Born to be villains part 39
মিথুবুড়ি
পাহাড়ের চূড়ায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে একটি সুবিশাল রয়্যাল প্যালেস। নিচ থেকে ওপরের দিকে তাকালে মনে হয়, প্রাসাদটির খাড়া দুর্গপ্রাচীর যেন সরাসরি নীল আকাশকে স্পর্শ করেছে। ইতালির সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ আর বিলাসবহুল পার্টির ঠিকানা এটি, যেখানে মূলত বিশ্বসেরা ধনকুবের আর মিলিয়ন, বিলিয়নাদের পদচারণা ঘটে। আর আজ এই রাজকীয় প্রাসাদে আয়োজন করা হয়েছে রিচার্ড আর এলিজাবেথের বিয়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মহামিলনমেলা।
পুরো আয়োজনের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব ফাদারের ওপর থাকলেও, ক্ষুরধার ও খুঁতখুঁতে স্বভাবের রিচার্ড নিজে আগেভাগে চলে এসেছে সবকিছুর সূক্ষ্ম তদারকি করতে। সে বরাবরই নিখুঁত আর সৌখিন। কোনো কাজে সামান্যতম অপূর্ণতাও তার সহ্য হয় না।
পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে একটি রাজকীয় বিজনেস ক্লাস কার এসে থামল প্রাসাদের সিংহমুখী ফটকের সামনে। গাড়ির বিশাল স্বয়ংক্রিয় দরজা দুটো দুই পাশে সরে যেতেই ভেতরের কোট-স্যুট ঠিক করতে করতে নেমে এলেন ফাদার। রিচার্ড চাইলে নিজেই এলিজাবেথকে সঙ্গে করে নিয়ে আসতে পারত, কিন্তু সে তা করেনি। যেভাবে ফাদারকে বাধ্য করে আজ এই আয়োজন পর্যন্ত এনেছে, ঠিক সেভাবেই ফাদারের ভঙ্গুর অহংকার গুঁড়িয়ে দিতে এলিজাবেথকে সঙ্গে করে আনার দায়িত্বটিও চতুরতার সঙ্গে তাঁর ওপরই চাপিয়ে দিয়েছে সে।
ফাদার ভেতরের প্রবল অসন্তোষ চেপে রেখে মুখে একচিলতে কৃত্রিম সৌজন্যতা ফুটিয়ে তুললেন। চোয়লে চেপে রাখা রাগ আর বিরক্তি নিয়েই তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন এলিজাবেথের দিকে। বিপরীতে লাস্যময়ী হাসিতে এলিজাবেথ ফাদারের হাতে নিজের কোমল হাতটি রেখে গাড়ি থেকে নেমে এলো। ঠিক তখুনি পেছনে সারি বেঁধে এসে থামল আরও দুটো একই রকম বিলাসবহুল গাড়ি। দ্বিতীয় গাড়ি থেকে নামল লুকাস এবং তৃতীয়টি থেকে ন্যাসো। গাড়ি থেকে নেমে তারা দুজনই পেছনের যাত্রীদের জন্য হাত বাড়িয়ে দিল। ইবরাত মিষ্টি হেসে ন্যাসোর হাত ধরলেও, সোফিয়ার চোয়ালে জ্বলছিল দগদগে ক্ষোভ। তার জ্বলন্ত চোখের তেজে যেন আগুন ঠিকরে বের হচ্ছিল। লুকাস প্রথমে বিষয়টিতে খানিক মজা পেলেও, সোফিয়ার সেই বিষাক্ত আর ধারালো দৃষ্টি দেখে গলার শুকনো ঢোক গিলে। এমন অদম্য ও ভয়ঙ্কর তেজ সে আগে কখনো কোনো নারীর চোখে দেখেনি। বিষাক্ত চাউনি বজায় রেখেই সোফিয়া লুকাসের বাড়িয়ে দেওয়া হাতে হাত রাখল।
ফাদার অত্যন্ত মার্জিতভাবে এলিজাবেথের হাত ধরে রেড কার্পেটে ঢাকা সিঁড়ি বেয়ে প্রাসাদের দিকে এগোতে লাগলেন। ঠিক দুই ধাপ পেছনের সিঁড়িতে লুকাসের হাত ধরে এগোচ্ছিল সোফিয়া। কিন্তু হঠাৎ-ই এক অপ্রত্যাশিত বিপত্তি ঘটল। ফ্লোর-টাচ গাউনের অতিরিক্ত ঘেরে আটকে গেল সোফিয়ার হাই হিলের তলা। শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে সে সামনের দিকে প্রায় উল্টে পড়তে লাগল। লুকাসের হাত সে এতই আলতো করে ধরেছিল যে, সামলে ওঠার আগেই বাঁধন ছুটে গেল। সোফিয়ার শরীর সিঁড়ির পাথুরে ধাপে আছড়ে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে, কোনো এক অলৌকিক দক্ষতায় আরেকটি শক্ত হাত তার হাতটি শূন্যেই ধরে ফেলল। মুহূর্তেই সোফিয়ার টাল সামলে দিল সেই শক্ত বাঁধন। বিস্ময়ে হতবাক সোফিয়া মুখ তুলে তাকাল। ঠিক যেভাবে সোফিয়ার শরীর পেটের কাছ থেকে ঝুঁকে পড়েছিল, ঠিক তেমনিভাবে পুরো ঘুরে গিয়ে তার দিকে ঝুঁকে আছে স্বয়ং এলিজাবেথ। বিস্ময়ে আঁতকে উঠে সোফিয়া নিজের অবশ হয়ে আসা হাতের দিকে তাকাল, হ্যাঁ সেটি শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রেখেছে এলিজাবেথ।
“বি কেয়ারফুল সুইটহার্ট। ইউ অলমোস্ট ফল।” ঠোঁটের কোণে রহস্যময় বাঁকা হাসি ফুটিয়ে ধীরকণ্ঠে বলল এলিজাবেথ।
সোফিয়াকে সামলে ওঠার কিংবা কোনো প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগ না দিয়েই এলিজাবেথ তৎক্ষণাৎ সোজা হয়ে দাঁড়াল। তারপর আবার আগের মতোই ফাদারের হাত ধরে দৃঢ় পদক্ষেপে প্রাসাদের ভেতর এগোতে লাগল। কয়েক মুহূর্তের জন্য চারপাশে জমে থাকা উৎসুক চোখগুলো এলিজাবেথের এমন ক্ষিপ্র আর স্বাভাবিক আচরণে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে এলো। তারপর যার যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল সবাই।
সিঁড়ি ডিঙিয়ে তারা রেড কার্পেট মোড়ানো চকচকে ফ্লোরে পা রাখল। আর মাত্র তিন পা এগোলেই স্বয়ংক্রিয় সেন্সর বসানো বিশাল রাজকীয় দরজাটি ফাদারের উপস্থিতি টের পেয়ে দু’ভাগে খুলে যাবে। এলিজাবেথ তার মসৃণ ভঙ্গিমায় ঠিক পরের কদমটি ফেলতে যাবে, অমনি সোফিয়া ঝড়ের গতিতে সামনে এসে একপা বাড়িয়ে দিল, ঠিক যেন কাউকে ল্যাং মেরে ফেলে দেওয়ার নিখুঁত মহড়া!
সোফিয়ার এমন আচমকা কাণ্ড দেখে ফাদার চকমে উঠলেন। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ন্যাসো, ইবরাত কিংবা লুকাস কিছু বুঝে ওঠার আগেই যা ঘটার ঘটে গেল। দূর থেকে দেখলে মনে হবে সোফিয়া নির্ঘাত ল্যাং মেরেছে, কিন্তু আদতে তা নয়। অনেক সময় কোনো বিপদ আঁচ করার আগেই মানবদেহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়; ঠিক তেমনি সোফিয়ার পা গায়ে না লাগা সত্ত্বেও এলিজাবেথ আচমকা টাল সামলাতে না পেরে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল।
কিন্তু এবার দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে গেল! একটু আগে সোফিয়ার সঙ্গে যা ঘটেছিল, ঠিক একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাল সোফিয়া নিজে। এলিজাবেথ যেভাবে তাকে পতন থেকে আগলে নিয়েছিল, সোফিয়াও ঠিক সেভাবে এলিজাবেথকে শূন্যে শক্ত হাতে আঁকড়ে ধরে সামলে নিল।
সোফিয়া এলিজাবেথের দিকে খানিকটা ঝুঁকে পড়ল। এলিজাবেথের আতঙ্কিত চোখের দিকে তাকাল তার ধূর্ত ও ধারালো দুটি চোখ। তারপর একটু আগেই ঘটে যাওয়া ঘটনার শতভাগ শোধ তুলে, এলিজাবেথের মতোই ঘায়ে বিষাক্ত নুন ছিটিয়ে দিয়ে ফিসফিস করল,
“বি কেয়ারফুল সুইটহার্ট! অল্পতেই হোঁচট খেলে অধিকারের লড়াইয়ে জিতবে কী করে?”
কথার চোটে এলিজাবেথের চিবুক শক্ত হয়ে উঠল। দুজোড়া চোখ একবিন্দুতে এসে মিশল, সেই চাহনিতে যেন বিষাক্ত বি ষ ঢেলে দেওয়া হচ্ছিল। এলিজাবেথ দাঁতে দাঁত চেপে চিবিয়ে চিবিয়ে জবাব দিল, “যেটা একান্তই আমার, সেটা নিয়ে আবার কিসের লড়াই?”
সোফিয়া অদ্ভুত নির্মম অভিব্যক্তিতে একদম নিষ্পাপ অবয়ব বানিয়ে ঠোঁট উল্টালো, “লড়াই?”
পরমুহূর্তেই তার মুখের বিষাদময় মাস্কটা খসে পড়ল। ক্ষীণ ক্ষণিকের মধ্যে সোফিয়ার পুরো অবয়ব হিংস্র হয়ে উঠল,”কার জন্য এই লড়াই?”
সে আরও একটু ঝুঁকে এলিজাবেথের কানের একদম কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে,
“ময়ূর দেখতে ততক্ষণই সুন্দর, যতক্ষণ না তাকে সাপ খেতে দেখো।”
“সোফিয়া!”
ফাদারের চাপা ধমকে সোফিয়া চট করে সোজা হয়ে দাঁড়াল। এলিজাবেথের তেজদীপ্ত, রোষে থমথম করা মুখের দিকে তাকিয়ে শেষবারের মতো বাঁকা হেসে নির্বিকার ভঙ্গিতে গিয়ে আবারও লুকাসের হাত আঁকড়ে ধরল।
ফাদারের দায়িত্ব ছিল অনুষ্ঠানস্থলে এলিজাবেথকে সাথে নিয়ে প্রবেশ করা। নিজের কাজ শেষ করেই তিনি এলিজাবেথকে ভিড়ের মাঝে একাকী রেখে অলক্ষ্যে মিলিয়ে গেলেন। এলিজাবেথ খানিকটা বিভ্রান্ত হয়ে এদিক-সেদিক তাকাচ্ছিল, খুঁজছিল রিচার্ডকে। কিন্তু এই জনসমুদ্রের মাঝে তার চোখ এড়িয়ে গেল বহুদূরে দাঁড়িয়ে থাকা একজোড়া ক্ষিপ্ত দৃষ্টি, যা স্থির হয়ে আটকে ছিল তার পরা স্লিভলেস গাউনটির দিকে। পরক্ষণেই প্রচন্ড রোষে সেই চোখজোড়ার মালিকের হাতে ধরা ড্রিঙ্কসের গ্লাসটি দুমড়ে-মুচড়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল।
হঠাৎ-ই দূরের কারও ইশারায় এক ওয়েটার ট্রেই হাতে এলিজাবেথের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে তার পোশাকে জুস ফেলে দিল। এলিজাবেথের গাউনের নিচের অংশ ভিজে একাকার হয়ে যায়। ওয়েটারটি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে কান্নাকাটি জুড়ে দিল, বারবার ক্ষমা চাইতে লাগল। এলিজাবেথ বড় কোনো ঝামেলা না চেয়ে শান্ত রইল। পোশাক শুকিয়ে নেওয়ার জন্য ওয়েটারের দেখানো পথ ধরে সে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল।
কিন্তু নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে এলিজাবেথ চমকে উঠল৷ সেখানে কোনো ওয়াশরুম নেই, একটি নির্জন, ফাঁকা ঘর। বিপদ আঁচ করতে পেরে সে ঘুরে দাঁড়িয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যাবে তখুনি পেছন থেকে কেউ তাকে হেঁচকা টানে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার দুটি হাত মাথার ওপর তুলে দেয়ালের সাথে শক্ত করে চেপে ধরা হলো।
পরক্ষণেই তীব্র যন্ত্রণায় শিহরে উঠল এলিজাবেথ। কেউ একজন সজোরে কামড়ে ধরেছে তার উন্মুক্ত কাঁধ! এক কাঁধ শেষ করে অপর কাঁধেও একই রা ক্ষসে আক্রমণ। এলিজাবেথ যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠতে গিয়েও নিজেকে আটকে নিল। পরিচিত পারফিউমের গাঢ় ঘ্রাণ নাকে আসতেই সে দাঁতে দাঁত চেপে কান্না গিলে ফেলল। একনিমেষেই বুঝে গেল রিচার্ডের এই আকস্মিক, উন্মাদের মতো আত্মঘাতী হয়ে ওঠার কারণ।
তাদের মধ্যকার সব ভুলবোঝাবুঝির অবসান তো ঘটে গিয়েছিল। কিন্তু সেদিন প্রেম-এর সাথে কথা বলার পর থেকে এলিজাবেথের মনে রিচার্ডকে নিয়ে নতুন করে সন্দেহ বাসা বাঁধে। সেই সন্দেহ থেকে ক্ষোভ, আর সেই ক্ষোভের বসেই আজ রিচার্ডের বারণ তোয়াক্কা না করে এই স্লিভলেস গাউন পরা।
অন্ধকারের মাঝেই এলিজাবেথ শক্ত গলায় বলে উঠল,”আপনাকে আমি ছাড়ব না মি. কায়নাত! যদি কখনো জানতে পারি এই সবকিছুর আড়ালে আপনি রয়েছেন…”
রিচার্ড ওর কাঁধ থেকে মুখ তুলে অন্ধকারে সরাসরি এলিজাবেথের চোখের দিকে তাকাল। তার কণ্ঠস্বর অদ্ভুত শান্ত,
“কী করবে শুনি?”
“ধ্বংস করে ফেলব আপনাকে!”
“কবুল।”
“হাহ্?”
রিচার্ড আগলে ধরল এলিজাবেথের সুকোমল গলা। বুড়ো আঙুল দিয়ে তার জাফরান রঙা গালে আলতো ছোঁয়া দিতে দিতে ফিসফিসিয়ে বলল, “তোমার হাতে আমার ধ্বংসও কবুল। তুমি কবুল এই জন্মের জন্য, কবুল ইহজন্মের জন্য। কবুল তোমার ভালোবাসা, কবুল তোমার ঘৃণা, কবুল তোমার হিংসা-প্রতিহিংসা… আর সবচেয়ে বেশি কবুল আমার ধ্বংসবতীর হাতে নিজের ধ্বংসকে।”
এলিজাবেথ চিবুক উঁচিয়ে বলল, “এই ষড়যন্ত্রের কারিগর যদি হন আপনি, তবে আপনাকে ধ্বংস করার একমাত্র অস্ত্র আমি। আমার কাছে আপনি কখনো জিততে পারবেন না।”
রিচার্ডের কণ্ঠে রহস্যময় আত্মসমর্পণ, “আপনার কাছে এই গোলাম সর্বক্ষণ হারার জন্য প্রস্তুত। এক তো আপনার এই লাল চুলের মোহেই সারাজীবনের জন্য আবদ্ধ হয়ে গেছি, নয়তো এই গোল পৃথিবীর কার সাধ্য ছিল আমাকে হারানোর? হাহ? ছিল বুঝি?”
রিচার্ড খুব বুদ্ধিমত্তার সাথে প্রসঙ্গটি এড়িয়ে গেল। এলিজাবেথ কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছে বা কেন বলছে, তা নিয়ে কোনো প্রশ্নই করল না। ধীরে ধীরে সে হাত রাখল এলিজাবেথের কোমর পেঁচিয়ে। তারপর আলতো করে কিন্তু গভীর শব্দে চুমু খেল এলিজাবেথের কণ্ঠনালিতে। এলিজাবেথ ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠল।
রিচার্ডের কণ্ঠ আরও গভীর, আরও ভার হয়ে এলো, “আর কখনো লাল পরবে না, ওকে?”
“কেন?”
“মনে হয় আমি মরে যাই।”
এলিজাবেথকে একরাশ অনুভূতির জোয়ারে ভাসিয়ে রেখে, অন্ধকারের মাঝেই ওকে একা ফেলে রিচার্ড রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
এলিজাবেথের হূদস্পন্দন দ্রুত হয়ে এসেছে, সে ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিচ্ছিল। এমন সময় দরজার ওপাশ থেকে আবার ভেসে এলো রিচার্ডের কণ্ঠ, “অন্ধকারে একা ভয় লাগছে না?”
“কেন লাগবে?”
এলিজাবেথের পাল্টা প্রশ্নের উত্তর রিচার্ড দেওয়ার আগেই এলিজাবেথ মৃদু স্বরে যোগ করল, “রিচার্ড কায়নাত থাকতে ভয় কীসের?”
অন্ধকার ছিল বলে এলিজাবেথ দেখতে পেল না, তার এই ছোট্ট বিশ্বাসটুকু শুনে দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার ঠোঁটের কোণে কতটা প্রশান্তি আর তৃপ্তির ছায়া ফুটে উঠেছিল!
“কাঁধের দাগ কীভাবে মুছবে, দ্যাটস আপ টু ইউ। ইউ হ্যাভ জাস্ট ফাইভ মিনিটস।”
হনহন করে হেঁটে চলে গেল রিচার্ড। আলো জ্বলে উঠল। এলিজাবেথ কাঁধের দিকে তাকাল। সত্যি, দুই কাঁধেই স্পষ্ট হয়ে বসে আছে হিংস্র কামড়ের দাগ! সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথার খোঁপা করা চুলগুলো খুলে দিল। রেশমি চুলের ঢল নামতেই ঢেকে গেল তার উন্মুক্ত ও ক্ষতচিহ্নযুক্ত কাঁধ।
প্রেম মানুষের জীবনে গভীর পরিবর্তন আনে, যার দুটো ভিন্ন রূপ বিদ্যমান—কেউ প্রেমে নিজে উন্মত্ত হয়, আবার কেউ অপরকে প্রেমে উন্মত্ত করে তোলে। তবে বিজনেস টাইকুন রিচার্ড কায়নাতের গল্পটা একটু অন্যরকম। সে যেন এই নিয়মে বরাবরের মতোই জয়ী। রিচার্ড শুধু নিজে এলিজাবেথের প্রেমে পড়ে উন্মাদ হয়নি, এলিজাবেথকেও নিজের ভালোবাসায় দিশেহারা করে ছেড়েছে।
সাধারণত পুরুষমানুষের ভেতরের এমন ব্যাকুলতা বা উন্মাদনা লোকচক্ষুর অন্তরালেই থেকে যায়। নিজের ভঙ্গুর ইগো টিকিয়ে রাখার তাগিদে তারা তা সযত্নে লুকিয়ে রাখে। কিন্তু শক্তপোক্ত আর কঠোর ব্যক্তিত্বের বিজনেস টাইকুন রিচার্ডের মাঝে সে ধরনের কোনো দ্বিধা বা কৃত্রিমতার বালাই নেই। এলিজাবেথের প্রতি তার গভীর আবিষ্টতা, ব্যাকুলতা আর মত্ততা সে লুকাতে চাইলেও তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে সবার সামনে। বিশেষ করে যখন এলিজাবেথ কাছে ছিল না, তখন চারপাশের মানুষগুলোর কাছে দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল, বাহ্যিকভাবে অত্যন্ত কাঠিন্যে ঘেরা এই লোকটা তার স্ত্রীকে কতটা চোখে হারায়।
ঘটনাটি অল্প কিছুক্ষণ আগের। পার্টিতে আজ রিচার্ড আর এলিজাবেথের বিয়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পাশাপাশি এক বিশাল ব্যবসায়িক চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার কথা। একজন বিজনেস পার্টনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ফাইল নিয়ে রিচার্ডের সামনে দাঁড়িয়ে বলেন,
“মি. কায়নাত, এবার সইটা করে দিন।”
ফাইলে চোখ না রেখেই নিস্পৃহ কণ্ঠে রিচার্ড উত্তর দিল,
“আমার ওয়াইফ আসুক।”
তখন তার কণ্ঠে চূড়ান্ত নির্লিপ্ততা থাকলেও, আচরণে ফুটে উঠেছিল গভীর চাওয়া, জীবনের এত বড় অর্জনের মুহূর্তেও সে তার স্ত্রীকে পাশে দেখতে চায়।
এর কিছুক্ষণ পর, ইংল্যান্ড থেকে আসা বায়াররা দ্রুত বিদায় নেবেন বলে আগেই ডিনার সেরে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তখন তারা রিচার্ডকে টেবিলে আমন্ত্রণ জানায়,
“মি. কায়নাত, ডিনার শুরু করা যাক?”
রিচার্ড তখনও সেই একই অবিচল কণ্ঠে বলল,
“ওয়েট, আমার ওয়াইফ আসছে।”
এমনকি পার্টির একপর্যায়ে যখন তাকে নাচের জন্য আহ্বান জানানো হলো,
“মি. কায়নাত, লেটস ডান্স।”
তখনও তার চোখ জোড়া কেবল একজনকেই খুঁজছিল। সংক্ষেপে কিন্তু দৃঢ় ভঙ্গিতে সে কেবল একটাই উত্তর দিয়েছিল,
“মাই ওয়াইফ ইজ কামিং।”
সমগ্র পার্টির এত কোলাহল আর আলোকের মাঝে রিচার্ডের প্রতিটি প্রত্যাখ্যানে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল স্ত্রীকে ছাড়া তার কোনো উদযাপনই পূর্ণ নয়।
বিজনেস ম্যাগনেটদের ভিড়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল রিচার্ড। হুট করেই হাই হিলের ক্লিক-ক্লিক শব্দে থমকে গেল চারপাশের গমগম গুঞ্জন। উপস্থিত সবার সাথে রিচার্ডও পেছন ফিরে তাকাল। এলিজাবেথ আসছে। মুহূর্তের জন্য যেন পুরো হলরুম থমকে গেল। চার ইঞ্চি উঁচু হিলে প্রতিটি পদক্ষেপে উপচে পড়ছে একরাশ আত্মবিশ্বাস। পরনে অগ্নিশিখার মতো লাল গাউন, ঠিক যেন রাজকীয় কোনো সম্রাজ্ঞী। খোলা চুলের মেঘে ঢাকা পড়ে গেছে তার অনাবৃত কাঁধ। এলিজাবেথকে ঘিরে থাকা অন্য পুরুষদের মুগ্ধ, লোলুপ দৃষ্টিগুলোর দিকে তাকাতেই রিচার্ডের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। তীব্র বিরক্তিতে সে এক কদম এগিয়ে গিয়ে সকলের দৃষ্টি আড়াল করে দাঁড়াল। তার এই হিংসুটে কাণ্ড দেখে পেছনে দাঁড়ানো একজন ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে হিসহিসিয়ে বলে উঠল,
“জেলাস, কায়নাত?”
হাতের ড্রিংকসের গ্লাসটা আঙুলের চাপে শক্ত করে ধরে রিচার্ড পেছনে ফিরল। গলায় তীব্র উত্তাপ ঝরিয়ে জবাব দিল, “জেলাস? নো, বার্নিং ইনসাইড।”
এলিজাবেথ এসে রিচার্ডের পাশে দাঁড়াতেই সে এক টানে ওকে নিজের বাহুডোরে আচ্ছন্ন করে নিল। রিচার্ডের এমন আকস্মিক আর প্রকাশ্য ঘনিষ্ঠতায় এলিজাবেথ খানিকটা অবাক হলো। তবে তাকে পুরোপুরি হতবাক করে দিয়ে, সবার সামনেই রিচার্ড ওর ঠোঁটে গাঢ, এবং দীর্ঘ চুম্বন আঁকে। চোখের পলকে চারপাশের মুগ্ধ আর বিস্ময়াকুল দৃষ্টিগুলো অপরাধীর মতো নত হয়ে গেল।
রিচার্ড ট্রে থেকে একটি লেমনেডের গ্লাস তুলে এলিজাবেথের দিকে বাড়িয়ে দিল, “ড্রিংক ইট, ওয়াইফি।”
এলিজাবেথ মাথা নাড়ে,”উঁহু।”
রিচার্ডের কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ ফুটল, “কেন? দ্যাটস ইউর ফেভারিট ড্রিংক, হানি।”
যেন চমকে উঠল এলিজাবেথ, “আমার ফেভারিট?”
স্মৃতির পাতায় জোর দিতেই এলিজাবেথের ফর্সা, গোলাপী মুখটা মুহূর্তে ফ্যাকাসে হয়ে গেল। সে আপ্রাণ চেষ্টা করে মনে করার। মস্তিষ্কে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হওয়ায় ফর্সা চোখ দুটো রক্তিম রূপ নেয়। তার এই অদ্ভুত আচরণে উপস্থিত অতিথিরা ফিসফিস করে নানা মন্তব্য করতে শুরু করে। চারপাশের এই অনুসন্ধানী দৃষ্টি সহ্য করতে না পেরে এলিজাবেথের চোখের কোণে জল জমে উঠল। রিচার্ডের দিকে তাকিয়ে সে করুণভাবে মাথা নাড়ল। না, সে কিছুই মনে করতে পারছে না।
রিচার্ডও উৎসুক হয়ে এলিজাবেথের দিকেই তাকিয়ে ছিল। কিন্তু এলিজাবেথের চোখের জল দেখে সে দ্রুত পরিস্থিতি সামলে নিল, “স্যরি, মাই মিস্টেক।”
তাও এলিজাবেথের ভেতরের অশান্তি কমে না। হঠাৎ তার নজর গেল দূরে ফাদারের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সোফিয়ার দিকে। সোফিয়া একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে ছিল। অকারণেই এলিজাবেথের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। মনের ভেতর জ্বলে ওঠা ক্ষোভ আর জেদের বশে সে হঠাৎ রিচার্ডের শার্টের কলার চেপে ধরল। তারপর হেঁচকা টানে কাছে টেনে এনে এবার নিজেই রিচার্ডের ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে দিল।
উপস্থিত অতিথিদের মাঝে সাথে সাথে গুঞ্জনের ঝড় উঠল। কেউ হেসে উঠল, কেউ কানাঘুষা শুরু করল, আবার কেউ বা লজ্জায় চোখ সরিয়ে নিল। পাশ থেকে একজন ঠাট্টা করে বলেই ফেলল, “মি. কায়নাত, ইয়োর ওয়াইফ মাস্ট বি সো হাংরি!”
কিন্তু এসব চাটুকারিতা বা মিশ্র প্রতিক্রিয়ার মাঝে সোফিয়া ছিল একেবারেই নির্বিকার। তার ঠোঁটের কোণে খেলা করছিল রহস্যময়, বাঁকা হাসি। রিচার্ডের ঠোঁট আঁকড়ে ধরে রাখা অবস্থাতেই এলিজাবেথ সোফিয়ার দিকে তাকাল,ঠোঁটে তার বিজয়ের প্রতিধ্বনি। বিপরীতে সোফিয়াও ঠিক ততটাই শীতল আর বাঁকা হাসিতে জবাব দিল। সেই রহস্যময় হাসি যেন এলিজাবেথের আত্মসম্মান আর অহমিকায় আগুন জ্বালিয়ে দিল। ক্রোধ আর অপমানে অন্ধ হয়ে সে এক ঝটকায় রিচার্ডের কলার ছেড়ে দিয়ে হনহনিয়ে ভিড়ের ভেতর চলে গেল। অর্ধাঙ্গিনীর এমন আকস্মিক আচরণ আর ক্ষিপ্ত প্রত্যাখ্যানের মূল কারণ রিচার্ডের কাছে অস্পষ্ট নয়। সে বুড়ো আঙুল দিয়ে ঠোঁট ঘষতে ঘষতে সামনে তাকাতেই ন্যাসোর সাথে চোখাচোখি হলো। ন্যাসো একজোড়া নির্জীব, নিষ্পলক চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। ওই নীরব দৃষ্টির অন্তরালে লুকিয়ে থাকা বার্তা রিচার্ডের অজানা নয়। কিছুক্ষণ আগে এলিজাবেথ যখন মনে করতে পারছিল না, তখন রিচার্ডের চোখে যে গাঢ় অসহায়তা ভেসে উঠেছিল,তা ন্যাসোর শ্যেনচক্ষু এড়াতে পারেনি।
বুকের ভেতর চেপে থাকা কষ্টের ভারী নিঃশ্বাস নৈঃশব্দ্যে ত্যাগ করল রিচার্ড। তারপর অত্যন্ত বিষাদ ভারাক্রান্ত কণ্ঠে আওড়ে,
“যেদিন ওর স্মৃতি থেকে আমি মুছে যাব, সেদিন এই পৃথিবীর বুক থেকে একজন নিঃশব্দে হারিয়ে যাবে।”
ঘোষণা শেষ হতেই শুরু হলো কপোত-কপোতীদের যুগল নৃত্য। মৃদু সুরের তালে ধীরে ধীরে নিভে গেল হলরুমের ঝলমলে আলো। অন্ধকার হলরুমের রোমান্টিক আবহে চারপাশের প্রতিটি জোড়া পরস্পরের আঙুলে আঙুল রেখে নাচের ছন্দে মেতে উঠল। এমনই এক মোহাচ্ছন্ন মুহূর্তে হঠাৎ এলিজাবেথের হাত ছেড়ে দিল রিচার্ড। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ভিড়ের ভিজিটিং ভিড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল সে। এলিজাবেথ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। ঠিক তখুনি কেউ একজন অত্যন্ত চতুরতায় তার হাতের মুঠোয় গুঁজে দিল এক টুকরো কাগজ। আচমকা স্পর্শে এলিজাবেথ ভেবেছিল রিচার্ডই হয়তো ফিরে এসেছে; কিন্তু পরক্ষণেই সূক্ষ্ম নখের আঁচড় আর কোমল ছোঁয়ায় সে বুঝতে পারল, হাতটি কোনো নারীর। তবে সেই রহস্যময়ীকে চেনার কিংবা চিহ্নিত করার আগেই সে হারিয়ে গেল ভিড়ের আড়ালে।
ঘটনার আকস্মিকতা এখানেই শেষ হলো না। এলিজাবেথের সম্পূর্ণ অগোচরে, অত্যন্ত নিখুঁত ও চতুর কৌশলে কেউ একজন তার ক্লাচ ব্যাগের ভেতর রেখে গেল আরেকটি গোপন খাম। এতটাই সাবলীল সেই হাতসাফাই যে এলিজাবেথ বিন্দুবিসর্গও টের পেল না।
হলরুমের আলো আবার জ্বলে উঠতেই এলিজাবেথ তড়িঘড়ি করে চিরকুটটি খুলল। দেখল একটি অজানা ফোন নম্বর। মুহূর্তের মধ্যে তার মস্তিষ্কে হাজারো প্রশ্নের ঝরনাধারা বইতে শুরু করল। বুকের ভেতর ধক করে উঠল একটা নাম—সুরাকার। এটা কি তবে সুরাকারই পাঠাল? সে কি তার সাথে যোগাযোগ করতে চাইছে?
প্যানিক আর কৌতূহল মেশানো চোখে এলিজাবেথ দ্রুত এদিক-সেদিক তাকিয়ে রিচার্ডকে খুঁজতে লাগল। কিন্তু নাহ্, আশেপাশে রিচার্ডের কোনো চিহ্নও নেই। তার চোখ গিয়ে পড়ল ইবরাতের ওপর। সে ছুটে গেল ইবরাতের দিকে। নিজের ক্লাচ ব্যাগটা ইবরাতের হাতে ধরিয়ে দিয়ে, প্রায় ছোঁ মেরে ইবটাতের হাতের ফোনটা নিয়ে দ্রুত হলরুমের বাইরে বেরিয়ে এলো এলিজাবেথ।
রিচার্ড কাছে নেই এর চেয়ে বড় সুযোগ আর হতে পারে না। এটাই আসল সময় সুরাকারের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করার; এটাই তার হারিয়ে যাওয়া বোনকে খুঁজে বের করার একমাত্র রাস্তা।
কিন্তু বোকা এলিজাবেথ ঘুণাক্ষরেও টের পেল না তাদের সব চাল আগেই আঁচ করে ফেলেছে রিচার্ড। পার্টির ভিড়ে এলিজাবেথের উদগ্রীব চোখ জোড়া যে আতিপাতি করে সুরাকারকেই খুঁজছিল, তা রিচার্ডের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়ায়নি। এমনকি সুরাকার যে যেকোনো মূল্যে আজ এলিজাবেথের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করবে, সেটাও তার অজানা ছিল না।
সব হিসাব কষে রিচার্ড সোজা চলে যায় প্যালেসের মনিটরিং রুমে। সিসিটিভি স্ক্রিনে চোখ রেখে দেখতে চায় সুরাকারের পরবর্তী চাল। রিচার্ড চাইলে এক মুহূর্তেই সুরাকারকে আটকে দিতে পারত কারণ তার কড়া নজরদারি আর অনুমতি ছাড়া এই সুরক্ষিত প্যালেসে একটা মশাও প্রবেশ করার দুঃসাহস রাখে না। কিন্তু সে ইচ্ছে করেই কোনো বাধা দেয়নি। সে ছক কেটেছে আরও বড় খেলায়। সুরাকারকে এগোতে দিয়ে তার প্রতিটি পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করা, যাতে এই সূত্র ধরেই সে পৌঁছে যেতে পারে নিজের আসল লক্ষ্যে।
তবে হিসাবের সমীকরণে হঠাৎ করেই গোলমাল পাকিয়ে দিল তার বউ। একমুহূর্ত ভাবল রিচার্ড, তারপর সিসিটিভি স্ক্রিনের সামনে থেকে সরে দাঁড়াল। ছায়ার মতো অনুসরণ করে ঠিক সেদিকেই পা বাড়াল, যেদিকে ইবরাতের ফোনটা হাতে নিয়ে পাগলের মতো ছুটে গেছে এলিজাবেথ।
“রেড?”
পেছন থেকে ভেসে আসা রিচার্ডের গম্ভীর কণ্ঠস্বর শোনামাত্র শিউরে উঠল এলিজাবেথ। মন্থর কিন্তু ভারী পায়ের শব্দ এগিয়ে আসছে তার দিকেই। সেই শব্দে এলিজাবেথের বুকের ভেতর বিষম কম্পন শুরু হলো। মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল তার সমস্ত চিন্তাভাবনা। হাতের মুঠোয় থাকা ফোন আর কাগজের টুকরোটা থরথর করে কাঁপছে।
কী করবে ভেবে না পেয়ে এলিজাবেথ হন্তদন্ত হয়ে চিরকুটটার দিকে শেষবারের মতো এক নজর তাকাল। মনে মনে নম্বরটা কয়েকবার আওড়ে নিয়ে, পলক ফেলার আগেই কাগজটি সোজা মুখে পুরে গিলে ফেলল! তারপর ইবরাতের ফোনটা দ্রুত লুকিয়ে ফেলল নিজের গাউনের ভাঁজে। ফোন ধরা পড়লেও অন্তত কোনো একটা বাহানা দাঁড় করানো যাবে, কিন্তু নম্বরের চিরকুট ধরা পড়লে যে সব শেষ!
রিচার্ড এসে দাঁড়াল তার মুখোমুখি। নিজের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া পুরো কাণ্ডটা দেখেও রিচার্ডের চেহারায় তার বিন্দুমাত্র আভাষ ফুটল না। শান্তভাব বজায় রেখে সে আলতো করে আঙুল দিয়ে এলিজাবেথের চোয়াল আগলে ধরল। আর্দ্র কণ্ঠে শুধাল, “এখানে কী করছ, রেড?”
ভেতরের ভয় আর অস্থিরতা সামলে নিয়ে এলিজাবেথ মুখে কৃত্রিম হাসি ফোটানোর চেষ্টা করল। গলার স্বর স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে বলল, “আসলে… হঠাৎ শরীরটা কেমন যেন খারাপ লাগছিল। তাই ভাবলাম একটু বাইরের ঠাণ্ডা বাতাসে দাঁড়াই।”
রিচার্ড এলিজাবেথের কপাল ও গলায় হাত রেখে গায়ের তাপমাত্রা মেপে নিল। তারপর বলল, “শরীর তো বেশ গরম। চলো, ম্যানশনে ফিরে যাই। ইউ নিড রেস্ট।”
রিচার্ড আর এলিজাবেথ প্যালেজ থেকে বেরিয়ে যেতেই আড়াল থেকে ওয়েটারের ছদ্মবেশে বেরিয়ে এলো সুরাকার। মাস্কের আড়ালে তার কোণে অশুভ ছায়ার মতো লেপ্টে ছিল শয়তানি হাসি। ট্রে ধরা বাঁ-হাতটা ব্যান্ডেজ করা৷ সদ্য যে কাটা গেছে, তার ব্যান্ডেজের ওপরের ছোপ ছোপ লাল র ক্তের দাগেই বোঝা যাচ্ছে!
ঘুম ভাঙতেই এলিজাবেথ দেখল পাশে রিচার্ড নেই। কাল রাতে কৌশলে ইবরাতের ফোনটা সে লুকিয়ে রেখেছিল। সকালে উঠেই নম্বরটাতে যোগাযোগের চেষ্টা করতেই বেচারির বুকটা দমে গেল, ওটা আদতে কোনো নম্বরই ছিল না৷ একটা সংখ্যা কন ছিল। হতাশায় মনটা ভার হয়ে এল এলিজাবেথের।
একরাশ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে নিচে নেমে সে সোফায় চুপচাপ বসে ছিল। সকাল থেকেই শরীরটা কেমন যেন অস্বস্তিকর লাগছে। ভেতরের নতুন জীবনটা একটু একটু করে জানান দিচ্ছে তার অস্তিত্ব। ড্রেনিং টেবিলে ফাদার প্রাতরাশ করছিলেন। রিচার্ড আর লুকাস আজ সকাল সকালই বেরিয়ে গেছে।
ইবরাত এসে এলিজাবেথের ক্লাচ ব্যাগটা তার হাতে দিল। এলিজাবেথ নিরাসক্ত ভঙ্গিতে ব্যাগটা খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো সেই বেনামী খামটা।
“এটা কোত্থেকে এলো?” কপালে ভাঁজ ফেলে বিড়বিড় করল এলিজাবেথ।
ইবরাতও বেশ উৎসুক চোখে তাকিয়ে ছিল। খামটা খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো একটা ছবি। ছবিটা দেখামাত্র এলিজাবেথের পুরো শরীর বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো শিউরে উঠল! একই ধাক্কা লাগল ইবরাতের গায়েও। সে ছোঁ মেরে এলিজাবেথের হাত থেকে ছবিটা নিতেই এলিজাবেথ সাথে সাথে তা কেড় নিল। আতঙ্কে, শোকে তার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে।
ইবরাত কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে এসে এলিজাবেথকে ছুঁতে চাইল, “ইমা… ইমাই, আমাকে ভুল বুঝিস না। ভা…ভাইয়া তোকে বলতে নিষেধ করেছিল।”
“ছুঁবি না আমাকে!” এলিজাবেথ ধাক্কা মেরে ইবরাতকে দূরে সরিয়ে দিয়ে আর্ত চিৎকার করে উঠল।
তার হাত থেকে ছিটকে মেঝেতে পড়ে গেল ছবিটা। চিৎকারের শব্দে সোফিয়া রুম থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির কাছে এসে দাঁড়াল, আর এলিজাবেথের আর্তনাদে ফাদারও ছুটে এলেন।
মেঝেতে পড়ে থাকা ছবিটায় দেখা যায় জঙ্গলের ভেজা মাটিতে র ক্তে ভেসে যাচ্ছে ইমনের নিথর দেহ। আর তার লাশটা ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে রিচার্ডের সশস্ত্র গার্ডরা।
মুহূর্তের জন্য এলিজাবেথ যেন বাকশক্তি হারিয়ে ফেলল। স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল ছবিটার দিকে। তার ছোট ভাইটার সেই উজ্জ্বল, নিষ্পাপ মুখটা আজ র ক্তে মেখে আছে। হঠাৎ কী যে হলো, সে হামাগুড়ি দিয়ে ছবিটার কাছে গেল। ছবিটা বুকের গভীরে আঁকড়ে ধরে গগনবিদারী কান্নায় ভেঙে পড়ল সে,
“আমার ভাই… আমার জানের টুকরো আর নেই! নেই…নেই.. আমার ভাই আর নেই এই পৃথিবীতে। জানোয়ারগুলো মেরে ফেলল আমার ছোট ভাইটাকে! আমার ভাই… ইমন…”
এলিজাবেথের হাহাকারে পুরো ম্যানশন থমথমে হয়ে যায়। ইবরাত আবার ছুটে গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরল, “শান্ত হ বোন, তোর শরীর ভালো না! এই অবস্থায় এভাবে ভেঙে পড়তে নেই…”
এলিজাবেথ এবারও ইবরাতকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল, “একদম ছুঁবি না আমাকে! তুইও একটা বিশ্বাসঘাতক! স্বার্থপর! শুধু এখানে পৌঁছানোর জন্য তুই আমাকে ব্যবহার করেছিস!”
এলিজাবেথের ইবরাত পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে গেল। এলিজাবেথ যেন সত্যি সত্যিই উন্মাদ হয়ে গেছে। ভাইয়ের ছবিটা বুকে চেপে ধরে সে একটানা কেঁদে যায়। ন্যাসো ওপর থেকে এই দৃশ্য দেখে তড়িঘড়ি রিচার্ডকে ফোন করল।
হঠাৎ এলিজাবেথ ছুটে গিয়ে ফাদারের জামার কলার চেপে ধরল। আকুল কণ্ঠে চিৎকার করে বলল, “কী দোষ করেছিল আমার নিষ্পাপ ভাইটা? আপনার পশুতুল্য ছেলে কেন মারল তাকে? কেন?”
এলিজাবেথের প্রশ্নে ফাদার যেন বরফের মতো জমে গেলেন। এলিজাবেথ আর কারো দিকে তাকাল না, কোনো কথা না বলে ছবিটা বুকে চেপে ছুটে ওপরে চলে গেল।
সিঁড়ি দিয়ে উঠতেই সোফিয়ার মুখোমুখি হলো সে। এলিজাবেথ থমকে দাঁড়াল। সোফিয়া তার কান্নাভেজা মুখের দিকে তাকিয়ে কপট হেসে বলল,
“এরপরও ভাইয়ের খুনির বাচ্চা পেটে ধরবে? আমি হলে তো কখনোই রাখতাম না।”
এলিজাবেথ স্তম্ভিত চোখে সোফিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। সোফিয়ার কথার গভীরতা তখনও পুরোপুরি স্পষ্ট হয়নি, যতক্ষণ না সে এলিজাবেথের দিকে একটামিসোপ্রোস্টল (গর্ভ পাত করানোর ও ষুধ) ওষুধের পাতা বাড়িয়ে দিল।
এলিজাবেথ একদৃষ্টিতে ওষুধটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার ভেতরটা তখন পুরোপুরি অবশ হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকার পর, নিজ হাতেই সে সোফিয়ার কাছ থেকে ওষুধটা তুলে নিল।
ন্যাসোর কল পেয়ে রিচার্ড যেন সম্পূর্ণ জ্ঞানশুন্য হয়ে পড়ে। সে হন্তদন্ত হয়ে পাগলের মতো ছুটে আসে ম্যানশনে। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় প্রতিটি ধাপে দম আটকে আসছিল পুরুষটার। বিড়বিড় করে তার ঠোঁট থেকে শুধু একটাই ব্যাকুল প্রার্থনা বের হচ্ছিল,
“রেড… প্লিজ রেড, আমি না আসা পর্যন্ত কোনো ভুল কোরো না। প্লিজজ….
এলিজাবেথকে রুমে না পেয়ে রিচার্ডের বুকের ভেতরটা হিম হয়ে আসে। সে উন্মাদের মতো ছুটে যায় বাথরুমের দিকে। বাথরুমের দরজায় পৌঁছাতেই থমকে দাঁড়াতে হলো তাকে
বাথটবে নিথর হয়ে শুয়ে আছে এলিজাবেথ। চোখ দু’টো খোলা, কিন্তু নির্জীব। তার বুক পর্যন্ত শরীর পানির নিচে তলিয়ে আছে। কিন্তু সেই পানি স্বচ্ছ কিংবা সাদা নয়, পুরো পানি ঘন র ক্তলাল হয়ে আছে! বাথটবের পাশে পড়ে আছে একটি মিসোপ্রোস্টল পিলের খালি পাতা।
দৃশ্যটা রিচার্ডের লৌহকঠিন শরীরের সমস্ত শক্তি শুষে নিল এক নিমিষেই। হাঁটু গেড়ে সে ধপাস করে ভেঙে পড়ল বাথরুমের হিমশীতল মেঝেতে।
Born to be villainspart 38
প্রচন্ড রকম শারিরীক দূর্বলতা এবং মানষিক অশান্তির ভেতর পর্বটা লিখেছি আজ। আজকের পর্বে তিন হাজার রিয়েক্ট না হলে এটা আর লিখবোই না। এই গল্পটা এখন আমার কুফা মনে হয়। শুরু থেকেই কত বাধাবিপত্তি আর শারিরীক অসুস্থতার মধ্যে যে যাচ্ছে এটা তা কেবল আমি জানি। তাও লিখে যাচ্ছি কেবল আপনাদের জন্যই। সকলে মন্তব্য করতে ভুলবেন না।
