শেহেজাদার আদর পর্ব ৭৫
সুমাইয়া ইসলাম নূর
ছয়টি মাস যেন চোখের পলকেই কেটে গেল।
সকালের কোমল রোদ তখন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে পুরো চৌধুরী ভিলা জুড়ে। জানালার স্বচ্ছ কাঁচ ভেদ করে সোনালি আলোর রেখাগুলো মার্বেলের মেঝেতে পড়ে তৈরি করেছে অপূর্ব নকশা। চারপাশে পাখিদের কিচিরমিচির, বাগানের শিশিরভেজা ফুলের সুবাস মিলেমিশে এক প্রশান্ত সকালের আবহ তৈরি করেছে।
কিন্তু আজকের সকালটা অন্য দিনের মতো শান্ত নয়।পুরো চৌধুরী ভিলাজুড়ে এক অদৃশ্য ব্যস্ততা ছড়িয়ে পরেছে। প্রত্যেকের পদচারণায় স্পষ্ট দায়িত্বের ছাপ। কারণ আজ শুধুমাত্র চৌধুরী গ্রুপ নয়, IVA Group এবং ASU Group-এর জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন।
আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী এবং আন্তর্জাতিক কর্পোরেট প্রতিনিধিদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে একটি উচ্চপর্যায়ের বিজনেস মিটিং। এই একটি মিটিংয়ের ওপর নির্ভর করছে ভবিষ্যতের কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রজেক্ট, বহুমূল্য বিনিয়োগ এবং নতুন ব্যবসায়িক সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত। তাই তিনটি গ্রুপের প্রত্যেক সদস্যই আজকের মিটিংকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।ডাইনিং হলে তখন সকালের নাস্তা করছে সবাই।
এক পাশে বসে আছেন লিখন চৌধুরী, রাতিব চৌধুরী ও রবিউল চৌধুরী। অন্য পাশে ইউভি আর রেদোয়ান দ্রুত নাস্তা শেষ করছে। তাদের চোখেমুখে কোনো অস্থিরতা নেই। বরং রয়েছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেওয়া আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্বের দৃঢ়তা আর বিজয় ছিনিয়ে আনার অদম্য প্রত্যয় বাংলাদেশের ব্যবসায়িক অঙ্গনে একটাই নাম যথেষ্ট চৌধুরী পরিবার।যে পরিবার শুধু দেশের শীর্ষ ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যই গড়ে তোলেনি, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নিজেদের অবস্থান শক্ত হাতে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ডাইনিং টেবিলের অন্য পাশে পাশাপাশি বসে নাস্তা করছিল ইনায়া আর পিয়াসা।গত রাতটা প্রায় নির্ঘুম কেটেছে ইউভি আর ইনায়ার। দু’জনে বসেই আজকের মিটিংয়ের প্রতিটি প্রেজেন্টেশন, প্রতিটি ডকুমেন্ট, প্রতিটি রিপোর্ট আর সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তর শেষবারের মতো মিলিয়ে দেখেছে। কোথাও যেন সামান্যতম ভুল না থাকে, সেদিকে ছিল তাদের তীক্ষ্ণ নজর তবুও…ইনায়ার মনের ভেতরের অজানা শঙ্কাটা কিছুতেই কাটছিল না।
চামচ দিয়ে ধীরে ধীরে খাবার নাড়তে নাড়তে সে যেন নিজের ভাবনাতেই হারিয়ে আছে পাশ থেকে বিষয়টা এক নজরেই বুঝে ফেলল ইউভি।খেতে খেতেই একবার আড়চোখে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে আবার নিজের প্লেটের দিকে মন দিল। তারপর খুব নিচু স্বরে, শুধু ইনায়ার কানে পৌঁছানোর মতো করে ফিসফিসিয়ে বলল,তোমার মিস্টার থাকতে এত চিন্তা করছ কেন, মিসেস চৌধুরী? আমি আছি তো…”
মাত্র একটি বাক্য। আমি আছি তো! কিন্তু সেই কয়েকটি শব্দই যেন জাদুর মতো কাজ করল।
ইনায়ার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল প্রশান্ত এক হাসি। মুহূর্তেই বুকের ভেতরের ভারটা অনেকটাই হালকা হয়ে গেল। সে জানে—তার পাশে যখন ইউভি আছে, তখন অসম্ভব বলে কিছু নেই।
পিয়াসাও বিষয়টা লক্ষ্য করে মুচকি হেসে ইনায়ার সঙ্গে আজকের মিটিংয়ের শেষ মুহূর্তের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা সেরে নিল।সবকিছু আরেকবার নিশ্চিত করে নিতেই যেন দু’জনেরই স্বস্তি মিলল।
নাস্তা শেষ হতেই পুরো চৌধুরী পরিবার একসঙ্গে উঠে দাঁড়াল।ভিলার বিশাল ড্রাইভওয়েতে একে একে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে পরিবারের বিলাসবহুল গাড়িগুলো।আজ প্রত্যেকেই নিজের নিজের গাড়িতে অফিসে যাবে।
লিখন চৌধুরী, রাতিব চৌধুরী এবং রবিউল চৌধুরী—প্রত্যেকেই আলাদা গাড়িতে রওনা দিলেন।
অন্যদিকে ইনায়া ও পিয়াসাও আজ আলাদা গাড়িতে যাবে। নিজেদের গন্তব্যে পৌঁছানোর আগে দু’জনেরই আরও কিছু কর্পোরেট প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে।কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই একে একে ইঞ্জিনের শক্তিশালী শব্দে মুখরিত হয়ে উঠল পুরো চৌধুরী ভিলা।রাজকীয় বহরের মতো একের পর এক বিলাসবহুল গাড়ি ধীরে ধীরে প্রধান ফটক অতিক্রম করে বেরিয়ে গেল।
সামনে পেছনে নিরাপত্তা কর্মীদের গাড়িগুলো পিছু ছুটে চলল সাদা ও নেভি ব্লু রঙের প্রিমিয়াম সেডান আর এসইউভির সারি। রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে গাড়ির বহরটি এগিয়ে চলতেই পথচারীদের অনেকেই অবচেতনেই তাকিয়ে রইল।কারণ এই বহর কারও অচেনা নয়।এটি বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীগুলোর একটি চৌধুরী ফ্যামিলি।
অন্যদিকে…
ঢাকার বাণিজ্যিক কেন্দ্রের মাঝখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা কাঁচে মোড়ানো পনেরো তলা বিশিষ্ট বিশাল ভবনটির সামনেও তখন তুমুল ব্যস্ততা।
প্রবেশদ্বারের সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে কোম্পানির নিরাপত্তাকর্মীরা। প্রত্যেকের কানে ওয়্যারলেস ডিভাইস, চোখেমুখে সর্বোচ্চ সতর্কতা।
রিসেপশন থেকে শুরু করে কনফারেন্স ফ্লোর—সব জায়গাতেই শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে।আজকের মিটিংয়ের জন্য পুরো বিল্ডিংয়ের নিরাপত্তা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।কারণ আজ এখানে উপস্থিত থাকবেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতি, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী এবং কর্পোরেট জগতের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা।বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে আজ।
ঠিক সেই মুহূর্ত একটির পর একটি বিলাসবহুল গাড়ি এসে থামল ভবনের সামনে।প্রথমে নেমে এলেন লিখন চৌধুরী তারপর রাতিব চৌধুরি ও রবিউল চৌধুরী।তাদের পেছনেই দরজা খুলে ধীর পায়ে গাড়ি থেকে নামল ইউভি।কালো সানগ্লাস, পরিপাটি কর্পোরেট পোশাক, আত্মবিশ্বাসে ভরা দৃঢ় পদক্ষেপ—তার উপস্থিতিই যেন চারপাশের পরিবেশ বদলে দিল।অন্য গাড়ি থেকে নামল রেদোয়ান।
দু’ভাই একবার চোখাচোখি হতেই নীরব হাসিতে বিনিময় হলো দিনের প্রথম শুভকামনা।
এর কিছুক্ষণ পর ভবনের সামনে এসে থামল আরও দুটি গাড়ি।একটি থেকে নেমে এল ইনায়া।
অন্যটি থেকে পিয়াসা।দুজনের পরনেই নিখুঁত কর্পোরেট পোশাক। আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপে তারা ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতেই উপস্থিত কর্মচারীরা সম্মানের সঙ্গে মাথা নত করল।
— “গুড মর্নিং, ম্যাম।”
— “গুড মর্নিং, স্যার।”
চারদিক একসঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ে মুখর হয়ে উঠল।ইউভি একবার আড়চোখে ইনায়ার দিকে তাকাল।ইনায়াও তার দৃষ্টি বুঝে মুচকি হেসে মাথা নাড়ল।আজ আর তার চোখে কোনো ভয় নেই।
কারণ সে জানে তার পাশে ইউভি আছ।মুহূর্তের মধ্যেই সবাই লিফটে উঠে নিজ নিজ ফ্লোরে চলে গেল।
অন্যদিকে বিশাল কনফারেন্স হলে ইতোমধ্যেই উপস্থিত হতে শুরু করেছেন বিদেশি অতিথিরা।
বিশাল এলইডি স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে আজকের আন্তর্জাতিক বিজনেস সামিটের লোগো।সামনের টেবিলগুলোতে নিখুঁতভাবে সাজানো রয়েছে প্রতিটি দেশের পতাকা, প্রজেক্ট ফাইল, ডিজিটাল ট্যাব, চুক্তিপত্র এবং প্রেজেন্টেশন কিট।
টানা কয়েক ঘণ্টার গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা, উপস্থাপনা, চুক্তির খুঁটিনাটি যাচাই-বাছাই এবং বিভিন্ন দেশের শিল্পপতিদের সঙ্গে মতবিনিময়ের পর অবশেষে আন্তর্জাতিক বিজনেস সামিটটি সফলভাবে সমাপ্ত হলো।কনফারেন্স রুমজুড়ে মুহূর্তের মধ্যেই করতালির শব্দ বেজে উঠল।
উপস্থিত বিদেশি প্রতিনিধিদের মুখে স্পষ্ট সন্তুষ্টির ছাপ। একজন দাঁড়িয়ে বললেন,
“The professionalism of the Chowdhury Family is truly exceptional.”
( “চৌধুরী পরিবারের পেশাদারিত্ব সত্যিই অসাধারণ।”)
সেই প্রশংসা শুনে উপস্থিত সবাই বিনয়ের সঙ্গে হাসিমুখে কৃতজ্ঞতা জানাল।
মিটিং শেষ হওয়ার পর পুরো চৌধুরী পরিবার নিজের হাতে অতিথিদের আপ্যায়নের দায়িত্ব নিল।বিশাল ব্যাংকুয়েট হলে ইতোমধ্যেই সাজানো ছিল রাজকীয় সব খাবার এর আয়োজন।বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী নানা রকম খাবারের সঙ্গে ছিল আধুনিক আন্তর্জাতিক কুইজিনেরও সমাহার। তবে আজকের মূল আকর্ষণ ছিল বাংলার নিজস্ব স্বাদ।
সুগন্ধি কাচ্চি বিরিয়ানি, ইলিশ পোলাও, চিংড়ি মালাইকারি, ভুনা খিচুড়ি, গরুর রেজালা, মোরগ পোলাও, শাহী কাবাব, নান, বিভিন্ন ধরনের ভর্তা, টাটকা সালাদ, দই, মিষ্টি, রসমালাই, ক্ষীর, পায়েস—প্রতিটি পদই অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে পরিবেশন করা হলো। ইনায়া ও পিয়াসা নিজেদের হাতে অতিথিদের খাবার পরিবেশন করছিল।তাদের আন্তরিক ব্যবহার, মিষ্টি হাসি আর নিখুঁত আতিথেয়তায় বিদেশি অতিথিরা সত্যিই মুগ্ধ হয়ে গেলেন।
একজন বিদেশি নারী উদ্যোক্তা মুগ্ধ হয়ে বললেন,
Bangladesh is beautiful… but today we discovered something even more beautifulyour hospitality.”( “বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে সুন্দর… কিন্তু আজ আমরা তার চেয়েও সুন্দর একটি বিষয়ের দেখা পেলাম—আপনাদের আন্তরিক আতিথেয়তা।”)
অন্য একজন হাসতে হাসতে বললেন,
Now we understand why the Chowdhury Family is respected not only for business, but also for their values.”(“আজ আমরা উপলব্ধি করলাম, চৌধুরী পরিবার শুধু ব্যবসায়িক সাফল্যের জন্য নয়, তাদের আদর্শ, নীতি ও মূল্যবোধের জন্যও সর্বত্র সম্মানিত।”)
ইনায়া ও পিয়াসা বিনয়ের সঙ্গে হাসিমুখে তাদের ধন্যবাদ জানাল।সবাই যেন একবাক্যে স্বীকার করলেন চৌধুরী পরিবারের আতিথেয়তার তুলনা হয় না।খাওয়া-দাওয়া শেষ করে অতিথিরা একে একে বিদায় নেওয়ার প্রস্তুতি নিলেন।বিদায়ের আগে প্রত্যেকেই লিখন চৌধুরী, রাতিব চৌধুরী, রবিউল চৌধুরী, ইউভি, রেদোয়ান, ইনায়া ও পিয়াসার সঙ্গে করমর্দন করলেন।একজন প্রবীণ শিল্পপতি বললেন,
We look forward to working with the Chowdhury Family for many years.(“আমরা আগামী বহু বছর চৌধুরী পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করার প্রত্যাশা রাখি।”)
আরেকজন হেসে বললেন
— “See you soon in our next international project.(“আমাদের পরবর্তী আন্তর্জাতিক প্রকল্পে আবার দেখা হবে।”)সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে একে একে অতিথিদের গাড়ি ভবনের প্রাঙ্গণ ছেড়ে চলে গেল।প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে পুরো চৌধুরী পরিবার তাদের বিদায় জানাল।গাড়ির শেষ বহরটিও চোখের আড়াল হতেই চারপাশে নেমে এলো এক অদ্ভুত প্রশান্ত নীরবতা।হঠাৎই ইনায়া আর নিজেকে সামলাতে পারল না।সে ধীরে ধীরে ইউভির সামনে এসে এক মুহূর্ত দেরি না করে তাকে জড়িয়ে ধরল।
ইউভিও আলতো করে স্ত্রীর কাঁধে হাত রাখল।
ইনায়া খুব আস্তে ফিসফিস করে বলল,
— “থ্যাঙ্ক ইউ, মিস্টার ইউভি ইউভি মৃদু হেসে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে নিচু স্বরে বলল,
থ্যাঙ্ক ইউ চাই না, মিসেস চৌধুরী… আমার ইচ্ছেকে চাই… ব্যাস। কথাটা শুনতেই ইনায়ার মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে গেল।মাথা নিচু করে খুব আস্তে বলল,
— “হুম…”
কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে আবার বলল,আজ যদি একটু ফ্রি হও… একবার আশ্রমে’ যাব? বড্ড দেখতে ইচ্ছে করছে ওদের। ইউভির চোখে কোমল হাসি ফুটে উঠল আমি তো প্রায় রোজই যাই, আদর। তোমাকে ওরা ভীষণ মিস করে। বিশেষ করে ছোটগুলো… সারাক্ষণ তোমার কথাই জিজ্ঞেস করে। ইনায়ার চোখ দুটো মুহূর্তেই ভিজে উঠল।
— “চলো… আজ যাই।”
ইউভি মাথা নেড়ে মৃদু হেসে সম্মতি জানাল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে লিখন চৌধুরীর গম্ভীর অথচ আবেগমাখা কণ্ঠ ভেসে এলো,
— “ইউভি…”
ইউভি ঘুরে দাঁড়াতেই লিখন চৌধুরী এগিয়ে এসে ছেলেকে শক্ত করে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরলেন।গলায় স্পষ্ট গর্বের সুর।
— “I’m proud of you, my son.”
বাবার কণ্ঠে উচ্চারিত এই কয়েকটি শব্দের মূল্য ইউভির কাছে পৃথিবীর যেকোনো পুরস্কারের চেয়েও অনেক বেশি।পরক্ষণেই রেদোয়ান কে ও বুকে জরিয়ে নিয়ে হাসিমুখে বললেন,এখন থেকে নিশ্চিন্তে সব দায়িত্ব তোমাদের হাতে তুলে দিতে পারব। আমরা এবার একটু শান্তিতে নিঃশ্বাস নিতে চাই। রাতিব চৌধুরী হেসে বললেন,শুধু ছেলেরাই নয়… আমাদের দুই মেয়ে ও আজ প্রমাণ করে দিল, ওরাও কোনো অংশে কম নয়। রবিউল চৌধুরী মৃদু হেসে বললেন ,যেমন দুই ছেলে, ঠিক তেমনই দুই মেয়ে। সত্যি বলতে কী, আজ তো মনে হলো ওরা আমাদেরও টেক্কা দিয়ে ফেলেছে।”
কথাটা শুনে সবাই একসঙ্গে হেসে উঠল।ঠিক সেই মুহূর্তেই রাতিব চৌধুরীর ফোনটা বেজে উঠল।স্ক্রিনে ভেসে উঠল—
“নুসরাত”।
মুখে হালকা হাসি নিয়েই কল রিসিভ করলেন তিনি।
কিন্তু ওপাশের কণ্ঠ শুনেই মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল তাঁর মুখের অভিব্যক্তি।নুসরাত চৌধুরীর কণ্ঠে স্পষ্ট উৎকণ্ঠা।শুনছ? তোমরা সবাই যত তাড়াতাড়ি পারো হাসপাতালে চলে আসো। রিমঝিমের ডেলিভারি পেইন শুরু হয়েছে। আমরা এখনই ওকে নিয়ে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে যাচ্ছি।” কথাটা শেষ হতেই কল কেটে গেল।রাতিব চৌধুরী আর এক মুহূর্তও দেরি করলেন না।উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন,চলো! রিমঝিমের ডেলিভারি পেইন শুরু হয়েছে। ওকে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে! কথাটা শুনেই সবার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।কয়েক মুহূর্ত আগেও যে পরিবেশ সাফল্যের আনন্দে মুখর ছিল, তা নিমেষেই বদলে গেল উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায়।
লিখন চৌধুরী, রবিউল চৌধুরী, ইউভি, রেদোয়ান, ইনায়া আর পিয়াসা কেউ এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না।একের পর এক গাড়ি দ্রুত ছুটে চলল এভারকেয়ার হাসপাতাল, এর উদ্দেশে।
চৌধুরী পরিবারের প্রত্যেকে হাসপাতালের উদ্দেশে ছুটে এলেও ভাগ্য যেন আজ তাদের জন্য অন্যরকম এক সুখবর আগেই লিখে রেখেছিল।
তারা হাসপাতালে পৌঁছানোর কয়েক মিনিট আগেই আল্লাহর অশেষ রহমতে, সম্পূর্ণ স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে রিমঝিম চৌধুরী জন্ম দিল এক ফুটফুটে, সুস্থ-সবল পুত্রসন্তানের।নবজাতকের প্রথম কান্নার শব্দে যেন হাসপাতালের নিস্তব্ধ করিডোরও প্রাণ ফিরে পেল।একটি নতুন প্রাণের আগমনে আলোকিত হয়ে উঠল একটি পরিবার।
চৌধুরী পরিবারের সবাই দ্রুত হাসপাতালের মাতৃত্ব বিভাগে পৌঁছাতেই দেখল করিডোরের একপাশে দাঁড়িয়ে আছেন নুসরাত চৌধুরী।তার কোলে সাদা নরম কাপড়ে জড়ানো ছোট্ট এক নবজাতক।
চোখেমুখে তৃপ্তি, আনন্দ আর মাতৃত্বের উজ্জ্বল আলো।ইনায়া আর পিয়াসা আর নিজেদের সামলাতে পারল না।দু’জন প্রায় দৌড়ে গিয়ে নুসরাত চৌধুরীর সামনে দাঁড়াল।ছোট্ট শিশুটার গোলাপি মুখ, বন্ধ দুটি চোখ, ছোট্ট ছোট্ট হাত-পা দেখে দু’জনের চোখই বিস্ময়ে ভরে উঠল।
পিয়াসা আবেগভরা কণ্ঠে বলল,মাশাআল্লাহ… কী সুন্দর! ইনায়া আলতো করে শিশুটার ছোট্ট আঙুলে নিজের আঙুল ছোঁয়াতেই নবজাতক যেন অবচেতনেই সেটি মুঠো করে ধরে ফেলল।মুহূর্তেই ইনায়ার চোখ ভিজে উঠল।তার ঠোঁটে অজান্তেই ফুটে উঠল মায়াভরা এক হাসি।
অন্যদিকে…ইউভি আর রেদোয়ান দ্রুত এগিয়ে গেল কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা এক নার্সের কাছে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে ইউভি জিজ্ঞেস করল,আমার পি কেমন আছেন?”
নার্স আশ্বস্ত করে মৃদু হেসে বললেন,”জি, স্যার। আলহামদুলিল্লাহ, উনি এবং বেবি—দু’জনই সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন। একটু থেমে শ্রদ্ধাভরা কণ্ঠে আবার বললেন,সত্যি বলতে, উনি অসাধারণ ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন। পুরো সময়টা আমাদের কাজ অনেক সহজ করে দিয়েছেন। এমন সাহসী রোগী খুব কমই দেখা যায়। কথাটা শুনেই ইউভি আর রেদোয়ান দু’জনেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
ঠিক তখনই রেদোয়ানের ফোনে ভিডিও কল ভেসে উঠল।স্ক্রিনে ফুটে উঠল রাশেদ মির্জার নাম দেশের বাইরে গুরুত্বপূর্ণ কাজে থাকায় তিনি চাইলেও দেশে ফিরতে পারেননি।কল রিসিভ হতেই উদ্বিগ্ন চোখে বললেন,আমার ছেলেটা কে . আমাকে একবার দেখাও। রেদোয়ান মুচকি হেসে ক্যামেরা ঘুরিয়ে ছোট্ট শিশুটার দিকে ধরতেই ওপাশে কয়েক সেকেন্ড কোনো শব্দ শোনা গেল না।শুধু দেখা গেল রাশেদ মির্জার চোখের কোণে আনন্দাশ্রু চিকচিক করছে।কাঁপা কণ্ঠে তিনি বললেন, আলহামদুলিল্লাহ তারপর ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,আমার রিমঝিম কেমন আছে? ইউভি পাশে দাঁড়িয়েই মৃদু হেসে উত্তর দিল,ভালো আছে, ফুপা। আমার পি এত সহজে ভেঙে পড়ার মেয়ে নয়। একটু পরেই কেবিনে নিয়ে আসবে।
রাশেদ মির্জা স্বস্তির হাসি হাসলেন।তারপর সম্মানভরা কণ্ঠে লিখন চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বললেন,ভাইয়া… আমি তো পাশে থাকতে পারলাম না। আপনি আমার হয়ে দয়া করে বাচ্চার কানে আজানটা দিয়ে দিন। লিখন চৌধুরীর চোখ দুটোও অশ্রুসজল হয়ে উঠল।ধীরে ধীরে তিনি নুসরাত চৌধুরীর কোল থেকে ছোট্ট শিশুটিকে অত্যন্ত যত্নে নিজের বুকে তুলে নিলেন।কপালে আলতো করে ভালোবাসার চুমু এঁকে শিশুটির ডান কানের কাছে মুখ নিয়ে অত্যন্ত স্নিগ্ধ, আবেগমাখা কণ্ঠে আজান দিতে শুরু করলেন।আল্লাহু আকবার… আল্লাহু আকবার…”
পবিত্র আজানের ধ্বনি ভেসে উঠতেই করিডোরজুড়ে এক অপার্থিব প্রশান্তি নেমে এল।চৌধুরী পরিবারের প্রত্যেক সদস্য নীরবে দাঁড়িয়ে সেই পবিত্র মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে রইল।আজ যেন তাদের পরিবারে শুধু একটি নতুন সদস্যের আগমনই ঘটেনি আল্লাহ তাঁদের ঘরকে আরও একটি নতুন রহমত দিয়ে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন।
মা ও নবজাতক—দু’জনেই সম্পূর্ণ সুস্থ থাকায় চিকিৎসকদের পরামর্শ ও অনুমতি নিয়ে রাতেই রিমঝিম চৌধুরীকে তার ফুটফুটে পুত্রসন্তানসহ চৌধুরী ভিলায় নিয়ে আসা হলো।একটির পর একটি গাড়ি ধীরে ধীরে ভিলার বিশাল প্রবেশদ্বারের সামনে এসে থামতেই চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল আনন্দের উচ্ছ্বাস।বিকেলেই ইনায়া, পিয়াসা আর সাবিহা চৌধুরী ভিলায় ফিরে এসে নতুন অতিথিকে স্বাগত জানানোর সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন করেছিলেন।মূল প্রবেশদ্বার থেকে শুরু করে ভেতরের করিডোর পর্যন্ত সাদা, নীল ও সোনালি বেলুনে সেজে উঠেছে পুরো ভিলা। চারদিকে ঝিকিমিকি ফেয়ারি লাইট, সুগন্ধি ফুল আর ছোট্ট ছোট্ট সাজসজ্জায় যেন উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে আছে।
রিমঝিম চৌধুরী কোলে নিজের ছোট্ট রাজপুত্রকে নিয়ে প্রধান ফটক পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই ইনায়া, পিয়াসা ও সাবিহা চৌধুরী একসঙ্গে গোলাপ আর সাদা ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে তাদের স্বাগত জানাল।হূর্তের মধ্যেই চারপাশ ভরে উঠল করতালি আর হাসির শব্দে।ভিলার হেল্পিং হ্যান্ডরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে হাতে মিষ্টির ট্রে নিয়ে। সবার মুখেই ছিল নির্মল আনন্দের হাসি। পরিবারের নতুন সদস্যকে একনজর দেখার জন্য যেন প্রত্যেকেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল।ঠিক তখনই আয়াত আর আতিকা দৌড়ে এসে একসঙ্গে বলে উঠল,
— “আমি আগে কোলে নেব! ওদের কথা শেষ হতেই রিদ দ্রুত সামনে এসে দুই হাত ছড়িয়ে দাঁড়াল।তোরা দু’জন দূরে যা! আগে আমি কোলে নেব। ও কিন্তু আমার ছোট্ট ভাই! তিনজনের সেই মিষ্টি ঝগড়া দেখে উপস্থিত সবাই হেসে উঠল।নতুন অতিথির আগমনে সেদিন চৌধুরী ভিলা যেন আনন্দ, ভালোবাসা আর অফুরন্ত সুখে নতুন করে প্রাণ ফিরে পেল।চারদিকে তখন শুধু হাসি, আনন্দ আর নতুন অতিথিকে ঘিরে উচ্ছ্বাস।ছোট্ট রাজপুত্রকে একবার কোলে নেওয়ার জন্য সবাই যেন ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কেউ তার ছোট্ট হাত ছুঁয়ে দেখছে, কপালে আলতো করে চুমু এঁকে দিচ্ছে।সেই আনন্দমুখর পরিবেশের মাঝেই ইউভি ধীরে ধীরে এসে ইনায়ার ঠিক পাশে দাঁড়াল।
চারপাশের কোলাহলের আড়ালে খুব নিচু স্বরে, শুধু তার কানে পৌঁছানোর মতো করে বলল,”আমার ইচ্ছেকে নিয়েও একদিন ঠিক এভাবেই এই বাড়িতে ঢুকব, আদর।কথাটা শুনতেই ইনায়ার মুখের হাসিটা মুহূর্তের মধ্যেই মিলিয়ে গেল।চোখের কোণে অজান্তেই চিকচিক করে উঠল অশ্রু।সে নিঃশব্দে মাথা নিচু করে ফেলল।মনের গভীর থেকে যেন এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।
“হে আল্লাহ… তুমি এ কেমন ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছ আমার ? এই মানুষটার ছোট্ট একটা চাওয়াও আমি আজ পর্যন্ত পূরণ করতে পারলাম না।বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠল তার।ঠিক তখনই সবাই নবজাতককে নিয়ে ধীরে ধীরে রুমের ভেতরে চলে গেল।চারপাশ কিছুটা ফাঁকা হতেই ইউভি ইনায়ার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
— “বড্ড ক্লান্ত লাগছে, বউ। চলো, রুমে যাই।”
ইনায়া ধীর কণ্ঠে মাথা নেড়ে বলল,না… আমি বেবির কাছেই যাব। কথাটা শুনে ইউভির ঠোঁটের হাসিটা মিলিয়ে গেল।ভ্রু দুটো সামান্য কুঁচকে উঠল।
এক মুহূর্তও আর সময় নষ্ট করল না সে।ধীরে ধীরে ইনায়ার সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর কোনো রকম পূর্বাভাস ছাড়াই এক হাত তার পিঠে, আরেক হাত হাঁটুর নিচে রেখে অনায়াসে তাকে কাঁধে তুলে নিল
সবাই দেখছে… নামান আমাকে!”— লজ্জায় কেঁপে উঠল ইনায়ার কণ্ঠ।কিন্তু ইউভি যেন কিছুই শুনল না।তার দৃঢ় বাহুর ওপর নিশ্চিন্তে ভর করে ছিল ইনায়া।মেয়েটির কোমর ছাড়িয়ে নেমে আসা নরম, ঘন চুলগুলো ঝরে পড়ল ইউভির প্রশস্ত পিঠজুড়ে, যেন রেশমের ঢেউ।লজ্জায় ইনায়া আলতো করে ইউভির কাঁধ আঁকড়ে ধরল। মাঝে মাঝে আস্তে করে নামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও ইউভির পদক্ষেপে কোনো পরিবর্তন এল না।
অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, নিজের আদরের মানুষটিকে কাঁধে নিয়েই সে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে চলল।রুমে ঢুকেই ইউভি কোনো রকম ভূমিকা না করেই আলতো জোরে ইনায়াকে বিছানার ওপর ফেলে দিল।হঠাৎ এমন কাণ্ডে ইনায়া মৃদু চিৎকার করে উঠে ভ্রু কুঁচকে বলল,
— “বালের শেহজাদা! একদিন না একদিন আপনাকে আমি মেরেই ফেলব!”ইউভি কোনো উত্তর দিল না।বরং বিরক্তির ভান করে গলার টাই খুলে পাশের সোফায় ছুড়ে রাখল। তারপর কোটটাও খুলে চেয়ারের পিঠে রেখে দিল। সারাদিনের ব্যস্ততায় কাঁধ দুটো যেন ভারে নুয়ে এসেছে।ধীরে ধীরে শার্টের ওপরের দু-একটি বোতাম খুলে গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলল সে।
ক্লান্ত কণ্ঠে বলল,
— “বড্ড ক্লান্ত লাগছে, বউ… একটু বুকে আয়।
ইনায়ার উঠতে একটু দেরি হতেই ইউভি নিজেই এগিয়ে গেল।এক টানে তাকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে দু’হাতে জড়িয়ে ধরল।তারপর আর কোনো কথা না বলে মাথাটা আলতো করে ইনায়ার বুকের কাছে রেখে চোখ দুটো বন্ধ করে দিল।মনে হলো, পৃথিবীর সব ক্লান্তির শেষ আশ্রয় যেন এটাই।
কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকার পর ভাঙা, কর্কশ কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
— “প্লিজ আদর .. এখন বলো না, কষ্ট হচ্ছে। আমাকে একটু এভাবেই থাকতে দাও। গত কয়েক দিন ধরে তোমার সঙ্গে ঠিকমতো সময়ই কাটাতে পারিনি। শুধু আজকের মিটিংটা শেষ হওয়ার অপেক্ষায় ছিলাম। ইনায়ার সমস্ত অভিমান যেন মুহূর্তেই গলে গেল।মুখে বিরক্তির ভাব ধরে রাখলেও চোখে নেমে এলো অদ্ভুত এক কোমলতা।
সে ধীরে ধীরে ইউভির চুলে আঙুল চালিয়ে দিতে লাগল।মাথায় স্নেহভরা হাত বুলিয়ে মৃদু হেসে বলল,
— “এই যে আপনি… বাইরে পরিবার, বন্ধু অফিস—সব জায়গায় এত গম্ভীর, এত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হয়ে থাকেন। সবাই আপনাকে দেখে ভয় পায়, সম্মান করে। আর আমার কাছে এলেই একদম ছোট্ট বাচ্চা হয়ে যান। শুধু আবদার আর আবদার। একটু থেমে দুষ্টু হেসে আবার বলল,
— “বাইরের মানুষগুলো যদি আপনাকে এখন এভাবে দেখত, তাহলে কী বলত জানেন?”ইউভি চোখ না খুলেই ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে ইনায়াকে আরও একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
নরম, শান্ত কণ্ঠে বলল,বলুক না… তাতে আমার কিছু যায়-আসে না। তারপর ধীরে ধীরে মুখ তুলে ইনায়ার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো
— “এই আমিটা শুধু তোমার জন্য, বউ। বাইরের পৃথিবী যে ইউভিকে চেনে, সে তাদের জন্য। কিন্তু যে মানুষটা তোমার সামনে নিজের সব ক্লান্তি, সব দুর্বলতা আর সব অনুভূতি নিঃসংকোচে রেখে দেয়… সে শুধু তোমার। তোমার কাছেই আমি নির্ভার হতে পারি। তোমার কাছেই আমি কোনো মুখোশ ছাড়া, একদম নিজের মতো করে বাঁচতে পারি।”
কথাগুলো শুনে ইনায়ার ঠোঁটে ধীরে ধীরে এক অপার মায়াভরা হাসি ফুটে উঠল।সে আর কিছু বলল না।শুধু আলতো করে ইউভির কপালে হাত রেখে চুলগুলো এলোমেলো করে দিতে লাগল।
সারাদিনের ক্লান্তি, ব্যস্ততা আর দায়িত্বের ভার যেন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল সেই নীরব, নিশ্চিন্ত মুহূর্তের উষ্ণতায়।কথা বলতে বলতে কখন যে ইউভির চোখ দুটো ভারী হয়ে এসেছিল, সে নিজেও বুঝতে পারেনি।একসময় ক্লান্ত শরীর আর মস্তিষ্কের সমস্ত অবসাদ যেন তাকে হার মানিয়ে দিল।
ইনায়ার কোমর আলতো করে জড়িয়ে ধরেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল সে।ইনায়া প্রথমে কয়েকবার নিচের দিকে তাকিয়ে নিশ্চিত হলো— মানুষটা সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছে।মৃদু হেসে খুব আস্তে করে তার কপালের ওপর ঝুলে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিল।
ডাকার কথা একবার মনে হলেও পরক্ষণেই সেই ইচ্ছেটা বদলে গেল।তারপর অত্যন্ত স্নেহে ইউভির চুলে আঙুল চালিয়ে দিতে লাগল। মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে,।এভাবেই বেশ কিছু সময় কেটে গেল।এক ভঙ্গিতে বসে থাকতে থাকতে ইনায়ার পিঠে হালকা ব্যথা অনুভব হলো।তবুও সে একবারের জন্যও ইউভিকে সরানোর চেষ্টা করল না।ধীরে ধীরে শরীরটা একটু নড়িয়ে খাটের হেডবোর্ডে হেলান দিল। পিঠের নিচে একটি নরম বালিশ গুঁজে নিয়ে নিজেকে একটু আরামদায়ক করে বসল।ইউভি একইভাবে তার কোমর জড়িয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে রইল।
মনে হচ্ছে এই বুকটাই যেন তার পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।সময় গড়িয়ে রাত প্রায় দুইটা বাজতে চলল।ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে ভেসে এল রেশমা চৌধুরীর পরিচিত কণ্ঠ।
— “কিরে তোরা, দুটো খাবি না নাকি? দরজাটা আধখোলা দেখেই তিনি কোনো দ্বিধা না করে ভেতরে ঢুকে পড়লেন।কিন্তু ভেতরের দৃশ্যটা চোখে পড়তেই তাঁর পা যেন সেখানেই থেমে গেল।
কয়েক মুহূর্ত তিনি নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলেন।চোখের সামনে যে দৃশ্যটি ধরা দিল, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।ইউভি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে ইনায়াকে জড়িয়ে।আর ইনায়া…
নিজের চোখে ঘুম, শরীরে ক্লান্তি, তবুও একটানা ইউভির মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। নিজের অস্বস্তির কথা একবারও ভাবছে না। শুধু এই ভয়েই মানুষটাকে ডাকলে যদি তার ঘুম ভেঙে যায়!দৃশ্যটা দেখে রেশমা চৌধুরীর চোখের কোণে অজান্তেই জল চিকচিক করে উঠল।মনের ভেতর নিঃশব্দে উচ্চারণ করলেন—
“আলহামদুলিল্লাহ… এর চেয়ে বড় শান্তি আর কী হতে পারে? আমার ছেলেটার যত্ন নেওয়ার জন্য আল্লাহ আমি ব্যাতিত আর একজন মানুষকে পাঠিয়েছেন, যে নিজের কষ্ট ভুলে ওর আরামটাকেই গুরুত্ব দিচ্ছে। ধীরে ধীরে তিনি আরও কয়েক পা এগিয়ে এলেন।হালকা শব্দ পেয়ে ইনায়া মুখ তুলে তাকাতেই রেশমা চৌধুরী ঠোঁটে আঙুল রেখে ইশারা করলেন … ওকে ডাকিস না। এভাবেই ঘুমাক। ইনায়া মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
রেশমা চৌধুরী তার সামনে এসে স্নেহভরে ইনায়ার কপালে একটি চুমু এঁকে দিলেন।নরম কণ্ঠে বললেন,এইভাবেই আমার পাগল ছেলেটার যত্ন নিস, নূর। ও যে তোকে ভীষণ ভালোবাসে, মা।”
কথাগুলো শুনে ইনায়ার চোখও ভিজে উঠল।
সে শুধু নিঃশব্দে হাসল।এরপর রেশমা চৌধুরী আলতো করে ইউভির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
ঘুমন্ত ছেলের মুখটার দিকে মায়াভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন,আল্লাহ তোদের দু’জনকে সব সময় এভাবেই সুখে রাখুন।”
তারপর ইনায়ার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
আমি তোদের খাবার রুমে রেখে যাচ্ছি। ওর ঘুম ভাঙলে দু’জনে একসঙ্গে খেয়ে নিস, ঠিক আছে?”
ইনায়া আস্তে করে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
শেহেজাদার আদর পর্ব ৭৪
রেশমা চৌধুরী ধীর পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।দরজার কাছে গিয়েও আরেকবার ফিরে তাকালেন।ঘুমন্ত ছেলের মুখ আর তাকে আগলে বসে থাকা নিজের পুত্রবধূকে একসঙ্গে দেখে তাঁর ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির এক নির্মল হাসি ফুটে উঠল।
মায়াভরা সেই দৃশ্যটি হৃদয়ে গেঁথে নিয়ে তিনি নিঃশব্দে দরজাটা টেনে বাইরে বেরিয়ে গেলেন।
