Home অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫৪

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫৪

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫৪
রিদিতা চৌধুরী

বাইরে তখন গভীর রাত। জনমানবশূন্য এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা গ্রাস করে আছে চারদিক; যেন পুরো প্রকৃতিও এই তীব্র উৎকণ্ঠায় থমকে আছে। নেই কোনো মানুষের সাড়াশব্দ, নেই কোনো কোলাহল—পৈশাচিক এক শূন্যতা বুক চিরে হঠাৎই নেমে এসেছে জীবনের সবচেয়ে বড় নিষ্ঠুরতা—
গাড়ির ড্যাশবোর্ডে আছড়ে পড়া নীল আলোর স্ক্রিনটা তখনো জ্যান্ত হয়ে কেঁপে চলেছে। ডার্ক ব্রাউন স্ক্রিনের ওপর জ্বলজ্বল করছে একটি নাম—‘মাই প্যারোট’।
কিন্তু যে মানুষটার বুকের ভেতর এই নামের মানুষটার জন্য প্রতিদিন হাজারো ঝড় বইত, সে আজ অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন। স্টিয়ারিংয়ের ওপর ঝুঁকে পড়া সৌহার্দ্যের নিথর শরীর থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় চুইয়ে পড়ছে তাজা রক্ত।
জনমানবশূন্য সেই থমথমে রাতের বুকে গাড়িটির দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া অবয়ব জানান দিচ্ছে এক চরম সর্বনাশের।

তখন থেকে একটানা সৌহার্দ্যের নাম্বারে কল করে যাচ্ছে রিদি, অথচ ওপাশ থেকে সাড়ার কোনো নাম নেই। শুরুতে রিদির মনে অভিমানের মেঘ জমেছিল—সে ভেবেছিল, সৌহার্দ্য হয়তো তার ওপর সেই ঘটনার জন্য রাগ করে আছে, তাই ইচ্ছা করেই ফোন ধরছে না।
কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সেই অভিমানী রাগটা পলকেই ফিকে হয়ে জমল বুকচাপা আশঙ্কায়। মেয়েটার বুকটা এখন অজানা আতঙ্কে কেঁপে কেঁপে উঠছে।
সৌহার্দ্য যতই রাগ করুক না কেন, এতবার ফোন বেজে যাওয়ার পরও এভাবে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করার মানুষ তো সে নয়! বেশি রাগ হলে বড়জোর ফোন কেটে দিত, কিন্তু সম্পূর্ণ রিসিভ না করার পেছনে নিশ্চয়ই অন্য কোনো বড় কারণ আছে।
আর এক মুহূর্তও স্থির থাকতে পারল না রিদি। বুক কাঁপানো উৎকণ্ঠা নিয়েই সে দ্রুত ডায়াল করল ফারিসের নম্বরে। কয়েকবার রিং হওয়ার পরই ওপাশ থেকে ফোনটি রিসিভ হলো।
আর অমনি গলা জড়িয়ে আসা কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে তাড়াহুড়ো করে রিদি বলে উঠল—
— ভাইয়া, একটু দেখবেন উনি কোথায় আছে? কখন থেকে ফোন করে যাচ্ছি, ফোনটা একবারের জন্যও রিসিভ করছে না! আমার না ভীষণ টেনশন হচ্ছে, ভাইয়া… প্লিজ একটু দেখুন না!

ফারিস কেবলই মাত্র ঘরে ফিরেছে। বিকেল থেকে পার্টি অফিস প্রচণ্ড ব্যস্ততার কারণে সৌহার্দ্যের সঙ্গে আজ আর কথাই বলা হয়ে ওঠেনি।
রিদির উৎকণ্ঠায় ভরা গলা শুনে সে শান্ত গলায় বলল, “তুমি এত টেনশন কোরো না রিদি, আমি দেখছি কী হয়েছে!”
বলেই ফোনটা কেটে দিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে বসল।
সৌহার্দ্যের নম্বরে পরপর কয়েকবার কল করেও ওপাশ থেকে কোনো সাড়া পেল না সে। বুকটা কেমন যেন ছ্যাঁত করে উঠল।
আর এক মুহূর্তও দেরি না করে বিছানা ছেড়ে উঠে তাড়াহুড়ো করে গায়ে একটা শার্ট গলিয়ে নিল ফারিস, এরপর দ্রুত আঙুল চালাল সুজনের নম্বরে।
কয়েক রিং হওয়ার পরই ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ হলো। সুজন কিছু বলার সুযোগটুকুই পেল না, তার আগেই চরম উৎকণ্ঠা নিয়ে ফারিস প্রায় চেঁচিয়ে উঠল—

— “সুজন, সৌহার্দ্য কোথায়? ও কি এখনো হাসপাতালেই আছে? ও ফোন রিসিভ করছে না কেন?”
সুজন কেবল সবেমাত্র ডাইনিং টেবিলে খেতে বসেছে। ঘণ্টাখানেক আগেই তো সৌহার্দ্যকে সঙ্গে নিয়ে একটা বড় অপারেশন শেষ করে অপারেশন থিয়েটার থেকে বের হয়েছে সে।
হঠাৎ এমন ফোন পেয়ে ভ্রু কুঁচকে বিরক্ত গলায় সুজন বলল—
— “কোথায় আবার থাকবে! বউকে নিয়ে বাড়িতে ঘুমাচ্ছে হয়তো!তোরা কি আর আমার মত সিঙ্গেল নাকি?।অপারেশন শেষ করে তো আমরা প্রায় ঘণ্টা খানেক আগেই হাসপাতাল থেকে বের হয়েছি!”
সুজনের কথাটা শোনা মাত্রই ফারিসের সারা শরীর দিয়ে ঠান্ডা ঘাম ঝরে গেল। আতঙ্কিত গলায় সে কেঁপে কেঁপে বলে উঠল—
— “কী বলছিস তুই! রিদি তো একটু আগেই ফোন করে জানাল, সৌহার্দ্য এখনো বাড়ি ফেরেনি! আমি নিজেও কতগুলো ফোন দিলাম, একটাও রিসিভ করল না!”
ফারিসের মুখে এ কথা শোনার পর সুজনের হাত থেকে চামচটা প্রায় খসে পড়ার উপক্রম হলো। মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে গেল সে, বুকটা অজানা আশঙ্কায় মোচড় দিয়ে উঠল।
সাময়িক ঘোর কাটিয়ে কাঁপাকাঁপা গলায় সে ফারিসকে নির্দেশ দিল—
— “তুই জলদি ওর ফোনের লোকেশন ট্র্যাক করে বের কর! আমি এখনই বের হচ্ছি, আ-আসছি আমি!”

সুজনের সাথে কথা শেষ করেই ফারিস বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে ফোন কেটে দিল এবং অন্য একটি নাম্বারে দ্রুত ডায়াল করে সৌহার্দ্যের লোকেশন ট্রেস করতে বলে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল।
ঠিক সেই মুহূর্তে ড্রয়িংরুমে তার সামনে এসে পড়লেন রায়েদা শেখ—তিনি আজ সকালেই এই বাড়িতে এসেছেন।
ফারিসের এমন উন্মাদ ও দিশেহারা রূপ দেখে তিনি থমকে গেলেন। তার শার্টের বোতামগুলো সব খোলা, চুলে অগোছালো ভাব, চোখেমুখে চরম আতঙ্ক!
রায়েদা শেখ চমকে গিয়ে উদ্বিগ্ন গলায় বলে উঠলেন—
— “কী ব্যাপার ফারিস! এভাবে পাগলের মতো কোথায় ছুটছো? আর তোমার শার্টের বোতামগুলো এমন খোলা কেন?”
রায়েদা শেখের দিকে ফিরে তাকানোর বা তাকে এক মুহূর্ত দাঁড় করিয়ে কথা বলার মতো মানসিক অবস্থা তখন ফারিসের ছিল না। ফুফির কথার কোনো উত্তর না দিয়ে, চোখমুখ শক্ত করে সে কেবল তাড়াহুড়ো করে পাশ কাটিয়ে বলে উঠল—
— “এখন এসব বলার সময় নেই ফুফি, আমার ভীষণ জরুরি কাজ আছে!”
বলেই উত্তাল ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ফারিস।

প্রায় বিশ মিনিট পর সৌহার্দ্যের ফোনের লোকেশন ট্র্যাক করে ফারিসের গাড়িটি যেখানে গিয়ে থামল, সেখানকার সামনের দৃশ্যটি দেখে থমকে গেল সে। মুহূর্তের জন্য ফারিসের চোখের পলক পড়ে গেল, হৃৎস্পন্দন যেন বন্ধ হয়ে এল।
রাস্তার একপাশে বিভৎসভাবে দুমড়েমুচড়ে পড়ে আছে সৌহার্দ্যের গাড়িটা!
পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। চলতে গিয়ে ফারিসের শরীরের সব শক্তি যেন হারিয়ে ফেলছে, বুকের ভেতরটা হু হু করে চিনচিনে ব্যথায় ফেটে পড়তে চাইল।
কোনোমতে পক্ষাঘাতগ্রস্তের মতো পা বাড়িয়ে সামনে এগিয়ে গেল সে। গাড়ির চূর্ণবিচূর্ণ কাঁচের ভেতর তাকিয়ে দেখল—রক্তাক্ত অবস্থায় সিটের ওপর নিথর হয়ে পড়ে আছে সৌহার্দ্য!
এই ভয়ানক রূপ আর সহ্য করতে পারল না ফারিস। বুকভাঙা কান্নায় আর নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে সে ঠিক ছোট বাচ্চার মতো হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল।

তবে কান্নার সময় এখন নয়। নিজেকে এক ঝটকায় সামলে নিয়ে সে দ্রুত সৌহার্দ্যকে গাড়ি থেকে বের করে আনল এবং নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
একই সাথে কাঁপাকাঁপা হাতে একটি মেসেজ পাঠিয়ে দিল সুজনের কাছে অ্যাম্বুলেন্সের জন্য। এরপর নিজেকে কঠোর করে সৌহার্দ্যের হাতের নাড়িটা চেক করতেই যখন পেলো ক্ষীণ এক স্পন্দন—তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে আর এক মুহূর্তও নষ্ট করতে চাইল না সে।
মনে মনে ভাবল, এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে, আর একটু দেরি হলে হয়তো চিরকালে সব শেষ হয়ে যাবে!

তাড়াহুড়ো করে সৌহার্দ্যকে রাস্তার পাশের ঘাসযুক্ত মাটিতে নিরাপদে শুইয়ে দিয়ে সে দ্রুত নিজের গাড়ির কাছে ছুটে গেল এবং গাড়িটি একটু এগিয়ে একদম সৌহার্দ্যের কাছাকাছি নিয়ে এল।
কিন্তু সৌহার্দ্যের মতো এমন লম্বা-চওড়া, ভারী একটা মানুষকে একা এভাবে পাজাকোলা করে গাড়িতে তোলা তার একার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছিল না। সে আপ্রাণ চেষ্টা করেও পেরে উঠল না।
নিরুপায় ও চরম অসহায়ের মতো চারদিকে চোখ বুলিয়ে কাউকে দেখার চেষ্টা করল—যদি এই বিপদের মুহূর্তে একটু সাহায্য মেলে! কিন্তু চারপাশটা একেবারে সুনসান।
বিপদের মুহূর্তে যে কাউকে পাশে পাওয়া যায় না, এই নির্মম সত্যটাই যেন আজ আবারও প্রমাণিত হলো!

সৌহার্দ্যকে জড়িয়ে ফারিসের সেই আকুল আর্তনাদ আর ধস্তাধস্তির ঠিক মাঝেই সাইরেন বাজিয়ে এসে হাজির হলো অ্যাম্বুলেন্স!
সঙ্গে রয়েছে সুজন, শাহাবীর। ফারিসের কাছ থেকে সৌহার্দ্যের খবর পাওয়ার পর, সে আর এক মুহূর্তও দেরি করেনি; দ্রুত খবর পাঠিয়েছে শাহাবীরকে।
অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামার পরই সৌহার্দ্যের নিথর অবস্থা দেখে শাহাবীর যেন নিজের পায়ের নিচের মাটি হারিয়ে ফেলল—সে রাস্তার ওপরই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল অসহায়ভাবে।
তবে মুহূর্তের জন্যও সময় নষ্ট করল না সুজন। দৌড়ে গিয়ে সৌহার্দ্যের কাছে পৌঁছেই তার নাড়ি (পাল্স) চেক করল।
পরক্ষণেই অ্যাম্বুলেন্সের লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে গলা ফাটিয়ে বলে উঠল,
“দ্রুত অক্সিজেন বের করুন! ওকে স্ট্রেচারে তুলুন, হারি আপ!”
ফারিস, সুজন আর অ্যাম্বুলেন্সের কর্মীরা মিলে দ্রুত সৌহার্দ্যকে তুলে দিল স্ট্রেচারে। ওরা সবাই মিলে অ্যাম্বুলেন্সে উঠে বসল।
সুজনের বুক কাঁপছে, হাতের আঙুলগুলো থরথর করে কাঁপছে—যে হাত দিয়ে সে প্রতিদিন কতশত মানুষের বুক চিরে হৃৎপিণ্ড ঠিক করে দেয়, আজ নিজের কাছের মানুষটির বিপদে সেই হাতই যেন অবাধ্য হয়ে উঠছে।
তবুও চরম আতঙ্ক আর বুকচাপা কান্না চেপে নিজেকে শক্ত করল সে। কাঁপাকাঁপা হাতেই শুরু করে দিল সৌহার্দ্যের প্রাথমিক চিকিৎসা, যা এই মুহূর্তে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সবচেয়ে বেশি জরুরি…

হাসপাতালের চত্বরে অ্যাম্বুলেন্স থামার আগেই সুজন সব প্রস্তুতি সেরে রেখেছিল। সৌহার্দ্যকে সোজা অপারেশন থিয়েটারে (ওটি) নিয়ে যাওয়া হলো।
দরজা বন্ধ হতেই ফারিস আর নিজেকে সামলাতে পারল না—হাসপাতালের ঠান্ডা ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে ভেঙে পড়ল সে।
শাহাবীর পাশে এসে বসতেই ফারিস ছোট বাচ্চার মতো হাউমাউ করে কেঁদে উঠল,
“ও… ও ঠিক হয়ে যাবে তো রে? ওকে উঠতে বল না! ওর মুখ থেকে ধমক না শুনলে তো আমার ভালো লাগে না। বিশ্বাস কর, আমার বুকের ভেতর কেমন যেন করছে, আর পারছি না সহ্য করতে… প্লিজ, ওকে উঠতে বল!
তাদের এই বন্ধুচক্রে শাহাবীর আর সৌহার্দ্যই সবচেয়ে শক্ত মনের মানুষ হিসেবে পরিচিত। অথচ আজ সেই পাথরসম শাহাবীরও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না; কান্নায় তার চোখগুলো লাল হয়ে ফুলে উঠেছে।
কাঁপতে থাকা হাতে ফারিসের পিঠে আলতো করে হাত বুলিয়ে সে সান্ত্বনা দিল,
“আমাদের সৌহার্দ্য অনেক স্ট্রং, ওর কিচ্ছু হবে না। একটু ধৈর্য রাখ, প্লিজ নিজেকে সামলা…”
ঠিক তখনই পকেটে বেজে উঠল ফারিসের ফোন। স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই ফারিসের বুকটা ‘ধক’ করে কেঁপে উঠল—ফোনে রিদির নাম জ্বলজ্বল করছে।
এই মুহূর্তে মেয়েটাকে সে কী জবাব দেবে? হতভম্ব হয়ে সে পাশে বসা শাহাবীরের দিকে তাকাতেই শাহাবীর চোখের ইশারাতেই রিদিকে এখনই সব সত্যি জানাতে মানা করল।
নিজেকে জোর করে শক্ত করে ফারিস ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে রিদির উদ্বিগ্ন ও কাঁপাকাঁপা কণ্ঠস্বর ভেসে এল,

“ভাইয়া, ওনার কোনো খোঁজ পেয়েছেন?”
গলার শুকনো থুতুটা গিলতে গিয়ে ফারিসের কষ্ট হলো। কোনোমতে নিজেকে স্বাভাবিক করে সে বলল,
“হুম… এই তো, আমি সৌহার্দ্যের সাথেই ওর হাসপাতালে আছি। তুমি টেনশন করো না, ওর জরুরি একটা ওটি চলছে তো, তাই এই মুহূর্তে কথা বলতে পারছে না।”
খবরটা শুনে রিদির বুক থেকে যেন একটা বড় পাথর নেমে গেল। কিছুটা স্বস্তি পেলেও লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে সে মিনমিন করে বলল,
“আচ্ছা… ওনার ওটি শেষ হলে ওনাকে একটা ফোন করতে বলবেন, ভাইয়া?”
“ঠিক আছে,” সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে কলটা কেটে দিল ফারিস।
ওদিকে ফোন রেখে দেওয়ার পরও রিদির মন মানল না। খাটের পাশ থেকে সৌহার্দ্যের বাঁধাই করা ছবিটা তুলে সেটিতে কয়েকটা আদরের চুমু খেল, তারপর ছবিটা বুকে জড়িয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল।
মনটা খানিকটা শান্ত হলেও বারবার তার চোখ চলে যাচ্ছে ফোনের স্ক্রিনে—সৌহার্দ্যের কোনো কল বা মেসেজ এল কি না, সেটাই দেখার অপেক্ষায় বুক কাঁপছে তার।
হাসপাতালের দূর করিডোরে অন্ধকারে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে আকাশ। সামনের কক্ষ থেকে ভেসে আসা বন্ধুদের সেই করুণ আত্মনাদ তার বুকটা চিরে ফেলছে, অথচ চাইলেও সে সামনে এগিয়ে যাওয়ার এক চুলও শক্তি পাচ্ছে না। ঠিক যেন কোনো অবুঝ শিশুর মতো অঝোরে গড়িয়ে পড়ছে তার চোখের জল।
​শূণ্যতার বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে রুদ্ধ কণ্ঠে বিড়বিড় করে উঠল—

​”ভাই আমার, আমি কত হতভাগ্য দেখ! আজ তোকে একটা বার ছুঁয়ে দেখার অধিকারটুকুও আমার নেই। যারা তোর এই অবস্থা করেছে, তাদের কাউকেই আমি ছাড়ব না। নিজ হাতে খুন করব একটা-একটাকে! চুলোয় যাক আমার এই শখের চাকরি… প্লিজ ভাই, তুই একবার ফিরে আয় না? তোর সাথে যে আমার এখনও কত কথা বাকি রয়ে গেছে!” শুনবি না তুই?
​কথাগুলো শেষ করেই আকাশ নিজের সর্বশক্তি দিয়ে চোখের জল মুছে ফেলল। তারপর দীর্ঘ এক ছায়া হয়ে হাসপাতালের সেই জমাট অন্ধকারেই হারিয়ে গেল নিঃশব্দে।
অপারেশন থিয়েটারের (ওটি) দরজা খুলে ডাক্তার বেরিয়ে এলেন। ফারিসের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন,

“স্যার, মিস্টার চৌধুরীকে দরকার; ওনাকে একটা বন্ডে সই করতে হবে। দ্রুত ওনাকে আসতে বলুন!”
কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই চমকে উঠল ফারিস। পরমুহূর্তেই উত্তেজনায় ফেটে পড়ে সে চেঁচিয়ে উঠল,
“কী আজেবাজে বকছেন আপনি হ্যাঁ! সামান্য একটু রক্তই তো গেছে, মুছে-টুছে ঠিক করে দেবেন—এতে বন্ডে সিগনেচার লাগবে কেন? কেমন ফালতু ডাক্তার হয়েছেন আপনারা! তাড়াতাড়ি ঠিক করুন ওকে, আমার ভাইয়ের কিচ্ছু হলে এই হাসপাতাল আমি জ্বালিয়ে দেব, সাথে আপনাকেও!”
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে শাহাবীর দ্রুত ডাক্তারকে চোখের ইশারায় চলে যেতে বলল। এরপর ফারিসের কাঁধে হাত রেখে শক্ত করে বুঝিয়ে বলল,
“পাগলামি করিস না তো! এগুলো প্রসিডিউরের ব্যাপার, নিয়মের খাতিরেই লাগে। মিস্টার চৌধুরীকে ফোন কর!”

বুকের ভেতর ঝড় বয়ে গেলেও কাঁপাকাঁপা হাতে সারহান চৌধুরীর নম্বরে ডায়াল করল ফারিস। ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ হতেই সে কোনোমতে স্বাভাবিক গলায় বলল,
“মামা, একটু হাসপাতালে আসেন তো… একটা জরুরি কাজ আছে। কাউকে কিছু বলতে হবে না, আপনি শুধু আসুন।”
ওপাশ থেকে সারহান চৌধুরীর আতঙ্কিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
“কী হয়েছে? কী লুকাচ্ছ আমার কাছ থেকে? আমার ছেলে… আমার সৌহার্দ্য ঠিক আছে তো?!”
ভয় চেপে রেখে কোনোমতে শান্ত গলায় ফারিস বলল,
“সব ঠিক আছে, আপনি শুধু আসুন।”
বলেই আর এক মুহূর্ত দেরি না করে লাইনটা কেটে দিল সে।

সারহান চৌধুরী ঠিকই বুঝতে পারলেন, একটা মারাত্মক কিছু ঘটেছে। নিজেকে সামলে নিয়ে তিনি যখন ঘর থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখনই শাহেদা চৌধুরী এসে ওনার হাত টেনে ধরলেন।
কাঁপাকাঁপা গলায় বলে উঠলেন,
“কোথায় যাচ্ছেন আপনি? আমার বাবুটা ঠিক আছে তো?”
সন্ধ্যা থেকেই শাহেদা চৌধুরীর বুকটা কেমন যেন কু গাইছিল; তাই তিনি ঘুমাতেও পারেননি। সৌহার্দ্য বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকেই আজ তিনি বেশ কয়েকবার ছেলেকে ফোন করে খোঁজ নিয়েছেন।
স্ত্রীর চোখের দিকে তাকিয়ে নিজেকে কোনোমতে শক্ত করার চেষ্টা করলেন সারহান চৌধুরী। নিজেকে সামলে নিয়ে তিনি বললেন,
“তেমন…”
পুরো কথাটি শেষ করতেও পারলেন না তিনি। তার আগেই বুকফাটা আর্তনাদে শাহেদা চৌধুরী বলে উঠলেন,
“না, আমি যাবো আপনার সাথে! লুকিয়ে লাভ নেই, আমি যাবই!”
স্ত্রীর সেই মাতৃত্বের আকুতি আর জিদের সামনে আর বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারলেন না সারহান চৌধুরী। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে আর মানা করলেন না, স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়েই দ্রুত বাড়ির বাইরে বেরিয়ে পড়লেন হাসপাতালের উদ্দেশ্যে।

অপারেশন থিয়েটারের (ওটি) ভেতরে সুজন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার বন্ধুটির নিথর দেহটার দিকে। অপারেশন থিয়েটারে প্রতিদিন কত শত রক্তাক্ত রোগী দেখা যার কাছে নিত্যদিনের ব্যাপার, আজ সেই একই জায়গায় এসে তার নিজেরই দম বন্ধ হয়ে আসছে। তার হাত দুটো অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে।
আর সহ্য করতে না পেরে সুজন হঠাৎ ওটির ঠান্ডা ফ্লোরে সেজদায় লুটিয়ে পড়ল। বুকফাটা আর্তনাদে সে রবের দরবারে আকুতি জানিয়ে কেঁদে উঠল—
“হে আল্লাহ…! যদি আমার জীবনটা নিতে হয়, নাও; তবুও আমার বন্ধুটাকে ফিরিয়ে দাও। আমার জীবনের প্রতিটি নেক আমল, প্রতিটি সেজদা, প্রতিটি দোয়া—সবকিছুর বিনিময়ে হলেও আমার ভাইটাকে আবার আমার বুকে ফিরিয়ে দাও। আমি ওকে ছাড়া বাঁচতে পারব না, আল্লাহ… দয়া করে ওকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিও না!”
সুজনের এমন হৃদয়বিদারক আর্তনাদ দেখে উপস্থিত জুনিয়র ডাক্তারটির বুকটাও কেঁপে উঠল; সৌহার্দ্যকে সেও ভীষণ ভালোবাসে।
কান্নাজড়িত চোখে সেজদা থেকে উঠে কাঁপাকাঁপা হাতে সৌহার্দ্যের শরীরের রক্তগুলো পরিষ্কার করতে যাবে, ঠিক তখনই একজন সিনিয়র ডাক্তার এসে তার কাঁধে হাত রেখে নরম অথচ দৃঢ় গলায় বললেন,
“তুমি চলে যাও সুজন, তুমি পারবে না। আমরা দেখছি!”
সিনিয়র ডাক্তারের দিকে এক পলক তাকিয়েও সুজন কোনো কথা বলল না। সে মুখ দিয়ে কিছু না বললেও তার মনের কোণে ভেসে উঠল শাহাবীরের সেই কড়া সতর্কতা—চোখ-কান খোলা রাখতে হবে; সুজনের নিজের হাতে চেক করা ছাড়া অন্য কেউ যেন সৌহার্দ্যের শরীরে ভুল করেও কোনো ইনজেকশন বা ওষুধ পুশ না করে!

হাসপাতালের করিডোরে পা রাখতেই যেন বাতাস ভারী হয়ে উঠল শাহেদা চৌধুরীর বুকফাটা কান্নায়। কিছু সময় আগেই সারহান চৌধুরীর সঙ্গে তিনি হাসপাতালে এসে পৌঁছেছেন।
সঙ্গে রয়েছে রায়েদা শেখ—ফারিসই ফোন করে ডেকে পাঠিয়েছে তাকে। রায়েদা প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে শাহেদা চৌধুরীকে সান্ত্বনা দিয়ে সামলে রাখার, কিন্তু মায়ের বুকভাঙা কান্না কিছুতেই থামছে না।
হাসপাতালের চারপাশের পরিবেশটা শোকে স্তব্ধ হয়ে আছে।

হাসপাতালের এক কোণে পাথরের মূর্তির মতো শক্ত হয়ে চুপচাপ বসে আছেন সারহান চৌধুরী; সঙ্গে তাঁর ভাই সারবান চৌধুরীও উপস্থিত আছেন। ভেতরের ঝড় বাইরে প্রকাশ না পেলেও তাঁদের থমথমে মুখ দেখেই সব বোঝা যাচ্ছে।
তখন সারহান চৌধুরী বাড়ি থেকে বের হওয়ার পরই দারোয়ান ফোন করে আরবানকে জানায় যে সারহান চৌধুরীকে ভীষণ চিন্তিত মনে হাসপাতালে যেতে দেখা যাচ্ছে।
খবর পাওয়া মাত্রই বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে তিনজনে মিলে ছুটে এসেছে হাসপাতালে। আজ আরবানের ডিউটি ছিল না বলে সে বাড়িতেই ছিল; হাসপাতালে পৌঁছানোর পর সে অনুমতি নিয়ে সোজা ঢুকে পড়েছে অপারেশন থিয়েটারের ভেতরে।
অপারেশনের ঠান্ডা ঘরে ভাইয়ের নিথর দেহটার দিকে তাকিয়ে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না আরবান। চোখের সামনে যেন পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে আসছে।
কান্নায় তার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে, বুকফাটা আর্তনাদে ভেঙে পড়ে সে এখন একেবারে দিশেহারা ও অস্থির!

অপারেশন থিয়েটারের দরজা খুলে ডাক্তার বের হতেই উদগ্রীব চাতক পাখির মতো তার দিকে তাকিয়ে রইলেন সারহান চৌধুরী।
ডাক্তার একটু শান্ত কণ্ঠে বলতে শুরু করলেন,
“ডাঃ চৌধুরীর অবস্থা আশঙ্কাজনক, আগামী চব্বিশ ঘণ্টা…”
কিন্তু পুরো কথাটা শেষ করার সুযোগ পেলেন না তিনি।
তার আগেই মাঝপথে কথা কেড়ে নিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে শাহাবীর বলে উঠল,
“আপনাদের চব্বিশ ঘণ্টা পর্যন্ত কষ্ট করতে হবে না! এয়ার অ্যাম্বুলেন্স এবং প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা প্রস্তুত আছে, আমরা ওকে এখনই লন্ডন নিয়ে যাচ্ছি। কী ফরমালিটিজ লাগবে, দ্রুত বলুন!”
বিরক্ত হয়ে ডাক্তার আপত্তি জানিয়ে বললেন,
“আপনারা চাইলেই হুট করে এমন একজন ক্রিটিক্যাল রোগীকে শিফট করতে পারেন না। লন্ডন পৌঁছাতে ছয়-সাত ঘণ্টা সময় লাগবে, এই মুহূর্তে ওনাকে নিয়ে এত বড় রিস্ক নেওয়া একেবারেই সম্ভব নয়!”
ডাক্তারের কথায় ক্ষিপ্ত হয়ে ফারিস গর্জে ওঠে বলল,
“সেটা আপনাকে ভাবতে হবে না! সে আমাদের বন্ধু, তার জীবন-”
ফারিসের কথা শেষ হওয়ার আগেই তেতে উঠে বাধা দিলেন সারবান চৌধুরী। কঠোর গলায় তিনি বলে উঠলেন,

“তোমাদের এসব পাগলামি আর নাটকবাজি এবার বন্ধ করো! আমার ভাইপোকে নিয়ে আমি আর কোনো ধরনের রিস্ক নিতে দেব না।”
এতক্ষণ সব শুনেও চুপচাপ পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন সারহান চৌধুরী। এবার অত্যন্ত দুর্বল ও ভাঙা গলায় তিনি অনুমতি দিয়ে বললেন,
“ওরা যা ভালো বোঝে, করুক… ওদের ওপর আমার পূর্ণ বিশ্বাস আছে।”
সারহান চৌধুরীর কাছ থেকে সেই কাঙ্ক্ষিত অনুমতিটুকু পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না শাহাবীর আর ফারিস। কারণ শাহাবীর খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছে—এই হাসপাতালের চারপাশে শত্রুদের যে জাল পাতা, তাতে সৌহার্দ্যকে এখানে শত পাহারা দিয়েও বাঁচিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে!
এদিকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এসেই এক কোণে একদম নিশ্চুপ হয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আরবান। সে কারোর সঙ্গেই কোনো কথা বলছে না, তার থমথমে নীরবতা যেন চারপাশের পরিস্থিতিকে আরও বেশি থমকে দিয়েছে!

সব গুছিয়ে নিতে নিতে প্রায় ভোর হয়ে এল। এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সৌহার্দ্যের সঙ্গে সুজন, আরবান এবং তাদের অত্যন্ত বিশ্বস্ত আরও কয়েকজন ডাক্তার যাচ্ছে।
তাদের সঙ্গে শাহাবীর ও ফারিসও যাচ্ছে। সারহান চৌধুরী ও রায়েদা শেখও। শাহেদা চৌধুরীকে রেখে যেতে চাইলে তিনি কিছুতেই রাজি হননি, কান্নাজড়িত জিদের মুখে শেষ পর্যন্ত তাঁকেও সঙ্গে নিতে বাধ্য হয়েছে সবাই।
তবে রিদিকে এখনো কিছু জানানো হয়নি; আর এই মুহূর্তে তাকে সঙ্গে নেওয়াও অসম্ভব, কারণ তার পাসপোর্ট ও ভিসার কোনো প্রস্তুতিই নেই।

সব ঠিকঠাক করে ফ্লাইটের সিটে এসে বসার পর ফারিসের একবার ইচ্ছে হয়েছিল রিদিকে ফোন করে সবটা জানিয়ে দেয়। কিন্তু শাহাবীরের কড়া মানা করায় সে আর তা করতে পারেনি।
কারণ, এই মুহূর্তে রিদিকে জানানো হলে সে ভেঙে পড়বে এবং তাকে সামলাতে গিয়ে যে সময়টুকু নষ্ট হবে, তা সৌহার্দ্যের মতো একজন ক্রিটিক্যাল রোগীর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।
অবশ্য ফ্লাইটে ওঠার আগে আরবান পৃথাকে ফোন করে সবটা জানিয়ে দিয়েছে এবং বলে দিয়েছে, রিদি ঘুম থেকে জাগার পর সে যেন পরিস্থিতি সামলে নেয়।
আসলে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় আরবানের আসল ঘটনাটি জানা ছিল না—দারোয়ানের কথায় সন্দেহ হওয়ায় তারা তিনজন ছুটে বেরিয়েছিল। কিন্তু মাঝরাস্তায় এসে যখন তারা সারহান চৌধুরীকে কল দেয়, তখন ওপারের সেই ভেঙে পড়া আর্তনাদ আর কান্নার আওয়াজ শুনেই আরবান বুঝতে পেরেছিল—ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটে গেছে!

সকাল প্রায় সাতটা বা সাড়ে সাতটা হবে ঘড়ির কাঁটায়। সারারাত চোখের পাতা এক করতে পারেনি রিদি। ফারিসের সঙ্গে কথা বলার পরও সে অনেকক্ষণ ধরে সৌহার্দ্যের কলের আশায় ছটফট করেছে।
লজ্জা আর সংকোচে সে আর ফারিসকে ফোন করতে পারেনি; এত রাতে কাউকে এভাবে বারবার বিরক্ত করা কি ঠিক? তাছাড়া সৌহার্দ্য তো মাঝেমধ্যেই ইমার্জেন্সি ওটির কারণে রাতে বাড়ি ফেরে না—
এসব ভাবতে ভাবতে শেষরাতের দিকে কোনোমতে তার একটু চোখ লেগেছিল। সৌহার্দ্যের রুমটা সাউন্ডপ্রুফ হওয়ায় এবং দরজা বন্ধ থাকায় বাইরের কোনো কোলাহল বা অস্থিরতা তার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি।
ওদিকে ভোরের আলো ফোটার আগেই পৃথা টেনশনে চারবার রিদির রুমের বাইরে থেকে ঘুরে গেছে। ঘুম ভাঙার পর রিদি কীভাবে এই নির্মম সত্যটা গ্রহণ করবে, সেই কথা ভেবেই মেয়েটার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে!

ঠিক তখনই পোষা বিড়াল মিকির মিউ মিউ শব্দে রিদির ঘুম ভেঙে দিল। চোখ মেলে অভ্যাসবশত বিছানায় হাতড়াতে গিয়ে যখন সে দেখল জায়গাটা পুরোপুরি খালি, তখন সে আর বিছানায় শুয়ে থাকতে পারল না—উঠে বসে পড়ল।
সে বুঝল, সৌহার্দ্য এখনো ফেরেনি। বুক কাঁপানো এক অজানা আশঙ্কায় হাত বাড়িয়ে নিজের ফোনটা তুলে সে সরাসরি ডায়াল করল সৌহার্দ্যের নম্বরে।
কিন্তু ওপাশ থেকে ভেসে এল সেই মেয়েলি কণ্ঠস্বর—“আপনার ডায়াল করা নম্বরটি এই মুহূর্তে বন্ধ রয়েছে।”
ফোনটা বন্ধ! এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই রিদির বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। আর যাই হোক, সৌহার্দ্যের ফোন জীবনেও কখনো বন্ধ থাকে না!

রিদি আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না; তড়িৎ বেগে বিছানা থেকে নেমে গালে-গলায় কোনোমতে ওড়নাটা জড়িয়ে সে রুম থেকে বেরিয়ে পড়ল।
সোজা সারহান চৌধুরীর রুমের দিকে পা বাড়াতেই সামনে পড়ে গেল পৃথা। কাঁচুমুখ করে পৃথা তাকে আটকে ধরে বলল,
“কোথায় যাচ্ছিস এভাবে? আয়, আগে কিছু খেয়ে নিবি!”
চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন কণ্ঠে রিদি জবাব দিল,
“না রে, উনি তো এখনো বাড়ি ফেরেননি! ফোনটাও বন্ধ পাচ্ছি। আব্বুকে বলি, হাসপাতাল থেকে একটু খোঁজ নিতে!”

রিদির কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই পৃথার কলিজাটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে কিছু একটা বলে সামলানোর চেষ্টা করার আগেই পাশ থেকে এগিয়ে এসে রিমা চৌধুরী নরম গলায় বলে উঠলেন,
“ভাবীর শরীর খারাপ করায় ভাইজান উনাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেছেন। তুই আয়, আগে কিছু খেয়ে নে!”
কপাল কুঁচকে রিমা চৌধুরীর দিকে তাকাল রিদি। অতীতে খারাপ ব্যবহার করলেও ইদানীং রিমা চৌধুরী তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন না, তবে পারতপক্ষে কথাও বলেন না।
তাহলে আজ হঠাৎ এভাবে পরম আদরে তাকে জোর করে খেতে ডাকার কারণ কী? রিদির মনে কেমন যেন এক তীব্র সন্দেহ দানা বাঁধল; তার অবচেতন মন বারবার বলছিল—ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটে গেছে!
পৃথার দিকে সরাসরি তাকিয়ে রিদি শক্ত গলায় বলল,
“আমার কাছ থেকে কিচ্ছু লুকাবি না। কী হয়েছে, খুলে বল আমাকে!”
রিমা চৌধুরী অনেক করে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন, কিন্তু রিদির কান যেন আজ পুরোপুরি বন্ধ—সে কারও কোনো কথাই শুনতে নারাজ।
ঠিক তখনই একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সাথী এগিয়ে এসে রিদিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। কাঁপাকাঁপা গলায় সে বলে ফেলল,

“সৌহার্দ্য ভাইয়ের ছোট একটা এক্সিডেন্ট…”
কথাটা কানে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যেন সব শব্দ থমকে গেল। রিদি পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে গেল।
পরের মুহূর্তেই তার বুকফাটা এক আর্তনাদে যেন গোটা চৌধুরী বাড়ির ইট-কাঠ পর্যন্ত কেঁপে উঠল! পাগলের মতো উন্মাদ হয়ে সে সাথীকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে ছুটে যেতে চাইল, কিন্তু রিমা চৌধুরী দ্রুত এগিয়ে এসে রিদিকে শক্ত করে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরল।
আর্তনাদ করে রিদি জানতে চাইল,
“কোথায় যাচ্ছিস মা? ওরা এখানে নেই, সৌহার্দ্যকে নিয়ে ওরা লন্ডন চলে গেছে!”
এই কথা শোনার পর রিদি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না; সে পুরোপুরি উন্মাদ হয়ে গেছে। সে খুব ভালো করেই বুঝে গেছে—সৌহার্দ্যের অবস্থা সামান্য কিছু হলে কেউ ভুলেও তাকে বিদেশে নিয়ে যেত না!
মেয়েটার এমন বুকভাঙা আর্তনাদ দেখে রিমা চৌধুরীর চোখ থেকেও গড়িয়ে পড়ল জল। পাশে দাঁড়িয়ে সাথী আর পৃথাও তখন কান্নায় ভেঙে পড়েছে।
রিমা চৌধুরী কোনোমতে টেনেহিঁচড়ে রিদিকে রুমে নিয়ে এসে বিছানায় বসিয়ে নিজের বুকের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখলেন।
এরপর সাথীর দিকে তাকিয়ে রিমা চৌধুরী বললেন,

“ওর জন্য দ্রুত কিছু নাস্তা নিয়ে আয়।”
সাথী ওঠার আগেই আমেনা খালা ট্রেতে করে নাস্তা নিয়ে হাজির হলো। কিন্তু নাস্তার প্লেটের দিকে এক পলক তাকিয়েই মুখ ফিরিয়ে নিল রিদি।
কান্নায় ভেঙে পড়া গলায় সে ফুঁপিয়ে উঠল,
“যতক্ষণ না আমি নিজের চোখে উনাকে দেখছি, এক ফোঁটা পানিও মুখে তুলব না আমি! আপনারা সবাই বেঈমান… একটা বারও আমাকে উনাকে দেখতে দিলেন না!”
হঠাৎ কী যেন মনে হতেই চমকে গিয়ে রিমা চৌধুরীর দিকে তাকাল রিদি। গলায় আটকে আসা ভাঙা কণ্ঠে সে ফিসফিস করে জানতে চাইল,
“আচ্ছা… ছোট মা, উনি বেঁচে তো আছেন তো? নাকি আপনারা…”
কথাটা শেষ করতে পারল না রিদি।
তার আগেই ধমক দিয়ে পৃথা বলে উঠল,
“কী আজেবাজে বকছিস তুই! পাগল হয়ে গেছিস নাকি?”
আর কোনো কথা না বলে রিদি চোখ বন্ধ করে ফেলল। বিছানার পাশের ডেস্ক থেকে সৌহার্দ্যের বাঁধানো ছবিটা টেনে তুলে সেটিতে এলোপাতাড়ি চুমু খেতে লাগল।
কান্নাভেজা কণ্ঠে বিড়বিড় করে সে বলতে লাগল,
“সত্যি, আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি… বিশ্বাস করুন! ফিরে আসুন না একটু… আমাকে বুকে টেনে নিন! বলুন, ‘স্টুপিড মহিলা, শান্ত হ! এই তো আছি আমি!’—প্লিজ ফিরে আসুন…”
রিদির এমন হৃদয়বিদারক পাগলামি দেখে উপস্থিত কারোরই চোখের জল ধরে রাখা গেল না; প্রত্যেকেই তখন নীরবে কেঁদে ফেলছে।

রিদির এমন হাহাকার আর বুকফাটা আর্তনাদ দেখে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না রিমা চৌধুরী। এতদিন যে মেয়েটিকে তিনি পছন্দ করতেন না, আজ সেই রিদির এই চরম বিপর্যয়ে তার নিজের বুকটাও ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে তিনি রিদির মাথায় পরম স্নেহে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন, আর ভাঙা গলায় সান্ত্বনা দিয়ে বললেন,
“শান্ত হ মা… আল্লাহ মানুষকে বিপদ দিয়ে পরীক্ষা করেন। ধৈর্য ধর, সব ঠিক হয়ে যাবে…”
কিন্তু রিদির কান পর্যন্ত কারোর সেই সান্ত্বনার বাণী পৌঁছাচ্ছে না। সে সৌহার্দ্যের বাঁধানো ছবিটা শক্ত করে বুকে চেপে ধরে হেঁচকি তুলে একটানা কেঁদে চলেছে।
কান্নায় ভেঙে পড়া কণ্ঠে অভিযোগের সুরে সে বিড়বিড় করতে লাগল,
“ওরা সবাই খুব নিষ্ঠুর… শেষবারের মতো আপনাকে ছুঁয়ে দেখার সুযোগটুকুও দিল না!”
কথাটা শেষ করেই সে আবারও ছবিটি বুক থেকে তুলে চোখের সামনে ধরল। ছবির কাঁচের ওপর তখন তার গলে যাওয়া চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে।
ঝাপসা চোখে অপলক তাকিয়ে থেকে অভিমানভরা কণ্ঠে সে বলতে লাগল,

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫৩

“আপনাকে ছাড়া আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। প্রতিটা নিঃশ্বাস যেন বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধছে। আপনিই তো সেদিন বলেছিলেন—যদি কোনোদিন আমি আপনাকে ছেড়ে চলে যাই, তাহলে আমাকে ছাড়া কীভাবে নিঃশ্বাস নিতে হয়, সেটা যেন আমি আপনাকে শিখিয়ে দিয়ে যাই! আজ তাহলে সেই কথাটাই সত্যি করে দেখান না… আমাকেই শিখিয়ে দিন, আপনাকে ছাড়া কীভাবে নিঃশ্বাস নিতে হয়।”
পাগলের মতো দুহাতে ছবিটা বুকে জড়িয়ে ধরে সে ফুঁপিয়ে উঠল,
“বলুন… কীভাবে বাঁচব আমি… আপনাকে ছাড়া?”

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫৫