Home এমপির অবাধ্য বউ এমপির অবাধ্য বউ পর্ব ৪৯

এমপির অবাধ্য বউ পর্ব ৪৯

এমপির অবাধ্য বউ পর্ব ৪৯
সুহাসিনী

রাহি একা একা বসে আছে নিজের রুমে।নিচে যাওয়া তার জন্য একেবারে বারণ করে দিয়েছে প্রেম। ডাক্তার টানা এক সপ্তাহ বেড রেস্টে থাকতে বলেছে।কিন্তু তার মতো উড়নচণ্ডী মেয়ে কি সেটা শোনার মানুষ। তবুও অনেক কষ্টে সে এই চারদিন ভদ্র মেয়ের মতো কাটিয়েছে। এখন আর তার এই ঘরে বন্দি হয়ে থাকতে ভালো লাগছে না।কেমন দম বন্ধ বন্ধ লাগছে।প্রেম রাহিকে হারে হারে চিনে।তাই সে বাইরে থেকে রাহিকে দরজা বন্ধ করে রেখেছে।যখন যে আসে সে রাহির সাথে সময় কাটিয়ে আবার যাওয়ার সময় বাইরে থেকে ঘর লক করে দিয়ে যায়।এতে রাহি খুব বিরক্ত প্রেমের উপর।নিজে তো সময় দিবেই না আবার সবাইকে কড়া নির্দেশ দিয়ে রেখেছে তার বিষয়ে। যত্তোসব আজগুবি লোক।এসব ভাবতে ভাবতেই রাহি উঠে দাঁড়ালো বিছানা থেকে।সে এখন মোটামুটি সুস্থ। হেঁটে বারান্দায় গেলো। গাছ গুলোর নিজে হাতে যত্ন নেই না অনেকদিন হলো।এখন তো তার কাছে অনেক প্রজাতির গাছ। গাছ তার খুব প্রিয়। আর তার সবচেয়ে প্রিয় গাছটি হলো অর্কিড ফুলের গাছ। এখনোও যদিও ফুল ফুটেনি কিন্তু বেশি সময়ও আর লাগবে না। রাহি গাছ গুলোই খুব যত্নসহকারে পানি দিলো। গাড়ির হর্নের শব্দে রাহি বারান্দা থেকে নিচে তাকালে দেখতে পেলো প্রেমের গাড়ি ভেতরে ঢুকছে।পেছনে আরও তিনটি গাড়ি, সেগুলো হয়তো পুলিশ আর বডিগার্ড দের।এখন আর প্রেম সেফটি ছাড়া চলাফেরা করে না।

প্রেম বাড়িতে ঢোকার আগেই রাহি ভদ্র মেয়ের মতো চুপটি করে বিছানায় শুয়ে পড়লো।প্রেম ফোনে কিছু একটা দেখতে দেখতে হাতে একটা প্যাকেট নিয়ে রুমে প্রবেশ করল।রাহিকে শুয়ে থাকতে দেখে টেবিলে প্যাকেটটি রেখে বিনা বাক্যে কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো।কিছুক্ষণ পর রেডি হয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরোলো। পরণে কালো প্যান্ট,সাথে কালো শার্ট ইন করা। চুল গুলো হালকা ভেজা।হালকা ভেজা চুল গুলো হাত দিয়ে ব্যাকব্রাশ করে নিলো প্রেম।ফর্সা গায়ে কালো পোশাক দারুণ মানিয়েছে।রাহি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার ব্যক্তিগত পুরুষটির দিকে।রাহিকে এভাবে তাকিয়ে থাকত দেখে ভ্রু নাচালো প্রেম।রাহি নাক ফুলিয়ে বললো,
“আপনি এখন এভাবে বাড়ির বাইরে যাবেন?”
“হুম, এনি প্রবলেম?”
“হ্যাঁ সমস্যা,আপনি এভাবে বাইরে যেতে পারবেন না।”
“হোয়াট ননসেন্স,এভাবে গেলে সমস্যা কি?”
“অনেক সমস্যা,আমি চাই না আমার হক নষ্ট হোক, সব মেয়েরা আপনাকে চোখ দিয়ে গিলে খাক।”
রাহির বাচ্ছামোয় প্রেম হালকা ঠোঁট বাকাল।কিন্তু পরমুহূর্তেই তা বিলীন হয়ে গেলো।গম্ভীর কন্ঠে বলল,

“আমাকে তো বাইরে যেতেই হবে।”
“আপনি বোরকা পড়ে বাইরে যাবেন।”
রাহির কথায় প্রেমের হাসি পেলো,কিন্তু হাসলো না।যে টেবিলের উপর থেকে প্যাকেটটি রাহির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“ফাস্ট রেডি হয়ে নিচে আসো,মাথায় যেনো হিজাব থাকে।আমাকে দেখে বিছানায় শুয়ে রোগী সাজার অভিনয় তো ভালোই করতে পারো।”
“আপনি কি করে জানলেন?”
প্রেম উত্তর করলো না।গায়ে কালো কোর্ট জড়িয়ে বেরিয়ে গেলো। বেরোনোর আগে বললো,
“টাইম কিন্তু দশ মিনিট।”

রাহি প্যাকটি খুলে দেখলো খুব সুন্দর একটা কালো রঙের ১০০% খাঁটি সোনা ও রূপার জারির জামদানি শাড়ি। এই শাড়ির বিশেষত্ব হলো এটি ১০০০ বা তার চেয়েও বেশি কাউন্টের সুক্ষ্ম সুতার সাথে আসল সোনা বা রূপার প্রলেপ দেওয়া সুতা দিয়ে বোনা হয়। এই শাড়ির সম্পূর্ণ জমিন জুড়ে ঘন সোনা-রূপার কারুকাজ আছে,যা লাইটের আলোতে অসাধারণ রাজকীয় উজ্জ্বলতা দেয়।এই ধরণের একটি শাড়ি সম্পূর্ণ হাতে বুনতে অভিজ্ঞ কারিগরদের ৬ মাস থেকে ১ বছর বা তার বেশি সময় লাগে। বাংলাদেশে এই রকম শাড়ি গত পাঁচ বছরে শুধু দুই পিস বানানো হয়েছে। তার মধ্যে প্রেম রাহির জন্য একটি নিজে নিয়ে এসেছে, প্রেম শুনেছে আর একটি নাকি অন্য কেউ বুক করে রেখেছে।কিন্তু লোকটি কে তা প্রেম জানে না।সেই বিষয়ে সে মাথাও ঘামায়নি।প্রেমের দেওয়া শাড়ি দেখে রাহির মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো। এতো সুন্দর শাড়ি সে ইহজীবনেও দেখেনি। আর আজকে এইরকম একটা শাড়ি তার।রাহি দেরি না করে ঝটপট উঠে রেডি হতে চলে গেলো।

বৃষ্টিকে এমন অবস্থায় দেখে সাঈদ কিছুটা হকচকিয়ে গেলো। বৃষ্টিও বিব্রতবোধ করছে।না চাইতেও দুজনকে এমন আপত্যিকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে। বৃষ্টি ভাবলো সাঈদ হয়তো ওকে এই অবস্থায় দেখে রুম থেকে বেরিয়ে যাবে।কিন্তু ঘটনা ঘটলো উল্টো। সাঈদ দরজা লক করে বৃষ্টির কাছে এগিয়ে আসতে নিলে বৃষ্টি ভয় চিৎকার করে বলে,
“প্লীজ এমনটা করবেন না শহুরে সাহেব,জানি আমি আপনার জন্য বৈধ,কিন্তু কিছুদিন পর তো আমরা আলাদায় হয়ে যাবো।তাহলে এমন সম্পর্কে জড়িয়ে লাভ কি বলুন।প্লীজ দূরে থাকুন।”
বৃষ্টির ভয়ের কারণ বুঝতে পেরে সাঈদ বিরক্ত হয়। চোখ মুখ কুঁচকে বলে,
“তোমার সাথে অন্য কোনো সম্পর্কে জড়ানোর কোনো ইচ্ছে নেই আমার। সো, ডোন্ট প্যানিক।নিজে তো শাড়ি পড়তে না পারে সং সেজে দাঁড়িয়ে আছো।”
“ত… তো আমি কি করবো।আমি তো শাড়ি পড়তে জানি না।আপনার আম্মুই তো বললো শাড়ি পড়তে।তাই একটু চেষ্টা করছিলাম।”

“বুঝতে পেরেছি,এখন আমার সাথে চলো।”
“এই অবস্থায় কোথায় যাবো আপনার সাথে?”
“হাতে টাইম নেই,কোনরকম শাড়িটা পেচিয়ে আসো, আর একটা সাউন্ড করলে থাপ্পড় দিবো।”
সাঈদের কথায় বৃষ্টির মুখটা ছোটো হয়ে যায়। সাঈদ বেরিয়ে যায়। বৃষ্টি শাড়ি পেঁচিয়ে বেরোতে গিয়ে পায়ে পা বেঁধে পড়তে নিলে কোনরকম নিজেকে সামলে নেয়। সিঁড়ি দিয়ে নামতে গেলে পায়ে শাড়ি বেঁধে উল্টে পড়ে যাওয়ার সময় পেছন থেকে সাঈদ এসে ধরে ফেলে তাকে।সাঈদ নিজের রুম থেকে বেরিয়ে আঁখির রুমে গিয়েছিল।বৃষ্টির অবস্থা দেখে চোখ বন্ধ করে লম্বা একটা নিশ্বাস নেয়।এরপর এক টানে বৃষ্টিকে কোলে তুলে নেয়। বৃষ্টি হঠাৎ এমন কাণ্ডে চোখ খিচে বন্ধ করে ফেলে।

“ক….কি করছেন এসব,সবাই তো দেখবে। প্লীজ নামান আমাকে।”
সাঈদ কিছু না বলে নিচে নামতে লাগলো। বৃষ্টি যথাসাধ্য চেষ্টা করছে সাঈদের কাছ থেকে ছাড়া পাওয়ার।এমন মোচড়ামুচড়িতে বিরক্ত হয়ে গম্ভীর স্বরে সাঈদ বললো,
“বেশী নড়াচড়া করলে কিন্তু নিয়ে গিয়ে বেচে দিবো।”
বৃষ্টি ভয় পেয়ে যায়।তাই ঘাপটি মেরে থাকে। সে গ্রামের সহজ সরল মেয়ে।গ্রামে থাকতে সে অনেকের মুখে শুনেছি শহরের ছেলেরা ভালো না।মেয়েদের ভুলিয়ে ভালিয়ে খারাপ জায়গায় বেচে দেয়।এখন তার মনে হচ্ছে সাঈদও তেমন।নয়তো বিক্রি করে দেওয়ার হুমকি দিলো কেনো?

রাহি সুন্দর করে রেডি হয়েছে।দেখতে একদম পুতুল লাগছে।সে একপ্রকার দৌড়ে আয়েশার রুমে গেলো।দেখতে পেলো আয়েশাও কালো রঙের একটি শাড়ি পরে রেডি হয়েছে। তারপর দুজন মিলে নীচে গেলো। প্রেম আর শান্ত ওয়েট করছে নিচে। রাহি আর আয়েশাকে এক সাথে নিচে আসতে দেখে দুজনেই হা করে তাকিয়ে আছে সিঁড়ির পানে।প্রেম হঠাৎ শান্তর চোখ হাত দিয়ে ঢেকে দিলো।বলল,
“চোখ বন্ধ কর শালা।আমার বোন তোর জন্য এখনো হালাল হয়নি।হলে তারপর না হয় সারাদিন সামনে বসিয়ে দেখবি।”
শান্ত বিরক্ত হলো।বলল,

“তাহলে দেরি না করে হালাল করে দিলেই তো পারিস ভাই।আমার কষ্ট কি তোদের বাপ ছেলে আর বোনের চোখে পড়ে না।এক একটা পাষাণ।”
“আর একটু ধৈর্য ধর,আগামী মাসে আয়েশা বিদেশ থেকে ফিরলেই তোদের ব্যবস্থা নেয়া হবে।”
শান্ত আর কথা বাড়ায় না।কদিন পরেই আয়েশার ফ্লাইট। পায়ের জন্য আবার তাকে বিদেশ যেতে হবে এক মাসের জন্য।
তারা সবাই বেরিয়ে পড়লো অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্যে।
আজকে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান একটা পার্টি থ্রো করেছে।সেখানেই ইনভাইটেড প্রেম আর তার বাবা।প্রেমের বাবা বেস্ত থাকায় উনার পক্ষ থেকে আয়েশা আর শান্ত যাচ্ছে। অপর দিকে আবার সামিট গ্রুপের ফিউচার চেয়ারম্যান হিসেবে সাঈদও ইন্ভাইটেড।তাদের সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে তারা সবাই যেনো যার যার বউকে সঙ্গে নিয়ে আসে। আর পার্টির থিম হচ্ছে কালো।
পার্টিতে পৌঁছে আয়েশা দেখতে পেলো তাদের দূরসম্পর্কের চাচা তার পরিবার নিয়ে এসেছে।সেই চাচার সাত বছর বয়সী একটা ছেলেও এসেছে এখানে।ছেলেটা আয়েশাকে চিনে।আয়েশাকে দেখে তার কাছে গিয়ে বলল,

“আলে আয়েশা আপু।কেমন আছো তুমি।তোমাকে তো অনেক সুন্দল লাগছে।”
আয়েশা ছেলেটার গাল দুটো টেনে আদুরে সুরে বলল,
“থ্যাংক ইউ গুলুমুলু।”
“আমি কিন্তু বলো হয়ে তোমাকেই বিয়ে কলবো।”
“ওলে বাবালে।”
বলেই ছেলেটার গাল একটু চুমু খেলো।যেটা দেখেই শান্ত খেক খেক করে উঠলো। ছেলেটাকে টেনে নিজের কাছে নিয়ে বললো,

“আহারে শখ কতো বিচ্ছুর, ওটা আমার বুকিং দেওয়া বুঝলি। সেকেন্ড টাইম ওর দিকে চোখ তুলে তাকালে তোকে সামনের ওই ড্রেনে ফেলে দিয়ে আসবো।”
ছেলেটাকে আয়েশা নিজের কাছে নিয়ে বললো,
“তুমিও না শান্ত ভাই, এরকম একটা কিউট বাচ্চার সাথে এভাবে কথা বলে কেউ?”
শান্ত এবার একটু নাটকীয় ভাবে গান ধরে বললো,
~তুমি বিশ্বাসঘাতকতা করো না প্রিয়া~
~ আমি ছাড়া তুমি কারো নও…..
ওর এই কাণ্ডে ওখানে উপস্থিত সবাই হো হো করে হেসে দিলো ।

সাঈদের গাড়ি এসে থামলো একটা পার্লার এর সামনে।বৃষ্টিকে নামতে বললে দেখলো বৃষ্টি ভয়ে গাড়ির এক কোণায় কাচুমাচু হয়ে বসে আছে। আর একটু পর পর সাঈদের দিকে সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। সাঈদ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“হোয়াট হেপেন্ড?”
“আপনি কি আমাকে বিক্রি করে দেওয়ার জন্য এখানে নিয়ে এসেছেন?সত্যি করে বলুন।”
“আল্লাহ্ তুমি তোমার এই কোন বান্দিকে আমার ঘাড়ে ঝুলিয়েছো।”
আর কোনো কথা না বলে বৃষ্টিকে কোলে করে নিয়ে ভেতরে ঢুকলো। বসিয়ে দিয়ে একজন স্টাফ এর হাতে একটি প্যাকেট ধরিয়ে দিলো।এরপর সে বেরিয়ে গেলো।আগে থেকেই পার্লার বুক করা ছিলো। বৃষ্টি নিজেকে পার্লারে দেখে একটু স্বস্তি ফিরে পেলো।
স্টাফটি প্যাকেট খুলে শাড়িটি দেখে চোখ বড় বড় করে বৃষ্টিকে বললো,

এমপির অবাধ্য বউ পর্ব ৪৮

“কি কপাল আপনার ম্যাম, এইরকম শাড়ি এখন শুধু বাংলাদেশে মাত্র দুটো এভেইলেবল আছে। তার মধ্যে একটি আপনাকে দিয়েছে আপনার স্বামী।আপনি বড় ভাগ্যবতী ম্যাম।আপনার স্বামী আপনাকে অনেক ভালোবাসে।”
ভালোবাসার কথা শুনে বৃষ্টি মলিন হাসলো।সে জানে হয়তো সাঈদ তাকে কোথাও নিয়ে যাবে আর সেই জন্য তাকে সুন্দর করে রেডি করছে।যেনো কেউ কোনো অভিযোগ করতে না পারে।আসলে এর মধ্যে ভালোবাসা টালোবাসা বলতে কিছু নেই।

এমপির অবাধ্য বউ পর্ব ৫০