Born to be villains part 35
মিথুবুড়ি
❝প্রেমেরও কাহিনী গান
হয়ে গেল অবসান।
এখন কেহ হাসে….
কেহ বসে ফেলে অশ্রুজল,
এখন কেহ হাসে,,,,
কেহ বসে ফেলে অশ্রুজল।
সখী চলো….
এরা সুখের লাগি চাহে প্রেম,
প্রেম মেলে না….
শুধু সুখ চলে যায়।
এমনি মায়ার ছলনা…..❞
একটি বিস্তৃত কক্ষের চারটি কোণ। একটি কোণের দেয়ালে র ক্ত দিয়ে লেখা ছিল এই হৃদয়বিদারক আকুল লাইনগুলো। অন্য আরেকটি কোণ আবার আড়াআড়িভাবে রাখা দুটি চকচকে গাড়িতে ঠাসা। শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, সুস্থ মস্তিষ্কের কোনো মানুষের নিজ শোবার ঘরে এমন দুটি ব্র্যান্ড নিউ গাড়ি রাখা তো স্বাভাবিক নয়! গাড়ির ঠিক সামনের দেয়াল জুড়ে রয়েছে বিশাল কাঁচ, যার ওপারেই হাতছানি দেয় নীল সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ।
আসবাব বলতে বিশেষ কিছুই নেই। তবে পুরো কাঠামোর নকশাটা অদ্ভুত। মনে হয় যেন কোনো অন্ধকার, আঁধারঘেরা গুহা। সুবিশাল মাস্টার বেডের সামনের পুরো দেয়ালটা জুড়ে সাজানো অসংখ্য মনিটর। ইতালি থেকে এই মনিটরগুলোর মাধ্যমেই রিচার্ড সর্বক্ষণ এলিজাবেথকে নিজের নজরবন্দি করে রাখত। খাটের পেছনের সম্পূর্ণ দেয়ালটা দখল করে আছে অদক্ষ হাতে কাঠপেন্সিলে আঁকা একটি বিশাল পেইন্টিং।
এই পেইন্টিংটিই সেদিন এলিজাবেথের হৃদয়ের বুদ্বুদে কান্নার সুনামি তুলেছিল। ভাঙা মন নিয়ে বোকা মেয়েটি ধরে নিয়েছিল পেইন্টিংয়ের ওই ছোট্ট মেয়েটি বোধহয় সোফিয়া, যাকে সবাই রিচার্ডের প্রথম স্ত্রী বলে দাবি করছে। অথচ সে যদি চোখের জল মুছে আরেকটু সতর্ক হয়ে দেখত, তবে ঠিকই দেখতে পেত—ছবিটির অবয়ব অস্পষ্ট হলেও নাকের ওপর থাকা লাল তিলটি তারই স্পষ্ট চিহ্ন বহন করছে! যা আজ থেকে আঠারো বছর আগে কোনো এক চৌদ্দ সিকের অন্ধকার কোণে বসে নিজের অদক্ষ হাতে এঁকেছিল এক চাতক, ব্যাকুল কিশোর প্রেমিক।
র ক্তে লেখা লাইনগুলোর ঠিক নিচে একটি চক্রের ভেতর ফুটে উঠেছিল দুটি আঁকা চোখ৷ একটি সমুদ্রের মতো গাঢ় নীল, অন্যটি মিষ্টি হ্যাজেল রঙা। তারপর সেই দুই চোখের ওপরই আড়াআড়িভাবে দাগ টেনে, দুটি রেখাকে একবিন্দুতে মিলিয়ে তার ঠিক নিচে স্পষ্ট করে লেখা ছিল— রিভেঞ্জ।
অসহনীয় যন্ত্রণা, হতাশা আর হৃদয়ভাঙা ঝড়ের তাণ্ডবে সে মুহূর্তে হয়তো সে এক চরম ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল, কিন্তু মৃত্যুর দোড়গোড়ায় দাঁড়িয়েও এলিজাবেথ তার প্রতিশোধের নকশাটা এঁকে দিয়ে গেছে। সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপায় সে যদি এই যাত্রায় ফিরে আসতে পারে, তবে প্রতিটা ধোঁকা আর নিজের প্রিয় বন্ধুর খুনের হিসাব সে কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নেবেই।
সামনের দিনগুলো যে কতটা ভয়ংকর হতে যাচ্ছে, তা ভেবে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলল রিচার্ড। ভাগ্যিস, হাতের শি রা তেমন গভীর করে কাটেনি, এ যাত্রায় বেঁচে যায় এলিজাবেথ৷ সে এখন শঙ্কামুক্ত। বিগত দুই দিন ধরে রিচার্ড একটানা হাসপাতালেই পেড়ে রয়েছে। এই মুহূর্তেও সে এলিজাবেথের শয্যাপাশে একটি স্টিলের চেয়ারে নিশ্চল হয়ে বসে আছে। শুধু অপেক্ষা কখন মেলবে তেজদীপ্ত দুটি চোখ, কখন ফিরবে চেতনা।
রিচার্ডের সমুদ্র-নীল চোখ জোড়ায় এখন কেবলই ক্লান্তির প্রচ্ছদ। আর পাথুরে চোয়ালে লেপ্টে থাকা বিধ্বস্ত ভাবটা যেন অবিলম্বেই জানান দিচ্ছে এই দুইদিনে ভেতরে ভেতরে মানুষটা ঠিক কতটা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে। এই দীর্ঘ ৪৮ ঘণ্টায় রিচার্ড এক মুহূর্তের জন্যও এলিজাবেথের পাশ থেকে নড়েনি, শুধু এক মুহুর্ত ব্যতিত। স্ত্রী আর অনাগত সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে সে বেশ তৎপর। সেই বিশেষ কারণেই সে গতকাল ম্যানশনে গিয়ে বেডরুম থেকে আত্মঘাতী, এমন সব ধারালো ও বিপজ্জনক বস্তু এক এক করে সরিয়ে ফেলে। এমনকি সিলিং ফ্যানটাও খুলে ফেলে লোকটা।
ম্যানশন থেকে ফেরার পূর্বে রিচার্ড আর ফাদার
মুখোমুখি হতে হয়। দুই দিন ধরে বুকের ভেতর চেপে রাখা অসহ্যকর যন্ত্রণা, ক্ষোভ আর অপরাধবোধের সমস্ত আগুন ফাদারকে দেখা মাত্রই যেন সব তাঁর ওপর গিয়ে আছড়ে পড়ে।
লম্বা কদমে এগিয়ে গিয়ে ফাদারের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াল রিচার্ড। কণ্ঠ থেকে যেন ঝরে পড়ল বরফশীতল হুকুম, “যেহেতু সিচুয়েশনে ক্রিয়েটর আপনি নিজেই, তাই সবকিছু আপনাকেই ঠিক করতে হবে।”
“মানে? কী বলতে চাইছ তুমি?”
“আপনাকে সবটা পরিষ্কার করতে হবে। এভরিথিং মিনস দ্য এনটাইয়ার স্টোরি।”
“তুমি বলতে চাইছ, ওই মেয়েটার সামনে আমি মাথা নত করব?”
“যদি বলি হ্যাঁ, তাতে সমস্যাটা কোথায়? রাণী সে। রাণীর সামনে মাথা নত করাটা অসম্মানের নয়, বরং তার সাক্ষাৎ পাওয়াটাই পরম সৌভাগ্য।”
“রিদ!” গর্জে উঠলেন ফাদার।
“আপনার সামনে এখন মাত্র দুটো অপশন,” রিচার্ড থামল না, “আমাকে বেছে নিন, না হয় সব ঝামেলা মেটান। ইউ হ্যাভ জাস্ট টু অপশন।”
“তুমি আর দশটা মানুষের মতো আমাকে ম্যানিপুলেট করতে পারবে না, রিদ!”
“এক…”
“আই সেইড নো রিদ!”
“দুই…”
“ওকে ফাইন! আমি হাসপাতালে যাচ্ছি,” নিরুপায় হয়ে চ্যাঁচালেন ফাদার, “কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে।”
রিচার্ডের চোখের দৃষ্টি নিমেষেই ধারালো হয়ে উঠল,”কাকে শর্ত দিচ্ছেন, সেটা ভুলে যাবেন না যেন। আমি যদি শর্ত চাপানো শুরু করি, তবে কূল-কিনারা কিচ্ছু খুঁজে পাবেন না।চারপাশে শুধু অন্ধকার দেখবেন।”
ফাদার নাছোড়বান্দা, “সোফিয়া যতদিন বেঁচে আছে, ততদিন তোমাকে এই মিথ্যে বিয়ের নাটকটা চালিয়ে যেতে হবে।”
“নেগেটিভ।”
“সামান্য ক’টা দিনের তো ব্যাপার! আমার মেয়েটার হাতে আর বেশি সময় বাকি নেই…”
“রেসপেক্টফুলি ফা কিং নট!”
“আমি তোমার কথা রেখেছি রিচার্ড, এবার তোমাকেও আমার কথা রাখতে হবে।”
“আপনি আমার কথা রাখতে বাধ্য!”
“তাহলে তুমিও আমার কথা মানতে বাধ্য,” ফাদার তীক্ষ্ণ হেসে আঘাত করলেন দুর্বল জায়গায়, “রুম নম্বর ৪০৪!”
রুম নম্বর উচ্চারণ হতেই রিচার্ডের ভেতরের হিংস্র ভাবটা যেন থমকে গেল। দাঁত কিড়মিড়িয়ে সে ফাদারের দিকে তাকাল। অথচ সেই ক্ষিপ্ত, হিংস্র চাহনিতেই এখন তীব্র আক্রোশের সাথে যেন লেপ্টে ছিল অদৃশ্য আত্মসমর্পণ।
তা দেখে ফাদারের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল বিষাক্ত, জয়ীর বাঁকা হাসি।
এমন সময় সেখানে হাজির হলো সোফিয়া। অসম্ভব সুন্দর একটি মেয়ে। অপার্থিব রূপ আর পুতুলের মতো চেহারা হলেও, তার প্রতিটা চালচলন আর আচরণ ছিল অবুঝ শিশুর মতো। হাতে একটি বারবি ডল আঁকড়ে ধরে সে রিচার্ডের দিকে ছুটে এলো। তার ঠিক পেছনেই তটস্থ হয়ে ছুটে আসে ন্যানি লুসি। রিচার্ডের পায়ের ওপর সোফিয়ার ছায়া পড়ার আগেই সর্তক ভঙ্গিতে রিচার্ড পা সরিয়ে নিল। মুহূর্তেই তার চিবুকের টানটান পেশিগুলে শক্ত হয়ে উঠল। তবে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ফাদারের মুখচ্ছবি যেন এক লহমায় বদলে গেল। কপট গম্ভীর ভাবটুকু বাতাসে মিলিয়ে গিয়ে সেখানে ফুটে উঠল স্নেহময় সজল হাসি।
ন্যানি লুসি উদ্বিগ্ন কণ্ঠে ফাদারকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“ফাদার, সোফিয়া তো কিছুতেই ওষুধ খাচ্ছে না।”
ফাদার কিছুটা কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে মেয়ের দিকে চাইলেন। গাম্ভীর্য বজায় রাখার চেষ্টা করে বললেন, “ওষুধ খেতে হবে তো, সুইটহার্ট।”
কিন্তু সোফিয়া বাচ্চাদের মতোই হাত-পা ছুড়ে বায়না ধরে বসল সে শুধু রিচার্ডের হাত থেকেই ওষুধ খাবে। তার রূপ এবং গড়ন পরিণত নারীর হলেও, মানসিক বিকাশ আর কথাবার্তায় সে তখনও আটকা পড়ে আছে শৈশবেই।
রিচার্ড ব্যস্ততা দেখিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করতে চাইল,”আমার অনেক কাজ আছে, আমি আসছি…”
সোফিয়া ঠোঁট উল্টে তার বাবার কাছে গিয়ে অবুঝের মতো চেঁচিয়ে উঠল, “ড্যাডিইইই.. আমি প্রিন্সের হাত থেকেই ওষুধ খাব। নয়তো কিছুতেই খাব না, একদম না।”
নিজের জিদ্দি বাচ্চার মতো বায়না ধরল, কিন্তু ধৈর্য ধরল না এক সেকেন্ডও। সে শিশুদের মতোই হাত-পা ছুঁড়ে কেঁদে উঠে হাতের বারবি পুতুলটা ছুঁড়ে ফেলে দিল। এই নিত্যদৃশ্য
দেখে রিচার্ডের বিরক্তি সবসময়ের মতো চরমে পৌঁছাল। ফাদার ইঙ্গিতপূর্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালেও, রিচার্ড তা পুরোপুরি উপেক্ষা করে বের হয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল।
তখুনি পেছন থেকে ভেসে এলো ফাদারের শীতল কণ্ঠস্বর,
“৪০৪।”
রিচার্ডের পা দুটো আপনা-আপনি থমকে দাঁড়াল। সে দাঁতে দাঁত চেপে ফাদারের দিকে ঘুরে তাকাল। বিপরীতে ফাদারকে বড্ড অসহায় দেখাল, যেন রিচার্ডের সবচেয়ে দুর্বল জায়গায় আঘাত করে তিনি নিজেও লজ্জিত, কিন্তু মেয়েকে সামলাতে অন্য কোনো পথ তাঁর জানা ছিল না।
রিচার্ড নিজের ক্ষোভ ও বিরক্তি সামলাতে শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর অনিচ্ছা সত্ত্বেও এগিয়ে গিয়ে ন্যানি মলির ট্রে থেকে ওষুধগুলো তুলে নিয়ে সোফিয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। রিচার্ডকে কাছে পেয়েই সোফিয়ার কান্না থেমে গেল। মেঘলা আকাশে হঠাৎ রোদ ওঠার মতো তার মুখে ফুটে উঠল প্রাণখোলা হাসি। সে রিচার্ডের বাঁ-হাতটা নিজের মুঠোয় নিতে চাইল, কিন্তু গুরুগম্ভীর মুখের ধারালো ভাব
তাকে কিছুটা থমকে দিল। তাও তার মুখের হাসি মিলালো না। সে নিষ্পাপ চোখে রিচার্ডের দিকে তাকিয়ে আদুরে গলায় বলল,
“তুমি শুধুই আমার প্রিন্স।”
রিচার্ড ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরে কৃত্রিমভাবে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসার চেষ্টা করল, যাতে তাকে দেখতে ভীষণ বিশ্রী ও বিষাদময় লাগল। সে আলগোছে সোফিয়ার মুখে ওষুধগুলো দিল এবং এরপর পানির গ্লাসটি হাতে নিল। পুরো দৃশ্য দেখে তো ন্যানি মলির চোখে বিস্ময়ের সীমা রইল না। যে রিচার্ড কোনোদিন সোফিয়ার ছায়াও মাড়াত না, সে আজ নিজের হাতে তাকে ওষুধ খাইয়ে দিচ্ছে? আশ্চর্য! অবাক কাণ্ড!
কিন্তু তার বিস্ময় কাটতে না কাটতেই ঘটে গেল আরেক কাণ্ড। রিচার্ড পানির গ্লাসটি সোফিয়ার মুখে তুলে ধরার মুহূর্তে হঠাৎ আঙুলগুলো আলগা করে দিল। যার ফলে মুহূর্তে কাঁচের গ্লাসটি মেঝেতে পড়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। ভয়ে শিউরে উঠল সোফিয়া।
রিচার্ড লোকদেখানো বিচলিত ভাব নিয়ে বলল, “ওহ, মাই মিস্টেক। স্যরি ডিয়ার, আমি আরেক গ্লাস পানি নিয়ে আসছি।”
এই বাহানা করে রিচার্ড যে বের হয়ে গেল,আর ফিরে এলো না। ফাদার ভালো করেই জানতেন রিচার্ড আর ফিরবে না। তাই তিনি নিজেই মেয়েকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে নিজের রুমে নিয়ে গিয়ে ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিলেন।
ফাদার তার রিচার্ডকে খুব ভালো করেই চেনেন। এ তো তার সেই রিচার্ড— যে রিচার্ডের কারও প্রতি ঘৃণা বা ক্ষোভ থাকলে সে তার মুখে বি ষ তুলে দিতে পারে, কিন্তু এক ফোটা পানি দেবে না। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সোফিয়ার প্রতিও রিচার্ডের এরূপ ক্ষোভ। রিচার্ড ভীষণ অপছন্দ করে সোফিয়াকে। আর সেই সবচেয়ে অপছন্দের মানুষটাকেই ফাদার তার ওপর চিরদিনের জন্য চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। নিজেকে আজকাল বড্ড স্বার্থপর মনে হলো তাঁর। ভাবলে এখনও অনুশোচনার দীর্ঘশ্বাস বুক চিরে বেরিয়ে আসে।
“আপনি এটা কী করলেন? এমনটা কেন করলেন আমার সাথে? এই তপ্ত দহন আমি কাকে দেখাব? কাকে? যে ছিল আমার সুখের প্রদীপ, তাঁর দেওয়া দুঃখের বিচার নিয়ে আমি কার দুয়ারে দাঁড়াব, মি. কায়নাত? কীভাবে নিজের স্বামীকে আমি অন্য নারীর পাশে দেখব? আমার মানুষটা শুধুই আমার, একান্তই আমার—সে অন্য এক নারীকে স্পর্শ করেছে! এই বিশ্বাসঘাতকতা আমার হৃদয় কীভাবে সইবে? কী করে সহ্য করবে?”
দু’হাতের মুঠোয় চেপে ধরা নিস্তেজ হাতটিতে মৃদু টান পড়তেই বোঝা গেল এলিজাবেথের জ্ঞান ফিরেছে। রিচার্ড হাতটা ছাড়ে না। শক্ত করে ধরে থেকে ক্লান্তিতে কপাল ঠেকিয়ে রাখে মুঠোর ওপর। গত দুই দিন ঘুমের ঘোরে আচ্ছন্ন থাকার পর চোখের পাতা মেলতেই, এলিজাবেথের হরিণকালো চোখ বেয়ে তপ্ত জলের ধারা গড়িয়ে পড়তে লাগল। জ্ঞান ফেরার পর সে একটুও ছটফট করল না, চিৎকার করে কান্নাকাটি কিংবা কোনো পাগলামিও করল না। শুধু নিঃশব্দে ভেসে যেতে লাগল নীরব কান্নায়।
রিচার্ড অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে এলিজাবেথকে তুলে বসাল। তারপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল তার সামনে; দু’হাতে জড়িয়ে ধরল আড়ষ্ট মেয়েটার লতানো কোমর, মাথা গুঁজে দিল তার পেটে। ভেতর থেকে কেঁপে উঠলেও বাইরে এলিজাবেথের অভিব্যক্তি ছিল পাথরের মতো। কোমল কিন্তু নিথর্ব।
এলিজাবেথের পেটে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ায় রিচার্ড। ভেতরের ছোট্ট অনাগত প্রাণকে সাক্ষী রেখে ব্যাকুল কণ্ঠে বলে,
“ছুঁইনি… ছুঁইনি… আমি কাউকে ছুঁইনি! যে আসছে তার কসম, আমার স্ত্রী ছাড়া এই জীবনে আর কোনো নারীকে আমি স্পর্শ করিনি।”
এলিজাবেথ নিস্তেজ পুতুলের মতো বিড়বিড় করে,
“যে পুরুষ একবার বিশ্বাস ভাঙতে পারে, সে সব পারে। এরা প্রেমিকার মাথা বুকে জড়িয়ে ধরে পরম আদরে গলায় ছুরি বসাতেও দ্বিধা করে না।”
দীর্ঘ দুই দিনের অনিদ্রা, তীব্র মানসিক ভাঙন আর স্ত্রী-সন্তানকে হারিয়ে ফেলার অন্তহীন ভয়…সব মিলিয়ে একসময়ের সুদৃঢ় মানুষটাকে দূর্বলতা আজ ভীষণ কাবু করে ফেলেছে। তার সুঠাম শরীরে ভাঙনের ছাপ স্পষ্ট না হলেও, ভেতরটা তখন বাজেভাবে বিধ্বস্ত। রিচার্ড মেঝাতেই বসে পড়ল, মাথাটা এলিয়ে দিল এলিজাবেথের উরুতে। তারপর তার ঝুলন্ত একটা পা নিজের হাতের তালুতে তুলে নিয়ে ঠোঁট ছুঁইয়ে মৃদুস্বরে বলল,
“আমি সব ঠিক করে দেব, রেড। সবকিছু। এই জীবনে একটিমাত্র নারীই এসেছে, যে আমার অন্ধকার হৃদয়ে আলোর দিশা হয়ে দেখা দিয়েছিল। সে আর কেউ নয়… সে আমার রুশরমণী।”
“আপনি আমাকে ঠিক সেই জায়গাটাতেই আঘাত করেছেন, যেখানে আপনি ছাড়া আর কেউ ছিল না।”
রিচার্ড তপ্ত শ্বাস ফেলে। নারী জাতি বুঝি এমনই? এঁরা বানভাসি বন্যায় নিজেকে ভাসিয়ে দেবে, তিলে তিলে শেষ হয়ে যাবে, ম র বে পর্যন্ত তবুও সত্য জানার ধৈর্যটুকু দেখাবে না। এই রহস্যময় বৈচিত্র্যই বোধহয় তাদের নারীগত স্বভাব। তবে এই মুহূর্তে ধীরস্থিরভাবে কিছু বোঝানোর মতো শারীরিক বা মানসিক শক্তি রিচার্ড কায়নাতের নেই। তাই সে সংক্ষিপ্ত পথ বেছে নিল। কোনো কথা না বলে পকেট থেকে রিভলবারটা বের করে এলিজাবেথের পাশে রেখে দিল। অস্ত্রটি দেখেই চমকে উঠল এলিজাবেথ। ওষুধটা জাদুর মতোই কাজ করল। শব্দ ছাড়া থেমে গেল শব্দ!
এলিজাবেথের পা দুটো একহাতে জড়িয়ে ধরে রিচার্ড পুরো মাথাটা এলিয়ে দিল এলিজাবেথের কোলে। ঘুমে জড়িয়ে আসা কণ্ঠে শান্তভাবে বলল,
“হুশ… আর একটা শব্দও নয়। আমি বড্ড ক্লান্ত, রেড। আমাকে নির্ঘুম রেখে মা-বাচ্চা মিলে খুব তো ঘুমালে! এবার আমাকে একটু শান্তিতে ঘুমাতে দাও।”
বলে রিচার্ড চোখ বুজতে যাবে, ওমনি এলিজাবেথের মিহি কণ্ঠ ভেসে এলো,
“উঠুন। কাছে আসুন।”
রিচার্ড ভ্রু কুঁচকে মাথা তুলে তাকাল। এলিজাবেথের চোখেও সম্মোহনী চাহনি। রিচার্ডের কপাল থেকে ভাঁজগুলো মোটেও মিলায় না। সেই কুঞ্চিত ভ্রু নিয়েই সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। তারপর ঠোঁট দুটো এগিয়ে নিয়ে যায় এলিজাবেথের ঠোঁটের দিকে। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই ঠিক যেন এক ঝড়ের বেগে এলিজাবেথ পাশে রাখা রি ভল বারটি তুলে সোজাসুজি ঠেসে ধরল রিচার্ডের বুকের ঠিক মাঝখানে। তার সাহসিকতার সীমা কেবল এটুকুর মধ্যেই থেমে রইল না। ক্ষোভ আর গর্জনে চিৎকার করে উঠল এলিজাবেথ,
“আই ডোন্ট গিভ আ ফাক অ্যাবাউট ইয়োর পাস্ট। আপনার জীবনে এখন আমি আছি, তার মানে আমিই প্রথম, আমিই শেষ! থার্ড পার্সনের কোনো স্থান নেই এই গল্পে। ইউ হ্যাভ টু ডিভোর্স হার। ডিনাই ইট, অ্যান্ড আই’ল কিল ইউ। অবহেলায় বড় হয়েছি সত্য, কিন্তু নিজের জিনিসের ভাগ কাউকে দিইনি। যে বুকে আমি মাথা রেখেছি, সেই বুকে অন্য কেউ মাথা রাখার চেষ্টা করার আগেই সেই বুক গু লি তে ঝাঁঝ রা করে দেব আমি! জাস্ট ধ্বংস করে ফেলব আপনাকে। এই কাটা হাতটা দেখতে পাচ্ছেন? রক্তের সাথে সমস্ত আবেগ ভাসিয়ে দিয়েছি। এবার হবে শুধুই লড়াই—অধিকারের লড়াই! আমার সন্তানের অধিকার আমি নিজ হাতে বুঝে নেব!”
“আমাদের সন্তান।” প্রচ্ছন্ন শুধরে দিল রিচার্ড। পরক্ষণেই নিম্ন অধর কামড়ে অসম্ভব সুন্দর এক আত্মতৃপ্তির হাসি ছড়িয়ে পড়ল তার রহস্য ঘেরা মুখে। গৌরবে জ্বলজ্বল করে উঠল সুনীল চোখজোড়া। এলিজাবেথের এই অনমনীয় তেজ তাকে এতটাই অভিভূত করে ফেলেছে যে, তার তীব্রতা কালচে ঠোঁটের কোণেও স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।
এলিজাবেথ তখনও রাগে ফুঁসছে। রিভ ল বার চেপে ধরা কোমল হাতটি ক্রোধে থরথর করে কাঁপছে। রিচার্ড সেই কম্পিত হাতের ওপর নিজের হাতটি রেখে কম্পন থামাল। রি ভল বার সরাল না, বরং সরু নলটা আরও শক্ত করে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে বলল,
“জান নিয়ে নে, জান। এই জান তো তোর নামেই কুরবান। তবু এই তেজটুকু ধরে রাখ। সারাজীবন… সারাটা জীবন এভাবেই নিজের অধিকার খাটিয়ে যা। রিচার্ড কায়নাত তোর পায়ের নিচে পড়ে থাকবে, ওয়াদা!”
এলিজাবেথ ঘন ঘন শ্বাস ফেলছে। দুটি জোড়া চোখের মাঝে কিছুক্ষণ নীরব বোঝাপড়া চলল। কেউ কারও থেকে দৃষ্টি ফেরাল না, কারও চোখের পলক পর্যন্ত পড়ল না। দীর্ঘক্ষণের এই নিস্তব্ধতা চূর্ণ করে এলিজাবেথ কর্কশ কণ্ঠে বলে উঠল,
“চলুন।”
রিচার্ডের চোখে প্রশ্ন জাগে। তার প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে এলিজাবেথ এক অনন্য রানির তেজ দেখিয়ে বলল,
“রানি তার রাজ্যে ফিরবে। অভিষেকের ব্যবস্থা করুন! বেঁচে যেহেতু ফিরে এসেছি, রাজ্য তো আমাকে শাসন করতেই হবে। ভুলে যাবেন না রিচার্ড কায়নাত, পুনর্জন্ম বলে কিছুই হয় না৷ আমাকে ঠকানোর শাস্তি আপনি এই জন্মেই পাবেন, আর সেই শাস্তিদানের ভার আমি নিজের কাঁধে তুলে নিলাম। আপনি আমাকে ছাড়তে পারবেন না, তা আমি খুব ভালো করেই জানি। তবে বিশ্বাস করুন—আমাকে পাশে রেখেও আপনি স্বস্তি পাবেন না। ওয়েলকাম টু দ্য হেল।”
কোনোপ্রকার ক্রোধ বা উগ্রতার বদলে রিচার্ডের ঠোঁটের কোণে যেন বিজয়ের ঝিলিক মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সে দু’হাতে এলিজাবেথের চোয়াল শক্ত করে চেপে ধরে শব্দ করে চুমু খেল ওর কপালে। তারপর মাথা নামিয়ে এলিজাবেথের কানের কাছে ঝুঁকে গেল। রহস্যময়ভাবে ঠোঁট কামড়ে হাসল পুরুষটা। অতঃপর কানের লতিতে ঠোঁট ছোঁয়ানোর ঠিক আগের মুহূর্তে ফিসফিস করে শুধালো,
“আই গ্ল্যাডলি অ্যাকসেপ্ট ইয়োর ওয়ার্ম ওয়েলকাম, মাই ফাকিং ডার্ক রেড!”
এলিজাবেথ জেদ ধরে সে এখন, এই মুহূর্তেই এই অবস্থায় ম্যানশনে ফিরে যাবে। শেষপর্যন্ত তার নাছোড়বান্দা জেদেরই জয় হয়। শরীরের শীর্ণ হসপিটাল গাউন আর হাতে গাঁথা ক্যানোলা নিয়েই সে শক্ত পায়ে বেরিয়ে পড়ে কেবিন থেকে। রিচার্ড সামনে এসে হাত বাড়িয়ে বাধা দিতে চাইলে, এলিজাবেথ শক্ত বুকে হাত রেখে একপাশে সরিয়ে দেয় তাকে। মেয়েটার চোখের অপ্রতিরোধ্য তেজ আর আত্মবিশ্বাস দেখে রিচার্ডের ভেতরে অদ্ভুত প্রসন্নতা জাগে। সে আর আটকায় না। বরং ঠোঁটের কোণে মৃদু বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বিনয়ের সাথে পথ ছেড়ে দিয়ে, পথ দেখিয়ে দেয়। পাথর খচিত কঠিন মুখে স্বামীর দেখিয়ে দেওয়া পথ ধরেই এগিয়ে যায় এলিজাবেথ।
লুকাস আর ন্যাসো এগিয়ে এসে রিচার্ডের পাশে দাঁড়ায়। কুঁচকানো ভ্রু আর বিষ্মিত চোখে লুকাস বসের দিকে তাকিয়ে বলে, “ওটা সত্যিই আপনি ছিলেন? সত্যিই আপনি? ম্যামের সামনে এতটা পরিবর্তন?” সে কেবিনের ভেতরের ঘটনার ইঙ্গিত দিল।
রিচার্ডের উত্তর ছিল একদম সহজ, অকপট, “ও সামনে থাকলে আমি কেন, আমার ভেতরের পিশাচটাও মাথা নত করে রাখে।”
লুকাসের কপালে ভাঁজ আরও স্পষ্ট হয়। বসের মুখ থেকে এমন নিঃসংকোচ স্বীকারোক্তি শুনে সে নীরব হয়ে যায়। পাশ থেকে ন্যাসো হিসেবি গলায় বলে, “এই ঝড় নাহয় সামলে নিলেন। কিন্তু যেদিন ম্যাম সবচেয়ে বড় সত্যটা জানতে পারবে, তখন কী হবে? আমার মনে হয়, আপনার এখনই ম্যামকে সবটা বলে দেওয়া উচিত।”
মুহূর্তের মধ্যে রিচার্ডের চোখে নেমে আসে অদৃশ্য আতঙ্ক। তার গাম্ভীর্য ভরা পুরুষালী কণ্ঠটি এক নিমিষেই নিভে গিয়ে রূপ নেয় গভীর অনুশোচনায়, “হাউ ওয়াজ আই সাপোজড টু টেল সাচ আ টেরিফাইং ট্রুথ? ড্যাম… শি ওয়াজ প্রেগন্যান্ট!”
এতো বড়ো সত্যটা শুনে ন্যাসো আর লুকাসের চোখ দুটি আতঙ্কে শিউরে উঠল। তীব্র মানসিক চাপ আর তীব্র অপরাধবোধে রিচার্ড নিজের চুল খামচে ধরে, “ফাক!”
তার স্মৃতির আয়নায় ভেসে ওঠে দুই বছর আগের একটি বিভীষিকাময় দৃশ্য। রিভলবারের সরু নলের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি বিস্ফোরিত চোখ—যেখানে মৃত্যুর কোনো ভয় ছিল না, ছিল কেবল সুনিপুণ বিস্ময় আর অবিশ্বাস। সামনের মানুষটিকে দেখে যেন ভূত দেখার মতো চমকে উঠেছিল সে।আর সেই চমকে ওঠা চোখে কীসের যেন ব্যাথাও ছিল। আর সেই বিহ্বল চোখের সামনেই রিচার্ড নির্দয়ভাবে চেপে ধরেছিল রিভলবারের ট্রিগার।
ঠাসসসসস! সরু নলের মুখ থেকে ধোঁয়া উড়িয়ে শাঁ শাঁ শব্দে একটি গুলির ঝাঁঝরা এসে বিদীর্ণ করল রমণীর বুকের বাঁ পাঁজর। প্রবল ধাক্কা সামলাতে না পেরে রক্তভেজা শরীরে মেয়েটা ছাদের রেলিং গলে নিচে পড়ে গেল। মেয়েটার শরীর শূন্যে ভাসমান থাকা অবস্থায় সে এক হাতে আঁকড়ে ধরেছিল নিজের পেটটা। বাতাসের শব্দ ভেদ করে তার মুখ থেকে ভেসে আসা এক চিলতে ক্ষীণ শব্দ রিচার্ডের কানে পৌঁছাতে ভুল করেনি। মৃত্যুর কোল ঢলে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে মেয়েটি বলেছিল,
“আমি প্রেগন্যান্ট।”
আর তারপর? বাতাসের তীব্র এক ঝাপটায় মেয়েটার মুখ থেকে সরে গিয়েছিল স্কার্ফটা, ফুটে উঠেছিল তার ক্ষতবিক্ষত মুখখানি…
স্মৃতির সেই ভয়াল দৃশ্য মনে পড়তেই শক্ত করে চোখ বুজে ফেলল রিচার্ড। এক ঝটকায় অতীত থেকে ফিরে এলো বর্তমানে।
লুকাস তাগাদা দিল, “বস, ম্যাম তো চলে যাচ্ছেন।”
রিচার্ড সামনে চোখ ফেরাল। এলিজাবেথ তখনও তার দৃষ্টিসীমানার ভেতরেই । রিচার্ডের ঠোঁটের কোণে উঁকি
দিল ক্রূর হাসি, “যাক না! মেয়েমানুষ… যতক্ষণ তেজ আছে, ততক্ষণই এগোবে। ভেঙে পড়লে আগলে নেওয়ার জন্য তো আমি আছিই।”
দীর্ঘ পদক্ষেপে মাত্র কয়েকটি কদমই যথেষ্ট ছিল এলিজাবেথকে ধরে ফেলার জন্য। হঠাৎ পেছন থেকে একটি বিশাল ছায়া নিজেকে আচ্ছন্ন করে ফেলছে দেখে এলিজাবেথ তার হাঁটার গতি বাড়াতে চাইল, কিন্তু সামলাতে না পেরে হুঁচোট খেলো। তবে মাটিতে আছড়ে পড়ার আগেই একটি শক্ত হাত তাকে কোলে তুলে নিল। এলিজাবেথ চমকে উঠল, থমকে গেল পুরোপুরি। ক্ষোভ নিয়ে চেঁচিয়ে উঠল তাকে নামিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু নির্বিকার লোকটির মধ্যে কোনো হেলদোল ভাব নেই। সে তাকে নামাল না। এলিজাবেথকে কোলে নিয়েই সে হসপিটাল প্রাঙ্গণ পেরিয়ে এগোল গাড়ির দিকে। হসপিটালের মূল ফটকের ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল একটি কুচকুচে কালো রোলস-রয়েস।
রিচার্ডের থেকে এক কদম দূরত্ব বজায় রেখে দুপাশ দিয়ে ছায়ার মতো তাকে অনুসরণ করে যাচ্ছিল ন্যাসো আর লুকাস। রিচার্ড গাড়ির কাছাকাছি পৌঁছানো মাত্রই লুকাস দ্রুত সামনে গিয়ে ব্যাকডোর খুলে দিল। ন্যাসো লম্বা কদমে এগিয়ে গিয়ে বসে পড়ল ড্রাইভিং সিটে।
হসপিটালের ছাদের রেলিংয়ে পা ঝুলিয়ে পুরো দৃশ্যটা একদম নিষ্পৃহ চোখে দেখছিল সুরাকার। তার পরনে স্বভাবসুলভ হুড টানা হুডি আর কালো ডেনিম। ঘোর অমাবস্যার এই ঘন আঁধারে ছাদের কিনারে ওভাবে বসে থাকায় তাকে দেখতে অবিকল কোনো অশরীরীর মতোই লাগছিল। সুরাকার কাঁধে ঝুলানো গিটারটা টেনে নিল নিজের কোলজুড়ে। এরপর তার আঙুলের আলতো ছোঁয়ায় গিটারের তারে বেজে উঠল উদাস সুর। তার সুগঠিত চোয়ালে হিংস্রতার কোনো চিহ্ন নেই, চোখে নেই কোনো ক্রোধের ছাপ, অথচ কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়ছে মোহনীয় সুর…
❝চির অভাগী, তোমারও লাগী
মরার আগে হয়েছে মরণ,
আগুনে জ্বলি, আমি কী করে বলি
হারালে কি খুঁজে পাবে মন?❞
এলিজাবেথকে রুমে আটকে রেখে বাইরে থেকে তালা দিয়ে রিচার্ড পেছন ঘুরতেই সোফিয়ার মুখোমুখি হলো। রিচার্ডের ভ্রু খানিকটা কুঁচকে গেল, কণ্ঠে রুক্ষ প্রশ্ন,
“এখানে কী চাও?”
বুকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরা বারবি ডলটার দিকে তাকাল সোফিয়া। ভয়ে তার চোখের মণি দুটো কাঁপছে। ফাদার পাশে না থাকলে রিচার্ডের সামনে দাঁড়ানোর তেজ তার থাকে না। তবু কাঁপা কাঁপা গলায় শুধাল,
“ওখানে কে আছে?”
“আমার পৃথিবী।”
“আর আমি?”
Born to be villains part 34
“নাথিং!” এক মুহূর্তের বিলম্ব না করে, অত্যন্ত নির্লিপ্ত কণ্ঠে উত্তরটি ছুড়ে দিয়ে রিচার্ড তার পাশ কাটিয়ে হাঁটা ধরল। সোফিয়া পেছনে ঘুরে দাঁড়াল। পলকের মধ্যে তার চোখের দৃষ্টি বদলে গেল৷ মুখের সেই কোমল, বাচ্চাসুলভ মায়াবী ভাবটা নিমিষেই কর্পূরের মতো উবে গেল। সেখানে ভর করল হিংস্র আভা। লম্বা লম্বা কদমে সে রিচার্ডের দিকে এগিয়ে গেল। রিচার্ড সিঁড়িতে প্রথম পা রাখা মাত্রই সোফিয়া পেছন থেকে হাত বাড়াল। তখন আচমকা পেছন থেকে ফাদারের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো,
“সোফি?”
থমকে গেল সোফিয়া, সেই সঙ্গে কেঁপে উঠল!
