Home শেহেজাদার আদর শেহেজাদার আদর পর্ব ৭৬

শেহেজাদার আদর পর্ব ৭৬

শেহেজাদার আদর পর্ব ৭৬
সুমাইয়া ইসলাম নূর

সকালের কোমল আলো ধীরে ধীরে জানালার ফাঁক গলে রুমজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। সাদা পর্দা ভেদ করে আসা সোনালি রোদ বিছানার চাদরে আঁকছে নরম আলোর নকশা। বাইরে বাগানের পাখিদের কিচিরমিচির আর হালকা বাতাসে দুলতে থাকা পাতার মৃদু শব্দ মিলিয়ে চারপাশে এক প্রশান্ত সকালের আবহ তৈরি হয়েছে।
হঠাৎই ইউভির ঘুম ভেঙে গেল।
আধোঘুমে ধীরে ধীরে চোখ মেলে সে প্রথমেই অনুভব করল—মাথার ওপর যেন ভারী কিছু চাপা পড়ে আছে। ভ্রু কুঁচকে আলতো করে চোখ খুলতেই দৃশ্যটা দেখে তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল।ইনায়া তার মাথার ওপর থুতনি রেখে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। এক হাত এখনো আলতো করে জড়িয়ে রয়েছে ইউভির কাঁধে, যেন ঘুমের মাঝেও মানুষটাকে ছেড়ে দিতে রাজি নয়।দৃশ্যটা দেখে ইউভির বুকটা হঠাৎ করেই মোচড় দিয়ে উঠল।
সে দ্রুত উঠে বসতেই ঘুমন্ত ইনায়ার শরীর সামনের দিকে হেলে পড়তে লাগল। কিন্তু বিছানাই পড়ার আগেই ইউভি তড়িঘড়ি করে তাকে নিজের বুকে আগলে নিল।হঠাৎ এমন ঝাঁকুনিতে ইনায়ার ঘুম ভেঙে গেল। আধোঘুমে চোখ মেলে কিছুক্ষণ ইউভির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।ইউভি কপাল কুঁচকে অভিমানী গলায় বলল,

— “সাধে কি তোকে বেয়াদব বলি? একবারও ডাকিসনি কেন? ইসস… কত কষ্ট হয়েছে! সারারাত এভাবে বসে ছিলি? অনেক কষ্ট হয়েছে, তাই না, পাখি?”তার কণ্ঠে ছিল অপরাধবোধ আর অদ্ভুত এক মায়া।সরি সরি আদর। আমি বুঝতেই পারিনি। কষ্ট পেয়েছিস অনেক?
ইনায়া মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
— “না।”
কথাটা বললেও চোখের নিচের হালকা ক্লান্তির ছাপ ইউভির চোখ এড়াল না।সে আরও শক্ত করে ইনায়াকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে অবাক কণ্ঠে বলল,
— “আদর… আমি এতটা গভীর ঘুমে ছিলাম যে একবারও ঘুম ভাঙল না! এমন তো কখনো হয় না আমার সঙ্গে। এক ঘুমেই সকাল হয়ে গেল!”
ইনায়ার ঠোঁটের কোণে দুষ্টু এক হাসি ফুটে উঠল।
সে নিজের বুকের দিকে আঙুল দিয়ে ইশারা করে মিষ্টি গলায় বলল,দেখতে হবে না? কোন ব্র্যান্ডের বালিশে ঘুমিয়েছিলেন।কথাটা শুনে ইউভি কয়েক সেকেন্ড তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হেসে ফেলল।
আলতো করে ইনায়ার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,
— “হুম… সত্যিই পৃথিবীর সবচেয়ে আরামদায়ক বালিশ। তাই তো ঘুম এত গভীর হয়েছে।একটু থেমে আবার মায়াভরা কণ্ঠে বলল জানিস, সারাদিন পৃথিবীর যত দায়িত্বই কাঁধে থাকুক না কেন দিনের শেষে আমার সব ক্লান্তি এসে থামে এই বুকের কাছেই। তুই থাকলে ঘুমও শান্তি পায়, মনও শান্তি পায়।
ইনায়া লজ্জায় মাথা নিচু করে মৃদু হেসে ইউভির বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলল।ইউভি তার এলোমেলো চুলে ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে আবারও ফিসফিস করে বলল,আর কখনো এমন কষ্ট করে বসে থাকার প্রয়োজন নাই মিসেস চৌধুরী । আমি যতই গভীর ঘুমে থাকি না কেন, একবার ডাকলেই উঠে যাব। তোর কষ্টের বিনিময়ে আমার বিশ্রাম চাই না, আদর। তুই ভালো থাকলেই আমার সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়।

সকালের নরম রোদ তখন পুরো চৌধুরী ভিলাকে সোনালি আভায় রাঙিয়ে তুলেছে। ফ্রেশ হয়ে এসে ইনায়ার সামনে দাঁড়িয়ে টাই ঠিক করতে করতে ইউভি বলল,মনে আছে, বউ? আজ কিন্তু রাজ্জোর অনারে ব্যাচেলর পার্টি আছে কথাটা বলেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।ইসস… ছেলেটা এখনো বুঝতেই পারছে না, বিয়ে করে কী বিপদ ঘরে নিয়ে আসছে!”
চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে ইনায়া থমকে দাঁড়াল। তারপর ভ্রু কুঁচকে মৃদু চিৎকার করে বলল,
— “এই! কী বলতে চাইছেন আপনি? আমরা মেয়েরা বিপদ?
ইউভি আয়নায় ইনায়ার প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে বলল,
একদম ঠিক শুনেছো মিসেস চৌধুরী । পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর আর সবচেয়ে বিপজ্জনক সৃষ্টি—বউ।
— “বাহ! তাহলে এত ভালোবেসে সেই বিপদকেই বিয়ে করলেন কেন?”
ইউভি এক মুহূর্তও না ভেবে জবাব দিল,কারণ আমি ছোটবেলা থেকেই রিস্ক নিতে ভালোবাসি।ইনায়া কিছু বলতে যাবে এমন সময় পিয়াসার কণ্ঠ শোনা গেল বেবি দ্রুত আই।

কিছুক্ষণ পর সবাই একে একে নিচে নেমে এল। ডাইনিং টেবিলে সকালের নাস্তা শেষ করে যে যার মতো অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে লাগল।
অফিসে বের হওয়ার আগে ইনায়া আর পিয়াসা একবার ছোট্ট রাজপুত্রকে দেখতে রিমঝিম চৌধুরীর রুমে গেল।রুমের ভেতরে রিমঝিম চৌধুরী আর সাবিহা চৌধুরী ছোট্ট শিশুটিকে নিয়ে গল্প করছিলেন।ইনায়া এগিয়ে গিয়ে অত্যন্ত যত্ন করে শিশুটিকে কোলে তুলে নিল। ছোট্ট মুখটার দিকে তাকিয়ে তার ঠোঁটে অজান্তেই মায়াভরা হাসি ফুটে উঠল। কিছুক্ষণ আদর করার পর পিয়াসাও শিশুটিকে কোলে নিয়ে নানা রকম মুখভঙ্গি করে তাকে হাসানোর চেষ্টা করতে লাগল।
সাবিহা চৌধুরী হেসে বললেন,

— “দেখছি, দু’জনেরই অফিসে যাওয়ার কোনোতাড়া নেই। পিয়াসা হেসে বলল,
এমন একটা বাবুকে রেখে যেতে মন চায় নাকি?”
কিছুক্ষণ পর ইনায়া শিশুটির কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে রিমঝিমের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “আজ আমাদের একটা পার্টি আছে। তাই অফিস শেষ করেই তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসব। তোমরা ভালো থেকো। রিমঝিম মুচকি হেসে মাথা নাড়লেন।
সাবধানে যাস দুটো
নাস্তা শেষ করে সবাই অফিসের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ল।ইউভি আর ইনায়া আজ একই গাড়িতে যাবে। অন্যদিকে রেদোয়ান আর পিয়াসা ও যাবে আরেকটি গাড়িতে।ভিলার সামনে দাঁড়িয়ে ইউভি আর রেদোয়ান দুই ভাই তাদের বউয়ের জন্য অপেক্ষা করছে।হাসতে হাসতে পাশাপাশি বেরিয়ে আসছে ইনায়া আর পিয়াসা।ঠিক তখনই হঠাৎ পিয়াসার চোখের সামনে যেন সবকিছু অন্ধকার হয়ে এল। শরীরটা টলমল করে উঠল। সে সামনে পড়ে যেতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই ইনায়া দ্রুত তাকে ধরে ফেলল।বেবি! তুই ঠিক আছিস?” উৎকণ্ঠিত গলায় বলল ইনায়া।
পিয়াসা নিজেকে সামলে নিয়ে জোর করে হাসল।

— “হ্যাঁ… চিন্তা করিস না। আমি ঠিক আছি।”
দূর থেকে বিষয়টা দেখে ইউভি আর রেদোয়ান দ্রুত এগিয়ে এল।উদ্বিগ্ন কণ্ঠে ইউভি বলল,কী হয়েছে, বনু?”ইউভির মুখে উদ্বেগের ছাপ দেখে পিয়াসা দ্রুত বলল,কিছু না, ভাইয়া চলো এর বেশি কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই সে গাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল।গাড়িতে ওঠার সময়ও ইউভি একবার তাকিয়ে বলল,বনু… আর ইউ ওকে?”
পিয়াসা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।জি, ভাইয়া।”
রেদোয়ান নিজ হাতে গাড়ির দরজা খুলে দিল। পিয়াসা গাড়িতে উঠে বসতেই সেও পাশের সিটে বসে পড়ল।
গাড়ি ছাড়তেই রেদোয়ান চিন্তিত কণ্ঠে বলল,
— “পিহু… আমি নিজের চোখে দেখেছি, তুমি পড়ে যাচ্ছিলে। সত্যি করে বলো, তুমি ঠিক আছ তো?”
পিয়াসা ধীরে ধীরে নিজের হাতটা রেদোয়ানের হাতের মধ্যে রেখে একটু কাছে সরে এল।
নরম কণ্ঠে বলল,হ্যাঁ… আমি ঠিক আছি। রেদোয়ান গভীর দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আলতো করে পিয়াসার কপালে ভালোবাসার পরশ এঁকে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,

— “আমার কাছ থেকে কখনো কিছু লুকাবে না, পিহু। প্লিজ পিয়াসা শুধু মৃদু হেসে তার কাঁধে মাথা রাখল।
এদিকে ইনায়া গাড়িতে উঠতেই ইউভি ঝুঁকে নিজ হাতে তার সিটবেল্ট বেঁধে দিল।তারপর একদৃষ্টিতে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ কণ্ঠে বলল মাশাআল্লাহ… মিসেস চৌধুরী! ইনায়া অবাক হয়ে বলল,হঠাৎ? ইউভি ইঞ্জিন স্টার্ট দিতে দিতে মুচকি হেসে বলল,আমার বউটাকে তো সব সময়ই মাশাআল্লাহ লাগে। তবে আজ একটু বেশিই লাগছে। মনে হচ্ছে, চোখ সরালেই কেউ নজর লাগিয়ে দেবে। ইনায়া হেসে বলল,তাই নাকি?”
হুম। তাই তো ভাবছি অফিসে না গিয়ে আজ সারাদিন ইনায়া চোখ বড় বড় করে বললো।সারাদিন কী? তোমাকে নিয়েই ঘুরি। মিস্টার ইউভি, আজ কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে।”
ইউভি মৃদু হেসে গাড়ি রাস্তায় তুলল।জানি। তাই তো আফসোস হচ্ছে… অফিসটা না থাকলে আজ পুরো দিনটাই শুধু আমার বউকে নিয়ে কাটাতাম।
ইস কি মারাত্মক আবহাওয়া এই আবহাওয়াই কেও বউ রেখে বাহির হয়। ইনায়া পালটা প্রশ্ন করলো কেন কি করে ইউভি ও নির্দ্বিধায় উত্তর দিলো চাইলে তো অনেক কিছু করা যায় বউ যেমন জিম ব্যাস ইনায়া মাঝ পথেই থামিয়ে দিলো অনেক বলছেন আর না।
কথাটা শুনে ইনায়া লজ্জায় মুচকি হেসে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।তাদের গাড়ি ধীরে ধীরে ব্যস্ত শহরের পথে অফিসের উদ্দেশে এগিয়ে চলল।ইউভি একমনে গাড়ি চালাচ্ছে। ডান হাতে স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরা, আর বাম হাতটা আলতো করে রাখা ইনায়ার হাতের ওপর। মাঝেমধ্যে বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে খুব যত্ন করে তার হাতের পিঠে স্পর্শ করছে। যেন এই নীরব স্পর্শ দিয়েই আশ্বস্ত করে দিচ্ছে। ঠিক তখনই ইনায়ার ফোনটা বেজে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল—

ডা. রাজিয়া সুলতানা।
নামটা দেখতেই ইনায়ার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। কাঁপা হাতে কল রিসিভ করল সে।
“হ্যালো, ওপাশ থেকে শান্ত কণ্ঠ ভেসে এলো,
“ইনায়া, তোমার রিপোর্ট চলে এসেছে। তুমি কি আজ একবার চেম্বারে আসতে পারবে?”
ইনায়ার গলা শুকিয়ে গেল।কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,”রি… রিপোর্ট ভালো তো, ?”
কয়েক সেকেন্ড নীরব হয়ে গেলেন ডা. রাজিয়া সুলতানা। কীভাবে কথাটা বলবেন, যেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না।তারপর অত্যন্ত কোমল, আশ্বাসভরা কণ্ঠে বললেন ইনায়া… তোমার পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS) ধরা পড়েছে। তবে তুমি একদম ভয় পাবে না। বর্তমানে এর খুব ভালো চিকিৎসা আছে। সঠিক চিকিৎসা, নিয়মিত ফলো-আপ আর জীবনযাপারে কিছু পরিবর্তন আনলে ইনশাআল্লাহ খুব দ্রুতই তুমি কনসিভ করতে পারবে। তাই অযথা দুশ্চিন্তা করবে না। তুমি শুধু একবার চেম্বারে চলে এসো, সবকিছু আমি বিস্তারিত বুঝিয়ে বলব।”

কিন্তু…
এরপর ডাক্তার আর কী বলছিলেন, ইনায়া যেন আর কিছুই শুনতে পেল না।তার চারপাশের সমস্ত শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল।হাত থেকে ফোনটা ধীরে ধীরে নিচে নেমে এলো।নিঃশব্দে জানালার বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল সে।
মুহূর্তের মধ্যেই তার চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল দু’ফোঁটা অশ্রু।পাশেই বসে থাকা ইউভির বুকটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল।মনে হলো, যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য সে শ্বাস নিতেই ভুলে গেছে।
উদ্বিগ্ন চোখে একবার ইনায়ার দিকে তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,কী হয়েছে, আদর?”কোনো উত্তর নেই।
ইউভি আরও একটু চিন্তিত হয়ে বলল,তোমার চোখে পানি কেন? একটু থেমে নিচু স্বরে আবার জিজ্ঞেস করল,আর… কিসের রিপোর্ট?
ইনায়া তড়িঘড়ি করে চোখের পানি মুছে ফেলল।
জোর করে ঠোঁটে একটুখানি হাসি এনে বলল,
কই… কিছু না। তুমি গাড়ি চালাও। ইউভি একবার গভীর দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল।সে বুঝতে পারছে ইনায়া মিথ্যে বলছে।খুব বড় কিছু হয়েছে।

তবুও সে আর একটি কথাও বাড়াল না।কারণ সে চাইলে সত্যিটা জানতে তার দশ মিনিটও লাগবে না। একটি ফোন কল, একটি নির্দেশ—ব্যস।কিন্তু সে সেটা করতে চায় না।সে চায়, তার আদর নিজে থেকে তার হাত ধরে, তার চোখের দিকে তাকিয়ে, নিজের মনের সমস্ত কষ্ট খুলে বলুক।তাই ইউভি শুধু নীরবে ইনায়ার হাতটা আরও শক্ত করে নিজের মুঠোর মধ্যে নিল।তারপর ধীর কণ্ঠে শুধু একটি কথাই বলল,”যখন বলতে ইচ্ছে করবে… আমি শুনব, আদর। তাড়াহুড়ো নেই।
গাড়ির ভেতর আবার নেমে এলো গভীর নীরবতা।ইনায়া জানালার বাইরে তাকিয়ে নিজের চোখের জল লুকানোর চেষ্টা করছে। এদিকে ইউভি স্টিয়ারিং ধরে সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে, অথচ তার সমস্ত মনোযোগ আটকে আছে পাশের মানুষটার নীরব কান্নায়।”আমি আজ অফিসে যাব না… একটু আশ্রমে যাব।”হঠাৎই নীরবতা ভেঙে খুব শান্ত কণ্ঠে বলল ইনায়া। ইউভি এক ঝলক তার দিকে তাকাল। চোখে এখনো উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট। তবুও নিজের সব প্রশ্ন বুকের ভেতর চেপে রেখে স্নিগ্ধ কণ্ঠে বলল,ঠিক আছে… যাও। তবে আমার সঙ্গে একটু থেকো, তারপর যেও।”ইনায়া শুধু নিঃশব্দে মাথা নাড়ল।এর বেশি আর কোনো কথা বাড়াল না।

কিছুক্ষণ পর গাড়ি এসে থামল চৌধুরী গ্রুপের বিশাল কর্পোরেট ভবনের সামনে।ইউভি গাড়ি থেকে নেমে গিয়ে অভ্যাসমতো ইনায়ার জন্য দরজা খুলে দাঁড়িয়ে রইল।ইনায়া ধীরে ধীরে নেমে আসতেই ইউভি একবার তার দিকে তাকাল। কিছু বলতে চেয়েও বলল না।দু’জন পাশাপাশি হেঁটে ভবনের ভেতরে প্রবেশ করল।চারপাশে কর্মচারীদের সম্মানসূচক অভিবাদন ভেসে উঠল।
— “গুড মর্নিং, স্যার।”
— “গুড মর্নিং, ম্যাম।”কিন্তু আজ যেন তাদের কারও মনেই সেই শুভেচ্ছার কোনো প্রতিধ্বনি নেই।
কিছুক্ষণ পর চৌধুরী গ্রুপের প্রধান কনফারেন্স রুমে বসেছে গুরুত্বপূর্ণ একটি মিটিং।টেবিলের শীর্ষে বসে আছেন লিখন চৌধুরী।তার ডান পাশে রাতিব চৌধুরী, রবিউল চৌধুরী।অন্য পাশে ইউভি, রেদোয়ান, ইনায়া ও পিয়াসা।মিটিংয়ে নতুন প্রজেক্ট, আন্তর্জাতিক চুক্তি আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে একের পর এক আলোচনা চলছিল।লিখন চৌধুরী কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ব্যাখ্যা করছেন।রাতিব চৌধুরী নিজের মতামত দিচ্ছেন।রবিউল চৌধুরী মাঝেমধ্যে কিছু তথ্য যোগ করছেন।রেদোয়ান ও পিয়াসাও মনোযোগ দিয়ে আলোচনায় অংশ নিচ্ছে।
কিন্তু…আজ যেন ইউভির মন সেখানে নেই।

তার সমস্ত মনোযোগ আটকে আছে শুধু একজন মানুষের ওপর।ইনায়ার ওপর।আর ইনায়া…
সে টেবিলের ওপর রাখা ফাইলের দিকেই স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।কিন্তু চোখের সামনে থাকা একটি শব্দও যেন তার মাথায় ঢুকছে না।মনের ভেতর শুধু একটাই কথা ঘুরপাক খাচ্ছে।ইউভির ছোট্ট একটা ইচ্ছেও আমি পূরণ করতে পারলাম না ভাবতেই নিজের ওপর ভীষণ অভিমান হতে লাগল তার।বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভারী হয়ে আসছে।
ঠিক তখনই অজান্তেই চোখ তুলে তাকাল ইনায়া।
সামনেই বসে আছে ইউভি।একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে।সেই দৃষ্টিতে কোনো অভিযোগ নেই।কোনো রাগও নেই।শুধু সীমাহীন উদ্বেগ আর অজস্র অপ্রকাশিত প্রশ্ন।আর সবচেয়ে বেশি যা চোখে পড়ল ইউভির দু’চোখ অস্বাভাবিক লাল হয়ে আছে।
যেন দীর্ঘক্ষণ ধরে নিজের ভেতরের অস্থিরতাকে জোর করে চেপে রেখেছে।সেই দৃষ্টি আর এক মুহূর্তও সহ্য করতে পারল না ইনায়া।হঠাৎ করেই চেয়ার সরিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।কাঁপা গলায় বলল,

— “আমি… আসছি। তোমরা কথা বলো কেউ কিছু বলার আগেই দ্রুত পায়ে কনফারেন্স রুম থেকে বেরিয়ে গেল সে।প্রায় পালিয়েই এল।কিন্তু কেন?
সেই প্রশ্নের উত্তর তার নিজের কাছেও নেই।
কীভাবে বলবে সে ইউভিকে যে মানুষটা প্রতিদিন স্বপ্ন দেখে একদিন নিজের সন্তানকে তার ইচ্ছে কে বুকে তুলে নেবে সেই মানুষটার সেই ছোট্ট স্বপ্নটাও হয়তো সে পূরণ করতে পারবে না।
ভাবতেই বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল।
করিডোরের এক কোণে গিয়ে থেমে দেয়ালে হেলান দিল ইনায়া।চোখ বেয়ে নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ল অশ্রু।মনের ভেতর একের পর এক প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল।আমি কি কোনোদিন মা হতে পারব না? পরক্ষণেই নিজেকে শক্ত করার চেষ্টা করল সে।
না এভাবে ভেঙে পড়লে চলবে না।ডা. রাজিয়া সুলতানার সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলতে হবে।
তিনি তো বলেছিলেন—চিকিৎসা সম্ভব।সবকিছু না জেনে, শুধু একটা রিপোর্ট দেখে নিজের স্বপ্নগুলোকে মেরে ফেলা যাবে না।

ইনায়া ধীরে ধীরে ডা. রাজিয়া সুলতানার চেম্বারের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল।চোখেমুখে স্পষ্ট অস্থিরতা। ঠোঁট দুটো শুকিয়ে গেছে। চেয়ারে বসার পরও দু’হাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বসে রইল সে।
ডা. রাজিয়া সুলতানা মমতাভরা চোখে তার দিকে তাকিয়ে নরম কণ্ঠে বললেন,রিল্যাক্স, ইনায়া। আগে শান্ত হও। আমি জানি রিপোর্টটা দেখে তুমি ভয় পেয়ে গেছ। ইনায়ার চোখ মুহূর্তেই ভিজে উঠল।
কাঁপা কণ্ঠে বলল,আমি কি কোনোদিন মা হতে পারব না? প্রশ্নটা শুনে ডা. রাজিয়া সুলতানা নিজের চেয়ার ছেড়ে তার পাশে এসে বসলেন।আলতো করে ইনায়ার হাতের ওপর হাত রেখে শান্ত স্বরে বললেন,
— “কে বলেছে তুমি মা হতে পারবে না?

শোনো, তোমার PCOS (পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম) ধরা পড়েছে। এটা খুবই সাধারণ একটি হরমোনজনিত সমস্যা। পৃথিবীতে অসংখ্য নারী এই সমস্যায় ভোগেন, আর তাদের অনেকেই পরবর্তীতে সুস্থভাবে মা হয়েছেন। তাই প্রথমেই মাথা থেকে এই ভয়টা দূর করে দাও।”ইনায়া চুপচাপ শুনতে লাগল।
ডা. রাজিয়া আবার বললেন,হ্যাঁ, এই সমস্যার কারণে গর্ভধারণে কিছুটা সময় লাগতে পারে। কারও ক্ষেত্রে ছয় মাস, কারও ক্ষেত্রে এক বছর, আবার কারও ক্ষেত্রে কয়েক বছরও লাগতে পারে। এমনও আছে, সঠিক চিকিৎসা শুরু করার কয়েক মাসের মধ্যেই সুসংবাদ এসেছে। আবার কারও ছয় বছরও লেগেছে। কিন্তু একটা জিনিস কখনোই ভুলবে না—সময় বেশি লাগা মানেই অসম্ভব নয়।”
একটু থেমে তিনি একটি ফাইল সামনে এগিয়ে দিলেন।
তোমার চিকিৎসা শুরু হবে আজ থেকেই। নিয়মিত ওষুধ, প্রয়োজন হলে কিছু পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম আর মানসিক চাপ কমানো এই কয়েকটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো মেনে চললে ইনশাআল্লাহ সম্ভাবনা অনেক ভালো থাকে।”
ইনায়ার চোখ থেকে আবারও অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

— “কিন্তু… যদি না হয়? ডা. রাজিয়া সুলতানা স্নেহভরে হাসলেন।মানুষ চিকিৎসা করে, আর ফল দেন আল্লাহ। আমরা চেষ্টা ছাড়ব না। তুমিও হাল ছাড়বে না। আশা হারিয়ে ফেললে চিকিৎসার পথটাই কঠিন হয়ে যায়।”তিনি আরও বললেন,
আর একটা কথা মনে রাখবে। নিজেকে কখনো দোষ দেবে না। PCOS তোমার কোনো ভুলের কারণে হয়নি। এটা একটি চিকিৎসাযোগ্য শারীরিক অবস্থা। তাই অপরাধবোধে ভুগবে না।”
ইনায়া নিচু স্বরে বলল,আমার স্বামী… ও ছোট্ট বাচ্চা খুব ভালোবাসে।
যদি আমি…”

কথা শেষ করার আগেই তার গলা ধরে এল।
ডা. রাজিয়া তার কথা থামিয়ে দিলেন।না, ইনায়া। ‘যদি’ দিয়ে জীবন চলে না। তুমি এখনো লড়াই শুরুই করোনি, আর তার আগেই হেরে যাওয়ার কথা ভাবছ? এটা ঠিক নয়। তুমি শক্ত হও। তোমার স্বামীকে সব খুলে বলো। এই সময়ে সবচেয়ে বেশি দরকার একজন সঙ্গীর মানসিক সমর্থন। একা একা এত বড় কষ্ট বয়ে বেড়িও না। একটু থেমে আবার বললেন,আমি অনেক দম্পতিকে দেখেছি। বছরের পর বছর অপেক্ষার পরও তারা বাবা-মা হয়েছেন। তাই ধৈর্য রাখো। ছয় মাস লাগতে পারে, ছয় বছরও লাগতে পারে। কিন্তু আশা ছেড়ে দিলে পথ সেখানেই শেষ হয়ে যাবে।
ইনায়া নিঃশব্দে মাথা নাড়ল।
ডা. রাজিয়া প্রেসক্রিপশন এগিয়ে দিয়ে বললেন,
আজ থেকেই চিকিৎসা শুরু করো। আর একটা কথা… নিজের চোখের পানি যতটা সম্ভব কমাও। কারণ মানসিক চাপও এই সমস্যাকে বাড়িয়ে দিতে পারে। নিজের যত্ন নাও। ইনশাআল্লাহ ভালো খবর আসবে। ইনায়া কাঁপা হাতে প্রেসক্রিপশনটা নিয়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।চোখের পানি লুকিয়ে ডাক্তারকে সালাম জানিয়ে চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেল।

পার্কিংয়ে এসে গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে বসতেই এতক্ষণ ধরে শক্ত করে আটকে রাখা বুকভরা কষ্ট আর ধরে রাখতে পারল না সে।স্টিয়ারিংয়ের ওপর মাথা রেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।তার কান্নায় যেন জমে থাকা সব অভিমান, সব ভয় আর সব অসহায়ত্ব একসঙ্গে বেরিয়ে আসতে লাগল।
দুই হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে বারবার ফিসফিস করে বলতে লাগল,হে আল্লাহ… আমি শুধু ওর ছোট্ট একটা ইচ্ছে পূরণ করতে চাই। আমার শেহজাদাকে একদিন বাবা বলে ডাক শুনতে দিও। আমি যতদিনই অপেক্ষা করি, কোনো অভিযোগ করব না।

কিছুক্ষণ পর গাড়িটি এসে থামল ‘আদরের আশ্রয়’-এর সামনে ইনায়া এসেছে অনেকক্ষণ গাড়ির ভেতরে একা বসে ছিল। ধীরে ধীরে চোখের জল মুছে গভীর একটা নিঃশ্বাস নিল। নিজের মুখে একটু পানি ছিটিয়ে আয়নায় তাকাল।জোর করে ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল,ওদের সামনে ভেঙে পড়া যাবে না।”
গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই পরিচিত দৃশ্যটা চোখে পড়ল। সবুজ ঘাসে ছাওয়া বিশাল মাঠ, রঙিন ফুলে সাজানো বাগান আর চারপাশে ছোট ছোট শিশুদের প্রাণখোলা হাসি।ইনায়াকে দেখামাত্রই যেন আনন্দে চিৎকার করে উঠল বাচ্চাগুলো।আপু এসেছে!”

— “ইনায়া আপু!”
মুহূর্তের মধ্যেই একঝাঁক শিশু দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল।কেউ তার হাত আঁকড়ে ধরেছে, কেউ কোমর জড়িয়ে আছে, আবার কেউ আদর করে তার গালে মুখ ঘষছে।কয়েক মুহূর্ত আগেও যে মেয়েটা নিজের কান্না লুকিয়ে রাখতে ব্যস্ত ছিল, সেই ইনায়ার মুখেই এবার ফুটে উঠল নির্মল এক হাসি।সে একে একে সবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল, কপালে চুমু খেল,বাচ্চাদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটিয়ে ধীরে ধীরে ভেতরের ভবনের দিকে এগিয়ে গেল সে।
ভেতরে ঢুকেই দেখল, বড় হলরুমে কয়েকজন কিশোরী মনোযোগ দিয়ে আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।একজন নারী প্রশিক্ষক অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে শেখাচ্ছেন—কীভাবে বিপদের সময় নিজেকে রক্ষা করতে হয়, কীভাবে আক্রমণকারীর হাত থেকে বেরিয়ে আসতে হয়।দৃশ্যটা দেখে ইনায়া পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন কর্মীকে জিজ্ঞেস করল,এসব প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা কে করেছেন? মেয়েটি সম্মানের সঙ্গে উত্তর দিল,ইউভি স্যার। শুধু এই আশ্রয়েই নয়, স্যারের প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রেই প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা করে মেয়েদের আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
একটু থেমে আবার বলল,

— “শুধু তাই নয়, ছোটদের খুব যত্ন করে বোঝানো হয় কোনটা ‘গুড টাচ’ আর কোনটা ‘ব্যাড টাচ’। যেন কেউ তাদের সঙ্গে অন্যায় করার চেষ্টা করলে তারা বুঝতে পারে এবং প্রতিবাদ করতে পারে। কথাগুলো শুনে ইনায়ার ঠোঁটের কোণে গর্বভরা হাসি ফুটে উঠল।খুব আস্তে বলল,সব দিকেই মানুষের কত খেয়াল রাখে…”
ঠিক সেই মুহূর্তেই করিডোরের অন্য প্রান্ত থেকে একটি নবজাতক শিশুর কান্নার শব্দ ভেসে এলো।
ইনায়া চমকে উঠে বলল,কে কাঁদছে? একজন কর্মী দ্রুত এগিয়ে এসে বলল,আজ সকালেই রিটা ম্যাডাম… মানে আপনার বডিগার্ড… এই বাচ্চাটাকে এখানে নিয়ে এসেছেন।”ইনায়ার বুকটা ধক করে উঠল।কেন?”মেয়েটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
বাচ্চাটার মা বাবা ওকে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে চলে গেছেন। কথাটা শুনেই ইনায়া আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে রইল না।প্রায় দৌড়ে চলে গেল শিশুটির কাছে।ছোট্ট নবজাতকটি একটি দোলনায় শুয়ে অবিরাম কাঁদছে।ইনায়া কাঁপা হাতে তাকে কোলে তুলে নিতেই শিশুটি ধীরে ধীরে কান্না থামিয়ে দিল।
মেয়েটিকে নিজের বুকের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে অশ্রুসিক্ত চোখে ফিসফিস করে বলল,

—কেউ হাজার চেয়েও পায় না… আর কেউ না চাইতেই পেয়ে যায়।
কথাটা বলতেই বুকের ভেতরের জমে থাকা ব্যথাটা আবারও যেন মাথা চাড়া দিয়ে উঠল।
সে শিশুটিকে আরও শক্ত করে বুকে আগলে রাখল।মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সমস্ত মায়া যেন এই ছোট্ট প্রাণটার মধ্যেই লুকিয়ে আছে।অনেকক্ষণ ধরে তাকে কোলে নিয়েই বসে রইল ইনায়া।
ছোট্ট শিশুটি কখন যে তার বুকের উষ্ণতায় নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছে, কেউ বুঝতেই পারল না।
কিছুক্ষণ পর ইনায়া মৃদু হেসে পাশে দাঁড়ানো কর্মীকে জিজ্ঞেস করল,ওর কোনো নাম রাখা হয়েছে? মাথা নেড়ে বলল,”না, ম্যাম। এখনও না। আপনি যদি একটা নাম রাখতেন।
ইনায়া অনেকক্ষণ শিশুটির নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর অত্যন্ত স্নেহভরা কণ্ঠে বলল,
আজ থেকে ওর নাম হবে… ‘মায়া’।”কর্মীরা একসঙ্গে হাসিমুখে বললেন মাশাআল্লাহ খুব সুন্দর নাম।”
ইনায়া ছোট্ট মায়ার কপালে আলতো করে চুমু এঁকে ফিসফিস করে বলল,আজ থেকে তুমিও আমাদের আদরের আশ্রয়ের মেয়ে, মায়া। আল্লাহর ইচ্ছায় আর কখনো তোমাকে একা হতে হবে না।

আদরের আশ্রয়ের ভেতরটা ঘুরে দেখতে দেখতে কখন যে বেশ অনেকটা সময় কেটে গেছে, ইনায়া নিজেও খেয়াল করেনি। ছোট্ট মায়াকে কিছুক্ষণ বুকে আগলে রাখার পর অনেক কষ্টে তাকে আবার কেয়ারটেকারের কোলে ফিরিয়ে দিয়েছিল সে। তবুও বারবার ফিরে তাকাচ্ছিল শিশুটার দিকে। বুকের ভেতরটা কেমন যেন হাহাকার করে উঠছিল।
ঠিক তখনই আশ্রমের মূল ফটকের দিক থেকে কয়েকজন পরিচিত মুখ দ্রুত ভেতরে প্রবেশ করল।
কালো পোশাক, কানে ওয়্যারলেস, চোখেমুখে সর্বোচ্চ সতর্কতা।নিজের বডিগার্ডদের দেখে ইনায়া অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,তোমরা এখানে?”
সবার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রীটা মাথা চুলকাতে চুলকাতে অপ্রস্তুত হেসে বলল,

— “ইয়ে… মানে…”রীটার সেই ভঙ্গি দেখেই ইনায়া হেসে ফেলল।বুঝেছি তোমাদের স্যারই পাঠিয়েছেন, তাই না?”রীটা এবার আর লুকানোর চেষ্টা করল না।লজ্জিত মুখে মাথা নেড়ে বলল,জি, ম্যাম।”
ইনায়া মৃদু হেসে তার কাঁধে আলতো করে হাত রাখল। তারপর দু’জনে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে আশ্রমের বাগানের পথ ধরে এগিয়ে যেতে লাগল।
হাঁটতে হাঁটতেই ইনায়া দুষ্টু হেসে বলল,তা বলো তো… কতক্ষণ ধরে আমাকে ফলো করছ?”
রীতা গম্ভীর মুখ করে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে বলল,চব্বিশ ঘণ্টাই করি, ম্যাম।”ইনায়া বিস্মিত হয়ে তাকাল।রীটা এবার হাসতে হাসতে বললোশুধু আপনি যখন স্যারের সঙ্গে থাকেন… তখনই আমরা ছুটিতে থাকি! কথাটা শুনেই ইনায়া হেসে ফেলল।
—কারণ তখন স্যার নিজেই আপনার পুরো সিকিউরিটি!”দু’জনেই একসঙ্গে হেসে উঠল।
হাসির মাঝেও ইনায়ার বুকের ভেতরটা উষ্ণ হয়ে উঠল মানুষটা আমাকে নিয়ে ঠিক কতটা ভাবে…” মনে মনে বলল সে।

আদরের আশ্রয় থেকে বেরোতে বেরোতে সন্ধ্যা নেমে এসেছে।পশ্চিম আকাশের শেষ আলোটুকু মিলিয়ে যেতেই শহরের প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি ভবন রঙিন আলোর ঝলকানিতে জেগে উঠেছে।
গাড়ির জানালার বাইরে তাকিয়ে চুপচাপ বসে ছিল ইনায়া।একসময় গাড়ি এসে থামল চৌধুরী ভিলার সামনে।আজ রাজ্জোর ব্যাচেলর পার্টি।
অফিস থেকে সরাসরি ইউভি আর রেদোয়ান পার্টি ভেন্যুতে চলে যাবে।অন্যদিকে ইনায়া আর পিয়াসা ভিলা থেকেই তৈরি হয়ে একসঙ্গে যাবে।নিজ নিজ রুমে ফ্রেশ হয়ে কিছুক্ষণ পরই ড্রেসিং রুমে এসে দাঁড়াল ইনায়া।আজ তার পরনে একটি গাঢ় খয়েরি রঙের ইভনিং গাউন।
মসৃণ সাটিন আর সূক্ষ্ম স্টোনওয়ার্কে সাজানো পোশাকটি তার গায়ের উজ্জ্বল আভাকে আরও ফুটিয়ে তুলেছে। কোমর পর্যন্ত নিখুঁত ফিটিং, নিচের দিকে ঢেউ খেলানো নরম ভাঁজ—হাঁটার সঙ্গে সঙ্গে যেন পোশাকটিও সুর তুলে দুলে উঠছে।গলায় ছিল হালকা ডায়মন্ডের নেকলেস, কানে ছোট্ট ঝুলন্ত দুল, হাতে চিকন পড়ে নিল ব্রেসলেট।মুখে খুবই হালকা মেকআপ।আর কোমর ছাড়িয়ে নেমে আসা তার হালকা লালচে আভাযুক্ত ঘন, নরম চুলগুলো সম্পূর্ণ খোলা রেখে দিলো চুলের ঢেউগুলো বুক ছুঁয়ে কোমর পর্যন্ত নেমে এসেছে, যেন সন্ধ্যার আলোয় গলে পড়া লালচে রেশম।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে একবার দেখে নিল ইনায়া ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
দরজা খুলতেই দেখা গেল পিয়াসা দাঁড়িয়ে আছে।

আজ তার পরনে ছিল গাঢ় নেভি-ব্লু রঙের মার্জিত পার্টি গাউন। পোশাকের সূক্ষ্ম সিলভার এমব্রয়ডারি তাকে দিয়েছে এক অভিজাত সৌন্দর্য। খোলা চুল, হালকা গয়না আর মিষ্টি হাসিতে তাকেও অপূর্ব লাগছিল।দু’জন একে অপরের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।তারপর পিয়াসা মুচকি হেসে বলল,
— “বেবি… আজ যদি ভাইয়া তোকে দেখে একদম ফিদা হয়ে যাবে রে।
ইনায়া লজ্জায় হেসে বলল,তুইও কম সুন্দর লাগছিস না। আজ আমার ভাইয়া তোকে দেখে চোখই ফেরাতে পারবে না।”পিয়াসা হেসে ইনায়ার হাত ধরে বলল চল, সবাই নিশ্চয়ই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।”দু’জন পাশাপাশি ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগল।সন্ধ্যার ঝলমলে আলোয়, রাজকীয় পোশাকে সজ্জিত দুই চৌধুরী বধূকে দেখে মনে হচ্ছিল—অভিজাত্য, সৌন্দর্য আর সৌম্য ব্যক্তিত্ব যেন একই ফ্রেমে ধরা দিয়েছে।
আর কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের গাড়ি রাজ্জোর ব্যাচেলর পার্টির উদ্দেশ্যে রওনা দিল।রাত ঠিক আটটা বাজে আকাশে তখন তারার মেলা বসতে শুরু করেছে। চারদিকের উঁচু উঁচু ভবনের জানালাগুলো রঙিন আলোয় ঝলমল করছে। সেই আলোর শহরের মাঝখানে পাঁচতারা হোটেলের বিশাল রুফটপ যেন আজ আরও একটুখানি স্বপ্নের মতো সাজানো।আজকের আয়োজন ছিল রাজ্জোর ব্যাচেলর পার্টি।
আজ থেকে ঠিক পাঁচ দিন পর অনুষ্ঠিত হবে রাজ্জো আর তুবার বহুল প্রতীক্ষিত বিয়ে। জীবনের নতুন অধ্যায়ে পা রাখার আগে বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী আর পরিবারের কাছের মানুষদের নিয়ে ছোট্ট পরিসরে এই আনন্দঘন সন্ধ্যার আয়োজন করেছে রাজ্জো।পুরো ছাদজুড়ে ঝুলছে হাজারো উষ্ণ ফেয়ারি লাইট। একপাশে সাদা, নীল আর সোনালি বেলুন দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিশাল একটি আর্চ। তার মাঝখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা—

“Bachelor Night of Rajjo.”
চারদিকে তাজা সাদা গোলাপ, নীল হাইড্রেনজিয়া আর অর্কিড ফুলের মনোমুগ্ধকর সাজসজ্জা। নরম হলুদ আলোয় পুরো পরিবেশটা যেন আরও অভিজাত হয়ে উঠেছে।এক কোণে লাইভ ব্যান্ড ধীর লয়ের ইংরেজি আর বাংলা গান পরিবেশন করছে। মৃদু সুর বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।অন্য পাশে সাজানো রয়েছে ওপেন বার, বিভিন্ন ধরনের মকটেল, ককটেল, জুস এবং অতিথিদের জন্য নানান রকমের স্ন্যাকস।যদিও এটি ব্যাচেলর পার্টি, তবুও পরিবেশে ছিল পরিমিত সৌন্দর্য আর অভিজাত্যের ছোঁয়া।রাজ্জোর হাসপাতালের কয়েকজন নারী সহকর্মীও আজকের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত ছিলেন। তারা নিজেদের সহকর্মীদের সঙ্গে গল্পে মেতে উঠেছেন। অন্যদিকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচিত মুখ, রাজ্জোর বন্ধু আর পরিবারের কাছের মানুষদের উপস্থিতিতে পুরো রুফটপ প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।
ছাদের একপাশে আরামদায়ক সোফা আর কাঠের টেবিল ঘিরে বসে আছে ইউভি, রেদোয়ান আর আজকের অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ—রাজ্জো।

তাদের সামনে রাখা ক্রিস্টালের গ্লাসে ধীরে ধীরে বরফ গলে যাচ্ছে।রাজ্জো গ্লাসটা হাতে নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,ব্যস… আর পাঁচটা দিন। তারপর স্বাধীন জীবনের ইতি।”কথাটা শুনেই চারপাশে হাসির রোল পড়ে গেল।
রেদোয়ান হেসে বলল,এই কথা তুবার সামনে বলিস না। বিয়ের আগেই বাড়ি ঢুকতে দিবে না।
ইউভি গ্লাসে হালকা চুমুক দিয়ে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি টেনে বলল বিয়ে কোনো জেলখানা নয়। তবে ভুল মানুষকে বিয়ে করলে হতে পারে। হাসির মাঝেও ইউভি আজ যেন একটু চুপচাপ।
মুখে মৃদু হাসি থাকলেও তার চোখ দুটো বারবার চলে যাচ্ছে রুফটপের প্রবেশপথের দিকে।
রেদোয়ান সেটা খেয়াল করেই মুচকি হেসে বলল,
— “ভাইয়া আর পাঁচ মিনিটও অপেক্ষা করতে পারছেনা না, তাই না?”ইউভি গম্ভীর মুখে বলল,
কীসের?”রাজ্জো সঙ্গে সঙ্গে হেসে উঠল।

— “ভাবি আসার। ইউভি কিছু না বলে শুধু ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একটা হাসি ফুটিয়ে আবার গ্লাসে চোখ নামিয়ে নিল।কিন্তু সবাই বুঝে গেল এই মানুষটার মন এখন কোথাও নেই।সে শুধু একজনের অপেক্ষায়।
ঠিক তখনই রুফটপের প্রবেশদ্বারের দিকে উপস্থিত অনেকের দৃষ্টি একসঙ্গে ঘুরে গেল।
দরজার সামনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে তিনটি পরিচিত অবয়ব।গাঢ় খয়েরি রঙের রাজকীয় গাউনে ইনায়া…গভীর নেভি ব্লু গাউনে পিয়াসা…
আর অপূর্ব আভিজাত্যে সেজে থাকা তুবা।
তিনজন ধীর পায়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই মুহূর্তের জন্য যেন পুরো রুফটপের কোলাহল থেমে গেল।
চারপাশের অসংখ্য আলো যেন তাদের সৌন্দর্যের সামনে ম্লান হয়ে পড়ল।অনেক অতিথিই অবচেতনেই তাকিয়ে রইলেন তাদের দিকে।

আর সেই মুহূর্তে ইউভির দৃষ্টি গিয়ে থামল শুধু একজনের ওপর।তার আদর…
তার ইনায়া।রাজ্জো মুচকি হেসে তুবার সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর অত্যন্ত ভদ্র ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে বলল,চলো, তোমাকে আমার কয়েকজন পরিচিত মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। সবাই তোমার সঙ্গে দেখা করার জন্য মুখিয়ে আছে। তুবা লাজুক হেসে মাথা নাড়ল। রাজ্জোর পাশে পাশে ধীরে ধীরে পার্টির অন্য প্রান্তের দিকে এগিয়ে গেল সে।তাদের চলে যেতেই ইনায়া আর পিয়াসা ভিড় থেকে একটু সরে ছাদের একপাশে এসে দাঁড়াল। চারপাশে নরম সুরের সংগীত, হাসি-আড্ডা আর ঝলমলে আলোর মেলায় পরিবেশটা যেন আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।
হঠাৎ পিয়াসা আলতো করে ইনায়ার কনুইয়ে গুঁতো দিয়ে ফিসফিস করে বলল,বেবি… ভাইয়ার দিকে একবার তাকা।”ইনায়া অবাক হয়ে পিয়াসার ইশারা অনুসরণ করতেই মুহূর্তের জন্য যেন তার সমস্ত পৃথিবী থমকে গেল।এক কোণে বন্ধুদের মাঝে বসে আছে ইউভি।কালো শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে রাখা। বুকের ওপরের দু-একটি বোতাম খোলা। এলোমেলো ঘন কালো চুলগুলো কপালের ওপর পড়ে তাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। ছয় ফুট ছয় ইঞ্চি দীর্ঘ সুঠাম দেহ, প্রশস্ত কাঁধ, জিমে গড়া নিখুঁত শরীর আর তীক্ষ্ণ চোয়ালের রেখা—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ থেকে যেন বাস্তবে নেমে এসেছে মানুষটা।

চারপাশে অর্ক, আদিল, রিসোব, রাজ্জো, রেদোয়ানসহ সবাই গল্পে মেতে আছে। মাঝেমধ্যে ইউভির ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠছে সেই পরিচিত মুচকি হাসি, আর সেই হাসিতেই যেন আশপাশের সবাই আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠছে।ইনায়া মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।মনে মনে বলল,
“আল্লাহ… মানুষটা এত সুন্দর কেন বলো তো।
ঠিক তখনই ইউভি একবার চোখ তুলে তাকাল।
দু’জনের চোখ এক হতেই সে বেশি সময় তাকিয়ে রইল না। স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই আবার বন্ধুদের আলোচনায় মন দিল।কিন্তু কথা বলতে বলতে, হাসতে হাসতে, গ্লাসে চুমুক দিতে দিতেও তার চোখ বারবার অবচেতনেই ফিরে আসছিল এক জায়গায়।শুধু ইনায়ার কাছেই।বিষয়টা ইনায়ার নজর এড়াল না।
সে মনে মনে ফিসফিস করে বলল,”কী হয়েছে তোমার, বর? আজ তোমাকে একদম স্বাভাবিক লাগছে না। মুখে হাসি থাকলেও চোখ দুটো যেন অন্য কিছু বলছে ঠিক সেই মুহূর্তেই অতিথিদের ভিড়ের মাঝে পরিচিত একটি মুখে গিয়ে থেমে গেল ইনায়ার দৃষ্টি।ডক্টর রাজিয়া সুলতানা।
মুহূর্তের মধ্যেই বিকেলের প্রতিটি কথা বজ্রপাতের মতো ফিরে এল তার মনে।
বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।
মনে হলো, চারপাশের সব শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে।শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল।
নিজেকে সামলে নিতে না পেরে ইনায়া ধীরে ধীরে পাশের একটি চেয়ারে গিয়ে বসে পড়ল।কয়েক মিনিট পর রাজ্জোর কাছ থেকে ফিরে তুবা আর পিয়াসাও এসে তার দুই পাশে বসল।
ঠিক তখনই…

সামনের টেবিল থেকে ভেসে এলো নানা রকম খাবারের মনমাতানো সুগন্ধ।হঠাৎ করেই পিয়াসার মুখের রং বদলে গেল।এক হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে অস্বস্তিতে কুঁকড়ে উঠল সে “উফ..পরের মুহূর্তেই দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে ওয়াশরুমের দিকে প্রায় দৌড়ে চলে গেল।ইনায়া আর তুবা একে অপরের দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্তও দেরি করল না।দু’জনেই দ্রুত তার পেছন পেছন চলে গেল।ওয়াশরুমে পৌঁছে দেখল পিয়াসা মুখে ঠান্ডা পানি দিচ্ছে।
ইনায়া উদ্বিগ্ন হয়ে তার পিঠে হাত বুলিয়ে বলল,
বেবি, কী হয়েছে? খুব খারাপ লাগছে?”পিয়াসা জোর করে মুচকি হাসল।না… এখন অনেকটাই ঠিক আছি।।ঠিক তখনই দ্রুত পায়ে সেখানে এসে পৌঁছাল রেদোয়ান।মুখভরা উৎকণ্ঠা নিয়ে এগিয়ে এসে বলল,কী হয়েছে, পিহু?।পিয়াসা নিজেকে পুরোপুরি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বলল,
“কিছু না। এত চিন্তা করো না। সারাদিন একটু খাওয়া-দাওয়া এলোমেলো হয়েছে… তাই বোধহয় হঠাৎ অস্বস্তি লাগছিল। এখন ঠিক আছি।
রেদোয়ান কয়েক সেকেন্ড তার চোখের দিকে স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল।মনে হচ্ছিল, কথাগুলো পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছে না।তবুও আর কোনো প্রশ্ন করল না।শুধু আলতো করে বলল,

— “নিজের শরীরের খেয়াল রাখবে, পিহু। কোনো সমস্যা হলে এক মুহূর্তও লুকাবে না।”পিয়াসা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।তারপর চারজন আবার ধীরে ধীরে পার্টির মূল আয়োজনের দিকে ফিরে গেল।
রুফটপে তখনও গান বাজছে, চারপাশে হাসি-আড্ডার রেশ ছড়িয়ে আছে।
পার্টি ধীরে ধীরে যেন প্রাণ ফিরে পেল।
চারদিকে ঝুলছে উষ্ণ সোনালি ফেয়ারি লাইট, মাথার ওপরে তারাভরা আকাশ, একপাশে নরম আলোয় সাজানো লাউঞ্জ কর্নার, অন্য পাশে লাইভ বারবিকিউ স্টেশন। ডিজের তালে তালে আধুনিক ইংরেজি আর বাংলা গানের মিশেলে জমে উঠেছে পুরো পরিবেশ।হাতে সফট ড্রিংকস আর মকটেল নিয়ে কেউ গল্পে মশগুল, কেউ আবার পুরোনো স্মৃতি টেনে হাসিতে ফেটে পড়ছে। মাঝেমধ্যেই রাজ্জোকে ঘিরে বন্ধুদের খুনসুটি শুরু হচ্ছে।

এরই মাঝে আদিল, রিসব, রেদোয়ান, ইউভি—সবার গল্পে যেন পুরোনো দিনের আড্ডার আমেজ ফিরে এলো।কিছুক্ষণ পর ডিজের সাউন্ড একটু কমিয়ে অর্কো হাতে মাইক্রোফোন তুলে নিল।
হালকা কাশে গলা পরিষ্কার করে দুষ্টু হাসি দিয়ে বলল,লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন… একটু মনোযোগ, প্লিজ!।মুহূর্তেই চারপাশের কোলাহল কিছুটা থেমে গেল। সবাই অর্কোর দিকে তাকাল।
অর্কো হেসে আবার বলল,আজকের রাতটা শুধুই আমাদের রাজ্জো ভাইয়ের জন্য। তাই নাচ, গান, আড্ডা—কোনো কিছুরই কমতি থাকবে না।”
চারপাশ থেকে করতালির শব্দ ভেসে উঠল।
অর্কো আবার বলল,কিন্তু একটা জিনিস ছাড়া এই পার্টি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।”সবাই কৌতূহলী হয়ে তাকাতেই রাজ্জো নিজের গ্লাসটা টেবিলে রেখে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তারপর সোজা ইউভির দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,

— “ব্রো…”ইউভি ভ্রু তুলে তাকাল।রাজ্জো ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল,আজকে কোনো অজুহাত চলবে না। কতদিন হয়ে গেল তোর গান শুনি না। আজ তোকে একটা গান গাইতেই হবে।”
ইউভি মুচকি হেসে মাথা নাড়ল।না, আজ থাক।”
সঙ্গে সঙ্গে রাজ্য হেসে বলে উঠল,না মানে? এত সহজে ছাড় পাবি ভাবছিস?”আদিলও বললো”ঠিক কথা।
রেদোয়ান কাঁধ ঝাঁকিয়ে হেসে বলল,
আজ আর পালানোর কোনো রাস্তা নেই, ভাই।”
সবাইয়ের এমন জোরাজুরিতে শেষ পর্যন্ত ইউভি হাল ছেড়ে দিয়ে মৃদু হেসে উঠে দাঁড়াল।
তার দাঁড়িয়ে পড়তেই আবারও করতালিতে মুখর হয়ে উঠল পুরো ছাদ।রাজ্জো এগিয়ে এসে নিজের
— “দিস ইজ হোয়াট আই ওয়াজ ওয়েটিং ফর, ব্রো।”ইউভি শুধু হেসে মাথা নাড়ল।
এরপর ধীর পায়ে সে স্টেজের দিকে এগিয়ে গেল…
আর ঠিক তখনই একজন স্টাফ তার হাতে তুলে দিল কালো রঙের একটট গিটার। চারপাশ মুহূর্তের মধ্যেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সবাই অপেক্ষা করতে লাগল—আজ আবার কতদিন পর ইউভির কণ্ঠে গান শোনার সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তের জন্য।
সবাই কে অবাক করে ইউভি তার প্রিয় মানুষ কে উদ্দেশ্য করে গেয়ে উঠলো……….

Bheegi bheegi sadkon pe main….
Tera intezaar karun….
Dheere dheere dil ki zameen ko…
Tere hi nam karun…
Khudko main kho doon….
Ke fir ne kavi paaun…..
Houle houle zindegi ko…
Ab tere hawaale karun…..
Sanam re sanam re…..
….tu mera sanam hua re
Sanam re sanam re…..
….Tu mera sanam hua re
Karam re karam re…..
Tera mujhpe karam hua ree
Sanam re sanam re
tu mera sanam hua re…….

মুহূর্তের মধ্যেই পুরো ছাদজুড়ে করতালির ঝড় বয়ে গেল।ইউভির কণ্ঠের শেষ সুরটা বাতাসে মিলিয়ে যেতেই যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য সবাই নিশ্চুপ হয়ে রইল। তারপর একসঙ্গে হাততালিতে মুখর হয়ে উঠল পুরো রুফটপ।রাজ্য হেসে উঠে বলল,এই জন্যই তোকে গান গাইতে বলি, ভাই! এখনও আগের মতোই সবাইকে মুগ্ধ করে দিস।”অর্কো মাইক্রোফোন হাতে হেসে বলল,লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান… এটাই আমাদের শেহজাদ ইউভি চৌধুরী!”
চারপাশে আবারও করতালি তে ভরে গেল।
কিন্তু সেই মুহূর্তে ইউভির চোখে ছিল না করতালি, না প্রশংসা।তার সমস্ত দৃষ্টি স্থির ছিল একজনের ওপর…সামনের সারিতে বসে থাকা ইনায়ার চোখ কখন যে ভিজে উঠেছে, সে নিজেও বুঝতে পারেনি। গানের প্রতিটি শব্দ যেন তার হৃদয়ের গভীরতম ক্ষতগুলোকে আবারও ছুঁয়ে গেছে।
দুটি অশ্রুবিন্দু নীরবে গড়িয়ে পড়ল তার গাল বেয়ে।
দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিল সে।কেউ যেন না দেখে…
বিশেষ করে ইউভি।এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না ইনায়া। ধীর পায়ে হেঁটে চলে গেল ড্রিংকস কাউন্টারের দিকে।সেখানে রাখা একটি গ্লাস তুলে নিল।কী আছে, সেটাও দেখল না।এক নিঃশ্বাসে প্রায় অর্ধেকটা পান করে ফেলল।দূর থেকে দৃশ্যটা দেখে পিয়াসা আর তুবা একসঙ্গে এগিয়ে যেতে নিল।ঠিক তখনই ইউভি খুব শান্ত গলায় বলল,

— “না… তোমরা যেও না।।দু’জনেই থেমে গেল।
রেদোয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল,
— “ভাইয়া..
ইউভি মৃদু হেসে চোখ না সরিয়েই বলল,
আমি আছি। ওকে আমি সামলে নেব।তার কণ্ঠে এমন এক অদ্ভুত নিশ্চয়তা ছিল যে আর কেউ কিছু বলল না।কিছুক্ষণ পর অর্কো সবাইকে ডিনারের জন্য আমন্ত্রণ জানাল।অতিথিরা একে একে ভেতরের হলরুমের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।
ইউভি তখন খুব স্বাভাবিক গলায় রেদোয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,তোরা সবাই খেয়ে নে। আমি আসছি। রেদোয়ান একবার ইনায়ার দিকে তাকিয়ে আবার ইউভির দিকে তাকাল।সব বুঝেও কিছু বলল না।শুধু মাথা নেড়ে পিয়াসা, তুবা আর বাকিদের নিয়ে ভেতরে চলে গেল।
এদিকে ইনায়া তখন ধীর, টলমল পায়ে পার্টির ভিড় ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে।করিডোরের নরম আলোয় একা একা হাঁটছে সে।উঁচু হিল পরে হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল।হঠাৎ থেমে নিচু হয়ে দু’পায়ের হাই হিল খুলে
তারপর খালি পায়েই আবার হাঁটতে শুরু করল।
ঠান্ডা মার্বেলের স্পর্শও যেন তার ভেতরের আগুনটাকে শান্ত করতে পারছিল না।
কিছুটা দূরে…পকেটে দু’হাত গুঁজে ধীর পায়ে হেঁটে আসছিল ইউভি।একবারও ডাকল না।শুধু নীরবে অনুসরণ করতে লাগল নিজের মানুষটাকে।
করিডোরের শেষ প্রান্তে পৌঁছাতেই ইনায়া থেমে গেল।পরের মুহূর্তেই ইনায়ার হাই হিল জোরা তুলে।নিয়ে ইউভি দ্রুত এগিয়ে এসে এক ঝটকায় তাকে দুই বাহুতে তুলে নিল।হঠাৎ এমন ঘটনায় ইনায়া চমকে উঠে দু’হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল ইউভির গলা।মাতাল কণ্ঠে বিড়বিড় করে বলল,

— “আমাকে… নামান. ইউভি কোনো উত্তর দিল না।
শুধু আরও শক্ত করে তাকে আগলে নিল।
তারপর ইনায়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে খুব নিচু, কর্কশ অথচ ভালোবাসায় ভরা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল—
ডোন্ট এভার থিংক অ্যাবাউট লিভিং মি, ইউ সিলি গার্ল।”
কথাগুলো বলেই ইউভি ধীরে ধীরে ইনায়ার ভেজা চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে জমে থাকা ভয়, অপরাধবোধ আর না-বলা হাজারো কষ্ট যেন এক মুহূর্তেই পড়ে ফেলল সে।কোনো শব্দ উচ্চারণ করল না।শুধু আলতো করে দু’হাতে ইনায়ার মুখটা তুলে নিল। কয়েক সেকেন্ড একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে অত্যন্ত কোমলভাবে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল ইনায়ার ঠোঁটে। সেই স্পর্শে ছিল না কোনো তাড়াহুড়ো, ছিল না কোনো উন্মাদনা—ছিল শুধু নিঃশর্ত ভালোবাসা, আশ্বাস আর সারাজীবন পাশে থাকার নীরব প্রতিশ্রুতি।ধীরে ধীরে সরে এসে ইউভি নিজের কপালটা ইনায়ার কপালে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করল। তার কণ্ঠটা ভারী হয়ে এসেছে।
ইনায়ার অশ্রুভেজা চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে কর্কশ অথচ ভীষণ কোমল কণ্ঠে বলল,

— “তোর চোখে পানি… এটা আমি কোনোদিনও সহ্য করতে পারি না, আদর। তুই জানিস? তোর মুখে একটা ছোট্ট হাসি ফোটানোর জন্য আমি কত কিছু করেছি। কখনো প্রকাশ্যে, কখনো আবার আড়ালে থেকে… পরিবারের সবার মাধ্যমে, শুধু তোর ভালো লাগবে বলে। তোর যেটা ভালো লেগেছে, আমি চেষ্টা করেছি সেটা মুহূর্তেই তোর সামনে এনে দিতে। কারণ তোর হাসিটাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় শান্তি।”
আর আজ… সেই তুই-ই আমার সামনে কাঁদছিস। বল তো, আমি কীভাবে এটা সহ্য করি? কীভাবে তোকে বোঝাই, তোর এক ফোঁটা চোখের পানি ও আমার বুকের ভেতরটা ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দেয়। মনে হয়, কষ্টটা তুই না আমি পাচ্ছি। ইউভি ইনায়ার কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করল।

শেহেজাদার আদর পর্ব ৭৫

— “তুই শুধু আমার স্ত্রী না, আদর। তুই আমার দুনিয়া। তাই নিজের কষ্টগুলো আর একা একা বয়ে বেড়াবি না। তোর প্রতিটা কান্নার অধিকারও আমার, আর তোর প্রতিটা হাসির দায়িত্বও আমার। যতদিন আমি বেঁচে আছি, ততদিন তোর চোখে পানি মানায় না… মানায় শুধু হাসি।

শেহেজাদার আদর পর্ব ৭৭