এমপির অবাধ্য বউ পর্ব ৪৮
সুহাসিনী
সাঈদ বাড়িতে এসেই নিজের রুমে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিয়েছে। নিচে সবার প্রশ্নের সম্মুখে দাঁড় করিয়ে এসেছে নিজের বিয়ে করা বউ,সহজ সরল গ্রামের মেয়টাকে। বৃষ্টি এক প্রকার ভয়ে কাপছে। ড্রয়িংরুমে চলছে পিনপতন নিরবতা। সবাই সোফায় বসে আছে,এক পাশে জড়োসড়ো হয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে বৃষ্টি।কিছুক্ষণ পর সাঈদের মা রান্নাঘর থেকে সবার জন্য কফি নিয়ে এসে টি টেবিলে রাখলেন। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বৃষ্টিকে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত খুব ভালো করে পরখ করলেন। এরপর গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
“আমাদের বাড়িতে বসার জন্য জায়গা আছে প্রচুর।”
বৃষ্টি বুঝতে পারলো কথাটা তাকে বলা হয়েছে।সবার নজর বিন্দু যে এখন সে এটা ভাবতেই কলিজা কাপছে। তার উপর এখানে নিজে থেকে কোথায় বসবে।এতো বড় বাড়িতে তো সে এর আগে কখনো আসেনি।যাকে ভরসা করে তার বাবা তাকে এখানে পাঠালো সেই তো তাকে এই বিপদের মুখে ফেলে চলে গেলো।
বৃষ্টির কোনো ভাবান্তর না দেখে সাঈদের মা আঁখিকে ইশারা করে বললেন বৃষ্টিকে এনে বসাতে। বৃষ্টিকে বসানো হলে সাঈদের মা গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
“নাম কি তোমার?”
বৃষ্টি কাপা কাপা স্বরে মিনমিন করে বলল,
“জ্বি, বৃষ্টি।”
“মিডিয়ার সামনে কেনো বললে তুমি সাঈদের স্ত্রী? রাহি তোমার কে হয়?”
“রাহি কে?আমি রাহি নামে তো কাউকে চিনি না।”
“তোমরা যদি একে অপরকে না চিনো তাহলে তোমাদের দুজনের চেহারার এতো মিল কীভাবে সম্ভব।তোমাদের যে কেউ আলাদা দেখলে গুলিয়ে ফেলবে। যেমনটা আমরা এবং মিডিয়ার লোকেরা করেছে।”
“জানি না।”
“যায় হোক,আগে বলো তুমি সবার সামনে নিজেকে কেনো সাঈদের স্ত্রী বলে পরিচয় দিলে? তোমার সাথে আমার ছেলের কি সম্পর্ক? ও তো রাহিকে ভালোবাসতো।”
বৃষ্টি এবার একটা দীর্ঘশ্বাস নিলো। মনে মনে সাহস সঞ্চয় করলো এবার তাকে সমস্ত সত্যিটা বলতেই হবে।
মাথা নিচু করে মিনমিন করে বলতে শুরু করলো,
“উনি কাকে ভালবাসতে সেটা তো আর আমি জানতাম না। আমাদের বিয়েটা….”
বাকি কথা শেষ করতে পারল না বৃষ্টি। তার আগে পেছন থেকে পরিচিত কন্ঠে গমগমে স্বরে বলে উঠলো,
“স্টপ, তোমাকে এতো কথা বলতে কে বলেছে।”
বৃষ্টি ভয় পেয়ে গেলো।দেখলো সাঈদ দাঁড়িয়ে আছে। চোঁখ জোড়া অসম্ভব লাল তার। মুখটাও কেমন যেনো শুকিয়ে গেছে। বৃষ্টি আমতা আমতা করে বলল,
“আ..আসলে ওনারা সবাই জানতে চাচ্ছিল তো তা..তাই আর কি।”
“কি জানতে চাইছিল তোমরা সবাই? ও আমার স্ত্রী কিনা? হ্যাঁ ও আমার বিয়ে করা বউ। এখন তোমাদের সবার বিশ্বাস হয়েছে। ওকে আর কেউ জেরা করবে না। ওর বিশ্রামের ব্যবস্থা কর, অনেকটা পথ জার্নি করে এসেছে। আজ থেকে ওই চৌধুরী বাড়ির বউ। রাহিকে সবাই ভুলে যাও, রাহি নামের যে কেউ ছিল এটা মাথা থেকে মুছে ফেলো সবাই।”
সাঈদ যেভাবে এসেছিল ঠিক সেভাবেই নিজের রুমে চলে গেল। কেউ আর কথা বাড়ালো না।সাঈদ যেহেতু নিজের মুখে সবার সামনে শিকার করেছে মেয়েটাকে তার মানে সত্যিই বিয়েটা হয়েছে। উনাদের ছেলে যে মেয়েটাকে মেনে নিয়েছে এটায় অনেক। বৃষ্টিও দেখতে রাহির চেয়ে কোনো দিক দিয়ে কম না।দুজনের চেহারা যেহেতু প্রায় একই রকম সেহেতু কারো সৌন্দর্য করো চেয়ে কম হওয়ার কথা না।উনার উনাদের ছেলের জন্য শুধু ভালো মেয়ে চেয়েছিল। সেই মেয়ের যদি কোনো টাকা পয়সা,সম্পত্তি নাও থাকে তবুও তাদের আপত্তি নেই।কিন্তু মেয়ের বংশ পরিচয় তো লাগবে।তাই সাঈদ এর মা বৃষ্টিকে বললো,
“বুঝলাম তুমি আমার ছেলের বউ। কিন্তু তোমার পরিচয় কি? কোন পরিচয়হীন মেয়ে তো চৌধুরী বাড়ির বউ হতে পারে না।”
“আমার নাম বৃষ্টি, বাবার নাম রফিক মিয়া। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন তিনি। এখন রিটায়ার করেছেন। মা নেই আমার।”
সাঈদের মা বুঝলেন মেয়েটার বাবা স্কুল শিক্ষক তাই মেয়েটার আদব কায়দা এতো সুন্দর।মেয়েটার ব্যবহার অমায়িক।এক কথায় সব মিলিয়ে সে বৃষ্টির প্রতি ইমপ্রেস।তিনি আঁখিকে বললেন আপাদত বৃষ্টিকে যেনো আঁখির ঘরে নিয়ে যায়। আঁখিও তাই করলো।
প্রেম এখনও রাহির পাশে বসে আছে। রাহির জ্ঞান ফিরেছে গত পাঁচ মিনিট ধরে।রাহির চোখ টলমল করছে।প্রেমকে নিশ্চুপ তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে রাহি বললো,
“খুব ভয় পেয়েছিলাম এমপি সাহেব।শুধু মনে হচ্ছিল এই বুঝি আমি আপনার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। আগে শুধু আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতাম আমি যেনো আমার মায়ের কাছে চলে যেতে পারি।তবে আপনি আমার জীবনে আসার পর আমি জীবনের মানে খুঁজে পেয়েছি। জ্ঞান হারানোর আগ পর্যন্ত আমি শুধু তখন মনে মনে আল্লাহর কাছে চাইছিলাম আল্লাহ্ যেনো আপনার কাছ থেকে দূরে না করে দেয়।”
রাহি কান্না করছে। প্রেম রাহিকে আলতো হাতে নিজের বুকে টেনে নিলো। গমগমে কণ্ঠে বলল,
“সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরো তাড়াতাড়ি,আমাকে ছেড়ে যাওয়ার যে পাঁয়তারা তুমি করেছো তার জন্য তো শাস্তি পেতেই হবে।”
“বউ বলে মানেন আমাকে?”
“নো ওয়ে”
“ভালোবাসেন এমপি সাহেব?”
“নো”
রাহি প্রেমের বুকেই মুখ গুঁজে মুচকি হাসলো। আজ সে বুঝে গেছে প্রেম মুখে যায় বলুক প্রেমের হৃদয় জুড়ে শুধু সেই আছে।যায় হয়ে যাক না কেনো প্রেম কোনোদিন তার হাত ছাড়বে না।রাহি আরও শক্ত করে প্রেমকে জড়িয়ে ধরলো।প্রেম ঠাণ্ডা কণ্ঠে বললো,
“ম্যাডাম কি জেনে বুঝে কাছে এসেছেন?প্রথমবার কিন্তু এই রকম একটা রুমেই আকাম টা করেছিলাম।এখন কি আবার এই অসুস্থ শরীরে স্বামীর হক আদায় করতে চাচ্ছেন?”
প্রেমের ইঙ্গিত বুঝতে পেরে রাহি লজ্জায় নেতিয়ে গেলো। প্রেম আরও কিছু বলতে যাবে তখনি শান্তর গলা ভেসে এলো,
“হে আল্লাহ,তুমি সাক্ষী,সবাই আমার সাথে অবিচার করছে।”
প্রেম বিরক্তিতে কপাল কুচকাল।গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“কী চায় এখানে?”
“বউ”
“আমি কি তোর জন্য বউ এর দোকান দিয়ে বসে আছি এখানে?”
“আমি তো দোকান থেকে বউ কিনবো না,আমি তোর বাড়ি থেকে বউ কিনবো,না মানে বউ নিয়ে আসবো।”
“ফাইজলামি রেখে বল কেনো এসেছিস?”
“এটা কেমন প্রশ্ন ভাই?আমি আমার বন্যার পানিতে ভেসে হারিয়ে যাওয়া বোনকে দেখতে এসেছি।”
“দেখা হয়েছে,এবার বের হো।”
“তুই এত পাষাণ কেনো?শুধু তুই না তোর বাপ যেগুলো পয়দা করেছে শালা সবগুলিই পাষাণ, মনের দুক্কু বুঝে না।”
আমজাদ খান সহ আফরোজা খান কেবিনে প্রবেশ করলেন। রাহির সাথে কিছুক্ষণ ভালো মন্দ আলাপ করলেন। আফরোজা খান নিজের হাতে রাহির জন্য রান্না করে এনেছেন। প্রেম রাহিকে নিজে হাতে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে বেরিয়ে গেলো।কেবিনের বাইরে রেখে গেলো কড়া পাহাড়া।
প্রেম এসে পৌঁছালো তার গোপন গোডাউনে। আশাকে এখানে আটকে রেখেছ প্রেম। আশা আধমরা অবস্থায় পড়ে আছে।অনেক শাস্তি হয়ে গেছে তার। প্রেম আশাকে বললো,
“আমাকে বিয়ে করার এবং আমার কলিজাকে কষ্ট দেওয়ার স্বাদ নিশ্চয় চিরতরে মিটে গেছে তোর।”
“আমাকে প্লীজ ছেড়ে দাও প্রেম,নয়তো একে বারে মেরে ফেলো,এই যন্ত্রণা আর সহ্য হচ্ছে না আমার।তোমার বউ এর আশে পাশে কখন যাবো না আর। কাউকে এখানকার ঘটনাও বলবো না, প্রমিজ।আমাকে ছেড়ে দাও,অন্তত আমার মায়ের জন্য ছেড়ে দাও। আমার মায়ের আমি ছাড়া আর কেউ নেই।”
কান্না করতে করতে কথা গুলি বললো আশা। তার প্রাপ্য শাস্তির চেয়ে দ্বিগুণ শাস্তি সে পেয়ে গেছে। প্রেম বললো,
“যাহ,তোকে দয়া করলাম। আমার আবার দয়ার শরীর। বাট, ইন ফিউচারে যদি তোকে আমার বাড়িতে বা আমার বউ এর আশেপাশেও দেখি খোদার কসম সেই দিনই হবে তো লাইফের শেষ দিন।”
এরপর লিয়নকে ইশারায় বললো আশাকে ছেড়ে দিতে।আশাকে একটি হাসপাতালে এডমিট করে ওর মাকে খবর দিতে। আর ওর মাকে বলতে বললো যে আশা এয়ারপোর্ট থেকে ফেরার সময় দুষ্কৃতীদের হাতে পড়েছিল,তাই ওর এই দশা।
তিনদিন হলো রাহিকে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে আনা হয়েছে। এর মাঝে প্রেমকে খুব কম সময় বাড়িতে দেখা গেছে। এর জন্য রাহির প্রেমের উপর অনেক রাগ জমে আছে।সে অসুস্থ আর মানুষটা তার কাছাকাছি না থেকে বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
আয়েশা রাহির পাশে বসে ফোন ঘাটছে। রাহি আয়েশাকে বলল,
“আপু তোমার ভাই কি কোন ভাবে জেনে গেছে আমার আর সাঈদ চৌধুরীর এনগেজমেন্ট এর কথা?”
“আরে না, জানলে কি আর তোমাকে এই তিনদিন আস্ত বাড়িতে বসিয়ে রাখত, নিশ্চয়ই তোমার হাড্ডিগুড্ডির খোঁজ থাকতো না এতদিন। আর শুনলাম সাঈদ চৌধুরী নাকি বিয়ে করেছে।”
“কি,ওই কাইল্লা পাডাকে আবার কে বিয়ে করতে রাজি হলো।”
“বলছি,আগে বলতো তোমার কি কোন জমজ বোন আছে?”
আয়েশার এই প্রশ্নের মুহূর্তে রাহির মুখের ভঙ্গিমা পরিবর্তন হয়ে গেল।
বৃষ্টি এখন সাঈদের রুমেই থাকছে। ওইদিন তাদের বাসর ঘরের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।এর পর সেই ঘরে নিয়েও বৃষ্টিকে সুন্দর করে সাজিয়ে বসানো হয়েছিল।কিন্তু ওই রাতে সাঈদ আর বাড়িতে ফিরেনি। আজকাল সাঈদ বাড়িতে থাকে না বললেই চলে।কেউ জিজ্ঞেস করলে বলে অফিসে এখন প্রচুর চাপ।সবচেয়ে বড় কথা হলো সে নিজের কাছ থেকেই পালিয়ে বেড়াতে চাচ্ছে কাজের অজুহাত দিয়ে। নিজেকে যথাসম্ভব কাজে বেস্ত রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে। প্রায় রাতেই সে বাইরে থাকে। বৃষ্টির কাছ থেকে সে কিছুটা সময় চেয়ে নিয়েছে। বলেছে বৃষ্টিকে মুক্তি দিতে তার কিছুটা সময় লাগবে।বৃষ্টির যদিও তাতে কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু তার কষ্ট এক জায়গাতেই। সে তার নিজের জীবনটা নিজের মনের মতো করে গোছাতে চেয়েছিল। চেয়েছিল গ্রামের কোনো শিক্ষিত, মার্জিত ছেলের সাথে ওর বিয়ে হবে,সুন্দর গোছানো সংসার হবে তাদের।সেই সংসারে অঢেল টাকা পয়সা, আধিপত্য না থাকলেও থাকবে সুখ, ভালোবাসা। হঠাৎ ভালোবাসার কথা মনে আসতেই বৃষ্টি নিজে নিজেই বললো,
“ভালোবাসা,তাও আবার আমার মতো এই অভাগীর কপালে।”
বলেই মলিন হাসলো।এরমধ্যেই রুমে প্রবেশ করলো তার শাশুড়ি।হাতে অনেক গুলো শাড়ি আর গহনা। সেগুলো বৃষ্টিকে দিয়ে বলল,
“তোমার যখন যেইটা মন চায় এখান থেকে পড়বে।এই বাড়ির বউরা এভাবে থাকে না।তাদের সবসময় সেজেগুজে পরিপাটি হয়ে চলতে হয়,এটায় এই সংসারের রীতি। আর যখন যেটা করতে মন চাইবে বা দরকার হবে আমাকে বলবে।”
এমপির অবাধ্য বউ পর্ব ৪৭
তিনি বৃষ্টিকে শাড়ি পরে রেডী হতে বলে চলে গেলো। বৃষ্টি শাড়ি পড়তে বাঁধালো বিপত্তি।সে এখন এইরকম অবস্থায় আছে যে না পারছে ভালো করে শাড়ি পড়তে আর না পারছে কাউকে ডাকতে।ওই মুহূর্তেই ঘরে প্রবেশ করলো সাঈদ।
