দুইজনাতেই পর্ব ৪১
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
সাক্ষ্য প্রায় উদ্ভ্রান্তের মতোই ছুটছিল। সিঁড়ির একেকটা ধাপ পার হয়ে ছাদ অব্দি পৌঁছাতে ওর খুব বেশি সময় লাগল। দ্রুত বেগে ছুটে এসেই হাত দিয়ে ছাদের দরজাটা ঠেলেই সাক্ষ্য ছুটল ছাদে। চোখজোড়া লাল টকটকে হয়ে উঠেছে ইতোমধ্যেই। শরীর ঘামছে। পরনের শার্টটা অব্দি ঘামে ভিজেছে। সাক্ষ্য হৃৎকম্পন দ্রুত বেগেই ছুটল। প্রিয়তমা স্ত্রীকে হারানোর ভয়ে দিগ্বিদিক না দেখে ছাদে ছুটে এসেই যখন উদ্ভ্রান্তের মতো ছাদের রেলিংয়ের দিকে ছুটল ঠিক তখনই দেখল দ্বিতী সে জায়গাটায় নেই। যে জায়গাটায় একটু আগ অব্দিও সাক্ষ্য দ্বিতীকে দেখেছিল, যে জায়গাটায় দেখেই চারতালা অব্দি ছুটতে ছুটতে সিঁড়ি পেরিয়ে ছাড়ে এসে পৌঁছাল সে জায়গাটায় দ্বিতী নেই।আছে শুধু রেলিংয়ের নিচটায় দ্বিতী সাদা রঙা স্যান্ডেলজোড়া। সাক্ষ্যর ছটফট লাগল কেমন। অস্থিরতায় ভেতরটা ছটফট করে উঠল। চারদিকে বেহাল অবস্থায় চোখ বুলাতে বুলাতেই সাক্ষ্য গলা উঁচিয়ে ডাকল দ্বিতীকে। একবার,দুইবার নয় বার কয়েক ডাকল। অথচ সাড়াশব্দ এল না কোন। সাক্ষ্যর বোধহয় কলিজাটায় মোচড় দিল এবারে। অজানা আশংকায় আর অস্থিরতায় হাত পা কাঁপতেই সে এক উদ্ভ্রান্ত যুবকের ন্যায় ছুটে যেতে লাগল ছাদের কার্নিশে।রেলিংয়ে দাঁড়ানো দ্বিতীকে এপাশ, ওপাশে রেলিংয়ে কোথাও না দেখতে পেয়ে সাক্ষ্য আচমকাই লাথি বসাল ছাদের রেলিংটায়। লালাভ হয়ে উঠা চোখজোড়া বয়ে নোনা পানি বইল মুহূর্তেই। সাক্ষ্য পারল না আর নিজের ভেতরের চিন্তা,অস্থিরতা আর হারানোর ভয়কে দমাতে। আকাশের পানে চেয়েই নিজের প্রতি সর্বোচ্ছ ক্ষোভ নিয়ে সে চিৎকার করে উঠল। ঠিক পরমুহূর্তেই সাক্ষ্য আর্তনাদ করে বলে উঠল,
“ পারলাম না। পারলাম না আমি ছুটে আসতে। পারলাম আমি… কেন করলে এমনটা দ্বিতী? কেন?
কেন এই শাস্তিটা আমায় দিলে দ্বিতী?
আমার কি এতোটাই কঠিন শাস্তি
প্রাপ্য ছিল? ছিল বলো? ”
সাক্ষ্য কেঁদে ফেলল। উষ্ণ, নোনা পানিরা চোখ বেয়ে বয়ে গেল। সাথে কথা গুলো শেষ করে ছাদের মেঝেটায় একটা ঘুষি বসাতেই সাক্ষ্যর কানে এল রিনিঝিনি নুপূরের শব্দ। সাক্ষ্য বোধহয় এক মুহূর্ত দমে গিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই ঘাড় বাঁকিয়ে চাইল। আশা হারানো মানুষরা যেমন একটু আশার আলো দেখলেই ছুটে যায় ঠিক তেমনই সাক্ষ্যও উঠে ওদিক পানে ছুটল সঙ্গে সঙ্গেই। প্রশস্ত ছাদটায় ওদিকটায় কিছুটা আঁধার। গাছগাছালিতে ভীড় করা ঐ জায়গাটুকুতে স্পষ্টই ফুটে একটা ছায়া। নারীসুলভ ছায়া। সাক্ষ্যর বুঝতে অসুবিধে হয় না যেন। একটু আগে যে নোনা পানিটা চোখ বেয়ে বইল তা যেন দ্বিগুণ হয়ে গড়াতে চাইল। সাক্ষ্য ছুটেই গেল। তীব্র বেগে ছুটে গিয়ে দ্বিতীর ঐটুকু শরীরকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিল নিজের সঙ্গে। এতোটা বেগে সে দৌড়ে গেল দ্বিতী আকস্মিক বুঝেই উঠল না। বরং দু পা পিছিয়ে গিয়ে ঠেকতে হলো ছাদের রেলিংটায়। সাক্ষ্য ওভাবেই থাকে। ওভাবেই দ্বিতীকে জড়িয়ে নিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“ কি মনে হয় আমাকে? কি মনে হয়? মানুষ না আমি? ”
দ্বিতীর ঘাড়ে তখন স্পষ্টই উষ্ণ তরলের উপস্থিতি। ছেলেটা কাঁদছে তখনও। দুই হাতে দ্বিতীকে শক্তপোক্ত ভাবে চেপে ধরে মুখটা দ্বিতীর কাঁধে গুঁজেই কাঁদছে। অথচ বোকা দ্বিতী তা বুঝল না। সাক্ষ্য ফের আবারও বলল,
“ ম ‘রার খুব ইচ্ছে তাই না দ্বিতী? খুব ইচ্ছে? এক কাজ করুন। আমায় মে’.রে ফেলুন দ্বিতী। ফেলে দিন ছাদ থেকে। এরপর আপনার যা ইচ্ছে সব পূরণ করুন..”
দ্বিতী কি বুঝল সাক্ষ্য কেন এতগুলো কথা বলল? টের পেল সাক্ষ্য কেন কাঁদছে? এইযে একটু আগে সাক্ষ্য দিশেহারা হয়ে উদ্ভ্রান্তে এদিক ওদিক ওকে খুঁজল, ডাকল এভাবে কেন তা বুঝল? এই যে সাক্ষ্য ওকে না দেখে কতোটা ছটফট করল তা বুঝল? আরেকটু হলে বোধহয় সাক্ষ্যর নিঃশ্বাসটা অব্দি থেমে আসত। সাক্ষ্যর চোখের উষ্ণ পানি তখনও ছুঁয়ে গেল দ্বিতীর কাঁধ। নিঃশব্দে সে উষ্ণ পানির ছোঁয়া, আর অস্থির নিঃশ্বাসকে টের পেতেই সাক্ষ্য দ্বিতীর মুখটা দুই হাতে আগলে নিয়ে অস্থির চিত্তে অজস্র চুমু দিল। ওভাবেই বলল জড়ানো স্বরে,
“ কতোটা ভয় পেয়েছিলাম জানেন দ্বিতী? আমার ভেতরটা কেমন করছিল জানেন? আমার মনে হচ্ছিল আমি আপনাকে হারিয়ে ফেলেছি। আমার মনে হচ্ছিল আমি আর কখনো আপনাকে চোখের সামনে দেখতে পাব না। আমার মনে হচ্ছিল, আমি আপনাকে আর কখনোই পাব না দ্বিতী। এই অনুভূতিটা কি বিশ্রী জানেন? জানেন কতোটা জঘন্য অনুভূতিটা? ”
দ্বিতী শুনে। এই এতোটা সময়েও তার প্রতিক্রিয়া একদম শূণ্যের ঘরে। এই যে সাক্ষ্য তাকে এতোটা শক্ত ভাবে জড়িয়ে ধরল, কাঁদল এমনকি মুখ আগলে উম্মাদের মতো চুমু আঁকল তাতেও দ্বিতীর বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। একদম স্থির, শান্ত হয়ে সে তাকিয়ে আছে। বিশ্বাস করবে সাক্ষ্যকে? বিশ্বাস করবে এই চোখের পানিকে? বিশ্বাস করবে কি এ অস্থিরতা, চিন্তাকে? যদি পরে জানতে পারে এসবও মিথ্যে? যদি পরে টের সাক্ষ্য শুধু সহানুভূতি দেখাতেই এসব করেছে? দ্বিতীর হাসি এল এবারে। সাজি আম্মুও তো এতকাল তাকে প্রচুর ভালোবাসত। নিজের আম্মুর মতো করেই ভালোবাসত, আগলে নিত, যত্ন করত। সে সাজি আম্মুর ভালোবাসা যদি লোক দেখানো হতে পারে সেখানে যে সাক্ষ্য তাকে কোনদিন ভালোবাসি বলেই নি তাকে কি করে বিশ্বাস করবে? সাক্ষ্য তো প্রায়ই বলত তার কপালে দ্বিতীকে জুটিয়ে দিয়েছে তার আম্মু। তার মানে নিজের ইচ্ছায় নিশ্চয় বিয়ে করেনি দ্বিতীকে? করলে নিশ্চয় এতগুলো দিনে দ্বিতীকে একবার হলেও ভালোবাসার কথা বলত। বলেছে তো যখন দ্বিতী কান্না করছিল। দ্বিতী অবশ্য এখন কাঁদল না। একদম স্থির শান্তি ভঙ্গিতে দাঁড়িয়েই হুট করে সাক্ষ্যকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিল। বলল,
“ কি ভেবেছিলেন? মা’ রা যাব? জীবনের ই’ তি টানব এভাবে? উহু! দ্বিতী আজ থেকে নিজেকে ভালোবাসবে সাক্ষ্য। আজ থেকে..ঠিক আজ থেকে দ্বিতী আর কারোর উপরি উপরি ভালোবাসায় বিশ্বাস করবে না। আজ থেকে দ্বিতী মানুষের বাইরের রূপ এবং ভেতরের রূপ চিনতে শিখবে। আজ থেকে.. আজ থেকেই দ্বিতী নিজের জন্য বাঁচবে। ”
সাক্ষ্য বিস্ময় নিয়ে চাইল। আলো আঁধারের আবছায়ায় দ্বিতীর চোখমুখ ফুলে যাওয়া মুখটায় চাইতেই দৃশ্যমান হলো আত্মবিশ্বাসী এক হাসি। যে হাসি প্রমাণ করছে দ্বিতী নিজেকে বিশ্বাস করে, নিজেকে ভালোবাসে। আর কাউকে নয়। সাক্ষ্য সে মুখপানে চেয়েই শুষ্ক ওষ্ঠে উচ্চারণ করল,
“ উপরি উপরি নয়, আমি তোমাকেই ভালোবাসি দ্বিতী। ঠিক যখন থেকে তুমি আমার প্রতি ঝুঁকেছিলে তখন থেকেই ভালোবাসি। ”
“ ভালোবাসে তো বোকারা।ভালোবেসে কষ্টও পায় বোকারাই। যারা জ্ঞানী, তারা কেবল নিজেকেই ভালোবাসে। নিজেকে ভালোবাসলেই সুন্দরভাবে বাঁচা যায়। ”
এইটুকু বলেই দ্বিতী থামল। ফের পরমুহূর্তেই বলল,
“ এত রাতে ছুটে এসে কি প্রমাণ করতে চাইছেন সাক্ষ্য? আসবেন না আর। আমার সাথে যোগাযোগ করবেন না আর৷ আচ্ছা একটা উত্তর দিবেন সাক্ষ্য? কণার সাথে যদি আপনার বিয়ে ঠিকই ছিল, যদি এইংগেইজম্যান্ট অব্দি হয়েই থাকে তো আমায় কেন তৃতীয় ব্যক্তি বানালেন আপনাদের মাঝে? কেন? কেন বিয়ে করেছিলেন সাক্ষ্য? আমার আম্মু কি এতোটাই অনুরোধ করেছিল? ”
দ্বিতীর স্বর স্পষ্ট, স্বাভাবিক৷ সাক্ষ্য শুনেই উত্তর করল,
“ দ্বিতী… যদি বলি তুমি তৃতীয় ব্যক্তি নও? আমাদের মাঝে তুমি আসোনি, বরং তুমি ছিলেই আমার সাথে। প্রথম থেকে!”
দ্বিতী এবারেও হাসল মৃদু। প্রথম? তাহলে কণা সেদিন যে অনামিকা আঙ্গুলে রিংটা দেখাল? যে রিংটা দেখিয়ে বলল ওটা সাক্ষ্যর আর ওর বিয়ের জন্য পড়ানো রিং ছিল? আর প্রথম হলে বুঝি কণার এতোটা আত্মবিশ্বাস থাকত? দ্বিতী বুঝে না। আবার যে সাক্ষ্য ভালোবাসি বলল না কখনো, ভাব নিয়ে বেড়াত সে সাক্ষ্য হুট করে এতবার ভালোবাসি বলছে তাও বোধগম্য হলো না। শুকনো হাসল সে। এই পর্যায়ে সাক্ষ্যর কথাগুলোকে বিশ্বাস না করেই পুরুষালি লাল টকটকে হয়ে আসা চোখজোড়ায় চেয়ে
দৃঢ় স্বরে বলল,
“চলে যান সাক্ষ্য। আজকের পর থেকে দ্বিতী আপনার জন্যও বিন্দুমাত্র অনুভূতি রাখবে না। আজকের পর থেকে দ্বিতী কারোরই সহানুভূতি নিবে না। কারোরই না! আপনার জীবনে কয়েক দিনের অনাকাঙ্ক্ষিক সদস্য হয়ে যাওয়ার জন্য দুঃখিত। খুবই দুঃখিত। সময়টা হয়তো ফিরিয়ে দিতে পারব না আমি৷ তবে কারোর জীবনে তৃতীয় ব্যক্তি হয়ে থেকে যাওয়ার মতো বেহায়াও আমি নই। আপনি কণাকে নিয়ে নির্দ্বিধায় সংসার সাজাতে পারেন। নির্দ্বিধায় তিন কুবলে নিজের স্ত্রী হিসেবে ঘরে তুলতে পারেন। এতে আমার বিন্দুমাত্রও ইন্টারেস্ট থাকবে না।”
সাক্ষ্যর কন্ঠ এবারে কিছুটা দৃঢ় হলো যেন। মুখ টানটান করে উত্তর করল,
“ আমাকে কি মনে হয় দ্বিতী? আমি চিটার? ”
দ্বিতী হাসল। বলল,
“ জানা নেই। এই পৃথিবীতে কাউকেই তো উপর থেকে দেখে বুঝে উঠা সম্ভব হয় না সাক্ষ্য। এই যে আমি এতকাল জানলাম, সাজি আন্টি আমায় খুব ভালোবাসে। অথচ এক মুহূর্তে সে ধারণা বদলাতে সময় লাগল না। আমি এতকাল জানতাম সাম্য ভাই আমাকে তার বড়ভাইয়ের বউ হিসেবে পেয়ে খুব খুব খুশি। কিন্তু কি জানলাম শেষে? সবাই চেয়েছিল কণা আপনার বউ হোক। আর আমি? আমি সে চাওয়ার ভেতরে হুট করেই প্রবেশ করে ফেললাম। অনাকাঙ্ক্ষিত এক ব্যক্তি হিসেবে আপনাদের পরিবারে ডুকে পড়লাম। আপনি জানেন সাক্ষ্য? আপনি কখনো মুখে ভালোবাসি না বলা সত্ত্বেও আমি কণার সামনে এতদিন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দেখাতাম আমি হ্যাপি। আমি আপনার সাথে হ্যাপি। বুঝাতাম, আমিই আপনার লাইফের মূল্যবান কেউ। অথচ দিনশেষে আমি জানলাম যে আমার সেই কথাগুলো ভিত্তিহীন। আমার সে আত্মবিশ্বাসও ছিল ভিত্তিহীন। সে জায়গাটায় আমি নিজেই অস্তিত্বহীনতায় পড়ে গেলাম সাক্ষ্য। টের পেলাম আমার কথা বলার মতো একটা জবাবও অবশিষ্ট নেই সাক্ষ্য। আমি মানুষটাই তো ভুল জায়গায়, ভুল যুক্তিতে পড়ে ছিলাম সেখানে ওর যুক্তিটা খন্ডাতাম কি করে? এবং দিনশেষে আমি সত্যিই ওর যুক্তিটা খন্ডাতে পারিনি। আমি মেনে নিলাম, মেনে নিলাম জীবনের সবটুকু পরিহাস৷ মেনে নিলাম সমস্ত মিথ্যে। ”
এইটুকু বলেই দ্বিতী চোখ বুঝল। এক মুহূর্ত ও আর অপেক্ষা না করে পা বাড়াল ছাদের দরজার দিকে। সাক্ষ্য মুহূর্তেই পা বাড়াল দ্বিতীকে আটকানোর জন্য। দ্বিতী বোধহয় টেরও পেল তা। হাত উঠিয়ে থামতে বলেই বলল,
“ পা বাড়াবেন না সাক্ষ্য। আমার সাথে যাবেন না আপনি। আমায়…আমায় একা থাকতে দিন। একা! ”
সাক্ষ্য ওভাবেই বলল,
“ সরি, পারব না আমি। একটু আগের ঐরকম ঘটনার পরও আমি আপনাকে একা ছাড়তে পারব না। ”
“ পারবেন। না পারলে একটু আগের মতে অহরহ ঘটনা আমার মাথায় ঘুরপাক খাবে। সত্যি বলব? আমি সত্যিই এত এত মিথ্যের ভীড়ে নিজের জীবনের আশাটুকু হারিয়েই আম্মুকে বাসায় পাঠিয়ে ছাদের রেলিংটায় উঠেছিলাম। ভেবেছিলাম এই দমবন্ধ করা কষ্টের থেকে ওটাই বেটার হবে। তারপর হুট করেই বোধ হলো, ম’রব কেন? কার জন্য? কাদের জন্য? সাক্ষ্য…আমায় একা ছেড়ে দিন প্লিজ। আমি নিজের মতো থাকতে চাই। নিজের মতো! আমার আশপাশেও আসবেন না যতদিন আমি চাইব না। অন্যথায় আমার সত্যিই আপনার আর কণার কথা মনে পড়বে। মনে পড়বে, কণার জায়গায় জোর করে বসে পড়েছি আমি। মনে পড়বে, আমার সংসারে আমিই ছিলাম তৃতীয় ব্যক্তি! ”
সাক্ষ্য এবারে অসহায়ের মতো করেই বলল,
“ দ্বিতী…”
দ্বিতী ছোটশ্বাস ফেলল। দৃঢ় স্বরে জানাল,
“একটু নিজের মতো বাঁচার অধিকার আছে আমার সাক্ষ্য এহসান। আছে! আমার সে অধিকারটুকু কেড়ে নিবেন না। একটু স্বস্তিতে বাঁচতে দিন। প্লিজ! প্লিজ…”
কথাগুলো বলেই দ্বিতী জোরে জোরে পা বাড়াল। অতঃপর দ্রুত বেগে সিঁড়ি ফেরিয়েই চলে গেল নিচে।সিঁড়িতে মাঝপথে দেখা হলো তার মায়ের সাথে। একপ্রকার মা বাবার উপর নিরব অভিমান রেখেই সে মা বাবার সাথে আর একটাও কথা বলেনি ঘুম ভাঙার পর থেকে। এতগুলো কথা বলল তার মা বাবা তবুও উত্তর করল না। নিরব, রাগ অভিমানকে সঙ্গী করেই ছাদে এসেছিল সে। নিরবে অনেকটা সময় বসেও ছিল। পিছু পিছু এসেছিল তার আম্মুও। অনেকটা সময় মেয়ের সাথে থাকার পর ভাবলে কিছু আনলে অন্তত মেয়েকে খাইয়ে দিতে পারবেন। ছোটবেলায় যখন রেগে এমন চুপ হয়ে বসে থাকত তখন বুঝিয় সুঝিয়ে ঠিকই খাইয়ে দিত। তাই তো গিয়েছিলেন। অথচ খাবার নিয়ে আসার পথে দেখল মেয়ে নির্জীব পদার্থের মতো বাড়িয়ে বাসার দিকেই যাচ্ছে। অদিতি আহমেদও তাই মেয়ের পিছু পিছুই পা বাড়াল।
প্রায় তিনটা দিন সাক্ষ্য ছটফট করেছে। অস্থির হয় অপেক্ষা করেছে একটাবার দ্বিতীর কথা শোনার, একটাবার দ্বিতীকে দেখার জন্য। অথচ সাক্ষ্যর কপালে কিছুই জুটল না। দ্বিতী এই তিনটে দিনে তার সাথে যোগাযোগের বিন্দুমাত্র উপায় ও বাকি রাখেনি। সবকিছু থেকে সাক্ষ্যকে ব্লক করেছে। সাক্ষ্য যতগুলো নাম্বার দিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে সবই দ্বিতীর ব্লকলিস্টে এখন। এমনকি কথা, সাম্য কারোরই ফোন তুলেনি মেয়েটা। ভার্সিটিতেও আসেনি তিন তিনটে দিন। সাক্ষ্য ছটফট করল কেবল। নিরব অপেক্ষায় হৃদয় যখন খা খা করে তখন নিজেকে অসহায় লাগে তার। এই তিন তিনটে দিন সে দ্বিতীদের বাড়ির সামনে গিয়েও দাঁড়িয়ে থেকেছে। অপেক্ষা করেছে দ্বিতী বোধহয় বেলকনি বা ছাদে আসবে। কিন্তু দ্বিতী আসেনি। একটাবারও আসেনি। সাক্ষ্য যেটুকু দেখেছে তা হলো দ্বিতীর ঘরের আলোটা। রাতজুড়ে জ্বালানো আলোটাই কেবল চোখে পড়েছে। আর দ্বিতীর মায়ের থেকে যতটুকু সম্ভব দ্বিতীর খোঁজখবর নেওয়া। এইটুকুই!
সাক্ষ্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আজও ভার্সিটিতে ক্লাস করানোর সময় একটাবার ভেবেছিল দ্বিতী আসবে। দেখতে পাবে। তার সাথে কথা না বলুক, দূরে থাকুক, সমস্ত রাগ রাখুক কিন্তু সামনে তো আসবে? মেয়েটা নিজেকে ওভাবে গুঁটিয়ে নিলে সাক্ষ্যর অস্থির লাগবে না? ছটফট করবে না হৃদয় টা? সাক্ষ্য কতগুলো দি ন হলো ঐ মেয়েটার সাথে ঝগড়া করেনি, কথা বলেনি, মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে দেখেনি! ইশশ! মেয়েটা কি জানে এর শূণ্যতা কতটুকু? সাক্ষ্য উপায় না পেয়েই পা বাড়িয়ে মাঠ দিয়ে যেতে থাকা কিয়ানকে ডাকল। প্রফেশনাল লাইফে কখনো নিজের স্ত্রীর দিকে না তাকানো সাক্ষ্য ও আজ বউয়ের বন্ধুকে দেখে সর্বপ্রথম বলল,
“ কিয়ান, তোমাদের ফ্রেন্ড দ্বিতীকা তাসনিমকে একটা কল করো তো। ফার্স্ট..”
কিয়ান বোধহয় বুঝে উঠল না কেন দ্বিতীর প্রসঙ্গ আসল। ভ্রু বাঁকিয়ে স্যারের আদেশ মানতেই বলল,
“ কয়েকটা দিন হলো ও অনলাইনে নেই স্যার। আর আমার ফোনে ব্যালেন্সও নেই। ”
সাক্ষ্যর ফোনটা গম্ভীর হলো। অভাগা যেদিকে যায় বুঝি সাগর শুকিয়ে যায়? চাপাশ্বাস ফেলে নিজের ফোনটা হাতে তুলল সে। অতঃপর বলল,
“ তোমার নাম্বারটা বলো, রিচার্জ করে দিচ্ছি। ”
কিয়ান বোধহয় এমন জরুরী তলবের কারণ বুঝে না। বিস্তৃত এক হাসি দিয়ে সে নাম্বারটা বলল। অতঃপর একটু সময়ের ব্যবধানেই পুরো পাঁচশত টাকা ব্যালেন্সে এসে হাজির হলো। কিয়ান অবাক হলো বোধহয়। বাহ বাহ! সোজা পাঁচশত টাকা! তাকাতেই সাক্ষ্য অপেক্ষা না করে শুধাল,
“ কল দাও এবার। ”
দুইজনাতেই পর্ব ৪০
কিয়ান বাধ্য ছেলের মতো কল দিল। একবার, দুইবার, তিনবার কল দেওয়ার পর ওপাশ থেকে দ্বিতী কল তুলল। সাক্ষ্যর বোধহয় এবার বুক ঢিপঢিপ করল কেমন। অস্থির একটা অনুভূতি সারা শরীর জুড়ে বয়ে গেল মুহূর্তেই। মনে হলো যেন, কতকাল, কত যুগ সে দ্বিতীর কন্ঠ শুনতে পায়নি। কতকাল সে দ্বিতীর কথা শোনেনি। সাক্ষ্য হাঁসফাঁস করা একটা অনুভূতি নিয়ে মাথা নামাতেই ওপাশ থেকে দ্বিতী মুহূর্তেই বলে উঠল,
“ হ্যালো..”
