Home অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫৩

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫৩

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫৩
রিদিতা চৌধুরী

ঘড়ির কাঁটায় তখন সবেমাত্র ছটা পেরিয়ে গেছে। বাইরে দিন শেষের গোধূলি ম্লান হয়ে নামছে সন্ধ্যার স্নিগ্ধ অন্ধকার। ক্যাম্পাসের পেছনের ব্যস্ত সেই পুরোনো ফুচকার স্টলটার সামনে বেশ ভালোই ভিড় জমেছে। ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো আর ফুচকাওয়ালার টিনের বাক্সে মৃদু ছায়ার খেলায় চারপাশটা বেশ চনমনে।
স্টলের এক পাশে দাঁড়িয়ে ফুচকা খাচ্ছে রিদি। তার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে, রিদির কাঁধে হাত জড়িয়ে নিজের কাছে টেনে নিয়ে কারো সাথে ফোনে কথা বলতে ব্যস্ত ছিল সৌহার্দ্য! বিকেলে রিদি বায়না ধরেছিল ফুচকা খাওয়ার—প্রথমে সৌহার্দ্য একটু টালবাহানা করলেও বউয়ের চোখের সেই অভিমানী চাওনির কাছে তাকে হার মানতেই হয়েছে।

রিদি নিজের ফুচকা খাওয়া থামিয়ে একটা ফুচকা বাড়িয়ে দিল সৌহার্দ্যের মুখের দিকে। সৌহার্দ্য একবার রিদির চোখের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকাল, তারপর হঠাৎই ফোনটা কেটে দিয়ে রিদির কানের কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলে উঠল, “আমি অন্য কিছু খাব… লাইক ডার্ক চকলেট, মাই ফেভারিট ডিস!” কথাটি বলেই সরাসরি তাকাল রিদির নরম ঠোঁটের দিকে।
সৌহার্দ্যের এমন খোলামেলা ইশারায় রিদি লজ্জায় লাল হয়ে মিনমিন করে বলে উঠল, “একটা খেয়ে দেখেন, ভালো লাগবে!”
মুহূর্তের মধ্যেই সৌহার্দ্য রিদির থেকে চোখ সরিয়ে মোবাইল স্ক্রিনের দিকে এক নজর তাকিয়ে গমগমে স্বরে জবাব দিল, “নো! তুমি খাও।”
ঠিক তখনই তাদের কথার মাঝপথে এসে হাজির হলো ফারিস আর রিভা। একটু আগেই সৌহার্দ্য রিভাকে এখানে নিয়ে আসতে বলেছিল, কারণ আজ রাতের বাইরে খাওয়া-দাওয়া করবে আর কিছু সময় একসঙ্গে কাটাবে বলে। এমনিতে সৌহার্দ্য ও ফারিস দুজনেই কাজের ব্যস্ততায় সময় পায় না, তবে আজ সৌহার্দ্য কলেজ থেকে ফিরে কোথাও যায়নি—পুরো সময়টা কেবল রিদিকেই দিতে চেয়েছে।
রিভা এসেই একছুটে রিদিকে জড়িয়ে ধরে গালে চুমু খেয়ে বলে উঠল, “মিস ইউ ভাবি!”
রিদিও রিভাকে একহাতে জড়িয়ে ধরে মিষ্টি হেসে বলল, “মিস ইউ টু!”

সৌহার্দ্যের সামনে রিভার এভাবে রিদিকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাওয়ার দৃশ্যটা দেখেই তার চোখের পলক কুঁচকে গেল। রক্তিম এক বিরক্তি খেলে গেল তার চোখে। বোন বলে শত হলেও কিছু বলতে পারছে না, কিন্তু তার বউয়ের ওপর এই সামান্য খুনসুটির অধিকারটুকুও অন্য কারো—তা সে বোনই হোক—প্রাপ্য নয়, এমন একটা অদ্ভুত পজেসিভ রাগ তার সারা শরীরে বয়ে গেল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ফারিসও নিজের বউয়ের এই গদগদ ভাব দেখে ভেতরে ভেতরে বিরক্ত, তবে সে ভালো করেই জানে—এই মুহূর্তে বউকে কিছু বলা মানে নিজের জীবনে এক অপ্রত্যাশিত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ডেকে আনা!
সৌহার্দ্যের মুখচোখের সেই অসহ্য অবস্থা দেখে ফারিস তাকে আরও একটু রাগিয়ে দেওয়ার সুযোগ ছাড়ল না। বাঁকা হেসে বলে উঠল, “তোর বোন ওই ঠোঁটে আমাকে চুমু খাই এখন আবার তোর বউকে…”
ফারিসের কথা শেষ হওয়ার আর সুযোগ হলো না। তার আগেই সৌহার্দ্য পেছন থেকে এক মোক্ষম লাথি বসিয়ে দিয়ে কটমটে গলায় বলে উঠল, “দ্বিতীয়বার কোনো বাজে কথা মুখ থেকে বের করলে, বউয়ের চুমু খাওয়ার সৌভাগ্য নিয়ে আর দুনিয়াতে থাকতে পারবি না, ইডিয়ট!”
রিভা ও রিদির ফুচকা খাওয়া শেষ হতেই সৌহার্দ্য যেন আর এক মুহূর্তও দেরি করতে চাইল না—গাড়িতে ওঠার জন্য ব্যস্ত হয়ে তাড়া দিল ওদের। ফারিসও নিজের গাড়িটা ড্রাইভারের হাতে দিয়ে পাঠিয়ে দিল সৌহার্দ্যের সাথেই যাওয়ার জন্য। রিদি আর রিভা নীরবে এসে বসল পেছনের সিটে, আর ফারিস বসল সৌহার্দ্যের পাশে সামনের সিটে।

গাড়ি স্টার্ট করে ড্রাইভ করার ফাঁকে সৌহার্দ্যের চোখ বারবার চলে যাচ্ছিল রিয়ার-ভিউ মিররের দিকে—গোপনে রিদিকে দেখার এক তীব্র আকুলতা। ফারিস তীক্ষ্ণ চোখে সব লক্ষ্য করছিল। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে কৌতুকপূর্ণ হাসি খেলে গেল। আর সহ্য করতে না পেরে সে একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলে উঠল, “ভাই, এক কাজ কর—তোর বউকে দেখতে দেখতে গাড়িটা উড়িয়ে দে না! আমরা যমের দুয়ার থেকে ঘুরে আসি?”
ফারিসের কথায় ভ্রূক্ষেপ না করে সৌহার্দ্য উল্টো মেজাজ দেখিয়ে সামনের দিকে তাকাল। তার মুখে তখন লজ্জার লেশমাত্র নেই, বরং ধরা পড়ে যাওয়ার এক অদ্ভুত বিরক্তি আর বেপরোয়া ভাব স্পষ্ট ফুটে উঠল। সে তেড়েফুঁড়ে বলে উঠল, “ইডিয়ট! আমি তো জাস্ট ওরা ঠিকমতো বসল কি না, সেটাই চেক করছিলাম!”
সৌহার্দ্যের এই অতিরিক্ত সাফাই গাওয়া দেখে ফারিস নাক কুঁচকে মৃদুস্বরে বিড়বিড় করে উঠল— “ঠাকুর ঘরে কে রে? আমি কলা খাইনি।”
প্রায় আধ ঘণ্টা পথ পাড়ি দিয়ে সৌহার্দ্যের গাড়িটা এসে থামল রমনা পার্কের ঠিক সামনে। সৌহার্দ্যের ইচ্ছে ছিল কোনো রেস্টুরেন্টে বসে সময় কাটানোর, কিন্তু রিদির জোরাজুরিতে শেষ পর্যন্ত এই সবুজ চত্বরেই আসতে হলো। গাড়িটা পার্ক করে সৌহার্দ্য সবেমাত্র নেমে দাঁড়িয়েছে, অমনি রিভা আর রিদি একরকম উৎসাহ নিয়েই পার্কের গেট দিয়ে ভেতরে ঢোকার জন্য পা বাড়াল। ঠিক তখনই পিছন থেকে রিদির হিজাবে আলতো করে টান দিল সৌহার্দ্য।

পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা ফারিসকে ইশারা করে রিভাকে একটু দূরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিল সে। ফারিস যেন মনে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল! নইলে তার এই আধপাগল বউটা নিজের স্বামীর চেয়ে রিদির সঙ্গেই যেন সারাক্ষণ আঠার মতো লেগে থাকে। ফারিস রিভার ঘাড় ধরে একটু ঝাঁকুনি দিয়ে আদুরে ধমকের সুরে বলল, “খরগোশের বাচ্চা, চল। নিজের জামাই পেলে ভাবি ভাবি করছিস কেন?”
বিরক্তিতে চোখমুখ কুঁচকে রিভা তেতে উঠে বলল, “ছাড়ুন আমাকে ফারিস ভাই! কতদিন পর ভাবির সাথে দেখা হলো, আমার কথা আছে ভাবির সাথে!”
ফারিস চোখ বড় বড় করে রাগ দেখানোর ভান করে বলল, “চুপ, শ্বশুরের বেয়াদব মেয়ে! কত কষ্টে নিজের কাজ ফেলে পার্কে এসেছি, বউয়ের সাথে একটু প্রেম করবো বলে। ভাবির সাথে কি, হ্যাঁ? ওরা ও প্রেম করুক, আমরা ও প্রেম করবো—চল! এই ঝোপ-ঝাপে উঁকি-ঝুঁকি মেরে প্রেম করার মজাই আলাদা!”
আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে রাগী অথচ শাসন দৃষ্টিতে রিভাকে প্রায় টেনেহিঁচড়েই পার্কের গভীর সবুজের দিকে নিয়ে গেল ফারিস।
ফারিস আর রিভা চোখের আড়াল হতেই সৌহার্দ্য রিদির হিজাবটা টেনে আলতো করে নিজের বুকের খুব কাছে এনে দাঁড় করাল। তারপর রিদির কানের কাছে মুখটা নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “কোথায় যাওয়া হচ্ছিল আমাকে একা রেখে, হুম? ম্যাডাম দেখি কাউকে পেলেই আমাকে একদম ভুলেই যান—দিস ইজ নট ফেয়ার!” বলেই রিদির সংবেদনশীল কানের লতিতে উষ্ণ একটা ফুঁ দিল সে।
সৌহার্দ্যের গরম নিশ্বাসের ছোঁয়া লাগতেই রিদি কেঁপে উঠে আমতা আমতা করে বলে উঠল, “অনেক দিন পর ওর…”

কথাটা শেষ করতে দিল না সৌহার্দ্য। নিজের তর্জনীটা রিদির নরম ঠোঁটের ওপর ছুঁইয়ে তাকে থামিয়ে দিল, এরপর রিদির ছোট হাতটা নিজের শক্ত হাতের ভাঁজে জড়িয়ে নিয়ে পার্কের ভেতর হাঁটতে শুরু করল। খানিক বাদেই একটা নিরিবিলি ছায়াঘেরা জায়গায় এসে ঘাসের ওপর বসল দুজনে। সৌহার্দ্য আলগোছে মাথাটা এলিয়ে দিল রিদির কোলের ওপর।
রিদি পরম যত্ন আর ভালোবাসায় নিজের হাতটা সৌহার্দ্যের নরম চুলের ভাঁজে বিলিয়ে দিয়ে আলতো সুরে ডাকল, “ডাক্তার সাহেব?”
চোখ দুটো বুজে আরাম নিয়ে সৌহার্দ্য শুধু ফিসফিস করে বলল, “হুম…”
রিদি একটু থমকে, সৌহার্দ্যের মুখের পানে তাকিয়ে অনিশ্চিত কণ্ঠে বলল, “আচ্ছা, আমি যদি কখনো হারিয়ে যাই… বা…”
পুরো কথাটা শেষ করার সুযোগও দিল না সৌহার্দ্য। একরাশ কৃত্রিম বিরক্তি নিয়ে এক ঝটকায় সোজা হয়ে তেতে উঠে বলল, “আরেকটা বিয়ে করব!”

রিদির বুকটা ব্যথায় মুচড়ে উঠল। রাগে আর অভিমানে চোখ দিয়ে জল আসার জোগাড়! ফুঁপিয়ে উঠে সে বলে বসল, “আপনার একটুও মায়া নেই! আপনি পারবেন আমার জায়গায় অন্য কাউকে বউ বলে মানতে?”
সৌহার্দ্য চরম একরোখা ভঙ্গিতে নির্বিকার উত্তর দিল, “কেন, না পারার কী আছে?”
রাগে ফুঁসে রিদি সৌহার্দ্যকে নিজের কোল থেকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে দিতে তেজী গলায় বলে উঠল, “সরুন বলছি, গন্ডার একটা! আমার থেকে দূরে সরুন, একটুও ভালোবাসেন না আপনি আমায়! আর আপনার এত ফুর্তি করারও দরকার নেই; আমি মরে গেলেও ভূত হয়ে আপনার আশপাশেই ঘুরে বেড়াব! কোনো পেতনিকে আপনার ধারেকাছে ঘেঁষতে দেব না, বলে দিলাম!”
রিদির এই অভিমানী রাগ দেখে সৌহার্দ্যের মুখে চওড়া একটা হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে এক টানে রিদির ছোট হাতটা টেনে সোজা নিজের বুকের ওপর চেপে ধরে একদম গম্ভীর গলায় বলল, “ওকে, ভূতনিকেই নিয়ে সংসার করব! শুধু রোমান্সের সময়ে একটু মানুষ হয়ে কাছে চলে আসলে হবে!”
কথাটা শুনে রিদি রাগে লাল হয়ে সৌহার্দ্যের প্রশস্ত বুকে একটা কিল বসিয়ে দিয়ে ফোঁস করে বলে উঠল, “সারাক্ষণ মুখে শুধু মুখে অমন বাজে কথা!”

রিভা একমনে বসে বসে ঝালমুড়ি খাচ্ছে আর ফারিস বিরক্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। পার্কে আসার মূল উদ্দেশ্য ছিল একটু রোমান্স করা—হাত ধরে পাশাপাশি হাঁটা, দুজনে মিলে কিছু মিষ্টি কথা বলা, আর বউটা তার কাঁধে মাথা রেখে ভালোবাসার গল্প শুনবে। অথচ এই মেয়ে পার্কে ঢোকার পর থেকেই থামার নাম নেই; একের পর এক শুধু খেয়েই চলেছে! দেখে মনে হচ্ছে জন্মের বিদেশি কোনো উপবাস ভেঙেছে সে।
অবশেষে আর সহ্য করতে না পেরে বিরক্তিতে ফেটে পড়ে ফারিস বলল, “আর কত খাবি বল তো? পেট ফাটবে তো!”
কথাটা শুনে রিভা ভুরু কুঁচকে তেতে উঠে জবাব দিল, “খাওয়ার খোটা দিচ্ছেন কেন, কিপটা এমপি? আমি কি এমন আর খেয়েছি? এই তো মাত্র…”
তার কথা মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে ফারিস কটমট করে তাকিয়ে বলল, “না, কিচ্ছু খাসনি তুই! এক কাজ কর, এবার আমাকেই চিবিয়ে খেয়ে আমার ভার্জিনিটিটা একেবারে নষ্ট করে দে!”
রিভা নাক-মুখ কুঁচকে বোকামির একাকার করে বলল, “আপনাকে কেন খেতে যাব, ঢং!”
ফারিস রিভার এই চটজলদি উত্তরের বিপরীতে পাল্টা কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই তার পকেটে থাকা ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল সৌহার্দ্য ফোন করেছে—ওদের এখনই পার্ক থেকে বের হতে হবে।
সব মিলিয়ে ফারিসের মেজাজ তখন চরমে। আর এক মুহূর্তও দেরি না করে সে এক টানে রিভাকে কোলে তুলে নিল, এরপর দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলল, “চল তো, বেয়াদব মেয়ে! আজ বাড়ি চল, তোকে চেপে মারব আমি!”

রাত তখন প্রায় এগারোটা। ঘড়ির কাঁটা পেরিয়ে গেছে রাত জাগার প্রহর। রিদি বসে বসে গল্প করছিল রিভা আর পৃথার সাথে। মাত্র ঘণ্টা খানেক আগেই ওরা বাড়ি ফিরেছে। ফারিস চেয়েছিল রিভাকে নিজের সাথে নিয়ে যেতে, কিন্তু রিভা চৌধুরী বাড়ি আসার তীব্র জিদ ধরায় ফারিস আর না করতে পারেনি। গল্প করতে একসময় রিভা ঘুমিয়ে পড়েছে গাঢ় ঘুমে, পৃথার চোখেও নেমে এসেছে ক্লান্তির আবেশ। আজ আরবানের নাইট ডিউটি থাকায়, রিভার এই উপস্থিতিতে পৃথা আজ রাতেই রিভার সাথে থাকছে।
পৃথার চোখে ঘুমের রেশ দেখে রিদি নিজের রুমের উদ্দেশ্যে পা বাড়াল। কিন্তু রুমে পা রাখতেই চোখের পলকে তড়িৎ বেগে বলিষ্ঠ দুটি হাত তাকে চেপে ধরল দেয়ালের সাথে। ভয়ে বুক কেঁপে উঠল রিদির। ঢোক গিলে থরথর কাঁপা গলায় সৌহার্দ্যের দিকে তাকিয়ে সে ফিসফিস করে বলে উঠল, “ভয় পে…”

বাকি কথাটুকু আর গলা থেকে বের হলো না। তার আগেই নিজের ডার্ক ব্রাউন ওষ্ঠ যুগল এনে রিদির কোমল ঠোঁটের ওপর বসিয়ে দিল সৌহার্দ্য। উন্মাদের মতো চুষে নিতে লাগল মেয়েটার ঠোঁটের নরম আভা। রিদির নিশ্বাস যেন আটকে আসার উপক্রম হলো। আপ্রাণ চেষ্টা করল শক্ত-পোক্ত সেই পুরুষের বুক থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে দিতে, কিন্তু তার সমস্ত প্রতিরোধ নিমেষেই ব্যর্থ হয়ে গেল। দম ফুরিয়ে আসছে রিদির, বুক ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে আর্তনাদ, তবুও সৌহার্দ্যের থামার কোনো নাম নেই! মনে হচ্ছিল, নিজের মনের সমস্ত জমে থাকা ক্ষোভ আর তীব্র ভালোবাসা সে যেন উগরে দিচ্ছে রিদির নরম ঠোঁটের ভাঁজে ভাঁজে।
দীর্ঘক্ষণ নিজের তৃষ্ণা মিটিয়ে, হৃদস্পন্দন স্তিমিত হওয়ার উপক্রম হলে তবেই রিদিকে মুক্তি দিল সৌহার্দ্য। তার বন্দী বাহু থেকে ছাড়া পেয়েই হাঁপাতে হাঁপাতে রিদি বলে উঠল, চোখে জল আর রাগের মিশ্রণে, “আরেকটু হলে তো দম আটকে মেরে ফেলতেন! কী করছেন এসব? আস্ত একটা রাক্ষস কোথাকার!”
সৌহার্দ্য নিজের হাতের উলটো পিঠ দিয়ে ঠোঁটটা মুছে নিল। চোখের সেই জমাট বাঁধা দৃষ্টিতে তখন এক অদ্ভুত অধিকারবোধ। গম্ভীর অথচ ভারী কণ্ঠে সে বলে উঠল, “আজ পার্কে যে কথাটা তুমি উচ্চারণ করেছিলে… বিশ্বাস করো, সেটা যদি দ্বিতীয়বার তোমার মুখ থেকে বের হয়, তবে এর পরিণাম এর চেয়েও অনেক বেশি ভয়ংকর হবে। কথাটা যেন মনে থাকে!”

বলেই এক টানে রিদিকে নিজের বক্ষে টেনে নিল সে। বুকের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল, “আমাকে ছেড়ে যেতে চাইলে হয় আমাকে মেরে যেও, নয়তো তোমাকে ছাড়া নিঃশ্বাস নিতে শিখিয়ে দিয়ে যেও! আমাকে ভালোবাসতে বাধ্য করে মাঝপথে ছেড়ে চলে যাবে—সেটা কোনো দিনও হতে দেবো না!”
সৌহার্দ্যের কথার ধরনে রিদির বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে, সে নিজের দুই হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল সৌহার্দ্যকে। নরম গলায় সে বলে উঠল, “আপনাকে ছেড়ে আমি কোথাও যাবো না। তার চেয়ে বরং… আপনাকে ছেড়ে যাওয়ার আগেই যেন আমার মৃত্যু হয়!”
মেয়েটার মুখ থেকে অমন কথা শুনতেই সৌহার্দ্যের ভ্রু কুঁচকে গেল। রিদিকে একটু দূরে সরিয়ে, তার থুতনিতে নিজের আঙুল ছোঁয়াতেই রিদির ঠোঁট কেঁপে উঠল। ধমকের সুরে সে ফিসফিস করে বলে উঠল, “এই বাজে শব্দটা মুখেও আনবে না আর কখনো!”

এরপর আর একটুও সময় নষ্ট না করে রিদিকে আলতো করে পাঁজা কোলে তুলে নিল সৌহার্দ্য। সোজা বিছানায় শুইয়ে দিয়ে নিজে গিয়ে বসল ল্যাপটপটা সামনে নিয়ে।
বিছানায় শুয়ে শুয়ে রিদি অপলক চেয়ে রইল সৌহার্দ্যের দিকে। নরম সুরে ডেকে উঠল, “ঘুমাবেন না?”
কিবোর্ডে টাইপিং করতে করতেই সৌহার্দ্য উত্তর দিল, “তুমি ঘুমাও, আমার কিছু জরুরি কাজ আছে…”
কিন্তু পুরো বাক্যটা শেষ করতে দিল কোথায় রিদি? বিদ্যুৎ গতিতে বিছানা থেকে উঠে একটা ভীরু খরগোশ ছানার মতো সৌহার্দ্যের টি-শার্টের ভেতর মাথাটা গলিয়ে দিল সে। দুই হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তার সেই চওড়া বুকটা, গভীর সুখে মুখ গুঁজে দিয়ে শক্ত করে বুজে ফেলল ক্লান্ত চোখ দুটো।
রিদির এমন আদুরে আবদারে থমকে গেল সৌহার্দ্যের ব্যস্ত আঙুলগুলো। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মৃদু হাসি ফুটিয়ে, এক হাতে আলতো করে রিদিকে নিজের আরও গভীরে আগলে নিল সে, আর অন্য হাতটা আবারও ব্যস্ত হয়ে পড়ল ল্যাপটপে।

সকাল প্রায় আটটা। রিদি আজ বেশ সকালেই ঘুম থেকে জেগে উঠেছে—কারণ সৌহার্দ্যও আজ খুব ভোরেই হাসপাতালে চলে গেছে।
রান্নাঘরে আমেনা খালার সাথে তখন সকালের নাস্তা তৈরিতে ব্যস্ত রিদি, আর তাকে টুকিটাকি সাহায্য করছে রিভা। কাজের প্রায় শেষ পর্যায়ে রান্নাঘরে এসে হাজির হলো পৃথা। পৃথার ফ্যাকাশে মুখানা দেখেই রিদির বুকটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। একটু উদ্বিগ্ন স্বরে সে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী রে, তোর মুখের এমন অবস্থা কেন? রাতে কিচ্ছু ঘুমাসনি নাকি?”
ক্লান্ত ও অবসন্ন চোখে রিদির দিকে তাকিয়ে পৃথা ম্লান হাসার চেষ্টা করল, “না রে রিদি, শরীরটা একদমই ভালো লাগছে না। কাল থেকে যা খাচ্ছি, সব যেন পেটে দানা বাঁধছে না, বমি হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।”
বন্ধুর এমন কষ্ট দেখে রিদির মায়ায় বুকটা ভারাক্রান্ত হয়ে এল। সে স্নেহের সুরে বলল, “তাহলে তুই আর দাঁড়িয়ে থাকিস না, যা গিয়ে ডাইনিংয়ে বস। আমি তোকে ঝাল-ঝাল কিছু একটা বানিয়ে দিচ্ছি, মুখে একটু রুচি ফিরবে। আর আজ তোকে কলেজে যেতে হবে না, বুঝলি?”

পৃথা দুর্বল হাতে কেবল না-সূচক মাথা নাড়ল। একটা দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে রিদি সান্ত্বনার সুরে বলল, “ঠিক আছে, তুই যা… আমি তোর নাস্তাটা নিয়ে আসছি।”
এরপর সবার নাস্তা টেবিলে গুছিয়ে দিয়ে, পৃথার জন্য আলাদা করে যত্ন নিয়ে নাস্তা তৈরি করে দিল রিদি। তারপর নিজে দ্রুত কিছু মুখে গুঁজে নিয়েই সে কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা দিল!
সকাল প্রায় এগারোটা বাজে। চেম্বারের নিস্তব্ধতায় চোখ বন্ধ করে ক্লান্ত হয়ে বসে আছে সৌহার্দ্য; মাত্রই একটা জরুরি অপারেশন শেষ করে ফিরেছে সে। হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার কোনো তোয়াক্কা না করেই কেউ একজন চেম্বারে প্রবেশ করল। বিরক্তিতে চোখ মেলে ভ্রু কুঁচকে তাকাল সৌহার্দ্য—সামনে দাঁড়িয়ে আছে তনিমা। মেয়েটির পোশাক-আশাকের কোনো শালীনতা নেই, পুরো অবয়বটাই যেন কেমন উশৃঙ্খল!
তনিমার দিকে এক পলক তাকিয়েই দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিল সৌহার্দ্য। এই মেয়ের চালচলন ও চলাফেরা তাঁর কাছে বরাবরই বিরক্তিকর ঠেকেছে।
সরাসরি সৌহার্দ্যের দিকে তাকিয়ে তনিমা কিছুটা আদুরে গলায় বলল, “স্যার, আপনার সাথে আমার একটা জরুরি কথা ছিল…”

ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই ঠান্ডা ও কর্কশ গলায় সৌহার্দ্য বলে উঠল, “আমার বিনা অনুমতিতে আমার চেম্বারে প্রবেশ করার সাহস কোথায় পেলে? গেট আউট ফ্রম মাই চেম্বার!”
সৌহার্দ্যের কথায় বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে তনিমা উল্টো তাঁর আরও একটু কাছে এগিয়ে এসে ফিউজ করা গলায় বলল, “প্লিজ স্যার, আমার কথাটা একটু শুন…”
আর সহ্য হলো না সৌহার্দ্যের। ঝটপট চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে, তনিমার দিকে না তাকিয়েই গর্জে উঠল, “আই সেইড গেট আউট! আর একবার কথাটি বলতে হলে ফল তোমার জন্য ভালো হবে না!”
সৌহার্দ্যের এমন তীব্র ও তীক্ষ্ণ ধমকে থরথর করে কেঁপে উঠল মেয়েটি। ভয়ে এক পা পিছিয়ে কোনোমতে দরজা খুলে বেরিয়ে যেতেই করিডোরে তার মুখোমুখি হলো রিদি।
মুখ কুঁচকে তনিমার আপাদমস্তক তাকিয়ে রিদি রাগে বিড়বিড় করে উঠল, “তুই ওনার চেম্বারে কী করছিলি? এখানে কেন এসেছিস?”

রিদির এমন ঝটকা প্রশ্নে বিন্দুমাত্র দমে না গিয়ে তনিমা মুখে একচিলতে মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে গদগদ সুরে জবাব দিল, “স্যারই তো ডেকেছিলেন, একটা পার্সোনাল কথা বলতে!”
তনিমার এমন নির্লজ্জ মিথ্যাচারে রিদির চোখের কোণে আগুন জ্বলে উঠল। বাঁকা হেসে ঘৃণাভরে সে বলল, “তোর এই ভাওতাবাজি অন্য কোথাও গিয়ে করিস! যে মানুষ নিজের বউয়ের সাথে পর্যন্ত পার্সোনাল কথা বলার সময় পায় না, সে তোর মতো একটা মেয়ের সাথে কী পার্সোনাল কথা বলবে—সেটা আমার খুব ভালো করেই জানা আছে!”
তনিমা বুঝতে পারল, রিদির সামনে এই মিথ্যে ভান বেশিদূর টিকবে না। তাই আর লুকোচুরি না করে সে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলল, “হ্যাঁ, আমি স্যারকে ভালোবাসি! সেটাই জানাতে এসেছিলাম, এখন তুই কী করবি শুনি?”
রিদির রাগে তখন পুরো শরীর জ্বলে যাচ্ছে। পাল্টা কিছু একটা বলতে গিয়েও সে নিজেকে সামলে নিল। চটজলদি পকেট থেকে নিজের মোবাইলটা বের করে সায়েমকে একটা সংক্ষিপ্ত মেসেজ পাঠিয়ে দিল সে। এরপর তনিমার দিকে তাকিয়ে মুখে এক চমৎকার মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে ব্যঙ্গের সুরে বলল, “আচ্ছা রে, তুই যে ওনাকে ভালোবাসিস—তার প্রমাণ কী?”

তনিমা বিরক্ত মুখে জবাব দিল, “তোকে আমি কেন প্রমাণ দিতে যাবো?”
রিদির এবার আর হাসি ধরে রাখা গেল না। সে আরও ব্যঙ্গাত্মক সুরে বলল, “আরে তোকে প্রমাণ দিতেই হবে না! চল, দুজনে মিলে একটু ঘুরে আসি। হবু সতিন বলে কথা!”
কথা শেষ হতে না হতেই রিদি এক টানে তনিমার হাত ধরে হাসপাতালের মর্গের অন্ধকার করিডোরের দিকে হাঁটতে শুরু করল। মর্গের ভারী দরজাটার সামনে গিয়ে পৌঁছাতেই তনিমা আতঙ্কিত হয়ে রিদির হাত ছাড়িয়ে দিয়ে পিছিয়ে গেল। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সে চিৎকার করে উঠল, “এখানে কেন এনেছিস আমাকে?”
রিদি একদম শান্ত গলায়, চোখে মুখে অদ্ভুত এক রূপালী হাসি নিয়ে বলল, “কী আর করব, এই লাশগুলোর সাথে একটু হাডুডু খেলব! তুই দেখবি চল!”
তনিমা রাগে ও ভয়ে ফেটে পড়ে বলল, “তুই আমাকে আস্ত একটা বলদ পেয়েছিস নাকি? ছাড় আমাকে বলছি!”
ঠিক সেই মুহূর্তে করিডোরের ছায়া থেকে বেরিয়ে এল সায়েম আর সুমি। সায়েম মুচকি হেসে বলল, “ছাড়াছাড়ি আর হবে না রে বেবি!”

এরপর আর এক মুহূর্তও দেরি না করে তিনজন মিলে জোর করে ধস্তাধস্তি করে, ভয়ে আড়ষ্ট তনিমাকে একরকম ধাক্কা দিয়েই মর্গের ভেতরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে ভারী দরজাটা আটকে দিল। এর আগেই সায়েম মর্গের দারোয়ানকে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে ভনিতা করে বাইরে নাস্তা খেতে পাঠিয়ে দিয়েছিল, তাই আশেপাশের চত্বরটা একদম ফাঁকা।
তনিমাকে মর্গে আটকে দেওয়ার পর রিদি সায়েম ও সুমিকে বলল, “তোরা ক্লাসে যা, আমি একটু পরেই আসছি।”
আসলে, ঠিক কিছুক্ষণ আগেই কলেজের সেকেন্ড পিরিয়ডের ক্লাস শেষ হয়েছিল। সকালে ঘর থেকে বের হওয়ার পর সৌহার্দ্যের সাথে রিদির আর কোনো দেখাই হয়নি। তাই হাসপাতাল চত্বরে আসার মূল উদ্দেশ্যই ছিল সৌহার্দ্যের সাথে একটু দেখা করে যাওয়া। কিন্তু চেম্বারের সামনে এসে তনিমাকে সৌহার্দ্যের চেম্বার থেকে বের হতে দেখে, রিদির মাথার সব ঠিকঠাক জ্ঞান গুলিয়ে গিয়েছিল, আর পরিণতি হলো এই!
সুমি আর সায়েমকে ক্লাসে পাঠিয়ে রিদি সরাসরি এসে হাজির হলো সৌহার্দ্যের চেম্বারে। তখন টেবিলে ঝুঁকে কিছু রোগীর ফাইল দেখছিল সৌহার্দ্য। হঠাৎ কেমন একটা শব্দের মতো কানে আসতেই সে চোখ তুলে তাকাল। সামনে রিদি দাঁড়িয়ে—চোখ দুটো রাগে জ্বলছে, যেন ঠিক ফোসফোস করছে ছোট্ট একটা নাগিন!
কপালে গভীর ভাঁজ ফেলে সৌহার্দ্য শীতল গলায় বলল, “হোয়াট?”

রিদি তেজ দেখিয়ে ঝাঁজালো গলায় বলল, “ওই মেয়ে এখানে কেন এসেছিল?”
তনিমার কথা ততক্ষণে সৌহার্দ্যের মাথা থেকে পুরোপুরি মুছে গেছে। তাই সে বিন্দুমাত্র বুঝতে পারল না রিদি ঠিক কোন মেয়ের কথা বলছে। কিছুটা বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন করল, “কোন মেয়ে?”
রিদির রাগ যেন এক পলকে বহুগুণ বেড়ে গেল। ফুঁসে উঠে সে এগিয়ে গেল সৌহার্দ্যের একদম কাছে, খপ করে চেপে ধরল তার শার্টের কলার। রাগের চোটে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “একদম নাটক করবেন না, আমি—”
রিদির কথা শেষ হতে দিল না সৌহার্দ্য। ঝটপট রিদির হাত নিজের কলার থেকে আলগা করে এক টানে তার কোমর জড়িয়ে বসিয়ে দিল টেবিলের ওপর। এরপর রিদির মুখটা নিজের দুই হাতের আজলায় আলতো করে ধরে খুব নরম স্বরে বলল, “এমন করছ কেন? আমি তো বুঝ—”

কথাটা মাঝপথেই থেমে গেল। ঠিক ওই মুহূর্তে সৌহার্দ্যের মাথায় এল তালুকদারের মেয়ের প্রসঙ্গটা! তখনই তার বুঝতে বাকি রইল না—তার অভিমানী বউটা ঠিক কোন কারণে এত ফায়ার হয়ে আছে।
সৌহার্দ্য রিদির ঘাড়ে নিজের মুখ গুঁজে দিয়ে কিছু বলবে, তার আগেই রিদি দুই হাতে শক্ত করে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল তাকে। আগের সেই তেজ বজায় রেখে সে খিন্ন গলায় বলে উঠল, “সরেন আমার থেকে! আগে বলুন ওই—”
পুরো বাক্যটা আর শেষ করতে পারল না রিদি। সৌহার্দ্য আবার তাকে নিজের কাছাকাছি টেনে নিতে চাইল, কণ্ঠে সেই একই মাদকতা আর নরম সুর, “আই ডোন্ট নো, আমি জানতেও চাইনি!”
কিন্তু রিদি সহজে দমবার পাত্রী নয়। সৌহার্দ্যকে ফের দূরে ঠেলে দিয়ে একই রকম তেজে সে বলে উঠল, “আপনার অনুমতি ছাড়া ও আ—”

এবার আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারল না সৌহার্দ্য। রাগে ফেটে পড়ে দাঁতে দাঁত চেপে সে ধমকে উঠল, “সমস্যা কী তোমার? এক কথা বারবার বল কেন? একবার বললাম জানি না মানে জানি না!”
সৌহার্দ্যের এমন হুট করে রেগে যাওয়াটা রিদি সহ্য করতে পারল না। চোখের কোণে জমল অভিমানের জল। মুখটা গোমড়া করে সে যখন চেম্বার থেকে বেরিয়ে যেতে নিল, তখনই সৌহার্দ্য বিদ্যুৎ গতিতে তার হাত টেনে সোজা বসিয়ে নিল নিজের কোলে। তারপর দুই গালে আলতো করে দুটো চুমু এঁকে ফিসফিস করে বলল, “ছোট্ট এই শরীরে এত রাগ একটুও মানায় না, ম্যাডাম!”
কথাটা বলেই নিজের হাতের ঘড়িটার দিকে এক নজর তাকাল সৌহার্দ্য। তারপর জিজ্ঞেস করল, “ক্লাস নেই তোমার?”
রিদি নির্বাক হয়ে কেবল মাথা নাড়ল। সৌহার্দ্য পরম যত্নে রিদির ছন্নছাড়া হিজাবটা ঠিক করে দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “চুপচাপ ক্লাসে যাও, লক্ষ্মীটি আমার! আজেবাজে চিন্তা করে ফালতু প্যানিক করার কোনো দরকার নেই।”

রিদি আর কথা বাড়াল না। অভিমানী পায়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল ক্লাসের উদ্দেশ্যে। সৌহার্দ্য দরজাটার দিকে কিছুক্ষণ অপলক তাকিয়ে রইল, তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার মন দিল নিজের ফাইলগুলোর মধ্যে।
ঠিক দুপুর তখন প্রায় দুটো। রাউন্ড শেষ করে ক্লান্ত পায়ে সৌহার্দ্য সবেমাত্র নিজের চেম্বারের দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই তাঁর ফোনটা বেজে উঠল। হাসপাতালের অথরিটি থেকে জরুরি ফোন।
ভ্রু কুঁচকে ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে বেশ উদ্বেগের সাথে কিছু একটা জানানো হলো। আর তা শুনে সৌহার্দ্যের গলাটা এক নিমেষে শক্ত হয়ে গেল। গমগমে গম্ভীর স্বরে সে শুধু বলল—
— “আই’ম কামিং ইন ফাইভ মিনিটস।”
বলেই এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে ফোনটা কেটে দিল। আর চেম্বারের দিকে না গিয়ে সোজা পা বাড়াল হাসপাতাল অথরিটির রুমটার দিকে।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ল এক অদ্ভুত দৃশ্য। রিদি, সায়েম আর সুমি মাথা নিচু করে একেবারে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক সামনেই বসে আছেন তালুকদার সাহেব, আর তাঁর পাশে ফ্যাকাশে মুখে দাঁড়িয়ে আছে তাঁর মেয়ে তনিমা।
সৌহার্দ্য রুমে ঢুকেই এক পলক রিদির দিকে তাকাল। তারপর গম্ভীর মুখে টেনে বসল একটা চেয়ার। চোখ দুটো তীক্ষ্ণ করে ডিরেক্টরকে উদ্দেশ করে বলল,

— “কী সমস্যা? ওরা এখানে কেন?”
ডিরেক্টর সাহেব কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে সৌহার্দ্যের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “স্যার, আপনার ওয়াইফ আর তাঁর বন্ধুরা মিলে তালুকদার স্যারের মেয়েকে মর্গে আটকে দিয়েছিল! মেয়েটা অনেক প্যানিক করেছে, খুব ভয় পেয়েছে।”
সৌহার্দ্য একবার তালুকদার সাহেবের দিকে তাকাল, তারপর আবার চোখ ফেরাল নিজের স্ত্রীর দিকে। রিদি তখন ভয়ে একদম কুঁকড়ে গেছে। সৌহার্দ্য কিছুটা বিরক্তি মেশানো গলায় বলল,
— “মর্গে কেন আটকেছে? ওটাকে তো পোস্টমর্টেমের জন্য পাঠানো উচিত ছিল! স্টুপিড মহিলার বুদ্ধি হবে না কখনো!”
সৌহার্দ্যের মুখ থেকে এমন একটা কথা বেরোতেই পুরো রুমে পিনপতন নীরবতা নেমে এল। সবাই যেন থমকে গেল! সায়েম তো তার মুখের হাসি আর কিছুতেই ধরে রাখতে পারল না, হো হো করে উচ্চস্বরে হেসে ফেলল। কিন্তু পর মুহূর্তেই ডিরেক্টরের গম্ভীর চোখের দিকে নজর পড়তেই বেচারা এক ধাক্কায় একেবারে চুপসে গেল!
সৌহার্দ্যের এই বেপরোয়া কথাটা অবশ্য তালুকদার সাহেবের খুব একটা ভালো লাগল না। এই ছেলেটিকে তিনি নিজের সন্তানের মতোই স্নেহ করেন; এক সময় তো মনে মনে প্রবল আশাও ছিল তাকে নিজের মেয়ের জামাই বানোর। যদিও সৌহার্দ্যের বিয়ের খবর শোনার পর সেই আশা আর মনে রাখেননি, তবুও ভালোবাসার কমতি ছিল না। একটু অসন্তুষ্ট গলায় তিনি বলে উঠলেন,

— “তোমার থেকে এটা আশা করিনি, মাই বয়! তোমার ওয়াইফ যা করেছে, সেটা কি তোমার মতে ঠিক হয়েছে?”
সৌহার্দ্য বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে ওনার চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় জবাব দিল,
— “স্যার, আপনার মেয়েও তো এমন অনেক কিছু করেছে, যেগুলো ওর করা উচিত ছিল না!”
তালুকদার সাহেব এক পলক নিজের মেয়ের দিকে তাকিয়ে আবার সৌহার্দ্যের দিকে তাকাতে গেলেন। কিন্তু তিনি কিছু বলার আগেই সৌহার্দ্য চেয়ার ছেড়ে এক ঝটকায় দাঁড়িয়ে পড়ল। শীতল কণ্ঠে বলল,
— “বাকিটা আপনার মেয়ের থেকেই জেনে নেবেন!”
বলেই আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে রিদির হাতটা নিজের শক্ত মুঠোর মধ্যে টেনে নিয়ে রুম থেকে বের করে আনল।
হাসপাতালের দীর্ঘ করিডোরে এসে রিদির হাতটা ছেড়ে দিল সৌহার্দ্য। তারপর জ্বলন্ত চোখে তার দিকে তাকাতেই রিদি ভয়ে আধমরা হয়েও মুখের তেজ বজায় রেখে ফুঁপিয়ে উঠল—

— “একদম এভাবে তাকাবেন না আমার দিকে! আমি বেশ করেছি! আমার জামাইকে কেউ ভালোবাসার কথা বলবে, আর আমি তাকে মিষ্টিমুখ করাব না?”
সৌহার্দ্যের রাগটা তখন মাথায় চড়ে বসেছে। বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে বলল,
— “তাই বলে তুমি আর কোনো জায়গা পেলে না? তোমার কি একটুও বুদ্ধি নেই? তুমি জানো, অতিরিক্ত ভয়ে মানুষ প্যানিক অ্যাটাক করতে পারে?”
রিদি এক চুলও না দমে আগের মতো তেজি গলায় জবাব দিল,
— “প্যানিক করার জন্যই তো আটকে রেখে এসেছি! আর আপনার ওই মেয়ের প্রতি এত দরদ উথলে উঠছে কেন শুনি?”
মাথা এমনিতেই গরম হয়ে আছে, তাই সৌহার্দ্য আর কথা বাড়িয়ে পরিস্থিতি জটিল করতে চাইল না। এমন সময় চোখ পড়ল সায়েমের দিকে। সৌহার্দ্য কিছু বলার আগেই সায়েম ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে তার ফোনটা বের করে সৌহার্দ্যের চোখের সামনে ধরে ফেলল। আমতা আমতা করে বলে উঠল,
— “বিশ্বাস করুন স্যার, আমার কোনো দোষ নেই! আপনার এই তারছেঁড়া বউ-ই আমাকে মেসেজ দিয়ে ফাঁসিয়েছে!”

কাউকে আর একটাও কথা বলার সুযোগ দিল না সৌহার্দ্য। বিরক্তিতে মুখটা শক্ত করে সোজা নিজের চেম্বারের দিকে হেঁটে চলে গেল। তনিমাকে তখন আটকে দিয়ে আসার কিছুক্ষণ পরই দারোয়ান আসে। মর্গের ভিতর থেকে চেঁচানোর আওয়াজ কানে যেতেই সে দরজা খুলে মেয়েটাকে উদ্ধার করে। তখনই তনিমার ভয়ে অবস্থা খারাপ! পরে একটু সুস্থ হয়ে সে তার বাবাকে সব খুলে বলে।
বিকালে সিআইডির ঠান্ডা বাতাসে ঘেরা ঘরটায় ভারী এক নীরবতা। ঘড়ির কাঁটা তখন চারটার ঘরে। এসবি বারবার বিরক্ত ভঙ্গিতে হাতঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন। রুমের অপর প্রান্তে বসে আছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এসিপি) হারুনুর রশীদ। এসবিকে অস্থির হতে দেখে তিনি ধীর গলায় বললেন, “শান্ত হয়ে বসো, মাই বয়। একটু আগেই তো কথা হলো, আসছে তো সে!”
ঠিক তখনই দরজায় মৃদু টোকা দিয়ে হাজির হলো এক তরুণী। এসবিকে দেখেই একটু থতমত খেয়ে বলে উঠল, “সরি ভ… না মানে স্যার, একটু লেট হয়ে গেল!”

বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে এসবি তেড়ে উঠলেন, “এভাবে অযথা ঝামেলা পাকালে তো লেট হবেই!”
তরুণী কিছু বলতে যাওয়ার আগেই হারুনুর রশীদ হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন। স্নেহের সুরে বললেন, “বসো, মামুনি। বলো, কাজ কতদূর এগোলো?”
মেয়েটি নিঃশব্দে একটা চেয়ার টেনে বসল। তারপর ব্যাগের থেকে দুটো ফাইল আর ভিডিও ফুটেজের একটা ড্রাইভ এগিয়ে দিয়ে ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, “এর থেকে বেশি কিছু পাওয়া যায়নি। আমার মনে হয় না, ওই বাড়িতে এর থেকে বেশি আর কিছু পাওয়া যাবে।”
এসবি দ্রুত হাত বাড়িয়ে ফাইল দুটো তুলে নিলেন। পাতা উল্টে এক পলক চোখ বুলিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, “এগুলোতে সারহান চৌধুরীর সিগনেচার রয়েছে! তার মানে…”
তরুণী তড়িৎ গতিতে এসবির দিকে তাকিয়ে আস্থার সুরে বলে উঠল, “উহু, উনি এসবে কিচ্ছু জানেন না! আমার বিশ্বাস, ওনার অজান্তে এসব করানো হচ্ছে। তবে… আমি ঠিক নিশ্চিতও নই।”
হারুনুর রশীদ গভীর ভাবনায় ডুবলেন। সন্দেহের চোখে তাকিয়ে বললেন, “আমার কেন যেন খটকা লাগছে। এত সহজে এগুলো তোমার হাতে চলে এল, তাও প্রতিটা জায়গায় সারহান চৌধুরীর স্বাক্ষর? ব্যাপারটা কি একটু বেশিই সহজ মনে হচ্ছে না?”

ফাইলগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে চেক করতে করতে এসবি বললেন, “ওরা যদি আমাদের বোকা বানোর জন্যও এটা করে থাকে, তবুও মন্দ হয়নি। এখান থেকে অনেক বড় বড় ক্লু পাওয়া যাবে। আর সারহান চৌধুরী যে একেবারে নিষ্পাপ, এমন কোনো কথা নেই। আপাতত সন্দেহের তালিকায় সবাই আছে!”
হারুনুর রশীদ মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমাকে তো বলা হয়েছিল, চৌদ্দ তারিখে…”
বাকি কথাটুকু শেষ করতে পারলেন না। মাঝপথেই এসবি প্রায় প্রতিবাদ করে বলে উঠলেন, “ওকে সেখানে পাঠানো কোনোভাবেই সম্ভব না, স্যার! ওর সামান্য কিছু হলে, আপনার সেই মৃত বন্ধুকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি কি রাখতে পারবেন?”
রুমের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে এল। হারুনুর রশীদ আর কোনো প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পেলেন না। স্তব্ধ চোখে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে মায়াময় কণ্ঠে বললেন, “ঠিক আছে, তুমি এখন আসতে পারো, মামুনি।”
ঘড়ির কাঁটা তখন অলস পায়ে গড়িয়ে প্রায় সাতটার ঘরে। শাহবীরের ফ্লাটের ছোট্ট রান্নাঘরে সুমি ব্যস্ত নাস্তা বানাতে। বাড়ি থেকে রিদির সাথে দেখা করার নাম করে এখানে এসেছে সুমি। ঘরের নিঝুম কোণটায় হঠাৎ করেই কোনো শব্দ না করে সুমির পেছনে এসে দাঁড়াল শাহবীর।
সামান্য দূরত্ব রেখে, ঠিক কানের কাছে মুখটা ঝুঁকিয়ে খুব নিচু আর মায়াবী কণ্ঠে সে ফিসফিস করে উঠল—
“ভয় করছে না? এভাবে একটা একা পুরুষের বাসায় একা চলে এসেছো?”

কোনো ভনিতা না করে, নুডুলসের চামচটা নাড়তে নাড়তে সুমি সাহসিকতার সাথে জবাব দিল—
“না, আমি ক্যারাটে জানি। উল্টাপাল্টা কিছু করতে আসলে নাক ফাটিয়ে দেবো!”
শাহবীর মৃদু হাসল। চোখের সেই চাহনিতে ছিল গভীর এক আকুলতা। সুমির দিকে তাকিয়ে সে নরম সুরে বলল—
“কিন্তু তোমাকে এভাবে একা পেয়ে আমার তো কিছু করার চেষ্টা করতে ইচ্ছে করছে… কী বলো, ট্রাই করব?”
শাহবীরের এমন কথার ঢেউয়ে সুমির বুকটা কেঁপে উঠল। গাঢ় লজ্জায় সে একটু কুঁকড়ে গেল, শরীরটা গুটিয়ে নিতে চাইল। ঠিক তখনই যখন শাহবীর আত্মসংবরণ করে একটু পিছিয়ে যেতে নিল, সুমি আর নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে দ্রুত তাঁর হাত খানি খামচে ধরল—
“আমি ভয় পাইনি… আপনার ওপর আমার অন্ধ বিশ্বাস আছে!”
এক দৃষ্টিতে সুমির মায় ভরা মুখের দিকে তাকিয়ে শাহবীরের বুক চিরে বেরিয়ে এল এক সুপ্ত আবদার—
“একটু জড়িয়ে ধরতে পারি তোমাকে?”
সুমি কিছুটা অস্বস্তি ও ঘোরের মধ্যে পড়তেই শাহবীর আশ্বস্ত করে বলল—
“ইটস ওকে, প্যানিক করতে হবে না, তু…”
কথাটা আর শেষ হলো না। শাহবীরের ঠোঁট থেকে কথা কেড়ে নিয়ে সুমি আলতো করে জড়িয়ে ধরল তাঁকে। শাহবীরও আর এক মুহূর্ত দেরি করল না; দুই বাহু দিয়ে পরম যত্নে বুক আগলে নিয়ে ফিসফিস করে বলল—
“চলো বিয়ে করে ফেলি?”

শাহবীরের প্রশস্ত বুকে মাথা গুঁজে সুমি মোহাচ্ছন্ন কণ্ঠে উত্তর দিল—
“হুম… বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যান!”
সুমির কোমল মাথার তালুতে নিজের থুতনিটা ছুঁইয়ে শাহবীর দীর্ঘশ্বাসের সাথে বলল—
“যদি তোমার আব্বু রাজি না হন?”
সুমি তাঁকে আরও একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে অভিমানের সুরে বলল—
“কেন রাজি হবেন না? আপনার মাঝে কিসের কমতি আছে বলুন তো?”
চোখ বন্ধ করে বুকফাটা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শাহবীর বলল—
“সবচেয়ে বড় কমতিটাই তো লুকিয়ে আছে আমার রক্তে…”
বুক থেকে চমকে মাথা তুলে সুমি যখন প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাল, শাহবীর তার চোখের গভীরতায় চোখ রেখে ভারী কণ্ঠে বলল—

“আমার জন্মপরিচয় নেই!”
সুমি যেন মুহূর্তের জন্য পাথর হয়ে গেল। রিদি বা শাহবীর— কারও জন্মপরিচয়ের বিন্দুবিসর্গও তার জানা ছিল না। সে তো শুধু রিদির মুখে শুনেছিল শাহবীর তার ভাই এবং ফুফুর কাছে পালক হিসেবে মানুষ হয়েছে। সে ভেবেছিল, হয়তো নিঃসন্তান ফুফু ভালোবেসে নিজের কাছে রেখেছেন। তাই এই নিয়ে কোনো দিন গভীরে গিয়ে প্রশ্ন করার প্রয়োজনও সে মনে করেনি।
সুমির সেই থমকে যাওয়া, কৌতুহলী মুখটার দিকে তাকিয়ে শাহবীর তার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল বারান্দার দিকে। ফিনফিনে অন্ধকারের দোলনায় দুজনে বসে পড়ল। সুমির মাথাটা টেনে নিল নিজের চওড়া বুকে। তারপর দূর আকাশের ধ্রুবতারার দিকে তাকিয়ে নিজের বুকের ভেতর জমিয়ে রাখা সমস্ত কষ্ট, অভিমান আর জীবনের নির্মম সত্যটা একে একে উজাড় করে দিল— তাঁর আর তাঁর বোনের পিতৃপরিচয়ের সেই করুণ ইতিহাস!
সেদিনের সেই হাওয়ায় যেন সুমির চারপাশের পৃথিবীটা স্তব্ধ হয়ে গেল। রিদি হাসিখুশির ওই মায়াবী আড়ালে ঠিক কত শত চাপা কষ্ট লুকিয়ে হাসিমুখে বেঁচে থাকে, তা ভেবে সুমির বুকটা ভেঙে আসতে চাইল।
শাহবীর সুমির হাত দুটো ধরে সস্নেহে জিজ্ঞেস করল—
“এই সত্যিটা জানার পরও… আমাকে ছেড়ে চলে যাবে না তো? যদি যেতে চাও, যেতে পারো। আমি কাউকে জোর করে আমার জীবনে আটকে রাখতে বিশ্বাসী নই।”
সুমি আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। শাহবীরকে আরও শক্ত করে, সমস্ত সত্ত্বা দিয়ে জড়িয়ে ধরে কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে বলে উঠল—

“আমি আপনাকে ভালোবেসেছি, আপনার কোনো ঠিকানাকে বা পরিচয়কে নয়!”
আকাশের পানে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে শাহবীর বলল—
“যদি তোমার বাবা এই সম্পর্ক মেনে না নেন, তবে কি সব ছেড়েছুড়ে আমার কাছে চলে আসতে পারবে?”
ঠিক এক মুহূর্তের জন্য সুমি একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল। এত বড় একটা প্রশ্নের উত্তর এক নিমিষে দেওয়া কি আর এত সহজ? বুকভাঙ্গা দ্বন্দ্ব কাটিয়ে সে খুব ধীর অথচ সুদৃঢ় কণ্ঠে বলল—
“আমি আমার বাবা-মা আর আপনাকে— এই তিনজনকে সমান ভালোবাসি। কাউকে ছেড়ে আমি থাকতে পারব না…”
শাহবীর সুমির মায়াবী মুখের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে মৃদু অথচ আশ্বস্ত করা হাসি হাসল। কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল—
“তোমাকে এত কঠিন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হবে না। আমি নিজেই ওনাদের কাছ থেকে চেয়ে তোমাকে নিজের করে নেব— প্রমিজ!”

শাহবীরের সেই প্রতিশ্রুতির ছোঁয়ায় সুমির ক্লান্ত ঠোঁটের কোণে ঝরে পড়ল এক ফালি চিরকালের স্নিগ্ধ ও পরম স্বস্তির হাসি।
রাত তখন প্রায় সাড়ে নয়টা। সারাদিনের ধকল সয়ে সবেমাত্র বাড়ি ফিরেছে সৌহার্দ্য। ক্লান্ত শরীর, ঘামে ভেজা কালো শার্টটা যেন লেপ্টে আছে গায়ে। ড্রইংরুমের সোফায় ক্লান্ত ভঙ্গিতে বসতেই চোখ পড়ল সামনের মানুষটির ওপর। সেখানে আগেই উপস্থিত ছিলেন তার বাবা, সারহান চৌধুরী।
ছেলের বিধ্বস্ত চেহারা দেখে এক গ্লাস পানি বাড়িয়ে দিয়ে তিনি শ্লেষের সুরে বললেন, “আমার কাছে তো না হয় আমার ছেলের নামে অভিযোগ আসে, সে না হয় কোনো রকমে মান বাঁচায়! কিন্তু তোমার কাছে তো একেবারে তোমার স্ত্রীর নামে অভিযোগ চলে আসছে, তা বাবা, কেমন গর্ব হচ্ছে তোমার?”
সারাদিনের টেনশন আর মানসিক চাপে সৌহার্দ্যের মাথা এমনিতেই গরম ছিল। বাবার এই তীক্ষ্ণ খোঁচাটা তার কাছে কাঁটা গায়ে নুনের ছিটার মতো ঠেকল। একরাশ পুঞ্জীভূত বিরক্তিতে ফেটে পড়ে সে ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠল, “গর্বে গর্ভবতী হয়ে গেছি, দাদা হবে কিছুদিন পর তুমি—আর ইউ হ্যাপি নাও?”

কথাটা শেষ করতেই সিঁড়ির দিকে চোখ পড়ল তার। সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে রিদি। তাকে দেখেই রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে এল সৌহার্দ্যের। রিদির দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে সে ধমকে উঠল, “এই যে আধপাগল! তোমার এই আধপাগল শ্বশুরকে আমার সামনে থেকে বিদায় করো বলছি, না হয় তোমাকে তুলে আছাড় মারব আমি!”
সৌহার্দ্যের এই হিতাহিতজ্ঞানশূন্য ধমকে রিদি একটু কেঁপে উঠল। তবে মুহূর্তেই সামলে নিয়ে সে দ্রুত এগিয়ে এসে সারহান চৌধুরীর হাত ধরে বলল, “আব্বু, চলুন তো! উনি এখন নিজেই পুরো পাগল হয়ে আছে, দুঃখে কাকে কী বলছে ঠিক নেই।”
রিদির কথায় সৌহার্দ্য আরও বেশি ক্ষিপ্ত চোখে তাকাল তাদের দিকে। কিন্তু তাতে কান না দিয়ে সারহান চৌধুরী ছেলের কাঁধে আলতো চোখ বুলিয়ে ধীর পায়ে উঠতে উঠতে বললেন, “ও ঠিকই তো বলছে, এভাবে তাকাচ্ছ কেন? ভয় পায় নাকি আমরা তোমাকে?”
বলেই শ্বশুর ও পুত্রবধূ একজোট হয়ে ঘর ছেড়ে চলে গেলেন। সৌহার্দ্য অপলক বিরক্তিতে সেদিকে তাকিয়ে রইল।
দুপুরের দিকে যখন সৌহার্দ্যের থেকে কোনো সদুত্তর পায়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, তখন তারা বাধ্য হয়ে ফোন করেছিল সারহান চৌধুরীকে—যেহেতু তিনি ওই হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজের ফাউন্ডার। কিন্তু সারহান চৌধুরী তখন নির্বিকারভাবে উল্টো উত্তর দিয়ে দিয়েছিলেন, “যার বউ, সে-ই বুঝবে। এসব ব্যাপারে আমি কথা বলতে পারব না!”

রাত তখন প্রায় দেড়টা। একটা প্রাইভেট হাসপাতালের দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর অপারেশন শেষ করে বাড়ির পথ ধরেছিল সৌহার্দ্য। রাতে তখন বাবা আর বউয়ের সাথে তীব্র কথা কাটাকাটির রেশ কাটতে না কাটতেই জরুরি তলবে তাকে ছুটে আসতে হয়েছিল হাসপাতালে।
হঠাৎ করেই রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে সৌহার্দ্যের চোখে পড়ল এক বিভীষিকা—রং সাইড থেকে দানবীয় গতির একটা বেপরোয়া ট্রাক ছুটে আসছে সোজাসুজি তার দিকে। প্রথমে তার মনে হয়েছিল, হয়তো গাড়িটার ব্রেক ফেল করেছে বা কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিয়েছে। তাই সে নিজেই কিছুটা সাইড করে দিতে চাইল। কিন্তু না! ট্রাকটার উন্মত্ত ভঙ্গি দেখে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল—ওটা কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং কাউকে চিরতরে শেষ করে দেওয়ার এক নিখুঁত ও মরিয়া চক্রান্ত!

​ততক্ষণে সব হিসাব-নিকাশ হাতের বাইরে চলে গেছে। সৌহার্দ্যের আর বাঁচার কোনো উপায় রইল না। দানবীয় সেই ট্রাকটা এক নিমেষে তার মার্সিডিজ গাড়িটাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে সড়কের একপাশে উল্টে ফেলল। সৌহার্দ্যের মার্সিডিজ গাড়িটিকে পিষে দিয়ে দানবীয় ট্রাকটি যখন অন্ধকারে মিলিয়ে গেল, তখন চারপাশটা এক অদ্ভুত ও ভারী নীরবতায় ছেয়ে গেছে। স্টিয়ারিংয়ের ওপর লুটিয়ে পড়া সৌহার্দ্যের নিথর শরীর থেকে গড়িয়ে পড়া তাজা রক্তে ধীরে ধীরে লাল হয়ে উঠল গাড়ির কেবিন আর পিচঢালা রাস্তা।

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫২

​ঠিক সেই মুহূর্তেই গাড়ির ড্যাশবোর্ডে একপাশে পড়ে থাকা ফোনটার স্ক্রিন হঠাৎ জ্বলে উঠল। মৃদু নীল আলোর সেই স্ক্রিনের ওপর ভেসে আছে একটি নাম—‘মাই প্যারোট’। আর ওপাশ থেকে বারবার বেজে চলেছে এক অন্তহীন উৎকণ্ঠার রিংটোন!

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫৪