দুইজনাতেই পর্ব ৪২
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
কিয়ান দ্বিতীর কন্ঠটা পেয়েই গলা ঝাড়ল। সবেই প্রস্তুত হচ্ছিল এটা বলতে যে, সাক্ষ্য স্যার তার তলব করেছে। এমনকি কলও করতে বলেছে। কিয়ান ঐটুকু বলার প্রস্তুতি নিলেও দ্বিতী ঐ মুহূর্তে আবারও বলল,
“ হ্যালো কিয়ান..”
কিয়ান হাসল মৃদু। অতঃপর হাসি চওড়া করে একবার সাক্ষ্যর দিকে চেয়ে বলল,
“ ভার্সিটিতে আসিসনি কেন দ্বিতী? তোকে তো সাক্…”
যেই না সাক্ষ্যর নামটা নিতে যাবে তখনই সাক্ষ্যর টনক নড়ল বোধহয়। দ্রুতই ওখানে দাঁড়িয়ে কিয়ানের মুখ চেপে ধরল। হুশিয়ারি দিয়ে ধীর অথচ গম্ভীর গলায় বলল,
“ কি বলছিলে? ”
কিয়ান বেচারা মুহূর্তেই মুখ ফসকে বলে ফেলল,
“ আপনি যে কল করতে বললেন তাই.. আর কিছু না। ”
দ্বিতী বোধহয় শুনেও ফেলল কথাটা। সাক্ষ্যর এই পর্যায়ে কিয়ানকে কষিয়ে একটা থাপ্পড় দিতে ইচ্ছে করল। একেই নিজের প্রফেশনাল দিক ভুলে এই প্রশস্ত মাঠের মধ্যে স্টুডেন্টের মুখ চেপে ধরেছে, চড় দিলে নিশ্চয় ভালো দেখাবে না আরো?সাক্ষ্য ফোঁস করে শ্বাস তুলে বলল,
“ তোমায় আমি বলেছি কি কি বলতে হবে? বলার আগেই এত বেশি বলছো কেন?”
কিয়ান এবারে গম্ভীর স্বর শুনে চুপ হয়ে গেল। ফ্যালফ্যাল করে চাইতেই ওপাশ থেকে দ্বিতীর স্বর শোনা গেল,
“ হ্যালো, কে কল করতে বলল কিয়ান? শুনছিস? হ্যালো…”
সাক্ষ্য ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। অতঃপর শিখিয়ে দেওয়া বুলি হিসেবে কিয়ানকে বলল,
“ বলবে, ভার্সিটির এক সিনিয়র ব্রো কল দিতে চাইছিল। ওকে? আর হ্যাঁ, এও বলবে যে এসাইনমেন্ট জমা দিয়ে যেতে হবে। হবে মানে হবেই! ”
কিয়ান চাইল। ওভাবেই দ্বিতীকেও তাই বলল৷ দ্বিতীও শুধাল,
“ আসব না। আমার এসাইমেন্ট গুলো খেয়াকে বলিয়ে জমা দিয়ে দিব। ”
সাক্ষ্য এবারও শিখিয়ে দিল। সে অনুযায়ী কিয়ান আবারও আওড়াল,
“ হবে না। যার যার এসাইনমেন্ট তাকেই জমা দিতে হবে।”
দ্বিতীর বোধহয় এবার কেমন সন্দেহ হলো। প্রশ্ন ছুড়ল,
“ তোর আশপাশে কেউ আছে কিয়ান?”
সাক্ষ্য চোখের ইশারাতেই বুঝাল না বলার জন্য। কিয়ান ও স্যার বলে তাই করল। অতঃপর কথা বলা শেষে আচমকাই কিয়ান প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
“ স্যার, আপনি না বিয়ে করলে মাস কয়েক আগে? আসলেই কি বিয়ে করেছিলেন? ”
কিয়ান বোধহয় সন্দেহের চোখেই চাইল। সাক্ষ্য এই প্রশ্নের উত্তরে উত্তর করল না। শুধু বলে গেল দ্বিতীকে যাতে এসব না বলে। কিছুতেই না। পরমুহূর্তেই আবার নিয়ে নিল এই মাত্র দ্বিতীর যে নাম্বারটায় কিয়ান কল করল সে নাম্বারটা। বোধহয় সিম চেঞ্জ করেছে। ইচ্ছে করেই বোধহয়। কারণ সাক্ষ্যকে সবকিছু থেকে ব্লক করলেও কথা, সাম্য সহ ওরা অনেকবার কল করছিল দ্বিতীকে। দ্বিতী যদিও কল তোলেনি তবে যোগাযোগই যাতে না করতে পারে তার জন্যই সম্ভবত সিম পাল্টেছে।
দ্বিতীর গা ভর্তি জ্বর। উষ্ণতায় সারা শরীর উত্তপ্ত হয়ে আছে। মেয়েটা এই তিনটা রাত একটুও ঘুমোয়নি। একটুও না। আবার দিনের বেলাতে ঘটেছে বিপরীত। দিনের পুরোটাই কেবল ঘুমিয়েছেই বাসাতে। ঘুম না এলে ঘুমের মেডিসিন নিয়েই ঘুমিয়েছে। আর এখন জ্বর নিয়ে ঘুমাচ্ছে। অদিতি আহমেদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মনে পড়ল ঠিক অনেক গুলো বছর আগে এমন একটা সকালে সেও এমনই জ্বরে পড়ে ছিল। সংসার ছেড়ে আসার প্রথম দুটো দিন তো কিছু খেলই না সে কমবয়সী নারীটি। গর্ভাবস্থায় একা, একলা সংসার ছেড়ে এসে বোধহয় স্বামীর বিরহেই সে কমবয়সী মেয়েটির কি ভীষণ অসুখ হলো সেবার। জ্বরে গা পুড়ে গেল। অথচ তাকে নিতে সেবার কেউ আসেনি। কেউ না! কেউ তাকে ফিরিয়ে নিতে চায়নি। কারণ সে শিক্ষিত, শহুরে মেয়ে, শ্বাশুড়ির কথায় উঠবস করার অভ্যাস তার ছিল না, ঘরের কাজকর্মও খুব একটা পারত না। সাথে শ্বাশুড়ির খুব ইচ্ছে ছিল তার বোনের মেয়েটার সাথে তার একমাত্র শিক্ষিত হওয়া সাহেব ছেলেটার বিয়ে দিবে। অথচ তা হলো না। মাঝখানে, অদিতি আহমেদকে ভালোবেসেই বিয়ে করেছিলেন মোস্তফা সাহেব।
অদিতি আহমেদ হাসলেন মৃদু। তারা উভয়ই বিয়ে করেছিল নিজের ছাব্বিশ বছর বয়সে। মাস্টার্স কম্প্লিট করে মোস্তফা সাহেব যখন একটা ছোটখাটো চাকরি পেলেন ঠিক তখনই দুইজনে বিয়ে নামক পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল। এর আগের ঠিক পাঁচ ছয়টা বছর অদিতি আহমেদ অপেক্ষা করেছেন। নিজের প্রিয় পুরুষকে নিজের করে পাওয়ার জন্য কত শত ভালো বিয়ের প্রস্তাব তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। কতশত ছেলের আকাঙ্খা, প্রণয়ও অবহেলা করেছিল। মা বাবাকেও রাজি করিয়েছিল কত অনুনয় করে। অথচ সে ভালোবাসার মানুষটিকে যখন বিয়ে করল, নিজের করল, গ্রামের খুব ছোটখাটো একটা সংসারে গিয়ে জায়গা করল ঠিক তখন থেকেই শুরু হয়েছিল অদিতি আহমেদের লড়াই। প্রেমটা গিয়ে একসময় ঠেকেছিল মানসিক অশান্তিতে। সাংসারিক অশান্তি, কলহ, নিজের প্রতি দোষারোপ এসব থেকে রেহাই পেতেই বোধহয় অদিতি আহমেদ সেদিন ছুটে এসেছিলেন একটাবার। হয়তো জীবনের তিক্ততায় মোস্তফা সাহেবকেও শুনিয়েছিলেন দুয়েক কথা। তাই বলে নিজের স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া কি দায়িত্ব ছিল না পুরুষটার? কেন নিল না? নিলে কি আজ তার মেয়েকে কেউ ভাঙা সংসারের মেয়ে বলতে পারত?
অদিতি আহমেদের চোখ টলমল করল এবারে। ইশশ! সেদিন যদি অদিতি আহমেদ চলে না আসতেন? বোধহয় তার মেয়েটার আজ এই দশা হতো। সমাজে, শ্বশুড়বাড়িতে এত কিছু শুনতে হতো না। অদিতি আহমেদ তো কম চেষ্টা করেনি মেয়েকে সুখী রাখতে৷ যে স্বামী সে চলে আসার দুইদিন পরই স্ত্রীর প্রতি থাকা রাগ আর মা মৃত্যুশয্যায় আছে বলে খালাতে বোনকে বিয়ে করেছিল সে স্বামীর সাথেই সংসারের অভিনয় করে গেল মেয়ের সামনে। অথচ অদিতি আহমেদের যে আত্মসম্মান, তাতে তো এই লোকটার মুখও উনি কখনো দেখতেন না। কখনো না! সে অদিতি আহমেদই স্বামীর সাথে সম্পর্কটা কত সহজ রেখেছেন।
মোস্তফা সাহেব অবশ্য খালাতো বোনকে বিয়ে করার ঠিক তিনদিন পরই তাকে তালাক দিয়েছিলেন। ছুটে এসেছিলেন অদিতি আহমেদের কাছে। কিন্তু তখন আর কি হতো? মানুষকে মেরে ফেলে যদি প্রাণ ফেরাতে চায়, তাহলে কি সম্ভব হয়? অদিতি আহমেদ চোখ বুঝে। এমন না মোস্তফা সাহেব কখনো ভালোবেসেছিল তার সে খালাতো বোনকে। এমনকি এটাও বলেছিলেন উনি যে, বিয়ের পরও তার সে খালাতো বোনকে উনি ছুঁয়েও দেখেননি। শুধু ঝগড়া,জেদ আর মায়ের কারণেই বিয়েটা করেছিলেন। অদিতি আহমেদের কি তাহলে মেনে নেওয়া উচিত ছিল? এই এতবছরে যে মোস্তফা সাহেব বহুবার ক্ষমা চেয়েছেন, বহুবার স্ত্রীর হাত জড়িয়ে কেঁদেছেন, বহুবার.. বহুবার স্ত্রীকে মানানোর চেষ্টা করেছে। তবুও তো নিজের সে আঘাত উনি ভুলতে পারেননি। ভুলতে পারেননি তার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করেছিল। ভুলতে পারেননি খবরটা শুনে তার কি কষ্ট হয়েছিল। মোস্তফা সাহেব কি বুঝবেন সে কষ্ট আদৌ কখনো? বুঝবেন? প্রিয় পুরুষ অন্য নারীর হলে যন্ত্রণা ঠিক কতটুকু হয়?
দ্বিতী জ্বর যখন নামল তখনই সে ভার্সিটিতে এল। দ্বিতীর অসুস্থতা ও মন বুঝে ওর এসাইনমেন্টট গুলো খেয়াই করে দিল। হাসিখুশি দ্বিতী হুট করেই মিইয়ো গেছে কেমন তা বুঝতে অসুবিধা হলো না কারোর। কোন একটা গোপন দুঃখ যে হৃদয়ে পুষে নিয়েছে তাও জানতে বাকি নেই। মিহু তবুও বহুবার জিজ্ঞেস করেছে কি হয়েছে। অথচ উত্তর মিলেনি। খেয়া বোধহয় তাই আর জিজ্ঞেস করল না। শুধু নিরবে সঙ্গ দিল, হাসল, মন ভালো করার চেষ্টা করল।
হিয়া যখন ভার্সিটি শেষে বাড়ি ফিরবে ঠিক তখনই কোথায় থেকে যেন কিয়ান দৌড়ে এল। মাঝরাস্তায় হাঁপাতে হাঁপাতে এসে ও দ্রুতই বলল,
“ এই.. এই দ্বিতী। দাঁড়া.. ”
দ্বিতী দাঁড়াল। রাস্তা পার হতে নিয়েও থেমে জিজ্ঞেস করল,“ কি?”
কিয়ান ভ্রু বাঁকিয়ে বলল,
“ তুই কি ঠিক মতো এসাইনমেন্ট করেছিস দ্বিতী? আই মিন পুরোটা করেছিল? তোর এসাইনমেন্ট নাকি ইনকম্প্লিট আছে। স্যার বলল। ”
দ্বিতী ভ্রু বাঁকাল। ও তো করেনি। করেছে খেয়া। খেয়া নিশ্চয় ইনকম্প্লিট রাখবে না? হতাশ হয়ে তাকাতেই কিয়ান আবারও বলল,
“ তোর এসাইনমেন্ট ইকম্প্লিট, এই কারণে স্যার বলেছে তোকে এখানে দাঁড়াতে। স্যার একটু পরই যাওয়ার সময় কথা বলে যাবে। ”
“ কি কথা বলবে? ”
“ জানি না। স্যার বলল। দাঁড়াবি কিন্তু। নয়তো স্যার ভাববে আমি তোকে বলিনি। ”
দ্বিতী ছোটছোট চোখ করে তাকাল। কিয়ান হাত নাড়িয়ে চলে যেতেই সে স্থির দাঁড়িয়ে থাকল। অতঃপর একটু পরই সাক্ষ্যর গাড়িটা এসে থামল দ্বিতীর সামনেই। কাঁচ নামিয় সর্বপ্রথম বলল সাক্ষ্য,
“ অপেক্ষা করছিলেন? ”
দ্বিতী একনজর চাইল। অতঃপর ভদ্রসভ্য কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“ কিছু বলবেন স্যার? ”
“ হ্যাঁ। ”
“ মাঝরাস্তা কেন একাডেমিক আলোচনা স্যার? ”
সাক্ষ্য তাকিয়েই ছিল দ্বিতীর মুখটার দিকে। চোখের নিচে তিনদিনেই কালো ফেলেছে। মুখ কিছুটা ফুলেছে। চুলও কিছুটা এলোমেলো। অতঃপর সে তাকিয়ে থাকার মধ্যেই দ্বিতীর পাল্টা প্রশ্ন শুনে উত্তর করল,
“ হু? রাইট রাইট। প্লিজ গাড়িতে উঠে বসুন। ”
দ্বিতী ভ্রু কুঁচকে চাইল। মুখে বলল,
“ সরি। প্রয়োজন নেই স্যার। আমি বাসায় ফিরব এখন। আপনার সাথে এসাইনমেন্টের সমস্যা নিয়ে আমি কাল ভার্সিটিতে এসে কথা বলে নিব। ”
সাক্ষ্য বোধহয় নিরাশ হলো। মেকি হাসল কেমন ভঙ্গুর এক অনুভূতি নিয়ে । দ্বিতী আজ একবারও তার দিকে তাকায়নি। একবারও না। যেন চেনেই না। এমনকি এই যে কথা বলছে এখনও একবারও মুখ তুলে চাইল না মেয়েটা। একবারও চাইল সাক্ষ্যর তৃষ্ণার্ত নজর। চাতকের ন্যায় চাহনি। দ্বিতী পা বাড়াল। আনমনে পা বাড়িয়ে হাঁটার কারণে যখন একটার রিক্সার সামনে পড়তে নিল ঠিক তখনই সাক্ষ্য টেনে ধরল। দ্বিতীকে পা বাড়াতে দেখে সে নিজেও নেমেছিল। অতঃপর একটুর জন্য রিক্সায় সামনে পড়তে থাকা দ্বিতীকে টেনে ধরে বলল,
“ হাঁটেন কিভাবে? এটা নিজের মতো বাঁচার নমুনা? ”
দ্বিতী এবারেও চাইল না। মুখে বলল,
“ একটা রিক্সাই। মেজর কিছু তো হতো না। ”
“ মেজর কিছু হলে খুশি হবেন? এই আপনার নিজের প্রতি ভালোবাসা মিসেস দ্বিতীকা তাসনিম? ”
দ্বিতী ঠিক এই মুহূর্তটায় চুপ করে গেল। নিজের প্রতি ভালোবাসা নেই. আছে! একশোবার আছে। এটা নেহাৎ ওর আনমনে হাঁটার কারণ। দ্বিতী উত্তর করার আগেই সাক্ষ্য ফের আবার গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“ তিনদিন আপনার কাছে যাইনি। দ্বারকাছেও ঘেষিনি। আপনার কথামতো আপনাকে নিজের মতো বাঁচতে দিয়েছি দ্বিতী। এখন প্লিজ গাড়িতে উঠুন। বাসা অব্দি পৌঁছে দিতে দিতে আমি আপনার সাথে অবশ্যই খারাপ কিছু করে ফেলব না। এইটুকু বিশ্বাস আমার প্রতি রাখা উচিত আপনার। ”
দ্বিতী এবার ছোটশ্বাস ফেলেই উঠে বসল৷ স্থির, শান্ত হয়ে বসে জানালার দিকটায় চাইতেই সাক্ষ্যও উঠে বসল। অতঃপর গাড়ি চালাতে চালাতে বলল,
“ ভার্সিটিতে কয়দিন আসেননি? এসাইনমেন্টও নিজে করেননি। যাও করা হয়েছে তাও ইনকম্প্লিট। ”
“ কি ইনকম্প্লিট? ”
সাক্ষ্য এবার মৃদু হাসল। বলল,
“ এই যে, ভার্সিটির মোস্ট হ্যান্ডসাম টিচারের দিকে একবারও ফিরে তাকাননি। তিনটা দিন ভার্সিটিতে না আসার বিনিময়ে আজকের ক্লাসটা ক্লাসরুমে বসে না করে আপনি ছিলেন বন্ধুদের সাথে ক্যান্টিনে। ”
“ তো? ”
সাক্ষ্য এবারে দীর্ঘশ্বাস ফেলল বোধহয়। বলল,
“ নিজেকে গুঁটিয়ে নিচ্ছেন কেন দ্বিতী? ভার্সিটিতে কন্টিনিউ আসবেন। আমি বিরক্ত করব না, প্রমিস। তবুও নিজেকে বাসার মধ্যে গুঁটিয়ে রাখবেন না। নিজের প্রতি অন্তত এতটুকু ভালোবাসা রাখবেন যাতে অন্যদের অনেককিছু বলা, না বলাতেও আপনার কিছু যায় আসবে না। ওকে?”
দ্বিতী উত্তর করে না। চুপচাপ ওভাবেই বসে থাকে মেয়েটা। এই যে সাক্ষ্য তার পাশে বসে আছে তবুও সাড়াশব্দ নেই, ঝগড়া নেই,তর্ক নেই, তাকাচ্ছে না এতেই সাক্ষ্যর বুকটা ভার লাগে। নিঃশ্বাস নিতে অব্দি কষ্ট হচ্ছে। দ্বিতভ বোধহয় এতোটক না বদলালেও পারত। সাক্ষ্য দীর্ঘশ্বাস ফেলেই শেষে জিজ্ঞেস করল,
“ দ্বিতী, কাল সকালে সময় দিবেন একটু? আমার সাথে… ”
দ্বিতী মাঝপথেই বলে উঠল,
“ না। আমার কিছু কাজ আছে। আপনি প্লিজ গাড়িটা থামাবেন? ”
সাক্ষ্য জানত বোধহয় উত্তরটা এমনই হবে। জিজ্ঞেস করেছে ভেবেই সে ঠোঁট চওড়া করে কেমন যেন হাসল। অতঃপর দ্বিতীদের বিল্ডিংয়ের সামনে এসে গাড়িটা থামতেই দ্বিতী নেমে পড়ল। যত দ্রুত সম্ভব তত দ্রুতই পা চালিয়ে চলে গেল বাসার ভেতরে।একটাবারও পিছু ফিরে সাক্ষ্যকে চাইল না। একটাবারও দেখল এক ভঙ্গুর পুরুষের ব্যর্থতা, অসহায়তা আর আফসোস!
তখন প্রায় রাত এগারোটা। দ্বিতী রুমেই আলো জ্বালিয়ে বসে আছে। অতঃপর যখন নিরবে, নিভৃতে বসে ছিল ঠিক তখনই এতোটা রাতে তার ফোনটা বেজে উঠল হঠাৎ। নাম্বারটা অচেনা। সে এই নাম্বারটা কেবল তারু বন্ধুমহলেই দিয়েছিল। আর কাউকে দেয়নি। বন্ধুমহলের কেউই কল দিয়েছে ভেবে দ্বিতী কল তুলল। কানে ফোন গুঁজে বলল,
“ হ্যালো। ”
ওপাশ থেকে উত্তর এল না। ভেসে এল শুনশান নিরবতা। দ্বিতী ফের আবার ও বলল,
“ হ্যালো? কে বলছেন? ”
ওপাশের মানুষটা এই পর্যায়ে শুকনো ঢোক গিলল। চাতক পাখির মতো আলো জ্বলতে থাকা রুমটায় চেয়ে সে চাপা শ্বাস ফেলল। দ্বিতী আরো দুয়েকবার জিজ্ঞেস করল কে হয়৷ অতঃপর বিরক্ত হয়ে কল রেখেই দিল। সাক্ষ্য এবারে ফ্যালফ্যাল করে চাইল। মেয়েটা নিশ্চয় এই নাম্বারও ব্লক করে দিবে? অন্তত কন্ঠ তো শুনতে পেল সে। তাই ভেবেই আবার কল দিল। ওপাশ থেকে দ্বিতী মেজাজ খারাপ করেই বলল,
দুইজনাতেই পর্ব ৪১
“ সমস্যা কি? কে বলছেন? রাত হলেই মেয়েদেরকে কল করে ডিস্টার্ব করেন নাকি? ”
সাক্ষ্য এই পর্যায়ে ছোটশ্বাস ফেলল। বউ এই নাম্বারটিও ব্লক করে দিবে ভেবে মুখে রুমাল রেখে বলল,
“ আপনার ভার্সিটির সিনিয়র হই মিস। আপনার ফ্রেন্ডের থেকেই নিয়েছিলাম নাম্বারটা। ”
