দুইজনাতেই পর্ব ৪৩
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
“ আপনার ভার্সিটির সিনিয়র হই মিস। আপনার ফ্রেন্ডের থেকেই নিয়েছিলাম নাম্বারটা। ”
দ্বিতী উত্তরটা শুনেই ভ্রু কুঁচকাল। কিয়ান বলেছি কোন সিনিয়র যেন খোঁজ করছে। এই সে নাকি? পরমুহূর্তেই বলল,
“ তো?”
সাক্ষ্য এবারে বোধহয় বুঝে গেল যে তার বউ খট করেই কলটা রেখে দিবে। তাই দ্রুতই বলল,
“ কল রাখবেন না প্লিজ। ”
দ্বিতী বোধহয় এই পর্যায়ে খুব বিরক্ত হলো। ঠিক পরমুহূর্তেই আন্দাজ করল এটা বোধহয় সাক্ষ্য। হ্যাঁ, সাক্ষ্যই! বুঝে উঠে দ্রুতই গলা শক্ত করে বলল,
“আমাকে আমার মতো থাকতে দিন একটু সাক্ষ্য৷ আমি আমার মতোই থাকতে চাই আপাতত। ”
কথাটা শক্ত কন্ঠেই বলল দ্বিতী। সাক্ষ্য এই পর্যায়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মুহূর্তেই বলল,
“ দ্বিতী..প্লিজ। কল রাখবে না দ্বিতী। আমার অনুরোধ। প্লিজ.. ”
সাক্ষ্যর গলাটা এমনই ফুটল যেন খুব আকুতি নিয়েই বলল। সে আকুতি শুনেই বোধহয় দ্বিতী থমকাল। ফোন না রেখে শুনল। ওপাশ থেকে সাক্ষ্য ফের বলল,
“ আমার ঠিকটা ব্যখ্যা দেওয়ার মতো হলেও তো আমায় একটা সুযোগ দাও দ্বিতী। একটা সুযোগ। দ্বিতী?”
দ্বিতী উত্তর করল না। শুধু চুপচাপ শুনল। সাক্ষ্য ফের আবার ও বলল,
“ জঘন্য অপরাধে অভিযুক্ত আসামীদেরও তো তাদের অপরাধ যাচাইয়ের সুযোগ দেওয়া হয় দ্বিতী। আমার বেলা কি তাও হবে না? আমি বিনা দোষেই তোমার কাছে দোষী সাব্যস্ত হয়ে গেছি? ”
দ্বিতী এই পর্যায়ে চোখ বুঝে। দোষী সাব্যস্ত হওয়া কি উচিত নয়? সাক্ষ্য কি কখনো বলেছে সে দ্বিতীকে ভালোবাসে? বলেছে মন থেকে বিয়ে করেছে? বলেনি তো। দ্বিতী ধীর স্বরে বলল,
“ দোষ নয়। আপনার তো কাউকে নিজের বউ করার ইচ্ছে থাকতেই পারে। স্বাভাবিক এটা। আমি আপনাকে দোষী হিসেবে দেখছি না মিস্টার সাক্ষ্য এহসান।”
“ দেখছো বলেই আমায় এমন ছন্নছাড়া একটা জীবন দিয়ে সরে গেলে হুট করে। এমন একটা ভাব করছো যেন তুমি আমায় চেনো না, জানো না। বাসা থেকে অব্দি বের হও না। কথা বলো না। আমার দোষটা কি দ্বিতী? আমার দোষ টা কি? জানো দ্বিতী? আমি না নিতে পারছি না। এই দূরত্বটা নিতে পারছি না। আমার..আমার তোমাকে চাই দ্বিতী। তোমার ঝগড়া, চঞ্চলতা সব চাই। আমি তোমাতে খুব কঠিনভাবে অভ্যস্ত দ্বিতী। প্লিজ..প্লিজ ফিরে আসো… ”
এইটুকু বলেই থামল সাক্ষ্য। ফের আবারও বলল,
“ আমি কাউকে নিজের বউ করতে চাইনি দ্বিতী। কণাকেও না।বরং ওর সাথে বিয়েটায় আমি নিজেই রাজি হইনি কেবল৷ বোনের নজরে দেখেছিলাম বলে নিজেই বিয়েটা ক্যান্সেল করেছিলাম। নিজেই বলেছিলাম এটা কখনো সম্ভব না। ”
দ্বিতীর চোখ বেয়ে এবার দু ফোটা জল গড়াল। স্পষ্ট চোখে ভাসছে কণার হাতের রিংটা। বলেছিল বিয়ের জন্যই পরানো হয়েছিল। নিশ্চয় সাক্ষ্যই পরিয়েছে? যদি বিয়েতে রাজি নাই থাকত, তাহলে বুঝি রিং পরাত? দ্বিতী হাসল মৃদু। ঠোঁট চেপে কান্না দমিয়ে আচমকাই বলে উঠল,
“ শুনতে চাই না। চেয়েছি আমি শুনতে সাক্ষ্য? চাইনি। ভালো থাকুন। আমিও ভালো থাকি। বাই।”
এটুকু শক্তস্বরে বলেই দ্বিতী দ্রুত কল রাখল। অতঃপর ফোনটা ছুড়ে মারল বিছানার এককোণে। যে সাক্ষ্যে কন্ঠ শোনার জন্য একটা সময় ছটফট করত সে সাক্ষ্যর কন্ঠ শোনার তার ইচ্ছে আসছে না। যে সাক্ষ্যকে দেখার জন্য ছটফট করত সে সাক্ষ্যর দিাে সে একবার চোখ তুলে তাকায়নি। এটাই কি মনের অসুখ?
দ্বিতী আজকের রাতটাও জেগেই কাটাল৷ ঘুম হয়নি। চোখে বসেছে নির্ঘুম রাত্রির চিহ্ন হিসেবে কালির আস্তরণ। দ্বিতী রাতের ঘুমটা গেল সকালে। একটা ছোট্ট ঘুমের ঔষধ সেবন করে যখন ঘুম দিল ঠিক তখনই কথা এল ওদের বাসায়। কথা এই নিয়ে তিনদিন এসেছে। প্রতিবারই দুর্ভাগ্যবশত দ্বিতীর সাথে কথা বলার সুযোগ হয়ে উঠেনি তার।কথা সেদিনের ঘটনাটা সম্পর্কে জেনেছিল বাসার সবার থেকেই। বিশেষ করে সাজিয়া আফরোজের কাছ থেকে। মানুষটা কথাকে এতবার বলছিল কোনভাবে দ্বিতীকে বুঝাতে, কোনোভাবে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে তা দেখে বোধহয় কথার নিজেরই খারাপ লাগছিল। সাজিয়া আফরোজ নিজেও চার পাঁচদিন দ্বিতীদের বাসায় এসেছেন। শুধুমাত্র দ্বিতীর সাথে কথা বলবেন বলে। অথচ সে ভাগ্য হয়ে উঠেনি। অদিতি আহমেদ নিজেই বান্ধবীর প্রতি থাকা অভিমান আর অভিযোগ থেকে বান্ধবীকে মেয়ের কাছে পৌঁছাকে দেননি। বরং মেয়ের ভালোর জন্য মুখের উপর না বলেছে।
তাছাড়া সাক্ষ্য সেদিনের পর থেকে বাসায় ফেরে না ঠিকঠাক। এই এতগুলো দিন সে একটাবারও বাসায় ঠিক সময়ে ফিরেনি কখনো ভোর হলে ফিরেছে, কখনো চারটা কি পাঁচটায় কখনো বা ফিরেইনি বাসায়। কথার সাথে কয়েকবার কথা হলেও তার আম্মু,আব্বুর সাথে সাক্ষ্যর খুব কমই কথা হয়। এই যে এতোটা রাত অব্দি বাইরে থাকে সে নিজ থেকে একটাও কল করেনা। শুধু প্রথমদিন কল করে জিজ্ঞেস করার পর বলেছে চিন্তা না করতে। সে বন্ধুর বাসায় আছে। মাঝখানে আর কথা বলেনি ছেলেটা। এই বিষয়গুলো নিশ্চয় খুব গুরুতরই?
কথা ছোটশ্বাস ফেলে। বান্ধবীকে ঘুমন্ত অবস্থায় বিছানায় এলোমেলো হয়ে পড়ে থাকতে দেখে ছোটশ্বাস ফেলল। অতঃপর সাক্ষ্যকে কল করে মৃদুস্বরে বলল,
“কোনভাবে এই সমস্যাটা সলভ করা যায় না ভাইয়া? আর কতদিন? দ্বিতী র মতো ঘুমপাগল মেয়েটাও ঘুমের মেডিসিন নিয়ে ঘুমায় ভাইয়া। তুমিও বাড়ি ফিরো না। সারারাত কোথায় ই বা থাকো? তোমার কি মনে হয় না তোমরা আগের চেয়েও ছন্নছাড়া সম্পর্কে চলে যাচ্ছো? ”
সাক্ষ্য তখন ভার্সিটিতেই ছিল। জানত কথা আজ যাবে। তাই চাতক পাখির মতো অপেক্ষাই করছিল কখনো দ্বিতীর সম্পর্কে শুনতে পাবে। কখনো দ্বিতীকে একটাবার দেখতে পাবে। সাক্ষ্য ওভাবেই আহত স্বরে বলল,
“ আমাকে সুযোগটা কে দিচ্ছে কথা?কেউ না। আমায় একবার এক্সপ্লেন করার সুযোগটাও দিল না কেউ। আমারই ভুল। আগে বুঝিয়ে উঠতে পারিনি যে আমি তাকে ভালোবাসি। আর এখন বুঝাতে চেয়েও সময়,সুযোগ কিছুই পাচ্ছি না। দুর্ভাগ্য।”
“ ওর জায়গাটাও ভুল কোথায়? সেদিন কতোটা কষ্ট করে কেক বানিয়েছিল জানো? জীবনে প্রথম কেক বানিয়েছে। এতোটা চেষ্টা করে, কষ্ট করে কার জন্য কেক বানিয়েছিল? তোমার জন্য, নিজের হাজব্যান্ডের জন্য। তারপর হুট করেই জানল যে যে সাজি আম্মু তাকে এতোটা ভালোবাসা দেখাল সে অন্য কাউকে বউ করতে চেয়েছে। এমনকি হাতের রিংও দেখিয়েছিল কণা। সবাই মিলে যদি ওকে চারদিক থেকে বলে ও যে জায়গাটায় এসেছে তা কারোর করুণা, দয়া তো মেয়েটার আত্মসম্মানে লাগবে না?ও তো দ্বিতী। চিনো তো তুমি ওকে।”
সাক্ষ্য শুনল। ভঙ্গুর একটা হাসি হেসে বলল,
“ চিনি। কিন্তু আমার কি আরোও একটা সুযোগ প্রাপ্য ছিল না কথা?”
কথা আর উত্তর করল না। হুট করেই কল রাখল। সুযোগ? হয়তো প্রাপ্য ছিল। হয়তো না, ছিলই। কিন্তু সে সুযোগটা দ্বিতী না দিলে?
দ্বিতীর শরীরটা উত্তপ্ত। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে মেয়েটার। এমন অবস্থাতেই বিছানায় ঘুমিয়ে আছে এলোমেলো হয়ে। সাদিকুর রহমান মেয়ের অবস্থা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কোথাও গিয়ে কি তারই কৃতকর্মের ফল ভুগতে হচ্ছে মেয়েটাকে? কোথাও কি সে যে কষ্টটা অদিতি আহমেদকে উপহার দিয়েছিলেন তাই তার মেয়ের কাছে ফেরত এলো? সাদিকুর রহমানের এই বয়সে এসেও তীব্র অপরাধবোধে হাঁসফাঁস করলেন। মেয়ের কপালে দীর্ঘ এক চুম্বন এঁকে কাঁদলেন নিরবে। যে কান্না সে কাউকে দেখায়নি এতগুলো দিন। যে কান্না তার এতগুলো বছরের সঙ্গী। সাদিকুর রহমান ওভাবেই বিড়বিড় করে বললেন,
“ আব্বু সরি আম্মু। আব্বু সরি। কোনভাবে কি আব্বুকে ক্ষমা করে দেওয়া যায় না আম্মু? এইযে তুমি একদম তোমার আম্মুর মতোই হয়েছো এতে আমার আফসোস হয় না। আমি খুশি হতাম। উৎফুল্ল হয়ে চেয়ে থাকতাম। অনুভব করতাম, অদিতির মতোই ছোট্ট দ্বিতীটাকে। অথচ আজ সে দ্বিতী আমার সাথে ঠিকমতো কথা বলছে না। আব্বু আব্বু করছে না। এটা ওটা আবদার করছে না। আমার যে বড্ড দুঃখ হয় মা। অপরাধের ভারে নিঃশ্বাস নিতে পারি না। তোমার এই ভাঙা সংসারের সম্বোধনটুকুর জন্য তো আমিই দায়ী আম্মু। আমিই! তখন যদি আরেকটু যত্ন নিয়ে তোমার মাকে আগলে নিতাম তাহলে কি এমন হতো? এতকাল নিঃসঙ্গ, অপরাধবোধ নিয়ে একটা জীবন কাটাতে হতো আমায়? আম্মু..আম্মু? তুমিও প্লিজ তোমার আম্মুর মতো করে আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না। নিও না প্লিজ। তোমার আব্বুর যে আর কেউ নেই। ”
সাদিকুর রহমানের চোখজোড়া লাল টকটকে। এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল ঠিক দ্বিতীর কপালটাতেই। সাদিকুর রহমান সঙ্গে সঙ্গেই চোখ মুঁছলেন। অতঃপর সোজা হয়ে বসলেন। সে যুবক বয়সে অদিতি আহমেদেন জন্য পাগল ছিল এই সাদিকুর রহমান। কি ভীষণ প্রেম তখন। দুইজনই একই বয়সের ছিলেন। প্রথমে বন্ধুত্ব, তারপর প্রেম, তারপর সংসার! এই এত এতকিছুর পর যখন অদিতি আহমেদকে রেখে দ্বিতীয়বার উনি নিজের খালাতো বোনকে বিয়ে করেছিলেন তখন অদিতির প্রতি ছিল তার সুক্ষ্ম এক রাগ, মায়ের অসুস্থতার ভান এমন কি কতশত পারিবারিক কারণ। কোন না কোন ভাবে বোধহয় উনি এটাও দেখাতে চেয়েছিলেন যে অদিতি আহমেদকে ছাড়াও তার চলে। অদিতি আহমেদের জন্য যে সে পাগল এই ধারণা ভুল করতেই বোধহয় চেয়েছিলেন। অথচ উনি নিজেই জানতেন না যে, সে নিজেই ছিল আপাদমস্তক ভুল। অদিতি আহমেদকে ছাড়া সত্যিই তার চলে না। সে সত্যিই অদিতি আহমেদের জন্য পাগল, মরিয়া! অথচ সে অদিতি আহমেদ এরপর ভুলেও আর তাকে ঠাঁই দেইনি। ভুলেও না। কারণ ঐ যে। ঐ মানুষটার আত্মসম্মান অনেক। বোধহয় সে সন্তানসম্ভাবা এই কথাটা এক সপ্তাহ পর জানতে না পারলে এবং কয়েকমাস পর দ্বিতীর জন্ম না হলে নিজের এই সামান্য যোগাযোগটুকুও থাকত না। থাকত না তো। মেয়ের জন্যই তো তারা এই যোগাযোগটুকু রেখেছিল কেবল! অথচ দীর্ঘ সময়ে এই ভালোবাসাটুকু দুইজনের হৃদয়েই পরিত্যাক্ত এক বস্তুর মতো জমে আছে কত কত বছর যাবৎ।
দ্বিতী উঠল বেলা করে। অতঃপর দুইহাতে আলগোছে চুল বাঁধল। গায়ে তখন অল্প জ্বর। মা বোধহয় ঘুমানোর মধ্যে জলপট্টি দিয়েছে। তাইতো জ্বর কমে এল। দ্বিতী পাশের পানির বাটিটা দেখেই তা আন্দাজ করল। অতঃপর পা বাড়িয়ে মুখচোখে পানি দিয়েই রান্নাঘরে গেল। দ্বিতী আজকাল চুপচাপ ঘরের কাজ সব করছে। ঘরের সব কাজ শিখছে। রান্নাবান্না করছে। এমনকি মাছ কাটা, মাংস কাটা, সবজি কাটা সব নিজেই করার চেষ্টা করছে। বোধহয় দক্ষ সংসারী হওয়ারই প্রচেষ্টা । দ্বিতী মায়ের পাশে দাঁড়িয়েই ভাত বসাল। ফ্রিজ থেকে মাছ বের করে ভেজাতে দিয়ে আচমকা প্রশ্ন করল,
“ আম্মু,সাজি আম্মুর সাথে সম্পর্কটা ঠিক করে নাও। শুধু শুধু আমার জন্য কেন বন্ধুত্বটা ভাঙছো? ”
অদিতি আহমেদ শুনলেন। শুনেই বললেন,
“ বন্ধুত্ব? যেখানে আমার নিজের মেয়েটাকেই ভেঙচুড়ে চূড়মার করে দিল সেখানে বন্ধুত্ব নিয়ে ভাবব?”
দ্বিতী হাসল। বলল,
“ বোধহয় সৃষ্টিকর্তা যা করেন ভালোর জন্যই করেন। এই যে তোমার মেয়ে এখন কাঁদে না। স্ট্রং হয়ে গেল। ভালোই তো। ”
দ্বিতী এইটুকু বলেই আর কথা বাড়াল না। রান্নায় মনোযোগ দিল। মনে মনে আওড়াল,
“ এই পৃথিবীর যে কেউ যে কোন সময় বদলাতে পারে আম্মু। যে কোন সময়!”
সাক্ষ্যর আম্মু সাজিয়া আফরোজ নিজের ছেলের এই পরিবর্তনটুকু বোধহয় মানতে পারলেন না। এই যে রাতভর বাইরে থাকা, ভালো ভাবে খাওয়াদাওয়া না করা, এমনকি চোখের নিচে কালি ফেলেছে। দাঁড়িগুলো অযত্নে বেড়ে উঠেছে। চুলগুলোও উষ্কুখুষ্কু। অথচ এই সাক্ষ্যই আগে কি পরিপাটি হয়ে ভার্সিটিতে যেত। সাজিয়া আফরোজের দুঃখ হয়৷ নিজ সন্তানের দুঃখ বুঝি কেউ এভাবে সইতে পারে? উনিও সইতে পারলেন না। ছেলের গা টা গরম। জ্বর! এতোটা জ্বর যেন গা পুড়ে যাচ্ছে। অথচ সে জ্বর নিয়েই ছেলেটা বাসায় ফিরল রাত চারটায় । সাজিয়া আফরোজ ছেলের বিধ্বস্ত রূপ দেখে ই প্রথমে খেতে ডাকলেন। এতোটা সময় অব্দি ছেলের জন্য জেগে থাকার পর যখন খেতে ডাকলেন তখন সাক্ষ্যর নির্লিপ্ত স্বর,
“ খাব না আম্মু। ক্ষিধে নেই। ”
অতঃপর এই কথা শুনেও যখন হাত টেনে খেতে নিয়ে আসতে লাগলেন তখনই টের পেলেন সাক্ষ্যর গাভর্তি জ্বর। এতোটা জ্বর যে গায়ের চাড়াটা উত্তাপ ছড়াচ্ছে। সাজিয়া আফরোজ যখন জিজ্ঞেস করল সাক্ষ্য তখন উত্তর করল না। নির্লিপ্তভাাবেই পা বাড়িয়ে চলে গেল নিজের ঘরে। অতঃপর ঐ জ্বর শরীরেই প্রায় দেড় ঘন্টা গোসল সেরে যখন রুমে পা রাখল ঠিক তখনই সাজিয়া আফরোজ এসে দাঁড়ালেন৷ বড্ড করুণ চাহনিতে চেয়ে বললেন,
“ আম্মু খুব খারাপ তাই না সাক্ষ্য? খুব খারাপ? ”
সাক্ষ্য চাইল বোধহয়। তার মা আবারও বলল,
“ ভুলটা আমি করেছি না? আমি দ্বিতীকে মানিয়ে নিব। ঠিক মানিয়ে নিব। ঠিক বাসায় ফিরিয়ে আনব দেখিস। এবার আগের মতো হয়ে যা আব্বু। আগের মতো হয়ে যা। এভাবে, এভাবে ছন্নছাড়া কি করে দেখি আমি আমার সাক্ষ্যকে? ”
সাক্ষ্য তখনও শান্ত চাহনিতেই তাকানো। সাজিয়া আফরোজ এবারে ছেলেকে আরেকটু বুঝালেন। আরেকটু বললেন। বললেন যে করেই হোক দ্বিতীকে বুঝাবে। তারপর… তারপর আচকাই সাক্ষ্যর কি হলো কিজানি। এক ঝাপটায় নিজের মাকে জড়িয়ে নিল ছেলেটা। ধীরগলায় বলল,
দুইজনাতেই পর্ব ৪২
” আম্মু…আমি না ভালো নেই আম্মু। আমি সত্যিই ভালো নেই৷ আমার দোষ কি বলো আম্মু? দোষ ছিল আমার? ও কেন তবুও সব শাস্তি আমার নামে করে দিল আম্মু? আমি ওকে দেখি না, শুনি না, তার চঞ্চলতায় হাসি না। কি করে ভালো থাকি বলো? ”
ঠিক পরমুহূর্তেই সাক্ষ্য ফের বলল,
“ আম্মু…আম্মু.. যে কথাটা ওর মা বাবাই ওর থেকে এতগুলো দিন লুকিয়ে রেখেছিল সে কথাটা কেন ওকে জানিয়েছিলে আম্মু? কেন আমার অনুপস্থিতিতে আমার স্ত্রীকে এতগুলো কথা শোনানো হলো আম্মু? ”
