Home স্নিগ্ধবিষ স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬৬

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬৬

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬৬
সানজিদা আক্তার মুন্নী

কেটে গেছে দুটো মাস। আজ নির্বাচনের দিন। মেয়রের নির্বাচন, কত প্রতীক্ষা, কত আক্ষেপ, কত রাত জাগা ভাবনার পর অবশেষে এলো এই কাঙ্ক্ষিত দিনটি। তৌসির জিতবে, এটা তো নিশ্চিত। আর যদি না-ও জেতে, ইঞ্জিনিয়ারিং করে হলেও জিতবে, সেটাও সুনিশ্চিত। মেয়রের চেয়ারটা তার হাতেই আসবে, এ নিয়ে কারো মনে কোনো সংশয় নেই। মেয়র হওয়ার পর সে ইন্ডিয়া যাবে। খলিলের সাথে হিসাবটা যে চুকাতে হবে! বহুদিনের জমে থাকা রক্তের হিসাব, বহুদিনের চাপা প্রতিশোধের আগুন, সব কিছুরই ফয়সালা হবে। বিবিজানের একটা ব্যবস্থাও করতে হবে, বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হবে। এই তিনজনের জন্য একটা মসৃণ, নিরাপদ, ঝলমলে জীবন রেখে যেতে হবে তাকে, যেখানে তাদের কোনো অভাব থাকবে না, কোনো ভয় থাকবে না।

নাজহার সাথে সম্পর্কের উন্নতি বোধহয় তার আর হবে না। অন্তত এই জীবনে তা আর সম্ভব নয়। ভাঙা কাচ যেভাবে জোড়া লাগানো যায় না, যেভাবে ঝরে যাওয়া ফুল আর ডালে ফিরে আসে না, ঠিক সেভাবেই তৌসির আর নাজহার এই সম্পর্কও আর জোড়া লাগবে না। নিজের দোষ মেনে নিয়ে তৌসির একপ্রকার হাল ছেড়ে দিয়েছে। মাঝেমধ্যে নাজহার কাছে যায় বটে, ভালোবাসার একটুখানি উত্তাপ খুঁজে পাওয়ার আশায়। নাজহা কখনো নিজেকে ছুঁতে দেয়, কখনো আবার এক ঝটকায় দূরে সরিয়ে দেয়। কখনো নীরব সম্মতি, কখনো নিঃশব্দ প্রতিবাদ। এভাবেই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে জীবন।

এখন বাজে দুপুর তিনটে। পুরো বাড়ির সবাই ফলাফলের অপেক্ষায় স্তব্ধ, থমথমে। বাইরে হালকা রোদ, ভেতরে ভারী নিস্তব্ধতা। তৌসির গোসল সেরে, খেয়েদেয়ে ঘরের বেলকনিতে বসে আছে। কপাল কুঁচকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। আকাশটা আজ পরিষ্কার, ঝকঝকে নীল, কোথাও এক টুকরো মেঘ নেই, অথচ তৌসিরের মনের আকাশে মেঘ-রোদের এক অন্যরকম খেলা চলছে।
নাজহাও বেলকনিতেই দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছে। বাচ্চারা এখন এখানে নেই, বাড়ির সবার কাছে ঘুরে ঘুরে আদর কুড়াচ্ছে। আকাশ দেখতে দেখতে সে ভাবছে, আচ্ছা, তার এই বয়সটা কি এসবের মাঝে আটকে থাকার? সত্যিই কি তাই? তার বয়স বর্তমানে মাত্র উনিশ। এখন তার ওড়ার বয়স, মুক্ত হয়ে থাকার বয়স, প্রজাপতির মতো এক ফুল থেকে আরেক ফুলে ঘুরে বেড়ানোর বয়স। নিজের একলা রঙিন আকাশ থাকার কথা, বাতাসে চুল উড়িয়ে হাসার কথা, স্বপ্ন দেখার কথা, সুখে থাকার কথা। তাহলে এই এতটুকু বয়সে তার কেন এত বিরহ, কেন এত দুঃখ, কেন এত ভার বুকে? তার বয়সী ছেলেমেয়েরা যেখানে বিন্দাস জীবন পার করছে, ক্যাম্পাসে হাসি-ঠাট্টায় মেতে আছে, ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্ন বুনছে, সেখানে আজ সে নিয়তির কাছে হেরে গেছে নিঃশব্দে। ঘৃণা, চাপা রাগ, অভিমান আর না-পাওয়া ভালোবাসার এক বুক ব্যথা নিয়ে তিন-তিনটে প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার উসিলা হয়ে বেঁচে আছে সে। জীবন বড়ই বিচিত্র, বড়ই নির্মম। নাজহার জীবন তাকে সুখ দিয়েও দিল না, বরং একটুখানি সুখের স্বাদ জিভে ছুঁইয়ে দিয়ে তার জীবন থেকে ‘সুখ’ নামক শব্দটাকেই বিষাদে পরিণত করে দিল। নিয়তি তার সাথে মন্দ খেলেনি, দুঃখে ভরিয়ে দেওয়ার কোনো অংশে কমতি রাখেনি।

বিষণ্ণ মনে আকাশের দিকে তাকিয়ে নাজহা এসবই ভাবছে। আজকাল তার আর কারো প্রতি ঘৃণা কাজ করে না। ঘৃণা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেছে সে, রাগ করতে করতে ফুরিয়ে গেছে তার ভেতরটা। এখন সে শুধু ভাবে, এসব কিছু তাকে প্রতিনিয়ত ভাবায়। কেমন করে যে ভাবায়, তা কাউকে বোঝানোর সাধ্য তার নেই। মাথার ভেতরটা কখনো ঝড়ের মতো এলোমেলো, কখনো আবার শশ্মানের মতো নিস্তব্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেলকনি থেকে ঘরের দিকে ফেরে নাজহা। পায়ের নিচে মেঝের ঠান্ডা স্পর্শ অবিকল তার ভেতরের উত্তাপকে আরও চেপে ধরে।

তৌসির চুপ করে বসেই থাকে। সে এখন বুঝতে পারে নাজহার অবস্থা। এতটুকু বয়সে এত বড় ঝড় সামলে নেওয়া কারো পক্ষেই সম্ভব না। সবাই তো আর তৌসির নয়, যে ভেতরে ক্ষত লুকিয়ে বিন্দাস হয়ে ঘুরে বেড়াবে, যে অন্তর রক্তক্ষরণ ঢেকে রেখে মুখে হাসি ফোটাবে, সবাই তৌসির না। প্রতিটা মানুষের সহ্যক্ষমতা আলাদা, প্রতিটা মানুষের কাঁধের জোর আলাদা। নাজহার কাঁধ এখনো এত ভার বহন করার মতো শক্ত হয়নি।
তৌসির অনেকক্ষণ বসে থেকে উঠে ঘরে আসে। নাজহা বাচ্চাদের ঘরে নিয়ে এসেছে। তিনজনই সজাগ, চোখ পিটপিট করে চারপাশ দেখছে। তাদের বয়স এখন তিন মাস দশ দিন। একেকজন বেশ গোলুমুলু হয়েছে, গালে-হাতে-পায়ে চর্বির ভাঁজ, সাথে ভীষণ সুন্দর, কারোর দিক থেকেই চোখ ফেরানো সম্ভব নয়। মনে হচ্ছে তিনটে ছোট্ট চাঁদ পাশাপাশি বিছানার ওপর শুয়ে আছে। নাজহা মেয়ের নখ কেটে দিচ্ছে সাবধানে, খুব যত্নে, যাতে ছোট্ট আঙুলে একটুও আঁচড় না লাগে। আর মেয়েটা মায়ের এই মনোযোগে খিলখিল করে হাসছে, দুই পা নাড়িয়ে বাতাসে কী একটা লিখছে। তৌসির ঘরে এসে চুপচাপ বিছানার কোণে গিয়ে বসে। কিছুক্ষণ ওদের দেখে, তারপর নাজহাকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করে,

“তালুকদার বাড়িতে যাবে তোমরা? তোমার বাবা বারবার বলছেন যাতে নিয়ে যাই তোমাদের। আগামীকাল সময় আছে, যাওয়ার হলে রেডি থেকো।”
নাজহা এটা শুনে স্থির হয়ে যায়। হাতের নেইল কাটারটা থমকে যায় মেয়ের ছোট্ট আঙুলের কাছে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে মলিন ও ক্ষুণ্ণ কণ্ঠে বলে,
“না, যাব না আমি।”
তৌসির এতে বেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
“ক্যান? কয়দিন আগেও তো যাওয়ার জন্য মরিয়া ছিলি, এখন না করস ক্যান?”
নাজহা তৌসিরের দিকে একপলক তাকায়, সেই দৃষ্টিতে অজস্র না-বলা কথার ভার। তারপর চোখ সরিয়ে নিয়ে বলে,

“এখন ইচ্ছে নেই, তাই যাব না। আপনাকে কৈফিয়ত দেওয়ার কোনো কারণ দেখছি না।”
তৌসির তিক্ত গলায় বিরক্তি নিয়ে বলে,
“এই ছিনাল কথাবার্তা কস ক্যান? সুন্দর করে কথা বলা যায় না?”
নাজহা তৌসিরের দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বলে,
“মুখ সামলে কথা বলুন। আমার সাথে গালাগালি করবেন না।”
তৌসির নাজহার দিকে এগিয়ে আসে। ওর দিকে ঝুঁকে, চোখে চোখ রেখে, নিচু কিন্তু ধারালো গলায় বলে,
“করমু। আমার বউ তুই। আর আমি আমার বউয়ের সাথে যেমনে মন ধরে, ওমনেই কথা কমু।”
নাজহা এ কথা শুনে কঠিন দৃষ্টিতে তৌসিরের দিকে তাকায়। সেই দৃষ্টিতে আগুন আছে, বরফও আছে, আছে ঘৃণার তীক্ষ্ণতা, আবার ক্লান্তির নীরবতা। এরপর আর কিছু না বলে উঠে দাঁড়ায় সে। সে জানে, এই লোকের সাথে তর্ক করে সময় নষ্ট করে লাভ নেই। কথা কাটাকাটিতে সে জিততে পারবে না, আর জিতলেই কি লাভ হবে? উঠতে উঠতে নাজহা বলে,

“ওদেরকে দেখুন। আমি গোসল করিনি এখনো, গোসল করে আসছি।”
তৌসির মাথা নাড়িয়ে বলে,
“আচ্ছা।”
কাপড় নিয়ে নাজহা ওয়াশরুমে চলে যায়।
তৌসির নিজের সন্তানদের কাছে এসে নাওয়াব আর তুরাবকে কোলে তুলে নেয়। দুজনের গালে গাঢ় করে চুমু খায়, একবার নয়, বারবার, তার মনে হয় সমস্ত দুনিয়ার শূন্যতা এই দুই ছোট্ট গালে চুমু দিয়ে ভরিয়ে ফেলবে। আহা, কতদিনের আক্ষেপ! যদিও মাঝেমধ্যে এখন কোলে নিতে পারে ওদের, তবু প্রতিবারই মনে হয় প্রথমবার। এই ছোট্ট দুটো প্রাণ তার বুকের ভেতরটা ভীষণ নরম করে দেয়, বাইরের দুনিয়ার সব হিসাব-নিকাশ, সব ক্ষোভ, সব ক্রোধ, সব হিংসা ওদের মুখের দিকে তাকালেই মুহূর্তে গলে জল হয়ে যায়। নাওয়াবের গালটা সদ্য বানানো নরম রুটির মতো তুলতুলে, চুমু দিলে মুখে মিষ্টি একটা ঘ্রাণ পায় তৌসির, শিশুর মায়ের দুধ আর নরম চুলের মিশেলে এই স্বর্গীয় সুবাস, যা পৃথিবীর কোনো সুগন্ধির সাথে তুলনীয় নয়, যা শুধুমাত্র একজন বাবাই চিনতে পারে।

ওদের দেখে তওশিও নিজের হাত পা নাড়তে থাকে, যাতে বাবা যাতে তাকেও কোলে নেয়। ছোট্ট ঠোঁট দুটো ফুলিয়ে কেমন এক অভিমানী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বাবার দিকে। মেয়েটার এই হাত পা নাড়ানোর দৃশ্যে তৌসিরের মৃদু হাসে। ছোট্ট একটা শিশু বাবার ভালোবাসা কেড়ে নেওয়ার জন্য কতটা চেষ্টা করতে পারে, তা আজ তৌসির নিজ চোখে দেখছে। তার বুকের ভেতরে কেমন একটা মায়ার জোয়ার বয়ে যায়। সে খালি গলায় বলে,

“আরে আমার মা, তুমি কাড়াকাড়িতে কেন পড়লা? আসো, বাবার বুকে আসো!”
তৌসির ছেলেমেয়ে তিনজনের মাঝখানে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে। নাওয়াবকে ডান দিকে রাখে, তুরাবকে বাঁ দিকে, আর তওশিকে বুকের ওপর রেখে নিশ্চিন্তে শুয়ে পড়ে। তিনটা প্রাণের ওজনে তার বুক চাপা পড়ে গেলেও এ চাপ তাকে ভারী লাগে না, বরং মনে হয়, এই বোঝাই তার জীবনের সবচেয়ে মিষ্টি বোঝা, সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ভার। এই ভার সে বয়ে বেড়াতে চায় সারাজীবন, নিজের শেষ নিঃশ্বাস অবধি।
তৌসির এখন খালি গায়ে। তওশি ওর বুকে এদিকে ওদিকে নড়ে মায়ের দুধ খুঁজছে। ছোট্ট মাথাটা এদিক ওদিক ঘোরাচ্ছে, ঠোঁট বাড়াচ্ছে, খোঁজার সে কী আকুতি! তৌসির এটা বুঝতে পেরে হাসতে হাসতে বলে,
“যা খুঁজছো, তা দেওয়ার সাধ্য একমাত্র তোমার মায়েরই আছে মা, আমার নেই।”
তওশি ছোট্ট হাতের আঙুলে টেনে ধরে বাবার উন্মুক্ত বুকের লোম। সেই টানে তৌসিরের ব্যথা পাওয়ার কথা, কিন্তু বিস্ময়করভাবে সে ব্যথাও তার ভালো লাগছে। নাওয়াব আর তুরাব গড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না, তাই শুধু হাত আর পা নাড়াচ্ছে, তারা ছোট্ট মুখে কেমন এক গোঙানির সুর তুলছে। কেউ কাঁদছে না। বাবার উষ্ণতা পেয়ে সবাই ভিন্নরকম এক আনন্দ অনুভব করছে, এমন এক তৃপ্তি যা মায়ের কোলে পাওয়া তৃপ্তির চেয়ে হয়তো আলাদা, কিন্তু কোনো অংশে কম নয়।

তৌসির ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবে, এই তিনটা মুখই তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি, সবচেয়ে বড় অর্জন। আজ সে নির্বাচন জিতুক আর হারুক, মেয়র হউক আর না-ই হউক, এই তিনজন তার কাছে পৃথিবীর সমস্ত সিংহাসনের চেয়েও বড়, সমস্ত ক্ষমতার চেয়েও দামি। সে নিজের মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, এই তিনজনের মাথার ওপর কোনোমতেই কোনো কালো ছায়া না পড়ে। বাবা হিসেবে তার জীবনে যা পাওয়ার ছিল, যা হারিয়েছে, তার প্রতিটা অভাব ওরা যাতে দ্বিগুণ ভালোবাসা পেয়ে পূরণ করে ফেলতে পারে। ওরা যাতে কোনোদিন না বলে, “বাবা ছিল না।” ওরা যাতে বলে, “বাবা ছিল, আকাশের মতো ছিল, ছাদের মতো ছিল।”

নাওয়াব হঠাৎ বাবার গালে নিজের ছোট্ট হাতটা রাখে। সেই স্পর্শে তৌসিরের গোটা শরীরে কেমন একটা শিরশিরে অনুভূতি বয়ে যায়, বৈদ্যুতিক এক শিহরণের মতো। তিন মাসের একটা শিশুর হাত, কোমল, তৃপ্ত, নিরাপদ, এই হাতই ঠিক বলে দিচ্ছে, “বাবা, আমরা আছি তো। তুমি একা না।” সেই না-বলা ভাষা তৌসির স্পষ্ট শুনতে পায় বুকের ভেতরে। তৌসির আর নিজেকে সামলাতে পারে না। তার চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে, গড়িয়ে পড়ে নাওয়াবের ছোট্ট আঙুলের ওপর। বাবার চোখের পানি দেখে তুরাব খানিকটা থতমত খেয়ে তাকিয়ে থাকে, ও বোধহয় বুঝতে পারছে, এই লোকটার চোখের পানিতে কোনো দুঃখ নেই, আছে শুধু আনন্দ, প্রচুর আনন্দ, বুক ভরা তৃপ্ত।

তৌসির চোখ মুছে একে একে তিনজনের কপালে চুমু দেয়। ফিসফিস করে, কিন্তু স্পষ্ট উচ্চারণে বলে,
“ওরে আমার জানের টুকরাগুলো! তোরা তিনজন যেদিন হাঁটতে শিখবি, সেদিন বাবার হাত ধরে হাঁটবি। বাবার সামনে দাঁড়িয়ে তোদের কোনো কিছুর অভাব বলতে হবে না রে, বাবা আছে, বাবা থাকবে।”
ওরা কিছুই বোঝে না, তবু বাবার গলার আওয়াজ শুনে তিনজনই তাকিয়ে থাকে তৌসিরের দিকে। ছোট্ট চোখগুলো মনে হয় গিলে নিচ্ছে বাবার প্রতিটা শব্দ। মনে হয়, ওরা আসলেই বুঝতে পারছে, এই কণ্ঠস্বরটাই ওদের পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ ঠিকানা, সবচেয়ে বিশ্বস্ত আশ্রয়।

গোসল শেষে নাজহা বেরিয়ে আসে, এসে বিছানার পাশে দাঁড়ায়। দূর থেকে দৃশ্যটা দেখে তার বুকের ভেতরটা কেমন একটা মোচড় দিয়ে ওঠে, দমটা ঠিক এক মুহূর্তের জন্য আটকে যায়। খালি গায়ে শুয়ে থাকা তৌসির, আর তার চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তিনটা ছোট্ট প্রাণ, এই দৃশ্যটা দেখে তার চোখে কোনোদিন দেখা তিক্ততা নেই। শুধু আছে এক গভীর অবিচ্ছেদ্য দুঃখ, যা ভাষায় বোঝানো যায় না।
নাজহার পরনে একটা কালো কুর্তি। ভেজা লালচে-কালো কেশতরঙ্গ থেকে টুপটুপ করে পানি ঝরে পড়ছে কাঁধে, পিঠে, কুর্তির কালো কাপড় সেই পানিতে আরও গাঢ় হয়ে উঠছে। তার গোলাপি অধরে লেগে আছে পানির ফোঁটা, অবিকল গোলাপের পাপড়িতে জমে থাকা শিশিরবিন্দুর মতো। তাকে দেখে সদ্য ফোটা একটি ফুলের মতো মনে হচ্ছে। তৌসির একদৃষ্টে নাজহার দিকে তাকিয়ে থাকে। সে শুনেছে মাতৃত্ব নাকি সৌন্দর্য নষ্ট করে দেয়, শরীরের রেখা এলোমেলো করে দেয়, চোখের নিচে ছায়া ফেলে দেয়, কিন্তু নাজহার বেলায় তা বোধহয় উল্টো হয়েছে। তার সৌন্দর্য কমেনি, বরং আরো বেড়ে উঠেছে, আরো গভীর হয়েছে, আরো পূর্ণতা পেয়েছে। মনে হয় কাঁচা ফুলের সৌন্দর্য এখন পাকা ফুলের মাদকতায় রূপ নিয়েছে। তৌসিরের এই দৃষ্টি দেখে নাজহা বুঝে যায় সে কেন এভাবে তাকাচ্ছে। সে তৌসিরের দিকে ঝুঁকে বুক থেকে মেয়েকে নিজের কোলে তুলে নেয়। নাজহা ঝুঁকে পড়ার সময় তার চুল থেকে ঝরে পড়া কয়েক ফোঁটা পানি তৌসিরের বুকে গিয়ে পড়ে। তৌসির চোখ বুজে নাজহার শরীরের ঘ্রাণ নেয়, সদ্য গোসল সেরে আসা এক নারীর সাবান আর শ্যাম্পুর মিশ্র সুবাস, যা তার মাথায় নেশার মতো ঘুরপাক খেতে থাকে। নাজহা মেয়েকে কোলে নিতে নিতে কপাল কুঁচকে তৌসিরকে বলে,

“এত নাটক না করে উঠুন। ওদের নিয়ে বাইরে যান। আমি মেয়েকে খাইয়ে একটু ঘুমাবো।”
তৌসির এ কথা শুনে কপাল কুঁচকে বলে,
“ক্যান? আমরা বাপ-ছেলেরা বাইরে যাব ক্যান? আমরাও ঘুমাবো।”
নাজহা রাগী চোখে তৌসিরের দিকে তাকায়।ওর এই দৃষ্টিতে এমন কিছু আছে যা কথায় বলা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়। ওর এমন তাকানো দেখে তৌসির আর কোনো কথা না বাড়িয়ে দুই ছেলেকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। এদের ঘুম কম, নিজেরাও ঘুমায় না, নাজহাকেও ঘুমাতে দেয় না। সারাদিন সারারাত কেমন এক নাচানাচি চলে ওদের। আবার যতক্ষণ মায়ের কোলে থাকবে, ততক্ষণ ঠিকই ঘুমাবে, মায়ের বুকের ধুকপুকানিতে নিশ্চিতভাবে তাদের ঘুমের দোলনা লুকিয়ে আছে। কিন্তু তিনজনকে একসাথে নিয়ে ঘুমানো নাজহার পক্ষে সম্ভব নয়। দুই হাতে দুইজনকে সামলানো যায়, তৃতীয়জন কোথায় যাবে? তাই ছেলেদের তৌসিরের কাছে দিয়ে, মেয়েকে নিয়ে সে একটু কাত হবে এখন, একটু জিরিয়ে নেবে ক্লান্ত শরীরটাকে।
তৌসির নাজহার খেয়াল রাখে। এমন করে, এমন গভীরভাবে, এমন নিঃশব্দে, যে নাজহা না চাইতেও তা বুঝে ফেলে। তিনটে ছোট্ট প্রাণকে একসাথে সামলানো, এ কি সত্যিই মুখের কথা? এটি আসলেই এক নীরব যুদ্ধ, যে যুদ্ধে দু’টি মানুষ প্রতি রাতে পরস্পরের হাত ধরে জিতে চলে, কোনো ঢাক ঢোল ছাড়াই, কোনো প্রশংসার আশা ছাড়াই। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে বাচ্চাদের কেউ যদি হঠাৎ কেঁদে ওঠে, তখন তৌসিরও সঙ্গে সঙ্গে ধড়মড়িয়ে উঠে বসে। ঘুম জড়ানো লাল চোখে সে তাকায় তাদের দিকে। বাচ্চাটাকে বুকে তুলে নেয় সে, আলতো হাতে পিঠে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে সামলে নেয়। কখনো নিচু গলায় গুনগুন করে ওঠে কোনো পুরনো ঘুমপাড়ানি সুর। নাজহার ঘুম ভাঙ্গলে নাজহার দিকে তাকিয়ে সে ফিসফিস করে বলে,

“তুই ঘুমা, আমি ওদের দেখে নিব।”
এই কণ্ঠস্বরে তখন এত মায়া, এত আশ্বাস, এত ভালোবাসা মিশে থাকে, নাজহার বুকের ভেতরটা অভাবনীয় এক আবেগে কেঁপে ওঠে। কিন্তু নাজহা তৌসিরের সেই কথায় খুব একটা পাত্তা দেয় না। তার কাছে নিজে হাতে বাচ্চাদের সামলে নেওয়াটাই এক অন্যরকম প্রশান্তি। যে প্রশান্তির নাম হয়তো ভালোবাসা, হয়তো মাতৃত্ব, হয়তো ওই মানুষটার জন্য না-বলা কৃতজ্ঞতা। তিনটে অনুভূতি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে তার বুকের ভেতর। আর রাতের বেলায় বাচ্চাদের সামলানোর তো একটাই সহজ উপায় হলো মায়ের বুকের দুধ। ওই এক ফোঁটা তরল ভালোবাসাই নিশ্চিতভাবে সব কান্না থামিয়ে দেয়, সব অস্থিরতা ঘুম পাড়িয়ে দেয়। নাজহা কখনো সরাসরি বলে উঠতে পারে না
“আপনি তো সারাটা দিন কত পরিশ্রম করেন, ক্লান্ত শরীরটাকে একটু বিশ্রাম দিন, আর কষ্ট করতে হবে না, আমি সামলে নিব ওদের।”

কথাগুলো ঠোঁটের কোণে এসেও থমকে যায়, গলার কাছে এসে দলা পাকিয়ে থাকে।ঘুমানোর সময় মেয়ে কে বুকে জড়িয়ে সে আলতো করে তুলে দেয় তৌসিরের প্রশস্ত বুকের ওপর। আর মেয়েও ঠিকই জানে, বাবার বুকই তার সবচেয়ে নিরাপদ ঠিকানা, পৃথিবীর সবচেয়ে উষ্ণ আশ্রয়। ছোট্ট মাথাটা রেখে বাবার বুকে সারারাত বেঘোরে, নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকে সে। ওইটুকু ছোট্ট শরীর তৌসিরের বুকের ওঠা নামার তালে তালে দোল খায়।রাতে মাঝেমধ্যে যখন মেয়ের ঘুম ভাঙে, তার ছোট্ট নড়াচড়াতেই তৌসির টের পেয়ে যায়। নিঃশব্দে উঠে আসে সে, মেয়েকে আলতো করে নাজহার কোলে দিয়ে দেয়, মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে দামি রত্নটা সে সঙ্গোপনে হাতবদল করছে। নাজহা বুকে জড়িয়ে দুধ খাইয়ে দেয় তার আদরের ছোট্ট পরীটাকে। মেয়ের ছোট্ট হাতটা মায়ের বুকের ওপর রাখা, চোখ আধবোজা। খাওয়া শেষ হলে তৌসির আবার মেয়েকে বুকে টেনে নেয়, চোখ বুজে ঘুমিয়ে পড়ে, ঠিক পৃথিবীর সবচেয়ে দামি সম্পদটাকে বুকে আগলে রাখতে বসেছে সে। আর নাজহা বালিশে মাথা রেখে তাকিয়ে থাকে সেই দৃশ্যের দিকে। অপলক, মুগ্ধ, তৃপ্ত। এভাবেই কথা না বলা ভালোবাসায়, না দেখানো যত্নে, চোখের ভাষায় বলা হাজারটা “ভালোবাসি”তে চলে যাচ্ছে তাদের ছোট্ট সংসার। বাইরে থেকে দেখলে হয়তো মনে হবে সাদামাটা এক জীবন।
হয়তো এটাই জান্নাতি সংসার, যেখানে ভালোবাসা কথা বলে না, শুধু বেঁচে থাকে। প্রতিটা নিঃশ্বাসে, প্রতিটা স্পর্শে, প্রতিটা মৌন যত্নে।

আসরের পর,,,,,,
‎বাড়ি হতে বেরিয়ে কুঠিরের দিকে পা বাড়ায় তৌসির। কুঠিরের সামনের খোলা জায়গাটায় কয়েকটা প্লাস্টিকের চেয়ার এলোমেলোভাবে পাতা আছে। সেখানে বসেই জমে ওঠেছে আড্ডা। রুদ্র, নুহমান, কেরামত ও নাযেম সবাই আজ বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছে। কারও হাতে চায়ের কাপ, কেউ আবার ফোনে চোখ রেখে খবর ঘাঁটছে। তাদের মুখের ভাবে আছে স্বস্তি, সাম্প্রতিক খবরগুলো তাদের মনমতোই আসছে। সব কটি কেন্দ্রেই তৌসিরের অবস্থান নাকি বেশ শক্ত। তার ওপর এলাকায় ছাত্রদলের আধিপত্যও মন্দ নয়। প্রয়োজন পড়লে তারা ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ করে নেবে নিয়ে জিতে যাবে সমস্যা কি। তাই আপাতত কারও চোখেমুখে দুশ্চিন্তার ছাপ নেই।
তৌসির ধীর পায়ে এসে নিজের একটা চেয়ারে বসে। বসার আগে একবার চারপাশে চোখ বুলিয়ে নেয় সে। তারপর গলা নিচু করে জিজ্ঞেস করে, “কিরে, ওদিকের খবরাখবর কী?”

‎রুদ্র ঠোঁটজোড়া চওড়া করে হেসে বলে, “সব ভালাই, ভাই। মানুষজনও তো বেশ সাড়া দিতাছে। চিন্তার কিছু নাই।”
‎কেরামত মাথা নেড়ে রুদ্রের কথায় সায় দেয়। তার চোখেমুখেও স্পষ্ট আগাম জয়ের উচ্ছ্বাস। ঠিক তখনই নাযেম নিজের ফোনের পর্দা থেকে চোখ না সরিয়েই নিউজ স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ বলে ওঠে, “এই দ্যাখ, আজ টাউনে একটা মাইয়া রেপ হইছে। এইটা নিয়া আবার ব্যাপক মিছিল-টিছিল শুরু হইছে।”
‎কথাটা বলার সময় নাযেমের গলায় বিশেষ কোনো আবেগর দেখা মিলে, ঠিক প্রতিদিনের আর দশটা খবরের মতোই একটি খবর এটি তার কাছে। কিন্তু কথাটা বাতাসে ছড়িয়ে পড়তেই আড্ডার ভেতরের হালকা হাসি কিছুটা থেমে যায়। তৌসির কিছু বলার আগেই নুহমান ঠোঁট বাঁকিয়ে ফোড়ন কাটে, “কয়দিন পরপরই তো আজকাল এইসব কাহিনি হয়। আসলে মাইয়ারা আজকাল একটু বেশিই স্মার্ট হইয়া গেছে অশ্লীল কাপড় চোপড় পড়ে কি থাইকা কি করে!”

বাক্যটা শেষ হতেই তৌসিরের মুখের রেখা বদলে যায়। এতক্ষণ যে তৌসির শান্ত হয়ে সবার কথা শুনছিল, এখন তার চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। চোখে জমে চাপা ক্রোধ। সে কয়েক মুহূর্ত নুহমানের দিকে স্থির তাকিয়ে থাকে, তার ভাবখানা এমন যে সে কথাগুলো ঠিকমতো বিশ্বাস করতে পারছে না।
‎তারপর তৌসির বেশ তীব্র আর তিক্ত গলায় বলে, “আরে, রাখ তোর এইসব সাউয়া মার্কা কথা! একটা মেয়ে ওয়েস্টার্ন ড্রেস পরে বাইরে গেলে তাতে তার দোষ কোথায়? এটা তার চয়েস, সে কী পরব, কীভাবে চলব, সেটা তার নিজের ব্যাপার। কিন্তু কাপুরুষদের ক্যান তার দিকে নোংরা চোখে তাকাইতে হবে? ক্যান তার ইজ্জত নিতে হবে? বুঝছস নুহমান, সমস্যা মাইয়াদের পোশাকে না; সমস্যা আমাদের সমাজের মাইনষের নোংরা মানসিকতায়।”

‎তৌসিরের কণ্ঠে এমন এক তীক্ষ্ণতা আছে যে, কেউ আর সঙ্গে সঙ্গে কোনো কথা বলতে পারে না। নুহমানের মুখের হাসি মিলিয়ে যায়। রুদ্র নিচের দিকে তাকায়, কেরামত অস্বস্তিতে চেয়ার নাড়ায়। বাগানের বাতাসও হঠাৎ থমকে যায়,
‎কিছুক্ষণ পর নাযেম গলা খাঁকারি দিয়ে ধীরে বলে, “ঠিকই কইছস ।”

‎অন্যরাও মলিন কণ্ঠে সায় দেয়। কিন্তু তৌসিরের চোখে এখনও সেই অস্থিরতা। মনে হয় এই কথাটা শুধু একটি সংবাদকে ঘিরে নয়, তার বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা বহু দিনের ভয়, অসহায়তা আর ক্ষোভকে একসঙ্গে নাড়িয়ে দিচ্ছে। সে মাথা একটু নিচু করে। তারপর বুকের গভীর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে আক্ষেপমাখা কণ্ঠে বলে সে বলে, “আল্লাহ আমারে মেয়ের বাপ বানাইলো, আমার কোলেও একটা ফুল দিল। এই কুকর্মের দেশে আমি এই ফুলটারে কেমনে আগলাইয়া রাখমু, এখন সারাক্ষণ এই চিন্তাই করি রে। মেয়ের বাপ হওয়ার আগে নারীদের প্রতি ধারণা একরকম থাকে, আর বাপ হওয়ার পর সেটা একদম বদলাইয়া যায়। মেয়ের বাপ হইয়া বুঝলাম, দুনিয়াতে মেয়ে সন্তানের চেয়ে সুন্দর উপহার আর কিছুই হয় না।”

‎কথাগুলো বলতে বলতে তার গলা ভারী হয়ে আসে। তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে তার ছোট্ট মেয়েটার মুখ, নিষ্পাপ হাসি, ছোট ছোট হাত। সেই ভাবনাই তৌসিরকে এক মুহূর্তে শক্ত মানুষ থেকে ভীষণ অসহায় এক বাবায় পরিণত করে।
‎তৌসির আর কিছু বলে না। বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টটাকে দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে বাইরে বের করে দেয়। এই দীর্ঘশ্বাসে আছে ভয়, ভালোবাসা, অনুশোচনা আর এমন এক অনিশ্চয়তা, যার কোনো সহজ উত্তর নেই। পরিবেশটা ক্রমেই ভারী হয়ে উঠছে। সবাই যে যার মতো করে চুপ হয়ে আছে। সেই নীরবতার মাঝেই রুদ্র একটু ইতস্তত করে তৌসিরের দিকে তাকায়। তার চোখে কৌতূহলের চেয়ে উদ্বেগই বেশি। ধীরে ধীরে সে জিজ্ঞেস করে, “আচ্ছা তৌসির ভাই ভাবির লগে কি সব ঠিক হইছে তোমার?”

‎প্রশ্নটা শুনে তৌসিরের মুখে এক অচেনা ছায়া নেমে আসে। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। দূরের কুঠিরের গেটের দিকে তাকিয়ে থাকে, সম্ভবত সেখানে হারিয়ে যাওয়া কোনো উত্তর খুঁজছে। তারপর খুব নিচু, মলিন গলায় বলে, “ওর চোখের সামনে ওর বাপের মতো চাচারে মাইরা ফেলছি আমি। ও কি আর কোনোদিন আমারে মাইনা নিব? আমি চাইও না সে আমারে মাফ করুক, মাইনা নিক। আমার একটাই চাওয়া, আমার তিনটা বাচ্চারে সে বড় করুক। আমাকে ঘেন্না করুক, তবু আমার সাথেই থাকুক।”

‎শেষ কথাটা বলতে গিয়ে তার গলা কেঁপে ওঠে কি না, তা কেউ নিশ্চিত বুঝতে পারে না। তবে সবাই বোঝে, তৌসিরের ভেতরে এমন এক ভাঙন আছে, যার শব্দ বাইরে থেকে শোনা যায় না। তৌসিরের কথা শুনে নাযেম বিরক্তিতে গালি দিয়ে ওঠে, “তুই হইলি একটা আস্ত বাইনচু***দ শালা, সব জেনেশুনে করবি না? নিজের সুখের সংসারে নিজেই আগুন লাগাইলি।”

তৌসির কোনো জবাব দেয় না এ কথার। কিছু প্রশ্নের জবাব থাকে না, কারণ জবাব দিলেও অপরাধের ভার কমে না, ভাঙা সম্পর্ক জোড়া লাগে না, এমনকি হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাস ফিরে আসে না। সে আনমনে ঠোঁটের কোণে একটুখানি ম্লান হাসি ফুটিয়ে মাথা নিচু করে নেয়। তার বলার মতো আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। এটাই তো সবচেয়ে বড় সত্যি।
এদিকে পাটোয়ারি বাড়ির দৃশ্য আজ বেশ সরগরম। তৃষ্ণার সৎ বোনের বিয়ে আগামীকাল। তাই ওকে নিতে ওর বাবা এসেছিলেন। তার হাতে সাদা কাগজে মোড়ানো এক প্যাকেট মিষ্টি, গায়ে সদ্য ইস্ত্রি করা ধবধবে পাঞ্জাবি। বাহ্যিক পরিপাটির আড়ালে কিন্তু তাঁর চোখেমুখে লেপ্টে থাকে চিরচেনা এক ব্যস্ততার ছায়া, যা দেখে সহজেই অনুমান করা যায়, মানুষটা আসলে আসতে চান না, আসেন দায়ে পড়ে।
মুখে বলেন ছোট মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান, ঘরভরা কাজের চাপ, তাই দুদিনের জন্য তৃষ্ণাকে নিতে এসেছেন। কিন্তু মনের গভীরে কথাটা থাকে অন্যরকম, বড় মেয়েটাকে দিয়ে খাটিয়ে নেওয়া ছাড়া উপায় কী। তখন ওয়াসেম বাড়িতে নেই। ভোরের আলো ফোটার আগেই সে বেরিয়েছে মাছের বাজারের উদ্দেশ্যে। সিজুতা বেগমের ধারণায়, ছেলের এই নতুন বউয়ের প্রতি কোনো টান নেই, বিয়েটা তাঁর চোখে শুধু কাগজে-কলমে সইয়ের এক নিছক আনুষ্ঠানিকতা। সেই সরল বিশ্বাসের উপর ভর করেই তিনি বিনা দ্বিধায়, বিনা কুণ্ঠায় সিদ্ধান্তটা জানিয়ে দেন তৃষ্ণা কে,

“যাও তুমি। দুদিন থেকে এসো। এত বড় বাড়িতে তোমাকে ছাড়া কাজ চলবে না, এমন তো নয়।”
তৃষ্ণা যেতে চায় না। ঘরের কোণে সিঁটিয়ে দাঁড়িয়ে আঁচলের ভাঁজে আঙুল গুঁজে সে ফিসফিস করে বলে,
“মা উনি যদি বাড়ি ফিরে আমাকে না পান? একবার জিজ্ঞেস করে নিই না? উনি ফিরুক, তারপর…
কিন্তু তার এই ভীরু কণ্ঠস্বর কারও কানে ঢোকে না। ইব্রাহিম সাহেবও শাশুড়ির সুরে সুর মেলান। প্রায় ঠেলে-ঠুলেই তাকে তুলে দেওয়া হয় বাবার নিয়ে আসা সিএনজিতে। উঠান পেরোনোর সময় তৃষ্ণা একবার পেছনে ফিরে তাকায় দোতলার সেই খোলা জানালার দিকে। মনে হয়, জানালাটা ঠিক তাকে কিছু বলতে চাইছে, আর সেই বার্তার পাঠ শেষ হওয়ার আগেই সিএনজি বাঁক নিয়ে চোখের আড়ালে হারিয়ে যায় রাস্তার মোড়ে।

তারা চলে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়ি ফেরে ওয়াসেম।
চৌকাঠে চপ্পল খুলতে খুলতেই তার বুকের ভেতর কেমন একটা অচেনা শূন্যতা টের পায় সে। রান্নাঘরে কড়াইয়ের ছ্যাঁৎছ্যাঁৎ নেই, ঘরের কোণে সেই মৃদু পদধ্বনি নেই, যেটা শুনতে শুনতে এই কদিনে সে নিজের অজান্তেই অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।
বসার ঘরে ঢুকে মাকে সামনে পেয়ে সে বলে,
“মা, তৃষ্ণা কোথায়? চা দিতে বলো ওকে।”
সিজুতা একটু থমকান। তারপর গোপনীয়তার সুরে গলাটা নামিয়ে বলেন,
“ওর বাবা এসেছিলেন। ওদের ছোট মেয়ের বিয়ে তো, দুদিনের জন্য নিয়ে গেছেন। তুই তো বাজারে ছিলি, ভাবলাম…”
কথাটা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই ওয়াসেমের চোখ দুটো অগ্নিবর্ণ ধারণ করে। গলার শিরা টানটান হয়ে ফুলে ওঠে, মুখমণ্ডল কঠিন পাথরের মতো শক্ত হয়ে ওঠে, সেই পাথর ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে গরম লাভা,
“কী?! কার অনুমতিতে? আমি বাড়িতে নেই বলে আমার স্ত্রীকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো? এই বাড়িতে আমি তাহলে কী, পোষা কুকুর, যার কিছু জানার দরকার নেই?!”
সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে দাঁত চেপে সে ছুড়ে দেয় শেষ হুংকারটা,
“ওর ঠ্যাং কেটে আজ ল্যাংড়া বানিয়ে নিয়ে আসব! একটু ভালো ব্যবহার করি বলে একেবারে মাথায় উঠে গেছে!”

রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ওয়াসেম পৌঁছায় তৃষ্ণাদের গ্রামের বাড়িতে। বিয়ের সাজসজ্জা দেখে বোঝাই যায়, এখানে উৎসবের আয়োজন তুঙ্গে। কিন্তু জামাই হিসেবে শ্বশুরবাড়িতে এটাই তার প্রথম পদার্পণ, আর সেই আগমনের আবহে উৎসবের রং নেই, বরং তা আদতে এক আসন্ন যুদ্ধক্ষেত্রের নীরব উত্তাপ।
দুর্ভাগ্যবশত, তৃষ্ণার সৎ মা সেই খবর জানেন না। দরজায় জামাইকে দেখে তিনি মুহূর্তে চেহারা পাল্টে ফেলেন। মুখে টেনে তোলেন দুধ-সাদা এক নিষ্পাপ হাসি, গলায় ঢালেন মধুর ঢেউ,
“এসো বাবা, এসো! ভেতরে এসো! আজ তোমার আসার কথা তো কেউ জানতাম না। তৃষ্ণা তো কিছু জানায়নি।”

ভালো মানুষের মুখোশ পরতে তাঁর এক পলকও লাগে না। নাস্তা, শরবত, সিঙ্গাড়া, মিষ্টি, একের পর এক থালা এসে সাজিয়ে দেন ওয়াসেমের সামনে। মনে হয়, এই আপ্যায়নের সুবাসেই ঢেকে যাবে বাড়িটার আসল রূপ।
আর ওয়াসেম? সে পড়ে যায় মহাসংকটে। ভেতরে রাগের দাবানল দাউদাউ করে জ্বলছে, আর সেই আগুনে জল ঢালার মতো হাজির হচ্ছে সম্মানের এই একের পর এক প্লেট। উঠে দাঁড়ানোরও উপায় নেই, ফেলে যাওয়ারও উপায় নেই। আতিথেয়তার এই বেড়াজালের সামনে সে প্রথমবারের মতো টের পায়, সমাজ নামক জিনিসটা আসলে এক নিঃশব্দ শিকল, যার প্রতিটি কড়া হাসির ভাঁজে লুকিয়ে আছে।
কোনোমতে মন আর মস্তিষ্ক দুটোকেই বশে এনে সে নাস্তাটুকু শেষ করে। প্রতিটা কামড় গিলতে তার বুকে ঠিক ভারী পাথর নেমে আসে। কারণ, এতক্ষণেও তৃষ্ণার কোনো দেখা নেই।
তৃষ্ণা তখন রান্নাঘরে। হাঁড়ির পাশে বসে সে চুলার আঁচ ঠিক করছে। নিজের বাড়িতেই সে আজও কাজের মেয়ে। বড় মেয়ে বলে কেউ তাকে এ পাড়ে ভাবতেই চায় না। এজন্য সে আসতে চায়নি। ওর সৎ মা ঐদিকে হাসিমুখে ওয়াসেমকে একটা ঘর দেখিয়ে বলেন,

“বাবা, তুমি এখানে একটু বসো। আমি তৃষ্ণাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।”
ঘরের মধ্যে ওয়াসেম অপেক্ষা করতে থাকে।
ঘড়ির কাঁটা আজ বোধহয় আটকে গেছে কোনো না-দেখা চাকায়। এক মিনিট, দুই মিনিট, দশ মিনিট, প্রতিটা মুহূর্তে তার রাগ ঠিক কুড়ালের ধারের মতো আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। মনে মনে সে সাজিয়ে চলে কথাগুলো, কী বলবে, কীভাবে বলবে। বাইরে বিয়েবাড়ির আনাগোনা, কিন্তু এই ছোট্ট ঘরটার ভেতর নেমে আসে এক নিশ্ছিদ্র কুয়াশার চাদর।
বেশ কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে তৃষ্ণা। রান্নাঘরেই সে খবর পেয়েছে ওয়াসেম এসেছে। শুনেই তার হাত থেকে খুন্তিটা প্রায় পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। সে বুঝে যায়, আজ তার মাথার উপর দিয়ে কী কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যেতে চলেছে। সে নিজেই তো আসতে চায় না, কেউ তার চাওয়াটা শোনে না, আজও শুনছে না।

ঘরে ঢুকেই সন্তর্পণে দরজাটা লাগিয়ে দেয় সে। তার ধারণা হয়, এই পাতলা কাঠের পাল্লাই বুঝি তাকে রক্ষা করবে। তাকে দেখে ওয়াসেম ধীরে ধীরে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ায়। তার ওঠায় কোনো তাড়াহুড়ো নেই, বরং তা ঝড়ের ঠিক আগের সেই ভয়ংকর প্রশান্তির প্রতিরূপ। এক পা এক পা করে সে এগিয়ে যায় তৃষ্ণার দিকে। প্রতিটা পায়ের শব্দ ঘরের নীরবতায় ঢাকঢোলের মতো ধ্বনিত হয়। তার একদম সামনে গিয়ে দাঁড়ায় সে, এত কাছে যে, তৃষ্ণা তার গরম নিঃশ্বাসের উষ্ণতা টের পায় গালে। তারপর বরফের চেয়েও শীতল গলায় ওয়াসেম জিজ্ঞেস করে,

“তুই যে এখানে এলি, কার কথায় এলি? আমাকে একবারও জিজ্ঞেস করার প্রয়োজনটুকু বোধ করলি না?”
এই ঠান্ডা গলাটা ধমকের চেয়েও ভয়ংকর। তৃষ্ণা চোখ তুলে তাকাতে পারে না। আমতা-আমতা করে বলে,
“আমি… আমি মাকে বলেছিলাম, যাব না। কিন্তু মা বললেন যেতে… উনি বললেন, আপনাকে তিনি বুঝিয়ে বলবেন।”
কথা শেষ হওয়ার আগেই ধমকে ওঠে ওয়াসেম। এবার তার কণ্ঠস্বর কুয়াশা ভেদ করে বেরিয়ে আসে,
“এই বেয়াদবের বাচ্চা! তোকে একটু সমাদর করি বলে মাথায় চড়ে বসবি? আমি তোকে বিয়ে করেছি, নাকি আমার মা, যে তুই মায়ের কথা শুনে চুপিচুপি চলে এলি!”
ধমকের ঢেউয়ে তৃষ্ণা পাথর হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর ভীতু চোখে সে ওয়াসেমের দিকে তাকায়। চোখে জল জমে আসে, কিন্তু গড়িয়ে পড়ে না, বহুকালের ব্যবহারে সম্ভবত এই গড়িয়ে পড়ার অভ্যাসটাই সে হারিয়ে ফেলেছে। কাঁপা কাঁপা গলায়, প্রায় শিশুর মতো ভেঙে বলে,
“আপনি তো আমাকে শুধু নামেই বিয়ে করেছেন। মা-ই তো আমার সব খেয়াল রাখেন, আমার পাশে থাকেন। তাই মাকে না করতে পারিনি। এক দিনেরই তো ব্যাপার, থেকে যাই না…!”
শেষ কথাটা আর শব্দ হয়ে বেরোতে পারে না, বেরোয় এক ভাঙা নিঃশ্বাস হয়ে।কিন্তু ওয়াসেমের চোখে সেই কান্নার ভাষা পৌঁছায় না। দাঁত চেপে সে ফিসফিস করে বলে,

“না। এক মুহূর্তও এখানে থাকা হবে না।”
কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গেই, কোনো সতর্কবাণী ছাড়া, সে এক টানে পাঁজাকোলা করে তুলে নেয় তৃষ্ণাকে। হঠাৎ শূন্যে ওঠার ঝাঁকুনিতে তৃষ্ণার দুই চোখ বড় বড় হয়ে ওঠে। হাত থেকে ছড়িয়ে পড়ে আঁচল। ভয় আর বিস্ময়ে আর্তনাদ করে ওঠে সে,
“কী কী করছেন এসব আপনি? আমাকে নামিয়ে দিন, মানুষ দেখবে!”
কোনো উত্তর না দিয়ে ওয়াসেম দরজা খোলে। তৃষ্ণাকে কোলে নিয়েই সোজা এগোয় ঘরভরা মানুষের সামনে দিয়ে, স্থির, অটল, অবিচলিত পায়ে। উঠানে এক পলকে সব থমকে যায়।মেহমানরা হাঁ করে তাকিয়ে থাকেন। তৃষ্ণার সৎ মা আর বাবা হতভম্ব হয়ে দৌড়ে এসে দাঁড়ান ওয়াসেমের সামনে।তৃষ্ণার বাবা কাঁচুমাচু হয়ে জিজ্ঞেস করেন,
” কিছু কী হয়েছে বাবা? তৃষ্ণাকে এভাবে কোলে তুলে নিয়ে যাচ্ছ যে?”
ওয়াসেম প্রথমে তাকায় তৃষ্ণার মুখের দিকে, যেখানে ভয়, লজ্জা আর বিস্ময় একাকার হয়ে জমাট বেঁধেছে। তারপর ধীরে চোখ তুলে ওর বাবার দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে গম্ভীর, অটল গলায় বলে,
“জি, হয়েছে। আমার স্ত্রী প্রেগন্যান্ট। আর আমি চাই না, এই অবস্থায় সে বিয়ে-শাদির ব্যস্ততার ধকলে যাক, কোনো ক্লান্তি নিক। তাই ওকে আমি নিয়ে যাচ্ছি।”

কথাটা ঠিক উঠানের মাঝখানে ছুড়ে দেওয়া এক ভারী পাথর। ঘরভরা মেহমান অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন। কারও ঠোঁটে কৌতুকের রেখা, কারও চোখে সন্দেহ, কারও দৃষ্টিতে তীক্ষ্ণ কৌতূহল।তৃষ্ণা তো প্রায় জ্ঞান হারানোর অবস্থায়। এসব কী বলছেন উনি! সে প্রেগন্যান্ট? কবে হলো? সৎ মা তড়িঘড়ি করে হাসি টেনে বলেন, তবে সেই হাসিটা এবার আর মুখে ঠিকমতো বসে না,
“আরে বাবা, এক দিনেরই তো বিষয়! থেকে যাক না, কিচ্ছু হবে না। দায়িত্ব আমি নিলাম।”
এবার ওয়াসেমের কণ্ঠে সেই আদব-কায়দা আর অবশিষ্ট থাকে না। খোলা, ধারালো এক সরলতা নিয়ে সে বলে,
“হ্যাঁ, থেকে যাক! আর আপনারা আপনাদের মেয়ের বিয়ের সব কাজের ধকল আমার বউয়ের ঘাড়ে চাপিয়ে দিন! রান্নাঘরে সে আঁচ খাঁড়া করবে, আর আপনার মেয়ে বরকন্দাজ হয়ে বসে থাকবে, তাই না? এত সাধনার বউকে আমি কোন দুঃখে এক দিনের জন্য আপনাদের বাড়িতে কাজের মেয়ে হয়ে ফেলে যাব?”
শেষ কথাটা উঠানের বাতাসে ঝুলে থাকে দীর্ঘক্ষণ। কেউ কোনো উত্তর দেয় না। দেওয়ার ভাষাও সম্ভবত কারও থাকে না।

এই বলে ওয়াসেম আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না। তৃষ্ণাকে কোলে নিয়েই সোজা এগোয় সামনের দিকে। উঠান পেরিয়ে, গেট পেরিয়ে, গ্রামের সেই সরু মাটির রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকে, যেখানে দুই পাশে ধানক্ষেতের সবুজ বিছানায় বিকেলের সোনালি রোদ গলে গলে পড়ছে।
আর তৃষ্ণা? তৃষ্ণা শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে ওয়াসেমের চোখের দিকে। ঘোরলাগা মানুষের মতো ধীরে ধীরে সে নিজের দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে ওয়াসেমের গলা, নিজের অজান্তে, অবচেতনে। পলকহীন দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে সেই মুখটার দিকে, যে মুখকে এতদিন সে ভয় পেয়েছে, ঘৃণা করেছে, এড়িয়ে গেছে।
জীবনে প্রথমবার, এই বাড়িতে, এই মাটিতে, সেই তার হয়ে এতগুলো মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলল।
যে মানুষটার কাছে সে সবসময় অপমানিত হয়েছে, যার ছায়া দেখলেই তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠেছে, আজ সেই মানুষটাই তার হয়ে লড়ছে। তার বুকে মাথা রেখে তৃষ্ণা শুনতে পায় ওয়াসেমের হৃৎস্পন্দন, দ্রুত, জোরালো, উত্তাল। বুঝতে পারে না সেটা রাগের, নাকি অন্য কোনো নাম না জানা অনুভূতির, যার নাম হয়তো ওয়াসেম নিজেই এখনো দেয়নি।
বিস্ময় আর মুগ্ধতা নিয়ে সে চেয়েই থাকে। চোখের কোণে জমে ওঠা জলটা এবার নীরবে গড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এই জল ভয়ের নয়। এই জলের স্বাদ অন্য।
‎পেছনে ততক্ষণে মেহমানদের মধ্যে ফিসফিসানি ছড়িয়ে পড়েছে ঝিঁঝির ডাকের মতো, উঠানের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত।
‎গায়ে-হলুদের প্যান্ডেলের নিচ থেকে এক প্রৌঢ়া চাচি ঠোঁট ফুলিয়ে বললেন,

‎”ওর সৎ মা তো আমাকে গত মাসেই বলছিল, মেয়ে নাকি সুখী না। স্বামী নাকি ওকে খুব মারধর করে। কী মিথ্যাবাদী রে বাবা!”
‎তাঁর পাশে বসা আরেক প্রতিবেশিনী চোখ বড়-বড় করে বললেন,
‎”কিন্তু ওর স্বামী তো দেখছি একেবারে বউ-পাগল! এমন করে কেউ কারও কোলে করে তুলে নিয়ে যায়? আজকালকার ছেলেরা তো নিজের বউকে দুই গ্লাস জল এনে দিতে চায় না, আর এই ছেলে তো একেবারে… হায় রে!”
‎দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকজন মন্তব্য করলেন,
‎”শুনলেন তো? প্রেগন্যান্ট! এই অবস্থায়ও মেয়েটাকে রান্নাঘরে ঢুকিয়ে চুলার পাশে বসিয়ে রেখেছিল। ছি ছি! আসল মায়ের কাছে কি এমন করে? কোনোদিন করে?”
‎গায়ে-হলুদের সাজে বসে থাকা সুধামা, তৃষ্ণার সৎ বোন, তার সাজানো মুখেও কেমন ছায়া পড়ে গেল। বিয়ের কনের মুখে এমন ছায়া মানায় না, কিন্তু আজ পড়েছে।
‎একজন মোল্লা সাহেব চশমাটা ঠিক করে বললেন,
‎”সৎ মেয়ে বলে এমন ডাহা গুজব ছড়ালো কী করে? লোকে কী বলবে, এই ভেবেই তো লোকে গুজব ছড়ায়। কিন্তু আজ তো উল্টো লোকে দেখল, কী রকম আদরের বউ! এমন জামাই হাজারে একটা মেলে না।”

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬৫

‎ তৃষ্ণার সৎ মা উঠানের এক কোণে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর মুখের সেই কৃত্রিম হাসিটা এতক্ষণে খসে পড়েছে। এতদিন ধরে যে গল্প তিনি বুনেছিলেন, “আমার সৎ মেয়ে দুঃখী, স্বামীর কাছে ভালো নেই, তবু আমি ওর দায়িত্ব নিয়েছি”, সেই গল্পের ভবন আজ বিকেলের বাতাসে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। এতগুলো মানুষের সামনে, এত সাক্ষীর সামনে।
‎এখন প্রতিটা ফিসফিসানি তার কানে ছুরির মতো বিঁধছে।
‎গুজবের ওই ভাঙা স্বর আর তৃষ্ণার কানে পৌঁছাল না।

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬৭