Born to be villains part 36
মিথুবুড়ি
“হোয়াট! আর ইউ ইনসেইন? আড়াইশো কোটি ডলারের একটি প্রজেক্ট আপনি অ্যাসাইলামে ডোনেট করে দিয়েছেন? ডু ইউ ইভেন হ্যাভ এনি আইডিয়া হোয়াট ইউ’ভ ডান?এই একটা ডিল আমাদের পুরো কর্পোরেট সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ ঠিক করে দিত। এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে বড় টেক-হাব হতে যাচ্ছিল এটা। আর সেটাকে আপনি একটা চ্যারিটির থালায় সাজিয়ে দিয়ে এলেন?”
সুবিশাল অট্টালিকার নিস্তব্ধতা চূর্ণ করে রিচার্ডের হাঁক ভেসে এলো। কিন্তু যার উদ্দেশ্যে এহেন প্রদীপ্ত গর্জন, সেই ফাদারের চোখে-মুখে কোনো ভাবান্তর নেই। পাথরে খোদাই করা মূর্তির মতো নিস্পৃহ। তিনি কেবল তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। গুরুগম্ভীর অবয়বে কোনো কম্পন জাগল না। ফাদারের এই কঠিন মৌনতা রিচার্ডের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সুপ্ত ক্রোধের স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে দিল। তার কণ্ঠনালি চিরে বেরিয়ে এল কর্কশ ধিক্কার,
“আমি আপনার উত্তরের অপেক্ষায় আছি, ফাদার। হোয়াই ডিড ইউ ডু দিস? এটা আপনি কখনোই করতে পারেন না। এর পেছনে রহস্য কি?”
পরক্ষণেই কণ্ঠের খসখসে ভাব রূপ নিল প্রখর সন্দেহে,
“যে মানুষটা ব্যবসার সামান্যতম লোকসানকেও বিষপানের সঙ্গে তুলনা করত, সে হঠাৎ করে এত বড় ক্ষতি কীভাবে হজম করল?”
“কারণটা সোফিয়া।”
ফাদারের নিরাসক্ত দুই শব্দের প্রত্যুত্তরে রিচার্ডের ললাটে বলিরেখা ফুটে উঠল। দুই ভ্রু এক বিন্দুতে মিলিত হয়ে গভীর ভাঁজের সৃষ্টি করল। সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ফাদারের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করল, “মানে?”
ফাদার আরেকবার তপ্ত নিঃশ্বাস ছেড়ে জবাব দিলেন,”সোফিয়ার ইচ্ছে ছিল, এই প্রজেক্টটা যেন আশ্রমে দান করে দেওয়া হয়।”
“আর আপনি অন্ধের মতো তা-ই করলেন?”
“হ্যাঁ।”
বুকের ভেতর জমে থাকা কড়কড়ে তিক্ততা আর ক্ষোভ চেপে রাখতে না পেরে রিচার্ড নিচু স্বরে গর্জে উঠল,
“আর ইউ গন ম্যাড? ওই মানসিক ভারসাম্যহীন মেয়েটার চক্করে পড়ে আপনিও কি পাগল হয়ে গেলেন?”
ফাদারের চোখ দুটো নিমেষেই ঠান্ডা এবং হিংস্র হয়ে উঠল। চাপা গলায় রিচার্ডকে সতর্ক করে দিয়ে তিনি বললেন,”রিচার্ড, বি অ্যালার্ট! ভুলে যেও না, যাকে তুমি পাগল বলছ, সে আমার রক্ত। আমার মেয়ে।”
রিচার্ড অধৈর্য হয়ে কপাল শক্ত হাতে চেপে ধরল। বিরক্তির তুঙ্গে পৌঁছে বলল, “উফফ, ফাদার! আপনি কি আদৌ অঙ্কটা বুঝতে পারছেন? আড়াইশো কোটি ডলার! ফাকিং টু হান্ড্রেড অ্যান্ড ফিফটি ক্রোর! ওটা কোনো সামান্য খেলা ছিল না।”
ফাদার এবার তীক্ষ্ণ ও ধারালো দৃষ্টিতে রিচার্ডের দিকে তাকালেন। কণ্ঠে ঢেলে দিলেন সূক্ষ্ম খোঁচা, “আর তুমি যে সামান্য একটা সাধারণ মেয়ের জন্য নিজের পুরো সাম্রাজ্য বিসর্জন দিয়েছিলে? তখন তোমার লাভ-ক্ষতির হিসেবটা কোন খাতায় জমা পড়েছিল, রিচার্ড কায়নাত?”
কথাটা তীরের মতো এসে বিঁধল। রিচার্ডের চিবুকের পেশি শক্ত হয়ে উঠল। চোখে দাউদাহ করল ল অগ্নিশিখা। দাঁতে দাঁত চেপে সে শেষবারের মতো বলে,”আপনার এই অন্ধ দুর্বলতাই একদিন আপনাকে ধূলিসাৎ করে দেবে। সবচে বড়ো আঘাত দিবে। জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ।”
ফাদার ঠাণ্ডা স্বরে ফিরিয়ে দিলেন, “একই বাক্য তোমার ক্ষেত্রেও সমান সত্য,।”
“ফাক!”অকথ্য শাপটা রিচার্ডের ঠোঁটের কোল বেয়ে শিলাবৃষ্টির মতো ঝরে পড়ল। সেখানে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না রিচার্ড। দীর্ঘ পদক্ষেপে হনহন করে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল।
ফাদার তাঁর চিরায়ত শীতল অবয়ব নিয়ে রিচার্ডের গমনপথের দিকে ফিরে তাকালেন। শান্ত চোখে দেখলেন রিচার্ডের প্রস্থান। কিন্তু মুখের অভিব্যক্তি বরফশীতল থাকলেও বুকের গহীনে কোথায় যেন একটা সূক্ষ্ম সন্দেহের বীজ রোপিত হয়ে গেল অজান্তেই। ফাদার ভালো করেই জানেন রিচার্ডের মুখ থেকে ঝরা একটা শব্দও কখনো ল বিফলে বের হয় না!
অপ্রতিরোধ্য ক্রোধানলে জ্বলতে জ্বলতে রিচার্ড ব্যক্তিগত কক্ষের দিকে অগ্রসর হয়। এই মুহূর্তে তার ভেতরের বিধ্বংসী ও উন্মত্ত রাগ প্রশমিত করতে প্রয়োজন তার একক অধিকারভুক্ত নারীটির সান্নিধ্য। কিন্তু কক্ষের সম্মুখে পৌঁছাতেই গম্ভীর কপালে দেখা দিল কুটিল ভাঁজ। মুহূর্তের মধ্যে রগের শিরাগুলো ফুলে স্পষ্ট হয়ে উঠল। দরজার তালাটি বাইরে থেকে খোলা।
রিচার্ডের হাত চলে গেল পকেটে। না, চাবিটি নেই। দাঁতে দাঁত চেপে তীব্র ক্রোধ সংবরণ করে সে ভেতরে প্রবেশ করল। কিন্তু না! এলিজাবেথ ভেতর কোথাও নেই।
তৎক্ষণাৎ রিচার্ডের নীল নয়নে জ্বলে উঠল প্রতিহিংসার আগুন। ক্ষিপ্র গতিতে কেবিনেট থেকে রিভলবারটি বের করে নিচে নেমে যাওয়ার জন্য উদ্যত হতেই পায়ের নিচে কিছু একটা পড়ল। থমকে দাঁড়াল রিচার্ড। পা সরিয়ে নিচে তাকাতেই চোখে পড়ল এলিজাবেথের গলার টিউলিপ নেকপিস টি—নেদারল্যান্ডসের টিউলিপ ফেস্টিভ্যালে যা সে নিদারুণ অনুরাগে এলিজাবেথের গলায় পরিয়ে দিয়েছিল।
এক হাঁটু ভেঙে বসে নেকপিসটি হাতে তুলে নিল রিচার্ড। এরপর তীক্ষ্ণ এবং অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে চারপাশ দেখতে গিয়ে নজরে এলো আরেকটি প্রক্ষিপ্ত পাথর, যেটা যেন সরাসরিই নির্দেশ করছে ছাদের সিঁড়ির পথটি। নেকপিসটি দ্রুত পকেটে গুঁজে সে প্রচণ্ড বেগে ছুটল ছাদে।
ছাদে প্রবেশ সবার জন্য কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আর ছাদের এই গুপ্ত সিঁড়ির খবর এলিজাবেথের পক্ষে
জানা কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। এই বিশালাকার ম্যানশনের কিছুই তো এখনও তার চেনা নেই!
হঠাৎ-ই রিচার্ডের প্রখর মস্তিষ্কে বেজে উঠল অশনিসংকেত। কালবিলম্ব না করে তার সন্দেহাতীত ও শানিত দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো ছাদের এককোণের কালকুঠুরির মতো অন্ধকার ঘরটির ওপর। সেই ঘরের তালাটিও খোলা। মুহূর্তের মধ্যে পুরো চিত্রটি রিচার্ডের কাছে স্ফটিকের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠল।
তখন সিঁড়ি দিয়ে নামার মুহূর্তে তাসার সাথে তার মুখোমুখি সাক্ষাৎ হয়েছিল। বরাবরের মতোই সে তাসাকে বায়ুর মতো উপেক্ষা করে চলে যায়। তার মানে, তখন তাসা অতীব চতুরতা আর কৌশলে তার অলক্ষ্যে চাবিটি হাতিয়ে নিয়েছে। মেয়েটা পূর্ব থেকেই মারাত্মক ধূর্ত ও শঠ। এলিজাবেথের পক্ষে এই কালকুঠুরির অস্তিত্ব জানা অসম্ভব। আর এই ঘরের ভেতর যে একটি গোপন সুরঙ্গপথ রয়েছে, যা দিয়ে সরাসরি ম্যানশনের পেছনের ফটকে পৌঁছে যাওয়া যায়—তা রিচার্ড আর ফাদার ব্যতীত আর কারও জানা নেই।
তবে কি এলিজাবেথকে তার কাছ থেকে চিরতরে বিচ্ছন্ন করার জন্য ফাদারই তাসাকে ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করে এই সূক্ষ্ম চক্রান্তটি সাজিয়েছেন?
রিচার্ড বিদুৎগতিতে রিভলবারের সেফটি ক্যাটক করে আনলক করল। লোকটার চোখে-মুখে তখন ভোরের আলোর মতো উঁকি দিল হিংস্র হাইনার ক্ষিপ্রতা। সেই উন্মাদনা নিয়েই সে ছুটে গেল অন্ধকার সুরঙ্গ পথ ধরে। অথচ তার জানা ছিল না, ঠিক সেই মুহূর্তটিতেই তাসা ফাদারের ব্যক্তিগত কক্ষে তারা মেতে আছে উদ্দাম রঙ্গলীলায়।
এদিকে নিজ রুমের জানালা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল সোফিয়া। দূরবীক্ষণ ছাড়াই সে স্পষ্ট দেখল, রিচার্ড কেমন দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে দ্বীপের প্রান্তের দিকে ছুটে যাচ্ছে। তারপর ছোট একটি স্পিডবোট নিয়ে নিমেষেই সে হারিয়ে গেল সমুদ্রের অতল গভীরে। দৃশ্যটি দেখে সোফিয়া ক্ষণিকের জন্য থমকে গেল। যে ভয় সর্বদা তার মুখে লেপটে থাকে, চেনা অভ্যাসে তখন তার দুই চোখে ছিল সেই ভয়ার্ত ছাপ। কিন্তু রিচার্ড সমুদ্রের বুকে দৃষ্টিসীমার বাইরে মিলিয়ে যেতেই সেই ভয় উবে গেল। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল ভয়ংকর হাসি!
ইঞ্জিন ছাড়াই সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ে ভেসে একটি অদেখা তটে এসে থামল বোটটি। ততক্ষণে ডার্গসের তীব্র প্রভাব বিষের মতো ছড়িয়ে পড়েছে এলিজাবেথের শরীরে। শুরুটা হয়েছিল পায়ের পাতা থেকে, যা ধীরে ধীরে ওপরের দিকে উঠে অবশ করে দিচ্ছে পুরো দেহ। অবচেতন হয়ে আসছে শরীর। নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে মস্তিষ্ক। চেতনা পুরোপুরি হারিয়ে না গেলেও দৃষ্টির সামনে ঘোড অন্ধকার নেমে আসছে। নিজের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণই আর অবশিষ্ট নেই।
এলিজাবেথের নাজুক শরীরটা তীব্র বাতাসে পতাকার মতো কাঁপছিল। সে অসাড় শরীরটা নিয়ে কোনোমতে বোট থেকে নেমে বালিতে পা রাখল। কিন্তু পা রাখা মাত্রই যেন চারপাশে শুরু হয়ে গেল তাণ্ডব। ঘূর্ণিঝড়ের তোড়ে গাছে গাছে মাতম উঠল, বালি আর শুকনো পাতা এলোমেলো উড়ে এসে আছড়ে পড়তে লাগল। এমন অনিয়ন্ত্রিত বাতাসে দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় অসম্ভব। টাল সামলাতে না পেরে হেলে পড়ল এলিজাবেথ।
বালুচরে নেমে এলো প্রকাণ্ড এক হেলিকপ্টার, যার বিশাল পাখাগুলোর আবর্তন আস্তে আস্তে ঝিমিয়ে আসছিল। প্যাকআপ করা হেলিকপ্টারের ভেতর থেকে নেমে এলো একটি সুউচ্চ দীর্ঘদেহী পুরুষ। ঝাপসা ও অস্পষ্ট চোখে সেই অবয়বের দিকে তাকাতেই এলিজাবেথের বিবর্ণ ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল অতি ক্ষীণ হাসি। হাত বাড়ায় সে৷ জড়ানো গলায়, অস্পষ্ট সুরে ডাকে,
“মি. কায়নাত…”
শব্দটি ঠোঁট থেকে খসে পড়ার সঙ্গেই শরীর পুরোপুরি ছেড়ে দিল। নিথর হয়ে বালির বুকে ঢলে পড়ল সে।
ঝড় থেমে গেছে। আজকের রাতের আকাশটা অদ্ভুত রকমের পরিষ্কার। কোথাও মেঘের লেশমাত্র নেই। দূর আকাশে ঝুলে আছে একখানা নিখুঁত গোল চাঁদ। যার স্নিগ্ধ রুপালি আলোয় ভেসে যাচ্ছে পুরো প্রান্তর। সেই জোৎস্নাপ্লাবিত বালুচরে নিথর, অচেতন হয়ে পড়ে আছে এলিজাবেথ। শুভ্র চাঁদনী এসে পড়েছে তার শান্ত মুখের ওপর। তার থেকে ঠিক হাতদুয়েকের দূরত্বে একইভাবে শুয়ে আছে সুরাকার। মাথার নিচে দু’হাত গুঁজে দিয়ে সে-ও একদৃষ্টিতে নিষ্প্রভ তাকিয়ে আছে ওই অসীম আকাশের দিকে। চাঁদের মায়াবী আলোয় ঠিকরে বেরোচ্ছে তার অদ্ভুত সুন্দর হ্যাজেল রঙা চোখ দু’টো। পাশে বালির ওপর রাখা তার ট্রেডমার্ক কালো সানগ্লাসটি।
দু’জনেই পাশাপাশি শুয়ে আছে নিস্তব্ধ আকাশের পানে চেয়ে। কিন্তু তাদেড সেই নিস্তব্ধতার আড়ালে লুকিয়ে ছিল গভীর কোনো গোপন কষ্ট। হঠাৎ করেই সুরাকারের চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে নামল নিঃশব্দ ব্যথা। সেই ব্যথায় আস্তে আস্তে ভিজে যেতে লাগল বালি।
হঠাৎ সে নিস্তব্ধ আকাশের পানে চেয়ে নিস্পৃহ কণ্ঠে বলে উঠল,”সাময়িক প্রিয়জন আজ দীর্ঘস্থায়ী অসুখের কারণ।”
কথাগুলোর পরতে পরতে জমা হয়ে ছিল তীব্র অভিমান। আরও এক ফোঁটা অশ্রুরূপী ব্যথা গড়িয়ে পড়ল তার চোখের কোণ বেয়ে। রুদ্ধ স্বরে সে বিড়বিড় করল,
“তুমি পালালে অগোচরে, দহন রেখে গেলে গোপন স্মরণে।”
সুরাকার একপাশে কাত হয়। কনুইটা বালিতে ঠেকিয়ে, হাতের তালুতে মাথা রেখে সে একদৃষ্টিতে তাকায় এলিজাবেথের নিস্তেজ, নিথর মুখটার দিকে। আজ সে কাছে আসে না, স্পর্শও করে না তাকে। তার ওই হ্যাজেল রঙা চোখে কোনো রাগও নেই, নেই প্রতিশোধের রক্তিম দহন। সে কেবল নির্বাক আকুলতা নিয়ে তাকিয়ে থাকে মেয়েটার ওই কোমল, গোলাপরঙা মুখশ্রীর দিকে। দেখতে দেখতে একবুক আফসোস বুকচিরে বেরিয়ে আসে,
“এই মুখটায় ভীষণ মায়া। এই মায়ার বেড়াজাল থেকে যদি বেরুতে পারতাম, তাহলে আর তোমার পিছু ছেড়ে দিতাম জান। সত্যিই ছেড়ে দিতাম। পাগলেও তো নিজের ভালো বোঝে! আমি তো সুস্থ-সবল একটা মানুষ… যদিও ভেতরকার হৃদয়টা একদম ক্ষত-বিক্ষত। মরীচিকার পেছনে কে ছোটে বলো?,”বলতে বলতে তার বলিষ্ঠ পুরুষালী ঠোঁট দুটো ভেঙে আসতে চাইল। দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁটটা চেপে ধরল সে। চোখ দুটো আরও গাঢ়, আরও প্রগাঢ় হয়ে উঠল, কণ্ঠে ঝরে পড়ল অসীম ব্যাকুলতা,
“আমার লিলি, আমার রোজাবেথ, আম….আমার সুকুনা…”
কণ্ঠ সামান্য কেঁপে উঠল তার, “তোমার মায়ায় পড়ে আহত হলাম, এখন দেখো, সর্বাঙ্গে ক্ষত নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি।”
একটু থেমে, নিঃশ্বাস চেপে রেখে সে আবার বলল, “যার হৃদয়টাই ক্ষত-বিক্ষত, তার তো সর্বাঙ্গেই ব্যথা থাকবে, তাই না লিল…”
আর বলতে পারল না সে। কথাগুলো গলার কাছেই আটকে গেল। পরক্ষণেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বালির ওপর উন্মাদের মতো গড়িয়ে পড়ল সে। সেদিন যদি এলিজাবেথের চৈতন্য থাকত, তবে সে নিজের চোখে দেখতে পেত তার নিস্তেজ, অসাড় দেহের ঠিক পাশটিতেই ফেলে রাখা একটা মানুষ কীভাবে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল! কীভাবে ছটফট করে কুঁকড়ে যাচ্ছিল বালুর বুকে! সেদিন যদি সে লোকটার চোখের জলের তোড় দেখতে পেত, তবে বোধহয় কট্টর কোনো শত্রুর জন্যও তার বুকের ভেতর মায়া জন্মাত। সেদিন যদি তার কান সজাগ থাকত, তবে সে শুনতে পেত সেই নির্জন দ্বীপের প্রতিটি গাছপালা, কীট-পতঙ্গ, আকাশ আর বাতাস যেভাবে শুনেছিল, ঠিক সেভাবে সে-ও শুনতে পেত লোকটা কী তীব্র আর্তনাদে চিৎকার করছিল!
কী ভীষণ যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে সে উপরওয়ালার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছিল,
“এই খোদা, যে চোখকে এভাবে কাঁদাচ্ছো, এই চোখ তো কেবল তোমার সৃষ্টির দিকেই তাকিয়েছিল! তোমার সৃষ্টির বাইরে তো কখনো যায়নি… তুমিও এতটা অধৈর্য হয়ে গেলে আমায় নিঃশ্বসিত করে কেড়েই নিতে?”
সমুদ্র তখন ভীষণ উত্তাল। তবে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে এই গর্জন নয়, সমুদ্রের বুক উত্তাল করে তুলেছে রিচার্ড কায়নাত এবং তার হিংস্র ড্রাগন সোলজারের দল। আঁধারে ডুবে থাকা বিশালাকার সমুদ্রটা ড্রাগন সোলজারদের শক্তিশালী সার্চলাইটের ঝলসানো আলোয় ক্ষণে ক্ষণে ঝলসে উঠছে। সমুদ্রের প্রতিটা জলরাশি, প্রতিটা তরঙ্গ তন্নতন্ন করে ছেঁকে খোঁজা হচ্ছে এলিজাবেথকে।
এই দ্বীপটি পুরোপুরি রিচার্ডের নিজস্ব সাম্রাজ্য। আজ থেকে দেড় দশক আগে ফাদার তার একছত্র আধিপত্যের কারণে এই দ্বীপের আকাশসীমায় অন্য কোনো বাণিজ্যিক বা রাষ্ট্রীয় হেলিকপ্টার ও বিমান চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে রাষ্ট্রীয় ভাবে। ম্যানশনে কেবল একটাই অত্যাধুনিক ব্ল্যাকহক হেলিকপ্টার রয়েছে, আর সেটার পাইলট রিচার্ড নিজেই। ফাদারের ব্যবহারের জন্য রয়েছে ব্যক্তিগত বিলাসবহুল ক্রুজশিপ। তাই এলিজাবেথের জন্য আকাশপথে পালানোর সব দরজা সম্পূর্ণ বন্ধ। বেঁচে ফিরতে হলে কিংবা মাফিয়াদের এই নরকপুরী থেকে নিস্তার পেতে হলে তাকে সমুদ্রপথের জলরাশিকেই বেছে নিতে হবে। আজ রাতের এই ঝোড়ো হাওয়ায় রিচার্ডের ক্ষমতার বিশাল জাল ছিঁড়ে এলিজাবেথের পক্ষে সমুদ্রের বুক চিরে পালিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব।
কিন্তু তারপরও মেয়েটার এত বড় দুঃসাহস, যে স্বয়ং রিচার্ড কায়নাতকে প্রত্যাখান করে চলে যাওয়ার মতো ঔদ্ধত্য দেখায়, এটা রিচার্ডের অহংকারে তীব্র আঘাত হেনেছে। রক্তচক্ষু আর শক্ত হয়ে আসা চোয়ালে থমথম করছে ভয়াল তাণ্ডবের আভাস। হিমালয়ের চূড়ার মতোই কঠিন আর নিটোল চোয়ালের পেশিগুলো ক্রোধে আর আক্রোশে শক্ত হয়ে উঠেছে। স্পিডবোর্ডের স্টিয়ারিংয়ে লৌহকঠিন হাতের মুঠো আরও শক্ত হয়। হঠাৎ যান্ত্রিক শব্দে বেজে উঠল ফোনটা। কল রিসিভ করে কানে তুলতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো ন্যাসোর তটস্থ কণ্ঠস্বর,
“বস, ম্যামকে খুঁজে পাওয়া গেছে।”
এলিজাবেথ তখনও নিঃসাড়, নিস্তেজ অবস্থায় লুটিয়ে আছে তপ্ত বালুকাচরে। তবে একটু আগে পাশে যে মানুষটি যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল, সে আর নেই। সে তার অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করে রেখে গেছে একটি চিরকুট। চিরকুটে ক্ষুরধার অক্ষরে লেখা ছিল,
“ডোন্ট বি রুড উইথ হার। আর ডোন্ট ইভেন টাচ হার হেয়ার।”
চিরকুটটা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে রিচার্ডের দু’চোখে প্রলয়ংকরী ধ্বংসলীলার যে ভয়াল ছবি ফুটে উঠেছিল, তা ক্ষণিকের মধ্যেই হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো মিলিয়ে গেল এলিজাবেথের নিস্তেজ মুখটার দিকে তাকাতেই। এক প্রবল পরাক্রান্ত রাজপুত্রের মতো বালিতে এক হাঁটু ভেঙে বসল রিচার্ড। কোনো অমূল্য সম্পদকে যেন অকাতরে ফেলে রাখা হয়েছে, ঠিক ওমন অনুভবে এলিজাবেথকে অত্যন্ত সযত্নে নিজের কোলে তুলে নিল রিচার্ড। তখুনি আচমকা নাসারন্ধ্রে এসে ধাক্কা দিল তীব্র ঘ্রাণ।
রিচার্ডের ধারালো দৃষ্টি গেল এলিজাবেথের শ্বেতশুভ্র গ্রীবায়। সেখানে ফুটে আছে অতি একটি ক্ষুদ্র রক্তিম দাগ। আরও খানিকটা ঝুঁকিয়ে নাসারন্ধ্রে সেই বিষাক্ত ঘ্রাণ নিতেই রিচার্ডের নিটোল চোয়াল ক্ষীণ-ক্ষণিকের জন্য ইস্পাতের মতো শক্ত হয়ে উঠল। এলিজাবেথকে ড্রাগস দেওয়া হয়েছে। ওকে এখান থেকে উধাও করে দেওয়ার একটি নিখুঁত চক্রান্ত ছিল এটি। তা না হলে যে মেয়ে আজ সকালে সম্পূর্ণ নিজ ইচ্ছায় ফিরে এলো, সে হঠাৎ পালানোর চেষ্টা করবে কেন?
প্রচণ্ড ভূমিকম্প যেভাবে মুহূর্তের মধ্যে বিশাল সৌধগুলোকে মাটি নিজের গর্ভে গ্রাস করে নেয়, ঠিক সেভাবে রিচার্ড অগ্নিসদৃশ ক্রোধকে সাময়িকভাবে দমন করে নিল। তারপর অতল ভালোবাসায় ঠোঁট ছুঁয়ালো এলিজাবেথের কোমল গলার ভাঁজে। বহমান মিহি বাতাসের সাথে তার কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়ল ফিসফিসানি, যা শুনল কেবল সে,
“খোদার কাছ থেকে যাকে চেয়ে এনেছি, কীভাবে হাত তুলি তার গায়ে?”
ক্ষণমাত্র বিলম্ব না করে এলিজাবেথকে কাঁধে তুলে নিল রিচার্ড। তার পুরো মহাবিশ্বকে আগলে রাখার জন্য তার একটি বাহুই যথেষ্ট ছিল। সম্মুখে উন্মুক্ত দ্বীপ প্রাঙ্গণে দৈত্যকৃতির পাখা ঘুরিয়ে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে
হেলিকপ্টার। দু’পাশে নত মস্তকে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে ড্রাগন সোলজার। রাজকীয় ও ত্রাস সৃষ্টিকারী সৈন্যসারির মধ্য দিয়ে এলিজাবেথকে কাঁধে চেপে এগিয়ে গেল রিচার্ড।
“বস, ছেলেটা দ্বীপের আশপাশে বোট নিয়ে ঘুরঘুর করছিল। সন্দেহ হওয়ায় গার্ডরা ওকে তুলে এনেছে।”
নিককে হাঁটু মুড়ে রিচার্ডের সামনে বসিয়ে রাখা হয়েছে। ন্যাসের কৈফিয়তধর্মী কথার বিপরীতে রিচার্ডের দৃষ্টি আরও গভীর, আরও শাণিত হয়। সেই প্রখর, সূচালো চাউনির সামনে নিক ঘন ঘন শুষ্কঢোক গিলতে থাকে। মাথা নিচু করে রেখেও সে স্পষ্ট অনুভব করতে পারছিল, রিচার্ডের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তার ওপর স্থির হয়ে আছে। নিক একবার সাহস করে চোখ তুলে তাকিয়েছিল, কিন্তু রিচার্ডের সমুদ্রনীল চোখের নিঃশব্দ প্রখরতা মুহূর্তেই তার ভেতরের সমস্ত সাহস শুষে নেয়। যেকোনো আত্মবিশ্বাসী মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বুনন গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য ওই একটি দৃষ্টিই যথেষ্ট।
দীর্ঘক্ষণের জমাট বাঁধা নীরবতা ভেদ করে হঠাৎ নিক ফুঁঁপিয়ে কেঁদে উঠল। অপ্রত্যাশিত এই কান্নায় সবাই চমকে যায়। বিরক্ত হয়ে লুকাস নিকের ঘাড়ে একটা চড় কষে বলল,
“অ্যাই এক্টিংয়ের দোকান! কিছু না বলে হঠাৎ ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কান্নাকাটি শুরু করছিস কেন? তোকে কে পাঠিয়েছে এখানে?”
কিন্তু এরপরের মুহূর্তেই লনে উপস্থিত সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়ে ঘটল এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। নিক চট করে উঠে দাঁড়িয়েলুকাসের ফোলা পেটে সজোরে দুটো ঘুসি বসিয়ে দিল। পরক্ষণেই আবার নিষ্পাপ শিশুর মতো সারল্য মেখে শান্ত গলায় বলল,
“কাউকে কখনো খালি হাতে ফেরাতে নেই। তা করুণা হোক কিংবা ঘৃণা। দ্বিগুণ করে ফিরিয়ে দিতে হয়, জেসাস বলেছে।”
নিকের এই প্রকম্পিত দুঃসাহস দেখে লুকাসের চোখ দুটো যেন কোটর থেকে ঠিকড়ে বেরিয়ে আসতে চাইল। সঙ্গে সঙ্গে চোখে আগুনের ছাই ছড়িয়ে পড়ে। পকেট থেকে ঝড়ের গতিতে রিভলবার বের করে সে নিকের দিকে তেড়ে যেতেই চারপাশ থমকে থমকে দিল বসের গম্ভীর কণ্ঠের মৃদু শব্দ,
“উমম…”
লুকাস যেখানে ছিল, সেখানেই স্থির হয়ে গেল। রিচার্ডের মেপে নেওয়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তখনও নিকের ওপরেই নিবদ্ধ। গম্ভীরাতিগম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন ভেসে এলো,
“হোয়াট মেকস ইউ দেয়ার?”
কণ্ঠস্বরটা ভীষণ ভারী এবং গভীর। নিকের মনে হলো, এই শব্দতরঙ্গের নিজস্ব ওজন আছে, যে ওজনে মুহূর্তে তার বুকের ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এলো। অকস্মাৎ নিক রিচার্ডের পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ল। অবিরল ধারায় কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“দয়া করে আমাকে মারবেন না। বিশ্বাস করুন, আমি ইচ্ছে করে এখানে আসিনি। আমি মেক্সিকো থেকে এসেছি। সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা মেয়ের সাথে পরিচয় হয়েছিল আমার। তার টানেই ইতালি ছুটে আসি। কিন্তু পুরো বিষয়টাই ছিল একটা জঘন্য ফাঁদ। মেয়েটা তার গ্যাং নিয়ে আমাকে ট্র্যাপে ফেলে। ওরা আমার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে—আমার কার্ড, ব্যাগ, মোবাইল, এমনকি পাসপোর্টটাও! পাসপোর্টের অভাবে আমি নিজ দেশেও ফিরতে পারছি না। আমি ওদের পায়ে পর্যন্ত ধরেছি অন্তত পাসপোর্টটা ফেরত দেওয়ার জন্য, কিন্তু ওদের একটাই দাবি, আরও পাঁচশত ডলার দিলে তবেই পাসপোর্ট মিলবে। বাট ট্রাস্ট মি, ব্রো, আই’ম টোটালি ব্রোক। তিন দিন ধরে পেটে একটাদানা দানাপানি পড়েনি। আমার আন্ডারওয়্যার পর্যন্ত ফুটো হয়ে গেছে, বিশ্বাস না হলে দেখুন!”
শুধু বলেই থামল না নিক। বাতাসের বেগে উঠে দাঁড়িয়ে সবার চোখের সামনেই নিজের প্যান্ট হাঁটুর নিচে নামিয়ে পাছা উঁচিয়ে ফুটো আন্ডারওয়্যারটা দেখিয়ে দিল। তারপর আবার প্যান্ট টেনে প্যানপ্যান করে বলতে লাগল,
“ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে একটা বোট নিয়ে মাছ ধরতে বের হয়েছিলাম। কিন্তু সমুদ্রের স্রোতে হঠাৎ করেই উপকূল থেকে অনেক দূরে ভেসে আসি। তখনই এই দ্বীপটা চোখে পড়ে। থইথই সমুদ্রের মাঝে এত বড় দ্বীপ আর বিশাল রাজপ্রাসাদ দেখে নিজের কৌতূহল সামলাতে পারিনি। কৌতূহলবশতই এদিকে চলে আসি, আর অমনি আপনার গার্ডরা আমাকে ছেঁকে ধরে। সত্যি বলছি, এর একটা বর্ণও মিথ্যা নয়। আপনাকে তো আমার দেখেই ভয় করছে। পরে আপনার ক্ষতি করার দুঃসাহস আমি কীভাবে দেখায়, বলুন, বস?”
“বস, পুরোটাই ওর সাজানো নাটক। দাঁড়ান, এক্ষুনি এর পেট থেকে সত্যিটা বের করছি।”, লুকাস আবারও রিভলবার হাতে নিকের দিকে আক্রোশ নিয়ে তেড়ে গেলে রিচার্ড হাত তুলে তাকে থামিয়ে দেয়। তার দৃষ্টি এখনও আগের মতোই গম্ভীর আর নিখুঁত। সে একটা নোটের বান্ডিল নিকের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে সামান্য ঘাড় বেঁকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“আউট।”
টাকার বান্ডিলটা নিক স্বর্গীয় অমৃতের মতো আঁকড়ে ধরল। তার গোল গোল চোখ দুটো আনন্দে জ্বলজ্বল করে উঠল। সে অতি-উৎসাহে রিচার্ডকে জড়িয়ে ধরতে গেলে ন্যাসো মাঝপথে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়। রহস্যজনকভাবে ন্যাসোর ঠোঁটের কোণে একচিলতে কৃত্রিম সৌজন্যের হাসি। সে বিনয়ের সাথে হাত উঁচিয়ে পথ দেখিয়ে বলল,
“দিস ওয়ে!”
নিক তবুও ন্যাসোকে পাশ কাটিয়ে রিচার্ডের উদ্দেশ্যে দু’বার মাথা নুইয়ে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল। তারপর পেছনে ঘুরল। নিকের মতো সন্দেহভাজনকে এত সহজে ছেড়ে দিতে দেখে লুকাসের বিস্ময় তো তখন তুঙ্গে! কিন্তু পরক্ষণেই যখন খেয়াল করল, নিক পেছনে ঘোরার ফাঁকে ন্যাসো অত্যন্ত সুকৌশলে জাদুকরী দক্ষতায় একটা ছোট্ট ট্র্যাকার বুতামের মতো নিকের হুডিট পিঠে গুঁজে দিল, তখন লুকাসের কপালের চিন্তার ভাঁজ শিশিরের মতো মিলিয়ে গেল। বুঝতে পারল এর নেপথ্যেও লুকিয়ে আছে অন্য কোনো গভীর মনস্তাত্ত্বিক চাল।
নিক লন পেরিয়ে ফটকের দিকে হাঁটার সময় হুডির হুডটা মাথায় টেনে নিল। ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতেই আড়চোখে পুরো ম্যানশনটা পাখির চোখে একপলকে স্ক্যান করে নিল সে। এক দৃষ্টিতেই মেপে নিল বিশাল প্রাসাদের প্রতিটা কোণ। জরিপ শেষ হতেই নিকের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল চতুর হাসি। এরপর সে শিস বাজাতে বাজাতে নির্বিকার গেট পেরিয়ে গেল। তার সেই তীক্ষ্ণ শিসের শব্দে ড্রাগন মূর্তির মতো বসে থাকা ব্ল্যাকহক ঘাড় ঘুরিয়ে তার বিদায়পথের দিকে তাকাল।
“ছাড়ো! ছাড়ো বলছি!”
তাসার চিৎকার ছিঁড়ে দেয় রাতের নিস্তব্ধতায়। পিছু পিছু কোনোমতে শরীরে নাইটস্যুট জড়িয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন ফাদার।
হেলিপ্যাডের ঠিক মাঝখানে একটি ফল্ডিং চেয়ারে পা তুলে বসে আছে রিচার্ড। একহাতে জ্বলন্ত সিগারেট, অন্যহাত শূন্যে ভাসছে। সামনের ছোট্ট ডেস্কটার ওপর রাখা একটি চকচকে কালো রি ভলবার। চাঁদের আলোয় তার ধাতব শরীর থেকে যেন ঠিকরে বেরোচ্ছে হিমশীতল আলো। রিচার্ডের দু-পাশে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে লুকাস, ন্যাসো। ন্যাসোর চিবুকে প্রস্তরকঠিন গাঢ় নীরবতা থাকলেও লুকাসের ঠোঁটের কোণে ঝুলে আছে কুটিল হাসি। তার হাতে মাঝারি আকৃতির একটা সাউন্ডবক্স। নাট্যলীলা দেখার জন্য সে মুখিয়ে আছে।
তাসার শরীরে পোশাকের উপস্থিতি ক্ষীণ। ঘামে ভেজা শরীর আর এলোমেলো চুল স্পষ্ট বলে দিচ্ছে তাকে গভীর অন্তরঙ্গ মুহূর্ত থেকে তুলে আনা হয়েছে।
ফল্ডিং চেয়ারে নির্বিকার ভঙ্গিতে গা এলিয়ে থাকা রিচার্ডের দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠলেন ফাদার, “রিদ! এসব কী হচ্ছে? তাসাকে ছেড়ে দাও!”
“ইউজ আইস কিউব অর টেক লিউপ্রোলাইড। এই নর্তকী আজ রাতের জন্য আমাদের বিনোদন।”
লজ্জা আর চরম অপমানে কেঁপে উঠলেন ফাদার। নিজ হাতে গড়া যন্ত্র আজ সবার সামনে দাঁড়িয়ে এভাবে কথা বলছে? রিচার্ডের এই তাচ্ছিল্য সইতে না পেরে ফাদার আবার চিৎকার করে উঠলেন, “ওকে আমি নিয়ে এসেছি। তুমি ওর সাথে এমন আচরণ করতে পারো না!”
“রক্ষিতাকেই তো নাচাচ্ছি, ঘরের লক্ষ্মীকে তো আর না,”
রিচার্ডের দায়সারা জবাবে ফাদারের হাতের মুষ্টি শক্ত হয়ে আসে। আড়চোখে লক্ষ্য করলেন, আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডরা মাথা নিচু করে রাখলেও সবার ঠোঁটের কোণেই চাপা হাসি।
রিচার্ড সোজা হয়ে বসল না, শুধু গ্রীবাটা সামান্য বাঁকাল। চোখ খুলে তির্যক দৃষ্টিনিক্ষেপ করল ফাদারের দিকে। কালচে ঠোঁটের কোণে ভেসে উঠল কটাক্ষ,
“ডু ইউ হ্যাভ সেকেন্ড থটস? শুড আই অ্যারেঞ্জ আ গ্র্যান্ড সেরিমনি?”
“শাট দ্য ফাক আপ!”ক্ষোভ আর অপমানে অকথ্য কিছু গালি বিড়বিড় করতে করতে ফাদার হনহন করে ঢুকে গেলেন ম্যানশনের ভেতরে।
ফাদারকে চলে যেতে দেখে তাসার চোখে জ্বলতে থাকা আশার শেষ প্রদীপটুকুও নিভে গেল। সে সকাতরে চিৎকার করে ফাদারকে ডাক। কিন্তু রক্ষিতার ডাকে ফাদার আর পেছনে ফিরে তাকালেন না।
তাত্ক্ষণিকভাবে গার্ডরা তাসাকে টেনেহিঁচড়ে হেলিপ্যাডের মাঝখানের ছোট গোল বৃত্তটার ভেতর দাঁড় করিয়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে সবাই একযোগে তাদের অস্ত্র তাক করল তাসার বুক বরাবর, যাতে পালাবার কোনো সুযোগ সে না পায়। রিচার্ডের ইশারায় লুকাস মিউজিক বক্সে গান চালিয়ে দিল। তাসা আতঙ্কিত চোখে তাকাল রিচার্ডের দিকে।
রিচার্ডের বরফশীতল দৃষ্টি মিলি সেকেন্ডের জন্যও তাসার দিকে ঘুরল না। রিভলবারের নলটা তাসার দিকে সোজা রেখা বরাবর উঁচিয়ে ধরে সে আবারও চেয়ারে গা এলিয়ে দিল। গলা থেকে ভেসে এলো হিমশীতল আদেশ,
“ড্যান্স। ডোন্ট স্টপ। ইফ ইউ স্টপ, ইউ’ল ডাই।”
তাসার কোনো প্রতিক্রিয়া জানানোর বা দেখানোর সুযোগও পেল না। স্পিকারের বিকট শব্দে গান বাজতে শুরু করল। তারপরও তাকে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে গার্ডরা একযোগে ট্রিগারে চাপ দেওয়ার উপক্রম করল। মুহূর্তের মধ্যে সচেতন হয়ে উঠল তাসা। ভয়ে শুরু করল বেলি ডান্স। নাচতে নাচতে একটুখানি অন্যমনস্ক হয়ে যেই তার পা বৃত্তের বাইরে চলে যায়, অমনি ব ন্দুকের নলগুলো আরও উঁচিয়ে ওঠে তাকে ঝাঁজরা করে দেওয়ার হুমকি নিয়ে। তাসা খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে, রিচার্ড আজ তার সমস্ত হিংস্রতা নিয়ে নিজের আসল রূপে ফিরে এসেছে। আজ আর তার একচুল ছাড় নেই।
কিন্তু সে-ও তো রক্ত-মাংসের মানুষ! অতীতে যত বড়োই বার ডান্সার থাক না কেন, হাজারো দর্শকের মন জয় করা নাচ নাচুক না কে, এক-দেড় হাতের একটা আঁটসাঁট বৃত্তের ভেতরে প্রাণ হাতে নিয়ে একটানা আর কতক্ষণই বা নাচা যায়! রাতের প্রথম প্রহরে তাসার নাচ শুরু হয়েছিল। এখন রাতের অন্তিম প্রহর। দীর্ঘ সময় টানা নাচার ফলে শরীর আর সঙ্গ দিচ্ছে না, পায়ের হাড়গুলো যেন জমে বরফ হয়ে গেছে। আর না পেরে সব শক্তি হারিয়ে তাসা লুটিয়ে পড়ল। কিন্তু নিস্তার মিলল না। নাচ থামতেই গার্ডরা তাকে হিংস্রভাবে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গেল সমুদ্রে।
রিচার্ড ঠোঁটের কোণে ক্রূর হাসি ঝুলিয়ে দেখল পরবর্তী দৃশ্য কীভাবে তাসার দু-হাত শিপ-ক্রেনের শিকলে বেঁধে তাকে ঝুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে উত্তাল মাঝ-সমুদ্রের ওপর। তাসা বাতাসে ঝুলতে ঝুলতে প্রাণপণ ছটফট করছে, চিৎকার করছে। সমুদ্রের বুক চিরে হাঙ্গরের দল যখন তার উপস্থিতি টের পেয়ে বিশাল হা করে তাকে গিলে খেতে আসছে, তখন তাসার আকাশচুম্বী আর্তনাদে কেঁপে উঠছে সমুদ্রের জলরাশি পর্যন্ত। তাসার শরীর জলপৃষ্ঠ থেকে ঠিক ততটাই উঁচুতে রাখা হয়েছে, যাতে ক্ষুধার্ত জলজ প্রাণীগুলো তাকে ছুঁতে না পারে। কিন্তু মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে তাসার এই আতঙ্ক আর আর্তচিৎকারই রিচার্ডের মনে এনে দিচ্ছে পৈশাচিক তৃপ্তি।
“ফ্রিলোডিং ব্লাডি বি চ,” হিমশীতল কণ্ঠে শব্দগুলো উগড়ে দিল রিচার্ড। মাঝ সমুদ্রে শূন্যে ঝুলতে থাকা অসহায় তাসার ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সে হাতঘড়ির দিকে তাকাল। পুরো আট ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। তার মানে এতক্ষণে এলিজাবেথের শরীর থেকে ড্রাগসের প্রভাব কমতে শুরু করার কথা।
হাঙ্গরবেষ্টিত মাঝ-সমুদ্রের ওপর ঝুলন্ত অবস্থায় তাসাকে মৃত্যুভয়ের নরকে ফেলে রেখেই রিচার্ড কুটিল হেসে পা বাড়াল মানসনের দিকে। তার পিছু পিছু অনুগত ছায়ার মতো এগিয়ে গেল ন্যাসো আর লুকাস।
এলিজাবেথ ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল। ড্রাগের প্রভাবে চোখের পাতাগুলোতে তখনও এক রাজ্যের ভার জমে আছে। মাথাটা ঝিমঝিম করছে ভীষণ। তবে মস্তিষ্ক খানিকটা সচল হতেই স্মৃতির ব্যাকড্রপে ভেসে উঠল সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো। বেডসাইড টেবিল থেকে রিচার্ডের ব্যক্তিগত ডায়েরিটি তুলে নিয়ে কেবল পাতাটা মেলে ধরেছিল সে। তখুনি দরজায় শব্দ হলো। পেছনে ঘুরে তাকানোর আগেই ঘাড়ে চেপে বসল ইনজেকশনের সুই। মুহূর্তেই ঝাপসা হয়ে এসেছিল চারপাশ। আবছা যতটুকু মনে পড়ে, কেউ একজন তাকে ধরে সিঁড়ি দিয়ে ছাদে নিয়ে গিয়েছিল, তারপর গোপন সুড়ঙ্গ পথ পেরিয়ে দ্বীপের কাছাকাছি নিয়ে একটা বোটে তুলে দিয়েছিল। এরপর আর স্মৃতি সায় দেয়নি।
দরজা খোলার শব্দে এলিজাবেথের চেতনা ফিরে এলো। ঝাপসা চোখে তাকিয়ে দেখল রিচার্ড দাঁড়িয়ে। নিজেকে সামলে ওঠার চেষ্টা করে হাত বাড়াল স্বামীর দিকে,
“ম…মি. কায়নাত!”
রিচার্ড ভেতরে ঢুকে ছিটকানিটা তুলে দিল। তার পুরুষালি হাস্কি স্বরের আবহে কেঁপে উঠল রমণীর সর্বাঙ্গ,
“অনেক রাগ আর অভিমান জমে আছে আমার ওপর, তাই না? লেট মি ফিক্স ইট মাই ওয়ে।”
চোখে তখনও ঘোর, মাথাটা ভারী। আবছা আলোয় এলিজাবেথ দেখল রিচার্ড হাতঘড়ি আর হার্মিসের বেল্টটা খুলে ছুঁড়ে ফেলল একপাশে। তার দু’হাতের তুড়ির শব্দে একে-একে ভারী পর্দাগুলো নেমে এসে ক্ক্ষটাকে ডুবিয়ে দিল ঘুটঘুটে অন্ধকারে। পরক্ষণেই খাঁজকাটা পাথুরে দেয়ালের ভেতর থেকে ঠিকরে বের হলো লাল আলোর রোশনাই।
রিচার্ড ধীরপায়ে খুব কাছে চলে এলো। বৃদ্ধা আর তর্জনি দিয়ে থুতনি চেপে ধরে এলিজাবেথের মুখটা ওপরে তুলল। হাস্কি স্বরে আওড়ালো,
“বি আ গুড গার্ল ,ওকে?”
ড্রাগের তীব্র ঘোরে এলিজাবেথের চোখ দুটো মাদকাসক্তের মতো ঘোলাটে হয়ে আসছিল। রিচার্ডের নেশালো চাহনি সেই ঘোরকে যেন আরও গাঢ় করে তুলল। এলিজাবেথ একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল তার চোখের দিকে। একসময় নিজের সমস্ত প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে সম্মোহনের বশে সায় দিল সে। নিঝুম নিস্তব্ধতায় কক্ষটা ডুবে যেতেই গাঢ় হতে শুরু করল তাদের দীর্ঘদিনের জমে থাকা অনুভূতি।
হঠাৎ এলিজাবেথের মুখের অভিব্যাক্তি কিছুটা বদলে যেতেই রিচার্ড সতর্ক হয়ে উঠে জিজ্ঞেস করল,
“রেড, টিস্যু লাগবে?”
এলিজাবেথ ততক্ষণে নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দিয়েছে। হেলে পড়ল বিছানার বুকে। নরম গদিতে এক হাঁটু গেড়ে এলিজাবেথের ওপর ঝুঁকে এলো রিচার্ড, মুখ ডোবাল গলার ভাঁজে। এবার আর শেষ সংবরণটুকুও ধরে রাখতে পারল না এলিজাবেথ। তার হাত দুটো আপনা থেকেই পৌঁছে গেল রিচার্ডের শার্টের বোতামে। ক্ষণিকের মান-অভিমান আর ভুল বোঝাবুঝির দেয়াল ভেঙে তারা আবারও হারিয়ে গেল নিবিড় ভালোবাসার সাগরে।
ড্রাগন গ্রুপের সতেরো তলা বিশালাকার ভবনে আজ ব্যস্ততার শেষ নেই। দীর্ঘদিন পর কোম্পানিতে পা রেখেছে রিচার্ড। মালিক যেখানে যান, তার ছায়াসঙ্গী ব্ল্যাকহকও সেখানে উপস্থিত থাকে। রিচার্ড যখন গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিমগ্ন থাকেন, ব্ল্যাকহক তখন ড্রাগন গ্রুপের বিশাল নেমপ্লেটের ওপর জাঁকিয়ে বসে চারপাশের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখে।
Born to be villains part 35
অনেকদিন পর ফেরায় আজ কাজের চাপটাও বেশ জাঁকালো। দেখতে দেখতে দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল। চারপাশ তখন গাঢ় অন্ধকার। হঠাৎ দূরের একটি থামানো গাড়ি থেকে ভেসে এলো এক সম্মোহনী শিসের সুর। সুরটি যেন দূর থেকেই সরাসরি ব্ল্যাকহককে লক্ষ্য করে বাজানো হচ্ছে। সুরটা চেনা লাগল। জানা সুর কানে পৌঁছাতেই ব্ল্যাকহক চোখ বুজে অনুভবে শুনতে লাগল।
হঠাৎ করে গাড়িটির ইঞ্জিন চালু হলো। চাকাগুলো ছুটতে শুরু করল। সঙ্গে সঙ্গে ডানা ঝাপটে গাড়িটির পিছু পিছু উড়ে গেল ব্ল্যাকহক। আর তারপরই…….
