লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৩৫
নুসাইবা আরা নুরি
ফাহিম দের আসতে এখোনো একটু দেরি হবে তাই মেহেরাজ আর দেরি না করে নিশাদ কে নিয়ে চলে আসে এক তিন তলা বাড়ির সামনে।বাড়ির গেটে স্পষ্ট করে নেমপ্লেটে লেখা সুখ নিবাস।মেহেরাজ বাড়ির গ্যারেজ এ বাইক পার্ক করে।শ্রেয়সীর হাত ধরে বাড়ির ভিতরে চলে যায়।
শ্রেয়সী এখোনো যানে না মেহেরাজ কোথায় নিয়ে এসেছে তাকে আর কেনই বা নিয়ে এসেছে।তবে নিশাদ নামের লোকটার সাথে কথা বলার সময় যতটুকু শুনে শ্রেয়সী বুজতে পেরেছে আজ কারোর বিয়ে তবে মেহেরাজকে কোনো প্রশ্ন করেনি।কারন মেহেরাজ এক কথার মানুষ কথার নড়চড় হয় না।বলবেই না।
সিড়ি বেয়ে তিন তলায় চলে যায় সকলে।তিন তলায় একটা ফ্লাট।মেহেরাজ দরজার সামনে গিয়ে কলিং বেল চাপতেই তোহা এসে দরজা খুলে দেয়।তোহার হাতে পানি লেগে আছে রান্না ঘরে নাস্তা বানাচ্ছে সবার জন্য।দরজা খুলতেই তোহাকে দেখে শ্রেয়সী অবাক হয়ে যায়।এখানে তার ভাবি কি করছে।শ্রেয়সী বড় বড় চোখ করে তার দিকে অবাক হওয়া দেখে তোহা হেসে বলে,
-কিগো ননদিনী আমাকে দেখে হা হয়ে গেল্র কেন।হা হবে তো আমাদের মেহু কে দেখে।
বলেই হাসলো তোহা।তা দেখে মেহেরাজ মিষ্টির ব্যাগটা তোহার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
-নে ধর দেখে নে সব ঠিক আছে কিনা।আমি কিন্তু আর বাইরে যাইতে পারমু না।
-আচ্ছা যেতে হবে না ভিতরে আই।এই নিশু তুই দাঁড়িয়ে আছিস কেন ভেতরে আই।ননদিনী তুমিও আসো।
সবাই ভেতরে ঢুকে।তবে শ্রেয়সী এখোনো তোহাকে দেখছে তা দেখে তোহা বলে,
-কি হয়েছে ননদিনী??
-ভাবি তুমি এখানে??
শ্রেয়সীর কথায় তোহা হাসে তারপর মেহেরাজের দিকে আড়চোখে তাকায়।মেহেরাজ চোখের ইশারা দিতেই বলে,
-আমাদের বাড়ি আর আমি থাকবো না।
শ্রেয়সীর মাথায় কিছু ঢুকলো না।তাই আবারো বলল,
-মানে??
-মানে হলো এটা তুহিনের আর ওর বাড়ি।এটা ওদের নিজেদের বাড়ি। আর যেখানে তোমরা গিয়েছো সেটা তোহার এক আত্মিয়র বাড়ি।
মেহেরাজের কথা শুনে শ্রেয়সী অবাক হয়ে যায়।কি থ্বকে কি হচ্ছে।শ্রেয়সী আবার বলে,
– আপনি ভাবিকে চিনেন তুই করে বললেন যে??
শ্রেয়সীর বোকা প্রশ্নে হেসে ফেলল সবাই।তোহা শ্রেয়সীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
-সব বলবো ননদিনী।তুমি বসো শান্ত হয়ে ওদিকে আমার সব পুড়ে গেলো।
তোহা তাড়া দেখিয়ে চলে গেলো রান্না ঘরে।শ্রেয়সী সোফায় বসে পড়েছে মাথাটা কেমন শুন্য শুন্য লাগছে ওর।ওর ভাবি কি বলল এটা ভাবি আর তার ভাইয়ের বাড়ি।আর ওরা যে বাড়িটা জানে ওটা ভাবির আত্মীয় দের বাড়ি।তাহলে ভাবির বাবা মা কোথায়।যদি তারা আত্মিয় হয় তাহলে আসল বাবা মা কোথায়।ভাবি কি মিথ্যা বলে তার ভাইকে বিয়ে করেছে।
শ্রেয়সী মাথা চেপে ধরে হাত দিয়ে।তা দেখে মেহেরাজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
-আপনার টেনশড হওয়ার কোনো কারন নেই।আজ সব খুলে বলবো।আওনার তো আবার মাথা যন্ত্রনার অভ্যাস আছে তাই আপাতত রিলাক্স করুন।একটু পর সারপ্রাইজ পাবেন।
মেহেরাজের কথা শেষ হতেই কলিং বেল বেজে উঠলো।তোহা রান্না ঘর থেকে চিল্লিয়ে নিশাদ কে বলল,
-নিশু দেখ তো কে এসেছে??
নিশাদ ওঠার আগেই শ্রেয়সী উঠে দাড়ালো।সে আসলেই ভাবতে পারছে না কিছু।মাথা যন্ত্রনা শুরু হয় যদি তাহলে আর নিস্তার নেই।তবে মেহেরাজ জানলো কি করে এই কথা।ভাবি বলেছে।হতেও পারে।তোহা চিল্লিয়ে বলল,
-আমি দেখছি ভাবি।
বলে শ্রেয়সী দরজার দিকে এগিয়ে গেলো।মেহেরাজ বাধা দিলো না নিশাদ এর সাথে গল্প শুরু করলো।দরজা খুলতেই শ্রেয়সী দুজন অপরিচিত মানুষ দেখে সালাম দিলো।তারপর তারা ভেতরে প্রবেশ করতেই মেহেরাজ সাহিদা খাতুনকে সালাম দেয়।তোহা রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে সালাম দিয়ে ভালো মন্দ জিজ্ঞাসা করে আবার রান্না ঘরে চলে যায়।
মেহেরাজ সাহিদা খাতুন কে বসতে দেয় সোফায় তারপর মাহির সাথে শ্রেয়সীর পরিচয় করিয়ে দেয়।শ্রেয়সী ও হাসি মুখে পরিচিত হয় মাহি আর সাহিদা খাতুনের সাথে।তোহা এসে সরবত দিয়ে যেতেই আবারো কলিং বেল বেজে উঠে তোহা সবাইকে বসিয়ে দরজা খুলতেই ভিতরে প্রবেশ করে মিলি, ফাহিম,,কাজি,,তুহিন আর ইরু।ইরুর মুখ শুকনো মাথায় ঘোমটা দেওয়া।নিচ থেকেই ফাহিম বকে দিয়েছে সবাইকে সালাম দিতে আর তার মাকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে।ইরু মাথা নাড়িয়েছে শুধু।
তোহা সরে আসতেই সবাই ভিতরে ঢুকে।তোহা ইরুর ঘোমটা সরাতেই শ্রেয়সীর চোখ পড়ে ইরুর উপর।সাথে সাথে আবারো অবাক হয়।ইরু এখানে।ইরুর ও চোখ পড়ে শ্রেয়সীর দিকে।তবে মাথায় কিছু আসেনা।ফাহিমের কথা মতো সাহিদা খাতুনের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে তারপর সবাইকে সালাম দেয়।
তোহার নাস্তা বানানো ও শেষ সবাইকে বসিয়ে নাস্তা আনতে যেতেই মেহেরাজ আটকে দেয়।তারপর কাজির দিকে তাকিয়ে বলে,
-কাজি সাহেব আগে আপনি শুভ কাজটা শুরু করুন।শেষ হলে সবাই নাস্তা করবো।
মেহেরাজের কথায় সবাই এক মত হয়।তোহা আর কথায় বাড়ায় না।তোহাদের ফ্লাটে চারটে বেড রুম।একটা কিচেন আর একটা বিশাল ডাইনিং।প্রতিটা বেড রুমের সাথে এটাস্ট ওয়াশরুম আর বারান্দা আছে ছোট। শ্রেয়সী এতক্ষনে বুজতে পারে আসল কাহিনী।ফাহিম আগে থেকে আনা কাগজ গুলো কাজি সাহেব কে দিতেই উনি দেখে বলে মেয়ের বয়স সতেরো।তখন ফাহিম বলে,
-আপ্নি শুরু করুন।ইরুর থেকে সাড়ে চার মাসের ছোট মেয়ে শ্রেয়সী ওকে বিয়ে দিলাম।আমি আর এখন আমার বিয়েতে সমস্যা। আপনি শুরু করুন আমি সব কাগজ রেডি করা শেষ এখন কবুল বলে সিগ্নেচার করলেই হবে।
কাজির কথার পিঠে ফাহিম কথাটা বলতেই মিলি হেসে বলে,
-কাজি সাহেব তাড়াতাড়ি করুন আমাদের বিয়ে পাগল বন্ধু বউ নিয়ে বসে আছে আর তর সইছে না…
বাকিটা বলার আগেই মেহেরাজ টেরা চোখে তাকালো ওর দিকে ওর কথা আটকে গেলো।এখানে যে গুরুজন আছে মিলি ভুলে গেছিলো আর একটু বাসর এর কথাও বলে ফেলতো।মিলি সবার দিকে একবার তাকিয়ে জোর পুর্বক হাসার চেষ্টা করে।কাজি সাহেব বিয়ে পড়াতে শুরু করে।পাচ লক্ষ টাকা কাবিন রেখে সবাইকে সাক্ষি করে আল্লাহ কে সাক্ষি করে তিন কবুলের মাধ্যমে একে অপরের জিবনে জড়িয়ে পড়ে ফাহিম আর ইরু।বিয়ে শেষ হলে মোনাজাত করে সবাই একই সুরে আলহামদুলিল্লাহ বলে উঠে।
কবুল বলার সময় ইরুর গলা আটকিয়ে আসছিলো।কি থেকে কি হচ্ছে তার জিবনে ভেবে পাচ্ছে না।তখন মায়ের মতন সাহিদা খাতুন ইরুর মাথায় হাত বুলয়ে বুজান।শ্রেয়সী হাতের উপর হাত রেখে ভরসা দেয়।তোহা চোখের পানি ফেলে নতুন জিবনে পদার্পন করে কবুল বলে।তোহা আর মিলি এগিয়ে গিয়ে ডাইনিং টেবিলে সোফায় সবাইকে নাস্তা দেয়।দু হাতে বানিয়েছে সব মিলি আর তোহা।বেশি কিছু না।লুডুস,,সেমাই,,পিঠা,,পায়েস,,সরবত,,আর কয়েক পদের ফল আর মিষ্টি।
তোহাদের একটা রুম সাজানো হয়েছে ফাহিম আর ইরুর জন্য।যদিও ফাহিম নিষেধ করেছিলো তবে মিলি শোনেনি।বিয়ের সময় মেহেরাজ কিনে আনা মালা দুটো ফাহিম আর ইরুর গলায় পরিয়ে দিয়েছিলো।আর বাকি ফুল গুলো সব শ্রেয়সীর।ফাহিম টাকা পরিশোধ করে দিয়ে কাজি বিদায় করে তারপর রিলাক্সে বসে।তোহা নিজের আলমারি থেকে একটা নতুন শাড়ি বের ক্ল্রে আনলে সাহিদা খাতুন তা নেন না। তিনি নতুন কিনে এনেছে তিন্টে ইরুর জন্য তা দিয়ে দেয়।তোহা মিলি মাহি আর শ্রেয়সীকে দায়িত্ব দেয় ইরুকে শাড়ি পরিয়ে আনতে।সাহিদা খাতুন আগেই রেডিমেট সব কিছু কিনে এনেছেন।কাল যখন তার ছেলে বলেছে কথা গুলো তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আর আজ সকাকেই সব কিনেছেন।মেয়েরা একটা ঘরে চলে যায় উরুকে নিয়ে।সাহিদা খাতুন উঠে যায় তোহার সাথে রান্না ঘরে।
বাইরে সোফায় বসে থাকা শুধু ছেলে চারজন।যার মধ্যে তিন জন বিবাহিত এখন আর একমাত্র তুহিন অবিবাহিত।তাই ফাহিম হেসে তুহিন কে বলল,
-তো তুই লেট কেন কবে করবি বিয়ে।দাওয়াত দিস কিন্তু।নিশাদের মতো বিয়ে করে বাচ্চা নিয়ে বলিস না বুয়ে করেছি।
ফাহিম কথাটা ইচ্ছা করে নিশাদকে পিঞ্চ মেরে বলল কারন নিশাদ চুপচাপ।ফাহিমের কথা শুনে নিশাদ হেসে শান্ত কন্ঠে বলল,
-আমি তো আর তোর মতো তুলে নিয়ে আসিনি বিয়ে করবো বলে।পাগলামি করিনি।আমি পরিবার এর মতেই বিয়ে করেছি।যদিও তখন বিয়ের অনুমতি ছিলনা তাই লুকানো ছিলো।
-হুম হইছে দাওয়াত দিসনি তুই ভাই।
তুহিনের কথায় মাথা নাড়িয়ে ফাহিম ও সায় জানালো।তা দেখে মেহেরাজ নিশাদের পক্ষ নিয়ে বলল,
-ও যাই করুক তোদের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে ওর বাচ্চা আছে তোদের তো নেই।তোদের একজনের বাসর হয়নি।আর একজনের বিয়েও হয়নি।তোরা আবার আর একজনরে জালাচ্ছিস।
-তুই চুপ কর।ওর পক্ষ নিস না।
-আমি নিচ্ছি না শুধু মনে করালাম তুই সিংগেল আর ও এক ছেলের বাপ।
কথাটা বলে মেহেরাজ হাসলো।সাথে সবাই।এভাবেই একে অপরের পিছনে লাগতে লাগতে মজা করতে গিয়ে কখন যেনো কেটে গেলো পুরো এক গোধুলি বিকেল।
লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৩৪
মাগরিবের আজান পড়তেই সকলে নামাজ পড়ে আরেক দফা নাস্তার আয়োজন করা হলো।সবাই ডাইনিং টেবিলে বসেছে।ফাহিমের পাশে ইরু বসা।মাথা নিচু লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে যাচ্ছে মেয়েটা।তা দেখে পাশ থেকে মিলি কিছু বলতে যাবে তখনই কলিং বেল বেজে উঠে।তোহা সবাইকে খেতে বলে উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই চোখ বড় বড় হয়ে যায়।খুশিতে আত্মহারা হয়ে বলে,
-তু তুই এখানে???
