Born to be villains part 34

Born to be villains part 34
মিথুবুড়ি

এলিজাবেথের শরীরটা মেঝেতে আঁচড়ে পড়ার আগেই দুটো র ক্তা ক্ত হাত আগলে নিল তার নাজুক দেহখানা, শক্ত করে চেপে ধরল বুকের সাথে। এরপর আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না সে। এলিজাবেথকে পাঁজাকোলে তুলে নিয়ে সিঁড়ি ভেঙে ছুটে গেল ওপরের দিকে। পেছনে গার্ডরা ততক্ষণে ওগ্রুকে তুলে নিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেছে।
নিজের ব্যক্তিগত রুমের সামনে এসে দীর্ঘ কদম থামাল রিচার্ড। এত বিশাল ম্যানশনের ওপরের তলায় কেবল তিনটি শোবার ঘর। একটি রিচার্ডের এবং বাকি দুটো ফাদার ও সোফিয়ার। বেডরুমের দরজার সামনে দাঁড়াতেই রিচার্ডের ঠোঁটের কোণে অদৃশ্য হাসি ফুটে উঠল। তালাটা এখনো অক্ষত আছে। তার মানে ফাদার নিজের সীমা অতিক্রম করেননি।

রিচার্ড তার রুমে কাউকে ঢুকতে দেয় না। কখনোই না।
সবর্দা বাইরে ঝুলানো থাকে বড় একটি তালা। তবে এই তালা খোলা ছাড়াও দরজাটি খোলার আরেকটি উপায় আছে, তা হলো রিচার্ডের চোখের মণি। সেন্সরে রিচার্ড চোখ রাখতেই নিঃশব্দে খুলে যায় দরজাটা।
ভেতরে ঢুকে এলিজাবেথকে বিছানার ওপর শুইয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ ওর মুখের দিকে ঝুঁকে রইল রিচার্ড। লাবণ্যভরা মুখটা এখন কেমন বিধ্বস্ত লাগছে! এই মলিন রূপ রিচার্ডের বুকে তীব্র যন্ত্রণার সৃষ্টি করল। সে একহাতে আলতো করে আগলে ধরল এলিজাবেথের চোয়াল। বুড়ো আঙুল দিয়ে গালে স্পর্শ বুলিয়ে ফিসফিস করে বলে,
“আমি সব ঠিক করে দিচ্ছি, রেড… সব। আমার কাছে তোমার চেয়ে বেশি মূল্যবান আর কিছুই নয়।”
এলিজাবেথের রেড ভেলভেট স্কার্টের নিচের অংশ ছিঁড়ে রিচার্ড বাহুর ক্ষতস্থান বেঁধে নিল। তারপর ভারি পদক্ষেপে গিয়ে দাঁড়াল খালি দেয়ালটার সামনে। ওপর থেকে দেখলে মনে হবে এটি শুধুই একটি দেয়াল। কিন্তু রিচার্ড একদৃষ্টিতে দেয়ালটির দিকে তাকিয়ে ভ্রু উঁচাতেই তা দরজার মতো দু’ভাগে ভাগ হয়ে খুলে গেল। দেয়ালটিতেও সেন্সর লাগানো ছিল এবং এর পেছনে ছিল একটি গুপ্ত কার্বাড। রিচার্ড কার্বাড থেকে একটি রেজিস্ট্রি পেপার বের করে আনল। এরপর অচেতন এলিজাবেথের দিকে শেষবারের মতো একনজর তাকিয়ে, হনহনিয়ে বেরিয়ে গেল সে।

সাজানো-গোছানো আর পরিপাটি কক্ষটি এখন কেবলই এক ভাঙা ধ্বংসস্তূপ। কিছুক্ষণ আগেই তাণ্ডব চালিয়েছে সোফিয়া। সে তখন থেকেই পাগলের মতো আচরণ করছে।কিছুতেই নিজেকে স্বাভাবিক করতে পারছে না, হাতের কাছে যা পাচ্ছে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। ফাদার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন মেয়েকে শান্ত করার। কিন্তু সব চেষ্টা যখন ব্যর্থ হলো, তখন বাধ্য হয়ে ফাদার কৌশলে সোফিয়ার ঘাড়ে একটি ইনজেকশন ফুটিয়ে দিলেন। ওষুধের প্রভাবে সোফিয়ার মোমের মতো মোলায়েম শরীরটা বিছানায় ঢলে পড়ল। চোখের পাতা ভারি হয়ে এলো, ধীরে ধীরে বুজে এলো ক্লান্ত দুটি চোখ।
এমন সময় সোফিয়ার রুমের দরজায় এসে দাঁড়াল রিচার্ড। দীর্ঘ পঁচিশ বছরে আজ দ্বিতীয়বারের মতো সে পা রাখল এই রুমের সামনে। রিচার্ডকে দেখামাত্রই ফাদারের ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ দাউদাউ করে জ্বলে উঠল।

গর্জে উঠলেন ফাদার, “রিদ, দেখো! দেখো কী হাল করেছ আমার মেয়েটা৷ সবকিছুর জন্য একমাত্র তুমি দায়ী। তোমার জন্যই আজ আমার মেয়েটা আবার পুরানো ট্রমায় ফিরে যাচ্ছে।”
দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রিচার্ডের গলায় কোনো ভাবান্তর নেই। নিরুদ্বেগ কণ্ঠে বলল, “অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে না নিয়ে গিয়ে এখানে দাঁড়িয়ে মরাকান্না কেঁদে কী লাভ?”
“রিদ!”
“চেঁচাবেন না। আই হেইট নয়েজ।”
“তুমি… তুমি কি আসলেই আমার সেই রিদ?”
রিচার্ডের নিরাবেগ প্রত্যুত্তর,”হ্যাঁ। শুধু বিয়ের পর পাঁচ কেজি ওয়েট লুজ করেছি।”
“আমার সাথে ফান করছ?”
“আমাদের সম্পর্কটা কি ফান করার মতো?” উল্টো প্রশ্ন ছুড়ে দিল রিচার্ড।
ফাদার আবার বিছানায় পড়ে থাকা নিস্তেজ, বিবর্ণ সোফিয়ার মুখের দিকে তাকালেন। এক বুক কষ্ট চেপে ধরে কাতর কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন, “রিদ দ্যাখো, আমার মেয়েটা কত কেঁদেছে। কেন ওর সাথে এমন করছ? তুমি তো ভালো করেই জানো ওর হাতে আর বেশি সময় নেই… বাঁচবে না আমার সোফি!”
রিচার্ডের চোখ দুটো নির্লিপ্ত,”হু কেয়ার্স?”

“ও তোমার স্ত্রী, রিদ!”
“আমার স্ত্রী, রেড।” সংশোধন করে দিল রিচার্ড।
ফাদারের ধৈর্যের বাঁধ এবার পুরোপুরি ভেঙে গেল। তিনি চড়াও হয়ে সোজা গিয়ে দাঁড়ালেন রিচার্ডের মুখোমুখি। অতঃপর রিচার্ডের বরফশীতল ও নির্বিকার চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,
“রিদ, একদম ভুলে যাবে না তোমাকে আমি নিজের হাতে গড়ায়ছি। আজ যে তেজ দেখিয়ে আমার সাথে কথা বলছ, সেই তেজটাও আমারই তৈরি!”
রিচার্ডের অধর নীড়ে তাচ্ছিল্যের হাসি খেলে গেল। সে দু’হাত পকেটে পুরে, বুক টেনে সটান দাঁড়াল। বীরদেহী
শরীরের প্রতিটি ভাজ আর ভাবভঙ্গিতে ফুটে উঠল দম্ভ। সেই সাথে কণ্ঠের দাম্ভিকতাও আর গোপন রইল না। আঁধারের বুক চিরে আলোক রশ্মির মতো বেরিয়ে এলো তার কর্কশ আওয়াজ,

“ভুল বললেন, ভিনসেনজো। কেউ কখনো কাউকে তৈরি করতে পারে না। আমার শুধু একটা ঠাঁই দরকার ছিল, যা আপনি আমাকে দিয়েছিলেন। কিন্তু তার বিনিময়ে আপনিও কম পাননি। ভুলে যাবেন না এই দ্বীপটা কিন্তু আপনি আমার জন্যই পেয়েছিলেন। অতীতটা যদি ভুলে গিয়ে থাকেন, তবে আবারও মনে করিয়ে দিই—এই দ্বীপ ছিল আমার রাজ্য, আর আমি ছিলাম এর ভবিষ্যৎ রাজা। আর সেই রাজ্য আমি নিজে আপনার হাতে তুলে দিয়েছিলাম, বসিয়েছিলাম রাজসিংহাসনে। সুতরাং আমি আপনার কাছ থেকে রাজ্য পেয়েছি অথবা আপনি আমাকে রাজা বানিয়েছেন—এই ভুল ভাবনা মন থেকে ঝেড়ে ফেলুন। বিনামূল্যে রিচার্ড কায়নাত কারো কাছ থেকে দোয়ার বরকতটুকুও নেয় না। আর তেজের কথা বললেন? এটা কারও দান করা তেজ নয়, এটা রিচার্ড কায়নাতের অহং।”
শাকের করাতের মতো ধারালো শব্দগুলো শুনে ফাদার শিউরে উঠলেন। কয়েক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন তিনি, মুখ ফুটে কোনো শব্দ বের হলো না। সত্যিই কি তাঁর নিজের হাতে গড়ে তোলা সেই রিদ আজ তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে এভাবে কথা বলছে?

নিজেকে সামলে নিয়ে ফাদার বললেন, “রাজার অহংকার দেখাচ্ছ? ভুলে গেছো অতীত? ভুলে গেছো কী ঘটেছিল তোর মায়ের সাথে? নরকপুরী থেকে তোমাকে বের করে এনে এই স্বর্গের ছায়ায় কে জায়গা দিয়েছিল?আমি দিয়েছিলাম, আমি। অকৃতজ্ঞের মতো কথা বলবে না, রিদ!”
রিচার্ডের ঠোঁটের কোণে এবার বিষাক্ত, কটাক্ষভরা হাসি ভাসল, অট্টহাসির নীরব চিৎকারের মতো। আজ সে সরাসরি ফাদারের চোখে চোখ রাখল, “আমি অকৃতজ্ঞ?”,বিদঘুটে হাসির দিল রিচার্ড, “আমার এক মাত্র ত্যাগের কাছে আপনার এই পঁচিশ বছরের ইতিহাস আজ অবধি নতজানু হয়ে আছে।”
ফাদারের মুখটা হিংস্র হয়ে উঠল, চাপা কিন্তু হুংকার ছাড়া গলায় তিনি বললেন, “শুধু আমার কথায় তুমি তোমার সমস্ত স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে চলে আসোনি, রিদ! প্রতিশোধের র ক্ত পিপাসায় অন্ধ হয়ে গিয়েছিলে তুমি।”
“সিংহ শাবক একবার শিকারের স্বাদ পেয়ে গেলে তাকে আর কোনো শিকল দিয়ে আটকে রাখা যায় না।” রিচার্ডের কণ্ঠ বরফের মতো ঠান্ডা শোনালো, “যে প্রতিশোধের আগুন আমার বুকে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তা পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকি না কেন, যে অবস্থাতেই থাকি না কেন, সেই প্রতিশোধ আমি নিতামই!”
রিচার্ডের কথার তেজ আর চোখের চাবুকের মতো চাউনিতে ফাদার কেঁপে উঠলেন। এ কি সত্যিই সেই রিচার্ড? তাঁর প্রিয় রিদ? ছেলেটা ছোটবেলা থেকেই একরোখা আর গম্ভীর প্রকৃতির ছিল। কথা কম বলে, কদাচিৎ হাসে, মনের ভেতরে সবসময় রহস্য পুষে রাখে। কিন্তু এসবের মাঝেও তাঁর প্রতি রিদের যে অগাধ সম্মান, নিষ্ঠা আর ভক্তি ছিল, আজ তার লেশমাত্র দেখতে পেলেন না ফাদার। এই রিচার্ড তাঁর কাছে বড্ড অচেনা, বড্ড ভয়ংকর!

ফাদার শুকনো ঢোক গিলে নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করলেন। মৃদু পায়ে এগিয়ে এসে হাত রাখলেন রিচার্ডের কাঁধে। তাঁর চোখমুখে ভয়ের ছাপ এখন স্পষ্ট। ইতস্তত ভাব কাটিয়ে সরাসরি বলেই বসলেন,
“রিদ… কাম অন, মাই বয়! মেয়েই তো চাও তুমি, তাই না? ঠিক আছে। আমার মেয়েকে তোমার মানতে হবে না, ওর সাথে সংসারও করতে হবে না। বিশ্বের যেকোনো মেয়েকে নিজের জন্য বেছে নাও তুমি, সৌন্দর্যের পশরা সাজিয়ে দেব তোমার সামনে৷ কিন্তু ওই মেয়েটা নয়… ও আমার অহংকারে আঘাত করেছে।”
রিচার্ডের ঠোঁটে উঠল তাচ্ছিল্যের হাসি। কাঁধটা সামান্য ঝাঁকিয়ে অবজ্ঞার সাথে ফাদারের হাতটা ফেলে দিল সে। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে প্রতিটি শব্দ উচ্চারণ করল,
“নারীর শরীরের নেশা থাকলে সবার আগে আপনার মেয়েকে বিছানায় নিতাম, তারপর আপনার ওই সো কল্ড রক্ষিতাকে। নারীর নেশা রিচার্ড কায়নাত কখনোই ছিল না। আমার একটাই নেশা—ওই লাল চুলের মেয়েটা। যার জন্য হাজারবার মরতেও পারি, আবার কাউকে মেরেও ফেলতে পারি। আপনি যদি মাঝপথে আসেন, তবে আপনাকেই…! সব তো জানেনই, শেষ পর্যন্ত আমাট রক্তটা তো নিশ্চয়ই কোনো জানোয়ারেরই হব…”
“ওই মেয়ে কালো জাদু করেছে তোকে?” পারমাণবিক বোমার মতো বিস্ফোরিত হলো ফাদারের কণ্ঠ।
তাঁর আকাশচুম্বী চিৎকারের বিপরীতে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ঠোঁট উল্টালো রিচার্ড। যেন গভীরভাবে কিছু একটা মনে করার চেষ্টা করছে সে। তারপর শান্ত কণ্ঠে বলল,

“হাহ! জাদু? ওহ্ হ্যাঁ, করেছে তো… ভালোবাসার জাদু!”
“রিদ…!”
“আমার স্ত্রী বেডরুমে একা আছে। শি নিডস মি। আসছি…”
কথাটি শেষ করে রিচার্ড ঘুরে দাঁড়াতেই ফাদারের তীব্র গলার আওয়াজ পিছু ধাওয়া করল,”আর আমার মেয়ে? ভুলে যেয়ো না, ও তোর প্রথম স্ত্রী!”
“সে-ই প্রথম, সে-ই শেষ। মাঝখানে কোনো অনশন ছিল না, আর কখনোই থাকবে না।”
“রিচার্ড তুমি যা বোঝাতে চাইছ, তা আমি বেঁচে থাকতে কখনোই হতে দেব না!”
রিচার্ড তপ্ত শ্বাস ফেলে এক পা এগিয়ে এসে ফাদারের সামনে দাঁড়াল। এই প্রথমবারের মতো সে ফাদারের হাতটা ছুঁল। তীব্র আকুলতায় ফাদারের হাতটি নিজের বুকের বাম পাশে এনে রাখল, “এখানে হাত রাখুন, ফাদার। কিছু টের পাচ্ছেন? ওই কাতর চোখ দুটো থেকে গড়িয়ে পড়া প্রতিটি অশ্রুবিন্দু ঝড়ের মতো তোলপাড় সৃষ্টি করছে এই বুকে। এই তাণ্ডব সইতে না পেরে এতদিন পালিয়ে বেড়াচ্ছিলাম। কিন্তু আজ… আজ আমি বড্ড দুর্বল…ভীষণ দূর্বল ফাদার। কাউকে হারানোর ভয় বিচ্ছিরিভাবে আমার শরীরের সব শক্তি শুষে নিয়েচ্ছে। এই ছলনা, এই রহস্য আর প্রতিশোধের খেলা চালিয়ে যাওয়া আমার পক্ষে আর সম্ভব নয়। আমি স্বার্থপর হতে চাই। গ্র্যান্ড পার্টির আয়োজন করুন, সবার সামনে ঘোষণা দিন—রিচার্ড কায়নাত বিবাহিত। আর কোনো লুকোচুরি নয়। আর হ্যাঁ, মিরর হাউজে ব্লাস্ট করানোর ব্যবস্থা করুন।”

ফাদারের হাতে রেজিস্ট্রি পেপারটা গুঁজে দিয়ে রিচার্ড এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল না। যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল সে। ফাদার হতবিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন কাগজটার দিকে। পাত্রের সাক্ষরের জায়গাটা একদম ফাঁকা! রিচার্ডের সই নেই সেখানে। তবে কি রিচার্ড সেদিন…?
কথাটা মাথায় আসতেই ফাদারের ক্ষুরধার মস্তিষ্ক যেন দুলে উঠল। মুহূর্তের জন্য চোখের সামনের সবকিছু ঘোলাটে হয়ে এলো। আক্ষেপ আর ক্ষোভে ফেটে পড়ে এক হ্যাঁচকায় রেজিস্ট্রি পেপারটা টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেললেন তিনি। এরপর প্রায় ছুটে গিয়ে অচেতন সোফিয়ার নাজুক শরীরটা বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন,

“আই’ম স্যরি, সুইটহার্ট! ড্যাডা-আআআ রিয়েলি স্যরি! আমি পারলাম না… তোমাকে একটা সুন্দর জীবন দিতে পারলাম না। তোমার ড্যাডা ব্যর্থ, প্রিন্সেস। সে তোমার শেষ ইচ্ছেটাও পূরণ করতে পারল না। কিন্তু আমি আর কী করতে পারি, বলো? আমি আর কত স্বার্থপর হব? নিজের স্বার্থের জন্য অলরেডি ওর চোখে আমি অনেক ছোট হয়ে গেছি। সেই সম্মান, সেই ভক্তি-শ্রদ্ধা আর নেই। আর আমার রিদ? শুধু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে গিয়ে যে ত্যাগ স্বীকার করেছে, নিজের রক্তের কেউও তা করে না। স্যরি মাম্মা, আই’ম সো স্যরি! রিদ যে আমার বড্ড আদরের ছেলে… আমার সন্তান, আমার বাঘের বাচ্চা।এক সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে গিয়ে আরেক সন্তানকে তো আমি নিজ হাতে ধ্বংস করতে পারি না। রিদ মেয়েটাকে সত্যিই ভালোবাসে, মাম্মা। আমি নিজ চোখে দেখেছি, ওর চোখে সেই ভালোবাসার রূপ দেখেছি।”

“খেয়ে নাও।”
হাঁটু থেকে মুখ তুলে ফ্যালফ্যালে দৃষ্টিতে ন্যাসোর দিকে তাকাল ইবরাত। দীর্ঘক্ষণ কান্নাকাটি করার ফলে দীঘল দু’টো চোখ ফুলে একাকার হয়ে আছে। তা দেখে ন্যাসোর মসৃণ কপালে খানিক বিস্ময়ের ভাঁজ পড়ল। সে কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“এই বোকা মেয়ে, এভাবে কাঁদছ কেন? একা ঘরে ভয় পাচ্ছ?”
ইবরাত অকস্মাৎ শিশুদের মতো ফুঁপিয়ে উঠে বলল,
“আমি আমার বোনের কাছে যাব। ইমামা কোথায়? আমাকে প্লিজ ওর কাছে নিয়ে চলুন, বিলেত রাজা! ও নিশ্চয়ই খুব কষ্ট পাচ্ছে… আমাকে ওর কাছে নিয়ে চলুন।”
ন্যাসো এবার বুঝতে পারল মেয়েটার চোখে মেঘ জমার আসল কারণ। প্রিয়জনের ব্যাথায় এমনটা হওয়া খুব স্বাভাবিক। ন্যাসো তার চিরাচরিত কঠোর এবং গম্ভীর অভিব্যক্তি খানিকটা হালকা করে কোমল গলায় বলল,
“নিয়ে যাব। কিন্তু তার আগে চোখের জল মোছো।”

ইবরাত শেষবারের মতো জোরে একটা নাক টান দিল। কান্না সামলাতে না পেরে তার ঠোঁট দুটো তখনও বারবার কেঁপে উঠছে। ইবরাত একটা ছোট্ট শিশুর মতো খানিক এগিয়ে এসে বিছানার কোণায় ন্যাসোর শরীর ঘেষে বসল। তারপর কোনো দ্বিধা ছাড়াই ন্যাসোর পরনের কালো টি-শার্টটা টেনে ধরে চোখ মুছল। ন্যাসো কিছুটা অবাক হলেও অসন্তোষ প্রকাশ করল না। সে বুঝতে পারল, মেয়েটা এখন তাকে নিজের খুব কাছের ও নিরাপদ ভাবছে, ভরসা পাচ্ছে বলেই এত সহজে এমনটা করতে পেরেছে। কিন্তু ইবরাত শুধু চোখ মুছেই ক্ষান্ত হলো না, ন্যাসোর ধোয়া-মোছা পরিষ্কার টি-শার্টে নিজের নাকের সর্দিও মুছে ফেলল।
এবার ন্যাসোর চেহারায় দৃশ্যত পরিবর্তন এলো। তীক্ষ্ণ নাকটা কুঁকড়ে গেল, গা গুলিয়ে উঠলেও সে যথাসম্ভব নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল। কিন্তু পরক্ষণেই, না চাইতেও তার ঠোঁটের কোণে একচিলতে চাপা হাসি ফুটে উঠল। ইবরাতকে এই মুহূর্তে সত্যিই একটা অবুঝ শিশুর মতো লাগছে। কীভাবে দু’হাতে হাঁটু দুটো জড়িয়ে বসে আছে মেয়েটা! তার কোমরছোঁয়া ঘন চুলগুলো কবিতার ছন্দের মতো পিঠ পেরিয়ে বিছানায় ছড়িয়ে আছে। ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে ওঠা শরীরের সাথে সাথে যেন তার চুলগুলোও তাল মিলিয়ে নেচে উঠছে।
ন্যাসো খাবারের ট্রে সমেত ইবরাতের সামনে বসল। রাগ বা তেজ সম্পূর্ণ দূরে সরিয়ে রেখে একদম শান্ত কণ্ঠে জানতে চাইল,

“এখন বলো তো, কী হয়েছে?”
চোখের জল মুছলেও ইবরাতের কান্নার তোড় তখনও পুরোপুরি থামেনি। সে হেঁচকি তুলতে তুলতে বলল,
“আমার ইমামার জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে। আপনার বস ওর সাথে এটা কী করল? ও কীভাবে সইবে এসব? রিদ ভাইয়া কেন করল এমনটা? উনি তো ইমামাকে খুব ভালোবাসতেন! আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, খুওওববব।”
পুরো দৃশ্যটা যেন এমন ছিল—ন্যাসো কোনো এক দায়িত্বশীল অভিভাবক, আর ইবরাত একটা অবুঝ শিশু; যে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তার অভিভাবকের কাছে মনের সব অভিযোগ জানাচ্ছে। ন্যাসো অত্যন্ত শান্তভাবে ইবরাতের প্রতিটি কথা শুনল। তারপর কোনো কঠিন অংক মেলানোর মতো হিসেবি গলায় বলল,
“কী করেছে? আর ম্যামের জন্য তোমার এত কষ্টই বা হচ্ছে কেন? তোমার তো বরং আরও খুশি হওয়া উচিত যে, তোমার বেস্টফ্রেন্ড আমার বসের মতো একজন জীবনসঙ্গী পেয়েছে!”
ইবরাত ভেজা চোখ জোড়া তুলে ন্যাসোর শান্ত দৃষ্টির দিকে তাকাল। হেঁচকি তুলে বলল, “আপনার বস ঠকিয়েছে আমার বেস্টফ্রেন্ডকে।”

ন্যাসোর গমরঙা ঠোঁটের কোণে একচিলতে রহস্যময় হাসি উঁকি দিল। সে সাথে সাথে কোনো জবাব দিল না। বাটি থেকে চামচ দিয়ে স্যুপটা একটু নাড়িয়ে, এক চামচ স্যুপ ইবরাতের মুখের সামনে তুলে ধরল। কাজটা সে এতটাই সাবলীল আর যত্ন নিয়ে করল, যেন এটা তাদের প্রতিদিনের চেনা দৃশ্য।
ইবরাত অবাক হলো, তার ভেতরে কনকনে শিহরণ খেলে গেল। সে বিস্ময়ভরা চোখে লোকটার দিকে তাকাতেই ন্যাসো ইশারায় হাঁ করতে বলল। একদম লক্ষ্মী বাচ্চার মতো ইবরাতও তা-ই করল।
ইবরাতকে এক চামচ খাইয়ে দিয়ে ন্যাসো আবারও স্যুপ তুলল। খাওয়াতে খাওয়াতে বলল, “উঁহু, আমার বস দুনিয়ার আর সব পারলেও এই কাজটা কখনোই পারবে না। কিছু বিষয় ক্ষমতার বাইরে থাকে, যা মানুষ চাইলেও করতে পারে না। ম্যামকে ঠকানোটাও বসের ক্ষমতার বাইরে। তাই এখন না কেঁদে চুপচাপ খাবারটা খেয়ে নাও। তোমার বেস্টফ্রেন্ড জিতেছে। শি গট দ্য বেস্ট হাসবেন্ড। আমি ড্যাম শিওর, বস একদিন বেস্ট হাসবেন্ড এওয়ার্ড পাবেই।”

ইবরাত মুখের খাবারটুকু গিলে, নাক টেনে বলল, “নিজের বস বলে এত প্রশংসা করছেন, তাই না?”
“উঁহু, প্রশংসা নয়। হি ইজ অ্যান একচুয়াল আলফা। বুদ্ধি আর ক্ষমতা দিয়ে তাকে আজ পর্যন্ত কেউ হারাতে পারেনি, আর না ভালোবাসা দিয়ে কেউ পারবে। উল্টে এই ভালোবাসার জন্য সে সব করতে পারে। কাউকে মারতে পারে, এমনকি নিজেও মরতে পারে। নিজের ভালোবাসাকে আপন করে নেওয়ার জন্য সে যেমন সবকিছু ধ্বংস করে দিতে পারে, তেমনি প্রয়োজনে ভালোবাসার মানুষের সাথে ছলনাও করতে পারে। পৃথিবীর তথাকথিত প্রেমিকদের সাথে তাকে মেলাতে যাওয়াটা বোকামি। তার ভালোবাসার ধরন ভিন্ন, নিজস্ব—যা সে নিজে তৈরি করে। রিচার্ড কায়নাত কখনো হারতে শেখেনি। যেকোনো মুহূর্তে, যেকোনো সময়, যেকোনো অবস্থায় সে খেলার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এমনকি ধ্বংসের শেষ সীমানায় দাঁড়িয়েও সে বলতে পারে—দ্য গেম ইজ নট ওভার!”

ন্যাসোর দীর্ঘ বক্তব্যের পর ইবরাত নিষ্পাপ মুখে শুধু বলল,
“আমার আবার কান্না আসছে। আর সর্দিও…”
বাটি থেকে আরেক চামচ স্যুপ তুলতে গিয়েও থমকে গেল ন্যাসো। চট করে চোখ তুলে তাকাল ইবরাতের দিকে। মেয়েটার চোখে আবারও শ্রাবণের মেঘ জমে আসছে, জল গড়িয়ে পড়ার উপক্রম!
ন্যাসোর ঠোঁটের কোণে একফালি মৃদু হাসির আলোড়ন দেখা দিল। মেয়েটা যে বড্ড বেশি বোকা আর সরল, ন্যাসোর রূপক কথাগুলোর গভীর অর্থ যে সে বিন্দুমাত্র বুঝতে পারেনি, তা বুঝতে ন্যাসোর আর বাকি রইল না।
ন্যাসো কয়েক সেকেন্ড ঠোঁট কামড়ে ইবরাতের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিজের টি-শার্টের দিকে তাকাল। টি-শার্টের নিচের অংশটা সর্দিতে ইতোমধ্যে চ্যাটচ্যাটে হয়ে আছে! ন্যাসো কয়েক সেকেন্ড কিছু ভাবল। তারপর ন্যাসো বিনা দ্বিধায় নিজের চওড়া কাঁধটা ইবরাতের দিকে এগিয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“আচ্ছা,এখানে মুছো। তারপর কিন্তু পুরো খাবারটা শেষ করতে হবে!”

চারদিকে পাতালপুরীর মতো পিনপতন নীরবতা। একটু আগেও যে সিঁড়ির সামনে র ক্তবন্যা বইয়ে গিয়েছিল, এখন সে-ই জায়গাটা আয়নার মতো চকচক করছে। নৃ শং সতার কোনো আলামতই নেই। বিশজনেরও অধিক দাসী থাকা সত্ত্বেও ম্যানশনের ভেতরটা অদ্ভুতরকম ফাঁকা। পরিবেশের এই শিথিলতা দেখে বোঝার উপায় নেই যে কিছুক্ষণ আগেই এখানে ঝড়ের তাণ্ডব বয়ে গেছে।
রিচার্ড সোফিয়ার রুম থেকে বেরিয়ে আসতেই মুখোমুখি হলো তাসার। রিচার্ডকে দেখামাত্র তাসার তীক্ষ্ণ ও ধারালো চোখে একধরনের লালসা ঝিলিক দিয়ে উঠল। তার ভেতরের সুপ্ত কা ম না র বীজ যেন মুহূর্তেই চাড়া দিয়ে উঠল। ঠোঁটে লাস্যময়ী হাসি ফুটিয়ে, শরীর দোলাতে দোলাতে সে রিচার্ডের দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু রিচার্ড তাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে পাশ কাটিয়ে চলে গেলে তাসা একপ্রকার ছুটে গিয়ে পথ আটকে দাঁড়াল।
তারপর নিজের বক্ষযুগল দুই হাত দিয়ে দু’পাশ থেকে চেপে আরও ফুলিয়ে কামাতুর হিসহিসিয়ে ওঠা গলায় বলল,

“রিদ, কাম অন মাই বয় চলো আমার সাথে। এই মুহূর্তে তোমার আমাকেই প্রয়োজন, আমি জানি। ওই মেয়েটা এখন তোমাকে কাছে ঘেষতে দেবে না। চলো স্টারবয়, আজকের রাতটা আমি তোমার জন্য স্মরণীয় করে দিই।”
রিচার্ড ভুল করেও তাসার দিকে চোখ তুলে তাকাল না। এমনিতেই তাসার উপস্থিতিতে তার চিবুক শক্ত হয়ে উঠে। আর এখন এমন প্রস্তাব শুনে ক্রোধে তা আরও র ক্তবর্ণ ধারণ করল। মেঝের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখেই রিচার্ড কুটিল হাসল। চাপা গলায় বলল,
“দুই টাকার রক্ষিতাকে ছুঁয়ে আমার চাঁদে কলঙ্ক লাগাতে চাই না, তাসা বেইবি। সো ব্যাক অফ।”
তাসা ব্যাকুল হয়ে ওঠে। তীব্র আকুলতায় ফিসফিসিয়ে বলল,”ওই মেয়েটা কিচ্ছু জানতে পারবে না!”
“তুমি এলিজাবেথকে চেনো না, তাই অবলীলায় কথাটা বলতে পারলে।”
তাসা তাচ্ছিল্যের সাথে শরীর ঝাঁকিয়ে হেসে উঠল, “হাহ! যেখানে সোফিয়ার মতো মেয়ে আমার কাছে জাস্ট লাইক আ প্রিটি লিটল বেবি, সেখানে হু ইজ শি? মামুলি একটা মেয়ে ছাড়া আর কিছুই নয়।”
“শি ইজ কুইন। আর দাসীদের মুখে রানীর নাম শোভা পায় না।”
“আই’ম ফার বেটার দ্যান হার! একবার বেডে নিয়ে তো দেখো, হানি! একটু পারফর্ম করার সুযোগ দিয়ে দেখো না… আই সোয়ার, তুমি নিরাশ হবে না।”

কথাগুলো বলেই তাসা করে বসল এক অমার্জনীয় কাজ। আচমকা সে একটানে নিজের পোশাকের পিছনের ফিতেটা খুলে ফেলল। ফলস্বরূপ মুহূর্তের মধ্যে তার অনাবৃত ঊর্ধ্বাংশ দৃশ্যমান হয়ে উঠল। দৃশ্যটি না দেখেও অনুধাবন করতে পেরে তীব্র ঘৃণায় রিচার্ড চোখ-মুখ শক্ত করে বুজে ফেলল। ওই অবস্থাতেই সে তাসার হাঁটুর গিঁটে সজোরে এক লাথি বসাল। অতর্কিত আঘাতে তাসা যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। পর মুহূর্তেই রিচার্ড একটানে গায়ের শার্ট ছিঁড়ে ফেলল। সম্পূণ অনাবৃত হয়ে গেল তার সুগঠিত শরীরের উপরাংশ। এরপর ছিঁড়ে ফেলা শার্টটি সে অর্ধনগ্ন তাসার দিকে ছুঁড়ে মারল, মুহুর্তেই ঢেকে গেল তাসার অনাবৃত শরীর।
এবার চোখ খুলল রিচার্ড। তার সমুদ্র-নীল চোখের গভীরে যেন কোনো নর খাদক জেগে উঠেছে, নীল মণির চারপাশের সাদা অংশ ক্রোধে র ক্তলাল। রিচার্ড ভারী চিলছি বুট পরিহিত পা-টা তাসার স্পর্শকাতর জায়গায় রেখে সজোরে পিষে ধরল। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে তাসা অগ্নিদৃষ্টিতে তাকায়। বিপরীতে রিচার্ড চাপ বাড়ায়। পা দিয়ে জায়গাটা পিষে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

“ইয়্যু ক্রেজি বি*চ। হাউ ডেয়ার ইউ…তোর অস্তিত্ব একটা তুচ্ছ প তি তার চেয়ে বেশি কিছু নয়। এরপর থেকে তোর এই কুৎসিত নজর যদি আমার স্ত্রী বা সন্তানের ওপর পড়ে, তবে সেটাই হবে যা ফাদারের ভয়ে এতদিন করিনি। অনেকবার ওয়ার্ন করেছি, দূরে থাকতে বলেছি, এরপর আর কোনো সতর্কবার্তা দেব না।”
যন্ত্রণায় রিভলবারের গুলির মতো কাঁপছিল তাসার কণ্ঠ,”কী… কী করবে তুমি?”
রিচার্ডের ঠোঁটে ফুটে উঠল পৈশাচিক, বিভৎস হাসি,”ইউ’ল বি মাই ওয়ান-নাইট পার্টনার ইন দ্য মিরর হাউস।”
মিরর হাউস- এর নাম শোনামাত্র তাসার ক্ষিপ্ত চোখ দুটো নিমিষেই আতঙ্কে কেঁপে উঠল। তা দেখে রিচার্ডের পৈশাচিক হাসিটা আরও চওড়া হলো। সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। ভারী বুটের শব্দ তুলে হনহনিয়ে ম্যানশন থেকে বেরিয়ে গেল।

“এক ট্যুরেই চার ছক্কা?”
রিচার্ড সিগারেটের ফিল্টারটা সুইমিং পুলের পানিতে ছুঁড়ে ফেলে নতুন আরেকটি সিগারেট ধরাল। প্রশ্নটির উত্তর তৎক্ষনাৎ দেওয়ার তাগিদ তার মধ্যে দেখা গেল না। লুকাস ঠোঁটের কোণে মিটিমিটি হাসি চেপে রিচার্ডের পাশে এসে দাঁড়াল। রিচার্ডের উপরাংশ তখনও অনাবৃত। খালি গায়ের উন্মুক্ত পিঠে, চাঁদের আলোয় ঘাড়ের বাটারফ্লাই ট্যাটুটা যেন সত্যি সত্যি ডানা মেলে উড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
নতুন ধোঁয়ায় টান দিয়ে রিচার্ড মৃদু শব্দ করে, “উঁহু।”
লুকাসের হাসির রেখা নিমেষেই মিলিয়ে গেল। সে কিছুটা অবাক হয়ে সপ্রশ্নে বসের দিকে তাকায়, “হুহ?”
মুখভর্তি ধোঁয়া আকাশে ছেড়ে দিয়ে রিচার্ড অন্যমনস্ক চোখে চাঁদের দিকে তাকাল। তার নিরাবেগ ঠান্ডা কণ্ঠ ভেসে এলো,

“যা হওয়ার বিডি’তেই হতো। আগে থেকেই প্ল্যান করা ছিল, তাই বিয়ের পর আর এক সেকেন্ডও অহেতুক সময় নষ্ট করিনি।”
পেছন থেকে ন্যাসোর গলার শব্দ পাওয়া গেল, “তাহলে কি এত দীর্ঘ ট্যুরের পেছনের মূল কারণ ছিল কনফার্মেশন?”
ন্যাসো টি-শার্ট পাল্টে লুকাসের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। খোলা আকাশের নিচে, পুলের টলটলে স্বচ্ছ পানির ধারে তিনজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। রিচার্ডের অভিব্যক্তিতে কোনো পরিবর্তন নেই, কেবল তার ঠোঁটের এককোণ সামান্য বাঁকা হয়ে একচিলতে রহস্যময় হাসির আভাস দিল।
তা দেখে ন্যাসো দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে,”ইউ আর সাচ অ্যান ইভিল মাস্টারমাইন্ড!”
লুকাস কিছুটা চিন্তিত গলায় বলল, “ম্যাম এই ধাক্কাটা সামলে উঠতে পারবে তো? সত্যিটা জানার আগেই যদি আবেগের বশে কিছু করে বসে?”
রিচার্ড ঘাড় বাঁকিয়ে লুকাসের দিকে তাকাল। বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে জবাব দিল, “ওকে এতটা দুর্বল ভেবো না তোমরা।”

সিগারেটটা ফেলে ম্যানশনের দিকে হাঁটা দিল সে। কিন্তু পেছন থেকে ভেসে আসা লুকাসের গম্ভীর কণ্ঠস্বর রিচার্ডকে থামিয়ে দিল,
“গায়ে যতই রাণীর র ক্ত বইুক না কেন, বেড়ে ওঠা কিন্তু খাঁটি বাঙালি সংস্কৃতিতেই। আর বাঙালি মেয়েরা বিশ্বজয়ের শক্তি রাখলেও, স্বামীর পাশে অন্য কাউকেই সহ্য করতে পারে না।”
কথাগুলো শুনে রিচার্ড ক্ষণিকের জন্য থমকে দাঁড়াল। বাক্যগুলো তার মস্তিষ্কে কয়েকবার প্রতিধ্বনি তুলল। কিন্তু সবশেষে তার চেহারার নির্লিপ্ত অভিব্যক্তিতে কোনো পরিবর্তন এলো না। সে শান্ত পায়ে আবার ম্যানশনের দিকে হেঁটে গেল।

অন্যদিকে ইতালির বিমানবন্দর ছেড়ে বেরিয়ে আসছে নিক আর সুরাকার। আপাদমস্তক কালো পোশাকে মুখ ঢেকে রাখা দুজনকে দেখলে যে কেউ তাদের দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী,অযবা টেরোরিস্ট ভেবে ভুল করবে। বিমানবন্দর প্রাঙ্গণ পার হয়ে তারা একটি ট্যাক্সি ক্যাব বুক করল।
ক্যাবে উঠেই সুরাকার ক্লান্ত শরীরটা জানালায় এলিয়ে দিল অনায়াসে পা দুটো তুলে রাখল নিকের উরুর ওপর। বিপরীতে নিকের মুখের অভিব্যক্তিতে বিরক্তির বদলে অভ্যস্ত ভাব। বোঝায় গেল এই দৃশ্য তাদের জন্য নতুন কিছু নয়।
সুরাকার পকেট থেকে ফোন বের করল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল রিচার্ডের নম্বর। এবার তার খেলায় নতুন মোড় এসেছে। এতদিন সে এলিজাবেথকে ফোন আর মেসেজের পর মেসেজ পাঠিয়ে আতঙ্কের সাগরে ডুবিয়ে রেখেছিল। কিন্তু আজ তার কৌশল ভিন্ন। সে সরাসরি রিচার্ডের নম্বরে মেসেজ পাঠাল,
“শি ইজ মাইন। অ্যান্ড মাইন অ্যালোন।”
ওপাশ থেকে প্রায় সাথে সাথেই রিপ্লাই এলো,
“কিপ ড্রিমিং, ম্যান।”

ফোনটা পকেটে পুরে রিচার্ড নিজের বেডরুমের সামনে এসে দাঁড়াল। দরজার বায়োমেট্রিক সেন্সর তার চোখের রেটিনা স্ক্যান করতেই যান্ত্রিক শব্দে দরজা খুলে গেল। কিন্তু ভেতরে একপা ফেলতেই রিচার্ডের পুরো শরীর যেন পাথরের মতো জমে গেল। মনে হলো, তার পা দুটো হঠাৎ সীসার সাথে আটকে গেছে। শরীর আর এগোচ্ছে না, বুকে আটকে গেছে নিঃশ্বাস!
তার বিবর্ণ এবং র ক্তশূণ্য দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো এলিজাবেথের ঝুলন্ত হাতের ওপর। খাটের ওপর থেকে হাতটা ঝুলে আছে, মেঝেকে ছুঁই-ছুঁই করছে। কেটে ফেলা শি রা থেকে অঝোরে ঝরে পড়ছে লাল র ক্ত।
রিচার্ডের কানের পাশে শুধু প্রতিধ্বনিত হতে লাগল লুকাসের বলা কথাটা—”মেয়েরা সব পারলেও স্বামীর পাশে কাউকে সহ্য করেত পারে না।”
কথা বলতে বলতে ম্যানশনের ভেতর ঢুকছিল ন্যাসো আর লুকাস। কিন্তু ভেতরের দৃশ্য চোখে পড়তেই তারা শিউরে উঠল। রিচার্ড উন্মাদের মতো এলিজাবেথকে কোলে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে নেমে আসছে। মেয়েটার নিথর হাত থেকে তখনও ফোটা ফোটা র ক্ত ঝরছে আর তাদের প্রতাপশালী বসের চোখে ফুটে উঠেছে অতল আতঙ্ক।

কয়েকটা সিঁড়ি নামতেই হঠাৎ রিচার্ডের শরীরের সব শক্তি যেন কেউ মুহূর্তের মধ্যে শুষে নিল। অকস্মাৎ সে হাঁটু মুড়ে সিঁড়ির ওপরই বসে পড়ল। যে লোক একা হাতে শত্রু বাহিনীকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে, সেই অপরাজেয় রিচার্ড কায়নাত আজ এলিজাবেথের এই হালকা, নিথর দেহটার ভার বইতে পারছে না!
ন্যাসো আর লুকাস দ্রুত ছুটে এলো। ন্যাসো হাত বাড়িয়ে এলিজাবেথকে নিজের কোলে নেওয়ার চেষ্টা করতেই রিচার্ড ওকে আরও আগলে ধরল। কাউকে ছুঁতেও দিল না।

Born to be villains part 33

সাধারণ মানুষ যন্ত্রণায় হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে, চিৎকার করে তাদের ভেতরের ব্যাথা প্রকাশ করে। কিন্তু রিচার্ড তো সাধারণ চার-পাঁচটা মানুষের মতো নয়। তার কষ্টগুলো শব্দ হয়ে বের হতে পারে না। তাই বুঝি তীব্র বেদনায় তার চোখের কোণে জমে ওঠে র ক্তের বিন্দু! রিচার্ড শক্ত করে চোখ-মুখ কুঁচকে ভেতরে জমাট বাঁধা একফোঁটা দীর্ঘশ্বাস শব্দ করে টেনে নিল। তারপর এলিজাবেথের নিথর দেহটা শক্ত করে বুকে চেপে ধরে আবারও উন্মাদের মতো হাসপাতালের উদ্দেশ্যে দৌড়ে গেল…

Born to be villains part 35