লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৩৮
নুসাইবা আরা নুরি
ঘড়ির কাটায় রাত বারোটা বাজে কাটায় কাটায়।দশটার দিকেই ইরুকে সাজিয়ে গুছিয়ে বাসর ঘরে রেখে এসেছিলো মিলি আর মাহি।সবাই যার সেই এখন সুয়ে পড়েছে।তোহা,শ্রেয়সী আর মিলি এক ঘরে। পাশের ঘরে তুহিন আর নিশাদ।তার পাশের ঘরে মাহি আর সাহিদা খাতুন।
ফাহিম ঘরে ঢুকে দরজা ভিতর থেকে লাগিয়ে দেয়।মনের ভেতরে তার ও কিছুটা লজ্জা লাগছে।পুরো ঘর জিরো বাল্ব এর নীলাভো আভায় আচ্ছাদিত।ফাহিম এক এক পা করে বিছানার কাছে এগিয়ে যায়।ট্রাওজার এর পকেটে ইরুর জন্য কেনা আংটি টা।বাসর রাতে উপহার দিবে বলে কাল রাতেই কিনে এনেছিলো।
ফাহিম ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে লাইটের আবছা আলোয় দেখতে পায় ফুলে সাজানো বিছানার এক কোনে হেলান দিয়ে বসে আছে ইরু।ফাহিম গলা ঝাড়া দিয়ে নিজের উপস্থিতি বোজায়।তবে ইরুর মাঝে কোনো ভাবাবেগ হয় না।ফাহিম এগিয়ে বিছানায় বসে।ইরু তখন ও একই ভাবে বসে আছে।
ফাহিম ছোট করে ডাক দেই,
-ইরাবতী শুনছো??
তবে ইরু শুনতে পায়না।ফাহিম এবার ইরুর একদম কাছে চলে যায়।তারপর ইরুর শাড়ির আচলের ঘোমটা উচু করে।মেয়েটা নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে।কাজল কালো চোখের কাজল লেপ্টে সারা চোখ লেগে আছে।কপালে মাঝে একটা টিপ আছে।নীলাভো আলোতে ফাহিমের বুকের ধুকধুকানি বেড়ে যায়।
ফাহিম আলতো করে ইরুর মুখে হাত রেখে ডাকে,
-ইরাবতী??
ইরু ঘুমিয়ে আছে।ফাহিম আবারো ডাক দেই,
-এইজে ইরাবতী।শুনছো।
তবে ইরুর হুশ নেই বড় বড় নিঃশ্বাস ছাড়ছে।ফাহিম আলতো করে ইরুকে ধরে বিছানায় বালিশে ভালো করে সুইয়ে দেয়।তারপর ইরুর মুখে দিকে তাকায় বেশ কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে আবারো ডাকে,
-ইরুপাখি।
-হু।
এবারের ডাকে ইরু উত্তর নেই তবে ফাহিম কি বলবে ভুলে যায়।ইরুর ঘুমন্ত কন্ঠস্বর তাকে মাতাল করে দিচ্ছে এক সেকেন্ডেই।ফাহিম নিজেকে সামলিয়ে বলে,
– ঠিক হয়ে ঘুমাও।
-হু।আচ্ছা।
ইরু কন্ঠ টা কেমন জানি খটকা লাগলো ফাহিমের কাছে পকেট থেকে আংটির বাক্স টা বের করে ইরুর আঙুলে পরিয়ে দিয়ে একটা চুমু আকলো।তারপর বিড়বিড় করে বলল,
-ভালোবাসি ইরাবতী।প্রমান দিলাম কিন্তু আমি খারাপ না।ভালো যেহেতু বাস্তে পেরেছি স্ত্রীর মর্যাদা দেওয়ার মতোই বেসেছি।
ফাহিম আলতো করে ইরু ঘুমন্ত কপালে চুমু খেয়ে উঠে দাড়াতেই চোখ যায়।টেবিলের উপর খালি পড়ে থাকা দুধের গ্লাসের দিকে।ফাহিমের চোখ ছোট ছোট হয়ে যায়।এই দুধ গরম করার সময় তো ইভান ছিলো রান্না ঘরে এমনকি ইভান ই ঘরে দিয়ে গেছিলো ফাহিম আড়চোখে খেয়াল করেছিলো।তবে দুধ ইরু কিভাবে খেলো।কথাটা মাথায় আসতেই ফাহিম বিছানায় বসে নিজের চুল টেনে ধরে বিড়বিড় করে বলে উঠলো,
-শালা মিরজাফর এর দল।আমার এতো দিনের সাজানো গোছানো বাসর নষ্ট কইরা দিলি।আল্লাহ তোদের একটার ও বিয়া হবে না।গজব পড়বে।তোদের ছাড়বো না আমি। মিলির বাচ্চা তুই আমার বউ টাকে ঘুমের ওষুধ মিশ্রিত দুধ খাইয়ে ঘুম পাড়াই দিলি।যেখানে আমি বার বার কইতাম মেহেরাজের বাসর হইবে না সেখানে তোরা আমার বাসর নষ্ট করলি তোদের আমি ছাড়বো না।এক একটা করে দেখে নিবো তোদের আমি।
ফাহিম রাগে দুঃখে ওয়াশ রুমে গিয়ে মাথায় পানি ঢালল।তার একখান মাত্র বউ।আর আজ সারাজীবনের ভিতরে একখান মাত্র রাত যেটাকে বাসর রাত বলে আর সেটাই ওই মিরজাফর গুলো নষ্ট করে দিলো।ফাহিমের মনে চাচ্ছে ওদের পিছনে চকলেট বোম বেধে রকেট এ করে মহাকাশে উড়িয়ে দিতে আগুন ধরিয়ে।
ম্যাসেজের নোটিফিকেশনের ভাইব্রেট এর কারনে ঘুম ভেঙে যায় তোহার। চোখ মেলে তাকায়।পুরো ঘর অন্ধকার।ফ্যান চলার শা শা শব্দ হচ্ছে শুধু ঘরে।তোহা ধীরে ধীরে মোবাইল টা বালিশের নিচ থেকে বের করে ম্যাসেজ চেক করে।তারপর হালকা করে পাশে ঘুমানো মিলির গায়ে নাড়া দিতেই মিলি উঠে বসে।তোহা একবার শ্রেয়সী সত্যি ঘুমিয়েছে কি চেক করে উঠে দাঁড়ায়।তারপর আলমারি খুলে দুটো রিভলবার বের করে নেয়।মিলি দ্রুত ওয়াশ রুমে গিয়ে চেঞ্জ করে আসে।মিলি আসার পর তোহা ও যায়।দুজনের পরনে কালো রঙের জিন্স তার উপরে শার্ট হাতা ভাজ করা।কানে ব্লুতুথ গুজা।মুখে কালো মাস্ক।চুল গুলো পেনি টেইল করে উচু করে বাধা।
তোহা আর মিলি দরজা সাবধানে খুলে আবার লাগিয়ে দেয় আর সদর দরজা বাইরে থেকে লক করে যায়।বাইরে বেরিয়ে তোহা বাড়ির মেন গেটে আসতেই একটা কালো গাড়ি দেখতে পায়।সাথে সাথে সেদিকে এগিয়ে জানলার কাচে টোকা দিতেই তুহিন কাচ খুলে দেখে নিয়ে গেট খুলে দেয়।ড্রাইভিং সিটে তুহিন বসে আর পিছনের সিটে ইভান বসে ল্যাপটপে কিছু একটা করেছে।
তুহিন আগেই কয়েকটা আলাদা আলাদা গুপ্ত চর লাগিয়ে ছিলো আলতাফ শেখ এর উপর সেখান থেকেই আনাম মিয়া আর রফিক সাহেব এর খবর পাওয়া যায়।আর খবর টা গিয়ে যুক্ত হয় সেদিন সিয়ামের আগুনে শার্ট পোড়ার কাহিনীতে।আর এটার সুত্রপাত রফিক সাহেবের খবর নিতে গিয়ে দেখে নিজ বাড়ির গেট এর সামনে রফিক মিয়া খুব খারাপ অবস্থায় মরে পড়ে আছে।তাই তুহিন কইছু না ভেবেই গাড়ির ডিকি তে করে টেনে এনে খাল পাড়ের ব্রিজ এ পিলার এ ফেলে দেয়।আর সেটাই পরের দিন বিকালে খাল পাড়ে মাটিতে এসে পড়ে।
একজন গুপ্তচর খবর দিয়েছে আনাম মিয়ার লোকেরা আজ একটা বাড়িতে মেয়ে তুলতে যাবে বাড়িটা বিলের ধারে।আর ওদের এখান থেকে পালিয়ে যাওয়া একটা মেয়ে নাকি ওখানে আছে তাকেই ধরতে আসবে।যেহেতু মেয়েটা আর দলের লোক গুলোকে ধরতে পারলে সব প্রমান পাকাপোক্ত হবে তাই আর কেও দেরি করতে চায় না।তুহিন গাড়ি স্টার্ট দেয় আর ইভান লোকেশন বলে।তারা হুট করেই প্লান করেছে কারন রাতেই খবর টা জেনেছে।তাই আর কেও ঘুমাইনি কারন এই মিশন খুব বড় মিশন।যতটা না পদোন্নতি হবে তার থেকে বেশি পাপি গুলোকে সরিয়ে সাধারন মানুষ গুলোকে বাচাতে পারবে।তুহিন আগে উঠে ইভান কে বাড়ি থেকে এনে তাই তোহাকে ম্যাসেজ দিয়েছে।
কিছুক্ষনের ভিতরে গুপ্তচরের দেওয়া লোকেশনে এসে পৌছায় ওরা।খবর অনুযায়ি এতক্ষনে আনাম মিয়ার লোকজনদের চলে আসার কথা।তবে আসেনি মনে হয়।ইভানকে গাড়িতে রেখে ওরা নেমে পড়ে।যদিও ইভানকে সবাই এসবে জড়াতে নিষেধ করেছিলো সবাই তবে ইভান কোনো উত্তর দেই নি কারোর।হ্যা অথবা না।
ধির পায়ে বিলের হাটু সমান পানি পার করে শব্দ হীন ভাবে ধান খেত এর আইল দিয়ে বাড়ির দিকে এগিয়ে আসে ওরা।আজ চাঁদনী রাত না।ঘোর অন্ধকার চারিপাশ।কিছুক্ষন বাদে শিয়ালের ডাক ভেসে আসছে।তবে ধান খেতের ভিতর দিয়ে যাওয়া তিন নর-নারীর মধ্যে কোনো ভয় নেই।কিছুক্ষনের ভিতরে বাড়ির পিছনে এসে পড়ে ওরা। বাড়িটা টিনের বাড়ি।।আশ পাশ মাটির খোলা বারান্দা তিন রুমের একটা বাড়ি।
বাড়ির পিছনে এসে দাড়িয়ে টিনের ফুটো দিয়ে উকি মারতেই তুহিনরা দেখতে পায় ভেতরে একজন মানুষ আর একজন মানুষের পা জড়িয়ে ধরে বসে কাদছে।লোকটা আহাজারি করে কান্নারত গলায় বলছে,
-ভাইজান মোর বউ ডারে ছাইড়া দেন ওর পেটে বাইচ্চা।ছাইড়া দেন।ওরে লইয়া যাইয়েন না।ওই মাইয়া ডারে লইয়া যান ওরে বাড়িত যাইগা দেয়ন ডাই কাল হইছে।ছাইড়া দেন ভাইজান।
লোকটার কথা শেষ হতেই তুহিন দেখতে পায় লোকটার পা দুটো খাটের পায়ার সাথে বাধা। ঠিক তখনই বাইরে থেকে একটা লোক ভিতরে এসে বলে উঠে,
-সাব দুইডারেই তুইলা দিছি গাড়িতে এবার চলেন আমরা যায়গা আমাদের কাম শেষ।
লোক্টার কথা শুনে বসে থাকা আদ্রিজ নামের লোকটা বলে উঠে,
-শামসু রে ডাক দে।আর এই দিন মজুর রে বাচাই রাইখা কি করবি।কিডনি চোখ দুইটা খুইলা নিয়ে গাড়িতে আস।আমি যাইতাসি।
বলেই আদ্রিজ উঠে দাঁড়ায়।তখন বাধা অবস্থায় লোক্টা কেদে উঠে নিজের জীবন বাচানোর জন্য। তখন একজন এসে লোক্টার হাত দুটো বেধে মুখে কাপড় গুজে দেয়।তুহিন আর দাড়াতে পারছে না।তার সামনে নিশপাপ কেও মরে গেলে সে নিজেকে মাফ কর্যে পারবে না।তুহিনের চোখ যায় দরজার সামনে আদ্রিজ নামের লোক্টার সাথে কথা বলতে থাকা শামসুর দিকে।
মুহুর্তে অবাকের চরম পর্যায়ে৷ পৌঁছে যায়।একি এ তো তার ঠিক করা স্পাই শামসু এখানে কি করছে।ও কি এদের দলের।তুহিন নিজের মাথা ঝাড়া দেয়।তার বিড়বিড় করে,
– না না নিশ্চয় ও আমাদের হেল্প করতে এখানে এসেছে।আমার এখনই এই লোক্টাকে বাচাতে হবে ওদের হাত থেকে নয়ো মেরে ফেলবে।
তুহিন আর কিছু না ভেবেই তোহা আর মিলির কাছে এগিয়ে ফিশ ফিশ করে বলল,
-তোরা গাড়ির ওদিকে যা।কাওকে শুট করা লাগ্লে করবি।বাট কেও যেনো পালাতে না পারে।আর আমি এখানে যাচ্ছি।
তুহিন বাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়ে।তখন তোহা আর মিলি ও চলে যায়।আদ্রিজ নামের লোকটা গাড়ির কাছে গেছে।সেদিকেই যায় মিলি আর তোহা।তুহিন ধীর পায়ে এগিয়ে যায় বাড়ির দিকে।খবর অনুযায়ি পাচজন এখানে তিনজন গাড়িতে আর দুজন ঘরে।তাহলে সে ঘরের সামনে গিয়ে রিভল বার তাক করলেই হয়ে যাবে।
যেই ভাবা সেই কাজ।চারিদিকে অন্ধকারে একবার নজর বুলিয়ে ঘরের সামনে গিয়ে রিভলবার তাক করে তুহিন।সাথে সাথে লোডশিডিং হয় পুরো বাড়িতে।কিছু বুজে উঠার আগেই সজোরে কেও আঘাত করে তুহিনের মাথায় তুহিন শব্দ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৩৭
ওদিকে তুহিনের কন্ঠ শুনে তোহা আর মিলি গাড়ির দিকে না গিয়ে অন্ধকারেই বাড়ির দিকে যেতে ধরতেই হটাৎ তারা কিছু বুজে উঠার আগেই ঘাড়ে ঘুমের ইনজেকশন পুশ করে দিয়ে রুমাল দিয়ে মুখ চেপে ধরে ধান খেতে সুইয়ে দেয়।ঘটনা এতো দ্রুত ঘটে যে কিছু বুজে উঠার আগেই জ্ঞান হারিয়ে কাদায় লুটিয়ে পড়ে মিলি আর তোহা।
