Home বাঁধন রূপের অধিকারী বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৪০

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৪০

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৪০
সুমি চৌধুরী

গাড়ির লম্বা লাইনে আটকে আছে বাঁধন। সামনে, পেছনে শুধুই গাড়ি আর গাড়ি। হর্ন-এর যান্ত্রিক আর কর্কশ শব্দে চারপাশটা যেন এক চরম অস্থিরতার রূপ নিয়েছে, কিন্তু বাইরের এই তীব্র বিশৃঙ্খলার চেয়েও বাঁধনের ভেতরের ঝড়টা অনেক বেশি ভয়াবহ।সে স্টিয়ারিংটা এত জোরে চেপে ধরেছে যে আঙুলের গিটগুলো রক্তশূন্য হয়ে সাদা হয়ে গেছে। কপালের রগগুলো ফুলে উঠে স্পষ্ট জানান দিচ্ছে ভেতরে জমে থাকা উত্তেজনা, আর শক্ত চোয়ালটা যেন নিজেকে সামলানোর শেষ চেষ্টা। অন্য হাতে ধরা ফোনটা স্ক্রিনে বারবার একটাই নাম্বারে ডায়াল করার তাগিদ, ‘আকাশ’।কল যাচ্ছে। কিন্তু প্রতিবারই সেই যান্ত্রিক বার্তা—“সুইচড অফ।”

—-“ধুর!”
চরম হতাশায় আর আক্ষেপে স্টিয়ারিংয়ে একটা সজোরে ঘুষি মারল বাঁধন। হুট করেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন খালি হয়ে মুচড়ে উঠছে। অজানা এক আশঙ্কার কালো ছায়া ধীরে ধীরে গ্রাস করছে ওকে।পাশে বসা অ্যান্সি খুব সতর্ক চোখে নজর রাখছিল ওর দিকে। পরিস্থিতি বিষিয়ে উঠছে বুঝতে পেরে একদম শান্ত আর ধীর গলায় বলল,
—-“বাঁধন, তুই একটু শান্ত হ তো। রূপা হয়তো গেটের কাছেই দাঁড়িয়ে আছে, খারাপ কিছুই হয়নি।”
কিন্তু অ্যান্সির সান্ত্বনাগুলো বাঁধনের কানে যেন পৌঁছালেই না। তার সমস্ত অস্তিত্বজুড়ে এখন একটাই অনুভূতি—কিছু একটা মারাত্মক ভুল ঘটে গেছে। মনে হচ্ছে প্রতিটা সেকেন্ড হাতের মুঠো থেকে বালি নদীর মতো ফসকে যাচ্ছে। এই স্থবির জ্যাম, এই অনির্দিষ্ট অপেক্ষা সবকিছু ওকে মুহূর্তে উন্মাদ করে দিচ্ছে।একবার মনে হলো গাড়ির লক খুলে এক দৌড়ে চলে যায়। কিন্তু সামনের রাস্তা এখনো অনেক বড়, হেঁটে বা দৌড়ে গেলে পৌঁছাতে আরও দেরি হয়ে যাবে। সে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে একটা গভীর শ্বাস নিল। নিজেকে সামান্য স্থির করার চেষ্টা করে আবারও ফোনটা হাতে তুলে নিল।আবারও সেই ডায়াল।এইবার আর কাটল না রিং ঢুকলো!
রিং হচ্ছে
একবার…
দু’বার…
তিনবার…
হঠাৎ ওপাশ থেকে কল রিসিভ হওয়ার শব্দ আসতেই বাঁধন আর নিজের ওপর থেকে সব নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। ফোনটা কানে চেপে ধরে একদম গর্জে উঠল,

—-“হোয়াট দ্যা হেল, আকাশ! এতবার কল দিচ্ছি, ফোন বন্ধ করে রেখেছিলি কেন?”
ওপাশ থেকে কিছুটা অবাক আর কিছুটা ব্যস্ত গলায় আকাশ বলল,
—-“সরি রে! অফিসে একটা মিটিং চলছিল, তাই ফোনটা সাইলেন্ট না রেখে অফ করে রেখেছিলাম। কী হয়েছে তোর? রেগে আছিস মনে হচ্ছে?”
দাঁতে দাঁত চেপে ধরল বাঁধন। এখন কোনো কৈফিয়ত শোনার কিংবা কথা ঘোরানোর সময় তার নেই। গলার স্বরটা বরফের মতো ঠান্ডা, কিন্তু তার ভেতরে প্রলয়ের আগুন জ্বলছে। একদম মেপে মেপে কড়া গলায় বলল,
—-“ফার্স্ট গেটের কাছে যা। এখনই। গিয়ে দেখে বল রূপা সেখানে আছে কি না!”
বাঁধনের কথা শুনে আকাশ আর দেরি না করে দ্রুত কলেজের গেটের দিকে এগিয়ে এলো। চারপাশে তন্ন তন্ন করে চোখ বোলায় সে, কিন্তু রূপার কোনো দূরতম চিহ্নও চোখে পড়ল না। চিন্তিত গলায় সে ফোনে বলল,
—-“বাঁধন, রূপা তো এখানে নেই! হয়তো বাসায় চলে গেছে?”
বাঁধনের রক্ত গরম করে দেওয়ার জন্য এই একটা কথাই যথেষ্ট ছিল। রূপা নেই! ও একা একা কীভাবে চলে গেল? ফোঁস ফোঁস করে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে বাঁধন গর্জে উঠল,

—-“ভালো করে দেখে বল!”
আকাশ আবার চারপাশটায় সতর্ক চোখে এক চিলতে নজর বুলালো। তারপর নিঃসংকোচে বলল,
—-“সত্যি বলছি রে, নেই। হয়তো সোজা ফ্ল্যাটেই চলে গেছে।”
কথাটা শোনামাত্র মুহূর্তের মধ্যে কলটা কেটে দিল বাঁধন। স্টিয়ারিংটা দুই হাতে এমন শক্ত করে চেপে ধরল যেন চূর্ণবিচূর্ণ করে ফেলবে। পাশে বসা অ্যান্সি উদ্বিগ্ন গলায় শুধাল,
—-“কী বলল আকাশ?”
দৃষ্টি সামনের রাস্তায় স্থির রেখে অস্বাভাবিক গম্ভীর আর থমথমে কণ্ঠে জবাব দিল বাঁধন,
—-“গেটের কাছে নেই। হয়তো ফ্ল্যাটেই গেছে।”
একটা দীর্ঘ আর গভীর শ্বাস ছাড়ল অ্যান্সি। দীর্ঘক্ষণ দমবন্ধ করে অপেক্ষা করার পর অবশেষে সামনের জ্যামটা একটু হালকা হয়ে এলো। বাঁধন এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে একবারে এক্সিলারেটর চেপে গাড়ির স্পিড ফুল বাড়িয়ে দিল।ঝড়ের গতিতে গাড়ি চালিয়ে এনে সোজা ফ্ল্যাটের সামনে দাঁড় করাল। প্রায় লাফিয়ে নামার মতো করে গাড়ি থেকে নেমে হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে লিফটে চেপে বসল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই লিফটা সোজা ফ্ল্যাটের ফ্লোরে এসে থামল।

কিন্তু লিফট থেকে বের হয়ে দরজার দিকে পা বাড়াতেই বাঁধনের গতি স্তব্ধ হয়ে গেল। পা দুটো যেন মাটির সাথে আটকে গেছে।দরজা বাইর থেকে তালা মারা!তার মানে রূপা আসেনি। কিন্তু আকাশ যে বলল গেটের কাছে নেই? তবে কি আকাশ মিথ্যা বলল, নাকি অন্য কিছু? রাগে-ক্ষোভে বাঁধনের দুই হাত শক্ত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এলো। এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে গটগট করে আবার নিচে নেমে সোজা গাড়িতে গিয়ে বসল সে।ওকে এভাবে হন্তদন্ত হয়ে নামতে দেখে অ্যান্সি, নিক্সি, ওমর আর জেইন ওরাও দ্রুত গাড়িতে গিয়ে চেপে বসল। পিছন থেকে নিক্সি উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে বলে উঠল,
—-“কী হয়েছে বাঁধন? আবার কোথায় যাচ্ছিস?”
কোনো উত্তর দিল না বাঁধন। গম্ভীর মুখে শক্ত হাতে গাড়ি ড্রাইভ করতে থাকল। ভেতরে থমথমে নীরবতা; গাড়ির বাকি সবাই বেশ বুঝতে পারছে চরম অপ্রীতিকর কিছু একটা ঘটেছে। এই মুহূর্তে ওর সাথে কথা বলতে যাওয়া মানে আগুনে ঘি ঢালা, তাই চুপ করে থাকাই শ্রেয় মনে করল সবাই।গাড়ি সোজা কলেজের গেটের সামনে এসে সশব্দে থামল। ঝড়ের গতিতে গাড়ি থেকে নেমে চারদিকে তীক্ষ্ণ চোখে নজর বুলালো বাঁধন। কিন্তু না, রূপার কোনো অস্তিত্বই নেই এখানে। তার মানে আকাশ সত্যিই বলেছিল রূপা গেটের কাছে নেই, আবার ওদিকে ফ্ল্যাটেও ফেরেনি। এর স্পষ্ট অর্থ হলো, মেয়েটা আবারও তাকে না জানিয়ে, না বলে কোথাও হাওয়া হয়ে গেছে!তীব্র রাগে আর মেজাজ হারিয়ে মাথার চুল শক্ত করে টেনে ধরল বাঁধন। দাঁতে দাঁত চেপে গুমরে উঠল,

—-“আই ফিল লাইক ফা’কিং ইউ, রূপ। আবার আমার কথার অবাধ্য হলি তুই।”
গাড়ি থেকে অ্যান্সিসহ সবাই তড়িঘড়ি করে নেমে এলো। বাঁধনের এমন উন্মত্ত রূপ দেখে অ্যান্সি উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,
—-“কী হয়েছে বাঁধন? সব ঠিক আছে তো? আর রূপা… ও কোথায়?”
চোখ দুটো রক্তবর্ণ করে বাঁধন কামড়ে কামড়ে বলল,
—-“না, নেই! ও ফ্ল্যাটেও যায়নি আবারও আমার কথার অবাধ্য হয়েছে ও!”
অ্যান্সি চরম অবাক হয়ে শুধায়,
—-“মানে ফ্ল্যাটে যায়নি? তাহলে কোথায় গেল মেয়েটা?”
—-“জানি না!”

বাক্য দুটো উচ্চারণ করেই ঝড়ের বেগে আবার গাড়িতে গিয়ে বসল বাঁধন। পরিস্থিতি বিষিয়ে উঠতে দেখে অ্যান্সিরাও আর কোনো কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ যার যার জায়গায় গিয়ে বসল।গাড়ি স্টার্ট দিল বাঁধন। গাড়িটা কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তার নিজেরও জানা নেই, তবে এই শহর চষে ফেলে রূপাকে যদি খুঁজে পায়।তারপর সেই মেয়েকে নিয়ে যে সে কী করবে, নিজেও জানে না। শক্ত হাতে স্টিয়ারিং চেপে গাড়ি ড্রাইভ করতে থাকে সে। কিছুক্ষণ আগে রূপা যে গলিটা দিয়ে হেঁটে এসেছিল, ঠিক সেই সরু গলিটার ভেতরেই গাড়িটা ঢুকিয়ে দিল বাঁধন।গাড়ির ভেতর শ্মশানের নীরবতা। সবার মুখে স্পষ্ট ভয়ের ছাপ, কেউ একটা টু শব্দ করারও সাহস পাচ্ছে না।হঠাৎই গলিটার মাঝামাঝি আসতেই রাস্তার একপাশে রূপার হার্ডবোর্ড আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কলমদানিটা চোখে পড়ল নিক্সির। চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেল! মুহূর্তে সজোরে চিৎকার দিয়ে উঠল নিক্সি,

—-“বাঁধন, গাড়ি থামা! ওই দেখ, রাস্তায় রূপার হার্ডবোর্ড পড়ে আছে!”
সজোরে ব্রেক কষে গাড়ি থামাল বাঁধন।নিক্সির কথা শুনে এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে উন্মাদের মতো গাড়ি থেকে নেমে এলো সে। সত্যি তো! পিচঢালা রাস্তার ওপর অনাদরে পড়ে আছে রূপার হার্ডবোর্ডটা, আর চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে তার কলমগুলো। মুহূর্তের মধ্যে বাঁধনের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল অজানা এক আশঙ্কায় শিউরে উঠল পুরো শরীর।দৌড়ে গিয়ে কাঁপাকাঁপা হাতে হার্ডবোর্ড আর কলমগুলো কুড়িয়ে নিল বাঁধন। তার আঙুলগুলো থরথর করে কাঁপছে। এগুলো রাস্তায় পড়ে আছে কেন? রূপা কোথায়?গাড়ি থেকে ততক্ষণে অ্যান্সিসহ বাকি সবাই নেমে এসেছে। ছড়িয়ে থাকা জিনিসগুলোর দিকে তাকিয়ে ওমর তীব্র আতঙ্কে বলে উঠল,
—-“এইগুলো তো রূপারই! কিন্তু এগুলো এখানে এভাবে পড়ে আছে কেন? রূপা কোথায় গেল?”
সবাই দিশেহারা হয়ে চারপাশে তন্ন তন্ন করে তাকাল। গলিটা একদম খাঁ খাঁ করছে মাঝে মাঝে দু-একটা অচেনা গাড়ি আর হেঁটে যাওয়া অল্প কিছু মানুষ ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ছে না। রূপা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে!এক সেকেন্ডের জন্য যেন বরফ হয়ে জমে গেল বাঁধন। মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ল এগুলো রাস্তায় পড়ে আছে, মেয়েটা ফ্ল্যাটেও ফেরেনি, তার মানে?তার রূপের কোনো ক্ষতি হয়নি তো?চিন্তাটা মাথায় আসতেই তীব্র হিংস্রতা আর আক্ষেপে পিচঢালা রাস্তার ওপর সজোরে এক ঘুষি বসিয়ে দিল বাঁধন। চামড়া ছিলে রক্ত গড়িয়ে পড়ল তার হাতের গিট থেকে, কিন্তু সেদিকে কোনো তোয়াক্কাই নেই তার। ক্ষিপ্ত বাঘের মতো গুমরে উঠে গর্জে বলল,
—-“নো! নো! নো! এই বাঁধনের দেহে প্রাণ থাকতে তার রূপের সামান্যতম কোনো ক্ষতি সে হতে দেবে না! যে আমার রূপের ক্ষতি করার দুঃসাহস দেখাবে, তার শহরে আমি রক্তের বন্যা ভাসিয়ে দেব!”

অন্য দিকে, হাসপাতালের আইসিইউ-এর হিমশীতল ঘরের ভেতর জীবনের সাথে লড়াই করছে সীমা। শরীরজুড়ে যন্ত্রপাতির খাঁচা। ডাক্তাররা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন অবস্থা মোটেও ভালো নয়, যেকোনো সময় যেকোনো কিছু ঘটে যেতে পারে।আইসিইউ কেবিনের বাইরে পুরো বাতাস ভারী হয়ে আছে চরম কান্নাকাটিতে। সেখানে দাঁড়িয়ে ইশতিয়াকের মা বিলকিস বানু, বাবা ইসরাত আর সীমার বাবা-মা। কান্নায় ভেঙে পড়েছে সবাই। নিজের পাঁজরের ধনকে এভাবে মৃত্যুর মুখে দেখে সীমার মা বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন; ইসরাত অনেক কষ্টে সীমার মাকে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে।অথচ এত বড় একটা ঝড় বয়ে যাচ্ছে, ইশতিয়াক তার বিন্দুমাত্র কিছু জানে না! তাকে ইচ্ছে করেই এই খবরটা দেওয়া হয়নি। বিলকিস বানু খুব ভালো করেই জানেন, তার কুপুত্র এই নিষ্পাপ মেয়েটার ওপর কীভাবে পশুর মতো অত্যাচার চালিয়েছে। তিনি সব জানতেন, কিন্তু এতদিন চুপ থাকতে বাধ্য হয়েছিল কারণ সীমা তাকে পায়ে ধরে কসম খাইয়েছিল, যেন ইশতিয়াককে কিছু না বলে। বাধ্য হয়ে তিনি এতদিন পেটের ভেতর পাথর চেপে সব সহ্য করে গেছেন।

কিন্তু আজ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারছেন না তিনি। চোখের জল মুছে ভেতরে ভেতরে এক কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। বিলকিস বানু সাফ জানিয়ে দিয়েছেন এই দুর্ঘটনার খবর কোনোভাবেই যেন ইশতিয়াকের কানে না পৌঁছায়। আল্লাহর রহমতে সীমা যদি একবার সুস্থ হয়ে উঠে আসে, তিনি নিজ দায়িত্বে মেয়েটাকে অনেক দূরে পাঠিয়ে দেবেন, আর কোনো দিন ইশতিয়াকের এই নরকতুল্য অত্যাচারে পুড়তে দেবেন না।
রাত তখন প্রায় দুটো। তীব্র নেশার ঘোরে ঢুলতে ঢুলতে নিস্তব্ধ বাড়িটায় ফিরল ইশতিয়াক। কিন্তু ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই তার ঢুলুঢুলু মাতাল পা দুটো হঠাৎ থমকে গেল।পুরো বাড়িটা একদম নিঝুম, থমথমে। কোথাও একটা চেনা আলো নেই, নেই কোনো সুতো পড়ার মতো শব্দও। চারপাশটা কেমন যেন এক গা ছমছমে ভৌতিক শূন্যতায় চেপে বসেছে।ঢলে ঢলে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে যায় ইশতিয়াক। ভেতরের লাইটটা জ্বালাতেই থমকে দাঁড়ায় সে পুরো ঘর একদম ফাঁকা, বিছানায় সীমা নেই! ক্ষণিকের জন্য একটু অবাক হয় সে, গেল কোথায় সবাই? কিন্তু পরক্ষণেই নেশার ঘোরে মাথাটা একটু ঝাঁকিয়ে এসব চিন্তা দূর করে দেয়। পায়ের নোংরা জুতো দুটো শুদ্ধই বিছানায় ধপ করে শুয়ে পড়ে ইশতিয়াক। দেখতে দেখতে নেশার অতল গভীরে তলিয়ে যায় সে।পরদিন সকালে ইসরাতের কান্নার আওয়াজে ঘুম ভাঙে তার। চোখ খুলে তাকাতেই দেখে ইসরাত সামনে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছে। ঘুম ভাঙার থমথমে মেজাজে বেশ বিরক্ত হয়ে ওঠে ইশতিয়াক,

—-“কী হয়েছে? এভাবে সামনে দাঁড়িয়ে প্যানপ্যান করে কাঁদছিস কেন?”
ইসরাত কাঁপাকাঁপা গলায় টেনে টেনে বলে,
—-“ভাইয়া, সীমা, সীমা।”
ইশতিয়াক অধৈর্য হয়ে শুধায়,
—-“কী সীমা সীমা লাগিয়েছিস? কী হয়েছে ওর?”
ইসরাত এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে ডুকরে কেঁদে উঠে বলল,
—-“সীমার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে কাল! হাসপাতালে আইসিইউতে রাখা হয়েছে ওকে ডাক্তাররা বলেছেন ওকে বাঁচানো নাকি প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে!”
বুকের ভেতরটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে ওঠে ইশতিয়াকের। মেঝের ওপর দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস যেন এক সেকেন্ডের জন্য বন্ধ হয়ে আসতে চায়। চোখ দুটো স্থির হয়ে গেছে পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষের মতো অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সে। পরক্ষণেই নিজের ভেতরের চরম অজানা আতঙ্ক ঢাকতে রাগান্বিত চোখে ইসরাতের দিকে তাকিয়ে হুঙ্কার দিয়ে উঠল,

—-“কী সকাল সকাল ফালতু মজা করছিস? সীমা অ্যাকসিডেন্ট করেছে মানে? দেখ ইসরাত, একদম এসব নিয়ে ফাইজলামি করবি না আমার সাথে!”
ইসরাত চোখের পানি মুছতে মুছতে ভাঙা গলায় বলল,
—-“আমি বিন্দুমাত্র মজা করছি না ভাইয়া! সত্যি সীমা হাসপাতালে ভর্তি। বিশ্বাস না হলে তুমি এখনই আমার সাথে চলো কাল সারারাত আমরা সবাই হাসপাতালেই ছিলাম!”
চুলের ভাঁজে দুটো হাত গলিয়ে দিয়ে মাথার চুল শক্ত করে চেপে ধরে ইশতিয়াক। সত্যি তো! কাল রাতে বাড়ি ফিরে তো কাউকে দেখতে পায়নি সে, পুরো বাড়ি খাঁ খাঁ করছিল। তবে কি ইসরাত যা বলছে তা বর্ণে বর্ণে সত্যি? সীমার সত্যিই অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে?কথাটা মাথায় আসতেই অদ্ভুত আশঙ্কায় যেন কলিজা মুচড়ে কেঁপে উঠল ইশতিয়াকের। নিজেকে সামলানোর জন্য আর এক সেকেন্ড সময়ও নষ্ট করল না সে। পরনের কাপড়ের তোয়াক্কা না করে এক দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

কাল থেকে উন্মাদের মতো রূপাকে খুঁজে চলেছে বাঁধন। পুরো শহরের পুলিশ বাহিনীকে মাঠে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে, শহরজুড়ে তন্ন তন্ন করে খোঁজা হচ্ছে তাকে, কিন্তু কোথাও এতটুকু হদিস মিলছে না সবাই শূন্য হাতেই ফিরে আসছে। রূপার এই নিখোঁজ হয়ে যাওয়াটা বাঁধনের বুকে যেন রক্তক্ষরণ ঘটিয়ে চলেছে। নিজেকে অনেক কষ্টে শক্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে সে।বারবার হন্তদন্ত হয়ে কন্ট্রোল রুমে ছুটে যাচ্ছে বাঁধন, কিন্তু প্রতিবারই ফলাফল সেই চরম শূন্য! বিগত চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে এই বিশাল শহরটা থেকেই যেন রূপাকে একদম হাওয়া করে দেওয়া হয়েছে। হতাশায় কখনো হয়তো ভেতর থেকে ভেঙে পড়ছে, আবার পরক্ষণেই রূপাকে যেকোনো মূল্যে খুঁজে বের করতেই হবে ভেবে নিজেকে নতুন করে শক্ত করছে।কিন্তু বারবার সেই একই ব্যর্থতা দেখে এবার আর নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারল না বাঁধন। দাঁতে দাঁত চেপে দেয়ালের ওপর সজোরে এক রক্তারক্তি ঘুষি বসিয়ে দিল সে। তার আঘাতের প্রচণ্ডতায় যেন পুরো কন্ট্রোল রুমটাই এক মুহূর্তে কেঁপে উঠল! উন্মাদের মতো রক্তবর্ণ চোখ জোড়া নিয়ে চিৎকার করে উঠল বাঁধন,

—-“ওকে পাওয়া যাচ্ছে না মানে? চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে ওকে নিয়ে কি ভিনদেশে চলে গেছে নাকি? শুনে রাখুন, আমার রূপকে যদি খুঁজে বের করতে না পারেন, তাহলে আপনাদের একটারও চাকরি আমি আস্ত রাখব না!”
বাঁধনের হিংস্র রূপ আর এমন হুমকির তোড়ে উপস্থিত পুরো পুলিশ বাহিনী ভয়ে রীতিমতো কাঁপতে শুরু করে দিল। ঠিক তখনই অখিল ধীরপায়ে এগিয়ে এসে বাঁধনের কাঁধে সান্ত্বনার হাত রেখে বলল,
—-“শান্ত হ বাঁধন! আমরা তো আমাদের সাধ্যের শেষটুকু দিয়ে চেষ্টা করছি। পুরো শহর খোঁজা শেষ, এমনকি ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রাম সবকটি বিভাগীয় শহরের পুলিশ একযোগে খুঁজে চলেছে। কিন্তু রূপাকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে সত্যি সত্যিই মাত্র একদিনের মধ্যে কেউ তাকে নিয়ে দেশ ছেড়ে চম্পট দিয়েছে!”
দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রয় বাঁধন। শক্ত করে চোখ দুটো বন্ধ করে বারবার ঘন ঘন বড় বড় শ্বাস ফেলতে থাকে । ঘরে ছেয়ে থাকা দমবন্ধ নীরবতার মাঝে অখিল কিছুক্ষণ ভেবে আবার হঠাৎ বলে উঠল,

—-“আচ্ছা বাঁধন, এখানে রজনী রহমানের হাত নেই তো?”
কথাটা কানে পৌঁছানোমাত্রই চট করে চোখ জোড়া মেলে তাকাল বাঁধন। মুহূর্তের মধ্যে বুকের গভীরে জমে থাকা আগুনটা দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। দুটো হাতের মুঠো শক্ত হয়ে বাঁধল । অনেক হয়েছে লুকোচুরি, আজ এই রজনী রহমানের মুখোমুখি সে হবেই! টেনে তার ওই নোংরা মুখোশটা আজ খুলে ছুড়ে ফেলবেই ।কথাগুলো মনে মনে স্থির করেই আর এক সেকেন্ড না দাঁড়িয়ে তরতর করে রুম থেকে বেরিয়ে এলো বাঁধন। তার পিছু পিছু অখিলও বেরিয়ে এলো। অখিলকে কী করতে হবে, চলতে চলতেই তা সংক্ষেপে বুঝিয়ে দিল বাঁধন। অখিলও গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে সায় দিল।
বাইরে অ্যান্সি, নিক্সি, ওমর, জেইন, বৃষ্টি আর আকাশ সবাই উৎকণ্ঠিত আর চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। বাঁধনকে ভেতর থেকে বের হতে দেখে আকাশ তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এসে বলল,

—-“খোঁজ পেলি?”
গাড়ির লক খুলে ভেতরে উঠতে উঠতে বাঁধন সংক্ষেপে জবাব দিল,
—-“না।”
গাড়িতে উঠে বসতেই পেছনে চুপচাপ অ্যান্সি, নিক্সি, ওমর আর জেইনও গিয়ে চেপে বসল। আকাশ বাঁধনের খোলা জানালা দিয়ে ভেতরে তাকিয়ে উদ্বেগের সঙ্গে শুধাল,
—-“কোথায় যাবি এখন?”
গাড়ির চাবি ঘুরিয়ে ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে বাঁধন ভারী কণ্ঠে বলল,
—-“বাড়ি।”
বাক্যটুকু শেষ হওয়ামাত্রই ঝড়ের বেগে ধুলো উড়িয়ে গাড়ি চালিয়ে বেরিয়ে গেল বাঁধন, পেছনে তার দেখানো পথ ধরে ফলো করল অখিল। আকাশও আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে নিজের গাড়ির দিকে দৌড়ে গেল। কিন্তু বৃষ্টিকে তখনও নিথর পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে গাড়ির জানালা নামিয়ে থমথমে গলায় বলল,
—-“এভাবে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে না থেকে গাড়িতে উঠে বসো!”

বৃষ্টির সারা শরীর ভয়ে আর আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছে, নিঃশব্দে নির্দেশ মেনে চুপচাপ উঠে বসল সে। চোখের জলে বুক ভেসে গেছে, পুরো ফ্যাকাশে মুখটায় কোনো অসাড়তা নেমে এসেছে যেন কোনো গভীর দুঃস্বপ্নের ঘোরে হারিয়ে গেছে । কাঁদতে কাঁদতে চোখ দুটো ফুলে জবা ফুলের মতো লাল হয়ে গেছে তার। রূপাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না কথাটা যতবার মনে পড়ছে, ততবারই কলিজাটা যেন আশঙ্কায় দুমড়ে-মুচড়ে কেঁপে উঠছে।
বাঁধনের গাড়ি সোজা এসে থামল রহমান ভিলার সামনে। পেছনে অখিলের গাড়ি আর আকাশের গাড়িও সশব্দে এসে দাঁড়াল।দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে বাড়িটার দিকে স্থির চোখে তাকাল বাঁধন। কত দিন পর আজ সে এই বাড়িতে পা রাখছে! নিজের জন্মভিটা হয়েও কেমন যেন অচেনা, বড় নিঃসঙ্গ ঠেকছে তার কাছে এই বাড়িটাকে। বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে ধীরে ধীরে সামনের দিকে পা বাড়াল; পেছনে বাকি সবাই নীরব অনুগামী হয়ে অনুগমন করল তাকে।দরজার সামনে দাঁড়িয়ে শক্ত থমথমে মুখে কলিং বেলে চাপ দিল বাঁধন।
ড্রয়িংরুমে বসে তখন রজনী রহমান রূপার নিখোঁজ হওয়া নিয়ে ন্যাকা কান্না কাঁদছিলেন, আর পাশে বসে শিলা রহমান তাকে নানাভাবে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। অন্য সোফায় মাথা নিচু করে থমথমে মুখে বসে আছেন আহসান রহমান, আতিক রহমান আর হাজি রহমান। শান্তাও আরেক কোনায় চুপচাপ বসে আছে। সবার চোখেমুখে এক রাশ আতঙ্ক আর দুশ্চিন্তার স্পষ্ট ছাপ।কলিং বেল বাজতেই শিলা রহমান এগিয়ে গিয়ে দরজাটা খুলে দিলেন। কিন্তু দরজা খুলতেই সামনে বাঁধনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার চোখ দুটো যেন কপালে ওঠার জোগাড়! চমকে উঠে অবাক কণ্ঠে তিনি বললেন,

—-“বাঁধন, তুই?”
বাঁধন একদম শান্ত, নির্ভাবন গলায় বলল,
—-“আসসালামু আলাইকুম কাকিয়া, কেমন আছো?”
শিলা রহমান সামলে নিয়ে হালকা মুচকি হেসে বললেন,
—-” ওলাইকুম আসসালাম,ভালো আছি,আয় বাবা ভেতরে আয়।”
বাঁধন পা বাড়াল ভেতরে। এতদিন পর হঠাৎ বাঁধনকে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে দেখে আহসান রহমান বসা থেকে একপ্রকার চমকে উঠেই দাঁড়িয়ে পড়লেন। তিনি ভাবতেও পারেননি তার এই মারাত্মক জেদি ছেলেটা কোনো দিন নিজ পায়ে এই বাড়িতে পা রাখবে!হাজারো অভিমান, জমাট বাঁধা ক্ষোভ আর ইগোর পাহাড় ডিঙিয়ে বাবা-ছেলের চোখাচোখি হলো। বাঁধন কয়েক মুহূর্ত নিথর চোখে আহসান রহমানের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপরই চুপচাপ চোখ সরিয়ে নিল।হাজি রহমানও তড়িঘড়ি করে উঠে এসে বাঁধনের হাত দুটো ধরে ব্যাকুল কণ্ঠে বললেন,

—-“দাদুভাই তুই? কেমন আছিস রে?”
বাঁধন মাথা নুইয়ে হাজি রহমানকে সালাম করে বেশ হালকা চালে বলল,
—-“আসসালামু আলাইকুম দাদু। তোমার নাতি ভালো নেই, কারণ তোমার নাতির বউ চুরি হয়ে গেছে! বউ ছাড়া কি আর ভালো থাকা যায়, বলো?”
হুট করে বাঁধনের মুখে এমন বেপরোয়া কথা শুনে বিষম খেয়ে কাশতে শুরু করলেন আহসান রহমান! শিলা রহমান তড়িঘড়ি করে গ্লাসে পানি ঢেলে তার দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
বাঁধন অবশ্য সেদিকে বিন্দুমাত্র পাত্তা দিল না। সে ধীরপায়ে হেঁটে গিয়ে সোজা রজনী রহমানের একদম সামনে গিয়ে দাঁড়াল। রজনী রহমান আড়চোখে একবার বাঁধনকে দেখে নিয়ে আবারও চোখ নামিয়ে তার সেই চেনা ন্যাকা কান্না চালু রাখলেন।চুপচাপ রজনী রহমানের মুখোমুখি গিয়ে বসল বাঁধন। তার তীক্ষ্ণ,দৃষ্টি একদম বিধে আছে রজনী রহমানের চোখের তারায়। হঠাৎ বাঁধন এভাবে রজনীর সামনে গিয়ে বসায় বাড়ির কেউ কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না এমনকি রজনী রহমান নিজেও কিছুটা হতভম্ব।রজনীর চোখের মনি জোড়ায় নিজের দৃষ্টি স্থির রেখে, বুকের ভেতরের পুরো হাহাকারটা এক করে আবেগঘন বরফশীতল কণ্ঠে বাঁধন বলে উঠল,

—-“আপনার যা চাই টাকা, গাড়ি, বিশাল বাড়ি কিংবা পুরো সম্পত্তি সব আপনি লিখে নিন! আমার কিচ্ছু চাই না। শুধু আমার বউটাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিন, দয়া করে ওর যেন কোনো ক্ষতি না হয়। আমার রূপের কোনো ক্ষতি হলে আমি সহ্য করতে পারব না। আল্লাহ আমাকে দুনিয়ার সবকিছু দিয়েছেন ঠিকি, কিন্তু ওর কষ্ট সহ্য করার মতো কোনো ক্ষমতা আমার বুকে দেননি! বিশ্বাস করুন, ওর গায়ে একটু আঁচ লাগলে আমার বুকে রক্তক্ষরণ হয়, ওর ওপর কোনো বিপদ এলে আমার নিশ্বাস আটকে আসে।”
বাঁধনের হঠাৎ এমন মন ছোঁয়া, আকুল করা কথায় পুরো ড্রয়িংরুম থমকে গেল। বাড়ির প্রতিটি মানুষ যেন স্তব্ধ হয়ে গেল তার ভেতরের গভীর ভালোবাসা আর হাহাকার দেখে।
ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠলেন রজনী রহমান। বুকের ভেতর তুফান উঠলেও নিজের কাঁপতে থাকা গলাটা কোনোমতে সামলে তোতলাতে তোতলাতে বললেন,

—-“এ-এসব কী বলছ তুমি বাঁধন? আমি, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না!”
বাঁধন এবার দৃষ্টি আরও কঠোর করে সামান্য ঝুঁকে এসে একদম সোজাসুজি বলল,
—-“আমার রূপ কোথায়? ওকে ফিরিয়ে দিন! ওর নামে ভিটের যত সম্পত্তি আছে, আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সেগুলো সব আপনাদের নামে লিখে দেওয়ার ব্যবস্থা করব তাও হাতজোড় করে অনুরোধ করছি, আমার রূপকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিন!”
বাঁধনের এমন অপ্রত্যাশিত কথায় ঘরের বাকি কেউ আগামাথা কিছুই বুঝতে পারছে না। আতিক রহমান কিছুটা থতমত খেয়ে এগিয়ে এসে বললেন,
—-“বাঁধন, কী বলছিস এসব? কিসের সম্পত্তি? আমরা তো কিছুই বুঝতে পারছি না!”
বাঁধন কিন্তু রজনী রহমানের ওপর থেকে দৃষ্টি সরাল না। ওই অবস্থাতেই বরফশীতল কণ্ঠে উত্তর দিল,
—-“যে বোঝার, সে ঠিকই বুঝেছে কাকা। আপনি চুপচাপ শুনুন, সময় হলে সব বুঝতে পারবেন।”
রজনী রহমান মুখে আর কোনো কথা ফোটাতে পারছেন না; বাঁধনের দৃষ্টির আগুনে তার সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। বাঁধন আবারও তার দিকে এক কদম এগিয়ে গিয়ে ঝুঁকে পড়ে বলল,

—-“আমাকে উন্মাদ হতে বাধ্য করবেন না, রজনী রহমান! বিশ্ব জয় করে আমি শান্ত হয়ে আছি। তাই এখনও ভদ্রভাবে বলছি, চুপচাপ বলুন আমার রূপ কোথায়?”
রজনী রহমান আমতা আমতা করে কাঁপা গলায় বললেন,
—-“বাঁধন তুমি এসব কী বলছ? রূপা কোথায় তা আমি কীভাবে বলব? আমি তো নিজের মেয়ের চিন্তায় শেষ হয়ে যাচ্ছি!”
বাঁধন ঠাণ্ডা গলায় গর্জে উঠল,
—-“এই মিথ্যা অভিনয়টা বন্ধ করুন! এখনও ভালোয় ভালোয় বলছি, আমার রূপ কোথায়?”
রজনী রহমান এবার আহসান রহমানের দিকে অসহায় চোখে তাকিয়ে কান্নার নাটক করে বললেন,
—-“দেখুন আহসান সাহেব, এসব কী বলছেন বাঁধন! আমি কীভাবে জানব রূপা কোথায়? আপনার ছেলের কি মাথা নষ্ট হয়ে গেছে?”
কথাটা শোনামাত্রই বাঁধনের ধৈর্যের শেষ বাঁধটাও ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।উন্মাদের মতো সোফা থেকে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল সে। ডাইনিং টেবিলের ওপর রাখা ধারালো ফল কাটার ছুরিটা সজোরে টান দিয়ে হাতে তুলে নিল। তারপর চোখের পলকে রজনী রহমানের কাছে গিয়ে সেই ধারালো ছুরিটা সোজা তার গলায় চেপে ধরল!রজনী রহমান আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠার আগেই বাঁধন তার রক্তবর্ণ চোখ দুটো সামনে এনে দাঁতে দাঁত চেপে কামড়ে কামড়ে বলল,

—-“রূপ বিপদে পড়লে বাঁধনের শুধু মাথাই নষ্ট হয় না বাঁধন তখন জ্যান্ত জানোয়ার হতে পারে, এমনকি রক্তচোষা খুনিও হতে পারে,মিসেস রজনী রহমান।”
আহসান রহমান এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। বাঁধনের উগ্র রূপ দেখে ঝড়ের বেগে সামনে এগিয়ে এসে গর্জে উঠলেন,
—-“স্টপ ইট বাঁধন! পাগল হয়ে গিয়েছিস তুই? এটা কোন ধরনের বেয়াদবি?”
বাবার অগ্নিগর্ভ চোখের দিকে একচুলও ভয় না পেয়ে সরাসরি তাকাল বাঁধন। তারপর থমথমে গলায় বলল,
—-“আমার রূপকে ফিরিয়ে আনতে হলে যদি আমাকে পাগলামি আর বেয়াদবিই করতে হয়, তাহলে আমি সেই পাগলামি আর বেয়াদবিই করব!”
আহসান রহমান তীব্র ক্ষোভে হাত উঁচিয়ে বললেন,
—-“কী সব হাবিজাবি বলছিস তুই? রজনী কীভাবে জানবে রূপা কোথায়?”
ছুরিটা রজনী রহমানের গলায় আরও একটু চেপে ধরে বাঁধন হিমশীতল কণ্ঠে জবাব দিল,
—-“এই নষ্ট মহিলা সব জানে! এই মহিলাই পারবে আমার রূপকে এনে দিতে। মিস্টার আহসান রহমান, আপনার বউকে বলুন আমার বউকে ফিরিয়ে দিতে, তা না হলে আপনার এই বউকে খুন করতে আমি এক সেকেন্ডও দ্বিধা করব না!”

কথাটা শুনে চরম ক্রোভে ফেটে পড়লেন আহসান রহমান। নিজের চোখ-কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না তিনি। সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যেতেই সজোরে বাঁধনের গালে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিতে হাত তুললেন তিনি!ঠিক থাপ্পড়টা বাঁধনের গালে এসে লাগার আগের মুহূর্তেই ঘরের পুরো নিস্তব্ধতা কাঁপিয়ে বাঁধনের পকেটের ফোনটা তীক্ষ্ণ সুরে বেজে উঠল।রিংটোনের সুরটা বাতাসের সুতোয় ছড়িয়ে পড়ল,
‘বাবা মানে হাজার বিকেল আমার ছেলেবেলা
বাবা মানে রোজ সকালে পুতুল পুতুল খেলা’
‘বাবা মানে কাটছে ভালো, যাচ্ছে ভালো দিন’
বাবা মানে জমিয়ে রাখা আমার অনেক ঋণ’
মাঝপথেই থেমে গেল আহসান রহমানের হাত। বুকের ভেতরটা তীব্র এক মোচড় দিয়ে কেঁপে উঠল তার। রিংটোন তখনো বেজেই চলেছে কত মায়াবী, মধুর সুরে ওই রিংটোনে এক কন্যাসন্তান তার বাবার ভালোবাসার অর্থ বুজিয়ে চলেছে।পুরো ঘর এক মুহূর্তের জন্য যেন পাথরের মতো নিচ্ছল, স্তব্ধ হয়ে গেল। অখিলের চোখ থেকে নিঃশব্দে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল, এমনকি আকাশের চোখ দুটোও ভিজে উঠল পানিতে। অ্যান্সি, নিক্সি, ওমর, জেইন সবার চোখেই পানি! কারণ এরা বাঁধনের সবচেয়ে কাছের মানুষ এই বিশেষ রিংটোনটির পেছনের রক্তভেজা ইতিহাস আর বাবার আবেগ তাদের খুব ভালো করেই জানা।
বাঁধন একটা বিষাদের হাসি হেসে আহসান রহমানের দিকে তাকিয়ে বলল,

—-“হাত থামালেন কেন? মারুন! একটা নয়, যত ইচ্ছে মারুন আমাকে মেরে যদি আপনার বুকের আগুন একটুও কমে, তবে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? মারুন!”
আহসান রহমান আর কোনো কথা ফোটাতে পারলেন না মুখে। কোনোমতে পা টেনে এনে নিথর হয়ে সোফায় বসে পড়লেন।অখিল আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। শক্ত পায়ে এগিয়ে এসে সবার মাঝখানে দাঁড়িয়ে উচ্চকণ্ঠে বলল,
—-“আজ আপনাদের এই তথাকথিত সম্মানিত পরিবার থেকে আমি এক বিশ্বমানের রূপসী অভিনেত্রীর মুখোশ টেনে খুলে দেব!”
সবাই চরম কৌতূহল আর ব্যাকুলতা নিয়ে অখিলের দিকে তাকাল। অখিল সাথে আনা ল্যাপটপটা বের করে ডাইনিংয়ের উঁচু টেবিলটার ওপর রাখল, যাতে ঘরসুদ্ধ সবাই দেখতে পায়। পেনড্রাইভ কানেক্ট করে ল্যাপটপে প্রথম ফুটেজটা প্লে করল সে যেখানে বাঁধন আর অখিল মারুফ হোসেনের সাথে মুখোমুখি কথা বলছিল। একই সাথে অডিও রেকর্ডটাও স্পিকারে ছেড়ে দিল অখিল।
ড্রয়িংরুমের সবাই স্তম্ভিত হয়ে সেদিকে তাকিয়ে শুনতে লাগল। স্ক্রিনে মারুফ হোসেনের মুখ আর তার কথা শোনামাত্রই রজনী রহমানের সারা শরীর বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে আসতে লাগল! ঘন ঘন বড় বড় ঢোক গিলতে লাগলেন তিনি। মারুফ হোসেনের জবানবন্দিতে রূপার আসল পরিচয় এবং রজনী রহমানের অতীতে করা হাড়হিম করা প্রতারণার কথা শুনে উপস্থিত সবার চোখ যেন কপালে উঠে গেল!
আহসান রহমান ঝড়ের বেগে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে না পেরে চিৎকার করে উঠলেন,

—-“হোয়াট! রূপা রজনীর নিজের মেয়ে না? ও কানাডার খ্রিস্টান পরিবারের মেয়ে?!”
শিলা রহমানের মাথা ঘুরে ওঠার জোগাড় হলো। অখিল বরফশীতল গলায় বলল,
—-“গল্প কিন্তু এখানেই শেষ নয় আহসান আঙ্কেল! আসল খেলা তো কেবল শুরু, আরো দেখাচ্ছি।”
কথাটা বলেই অখিল আরেকটা ভিডিও ফুটেজ প্লে করল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল রজনী রহমানের ঘরের গোপন দৃশ্য যেখানে নিজের রুমে বসে গোপনে কারও সাথে ফোনে কথা বলছেন তিনি। এতদিন ধরে রজনী রহমান ঘরের কোণে বা বাড়ির যে যে নির্জন জায়গায় গিয়ে ষড়যন্ত্রের ফোনালাপ করেছেন, অখিলের টিম তার প্রতিটি ভিডিও আর অডিও রেকর্ড করে এনেছে। একে একে সেইসব ভয়ঙ্কর বার্তা ড্রয়িংরুমের স্পিকারে বাজতে শুরু করল!
সব কথা শোনার পর মনে হলো যেন গোটা রহমান পরিবারের মাথার ওপর কোনো এক বিশাল পাহাড় ভেঙে পড়ল!আহসান রহমান তীব্র যন্ত্রণায় বুক চেপে ধরে সোফায় ঢলে পড়লেন। তার বুকের ভেতরটা যেন খাঁ খাঁ আগুনে ছাই হয়ে যাচ্ছে। যেই মহিলার জন্য তিনি নিজের কলিজার টুকরো, নিজের জন্ম দেওয়া সন্তানের গায়ে হাত তুলেছেন, পরম আদরে একটা মিষ্টি কথাও বলেননি, যার কথা শুনে নিজের ছেলেকেই সারা জীবন ভুল বুঝে এলেন আর সেই মহিলা কিনা এতটা নিচ, এতটা জঘন্য চক্রান্তকারী!রজনী রহমানের অবস্থা তখন একদম জ্ঞান হারানোর মতো! মাথা ঝিমঝিম করছে তার, চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে আসছে। তিনি কিছুতেই মাথায় মেলাতে পারছেন না বাড়ির ভেতরে এসব ভিডিও আর অডিও গোপন রেকর্ড কখন আর কে করল!অখিল ধীরপায়ে রজনী রহমানের একদম সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মুখে এক চিলতে বিষাক্ত বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল,

—-“কী আন্টি, বড্ড অবাক হচ্ছেন তো? ভাবছেন আমরা এসব গোপন দৃশ্য কীভাবে রেকর্ড করলাম? আরে, আমরা কষ্ট করে দাঁড়িয়ে থেকে রেকর্ড করিনি, রেকর্ড করেছে সিসি ক্যামেরা!”
পুরো ড্রয়িংরুম থমথমে, যেন নিশ্বাস ফেলার শব্দটুকুও উধাও হয়ে গেছে। অখিল ঘরের মাঝখানে চারপাশ ঘাসের মতো পায়চারি করতে করতে হালকা চালে বলল,
—-“এই বাড়ির প্রতিটি আনাচে-কানাচে, প্রতিটা গোপন কোণে অডিও রেকর্ডার আর সিসি ক্যামেরা বসানো আছে। আর এই খবরটা এই বাড়ির কোনো মাছিও জানত না! শুধু জানতাম আমি আর বাঁধন। কারণ এই পুরো মাস্টারপ্ল্যানটাই ছিল বাঁধনের! আর শুধু ড্রয়িংরুম বা গলি নয় আন্টি, বাঁধনের নিজের ঘরেও সিসি ক্যামেরা লাগানো ছিল। সেদিন যদি ওই ক্যামেরাটা না থাকত, তবে শান্তার সাজানো ওই নোংরা চক্রান্ত থেকেও হয়তো আমার বন্ধুটা নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করে বাঁচিয়ে আনতে পারত না!”
কথাটা কানে পৌঁছানোমাত্রই লজ্জায় শান্তার ফ্যাকাশে মুখটা একদম মাটির দিকে নুয়ে এলো। অখিল আড়চোখে দৃশ্যটা দেখে ঠোঁটের কোণে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে তুলল।অন্য দিকে, আকাশ আর বৃষ্টি দুজনেই পুরো থ মেরে গেছে! রূপা কোনো সাধারণ বাংলাদেশি মেয়ে নয়? ও কানাডার বিশাল খ্রিস্টান মাফিয়া পরিবারের মেয়ে?!আকাশ একদম ঘোরের মাঝে বৃষ্টির কাঁধে হাত রেখে বিস্ময়ভরা কণ্ঠে শুধাল,

—-“তার মানে রূপা মাফিয়ার মেয়ে? তাই না, বৃষ্টি?”
বৃষ্টিও সেই চরম বিস্ময়ের ঘোর থেকে বের হতে না পেরে থমথমে গলায় জবাব দিল,
—-“হ্যাঁ স্যার ও আমাদের মতো সাধারণ বাংলাদেশি নয়, ও বিদেশি মাফিয়ার মেয়ে,যার নাম ইথান প্রিসিয়া।”
বাঁধন একটা দীর্ঘ আর ভারী শ্বাস ফেলল। তারপর ধীরহেসে রজনী রহমানের গলা থেকে ধারালো ছুরিটা সরিয়ে নিল। একদম বরফশীতল, থমথমে গলায় বলল,
—-“এখনও কি আপনি সেই পুরোনো নাটকটাই চালিয়ে যাবেন? দেখুন, আমি আপনার কোনো ক্ষতি করতে চাই না শুধু ভালোয় ভালোয় বলুন, আমার রূপ কোথায়?”
রজনী রহমান আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে থরথর গলায় বললেন,
—-“আমি আমি সত্যি কিচ্ছু জানি না!”
বাঁধন এবার আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল না। সোজা ছুরিটার চোখা আগালটা রজনী রহমানের বুকের বাঁ পাশে চেপে ধরে হিংস্র গলায় বলল,

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩৯

—-“মিথ্যা কথা! একটা কথা একদম পরিষ্কার মাথায় ঢুকিয়ে রাখুন, মিসেস রজনী রহমান”
কথাটা মাঝপথে থামিয়ে হিংস্র বাঘের মতো দাঁতে দাঁত চেপে বাঁধন আবার গুমরে উঠল,
—-“আমার রূপের যদি সামান্যতম কিছু হয়ে যায়, তবে আমি খুব বেশি কিছু করব না! শুধু এই ধারালো ছুরিটা আপনার বুকের বাঁ দিক দিয়ে ঢুকিয়ে পিঠ দিয়ে বের করে আনব তারপর অত্যন্ত যত্ন নিয়ে আপনার কলিজাটা টেনে বাইরে বের করে আনব, আর আপনার নিজের চোখের সামনেই সেই জ্যান্ত কলিজাটাকে দু-খণ্ড করে ছিঁড়ে ফেলব!”

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৪১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here