Home লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৩৭

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৩৭

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৩৭
নুসাইবা আরা নুরি

শ্রেয়সী ঘোর কাটতেই আরেক দফা লজ্জা পায়।ছিহ লোক্টাকে নিয়ে এমন বাজে কল্পনা করে ফেলেছে সে।শ্রেয়সী লজ্জা নিয়ে হাত মুখ ধুয়ে সবেরিয়ে আসে।বোরকা খুলে রেখেছে।এতক্ষন খুলেনি। গায়ে একটা হালকা গোলাপি রঙের থ্রিপিস।শ্রেয়সী মাথায় কাপড় দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।
মেহেরাজ সেদিকে এক পলক তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিলল তবে কিছু বলল না।রাত নয়টার দিকে সবাই খাওয়া দাওয়া শেষ করলো।সবাই আজ এখানে থাকবে শুধু মেহেরাজ আর ইভান বাড়িতে যাবে।যদিও ইভান থাকতে চাচ্ছে তবে মেহেরাজ থাকতে দিবে না।ইভান কে নিয়ে গিয়ে বাড়ির সবাইকে সারপ্রাইজ দিবে।
খাওয়া শেষ হওয়ার পর মেহেরাজ যখন সবার থেকে বিদায় নিচ্ছিলো চলে যাওয়ার জন্য তখন শ্রেয়সীর মনটা কিঞ্চিত খারাপ হয়ে গেলো।খাওয়ার সময় লজ্জায় মাথা নিচু করে খাওয়া মেয়েটার হটাৎ মন খারাপ হয়ে যাওয়া কারোর চোখে না পড়লেও ইরু আর মেহেরাজের চোখে পড়লো।

মেহেরাজ ভ্রু কুচকে তাকালো শ্রেয়সীর দিকে।বেশ কিছুক্ষন মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বুজতে না পেরে তোহাকে চোখ দিয়ে ইশারা করলো শ্রেয়সী কে একটু ঘরে নিয়ে যেতে।তোহা মেহেরাজের ইশারা বুজে শ্রেয়সী কে ডেকে নিয়ে ঘরে চলে গেলো।বেশ কিছুক্ষন পর শ্রেয়সী কে রেখে তোহা বের হতেই মেহেতাজ সবাইকে একটু গল্প করতে বলে আবারো ঘরের ভিতর চলে গেলো।
শ্রেয়সী চুপ চাপ বসে আছে বিছানায়।মেহেরাজ এসে ঘরের দরজা ভিতর থেকে লাগিয়ে দেয়।সেই শব্দে শ্রেয়সী মেহেরাজের দিকে তাকাতেই মেহেরাজ এগিয়ে এসে বলে,
-কি হয়েছে আপনার হটাৎ মন খারাপ হয়ে গেলো কেনো??
মেহেরাজের কথায় শ্রেয়সী কিছু বলল না।কিভাবে বলবে এই লোক্টাকে সে ভালোবেসে ফেলছে।সে এখন চলে যাবে ভাবতেই খারাপ লাগছে। মনে হচ্ছে ও যদি সাথে যেতে পারতো।শ্রেয়সী কে চুপ থাকতে দেখে মেহেরাজ এসে শ্রেয়সীর পাশে বসে তারপর ডান হাত দিয়ে শ্রেয়সীর থুত্নি উচু করে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলে,

-তাকান আমার দিকে!!
শ্রেয়সী মাথা নিচু করে নিতে চায়। তখন মেহেরাজ আবার বলে,
-আমি তাকাতে বলেছি আপনাকে আমার চোখের দিকে তাকান।
মেহেরাজের গম্ভীর কন্ঠে কেপে উঠে শ্রেয়সী। চোখ থেকে এক টোপ পানি গড়িয়ে পড়ে।তবে তাকায় মেহেরাজের চোখের দিকে।মেহেরাজ গোফে হাসে তারপর বলে,
-আমি চলে যাচ্ছি বলে মন খারাপ নাকি মহারানি।
শ্রেয়সী কিছু বলে না।মেহেরাজ এবার ঠোঁট টিপে শ্রেয়সীকে লজ্জা দিতে বলে,
-তো থাকলে কি দিবেন মিসেস??
মেহেরাজের এমন কথায় চমকে তাকায় শ্রেয়সী। তারপর বলে,
-মানে??
-আপ্নি চাইলে!!
-কি??

মেহেরাজ শ্রেয়সীর আর একটু কাছে নিজের মুখ এগিয়ে নিয়ে গেলো।শ্রেয়সীর মুখে মেহেরাজের গরম নিঃশ্বাস শ্রেয়সীর মুখে আচড়ে পড়ছে।শ্রেয়সী শুক্নো ঢোক গিলে।মেহেরাজ নেশালো কন্ঠে শ্রেয়সীর হাতের উপর নিজের হাত রেখে ফিশফিশিয়ে শ্রেয়সীর কানের কাছে বলল,
-আপ্নি চাইলে আমাদের বাসর টাও আজ হয়ে যাক কি বলেন ওয়াইফি।
মেহেরাজের কথাটা শেষ করতেই শ্রেয়সী কান চেপে ধরে বলে,
-চুপ করুন অসভ্য লোক।আপনার থাকা লাগবে না জান তো আপনি।
শ্রেয়সীর হটাৎ মুড চেঞ্জ এ হেসে গড়াগড়ি খাওয়ার জোগাড় মেহেরাজের তবে তা প্রকাশ করলো না।মেহেরাজ হেসে দু হাত শ্রেয়সীর দু গালে রেখে কপালের মাঝ বরাবর একটা চুমু আকল।শ্রেয়সী লজ্জায় চোখ বুজে নিলো সাথে সাথে।মেহেরাজ শান্ত কন্ঠে বলল,
-আর মাত্র এক সপ্তাহ।তার পর আপনাকে ছেড়ে আর কোথাও যাবো না।এই এক সপ্তাহ ধৈর্য ধরুন।আসছে সামনে শুক্রবার রাতে সব ভালোবাসা পুষিয়ে দিবো।
মেহেরাজের কথায় শ্রেয়সী কান দিয়ে ধোয়া উঠতে শুরু করলো।গাল দুটো ব্লাশ করতে শুরু করেছে।মেহেরাজ শ্রেয়সীর হাত ধরে উঠে দাড়ালো।তারপর স্বাভাবিক পুরুষালি গম্ভীর গলায় বলল,
-রাতে মোবাইল ঘাটবেন না।তোহার সাথে ঘুমিয়ে পড়বেন।আমি বাড়িতে গিয়ে ম্যাসেজ দিয়ে জানিয়ে দিবো।কাল সকালে আমি এসে তাই আপনাকে বাড়িতে নিয়ে যাবো ততক্ষন এখানেই থাকবেন।মনে থাকবে।

-জ্বী।
শ্রেয়সীর শান্ত কন্ঠ।মেহেরাজ আর কিছু না বলে শ্রেয়সীর হাত ধরে ঘর থেকে বের হতেই মিলি বলল,
-দোস্ত ভাবির সাথে মিটিং শেষ হলো তাইলে।তো কিসের মিটিং করছিলি একটু বল শুনি।
মিলির কথায় মেহেরাজ একবার চারিপাশ দেখে নিলো।না সাহিদা খাতুন নেই।গুরুজনদের সে সম্মান করে।মেহেরাজ সদর দরজার কাছে এগিয়ে এসে সবার থেকে বিদায় নেয়।তখন মিলি আবার বলে,
– কি ব্যাপার মেহু।বউ এর সাথে কি গোপ্ন মিটিং করলি না বলেই চলে যাচ্ছিস।
মিলির কথায় সবাই হেসে উঠে।শ্রেয়সীর কান দিয়ে ধোয়া উঠছে লজ্জায়।মেহেরাজ বিরক্তি প্রকাশ করে মিলির দিকে তাকিয়ে বলল,
-আমি আমার বউকে নিয়ে বাচ্চার প্লানিং করছিলাম তো তোর কি।তোর তো বর ও নাই।লিলিপুট।
-এইইই অপমান করবি না।
-তোর কি মান আছে।
-মেহুউউ।
মেহেরাজ কিছু বলতে যাবে তখনই ইভান তুহিনের দিকে তাকিয়ে বলে,
-তুহিন ভাই আমার এই লিলিপুট টারে সামলা আমরা যাচ্ছি।নয়তো রাত হয়ে যাবে।
বলেই মেহেরাজ আর ইভান বেরিয়ে গেলো বাড়ি থেকে।সবাই আর এক দফা হেসে উঠলো।ইভান আর মেহেরাজ মেহেরাজের বাইক এ উঠে রওনা দিলো বাড়ির উদ্দেশ্য। ইভানের মনের মধ্যে আনন্দ লাগছে ভীষণ। কত দিন পর বাবা মাকে দেখবে।দুই নারীর উপর জেদ ধরে দেশ ছেড়েছিল।তবে একজন আজ ও তার জন্য অপেক্ষা করে সে হলো তার মা।আর একজন তার জন্য আর অপেক্ষা করতে পারলো না।বিয়ে করে অন্যর সংসারে চলে গেলো সে হলো তার পবিত্র ভালোবাসা।

রাত এগারোটা পচিশ।হাইওয়ে পার হওয়ার পর থেকে কয়েক কিলো জ্যাম।একটা ট্রাক এক্সিডেন্ট হয়েছে তার কারনে বিশাল জ্যাম।জ্যাম ঠেলে মাত্র মির্জা বাড়িতে ঢুকলো মেহেরাজ আর ইভান।
ইভান বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে এক পলক তাকায় বাড়ির দিকে।সাদা লাইট এ বাড়িটা চক চক করছে।আগের থেকে অনেক চেঞ্জ হয়ে গেছে সব কিছুই।মেহেরাজ সদর দরজার কাছে এসে দাঁড়ায় তারপর ইভানের দিকে তাকিয়ে বলে,
-ওয়েট আম্মুকে সারপ্রাইজ দিবো।আমি বলার পর তুই ভিতরে আসবি।
-ওকে।
মেহেরাজ কলিং বেল চাপে।দুবার চাপার পর বাড়ির কেয়ার টেকার রহিমা এসে দরজা খুলে দেয় হায় তুলতে তুলতে।মেহেরাজ ভিতরে প্রবেশ করে দেখে তার মা ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে বসে আছে চুপচাপ।মেহেরাজ কে দেখে নাহিদা খাতুন উঠে দাঁড়ায় মেহেরাজের দিকে এগিয়ে এসে বলে,
-তোর ফোন বন্ধ কেন বাবু।কত চিন্তা হচ্ছিলো জানিস এতো দেরি করলি কেন বাড়িতে আসতে??
মায়ের কথায় মেহেরাজ নিজের পকেট থেকে ফোন বের করে দেখে ফোনে চার্জ শেষ। তাই বলে,

-চার্জ ছিলো না আম্মু।
-ফ্রেশ হয়ে নে খেতে দেই।
-তুমি খেয়েছো??
-সন্তান কে বাইরে রেখে কোনো মা কি মুখে খাবার তুলতে পারে। ফ্রেশ হয়ে আই এক সাথে খাবো।
মায়ের কথায় মেহেরাজ চুপ হয়ে গেলো।তারা খেয়ে এসেছে বললে তার মা কষ্ট পাবে।দেখা যাচ্ছে সে খাচ্ছে না আর রাতে।তাই মেহেরাজ আর না বলে মায়ের কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল,
-তোমাকে না বলেছি নয়টার ভিতরে খেয়ে নিবা তুমি।আমার জন্য অপেক্ষা করতে কে বলছে তোমাকে??
-কেও বলেনি এখন যা ফ্রেশ হয়ে আই আমি খাবার বাড়ি।
মেহেরাজ ছোট্ট একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নরম গলায় বলে,
-আম্মু একটা কথা ছিলো??
মেহেরাজের কথায় নাহিদা খাতুন রান্না ঘরে যেতে গিয়েও থেমে যায়।তারপির ছেলের দিকে তাকিয়ে বলে,

– কি কথা বাবু বল।
-তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে আম্মু।
মেহেরাজের কথা নাহিদা খাতুন বুজতে পারলো না।তাই বলল,
-আমার জন্য আবার কিসের সারপ্রাইজ??
-আছে চোখ বন্ধ করো।
-আগে বল কি সারপ্রাইজ।
-চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাবে।
মেহেরাজের কথায় নাহিদা খাতুন চোখ বুজতেই মেহেরাজ গলা ঝাড়া দেয়।তখন ইভান পা টিপে টিপে মেহেরাজের পাশে এসে দাঁড়ায়।কতদিন পর মাকে দেখছে সামনা সামনি।ইভানের বুকের মাঝে আনন্দে লাফাচ্ছে।মেহেরাজ এবার তার মাকে চোখ খুলতে বলে।নাহিদা খাতুন চোখ খুলে সামনে ইভানকে দেখে প্রথমে চিনে উঠতে পারে না।তবে ইভান যখনি আম্মু কেমন আছো বলে পায়ে সালাম করে তখনই ইভান কে জড়িয়ে ধরে শব্দ করে কেদে উঠে নাহিদা খাতুন।
ইভান ও মাকে জড়িয়ে ধরে।চোখ ভিজে আসে তার।নাহিদা খাতুন কতক্ষন ফুফিয়ে কাদার পর মেহেরাজ পরিস্থিতি সামলানোর জন্য বলল,

-ছোট ছেলেকে পেয়ে আমাকে ভুকে গেলে আম্মু।এটা কিন্তু অবিচার।
মেহেরাজের কথায় নাহিদা খাতুন হাত বাড়িয়ে মেহেরাজকেও বুকে জড়িয়ে নেয়।নাহিদা খাতুনের কান্নার শব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন নিলয় মির্জা।শারমিন খাতুন আর হাসান সাহেব।ইভান সবাইকে সালাম করে ভালো মন জিজ্ঞাসা করে বাবাকে জড়িয়ে ধরে।মেহেরাজের যেমন দাদির সাথে বন্ডিং ভালো ছিলো ইভানের তেমনই বাবার সাথে বন্ডিং ভালো ছিলো।
নিলয় মির্জা ও সব অভিমান ভুকে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরেন।নাহিদা খাতুন উড়নার কনা দিয়ে চোখ মুছে মেহেরজ কে বলে,

-বাবু ওকে রুমে নিয়ে গিয়ে ফ্রেশ করে নিয়ে আই।
তারপর রহিমার দিকে তাকিয়ে বলে,
-তুই খাবার গুলো সব গরম কর।আমি আসছি।
মেহেরাজ মায়ের কথা মতো ইভানকে নিয়ে সিড়ি বেয়ে দোতলার উদ্দেশ্যে হাটা শুরু করে।তখন ইভান মেহেরাজের দিকে তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে বলে,

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৩৬

-সত্যিই ভাইয়া তোমার কথা আমি যত বার শুনেছি ততবার আমার মনের দরজায় সুখ এসে ধরা দিয়েছে।আমি কখোনো কল্পনাও করি নি আম্মু এতোটা খুশি হবে।আমি ভেবেছিলাম হয়তো আমার উপর রাগ করে কদিন কথায় বলবে না।

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৩৮