প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৫২ (২)
রোজ ও রুশা
এদিকে রোজ আর রুশার ঘরের আবহাওয়ায় এতটাই উত্তাপ যে একপাশে ডিম ভেঙে দিলে নির্ঘাত ওমলেট হয়ে যাবে। ঝিনুক হেরার রুমে শুয়েছে সকাল সকাল তুষার আর তাকে বের হতে হবে দরকারি কাজে । রুশা ঘরের এমাথা থেকে ওমাথা তাণ্ডব নৃত্যের মতো পায়চারি করছে—চোখমুখ লাল, চুলগুলো উসকোখুসকো হয়ে একদম কাকের বাসার রূপ নিয়েছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে, সামনে যাকে পাবে তাকেই একদম চিবিয়ে কাঁচা গিলে খাবে!
অন্যদিকে, বেচারি রোজ দরজার পাশে এমনভাবে দেওয়ালের সাথে লেপ্টে দাঁড়িয়ে আছে, যেন সামান্য একটু নড়াচড়া করলেই ভিতর থেকে মিসাইল এসে তাকে একদম উড়িয়ে দেবে! সে নাভানের বন্ধ ঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে ভীতিপূর্ণ চোখে নখ কামড়াচ্ছে। দরজার ভিতর আসলে ঠিক কী চলছে? এতক্ষণ ধরে পুরো বন্ধুমহল উঁকিঝুঁকি মেরে চেষ্টা করেও না পেল একটা টু শব্দ, না দেখা গেল দরজার নিচ দিয়ে ঘরের আলো! অবস্থা বেগতি দেখে ঝিনুক সবাইকে জোড়াজোড়ি করে পাঠিয়ে দিয়েছে। রুশা আর সহ্য করতে না পেরে ফুঁসে উঠে রোজের দিকে এক পা এগিয়ে গেল। নিজের মাথায় হাত দিয়ে এমনভাবে চিৎকার করে উঠল যেন তার রাজ্য হাতছাড়া হয়ে গেছে!
” অই গোলাপ ফুল ! তুই কিন্তু একটা জ্যান্ত, জলজ্যান্ত বেঈমান! তুই বান্ধবী নামের আস্ত একটা কলঙ্ক রে! তুই হেরাকে আটকাতে পারলি না? অই ‘চকলেট হিরো’ এখন ঘরের ভিতর আমার নিরীহ বাচ্চাটার সাথে কী অত্যাচার করছে কে জানে!”
কথাটা শুনে রোজের চোখ তো একঝাঁক কপালে উঠল! সে গালে হাত দিয়ে, একদম ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়ার ভংগিতে কটমট করে উঠে বলল—
” অই শালি, মুখ সামলে কথা বলবি একদম! তুই নিজে কেন আটকালি না রে? বীরপ্রতীমের মতো রাজকীয় ভঙ্গিতে সোফায় তো তুই-ই বসে ছিলি! বেঈমানের ডিকশনারি তো তুই নিজে!”
রুশা একদম বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিকের মতো হাত নেড়ে যুক্তি দেখানোর চেষ্টা করল——
” আরে ভাই, কমন সেন্স বোঝিস না? অই চকলেট হিরো তোর তো ভাই হয়, আর আমার হলো না মেনে নেওয়া জিজু! না মানা জিজুর সাথে পাঙ্গা নিতে গেলে আমার ফিউচার সিকিউরিটি থাকবে? তোর কি একটুও মায়া-দয়া নেই?”
রোজ মুখ বিকৃত করে, চোখ খিঁচিয়ে একদম দাঁত কিড়মিড় করে উঠল—
” বাহ্! এখন খুব জিজু-প্রীতি দেখাচ্ছিস, তাই না? তখন যে ‘ও মাই গড, ওয়াও, কী ক্রাশ!’ বলে জিভ বের করে লালা ফেলছিলি? আর আজ আমার ওই দুধের ছাওয়াল, নিষ্পাপ, কিউট অধীর ভাইটাকে কী অলৌকিক বাণী শোনালি? সত্যি বলছি, এখানে একটা ক্যামেরা থাকলে তুই আজকেই সেরা অভিনয়ের জাতীয় অ্যাওয়ার্ড পেয়ে যেতি! ইস রে, আমার কহিনুর হীরা—থুক্কু কহিনুর হিরো ভাইটার মনে আজ না জানি কত বড় আঘাত লাগল!”
রোজের কথা শেষ হতে না হতেই হেরা টাইপের নাটক শুরু করল রুশা। সে সোজা নিজের দুই কানে নিজের হাতে থাপ্পড় মেরে একদম হাউমাউ করে কেঁদে ফেলার প্যান্টোমাইম করে বলল—
“মেরি মা, ক্ষেমা কর আমাকে! প্লিজ ওই লাইভ টেলিকাস্টের কথা আর বলিস না! কথাগুলো মনে পড়লেই আমার ব্লাড প্রেসার হাই হয়ে খিঁচুনি ওঠার জোগাড় হয়! ও কোনোদিন জীবনে সিরিয়াস হবে না রে, সব সময় শুধুই ভণ্ডামি আর ড্রামা!”
রোজ এবারে একটু থমকে দাঁড়াল। হাতের ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে একটু রহস্যময় হেসে বলল—–
” শোন, কহিনুর হিরো যতই ভণ্ডামি করুক না কেন, তোর জন্য যে তার মনটা একদম পিওর পিজেজিপ (Pure Pure)—তা কিন্তু খাঁটি সত্য। মনে নেই, সেদিন তোর হাত কেটে রক্ত বের হওয়ার সময় লোকটা কী তাণ্ডবটা করেছিল? আর ওই যে একটা ছেলে তোকে প্রস্তাব দেওয়ার চেষ্টা করতেই ছেলেটাকে ধরে কেমন উদুম কেলানি দিল? আর সবশেষে, নিজের অত মূল্যবান জায়গা থেকে ফুল এনে তোকে যেভাবে প্রোপোজ করেছিল… ভুলেই গেলি? তার ওপর সারাক্ষণ যে তুই উপন্যাসের অবাস্তব নায়কদের কথা বলে বলে সবার মাথা চিবিয়ে খাস, তাতেই বা সে তোকে কী বলেছে? আহা, কী প্রেম রে! ওদের কাণ্ড দেখলে তো আমারই হার্টবিট লাফিয়ে ডাবল হয়ে যায়, আর তুই…”
রুশাকে হঠাৎ খুব গভীর কোনো ভাবুক ভঙ্গিতে দূর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে রোজ খিঁচিয়ে উঠল—
“অই, সর তো সামনে থেকে! তোর এই সস্তা মেগাসিরিয়ালের ড্রামা দেখে ভয়ে আমার হাত-পা কাঁপা তো দূর, মেইন হার্টবিটই বন্ধ হওয়ার জোগাড়!”
রোজ এবারে রুশার কাঁধ ধরে এক ঝাঁকুনি দিয়ে কটমট করে বলল—
“এখন আর কোনো নায়িকার মতো অ্যাটিং না মেরে সোজা ঘরের এক কোণে হাঁটু গেড়ে বসে দোয়া পড়তে থাক, বুঝলি?”
রুশা আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। সোজা ঘরের এক কোণে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল, চোখ দুটি শক্ত করে বন্ধ করে একদম কান্নাকাটি মার্কা মোনাজাতের ভঙ্গিতে দু-হাত ওপরে তুলল।
“ও আল্লাহ্ গো! রহম করো! চকলেট হিরোর হাত থেকে আমার বান্ধবীটাকে অন্তত আজকের দিনটা বাঁচাও! দরকার হলে কাল থেকে আমি দিনে তিন বেলা একদম তিতা করলার শরবত খাব! তবু তার বাসরে যেন বিড়াল মারার মতো ঘটনা না ঘটে!”
রোজ ধির পায়ে বের হয় বাহিরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে নাকি দেখতে। আর তার ফোনেও কিছু কাজ করা লাগবে বাবার একটা একাউন্টে জমানো টাকা আছে তা তার মামা অগোচরে অই টাকা রোজের নামে করে দিয়েছে সেখান থেকে টাকা নিয়ে খরচ চালায় রোজ। সেই টাকার হিসাব করবে একটু তাই আপাতত ছাদে গিয়ে ঠান্ডা মাথায় হিসাব করবে ভেবে চলে যায়।
বাইরে তখন নাভানের ওই বিধ্বংসী রূপ দেখে চিন্তা যে রোজের একদম হচ্ছে না তা নয়! কিন্তু তুষার, ঝিনুক আর সৃজন—সবাই তাকে বারবার গ্যারান্টি দিয়ে বলেছে, “ভয় নেই, কিছুই হবে না।” তাও পেটের ভিতর এক অদ্ভূত অস্বস্তি আর বান্ধবীর জন্য মন খারাপ লাগা থামছেই না। রোজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুশাকে একা রেখে ছাদের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
রোজ ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই রুশা আবার দুই হাত তুলে আরও জোরকদমে তার বাকি মোনাজাত শুরু করে দিল—
“ও গড! প্লিজ, আজ যেন চকলেট হিরো বাসর না করে! মেয়েটার কত দিনের মিষ্টি ইচ্ছে সুন্দর করে নতুন বউ সেজে, লাল বেনারসি পরে বাসর করার! তুমি অন্তত ওর ওই কাঁচের মতো পুতুল স্বপ্নটা ভেঙে দিও না প্লিজ… তার চেয়ে বরং দরকার হয় আজ রাতে আমার বাসর করিয়ে দাও! আমীন!”
দোয়া শেষ হতেই রুশা নিজেই নিজের কথা শুনে থতমত খেয়ে গেল।
“আমার বাসর মানে?!” তবা তবা! কি যে বলি আমি!
—নিজের ভুল মোনাজাতের কথা উপলব্ধি করতেই রুশা নিজের মুখে নিজেই একটা হাত চাপা দিল। ঠিক সেই মুহূর্তে ছাদের দরজা খোলার শব্দে আর পুরো পরিস্থিতির অবাস্তবতায় দুই বান্ধবীর আগের ওই পাগলামির দৃশ্য মনে পড়ে রুশা একা একাই হেসে একাকার হয়ে মেঝেশয্যা নেওয়ার জোগাড় হলো!
নাভানের মহাকাব্যিক আর ভয়ংকর হুংকারের পর থেকে যেন পুরো বাড়ির হাওয়া বেশ গরম!
“এটা বাসরের শাস্তি! আর এই শাস্তির অধিকার শুধু আমার এই ঘাড়ত্যাড়া মিসাইল গার্লের!”—এক সংলাপে তাসের ঘরের মতো পুরো বাড়ি কাঁপিয়ে,হেরাকে কাধে তুলে শেহতাজ খান নাভান নিজের রুমের দরজা আটকেছিলো, সবাই যখন চিন্তিত, ভয়ে, তখন রুশার ভাব ছিলো একেবারে অন্যরঅকম।
রুশার সেই ঐতিহাসিক মন্তব্য মনে পড়তেই অধীরের গ্যাংস্টার ভাবটা যেন দশ গুণ বেড়ে গেল!
টাকার হিসাব-নিকাশ আপাতত মাথা থেকে একদম আউট ছেলেটার । অধীরের মনের পর্দায় তখন কেবলই ভাসছে রুশার সেই হাঁ করে নাভানের দিকে চেয়ে থাকার দৃশ্য আর তাদের মধ্যকার রোমাঞ্চকর কথোপকথন। নাভানের সেই তাণ্ডব দেখে রুশা তো একবারে ইমপ্রেসড হয়ে বলেছিল—
“এ তো পুরাই ভিলেন! একেবারে রিয়েল হিরো, অ্যাটিটিউড পুরাই ঝাক্কাস! আই এম ফিদা!”
অধীর তখন জ্বলে-পুড়ে ছাই হয়ে উত্তর দিয়েছিল—
“চুপ লাল গোলাপী! বারবার ভাসুরের দিকে নজর না দিয়ে এই কোহিনুর হিরার দিকেও তো একটু দিতে পারো!
রুশা নাক সিঁটকে বলেছিল—-
“হুস! আপনাকে তো ঐরকম লাগে না।”
“মানে?”
অধীর অবাক হয়ে শুধিয়েছিল।
“আমার ভিলেন লাভ পছন্দ!”
রুশার সোজা জবাব।
অধীর ছিটকে উঠে বলেছিল–
“ছে ছে ছে! জোর করে বাসর করা তোমার পছন্দ?”
“দূর! আপনি ওইসব বুঝবেন না!
বলেই রুশা ‘ক্রিমিনাল’ গান গাইতে গাইতে হেঁটে চলে গিয়েছিল!
হি ইজ আ ভিলেন বাই দ্য ডেভিলস ল
হি ইজ আ কিলার জাস্ট ফর ফান, ফান, ফান, ফান
ড্যাট ম্যানস আ সুইচ অ্যান্ড আনপ্রেডিক্টেবল হিজ গট নো কনসায়েন্স, হি গট নান, নান, নান, নান
অল আই নো, শুডভ লেট গো, বাট নো দূর কজ হিজ আ ব্যাড বয় উইথ আ টেইন্টেড হার্ট অ্যান্ড ইভেন আই নো দিস এইন্ট স্মার্ট বাট মামা আইম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল,,,,
রুশার সেই কথার বদলা নিতেই আজ অধীরের এই গ্যাংস্টার রূপ! রুশা যখন ভিলেন আর রাফ-টাফ মার্কা রোমান্স পছন্দ করে, অধীরও আজ দেখাবে কীভাবে সাউথ ইন্ডিয়ান সিনেমার খাতারনাক ভিলেন হতে হয়!
অধীর তার ঘরের দরজা আধখোলা রেখে ভেতরে একদম ডন-মারকা অ্যাটিটিউডে পায়চারি করতে লাগল। গাঢ় গম্ভীর চেহারা, চোখে-মুখে বিষাক্ত এনার্জি!
সে ধীরপায়ে দরজার দিকে এক পা এগিয়ে এল। গলার ভয়েস একেবারে তিন পর্দা নিচে নামিয়ে, বুক ফুলিয়ে, এক হাত শূন্যে তুলে চিল-চিৎকার করে উঠল—
” আজই বাসর করব! আজ রাতে আমার লাল গোলাপীকে আমি আমার ঘরে বন্দি করবই করব! আর তোদের সবাইকে আমি এক এক করে দেখে নেব! কেউ আটকাতে পারবি না আমাকে!”
ডায়লগটা দিয়েই অধীর নিজেই নিজের গলার আওয়াজে চমকে উঠল!
তারপর দ্রুত আয়নার সামনে গিয়ে চুলগুলো কপালে ফেলে, গালে একটা ডন-মার্কা চাপড় দিয়ে বিড়বিড় করতে লাগল—
“হুমম… নাভান ভাই তো জোর করে কিউটিপাই বনুকে টেনে নিয়ে হিরো হয়ে গেল, আর লাল গোলাপি তা দেখে ফিদা! এবার আমি যখন এই ডায়লগ দিয়ে একদম ভিলেন স্টাইলে ওকে কোলে তুলে নেব… রুশা কি বাংলা সিনেমার রোমান্টিক হিরোইনদের মতো আমার বুকে ঢলে পড়ে ‘ক্রিমিনাল’ গান গাইবে? নাকি ‘আঁচল’ সিনেমার ভিলেন ভেবে হাতের কাছে যা পাবে তাই দিয়ে মাথায় বাড়ি মারবে? ধুর! আগে থেকে কিছু বলা যাচ্ছে না, হুঁহ, আগে একটু জোরদার ট্রায়াল দিয়ে দেখা দরকার!”
কথাটা শেষ করেই অধীর ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা একটা দামি প্লাস্টিকের ফুল তুলে নিল। আয়নার সামনে থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে শুরু করল তার কাল্পনিক রোমান্টিক রোল-প্লে—
“অই লাল গোলাপী! আমার দিকে সোজা তাকা! তোর এই নিষ্পাপ চোখ দিয়ে আজ কি ভিলেন দেখবি, নাকি আমার ভেতরের এই কিউট রোমান্টিক ডনটাকে ভালোবাসবি? বল! আমার সাথে পলটি মারার শাস্তি আজ তোকে হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দেব। আর শোন… আমি তোর ফিউচার জামাই! আমাকে ভুলেও অন্য কারও সাথে তুলনা করবি না। কারণ, এই অধীর দুনিয়ায় অনলি ওয়ান পিস!”
ঠিক তখনই দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সৃজনের পেট ফেটে হাসির এক অদ্ভুত আওয়াজ ভেসে এল—
“হু হু… হা হা… হি হি হি!”
সৃজন এতক্ষণ ধরে দরজায় দাঁড়িয়ে অধীরের এই বিশ্বমানের ‘ভিলেন-মারকা রোমান্টিক ট্রায়াল’ উপভোগ করছিল। হাসতে হাসতে তার পেটে খিল ধরে যাওয়ার অবস্থা! সে ধপ করে খাটে বসে পড়ে দুই হাত দিয়ে পেট চেপে ধরে বলতে লাগল—
“ওরে আমার আণ্ডা-বাচ্চা ডন রে! ওরে আমার লেটেস্ট ভিলেন! অই কহিনুর হিরো , তোর ‘লাল গোলাপী’ তোর এই ডায়লগ শুনলে রোমান্টিক হওয়া তো দূর, আতঙ্কে ৯৯৯-এ কল দিয়ে পুলিশ ডেকে তোকে শ্রীঘরে চালান করে দেবে রে!”
অধীর এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়াল। হাতের প্লাস্টিকের ফুলটা একদম সুচালো অস্ত্রের মতো সৃজনের দিকে উঁচিয়ে ধরে লাল-লাল চোখে চিল্লাল—
“অই সৃজনশীল! তুই আবার এসেছিস আমার ফিউচার প্ল্যানিং ধ্বংস করতে? তুই জানিস না একটা ক্রিয়েটিভ মাইন্ড যখন ডায়লগ প্র্যাকটিস করে, তখন ডিস্টার্ব করতে নেই?”
সৃজন হাসি থামানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে এক হাত বুকে রেখে বলল—
” না না ভাই, তুই চালিয়ে যা! তবে একটা কথা বল তো—নাভান যখন বলছে ‘তোদের শাস্তি দিবো! তখন ওর চোখে ছিল আগুনঝরা সিংহের লায়ন-মারকা অ্যাটিটিউড! আর তুই যখন বলছিস, তখন তোকে মনে হচ্ছে পাড়ার মোড়ে ধাওয়া খেয়ে আসা একখানা চিতা বেড়াল! যে চিতা বাঘের পার্ট ধরে। তোর লাল গোলাপী তোকে হিরো তো ভাববেই না, বাসর ঘরে ঢুকলে ভয় পেয়ে ভাববে ভূত এসেছে!
অধীরের ইগোতে এবার সোজা পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটল! সে শার্টের হাতা গুটাতে গুটাতে একদম তেড়ে গেল সৃজনের দিকে—
” কী বললি তুই? আমি ভূত? আমি চিতা বেড়াল? অই, তুই দেখেছিস আমার ডেঞ্জারাস আই-কন্ট্যাক্ট? দেখেছিস আমার এই বডি ল্যাঙ্গুয়েজ? নাভান ভাইয়ের কার্বন কপি আমি! লাল গোলাপী আমার এই ভিলেন-মারকা রোমান্স দেখে এক নিমেষে ফ্ল্যাট হয়ে মাটিতে পড়ে যাবে!”
সৃজন মুখ বিকৃত করে হাত নেড়ে বলল—
“হুম, ফ্ল্যাট তো হবেই! তবে প্রেমে পড়ে না, তোর এই সস্তা যাত্রাপালার অ্যাক্টিং দেখে হাসতে হাসতে ফিট হয়ে পড়বে! আর বাসর ঘরের বরণ তো দূরের কথা, ঝাড়ু দিয়ে পিটিয়ে তোকে ঘর থেকে বের করে দেবে!”
” তুই খুব বেশি কথা বলছিস কিন্তু সৃজনশীল!”
অধীর খেপে একদম বোম্বাস্টিক হয়ে খাট থেকে একটা বিশাল কোলবালিশ তুলে নিয়ে সৃজনের ওপর আছড়ে পড়ল—
” আজ তোকেই আমি লাল গোলাপী বানিয়ে ট্রায়াল দেব! তুই বলবি আমি হিরো নাকি ভিলেন!”
সৃজন খাটের ওপর গড়াগড়ি দিয়ে বালিশের আঘাত এড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে হাসতে লাগল—
” ছাড় ছাড়! মেরি বাপ, আমাকে ছেড়ে দে! তোর এই ‘ভিলেন রোমান্স’ সহ্য করার ক্ষমতা আমার নাই! নাভান তো অন্তত বাসর ঘরে বনুকে নিয়ে গেছে, আর তুই তো এই কোলবালিশের সাথে মারামারি করেই রাত পার করে দিবি!”
” আজ তোর আর রক্ষে নাই রে সৃজনশীল !”
অধীর এক লাফে সৃজনের ওপর চেপে বসল। অধীরের ৬৮ কেজি ওজনের নিচে চাপা পড়ে সৃজনের তখন প্রাণ যায় যায় অবস্থা! সে দম আটকানো গলায় চিঁ-চিঁ করে চিল্লাতে লাগল—
” অই! তুই কি আমাকে রেপ করবি নাকি? এমন জোরজবরদস্তি করছিস কেন হারামি? সর আমার উপর থেকে!”
অধীর চোখ দুটো ছোট ছোট করে বিষাক্ত গলায় বলল—
” না! আজ তুই আমার লাল গোলাপীর সাথে সুন্দর সময় কাটানোর সুযোগ করে দিবি, নয়তো আজ সত্যি তোর অবস্থা করুণ করে দেব!”
বলে অধীর ডিরেক্ট সৃজনের শার্ট ধরে টানাটানি শুরু করে দিল। সৃজন হাত-পা ছুড়ে একদম ঘর মাথায় তুলে চিৎকার দিল—
” বাঁচাও! কে কোথায় আছো বাঁচাও! আমার ইজ্জত নিয়ে টানাটানি করছে রে!”
অধীর ক্রূর হেসে বলল—
” তুই যতই চিল্লাস না কেন, এই বাড়িতে আজ তোকে বাঁচাতে কেউ আসবে না! পুরো বাড়ি এখন নাভান ভাই এর ভয়ে থরথর করে কাঁপছে!”
দুইজনের মল্লযুদ্ধ দেখে মনে হচ্ছে যেন কোনো অপরাধমূলক কেস চলছে! সৃজন নিচে চাপা পড়ে কাঁচুমাচু হয়ে বলে উঠল—
“ভাই! এবারের মতো ছেড়ে দে! এটা আমার ফুলজানের হক, এভাবে নষ্ট করিস না!”
“চুপ শালা! তোকে আজ খালি আন্ডারপ্যান্ট পরায়ে বাইরে বের করব! আগে আমায় সুযোগ করে দে, যাতে আমি আমার লাল গোলাপীর সাথে একটু দেখা করতে পারি!”
সৃজন আর সহ্য করতে না পেরে পুরো শক্তি দিয়ে অধীরকে মারল এক ধাক্কা। অধীরকে সরিয়ে উঠতে গিয়ে নিচে থাকা বিছানার টপারে পা পিছলে সৃজন ‘ধপাস’ করে মেঝের ওপর আছড়ে পড়ল। কিন্তু ঝামেলা হলো অন্য জায়গায়—পড়ার সময় অধীরের হাতে আটকে রয়েছিল সৃজনের প্যান্টের বেল্ট!
সৃজন এক প্রকার আধা-কাত হয়ে খাটের তলায় মাথা গলিয়ে বাঁচার চেষ্টা করল। কিন্তু অধীর ছাড়ার পাত্র নয়! অধীর প্যান্ট ধরে মারল সজোরে এক টান!
‘সড়ড়ড়…!’ শব্দে সৃজনের জিন্সের প্যান্ট একদম গোড়ালি পর্যন্ত খুলে অধীরের হাতে চলে এল!
অধীর হা করে কিছুক্ষণ প্যান্টের দিকে তাকাল, তারপর খাটের নিচ থেকে বেরিয়ে আসা রূপ দেখে অধীরের চোখ তো ছানাবড়া!
সে প্যান্টটা হাতে নিয়ে অবাক হয়ে চিৎকার করে উঠল—
“যা শালা! এটা কী? কিরে সৃজনশীল, চুমুর স্প্লাই ম্যান ! নিচে কি কিছু পরা আছে। নাকি একদম জন্মদিনের ড্রেসে আছিস ” কিরে সালা!
সৃজন এক লাফে খাটের নিচ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে রাগে-লাজে লাল হয়ে হাত দিয়ে লজ্জা ঢাকার আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে বলল—
“শালা ফাজিল! আমার প্যান্ট দে! তুই তো সত্যি কারের ইজ্জত মারার ভিলেন রে!”
সৃজনের এই করুণ আর অদ্ভুত অবতার দেখে অধীর পেট চেপে ধরে মাটিতে গড়াগড়ি খেতে লাগাল! হাসতে হাসতে তার চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসছে—
” বাহ্ ভাই বাহ্! আমার ‘চুমুর সাপ্লাই ম্যান তোকে তো এখন একদম নোড়া ফাতেহির মতো লাগছে রে! আয় একটা বেল্লি ডান্স দে! সেই লাগবে! আমি শুয়ে টাকা উড়াবো আর তুই নাচবি।
সৃজন এর শ্যামলা মুখের গড়নের থেকে পা অনেক ফর্সা। কালো আন্ডার পেন্টে নিচের হাটু বের হওয়ায় অধীর বলে উক্ত কথা, সৃজন দাঁত কিড়মিড় করে বলল–
“দে বলছি প্যান্ট! নতুবা তোর কপালে কিন্তু আজ শনি আছে!”
অধীর চট করে পকেটে হাত দিয়ে ফোনটা বের করে বলল—
” দাঁড়া দাঁড়া! আগে এই ঐতিহাসিক চুমুর সাপ্লাই ম্যানের একটা পিক নিই! তোর ফুল জানকে দেখাবো। অধীর যা বদের হাড্ডি তার ইজ্জত এর ফালুদা করতে এক সেকেন্ড টাইম যে অপচয় করবে না তা ভালই জানে সৃজন। ইতি মধ্যে পিক তুলে অধীর হেসে লুটিয়ে পড়ছে ফ্লোরে। সৃজনের এবার অবস্থা খারাপ! সে হাত জোড় করে প্রায় কাঁদতে কেঁদে ফেলে বলল—
“এই ভাই না না! এই কাজ করিস না! তুই আমার ধর্মের ভাই ? প্লিজ পিক তুলিস না! ( কাদো কাদো গলায়)
অধীর ফোনটা উঁচিয়ে এক গালে বাঁকা হাসি হেসে বলল—
“নো নো ডার্লিং! শর্ত একটাই—আগে তুমি আমার লাল গোলাপীর সাথে কোয়ালিটি টাইম কাটানোর ব্যবস্থা করে দাও! ওই মেয়ে তো আমার হাতের নাগালে পড়েই না, আর যখনই আসে খালি ঝগড়া করে! আর রাতে তোর ওই ‘ফুল’তাকে জড়াই ধরে সন্ধ্যা না নামতেই ঘুমিয়ে পড়ে! লাল গোলাপীকে একদম আমার কাছে ঘেঁষতে দেয় না! তাই আজ তুই তোর ফুলকে সামলাবি, আর আমার লাল গোলাপীকে আমার কাছে আসার সুযোগ করে দিবি!”
সৃজন আর কোনো উপায় না পেয়ে নিজের ইজ্জত বাঁচাতে দুই হাত তুলে সমর্পণ করল—
“ওকে ভাই ওকে! আজ রাতে আমি যেকোনো উপায়ে ফুলকে আমার কাছে আটকে রাখব! তুই যা তোর লাল গোলাপীর কাছে! এবার দয়া করে আমার প্যান্টটা ফেরত দে, আর পিকটা ডিলিট কর!”
অধীর জয়ীর মতো প্যান্টটা সৃজনের মুখে ছুঁড়ে মেরে বলল—
“এই তো চাই, সুবোধ বালকের মতো কাজ! যা, এবার গিয়ে নিজের মান-সম্মান ঢাক!
বাইরে রাত এখন অনেক গভীর। মেঘলা আকাশের নিচে ঝিরিঝিরি হাওয়া বইছে। ছাদের বাগান থেকে ফুলের গ্রান আসছে। সৃজন সারা বাড়ি খুঁজে কোথাও রোজকে না পেয়ে অবশেষে ছাদে উঠে এল। দূর থেকে দেখা গেল, ছাদের এক কোণে রেলিংয়ে হেলান দিয়ে রোজ দাঁড়িয়ে আছে, হাতে তার ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলজ্বল করছে।
রোজের আত্মমর্যাদাবোধ বরাবরের মতোই বড্ড বেশি। এখানে আসার পর থেকে সে সম্পূর্ণ নিজের উপার্জনে চলছে, কারো এক পয়সার সাহায্যও নেয়নি। নাভান অবশ্য তাকে সবসময় নিজের আপন বোনের চোখে দেখে এসেছে, কতবার তাকে নিজের কাছে রাখার চেষ্টা করেছে। কিন্তু রোজ নিজের সম্মানের প্রশ্নে আপসহীন। সে যে কারো বোঝা না হয়ে নিজের খরচ নিজে চালায়—এ নিয়ে নাভান এমনকি জাভেদ খান আর কাজল রেখার সাথেও কথা বলেছে। মেয়েটার এই নাছোড়বান্দা আত্মসম্মান সবাইকে যেমন অবাক করে, তেমনই শ্রদ্ধায় মাথা নোয়াতেও বাধ্য করে।
সৃজন ধীরপায়ে রোজের দিকে এগোতে লাগল। কিন্তু একই রাতের অন্যপ্রান্তে, বাড়ির আরেক কোনায় তখন সম্পূর্ণ এক পাগলামির নাটকের আয়োজন চলছে!
রুশা সবেমাত্র নিজের মনে দোয়া পড়ে মেঝেজোড়া বিছানায় বসতে যাবে, ঠিক তখনই অধীর ধুম করে রুমে ঢুকে সোজা বেডে চিতপটাং হয়ে শুয়ে পড়ল!
রুশা হা করে তাকাল। অবাক কাণ্ড! এই ছেলেকে সে রাতে কোনোদিন নিজের অত কাছে আসতে দেয় না, খালি ‘গালটুস’ খাওয়ার অজুহাত খোঁজে। তবে ঘরের চারদেওয়াল এক হলেই ছেলেটার রুমান্টিকতা কোন হাই লেভেলে যে গিয়ে ঠেকে, তা রুশার জানা আছে। তার ওপর আজ ঘরে রোজ নেই, চারপাশে নিঝুম গভীর রাত! এমন অবস্থায় একই রুমে একটা তরুণ ছেলে আর মেয়ে থাকলে অনাকাঙ্ক্ষিত কামনা জাগাই তো স্বাভাবিক! কিন্তু রুশা এসব একদম পছন্দ করে না, সে মন থেকে চায় সম্পূর্ণ হালাল এক পবিত্র সম্পর্ক।
রুশা চূড়ান্ত বিরক্ত হয়ে হাত নেড়ে বলল—.
” এই! হচ্ছেটা কী শুনি? লাইভ টেলিকাস্ট বের হন বলছি এখান থেকে!
অধীর এক হাত কপালে রেখে ড্রামাটিক ভঙ্গিতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল—
” উফ! লাল গোলাপী… সবারটা হয়ে যাচ্ছে, আমাদেরটা কবে হবে, কবে কবে লাল গোলাপি আমাদেরো হবে ?
“কী সবার হচ্ছে?”—রুশা ভ্রূ কুঁচকাল।
“এই যে আমাদের ফুল বনু, ঝিনুক মালা… সবাই কী চুটিয়ে প্রেম করছে! আমরাই কেবল শুকনো কাষ্ঠের মতো বসে আছি, কেন ভাই?”
“তো আমরা কী করছি? আমরা প্রেম করছি না?”
” না! আমরা সিনেমায় অভিনয় করছি, বুঝলে?”—অধীর উল্টে গিয়ে বলল।
” তুমি এত উপন্যাস পড়ো , লাল গোলাপী! অথচ আমায় দেখেও একটু রোমান্টিক হতে পারো না?”
রুশা হাত আড়াআড়ি করে দাঁড়াল—
“আপনার মধ্যে কী এমন রোমান্টিকতা আছে শুনি?”
“কী? কিছু নেই আমার মধ্যে?”
অধীর এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে রুশার হাত ধরে এক টানে তাকে বেডে ফেলে দিল! মুহূর্তেই রুশা অর্ধেক শায়িত অবস্থায় অধীরের নিচে আটকা পড়ল।
” কিছু নেই আমার মধ্যে, বলছিলে না?”
ঠিক সেই মুহূর্তে রুশার চোখ গিয়ে থমকে গেল অধীরের চোখের ওপর। কী মায়াবী সেই দুটো চোখ! চোখের পাতার পাপড়িগুলো এত ঘন আর মারাত্মক সুন্দর যে যে কেউ প্রেমে পড়ে যাবে। আর তার ঠোঁট দুটো? একেবারে হালকা গোলাপি, কোনো মেয়ের ঠোঁটকেও হার মানায়। অধীরকে প্রতিদিন এত চঞ্চল দেখালেও, এই আলো-আঁধারিতে তাকে যেন অন্য কোনো দুনিয়ার রাজপুত্রের মতো লাগছে।
” আমার রাশিয়ান বউ…
” অধীর নিচু স্বরে বিড়বিড় করে উঠল।
‘বউ!’—ইস, কী সুন্দর আর গভীর একটা সম্বোধন! রুশার অজান্তেই চোখের পাতা দুটো বন্ধ হয়ে এল।
রুশাকে চোখ বন্ধ করতে দেখে অধীর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে আলতো করে তার ঠোঁট দুটো রুশার বন্ধ চোখের পাতার ওপর ছুঁইয়ে দিল। তারপর অতি শান্ত, অথচ ভারী গলায় বলল—
” আমার না আগের জীবনটা একদম অন্যরকম ছিল, জানো লাল গোলাপী? ভাবতাম প্রেম- ভালোবাসা এসব ফালতু প্যারা, বড্ড বিরক্তিকর জিনিস। মেয়েদের ঘ্যানঘ্যান সহ্য করা আমার দ্বারা অন্তত কোনোদিন হবে না। কিন্তু গড প্রমিস লাল গোলাপী… তোমার প্রেমে পড়ে আমি বুঝেছি, এই জ্বালার ভেতরেই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সুখটা লুকিয়ে থাকে।”
অধীর একটু থামল। তার মায়াবী চোখে আজ একবুক গভীরতার স্পষ্ট ছাপ। সে রুশার গালের ওপর থেকে এক গোছা চুল সরিয়ে দিয়ে বলল—
” আমি হয়তো পৃথিবীর কোনো কিছুতেই সিরিয়াস না, সারাদিন ফাজিলামো করি, সবাইকে হাসাই… কিন্তু তোমার প্রতি আমার এই মনটা কতটা গভীর আর সিরিয়াস, তা তুমি আমার এই বুকের ভেতর কান না পাতলে কোনোদিন বুঝতে পারবে না। আমি হাসতে পারবো লাল গোলাপী, কিন্তু তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না।”
রুশার বুকটা এক অদ্ভুত ভালোবাসায় মোচড় দিয়ে উঠল। সে তোলপাড় করা অনুভূতি সামলাতে না পেরে অস্ফুটে বলল——
“লাইভ টে…”
“নো লাইভ টেলিকাস্ট ! একটু ‘অধীর’ বলে ডাকো না, লাল গোলাপী… শুধু একবার।”
রুশার গলাটা শুকিয়ে এল, সে কাঁপাকাঁপা স্বরে ডেকে উঠল——–
“অ… অধীর…”
” আমি তোমায় বড্ড ভালোবাসি, লাল গোলাপী। সারাটা জীবন থাকবে তো এই পাগলের পাশে?”
” হুম…”
অধীরের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটল, কিন্তু পরক্ষণই তার চোখ দুটো আবার দুষ্টুমিতে চকচক করে উঠল—
” আচ্ছা লাল গোলাপী… আমার ভাইটা নাকি আজ বাসর করবে! উফ, আমারও ইচ্ছে করছে !”
রুশা চোখ বড় বড় করে তাকে ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করল, আহত গলায় শুর ধরলো —
” ওদের হয়েছে কবে আমাদেরো হবে। কবে কবে কবে লাল গোলাপি আমাদেরো হবে।
রুশা পালটা উত্তর দেয় —–
” ওদের বিয়ে হয়েছে, আমাদের তো বিয়েই হয়নি!”
অধীর এক ফালে আবার রুশার উপর ঝুকে পরে —-
” তাহলে চলো এক্ষুনি করে ফেলি!”
অধীর এক সেকেন্ডের মধ্যে গম্ভীর হয়ে হাত উঁচিয়ে বলল—
“কবুল! কবুল! কবুল! ব্যাস, আমার দিক থেকে শেষ। এবার তুমি বলো!
রুশা হতভম্ব হয়ে থাকে অধীরের কথা শুনে —
“এভাবেও কি কখনো বিয়ে হয় নাকি? ফাজিলামো পেয়েছ?”
“হয়! এই অধীর এভাবেই সবার আগে তোমাকে বিয়ে করবে, তারপর আবার সবার সামনে দুনিয়াকে জানিয়ে করবে! বলো না একটু… প্লিজ, একটা ‘কবুল’ বলো! আলহামদুলিল্লাহ্ বলে ফেলি?”
” মানে কী এসবের?”
“মানে হলো, আজ সবার আড়ালে দুজনেই বিয়ে করবো। মন থেকে কবুল পরবো , মিনি বাসর করবো , আর যেদিন ধুমধাম করে সব আনুষ্ঠানিকভাবে হবে, সবার সামনে কবুল পরবো। সেদিন হবে ফুল বাসর! আমার আইডল ব্রো বাসর করবে আর আমি তার শিশ্য হয়ে কিছু না করলে তোমার ক্রাসের অপমান হবে গো লাল গোলাপি ।
“পাগল হয়ে গেছেন নাকি আপনি?”
—রুশা রাগান্বিত স্বরে বললো ।
“হুম, পাগলই হয়ে যাচ্ছি। তোমার এই গোলাপি অধরের ঝরনা দেখে আমি সত্যি সত্যি দেওয়ানা হয়ে যাচ্ছি, লাল গোলাপী…”
“অ… অধীর! কী আজেবাজে কথা বলছেন এসব?”
” তুমি কবুল বলো প্লিজ। কবুল না বললে ছাড়বো না।
” আচ্ছা কবুল বলে ছাড়বেন তো?
” হ্যাঁ ছাড়বো।
” ওকে কবুল, কবুল, কবুল, এবার ছাড়ুন, আর এখান থেকে বের হন।
“হুস! চুপ। একটু আগে কবুল বলেছি না? তোমাকে নিজের বউ মেনেছি। কিন্তু ছাই… দেনমোহর দিতে তো ভুলে গেছি!
অধীর ক্ষণিকের জন্য বিষণ্ণ হওয়ার নাটক করল।
তারপর চট করে নিজের হাতের অতি প্রিয় ও মূল্যবান আংটিটা খুলে নিল। রুশার নরম আঙুলে সেটা ধীরে ধীরে পরিয়ে দিতে দিতে বলল—
“আমার কাছে এখন লাখ লাখ টাকা নেই লাল গোলাপী, তাই আমার সবচেয়ে প্রিয় এই আংটিটাই আপাতত তোমার দেনমোহর হিসেবে দিলাম। তুমি আবার এই কাজী অধীরের বিয়েতে ভুল ধরো না প্লিজ! আর হ্যাঁ, বিয়ের আগে এসব করা যদি পাপ হয়, তবে সেই পাপের সব হিসেব যেন আমার খাতাতেই লেখা হয়। তোমার এই লালচে-গোলাপি ঠোঁটের একটুখানি ছোঁয়া না পেলে আজ রাতে সত্যি আমার দম আটকে যাবে। নিজেকে একটু শান্ত রাখার জন্য হলেও আমাকে এই সুযোগটুকু দাও…”
কথা শেষ হতেই অধীর আর রুশার কোনো উত্তরের তোয়াক্কা করল না। সে ঝুঁকে এসে নিজের উত্তপ্ত ঠোঁট দুটি সোজা রুশার গোলাপী ঠোঁটের ওপর চেপে বসাল!
রুশা চমকে উঠে প্রথমে একটু আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু অধীরের এই অন্ধ উন্মাদনা আর ব্যাকুল ভালোবাসার কাছে সে নিমিষেই আত্মসমর্পণ করল। সে শক্ত করে অধীরের শার্টের কলার খামচে ধরল।
পুরো পাঁচটা মিনিট ঘরে শুধু তাদের নিঃশ্বাসের ঘন আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই শোনা গেল না। এক অনন্ত তৃষ্ণা মেটানোর পর অধীর ধীরে ধীরে মুখ সরাল। তারপর রুশার বুকের ওপর মাথা রেখে তাকে দু-হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল—
“আই এম সো সরি লাল গোলাপী… খুব তৃষ্ণা পেয়েছিল আমার! প্লিজ, তোমার এই জামাইটার ওপর রাগ কোরো না। আর সত্যি বলতে—তুমি রাগ করলেও এখন আমার আর কিচ্ছু করার নেই, কারণ এই অধীর তোমার ভালোবাসায় বড্ড বেশি তৃষ্ণার্ত!”
রুশা ঘাপটি মেরে অধীরের বুকে মিশে আছে। অধীরের ভালোবাসা কতোটা গভির তা অনুভব করছে,অধীর আবারো ভালোবাসাময় কন্ঠে বলে —-
”আমার জীবনের শেষ বিন্দু রক্তটুকু দিয়ে হলেও আমি তোমাকে ভালোবেসে যাব লাল গোলাপি । কারণ তুমি শুধু আমার ভালোবাসা নও, তুমি আমার অস্তিত্ব!
বলে অধীর আবার রুশার ঠোঁটে মত্ত হয়। দুই মিনিট পর মুখ মুছে রুশাকে রেখে নিজের রুমে চলে আসে। দরজা আবজিয়ে দেয় উরাধুরা ডান্স। তার লাল গোলাপিকে আজ বিয়ে করেছে আবার মিনি বাসর করে চলে এসেছে। অধীর খুব ভালো ডান্স পারে সে সুন্দর করে নিজের মনের আনোন্দে ডান্স করতে থাকে। সাদা ট্রি শার্ট হাতা গোটানো হাতে ঘড়ি। অত্যাধিক সুন্দর দেখাচ্ছে,আর জিন্স এর সাথে সাদা শার্ট খাবার ব মানিয়েছে।
রোজকে বুকে নিয়ে বসে আছে সৃজন, আজ সারারাত সময় চেয়েছে রোজের থেকে। সৃজন এমন ভাবে বলেছে রোজ মানা করতে পারে নি। সেই কখন থেকে রোজ সৃজনের বুকে মাথা দিয়ে দোলনায় দোল খাচ্ছে আর জাপটে ধরে আছে, সৃজন অনেক গল্প করেছে। রোজ ও অনেক কিছু বলেছে তার পরিবার নিয়ে। রোজের কষ্টের কথা শুনে সৃজন রোজকে বুকে নিয়ে বলে —-
”ফুল জান, আমি তোমাকে শুধু ভালোই বাসি না, আমি তোমাকে আমার ভেতরে ধারণ করি। আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে, আমার প্রতিটা ভাবনায় শুধুই তোমার রাজত্ব। তুমি যদি মৃত্যুর মুখেও দাঁড়িয়ে থাকো, আমি নিজের জীবন দিয়ে হলেও তোমাকে রক্ষা করার চেষ্টা করব, আল্লাহর কাছে নিজের আয়ু দিয়ে হলেও তোমাকে চেয়ে নেব। তোমাকে ভালোবেসে আমি নিঃস্ব হতেও রাজি, তবুও তোমাকে হারাতে রাজি নই!”তোমার সুখের কারন আমি হবো। আর তোমার সব দুঃখ আমি নিবো তাও তোমায় কষ্ট পেতে দিবো না ফুল জান !
এদিকে সৃজনদের ছাদের চিলেকোঠার ঘর থেকে নুড়ী সবটা পরখ করে। চোখের পানি মুছে বুকে কষ্ট নিয়ে চলে যায় নিজ রুমে।
শেষ রাতের দিকে,,,,,,,,,,
হেরাকে কোলে নিয়ে যখন নাভান ধীর পায়ে হেরার রুমে এসে ঢুকল, তখন ঘরের আবহাওয়ায় যেন হঠাৎ ঝড় বয়ে গেল। ঝিনুককে ফোন দিয়ে বের হয়েছে নাভান। সেই সুবাধে রুমে আগে থেকেই উদ্গ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছিল রোজ আর রুশা। নাভানের কোলে নেতিয়ে পড়া হেরার নিথর দেহটা দেখে দুজনেরই বুক ছ্যাঁৎ করে উঠল! এক মুহূর্তের জন্য যেন পুরো ঘরের বাতাস থমকে গেল। হেরার এমন অবস্থা দেখে ঘরের সবাই ঘাবড়ে গিয়ে নাভানের দিকে হা করে তাকিয়ে রইল।
কিন্তু যার এত কিছু করার কথা, সেই নাভানের মুখে কোনো অনুশোচনার বিন্দুমাত্র ছাপ নেই। সে অত্যন্ত স্থির, কাঠ কাঠ গলায় ঠাণ্ডা কণ্ঠে বলে উঠল—–
“ভয়ে জ্ঞান হারিয়েছে, দ্যাটস ইট! আর হ্যাঁ, মুখে পানি ছিটিয়ে জ্ঞান ফিরাও। নয়তো আমি কিন্তু থাপ্পড় মেরে জ্ঞান ফিরাব!
সৃজন চোখ দুটো ছানাবড়া করে রাগমিশ্রত কন্ঠে বলে উঠল——-
“তোর কি বুকে দয়া-মায়া বলে কিচ্ছু নেই রে নাভান?”
নাভান হেরাকে আলতো করে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে পকেটে হাত পুরে দাঁড়াল। তারপর একবিন্দু অপরাধবোধ ছাড়াই বলল—–
“না, নেই।”
সৃজন রেগে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই নাভান আঙুল উঁচিয়ে একদম সোজা ব্যাখ্যামূলক গলায় বলল——
“শোন, আমি যে এই মুহূর্তে নিজেকে এতটা কন্ট্রোল করে এখানে এনেছি, তোরা হলে জীবনেও পারতিস না! একে চড় মারা তো দূরের কথা, মাথায় তুলে সোজা আছাড় দেওয়া উচিত ছিল!”
এদিকে রোজ আর রুশা হেরার মুখে পানি ছিটিয়ে, মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে সুস্থ করার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। অন্যদিকে সৃজন, অধীর আর ঝিনুক—তিনজনে মিলে নাভানকে ঘিরে ধরল। একদম ডিটেক্টিভদের মতো জেরা করার ভঙ্গিতে নাভানের পথ আটকে দাঁড়াল তারা।
অধীর নাভানের একদম মুখোমুখি হয়ে চোখ ছোট ছোট করে বলল—-
“সত্যি করে বল তো ভাই, কি করেছিস তুই কিউটি পাই বনুর সাথে?”
নাভান টিপিক্যাল একঘেয়ে ভঙ্গিতে এক গাল বাঁকা হেসে উত্তর দিল—-
” বললাম না জাস্ট ভয় পেয়েছে। আর হ্যাঁ , বউ আমার! আমি যা ইচ্ছা করব, তার কৈফিয়ত তোদের মতো ছাগলদের দিতে যাব কেন?”
ঝিনুক হাত উঁচিয়ে বাধা দিয়ে বলল—–
” হ্যাঁ মানছি কিন্তু তার একটা সময় আছে। আর তুই কি বলে গিয়েছিস তা ভুলে গেছিস নাকি?
নাভান ভ্রূ কুঁচকে বলল—-
“আমি কি বলেছি?
সৃজন এবার ফোড়ন কাটল—-
” আরে বাসর বাসর! দরজা লাগানোর আগে যে বললি বাসর রাতের শাস্তি দিবি?”
কথাটা শুনে নাভান একটা বিরক্তিকর শব্দ করে উঠল—-
“তো? তোরা কি কোনোদিন করবি না? আর হ্যাঁ, এই ইডিয়টের সাথে আমার ইহজিন্দেগিতে আদৌ বাসর হবে কি না, তা নিয়ে আমার ঘোর সন্দেহ আছে! আর বাই এনি চান্স যদি বাসর করিও, তবে এই কয়েক ঘণ্টার জন্য নট! মিনিমাম ২৩ দিন বউকে রুম থেকে বের হতে দিব না, লক করে রাখব। সো এখন অই ঘাড়ত্যাড়া মেয়ের জ্ঞান ফিরা আমায় জেরা না করে!
নাভান যে দিন দিন বেপরোয়া আর নির্লজ্জের চুড়ান্তে পৌঁছে যাচ্ছে, তা এই বন্ধু মহলের অজানা নয়। কিন্তু এত মানুষের সামনে মুখ উঁচিয়ে ২৩ দিনের যে ‘প্ল্যান’ সে শোনালো, তা শুনে তিন বন্ধুর হাঁ করা মুখ আর বন্ধ হলো না!
ঠিক তখনই অধীরের তীক্ষ্ণ চোখ গিয়ে পড়ল হেরার দিকে। হঠাৎই খেয়াল করে সে চমকে উঠে নাভানকে পরখ করতে করতে বলে উঠল—-
“এই ভাই, মিথ্যা বলবি না কিন্তু! হেরার ঠোঁট কাটল কীভাবে তাহলে? রক্তের দাগ কেন ওখানে?”
অধীরের মুখ থেকে “ঠোঁট” শব্দটা বের হওয়া মাত্রই যেন নাভানের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা এক হিংস্র সিংহ জেগে উঠল! এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে নাভান অধীরের শার্টের কলারটা শক্ত করে চেপে ধরল। তার চোখের দৃষ্টি তখন রক্তবর্ণ, গলায় ঝরে পড়ছে প্রলয়ঙ্করি রাগ।
নাভান গজগজ করে উঠে বলল—–
” এই! চোখ উপড়ে একদম হাতে ধরিয়ে দেব! ওর ঠোঁটের দিকে নজর দিলি কেন, তুই ?”
অধীর তো নাভানের এমন আচমকা আক্রমণে বিষম খাওয়ার জোগাড়! শার্টের কলার ছাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতে আকুল হয়ে বলল—
“আরে ভাই! মানুষের মুখের দিকে তাকালে ঠোঁট তো চোখে পড়বেই! ঠোঁট কি আমি পকেট থেকে বের করে দেখছি নাকি?”
নাভান কলারের চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়ে গর্জে উঠল—-
“নো! নেভার! আজ থেকে তুই যদি হেরার সামনে কথা বলিস, একদম মাথা নিচু করে বলবি! এক চুল ওপরে চোখ উঠলে আমি কী করব জানি না!”
অধীরও এবার নিজের আত্মসম্মানে লেগে গিয়ে বলে উঠল—
“কেন রে ভাই? আমার বুনুর দিকে আমি তাকাব, তোর তাতে কী রে ভাই ?”
নাভান চোখের পলক না ফেলে ধীর শান্ত কিন্তু মারাত্মক গলায় বলল—
“যেখানে আমি নিজ বাবাকে ছাড় দিয়ে কথা বলি না, সেখানে তুই কোন বাল ? তোকে তো একদম! যাই হোক তুই আজ থেকে কথা বললে মাথা নিচু করে বলবি। আর কিউটি পাই বনু না বলবি কিউটপাই ভাবিমা!!
অধীর এবার দুই হাত তুলে হা-হুতাশ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠল—–
“গেলো রে গেল! গেলোওওও” এ ছেলে বাসর না করতে পেরে পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছে! মাথাটা একদম গেছে এর!”
নাভান অধীরকে এক ধাক্কায় পেছনে সরিয়ে দিয়ে কড়া গলায় হুকুম জারি করল—-
“তুই এই মিসাইল গার্লের সামনে পড়লে সবসময় মাথা নিচু করে থাকবি! সোজা ওর পায়ের জুতোর দিকে তাকিয়ে কথা বলবি, বুঝেছিস?”
পাশ থেকে ঝিনুক এতক্ষণ হাঁ করে এই নাটকের দৃশ্য দেখছিল। সে এবার নাভানের পাগলামি দেখে এগিয়ে এসে বলল—
“নাভান! তুই কি আসলেই পাগল হয়ে গেছিস নাকি? ও তো সত্যি কথাই বলছে। আর হেরার ঠোঁট দিয়ে…”
ঝিনুকের কথা শেষ হওয়ার আগেই নাভান ঘুর দাঁড়াল। ঝিনুককে একদম থামিয়ে দিয়ে আঙুল উঁচিয়ে গম্ভীর গলায় বলল—–
” এই তোকে শুধু বলেছি জ্ঞান ফিরাতে অই ব্যায়াদপ এর, আর কোথা খেয়াল করতে বলি নি। তুই মেয়ে বলে মাফ পেয়ে যাবি ভেবেছিস? মিসাইল গার্ল এর দিকে তুইও তাকাবি না! নো ওয়ান!
নাভানের এই অদ্ভূত আর মাত্রাতিরিক্ত পসেসিভনেস দেখে পুরো বন্ধু মহল যেন আকাশ থেকে পড়ল! ঝিনুক ওদের নিজের বোনতুল্য বান্ধবী, এমনকি সে নিজেও একজন মেয়ে! তাকেও পসেসিভনেসের দোহাই দিয়ে হেরার দিকে তাকাতে বারণ করছে?
অধীর ফ্লোরে বসে পরে কপালে হাত দিয়ে বলে উঠে —
”ওরে আমার ‘পসেসিভনেস’-এর এভারেস্ট! একটা মেয়েও তার বয়ফ্রেন্ড বা বান্ধবীর জন্য জীবনে এত পসেসিভ হতে পারে না, যতখানি তুই আজ আমাদের দেখালি! তোকে তো ‘ওভার-পসেসিভনেসের’ ওপর গোল্ড মেডেল দেওয়া উচিত। ওরে ভাই, কেউ আমাকে একটু পানি খাওয়া! নাভানের পসেসিভনেস দেখে বঙ্গোপসাগরের এগারো নম্বর বিপৎসংকেতও তো লজ্জা পেয়ে ডুবে মরবে! ভালোবাসি বলে না কিন্তু,পাড়ার হিংসুটে কাকিদের মতো ব্যাবহার!
সবাই বুঝতে পারল, নাভানের ভেতরের হিংসা ও জেলাসির ভূত এখন চরম পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। বাসরের নাম করে মেয়েটাকে ভয় পাইয়ে অজ্ঞান তো করেছেই, এখন বউয়ের ঠোঁট তো দূরের কথা, মুখের দিকে তাকানোর অপরাধেও বন্ধুদের হাত-পা কেটে নেওয়ার ধমক দিচ্ছে! এ ছেলে সত্যি সত্যিই হেরার ভালোবাসায় পাগল না হয়ে ছাড়বে না!
এদিকে মন্ত্রী জাওয়াদ খানের চোখে আজ একফোঁটা ঘুমও নেই! মাথার ভেতরের চিন্তার পোকাগুলো যেন সার্কাস দেখাচ্ছে। ঘরের পরিস্থিতি কিছুটা বোঝার জন্য নিজের প্রাণপ্রিয় সহধর্মিণীকে বুকের কাছ থেকে সাবধানে সরিয়ে, একদম টিপিটিপি পায়ে ঘর থেকে বাইরে বের হয়ে এলেন তিনি।
নিজের জন্ম দেওয়া বাঘমার্কা ছেলের চোখের আড়াল হতে একটা দারুণ বাহানা দাঁড় করিয়ে তো ভেগেছেন ঠিকই, কিন্তু মনের ভেতরটা কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে! বেচারি পুতুলের মতো মায়াবী মেয়েটাকে নাভান নিজের যে রূপটা দেখাল, মেয়েটা শেষমেশ নাভানের রাগ আর হিংস্রতার শিকার হয়ে গেল না তো? এই ভেবে জাওয়াদ খানের মনে ভয় আর শঙ্কার পারদ চড়চড় করে চড়ছিল।
জাওয়াদ খান ধীর পায়ে করিডোর পেরিয়ে ড্রইংরুমের দিকে এলেন। পুরো বাড়ি তখন নিশুতি রাতের নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। চারপাশটা নিঃশব্দ দেখে একটা স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি। মনে মনে নিজেকেই সান্ত্বনা দিয়ে বিড়বিড় করে উঠলেন, — “যাক বাবা, কোনো গণ্ডগোল হয় নাই! বেঁচে গেছি, সেফ জোনে আছি। উফ, কী ছেলে মাইরি! আমি এত বছর আগে বাসর করেছিলাম রয়েসয়ে, লজ্জাশরম বজায় রেখে… আর এই ছেলের অভিধানে তো ‘লজ্জা’ শব্দটার ‘ল’-ও নেই!”
কথাটা নিজের মনে বলতে বলতেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ডাইনিং টেবিল থেকে এক গ্লাস পানি ঢেলে খেতে গেলেন জাওয়াদ খান।
ঠিক তখনই অন্ধকার কোণ থেকে ভেসে এল নাভানের অতি চেনা, কড়া ও ঠাণ্ডা গলা—-
“কে বলল ‘লজ্জার ল’ নেই, শ্বশুর বাবা ”
জাওয়াদ খান পানির গ্লাসটা মুখের কাছে নিয়েও যেন শকে জমে বরফ হয়ে গেলেন!
নাভান পকেটে হাত পুরে ধীর পায়ে হেঁটে অন্ধকারের ভেতর থেকে আলোর নিচে এল। মুখে এক চিলতে শয়তানি হাসি ঝুলিয়ে অত্যন্ত ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বলল—-
“বিয়ে করেছি সেই ‘দুধভাত’ খেলার বয়সে! অথচ এখনো যে তোমার কোলে একটা পুরো ক্রিকেট টিম ধরিয়ে দিইনি—এটাই কি অনেক বেশি না? আমার লজ্জা আছে বলেই তো এখনো নাতি-পুতির মুখ দেখতে পাচ্ছ না! আমার জায়গায় যদি তুমি থাকতে, এতদিনে ক্রিকেট কেন, অলিম্পিকের প্লেয়ারের স্কোয়াড বানিয়ে ফেলতে!”
ছেলের এমন অকপট ও নির্লজ্জ মার্কা সংলাপে পানির শেষ ফোঁটাটুকু গিলে নেওয়ার আগেই জাওয়াদ খানের গলায় বিষম লাগার জোগাড়! কথায় বলে না—যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই রাত হয়! তিনি তড়িঘড়ি করে মুখের পানিটুকু উগড়ে না দিয়ে কষ্ট করে গিলে গ্লাসটা সশব্দে টেবিলে রেখে দিলেন।
নিজের প্রতাপশালী মন্ত্রী বাবাকে এভাবে ঘাবড়ে গিয়ে থতমত খেতে দেখে নাভান সশব্দে হেসে উঠল। অত্যন্ত রসিকতার সুরে বলল—-
“আহা! নিন শ্বশুর বাবা , পানিটা শান্ত হয়ে খেয়ে নিন। এত ঘামছেন কেন?”
জাওয়াদ খান চোখ দুটো গোল গোল করে তোতলাতে তোতলাতে বললেন—–
“তু… তু… তুমি? এত রাতে এখানে কী করছ?”
নাভান একটা লম্বা আড়মোড়া ভেঙে বেশ ভাব নিয়ে বলল—–
“কী আর করব বলো? তুমি তো আর ছেলের শখ-আহ্লাদ পূরণ করার লোক নও! সব কাজ তো আমারই করতে হয়।”
জাওয়াদ খান বুক চিতিয়ে ভয় ঢাকার ব্যর্থ চেষ্টা করে গমগমে গলায় জিজ্ঞেস করলেন—-
“তাই বলে তুমি… তুমি কী করেছ আমার মেয়ের সাথে, হ্যাঁ?”
নাভান ভ্রূ উঁচিয়ে একদম ঠাণ্ডা গলায় পালটা প্রশ্ন করল—
“বাসরঘর রেডি করে দিলে কী হতো, শুনি?”
জাওয়াদ খান কানে হাত দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন——
“আহ্! এই নির্লজ্জ ছেলে! মুখে একটু কথা আটকায় না? ছি ছি, তুমি বাবার সামনে কী বলছো এসব?”
নাভান এ কথার কোনো তোয়াক্কাই করল না। সে খুব স্বাচ্ছন্দ্যে শার্টের ওপরের বোতামগুলো একে একে খুলতে শুরু করল। নিজের গায়ের শার্টটা এক টানে খুলে ফেলতেই ডাইনিং টেবিলের জগ থেকে সোজাসুজি গ্লাসে পানি ঢেলে এক চুমুকে খেয়ে নিল।
তারপর নিজের কাঁধটা একটু ঝাঁকিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বলে উঠল——-
“হুমম, যা বলছিলাম… তোমার মেয়ের নখগুলো কাল সকালে উঠে সবার আগে কাটতে হবে! দেখেছ আমায় কীভাবে আঁচড়ে-কামড়ে শেষ করেছে? উফ! অবশ্য বউয়ের কাছ থেকে প্রথম রাতে এসব একটু-আধটু সহ্য করতেই হয়, লাভ সাইন বলে কথা!”
কথাটা শোনামাত্রই জাওয়াদ খানের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল! টর্চের আলোর মতো তাঁর চোখ গিয়ে পড়ল নাভানের অনাবৃত গাড়ে, রগে আর গলায়! স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে জায়গায় জায়গায় নখের দীর্ঘ আঁচড়ের দাগ আর হাতের সুগঠিত পেশিতে দাঁতের গভীর কামড়ের লাল হয়ে থাকা চিহ্ন!
ছেলের গায়ে এসব ‘যুদ্ধের দাগ’ দেখে জাওয়াদ খানের তো হার্ট অ্যাটাক হওয়ার দশা! তিনি দুই হাতে চোখ ঢেকে এক কদম পেছনে হটে গিয়ে চিল্লিয়ে উঠলেন—–
“ছি ছি ছি! নির্লজ্জের ধাড়ি একটা! গায়ে জামা পর আগে! পোশাক পর! তুমি .. তুমি তাহলে সব শেষ করে ফেলছো এক রাতে? এত অধৈর্য তুমি ”
আসলে, বাবা তাকে অতীতে কম জ্বালাননি! জীবনের একটা কঠিন মোড়ে দাঁড়িয়ে আজ নাভান যেন সুদে-আসলে সেসব ফেরত দিচ্ছে। সেদিন যদি বাবা তাকে অত নিষ্ঠুরভাবে ফিরিয়ে না দিতেন, তবে হয়তো আজ হেরার এই পরিণতি হতো না। হেরার স্মৃতি থেকে নাভানের নামটা আজ এভাবে চিরতরে মুছে যেত না। সব পরিস্থিতি হয়তো শেষ পর্যন্ত মানিয়ে নিয়েছে সবাই, কিন্তু মাঝখান থেকে হেরার মন থেকে মুছে গেছে নাভানের অস্তিত্বটুকু! একটা মানুষের স্মৃতিতে নিজের প্রিয়তম রূপটা হারিয়ে যাওয়ার কষ্ট যে কতটা বিষাক্ত আর গভীর—তা কেবল নাভানই জানে। আর তার এই যন্ত্রণার নিরানব্বই ভাগ দায় যাঁর, তিনি আর কেউ নন—জাওয়াদ খান!
তাই নাভান আজ এক অদ্ভুত দ্বৈত খেলায় মেতেছে। একদিকে সে বাবাকে ভালোবেসে পরম আদরে বুকে টেনে নিচ্ছে, আর অন্যদিকে একটু একটু করে জ্বালাতন করে তুলছে। ভাবটা এমন—পুরোনো হিসেব তো চুকাতেই হবে!
জাওয়াদ খানের তো উচিত ছিল মেয়েকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ভালোবাসার মানুষের হাতে তুলে দেওয়া, দুজনকে একসাথে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া। তা না করে, তিনি উল্টো নাভানের কোনো তোয়াক্কা না করে মেয়েকে দূরে পাঠাল? তাও আবার তার বিন্দুমাত্র অনুমতি ছাড়া!
বাবা যখন বড় বড় কথা বলছেন, নাভান তখন এমন ভাব ধারণ করল যেন সে পৃথিবীর সবচেয়ে মাসুম আর নিষ্পাপ কোনো শিশুর মতো বাবার জ্ঞানগর্ভ বাণী শুনছে। অতল গম্ভীর চোখ দুটোকে সামলে নিয়ে, অতি-ভদ্র এক ভঙ্গিতে সে মুখ খুলল—
“সব শেষ মানে? কী বলতে চাইছ শুনি?”
জাওয়াদ খান লজ্জায় লাল-নীল-বেগুনি হয়ে তোতলাতে তোতলাতে বললেন—–
“এমন ভাব ধরছ যেন কিছুই বুঝো না! কচি খোকন একটা! আমি তোমার বাবা হই, আমি কীভাবে মুখে আনি এসব কথা? তোমার মতো অন্তত এতটা বেলজ্জা আর নির্লজ্জ আমি নই!”
নাভান হাত দুটো বুকের ওপর বেঁধে একগাল হেসে শয়তানি ভঙ্গিতে বলল—-
“আরে ধুর শ্বশুর বাবা ! এখনো কিছুই করিনি। তোমার জমানো ব্যাংক ব্যালেন্স আর কষ্টার্জিত টাকা একদম শেষ না করে আমি কিছুই করব না, নিশ্চিন্ত থাকো!”
জাওয়াদ খান চোখ বড় বড় করে তাকাতেই নাভান আঙুল তুলে কড়া হুকুম দেওয়ার সুরে বলল—–
“আর হ্যাঁ, আসল বাসরঘর তুমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সাজাবে। সুন্দর ফুল দিয়ে, অরিজিনাল রোমান্টিক ফিল এনে! সেদিনই যা হওয়ার আনুষ্ঠানিকভাবে হবে। এখন আপাতত তোমার মেয়ে ভয় পেয়ে একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছে তো… তাই তাকে সুস্থ করার জন্য কেবল অল্প একটু গ্লুকোজ আর একটু অক্সিজেন থেরাপি দিয়ে এলাম! দ্যাটস ইট।”শ্বশুর বাবা!
” নিজ জন্মদাতাকে শ্বশুর বলতে লজ্জা করে না!
” না! একদিম করে না! কারন তুমি তো বাবার মতো আঁচড় করো না। গুন্ডা শ্বশুর এর মতো আচরণ সেই প্রথম থেকে করে যাচ্ছো!
” যাও যাও তোমার সাথে কথা বকা বেকার। মেয়ে রাজি তো ডাকবো কাজি!
” কাজি আর ডাকা লাগবে না। অক্সিজেন, গ্লুকোজ থেরাপি নিয়মিত পেলে আর কাজির প্রয়োজন নেই!!
“অক্সিজেন থেরাপি” আর “গ্লুকোজ”-এর আসল মানে বুঝে জাওয়াদ খানের কানের পাশ দিয়ে যেন গরম ধোঁয়া বের হতে লাগল!
তিনি চরম বিরক্তি ও লজ্জায় নাক-মুখ খিঁচে, দুই হাতে নিজের কান চেপে ধরলেন। এই মহা-নির্লজ্জ আর ঠোঁটকাটা ছেলের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজের ইজ্জতের ফালুদা করার আর কোনো ইচ্ছেই তাঁর রইল না! তিনি বিড়বিড় করে নিজেকেই গালি দিতে দিতে অতি দ্রুত পা চালিয়ে সেখান থেকে ভেগে নিজের ঘরের দিকে রওনা হলেন।
পিছনে দাঁড়িয়ে নাভান গ্লাসের বাকি পানিটুকু শেষ করতে করতে আড়ালে যাওয়া বাবার কাণ্ড দেখে একটা বিজয়ের বাঁকা হাসি হেসে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল!
সময় নিজের গতিতেই বয়ে চলেছে। দেখতে দেখতে কেটে গেছে বেশ কয়েকটি মাস। আগামীকাল ভোরেই সবাই মিলে সাজেকের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে। সেই ভ্রমণের উত্তেজনায় বাড়ির ছোট-বড় সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে—কেউ ব্যাগ গোছাচ্ছে, কেউ ক্যামেরা চার্জে বসিয়েছে, আবার কেউ ভ্রমণের পরিকল্পনা নিয়ে গল্পে মেতে আছে।
কিন্তু এই কোলাহলের মাঝেও একজন মানুষ যেন ধীরে ধীরে নিজের ভেতরেই গুটিয়ে গেছে।
সে হেরা।
সেদিনের ঘটনার পর থেকে মুখে হাসি থাকলেও সেই হাসি আর চোখ পর্যন্ত পৌঁছায় না। সেদিন ৩ ঘন্টা অজ্ঞান থাকার পর গা কাপিয়ে জ্বর চলে আসে সেই জ্বর তিন দিন থাকে। হেরা এখন প্রয়োজন ছাড়া সে খুব একটা কথা বলে নাভানের সাথে। অকারণে হাসাহাসি কিংবা সবার সঙ্গে আড্ডায় মেতে ওঠার অভ্যাসটাও নাভানের সামনে করে না । সে এখন নাভানের এসব লুকুচুড়ির কারন খুজতে বেস্ত।
অন্যদিকে নাভানও নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিল। সে হেরার প্রশ্নে এড়িয়ে গেছে বরাবর। সেদিনের পর সবার সামনে বলেছিলো হেরার ব্যাপারে যা কিছু হয় তা যেন অবশ্যই তাকে জানানো হয় সবার আগে। সেদিন চাইলে সে হেরাকে নিজের কাছে রাখতে পারতো, কিন্তু তার উদেশ্য হাসিল করে সে বরং ইচ্ছে করেই নিজের রুমে দিয়ে এসেছিল, যাতে হেরা কোনোভাবেই মনে না করে তার সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটেছে কিংবা নাভান তার দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছে। নাভান জানত, একজন ভীত বা বিভ্রান্ত মেয়ের মনে ভুল ধারণা জন্মালে সেই ক্ষত সহজে মুছে যায় না।
আর নাভানের ব্যক্তিত্ব এমনই ছিল যে, বাড়ির কেউ তাকে অকারণে প্রশ্ন করার সাহসও পেত না। সবাই বুঝত, সময় হলেই সে নিজেই সব বলবে।
তবে নাভানের সামনে এলেই হেরার বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠত। লজ্জায় চোখ তুলে তাকাতে পারে না। কথা বলতে গেলেও গলা শুকিয়ে আসে। অথচ এই লজ্জার আড়ালেই লুকিয়ে ছিল হাজারো প্রশ্ন, হাজারো অজানা উত্তর পাওয়ার অপেক্ষা।
হেরা দিন গুনছিল। আর মাত্র কয়েক মাস।
তারপরই ফিরে আসবে প্রিয়।
সেই দিনটির অপেক্ষায় যেন প্রতিটি সকাল আর প্রতিটি রাত একটু একটু করে গুনে রাখছিল সে। তার বিশ্বাস, প্রিয় ফিরলেই এতদিনের সব রহস্যের জট খুলবে। এত প্রশ্নের উত্তর মিলবে। তাই অস্থির হলেও নিজেকে ধৈর্য ধরতে শিখিয়েছে হেরা। সে অতটা অভুজ না নাভান যদিও তার সাথে কম কথা বলে ইদানিং কিন্তু তার সব কিছুতেই কেয়ার রাখে। হেরা সব বুঝে কিন্তু নাভানের মুখ থেকে ভালোবাসি কথাটা আর কেনো এতো লুকুচুড়ি করেছে তার সাথে তার অনূভুতির সাথে সেই কথা আভাষ পেলে না হেরা। বরং হেরা কিছু বললে নাভান এড়িয়ে যায় হেরাকে।
এদিকে বাকিদের জীবন যেন স্বাভাবিক ছন্দেই এগিয়ে চলেছে। প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্বে ব্যস্ত। অফিস, ব্যবসা, পড়াশোনা—সবকিছু নিয়েই চলছে নিয়মমাফিক জীবন।
তবে বন্ধু মহলের তিনজন সদস্যের অবস্থা একটু ভিন্ন।
সেদিনের অবিবেচক কাজের জন্য শাস্তিস্বরূপ তাদের তিনজনকে এক সপ্তাহের জন্য তিনটি ভিন্ন জেলায় একটা কাজে পাঠানো হয়েছে। এমন সব দুর্গম এলাকা, যেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক পর্যন্ত ঠিকমতো পৌঁছায় না। চাইলেও কারও সঙ্গে যোগাযোগ করার উপায় নেই। যেন এক সপ্তাহের জন্য পৃথিবী থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে তারা।
এ শাস্তির উদ্দেশ্য শুধু কষ্ট দেওয়া নয়, বরং দায়িত্ববোধের মূল্য শেখানো।
অন্যদিকে অনেকদিন ধরে লোকচক্ষুর আড়ালে থাকলেও শামসুল আজমীর চৌধুরী যেন হাল ছাড়ার মানুষ নয়।
সে প্রকাশ্যে আর কোথাও দেখা না দিলেও ফোনের মাধ্যমে একের পর এক বিরক্ত করে চলেছে অ্যাডভোকেট ও এমএলএ কাজল খানকে।
প্রথমে নিজের নম্বর থেকে ফোন।
তারপর আরেকটি নম্বর। তারপর আরও একটি।
কাজল খান প্রথম দুটি নম্বরই ব্লক করে দিয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, এতেই হয়তো লোকটার বিরক্তি শেষ হবে। কারণ নিজের কথামতোই তো তিনি তাকে ছেড়ে দিয়েছিলেন। এরপরও কেন এই অবিরাম যোগাযোগের চেষ্টা?
কিন্তু শামসুল যেন এক অদ্ভুত নেশায় মেতে উঠেছে।
একটি নম্বর ব্লক হলেই আরেকটি নম্বর থেকে কল আসছে।
গতো কালের ঘঠনা। সকালের নরম রোদ তখন ধীরে ধীরে রান্নাঘরের জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকছে। রান্নাঘরজুড়ে ভেসে বেড়াচ্ছে গরম পরোটা আর ঘি-ভাজা ডিমের সুগন্ধ।
কাজল খান নিজের হাতে সকালের নাস্তা তৈরি করছেন।
পাশেই তৌহিদা তালুকদার ব্যস্ত টেবিল গুছিয়ে রাখতে।
এই কয়েক মাসে বাড়ির পরিবেশটাই যেন বদলে গেছে। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও সবাই একে অপরের আপন হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন নিজের হাতে সবার জন্য খাবার পরিবেশন করতে কাজল খানের ভীষণ ভালো লাগে। ছেলেমেয়েগুলো যেন অজান্তেই তার হৃদয়ের একটা বড় অংশ দখল করে নিয়েছে।
তুষারও এর ব্যতিক্রম নয়।
তৌহিদা তালুকদারের স্নেহও যেন সীমাহীন। তাকে দেখলে কেউ বিশ্বাসই করবে না যে এই সন্তানদের সঙ্গে তার রক্তের কোনো সম্পর্ক নেই। ভালোবাসা কখনো কখনো জন্মসূত্রের সম্পর্ককেও হার মানিয়ে দেয়—এই বাড়িটাই তার জীবন্ত প্রমাণ।
ঠিক তখনই—
টেবিলের ওপর রাখা মোবাইল ফোনটা আবার কেঁপে উঠল। একবার…দুইবার…তিনবার…
একটানা বেজেই চলেছে।
মন্ত্রী জাওয়াদ খান প্রথমে গুরুত্ব দিলেন না। কিন্তু একই নম্বর থেকে বারবার কল আসতেই বিরক্ত হয়ে ফোনটা হাতে তুলে নিলেন। স্ক্রিনে অচেনা নম্বর।
কল রিসিভ করতেই ওপাশের কণ্ঠস্বর শুনে মুহূর্তেই তার মুখের শান্ত ভাব মিলিয়ে গেল।
চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
চোখে নেমে এল কঠিন আগুন।
এক মুহূর্তও দেরি করলেন না।
ফোন কেটে দিয়ে দ্রুত বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন।
মন্ত্রী জাওয়াদ খানের সঙ্গে ছিলেন একজন অভিজ্ঞ পুলিশ ইন্সপেক্টর।
গাড়িটা শহরের ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে ধীরে ধীরে পৌঁছাল শামসুল আজমীর চৌধুরীর বাড়ির সামনে।
বাড়ির প্রধান দরজা অর্ধেক খোলা।
ভেতরে ঢুকতেই তীব্র মদের গন্ধ নাকে এসে লাগল।
ড্রয়িংরুমের মাঝখানে বসে আছে শামসুল।
পরনে আগের মতোই দামি প্যান্ট-শার্ট। সামনে কাচের টেবিলে রাখা খোলা বিদেশি মদের বোতল, অর্ধেক ভরা গ্লাস আর ছড়িয়ে থাকা কয়েকটি সিগারেটের অবশিষ্টাংশ। চোখ দুটো লালচে।
চেহারায় ক্লান্তি থাকলেও অহংকারের বিন্দুমাত্র কমতি নেই। জাওয়াদ খানের ধৈর্য তখন প্রায় শেষ।
কোনো কথা না বলে তিনি ঝড়ের বেগে এগিয়ে গিয়ে শামসুলের শার্টের কলার শক্ত করে চেপে ধরলেন।
এক ঝটকায় তাকে সোফা থেকে দাঁড় করিয়ে দিলেন।
কিন্তু শামসুলও কম নয়।
ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে এক ঝাড়ি দিয়ে দাওয়াত খানের হাত সরিয়ে দিল।
তারপর চোখে চোখ রেখে ব্যঙ্গভরা কণ্ঠে বলল,
“ওহ…! মন্ত্রী সাহেব নিজেই চলে এসেছেন? কী ব্যাপার? আমার মতো একজন মানুষকে দেখতে এত কষ্ট করে আসতে হলো নাকি?”
জাওয়াদ খান কিছু বলতে উদ্যত হতেই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ ইন্সপেক্টর শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে সামনে এগিয়ে এসে বললেন,
“মি. শামসুল আজমীর চৌধুরী–
কথা বলার আগে অনুগ্রহ করে নিজের অবস্থাটা বুঝে নিন…”
পুলিশ ইন্সপেক্টর বললো কতাটা। তারপর পুলিশ ইন্সপেক্টর শামসুল আজমীর চৌধুরীর সামনে গিয়ে বলে।
” আপনি নাকি উনার মেয়েকে আর উনার বউ কে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন?
শামসুর আজমির চৌধুরী দ্রুত বলেন যেন এখানে এমন রায় হচ্ছে যে তার এই কথায় সব মুক্তি মিলবে —
” আলবাত দিয়েছি! আগে নিজের জন্য দিয়েছিলাম, এখন ছেলের জন্য দিচ্ছি। বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া কি কোনো অপরাধ নাকি? আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আইন বই না পড়ে শুধু থানার চা-ই বেশি খেয়েছেন!
পুলিশ অবাক হয়ে যায় তাকায়।
শামসুর আজমির চৌধুরী আবার বলে মাতাল কন্ঠে —
” দেখেন অফিসার, চুরি-ডাকাতি করলে ধরতেন, আমি তো শুধু সম্পর্কের আবেদন করছি। আবেদন করলে কি মামলা দিবেন নাকি?
পুলিশ ইন্সপেক্টর বিরক্ত হয়ে বলে —
” আপনার লজ্জা করে না।
শামসুল আজমীর চৌধুরীর স্বাভাবিক উত্তর —
” কেন করবে? চাকরির আবেদন দশ জায়গায় করা যায়, আর বিয়ের আবেদন এক জায়গায় করলেই সমস্যা।
ধানের ধৈর্যের ভাব ভেঙ্গে যায় সে নাকে মুখে ঘুসি মারে কয়েকটা করিয়ে রক্ত বের হয় শামসুল আজমীর চৌধুরীর যারা ধানের ফোন আসে এর আগে গজগজ করে বলতে থাকে।
” নেক্সট টাইম আর কখনো যদি বিরক্ত করতে দেখি বা আমার বাড়ির কোন সদস্যের আশেপাশে দেখি এই দেশ ছাড়া করবো না সোজা মাটিতে পুঁতে রাখবো বলে দিলাম।
গটগট পায়ে প্রস্থান করে জাওয়াদ খান। শামসুল আজমির চৌধুরী মুখের রক্ত মুছে ন্যায় টিস্যুতে লাল বর্ণ দেখে বলে।
” এই রক্তের প্রতিশোধ অতি শীগ্রই পাবে? মন্ত্রী জাওয়াদ খান। আমার স্থান কেড়ে নেয়ার ফল পাবি তুই!
হেরা ব্যাগ গুছাচ্ছে আর নাভানের সাথে হওয়া ঝামেলার কথা ভাবছে। সে কি ভুল করছে নাকি নাভান ভুল। সেদিনের নাভানের অই কাহিনির পর
ডায়েরির প্রতিটি কথা হেরা পরদিন সবাইকে জানায়। সবাই তো অবাকের চরম সীমানায়! নাভান যে গভীর জলের মাছ, সেটা তো বন্ধু মহলের সবাই আগে থেকেই জানত। কিন্তু তাই বলে তার মতো গম্ভীর ছেলের জীবনে এমন এক লুকুচুরি প্রেম লুকিয়ে আছে—এটা সবার ভাবনারও বাইরে ছিল।
বন্ধু মহল কতভাবে নাভানকে পরীক্ষা করেছে, কথা বের করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু নাভান বরাবরই ধমকের সুরে বা কথা কাটিয়ে চলে গিয়েছে। কিন্তু সেদিন আর সে পারল না। একদিনের কাহিনি—সৃজন, তুষার, অধীর আর ঝিনুক মিলে নাভানকে এমনভাবে চেপে ধরল যে তার আর পালানোর পথ রইল না।
তাদের কথোপকথন ছিল ঠিক এমন—-
” তুই হেরাকে আগে থেকে চিনতি? আই মিন, আগে থেকে পছন্দ করতি?
সৃজন কৌতূহলী চোখে তাকাল—-
“হোয়াট আর ইউ ম্যাড!”
নাভান বিরক্ত হয়ে জবাব দিল। তুষার ফোড়ন কেটে বলল—
“সালা বাবু তোমার ম্যাড মুড বাদ দাও । ফর্মে আসো ভাই। তা কবে থেকে লুকুচুরি প্রেম করছো ?”
ঝিনুকও যোগ করল—-
” হ্যাঁ বল নাভান, এর জন্যই কি তুই কোনো মেয়েকে পাত্তা দিতি না?”
নাভান চোখ রাঙিয়ে বলল—
” ফালতু বকবকানি বন্ধ কর তোরা।”
এবার অধীর আসল বোমাটা ফাটাল—
” তাহলে কিউটিপাই বনু যে বলল তুই নাকি তার গোপন প্রেমিক?”
কথাটা শুনেই থতমত খেয়ে গেল নাভান। ডায়েরিটার যে লক হেরা খুঁজে পেয়েছে, সেটা সে ভালোই বুঝতে পারছে। কিন্তু এখন যে সব সত্যি ফাঁস করার সময় হয়নি!
হেরা সেদিন কোনো লুকোছাপা না করে অকপটে নাভানকে ডায়েরির কথা বলেছিল। কিন্তু নাভান তার চিরচেনা গম্ভীর রূপে ফিরে এসে বলে —
“ডেট ওভার গাঁজা খেয়ে কী পড়তে কী পড়েছো , মিসাইল গার্ল ”
হেরা দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে বুক ফুলিয়ে বলেছিল–
” আমি ভুল নই। আপনি লুকুচুরি করছেন মিস্টার অসভ্য গিটারওয়ালা! এখন তো মনে হচ্ছে সব আপনার পূর্বপরিকল্পিত নাটক। আই মিন, এই বিয়েটাও!”
পরিস্থিতি বেগতিক দেখেও ঘাবড়ে না গিয়ে নাভান অকপটে উত্তর দিয়েছিল—
“আমার বয়েই গেছে গুন্ডাদের হাতে মার খেয়ে ওইসব করতে! ভার্সিটির প্রথম দিন তো আমি জানতামও না যে তুমি আমার কাজিন হও।”
তখনই অধীর মাঝখান থেকে বলে উঠেছিল—
” ভাই, শুধু কাজিন না, ছোটবেলার বিয়ে করা বউ!”
নাভান এবার সত্যি সত্যি রেগে গিয়ে বলল—
‘ যে বিয়ে কারো মনে নেই, সেই সম্পর্ক আমি ধরি না। আর এখন যেহেতু আমার নামের সাথে তার নাম জড়িয়ে গিয়েছে, সো ও আমার অধিকার!”
হেরা তখন জেদ ধরে বলেছিল—
“ওহ তাই? কিন্তু আমি আমার সেই রহস্যময় ‘জি ম্যান’ কে ভালোবাসি।”
“ওহ, তুমি ভালোবাসতেই পারো যাকে ইচ্ছে। বাট অন্য কারো সাথে হাত ধরাধরি, কথা বলা—ওইসব নট এলাউড। গট ইট? আমি কোনো সস্তা পুরুষ নই।”
“আপনি মিথ্যা বলছেন!” হেরা চেঁচিয়ে উঠেছিল।
“আমি মিথ্যা বলতে যাব কেন?”
“তাহলে ওই ডায়েরিটা কী?”
নাভান চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছিল—
“আনো ডায়েরি, দেখি আমরা!”
তার ঠিক দুদিন পর, হেরা অনেক হেনতেন বুঝিয়ে ফারুক সাহেবের কাছ থেকে ডায়েরিটা উদ্ধার করে নিয়ে আসে। কিন্তু ডায়েরিটা খোলার পর হেরা চরম অবাক হলো! ডায়েরি সেম, তার লকও সেম, কিন্তু ভেতরের লেখাগুলো সম্পূর্ণ আলাদা! সেখানে কোনো গোপন প্রেমের ইতিহাস নেই, শুধু সাধারণ কিছু ভালোবাসার ছন্দ লেখা।
নাভান সেদিন হেরার বোকা বনে যাওয়া মুখটা দেখে আড়ালে কুটিল হেসেছিল। হেরা রাগে কাঁপতে কাঁপতে নাভানের কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেছিল—.
” আপনি আমায় মিথ্যা প্রমাণ করছেন! আপনিই এটা বদলেছেন।”
নাভান তো গভীর জলের মাছ। সে হেরার চোখের দিকে তাকিয়ে প্রতিউত্তরে বলল—
“হ্যাঁ তোমাদের চোখের সামনে দিয়ে, ভুত হয়ে উড়ে গিয়ে চেঞ্জ করে এসেছি। আচ্ছা একটা কথা বলো -তুমি কেন আমায় তোমার সেই গোপন প্রেমিক বানাতে চাচ্ছো? মিসাইল গার্ল কি তবে আমার প্রেমে পড়েছে? নাকি সে নিজেই বুঝতে পারছে না সে আসলে কাকে ভালোবাসে?”
হেরা রাগে ফুসফুস করে বলল —
‘ ভালোবাসা আপনার সাথে যায় না।”
নাভান তার স্বভাবসুলভ কুটিল হাসিটা হেসেই চলল। হেরা বুঝতে পারছে না, এই হাসির আড়ালে কত বড় একটা সত্যকে নাভান পাথরচাপা দিয়ে রেখেছে। ডায়রির সব কথা সত্যি বললে, অতীত সব সামনে আসবে। আর হেরা যদি নিজ ইচ্ছায় এসব মনে করতে চায়। আর যদি না মনে হয় তাহলে তার লাইফ রিক্স জতে পারে। ডাক্তার স্পষ্ট বলে দিয়েছিলো যে , হেরা কোনো মানসিক চাপ নিতে পারবে না, তার পুরনো স্মৃতি জোর করে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলে তার বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। নাভান হেরা ও হেরার অতীতকে কতটা অসম্ভব ভালোবাসে, তা শুধু নাভানের এই নীরব ত্যাগটুকুই জানে। তাই সে নিজে ভিলেন সেজে হলেও ডায়েরির রহস্যটা লুকাতে চায়।
হেরা ডায়েরিটা টেবিলে আছাড় দিয়ে বলল—–
“আপনি একটা ধড়িবাজ, চরম মিথ্যাবাদী! আপনিই আমার সেই গোপন প্রেমিক ‘জি ম্যান’। ডায়েরির হাতের লেখা বদলেছেন আপনি!”
নাভান এক পা এগিয়ে এসে হেরার খুব কাছে দাঁড়াল। তার চোখ দুটোতে তখন এক অদ্ভুত শীতলতা। সে চায় না হেরা তার এই ছদ্মবেশী রূপটার প্রেমে পড়ুক। সে চায় হেরা বর্তমানের নাভানকে ভালোবাসুক, কোনো অতীতের ছায়াকে নয়। দুনিয়ার সবাই যদি হেরার আগে-পরে থাকুক, হেরার অতীতে হাজারটা গল্প থাকুক—নাভান সেসব অতীতকে ধুয়েমুছে দিতে চায়। সে চায় হেরা এই বর্তমানের অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়েটাকে মনে-প্রাণে গ্রহণ করুক।
নাভান গম্ভীর গলায় বলল—-
“প্রমাণ ছাড়া ব্লেম দেওয়া বন্ধ করো, মিসাইল গার্ল। ডায়েরিতে তেমন কিছুই নেই, লকও ঠিক আছে বলছো । তাহলে আমি কীভাবে বদলালাম? ভুত সেজে উড়ে নেপালে গিয়ে বদলে এসেছি? আসলে তোমার ওই কাল্পনিক ‘জি ম্যান’ কোনোদিন ছিলই না।”
“ছিল! সে আমাকে ভালোবাসত!হেরা চিৎকার করে উঠল।
“তাহলে সে এখন কোথায়? কেন সে তোমাকে এই বিপদে ফেলে আড়ালে লুকিয়ে আছে?”
নাভানের কণ্ঠে এবার একটু যেন অধিকারের সুর–
“শোনো মিসাইল গার্ল , ছোটবেলার যে বিয়েটা আমাদের কারো মনে নেই সো অইটা বাদ দেয়া যায়। কিন্তু বর্তমানে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ বা ‘দুর্ঘটনা বলে ’ যে বিয়ে উড়িয়ে দিতে যে চাচ্ছো, আমি সেটাকে একটা পবিত্র সম্পর্ক বলে মানি। আমি চাই তুমি বর্তমানকে মেনে নাও। অতীতের কোনো ভূতকে ভালোবেসে বর্তমানের স্বামীকে অবহেলা করাটা কোনো কাজের কথা না। তোমার তো পাপের ডায়রি পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে।
হেরা নাভানের চোখের দিকে তাকাল। সেখানে এক অদ্ভুত টান, কিন্তু হেরা নিজের জেদে অটল। সে বলল—-
“আমি আমার ওই গোপন প্রেমিককেই ভালোবাসি। এই জোর করে হওয়া বিয়েটাকে আমি কোনোদিন স্বীকৃতি দেব না!আপনি সত্যি না বললে তো কখনো মানবো না।
নাভানের বুকের ভেতরটা তখন তীব্র যন্ত্রণায় মুচড়ে উঠল। সে মনে মনে বলল—
‘পাগলী, যাকে তুই ডায়েরির পাতায় খুঁজছিস, সে তো তোর সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু আজ তোকে বাঁচানোর জন্যই আমাকে তোর চোখে অপরাধী হতে হচ্ছে।’তোর বিন্দু পরিমান ক্ষতি যে আমি হতে দিতে পারি না। সব সত্যি সামনে আসলে অতীত সামনে আসবে। আর তখন যদি তুই অইসব মনে করতে যাস। যদি তোর ক্ষতি হয় না না আমি সময় হলে সব সঙ্গে সঙ্গে বলবো বাট তোকে রিক্সে ফেলতে পারবো নারে।
বাইরে নাভান চরম উদাসীন আর কঠোর, যেন এই বিয়েটা তার কাছে শুধু একটা দায়িত্ব। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে হেরার প্রতিটা দীর্ঘশ্বাস টের পায়। হেরা যখন রেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, নাভান ড্রয়ারের গোপন লকার থেকে ডায়েরির আসল পাতাগুলো বের করল। সেখানে রক্ত দিয়ে লেখা ছিল—
“অক্সিজেন , তুই ভুলে গেলেও এই নাভান তোকে কোনোদিন ভুলবে না।”
প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৫২
নাভান পাতাগুলো বুকে চেপে ধরে চোখ বন্ধ করল। এক চরম মানসিক দ্বন্দ্বের খেলা শুরু হয়েছে দুজনের মাঝে। হেরা সত্যটা প্রমাণ করার জন্য মরিয়া, আর নাভান সত্যটা লুকিয়ে হেরাকে ভালো রাখার জন্য নিজের ভালোবাসাকেই অস্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে।
হেরা কি পারবে নাভানের এই কঠিন খোলসটা ভেঙে তার ভেতরের আসল মানুষটাকে আবিষ্কার করতে? নাকি নাভানের এই নীরব ত্যাগ চিরকালই গোপন থেকে যাবে?
