Home শেহেজাদার আদর শেহেজাদার আদর পর্ব ৭৪

শেহেজাদার আদর পর্ব ৭৪

শেহেজাদার আদর পর্ব ৭৪
সুমাইয়া ইসলাম নূর

গভীর রাতের সমস্ত উন্মাদনা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেছে। পূর্ব আকাশে ফজরের আগমনী আভা ফুটতে শুরু করেছে। চারপাশে ভেসে আসছে মসজিদ থেকে আজানের সুমধুর ধ্বনি। সেই পবিত্র সুর যেন রাতের সমস্ত ক্লান্তিকে ধুয়ে দিয়ে নতুন এক প্রশান্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে।
অনেক আগেই ইউভি জিমরুম থেকে নিজের আদরের স্ত্রীকে কোলে করে তাদের রুমে ফিরিয়ে এনেছে। সারারাতের ব্যস্ততার পরও তার চোখেমুখে একটুও বিরক্তি নেই। বরং নিজের প্রিয়তমাকে বুকের মাঝে আগলে রাখার এক অদ্ভুত প্রশান্তি ছড়িয়ে আছে তার পুরো অস্তিত্বজুড়ে। ইউভি ফ্রেশ হয়ে এসে তারপর আলতো করে ইনায়ার কপালে চুমু এঁকে বলল,

— “এবার ফ্রেশ হয়ে এসো, বউ। ইউভি রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পর ইনায়া বাথরোব পরে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো।দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইউভি মুগ্ধ চোখে তার প্রিয়তমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে মৃদু হেসে বলল,
— “বড্ড বেশি মায়াবতী তুমি, বউ। এতটা মায়াবতী বলেই হয়তো তোমার উপর দিয়ে এত ঝড় বয়ে যাই। এই বলে ওয়ারড্রোব খুলে একটি নরম সাদা টি-শার্ট আর কালো জিন্স বের করে ইনায়ার হাতে দিল।”রেডি হয়ে নাও। এরপর নিজেও একটি ফুলহাতা টি-শার্ট পরে নিল।ইনায়া অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলল,গরম লাগছে না তোমার?”
ইউভি ধীরে ধীরে তার একেবারে কাছে এসে নিচু, ভারী কণ্ঠে বলল,নো মিসেস চৌধুরী তোমার রাখা কিছু ব্যক্তিগত স্মৃতি আমি কাউকে দেখতে দিতে চাই না।”
ইনায়া ভ্রু কুঁচকে বলল,

— “মানে? ইউভি কোনো উত্তর না দিয়ে ধীরে ধীরে নিজের টি-শার্টের গলার অংশটা একটু সরিয়ে দিল।
ইনায়া তাকিয়ে হঠাৎ থমকে গেল।তার বুকের ওপর কয়েকটি আঁচড়ের দাগ স্পষ্ট হয়ে আছে।ইনায়ার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে সেই দাগগুলোর ওপর আলতো করে হাত রাখল। কণ্ঠটা কেঁপে উঠল। আমি বুঝতে পারি নি বর।
ইউভি মুচকি হেসে তার হাতটা নিজের হাতের মধ্যে
হঠাৎ যেন ইউভির কিছু একটা মনে পড়ল। মুচকি হেসে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,”চলো, খেতে হবে। ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে বলল,আর খিদে নেই। ইউভি ভ্রু তুলে দুষ্টু হেসে বলল,সত্যি কথা বলছ, বউ? এত আদর খাওয়ার পর আর খিদে থাকে নাকি! কথাটা বলেই এক ঝটকায় ইনায়াকে কোলে তুলে নিল সে।
— “ইস! ভাবছি, এখন থেকে রোজ এভাবেই আদর করব। তাহলে তোমার জন্য বরাদ্দ করা চালটা বেঁচে যাবে। সেই টাকা জমিয়ে আমরা গার্ডেনে আর একটা জিম বানাব। কী বলো?
রাগে গজগজ করতে করতে ইনায়া ইউভির বুকে কিল-ঘুষি মারতে লাগল।খাব না আমি! নামাও নিচে! “বড্ড অসভ্য তুমি!”

কিন্তু ইউভি তার কোনো কথাই শুনল না। কোলে করেই সোজা কিচেনে নিয়ে এলো।এরপর কিচেনের একপাশে রাখা এপ্রোনটা পরে নিয়ে। নিজের প্রিয়তমার জন্য রান্না করতে শুরু করল। ইনায়ার জন্য গরম গরম নুডলস, চিজ অমলেট আর তাজা ফল কেটে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখল। আর নিজের জন্য তৈরি করল সেদ্ধ চিকেন ব্রেস্ট, সেদ্ধ ডিম, ওটস আর এক গ্লাস প্রোটিন শেক।সব রান্না শেষ করে ইউভি সুন্দর করে খাবারগুলো ডাইনিং টেবিলে সাজিয়ে রাখল।ঠিক সেই সময় ফজরের নামাজ আদায় করার জন্য করিডোর দিয়ে নামাজের রুমের দিকে যাচ্ছিলেন রেশমা চৌধুরী। হঠাৎ কিচেনে আলো জ্বলতে দেখে কৌতূহলী হয়ে সেদিকে এগিয়ে গেলেন।
উঁকি দিতেই চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
আরও কয়েক পা এগিয়ে যেতেই নিজের ছেলের কাণ্ডকারখানা দেখে তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।ইউভি নিজের হাতে অত্যন্ত যত্ন করে ইনায়াকে খাইয়ে দিচ্ছে। প্রতিটি লোকমায় যেন মিশে আছে অফুরন্ত ভালোবাসা।
রেশমা চৌধুরী মনে মনে বললেন,”এর থেকে সুন্দর দৃশ্য আর কী হতে পারে! আমার ছেলেটা কতটা সুখে আছে! ইশশ নজর না লাগুক।
হঠাৎই তার চোখ পড়ল ইউভি আর ইনায়ার ভেজা চুলের দিকে।তিনি নিজের মনেই বিড়বিড় করে বললেন, “ইস… এখন কী করি! ওদের কাছে যাব, না-ই যাই?”ঠিক তখনই দূর থেকেই ইউভির চোখ পড়ল তার মায়ের ওপর।মুচকি হেসে ডাক দিল,

— “মম!”
রেশমা চৌধুরী মাথা নেড়ে হেসে বললেন,
—”শুরু হয়ে গেছে তোর শয়তানি!”রেশমা চৌধুরী মুচকি হেসে ।মনে মনে বললেন,”বাপের মতোই হয়েছে ছেলে একটা!— কীরে, দুটো রাতে খাওয়া-দাওয়া করিসনি নাকি? আর এখন এই ফজরের সময় চুপিচুপি কী করছিস? আমাকে ডাকলেই তো হতো, ইউভি!রেসমা চৌধুরীর তিনি একবার ইনায়ার দিকে, একবার ইউভির দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল সত্যি করে বল তো, রাতে তোরা দুজন খেয়েছিস? তোদের কাণ্ডকারখানা যে কিছুই বুঝি না! সারারাত কী করিস, আল্লাহই জানে!ইউভি মুচকি হেসে পাশ ফিরে ইনায়ার দিকে তাকাল। তার চোখের কোণে তখন এক দুষ্টু ঝিলিক, যা দেখেই ইনায়ার বুকের ভেতর অকারণে অশনি সংকেত বেজে উঠল
কী আর করব, মম? আমাদের পৃথিবীটা আরেকটু বড় করার পরিকল্পনা করছিলম আর কী রেসমা চৌধুরী কপাল কুঁচকে তাকিয়ে বললো পৃথিবী বড় করার পরিকল্পনা?
ইউভি অত্যন্ত গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল।

— হ্যাঁ। তোমাদেরও তো বয়স হচ্ছে। এই বয়সে একটু দৌড়ঝাঁপ করা দরকার। সারাদিন বসে থাকলে শরীর খারাপ হয়ে যাবে। তাই ভাবলাম, তোমাদের জন্য একজন পার্টনার নিয়ে আসার পরিকল্পনা করি। তার পেছনে পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতেই তোমাদের শরীরচর্চা হয়ে যাবে। তোমাদের কষ্ট আমি সহ্য করতে পারি না, বুঝলে?
রেসমা চৌধুরী কয়েক সেকেন্ড ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন তারপর চোখ দুটো সরু হয়ে এল।
এই, তুই আসলে কী বলতে চাস? ঝেড়ে কাশ তো ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে চোখের ইশারায় ইউভিকে সতর্ক করল— আর একটা শব্দ বললে এখানেই শেষ করে দেব কিন্তু ইউভি সেই সতর্কবার্তাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে অত্যন্ত নিরীহ মুখে বলল,
, বেশি কিছু তো করিনি, মম। শুধু আমার ইচ্ছেকে তোমাদের মাঝে নিয়ে আসার একটা পরিকল্পনা করছি। ভালো হবে না বলো ইনায়া এবার অবাক হয়ে রেসমা চৌধুরীর দিকে তাকাল।

— ইচ্ছে মানে?
ইউভি যেন এতক্ষণ এই প্রশ্নটিরই অপেক্ষায় ছিল। মুখে খাবারের এক লোকমা তুলে নিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল আমার মেয়ে। ইচ্ছে চৌধুরী। আমার প্রিন্সেসের কথা বলছি।
রেসমা চৌধুরী প্রথমে কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর তাঁর মুখে ধীরে ধীরে বিস্ময় মেশানো আনন্দ ফুটে উঠল।
— ইউভি পরক্ষণেই তিনি ছেলের কপালে স্নেহভরা চুমু এঁকে বললেন এটা তো খুব ভালো পরিকল্পনা! এই প্রথম জীবনে তোর কোনো পরিকল্পনা শুনে আমার ভালো লাগল ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড় বড় করে ইউভির দিকে তাকাল।
রেসমা চৌধুরী উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আমি যাই। ওযু করতে হবে। নামাজ এর সময় তো চলে গেল! তোরা খাবারটা খেয়ে নে।দরজার কাছে গিয়ে আবার হঠাৎ থেমে পেছন ফিরে ছেলের দিকে তাকালেন।

— হ্যাঁ রে ইউভি, একটু তাড়াতাড়ি করিস বাবা এই বলে তিনি চলে গেলেন।ইনায়া কয়েক মুহূর্ত দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে ইউভির দিকে তাকাল।সে রাগে ইউভির দিকে এগিয়ে এসে দাঁত কিড়মিড় করে বললো— লজ্জা করল না আপনার? বড় মাকে এসব বলতে! আমাকে বললেন ঠিক আছে, কিন্তু বড় মাকে? ছিঃ! নির্লজ্জ একটা মানুষ!ইউভি বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। বরং অত্যন্ত শান্তভাবে খাবারের এক লোকমা তুলে ইনায়ার মুখের সামনে ধরে মৃদু হেসে বলল,
— আগে খেয়ে নাও, আদর। অনেক ধকল গেছে তোমার ওপর দিয়ে ইনায়া তার দিকে তাকিয়ে লোকমাটার দিকে তাকাল। তারপর আবার ইউভির দিকে তাকিয়ে বললো
এই যে, ইচ্ছে আমাদের মেয়ে—মানে কী? আমি কিছুই বুঝলাম না ইউভি মুচকি হেসে তার কপালে আলতো করে ভালোবাসার পরশ একে দিল। আমাদের মেয়ে, ‘#অ্যাভিয়ানা_ইচ্ছে_চৌধুরী’। আমার রাজকন্যা। তার কথাই বলছিলাম, আদর।ইনায়ার চোখ মুহূর্তেই বড় হয়ে গেল। আপনি… আমাদের মেয়ের নামও ঠিক করে ফেলেছেন?
ইউভি এবার আরও কাছে ঝুঁকে নরম গলায় বলল,

— আমার ইচ্ছেকে আমাদের মাঝে এনে দেবে? লজ্জায় ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু করে ফেলল। তার গাল দুটো যেন আরও লাল হয়ে উঠলো খুব আস্তে, প্রায় ফিসফিস করে বলল সব কিছু ঠিক করে ফেলা হয়েছে দেখছি…
ইউভির ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে বিজয়ী হাসি ফুটে উঠল।সব তো অনেক আগেই ঠিক করা, আদর। এখন শুধু আমার রাজকন্যাটাকে পৃথিবীতে আনার জন্য একটু তাড়াতাড়ি করতে হবে।
ঠিক তখনই নামাজ আদায় করার জন্য নিজের রুম থেকে বেরিয়ে এলেন লিখন চৌধুরী। রেশমা চৌধুরীর মুখের হাসি দেখে ভ্রু তুলে বললেন,
— “হাসছো কেন?”রেশমা চৌধুরী মুচকি হেসে একটু আগে কিচেনে দেখা পুরো ঘটনাটা খুলে বললেন। ছেলের কাণ্ডকারখানার কথা শুনে লিখন চৌধুরীও হো হো করে হেসে উঠলেন।হাসতে হাসতেই বললেন,
— “তা বলো তো, আমার ইচ্ছে দাদুভাই কবে আসবে?”কথাটা শুনেই রেশমা চৌধুরী আলতো করে লিখন চৌধুরীর কাঁধে একটা চাপড় দিয়ে লাজুক হেসে বললেন,চলুন তো! সময় হলে এমনিতেই চলে আসবে।দুজনের মুখেই তখন তৃপ্তির হাসি। একসঙ্গে ধীর পায়ে নামাজের রুমের দিকে এগিয়ে গেলেন।

ভোর পেরিয়ে ধীরে ধীরে সকাল নেমে এসেছে। জানালার ফাঁক গলে সোনালি রোদের কোমল আলো ছড়িয়ে পড়েছে পুরো ঘরে। বাইরে পাখিদের কিচিরমিচিরে মুখর হয়ে উঠেছে চৌধুরী ভিলা।
অন্যদিকে, ইনায়া তখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
ইউভি বিছানার একপাশে বসে আছে। সামনে খোলা ল্যাপটপ। এক হাতে দ্রুত IVA গ্রুপের জরুরি ফাইলগুলো দেখছে, একের পর এক মেইলের রিপ্লাই দিচ্ছে। সারারাত একফোঁটাও ঘুমায়নি সে। তবুও তার চোখে ক্লান্তির চেয়ে বেশি ছিল প্রশান্তি।
কাজের ফাঁকেই অন্য হাতটা বাড়িয়ে আলতো করে ইনায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। কখনো এলোমেলো চুলগুলো কানের পাশে সরিয়ে দিচ্ছে, আবার কখনো মুগ্ধ হয়ে ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসছে।
ঠিক তখনই ইউভির ফোনটা বেজে উঠল।
কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে রেদোয়ানের কণ্ঠ ভেসে এলো,ভাইয়া, আমি অফিস চলে যাচ্ছি। তুমি একটু পরে আসো।।ইউভি মুচকি হেসে উত্তর দিল,
— “ওকে, ব্রো। কল কেটে দিয়ে আবারও একবার ঘুমন্ত ইনায়ার দিকে তাকাল সে। তারপর ধীরে ধীরে ল্যাপটপ বন্ধ করে অফিসের জন্য তৈরি হতে চলে গেল।

এদিকে নিচতলার বিশাল ডাইনিং হলে সকাল থেকেই ব্যস্ততা।অফিসে যাওয়ার তাড়া থাকায় লিখন চৌধুরী, রাতিব চৌধুরী আর রবিউল চৌধুরী দ্রুত নাস্তা শেষ করছেন।ওদিকে আয়াত আর আতিকা স্কুলে যাওয়ার জন্য ইউনিফর্ম পরে দৌড়াদৌড়ি করছে।নুসরাত চৌধুরী চারদিকে তাকিয়ে বললেন,রিদ কোথায়? ছেলেটাকে তো কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না! এদিকে পিয়াসা তখনও ঘুমিয়ে আছে।রিমঝিম চৌধুরীর খাবার অনেক আগেই তার রুমে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই সময়টাতে বেশি সিঁড়ি ওঠানামা করাটা লিখন চৌধুরী একদমই ভালো চোখে দেখছেন না। তাই তিনি আগেই নির্দেশ দিয়েছেন, রিমঝিমের প্রয়োজনীয় সবকিছু যেন ওপরেই পৌঁছে দেওয়া হয়। কারণ এই সময়ে তারা কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে চান না।
ঠিক তখনই রাতিব চৌধুরীর ফোন বেজে উঠল।
ফোন রিসিভ করতেই ওপাশের কথা শুনে তিনি হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন,কী! আই অ্যাম রিয়েলি সরি, বন্ধু। আমার ছেলের হয়ে আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি। আমি নিজেই ওকে জিজ্ঞেস করব, ও এমনটা কেন করল!”ফোন কেটে দিয়েই তিনি প্রায় চিৎকার করে উঠলেন,”রিদ! কোথায় তুই? রিদ…!”
এই বলে তাড়াহুড়ো করে গার্ডেনের দিকে চলে গেলেন।বাড়ির অন্য সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
কী হয়েছে জানতে চাইলে তিনি শুধু বললেন,

— “পরে বলছি। ঠিক সেই সময় ইউভি অফিসের জন্য পুরোপুরি তৈরি হয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো।রাতিব চৌধুরীর চিৎকার শুনে ভ্রু কুঁচকে বলল,কী হয়েছে, চাচ্চু? চিৎকার করছেন কেন?
নুসরাত চৌধুরী মাথা নেড়ে বললেন,জানি না রে বাবা, কী করেছে আবার! তারপর ইউভির দিকে তাকিয়ে বললেন,নূর খাবে না? আজ তো ওদের ক্লাসও নেই।ইউভি মৃদু হেসে বলল তুমি চিন্তা কোরো না, মেজো মা। তোমার নূর খেয়েছে। আর আজ বোনু আর আদর কোথাও যাবে না। ওরা ঘুমাচ্ছে। প্লিজ, ওদের ডেকো না। রেশমা চৌধুরীও সঙ্গে সঙ্গে বললেন হ্যাঁ রে মেজো, ডাকিস না। মেয়ে দুটোরই একটু বিশ্রাম দরকার।
লিখন চৌধুরী গভির দৃষ্টিতে রেশমা চৌধুরীর দিকে তাকাতেই তিনি দ্রুত কথাটা ঘুরিয়ে বললেন,
মানে… ক্লাস, বিজনেস, মিটিং—সবকিছু সামলাতে সামলাতে ওরা খুব ক্লান্ত হয়ে গেছে। একটু ঘুমাক।”
ইউভি হালকা হেসে নিজের ঘড়িটার দিকে একবার তাকিয়ে বলল,আমি যাচ্ছি, বাবা। তোমরা আসো। মিটিংয়ের সবকিছু আমি আর রেদোয়ান রেডি করে রাখব।
কথাটা বলেই সবার উদ্দেশে মাথা নেড়ে চৌধুরী ভিলা থেকে বেরিয়ে গেল ইউভি। রিদকে গার্ডেনে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ইউভি ধীর পায়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমিভরা এক চিলতে হাসি টেনে বলল “কী হয়েছে, শ্বশুর আব্বা?

কথাটা শুনেই পাশ থেকে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে এগিয়ে এলেন রাতিব চৌধুরী।“শাসন করো, ইউভি, একে! ওর কত বড় সাহস! পুলিশের অফিসারের মেয়েকে একেবারে পাঁচটা থাপ্পড় মেরেছে! শুধু চৌধুরী বাড়ির ছেলে বলেই ওরা কিছু বলেনি। নইলে আজ আমার মান-সম্মান সব শেষ হয়ে যেত। লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে গেছে!”
কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে বিরক্ত মুখে ভিলার ভেতরে ঢুকে গেলেন রাতিব চৌধুরী।রাতিব চৌধুরী চোখের আড়াল হতেই ইউভি ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে রাখল। তারপর একটু ঝুঁকে রিদের কানের কাছে ফিসফিস করে বলল পাঁচটা দিয়েছিস নাকি, ছোট নবাব?”
রিদ একদম নির্লিপ্ত মুখে উত্তর দিল “হ্যাঁ, দিয়েছি। তবে হাবুডুবু তো খেল না, বড় নবাব।”ইউভি আর হাসি আটকে রাখতে পারল না। মুচকি হেসে মাথা নেড়ে বলল—

— “তোরটা মনে হয় সাঁতার জানে।”
রিদের মুখটা মুহূর্তেই কাঁদো কাঁদো হয়ে গেল।
আমার তাহলে কী হবে? টুকটুকি এখন তো আমাকে দেখতেই পারে না!”ইউভি আলতো করে রিদের কান থেকে হাত নামিয়ে দিল। তারপর গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল—চৌধুরী বাড়ির ছেলেদের সম্মান রাখলি না।”
রিদ হতভম্ব হয়ে চোখ বড় বড় করে বলল কী করলে ভালো হতো?
ইউভি দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা ঝাঁকাল।
— “কমপক্ষে একটা থাপ্পড় বেশি মারতে পারতি! এখন মেয়েটা তোকে দেখলেই রাস্তা বদলাবে। প্রেম করার আগেই নিজেই সব নষ্ট করে ফেললি, ছোট নবাব! চৌধুরী বাড়ির ছেলে হয়ে এতো কিপ্টামি করলে চলে নেক্সট টাইম থেকে একটা বেশি দিবি
রিদ অসহায়ের মতো মুখ করে বিড়বিড় করে বলল—
— “আহারে আমার টুকটুকি…

এদিকে চৌধুরী ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যান্ড কোম্পানির হেড অফিসে সকাল থেকেই ব্যস্ততা তুঙ্গে।
পুরো কনফারেন্স ফ্লোর জুড়ে কর্মীদের ছোটাছুটি। কেউ প্রেজেন্টেশনের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নিচ্ছে, কেউ গুরুত্বপূর্ণ ফাইল সাজিয়ে রাখছে, আবার কেউ বিদেশি ক্লায়েন্টদের সঙ্গে অনলাইন সংযোগ নিশ্চিত করতে ব্যস্ত।
কনফারেন্স রুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ইউভি একের পর এক ফাইল যাচাই করছে। তার সামনে বড় স্ক্রিনে আজকের মিটিংয়ের সম্পূর্ণ প্রেজেন্টেশন ভেসে আছে। কোথাও সামান্য ভুলও যেন না থাকে, সেদিকে তার তীক্ষ্ণ নজর।অন্যদিকে রেদোয়ান ফাইন্যান্স টিমের সঙ্গে বসে শেষবারের মতো প্রজেক্টের বাজেট, ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট আর ভবিষ্যৎ এক্সপ্যানশন প্ল্যান মিলিয়ে দেখছে। মাঝেমধ্যে দুজন একে অপরের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করছে। কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সবকিছু নিখুঁতভাবে যাচাই করে তবেই চূড়ান্ত অনুমোদন দিচ্ছে।
মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিশাল কনফারেন্স রুমটি সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে গেল।ঠিক তখনই ইউভির ফোনটা বেজে উঠল।স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটি নাম
“মামাতো ব্রো
ইউভি মুচকি হেসে কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে রাজ্যের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো,”বিকেলে তুবাদের বাড়ি যাব।”ইউভি ভ্রু কুঁচকে বলল,

শেহেজাদার আদর পর্ব ৭৩ (২)

— “হঠাৎ?”
রাজ্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,তুবা আমার সঙ্গে দুই দিন ধরে একটা কথাও বলছে না, ব্রো।কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে আবার দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
খুব দ্রুত ওকে বিয়ে করব আমি। তুই আর রেদোয়ান আমার সঙ্গে যাবি। ইউভির ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।রাজ্য এবার এক নিঃশ্বাসে বলে গেল,আমাকে ইগনোর করা! এক দিনের মধ্যে যদি ওই পাঁচ ফুট সাইজের পিচ্চিটাকে বিয়ে না করি… তাহলে আমার নামও রাজ্য নয়! কথাটা শুনে ইউভি হেসে ফেলল।পাশে বসে থাকা রেদোয়ান অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল,কী হয়েছে, ভাইয়া?”
ইউভি হেসেই ফোনটা স্পিকারে দিয়ে বলল,
— “শোন, তোর মামাতো ভাইয়ের নতুন ঘোষণা!

শেহেজাদার আদর পর্ব ৭৫