মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৬
jannatul firdaus mithila
“ না হচ্ছে না! কারণ ওসব কাপড় আমার নয়, মিসেস টু-বি অধীর রায়ের। যার জন্য ওসবে আমার কোনো অধিকার নেই।”
তৎক্ষনাৎ চোয়ালের পেশি টানটান হলো রূঢ় মানবের! দৃঢ়তা বাড়ল সুদর্শন মুখাবয়বে! দৃষ্টিযুগলে একপ্রকার অদৃশ্য আগুন লেপ্টে তক্ষুনি নিজ বলিষ্ঠ হাতের আক্রমণ বসালো রমণীর কোমল চোয়ালরেখায়! ঘটনাপ্রবাহের আকস্মিকতায় ভড়কায়নি মাহি। যেন ঘটনাপ্রবাহের সকল ছিঁড়ি পূর্ব থেকেই নখদর্পনে তার! বলিষ্ঠ পুরুষ জোর বাড়াচ্ছে হাতের। অনমনীয়তায় বোকা মানবীর পেলব মুখখানা তুলেছে খানিক উঁচিয়ে। অহমিকায় পরিপূর্ণ ঘাড়টা সামান্য ঝুঁকিয়ে এনে, কটমট কন্ঠে শুধালো—
“ কি বললি? আরেকবার বলতো।”
রমণী স্থির! নাকের পাটা ফুলিয়েছে বেশ। একমুহূর্তের অভিঘাতে চোয়ালের ব্যথা বেমালুম ভুলে গেলেন তিনি। তিক্ত মেজাজে খ্যাঁক খ্যাঁক করে কোনমতে অধর নাড়িয়ে আওড়াল,
“ কানে শোনেননি আপনি? একটা মাইক আনব? আমার মুখে নিজের উডবি’র কথা শুনতে বুঝি ভীষণ মজা লাগছে? অসভ্য লোক কোথাকার! ভো’গ যেহেতু করবেন, এমনিতেই করুন না। তারজন্য শুধু শুধু অন্যের জিনিসপত্র দিয়ে ওতো সাজ-গোজ করানোর কি আছে? শুনুন বিস্ট! অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ করার মতো জঘন্যতম রুচি আমার কোনোকালেই ছিল না, এখনো নেই।”
সপ্তদশীর কন্ঠে সে-কি উপচে পড়া রাগ! ঝাঁঝাল বাক্যবাণে নির্দয় মানবকে জর্জরিত করার ব্যাপক প্রয়াসে কমতি নেই একফোঁটাও। এহেন কান্ডে বিচলিত হয়নি মুগ্ধ। উল্টো চোয়ালের রেখার দৃঢ়তা বাড়িয়ে চিড়বিড়িয়ে বলে উঠল,
“ কুচুটে মহিলাদের মতো পেটের মধ্যে জিলাপির প্যাচ না টেনে, যা বলার সরাসরি বল মনস্তারের বান্দী! কিসের অন্যের জিনিসপত্র? এন্ড হু দা ফা’ক ইজ দিস মিসেস টু-বি অধীর রায়?”
রাগটা বোধহয় তরতর করে বেড়ে গেল রমণীর! চোখেমুখে একপ্রকার ঝাঁঝ লেপ্টে তক্ষুনি তাকালো মুগ্ধের পানে। দাঁত খিঁচে শুধালো,
“ আপনার এসব নাটক অন্যের সামনে গিয়ে দেখাবেন, আমার সামনে নয়! কেনো বলেছিলেন ঘরভর্তি কাপড়চোপড় থেকে যেটা ইচ্ছে সেটা পরে নিতে? কোন অধিকারের ভিত্তিতে অন্যের জিনিসপত্রে হাত দিতে যাবো আমি? কোন…!”
সপ্তদশীর জিভের ডগায় বিরতিহীন বাক্যবাণ। তাতে হুট করেই লাগাম টানলো মুগ্ধ! ত্বরিত শক্ত হাতের জোরালো টানে রমণীর ক্ষুদ্র মুখখানা উঁচিয়ে তুললো আরও কিছুটা। বিকট হুংকারে পরপরই শুধালো,
“ খোদ রুশদী কিংয়ের ওপর যার একচ্ছত্র অধিকার, তাকে আবার নতুন করে সামান্য কিছুর জন্য অনুমতি দেবার কি আছে বেয়াদবের বাচ্চা? কে তোকে অধিকার নিয়ে কথা শুনিয়েছে সেটা বল! দেখি ও কোন বাপের পেট থেকে বেরিয়েছে।”
সহসা বিরক্তিতে মুখ কুঁচকায় মাহি! কপালের চামড়া ভাঁজ পড়তেই জিভ ঠেলে দু’টো কট্টর বাক্য বেরিয়ে আসতে চাইলো যেন। রূঢ় মানবের মুখের ওপর বলতে চাইলো —
“ ওরে মাথামোটা রাশিয়ান দৈত্য! বাপের পেট থেকে সন্তান বেরোবে কি করে?”
অন্তঃকোণে উত্থাপিত হওয়া এহেন সাহসী বাক্যটুকু মুখ ফুটে আওড়ানোর সাহস পেলো না মাহি। তৎক্ষনাৎ ঝুঁকিয়ে নিলো নজর। সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মাফিয়া বিস্ট তখনো ক্রুর দৃষ্টে তাকিয়ে আছে মেয়েটার পানে। বোধহয় কাঙ্ক্ষিত উত্তরের অপেক্ষায় আছেন। তবে প্রহর পেরুতে না পেরুতেই অধৈর্য্যের তালিকায় নাম লিখলেন তিনি। শক্ত মুখে একঝটকায় মাহি’র নরম চোয়ালখানা ছেড়ে দিয়ে, পরমুহূর্তেই চেপে ধরল মেয়েটার ডানহাতের নরম কব্জিসন্ধি। বলিষ্ঠ হাতের জোর দেখিয়ে তাকে একপ্রকার টানতে টানতে এগোলো মুগ্ধ। অথচ সপ্তদশীর বেহাল দশা! রূঢ় মানবের সনে পায়ের তাল মেলাতে গিয়ে রীতিমতো দৌড়াতে হচ্ছে তার। এলোমেলো অবিন্যস্ত কায়দায় হোঁচট খেতে খেতে কোনমতে বেঁচেছে এক-দুবার। এতে অবশ্য ভ্রুক্ষেপহীন মুগ্ধ! শক্ত মুখে গটগটিয়ে হাঁটছে সম্মুখে। মাত্র মিনিট তিনেকের অভিঘাতেই পায়ে রুখ টানলেন রূঢ় মানব। কারুকার্যে শোভিত বিশালাকার দরজার গায়ে মস্তবড় এক তালা ঝুলছে দেখেই কপালের রগগুলো কেমন দপদপিয়ে জ্বলে উঠল তার! বদরাগের নিদর্শনে ঘাড়ের রগগুলোও ফুললো বেশ। ক্ষুব্ধ বাঘের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করতে করতে যুবক কেমন ঘাড় বাকিয়ে আচানক গর্জন তুললো,
“ হু দা ফা’ক ডেয়ার টু লক দিস রুম? কোন বাস্টা’র্ড করেছিস এ কাজ?”
বিকট গর্জনে মুহুর্তেই অন্দরমহলের ফাঁকা অঙ্গনে জড়সড় হলো মাফিয়া বিস্টের পোষ্য গার্ডস! নতমুখে দাঁড়িয়ে থেকে কি যেন একটা প্রতুত্তর করলেন তারা। ওদিকে যুবকের ওমন হুংকারে ফের নিজেদের ঘর ছেড়ে বেরুলেন হিমাংশু রায় এবং জমিদার গিন্নী। চোখেমুখে উৎকন্ঠা তাদের! কপালে দ্বিরুক্তির ছাপ। ততক্ষণে ফের গর্জে উঠে মুগ্ধ!
“ ঘরগুলোতে তালা লাগিয়েছে কোন বাস্টা’র্ড? এক্ষুণি আমার সামনে আয়!”
এহেন বাক্যে খানিক অবাক হলেন হিমাংশু রায়। গম্ভীর মুখে এগোতে চাইলেন এক-কদম। তবে পরক্ষণেই নিজ বাদবাকি সম্মানের কথা চিন্তা করে থমকে দাঁড়ালেন তিনি। ক্ষুব্ধ বাঘের সম্মুখে গিয়ে অপমানিত হওয়ার চেয়ে নিজ জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকাটাই বোধহয় অধিক সম্মানের। হিমাংশু রায় তা-ই করলেন! গম্ভীর মুখে খানিক গলা খাঁকারি দিয়ে শুধালেন,
“ অধীর!”
তৎক্ষনাৎ রূঢ় মানবের অগ্নি দৃষ্টিযুগল একত্রে নিক্ষিপ্ত হলো হিমাংশু রায়ের ওপর। ওমনি বাক হারালেন বেচারা! জিভটা কেমন আমতা আমতা করতে করতে শুধালেন,
“ না মানে বলছিলাম, ঘরগুলোতে কাপড়ের স্তুপ দিয়ে বোঝাই করে রাখা। এগুলো তো আর হা করে খুলে রাখা যায় না! তাই আরকি…..!”
হিমাংশু রায়ের কথা চলমান। অথচ সেদিকে বড্ড অনিহা দেখিয়ে ত্বরিত ঘাড় বাকিয়ে পেছনে তাকায় মুগ্ধ। নিজ বলিষ্ঠ দেহের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ক্ষুদ্র রমণীর পানে আলতো করে ঝুঁকে এসে গমগমে গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ তোকে কে বলেছে এখানকার ঘরগুলোতে যা আছে তা অন্যের? কে বলেছে উত্তর দে!”
মুগ্ধের গর্জে ওঠা কন্ঠ! তা কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই ভয়ে কেঁপে ওঠে মাহি। সহসা দু’হাতে খামচে ধরে পরনের জামাটার দুপাশ! নতমুখে নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতেই বদরাগীর রাগের পারদ তরতর করে আকাশ ছুঁলো বোধহয়। তৎক্ষনাৎ হিং স্র থাবায় রমণীর সিল্কি চুলগুলো খামচে ধরে হুংকার ছুঁড়ল —
“ উত্তর দে জানোয়ারের বাচ্চা!”
চুলের ব্যথায় কুপোকাত মাহি! দাঁত খিঁচে ব্যথাটুকু সইবার প্রয়াসে মত্ত থেকে আচানক তর্জনী উঁচিয়ে তাক করল অদূরের ডানপাশে। যেথায় একপ্রকার জড়সড়ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণী। তক্ষুনি তর্জনীর ইশারায় ঘাড় ঘোরায় মুগ্ধ। বাজপাখির ন্যায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিজোড়া মুহুর্তেই গিয়ে আছড়ে পড়ল অচেনা মেয়েটার ওপর। এহেন দৃষ্টে চোখ পড়তেই ভড়কায় তরুণী! কাঁপতে কাঁপতে পেছাতে লাগল কদম। মুগ্ধ হাসলো এবার। অত্যন্ত ভয়ানক ভঙ্গিতে বাঁকা হাসলো খানিকটা। মাহি’র চুলের গোছা আলগোছে ছেড়ে দিয়ে পা বাড়ালো অদূরের তরুণীর পানে। তরুণী বোধহয় ভয় কেঁদে দিবে দিবে ভাব। কয়েক কদম পিছিয়ে প্রাণভয়ে পালাতে গেলেই গার্ডস সাধলো বাঁধ! এগিয়ে এসে শক্ত হাতে পাকড়াও করল মেয়েটাকে। ওদিকে যুবক এগোচ্ছে! ধীরলয়ে কোমর হতে বের করেছে নিজ রিভলবারটা। রুক্ষ আঙুলের ডগায় রিভলবারের চাবি ঘোরাতে ঘোরাতে কুঞ্চিত দৃষ্টে তাকাল সম্মুখে। গমগমে গলায় শুধালো,
“ এটুকুন একটা স্লা’টের বীজ! ম’রার এতো শখ উথলে উঠল কেনো?”
তরুণীর কন্ঠ বাকরুদ্ধ! কাঁদতে কাঁদতে কোনমতে প্রতুত্তর করল —
“ আমি.. আমি আসলে..অধীর দা। নিরু দি’র..”
তরুণীর বাক্য পূর্ণ হবার পূর্বেই কোত্থেকে যেন ছুটে এলো নিরু। ছুটে এসেই কেমন পাশ দিয়ে দু’হাতে জড়িয়ে ধরল তরুণীকে। এতক্ষণে ভরসার শেষ আশ্রয়টুকু পেয়ে ফুপিয়ে ওঠে তরুণী। তৎক্ষনাৎ মুখ গুঁজল নিরুর নরম বুকে। নিরু হাঁপাচ্ছে! ছুটে আসার দরুন ঘেমে-নেয়ে একাকার অবস্থা তার। পরনের হলুদ রঙা চুরিদারটা কেমন ভিজে উঠেছে বেশ কিছু জায়গায়! অষ্টাদশী খানিক সময় নিয়ে ঢোক গিললো সামান্য। তরুণীর মাথার ওপর একপ্রকার ভরসার হাত বুলিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে আওড়াল,
“ এসব কি করছেন অধীর দা? ওকে এভাবে আঁটকে রেখেছেন কেনো আপনি?”
সহসা বিরক্তিতে নাকমুখ কুঁচকে নেয় মুগ্ধ। পায়ের গতি বহাল রেখে, বন্দুকের ধাতব নলের ডগা দিয়ে ঘাড়ের পাশ চুলকালো খানিক। তিতিবিরক্ত মেজাজে তেঁতো কন্ঠে আওড়াল,
“ আবার ঐ বা*লপাকনা! বলি এই বান্দীর ছেলে হিমাংশু রায়! আপনার এই বা*লপাকনা মেয়েটাকে ঘরের ভেতর আটঁকে রাখতে পারেন না? এভাবে যেখানে সেখানে ছেড়ে দেন কেনো?”
চোয়াল শক্ত করলেন হিমাংশু রায়। রাগ নিয়ে ক’টা উপযুক্ত বাক্য আওড়াতেই যাবেন, ঠিক তখনি পেছন থেকে কব্জিসন্ধিতে টান বসল তার। কপাল কুঁচকে ত্রস্ত ঘাড় বাকিয়ে তাকালেন মধ্যবয়স্ক। দেখলেন — স্ত্রী কেমন ইশারায় চুপ থাকতে বলছে তাকে। হিমাংশু রায় বুদ্ধিমান মানুষ। স্ত্রীর কথা গায়ে মাখতে খুব একটা কার্পণ্য করলেন না তিনি।
এদিকে, মুগ্ধ ততক্ষণে এগিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে নিরুর সম্মুখে। মুখটা অন্যত্র ঘুরিয়ে রেখে চোয়াল শক্ত রেখে গমগমে গলায় আওড়াল,
“ সামনে থেকে সর বা*লপাকনা!”
সরলো না নিরু! উল্টো তরুণীকে আগের ন্যায় জড়িয়ে রেখে বিচলিত কন্ঠে আওড়াল,
“ অধীর দা! ওর দোষটা অন্তত বলুন। ও কি এমন করেছে যার জন্য ওকে এমন একটা শাস্তি দিতে হচ্ছে আপনার?”
তৎক্ষনাৎ প্রতুত্তর দেবার বদঅভ্যেস নেই রূঢ় মানবের। বদমেজাজী ভাবাবেগে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে আচানক ট্রিগার তুললো বন্দুকের। অতঃপর কোনরূপ বলাকওয়া ছাড়াই সরু ধাতব নলখানা সম্মুখে তাক করে শক্ত কন্ঠে বলে ওঠে,
“ সামনে থেকে সরবি? না ম’রবি?”
অনড় নিরু! দৃঢ় মানবীর ন্যায় সামান্য নাক টেনে সটান হয়ে দাঁড়ালো ভয়ার্ত তরুণীর সম্মুখে। ভনিতাহীন কন্ঠে প্রতুত্তর করল —
“ দিন মে’রে! ”
তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটলো মুগ্ধের ঠোঁটের কোণে। বলিষ্ঠ হাতটা সামান্য নাড়িয়ে, বন্দুকের নলটা আলগোছে নামিয়ে আনলো নিরুর দিকে। এহেন অতর্কিত কান্ডে আঁতকে উঠেন বাড়ির সকলে। হিমাংশু রায় কেমন চিৎকার দিয়ে উঠলেন তক্ষুনি। ছোটালেন পা। অথচ মুগ্ধ অনড়! নিরুর পানে বিরক্তির দৃষ্টিজোড়া তাক করে রেখে অনিহা মিশ্রিত কন্ঠে বলে উঠল,
“ ফাইন! গো টু হেল।”
সহসা চোখদুটো বুঁজে নেয় নিরু। দাঁড়িয়ে রয় চুপচাপ। মুগ্ধ ততক্ষণে আঙুল ঢুকিয়েছে বন্দুকের ট্রিগার। চাপ বসাবে বসাবে ভাব। ওমনি পেছন থেকে ছুটে আসা একজোড়া কোমল হাত তক্ষুনি আষ্টেপৃষ্ঠে আঁকড়ে ধরল রূঢ় মানবের বলিষ্ঠ হাতখানা। ভয়ার্ত কন্ঠে আওড়াল,
“ পাগলামি থামান বিস্ট!”
সহসা ঘাড় বাঁকায় মুগ্ধ। শক্ত চোয়ালে কটমটিয়ে বলে উঠল,
“ পাগল বানানোর আগে মনে ছিলো না?”
এহেন প্রতুত্তরে ভঙ্গুর মাহি! তারচেয়েও ভগ্ন হলো নিরুর অন্তর। ছলছল চোখজোড়া পর্দা সরাতেই সম্মুখের দু’জনকে ওমন প্রেমিক যুগলের ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অন্তঃকোণে কেমন চিনচিন করে ব্যথা হচ্ছে তার। চোখদুটো মানছে না বাঁধ। ঝরাতে লাগলো অশ্রু! মাহি দূর্বল বড্ড। একপ্রকার টানছে মুগ্ধের উঁচু হাত। লোকটার বাড়াবাড়িতে একপ্রকার অতিষ্ঠ হয়ে শুধালো,
“ আমার কিচ্ছু লাগবে না। শুনেছেন আপনি? এসব ঘরভর্তি কাপড়চোপড় কিংবা অর্নামেন্টস, কিচ্ছু চাই না আমার। এগুলো উনারই থাকুক।”
রাগের পারদ তরতর করে বেড়ে গেল মুগ্ধের। শক্ত হলো চোয়াল! সে তক্ষুনি ঘাড় ঝোঁকায় মাহি’র ক্ষুদ্র মুখখানার ওপর। কেমন হিসহিসিয়ে শুধালো,
“ কি বললি তুই? এসব লাগবে না তোর তাই তো?”
“ হ্যাঁ! লাগবে না আমার এসব। এগুলো উনার।”
সহসা রাগের তোড়ে হিতাহিতজ্ঞান হারালো মুগ্ধ। বেপরোয়া উম্মাদের ন্যায় চোখদুটো বুঁজে বারকয়েক ডললো ঘাড়। অধর কামড়ে ধরে নিজের উপচে পড়া রাগগুলো দমানোর বৃথা প্রয়াসে মত্ত সে। তবে লাভের লাভ হলো না বোধহয়। রাগ বাড়ছে বৈ কমছে না তার। যুবক আচানক চোখ খুলল। অগ্নিদৃষ্টি যুগল দিয়ে খানিক এদিক-ওদিক তাকিয়ে আচমকা রাশিয়ান ভাষায় গার্ডদের উদ্দেশ্য করে বলে উঠল,
“ স্লামাই জামকি ফ্সেখ কোমনাত।”
“ সবগুলো ঘরের তালা ভাঙ!”
হুকুম তামিলে তৎক্ষনাৎ মত্ত হলেন গার্ডেরা। উপস্থিত বাকিরা নিরব দর্শক মাত্র! নির্লিপ্ত কায়দায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে দেখল — বলিষ্ঠ লোকগুলোর তালা ভাঙন। ওদিকে মুগ্ধ ছুটেছে অন্যত্র! জোরালো কদমে অন্দরমহলের বা-দিকে ছুটেছে সে। সেথায় বারান্দার দেয়ালে ঝুলছে বেশক’টা অব্যবহৃত মশাল! মুগ্ধ হাত বাড়িয়ে একখানা মশাল নিলো হাতে। রাগান্বিত ভাবাবেগে দাঁতে দাঁত চেপে পরক্ষণেই ট্রাউজারের পকেট হাতড়ে বার করল লাইটার। শুকনো মশালের আগায় লাইটার ধরাতেই আগুনের সে-কি তেজ বাড়ল। দাউদাউ করে জ্বলে উঠল মশালটা! যুবক আগুন হাতে নিয়েই ছুটলো। ক্ষ্যাপাটে ষাঁড়ের ন্যায় দুর্বার গতিতে এগোলো সদ্য তালা ভাঙা ঘরগুলোর দিকে। এদিকে, তার এহেন পাগলামো দেখে আঁতকে উঠে নিরু! বিচলিত ভঙ্গিতে ছুটতে গেলেই আচানক তাকে পাশ কাটিয়ে ছুট লাগায় মাহি! রমণীর সে-কি গতি পায়ের। যা দেখে মুহুর্তেই থমকে দাঁড়ায় নিরু। পা ছোটানোর কর্মে হুট করেই কেমন ভাটি পড়ল তার।
তালা ভাঙা ঘরের দুয়ার পানে ছুটে এসে দাঁড়িয়েছে মাহি। বিচলিত দৃষ্টিজোড়া সম্মুখে তাক হতেই ফের থমকায় মানবী! থমকায় তার হৃৎস্পন্দন। চোখের সামনে দাউদাউ করে জ্বলছে সব। আবারও একই ভঙ্গিতে জ্বলছে ঘরভর্তি কাপড়ের স্তুপ! আবারও তাকে সাক্ষী হতে হলো রূঢ় মানবের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের। রমণী ঘোলাটো চোখ। কার্নিশ বেয়ে গড়াচ্ছে অশ্রু! দূর্বল পদযুগল টুকটাক গতিতে প্রবেশ করল কক্ষে। হিতাহিতজ্ঞানশূন্য মুগ্ধ, সামনে যা পাচ্ছে তাতেই আগুন ধরাচ্ছে! ক্ষুব্ধ বাঘের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করতে করতে যেই-না পিছু ফিরল — ঠিক তখনি বোকা মানবীর সনে চোখাচোখি হলো তার। ক্রোধে অন্ধ মানব তখনো ফোঁস ফোঁস করছে। হাতে তার জ্বলন্ত মশাল! চারপাশের দাবানলের লেলিহানে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দু’জন। বেরুনোর নামগন্ধও নেই! দূর্বল মাহি এবার আরেকটু এগোলো। রাগে ফুঁসতে থাকা রূঢ় মানবের উম্মুক্ত রুক্ষ বক্ষভাঁজে কাঁপা কাঁপা হাতটা আলগোছে ছোঁয়ালো। ধীরলয়ে ভঙ্গুর কন্ঠে শুধালো,
“ এতোটা পাগল কেনো আপনি বিস্ট? কেনো প্রতিবার এমন হিং স্র পাগলামি গুলো করেন আপনি? কি দরকার ছিলো কাপড়গুলোতে আগুন ধরানোর? আমি নাহয় অন্যকিছু নিয়ে নিতাম। এগুলো নাহয় মিসেস টু-বি অধীর রায়ের-ই থাকতো।”
তৎক্ষনাৎ বলিষ্ঠের শক্ত হাতের হিং স্র থাবায় পিষ্ট হলো রমণীর সুদীর্ঘ কোমল গ্রীবাদেশ! ক্ষুব্ধ মানবের কন্ঠফুঁড়ে বেরিয়ে এলো আরেক হিং স্র গর্জন!
“ হুঁশশ! ডোন্ট ইউ ডেয়ার টু সে দ্যাট এগেইন। অকালে প্রাণ হারাতে না চাইলে অন্য কাউকে মিসেস টু-বি অধীর রায় বলতে যাস না মিসেস অধীর রায়! ডোন্ট ফরগেট —জনদরদী তুই, আমি না!”
রমণীর সিক্ত চোখদুটো অশ্রু বিসর্জনে মত্ত! দক্ষ নিরব ভাষায় বলে যাচ্ছে অনেককিছু। মুগ্ধ সরায়নি নিজ অগ্নি দৃষ্টিযুগল। তাক করে রেখেছে মিনিট খানেক। তবে রমণীর চোখের ভাষা যেন ভাঙতে চাইছে তাকে। কোনরূপ দৃশ্যমান আক্রমণ ছাড়াই রূঢ় মানব পরাস্ত হবার ভয়ে সহসা ঢিলে করল নিজ রুষ্ট হাতের চাপ। ছেড়ে দিলো রমণীর গ্রীবাদেশ! শক্ত মুখে পিঠ ঘুরিয়ে দাঁড়াতেই মাহি’র ভগ্নকণ্ঠ ফুঁড়ে অস্ফুটে বেরুলো,
“ এগুলো সামান্যকিছু কাপড় ছিলো বিস্ট! হোক না তা আমার নামের, তাই বলে তা অন্যকেউ…!”
বাকিটা বলার ফুরসত পেলো না মাহি। তার পূর্বেই তড়াক শরীর ঘুরিয়ে আনে মুগ্ধ! আচানক মেয়েটাকে হতবাকতার শীর্ষে পৌঁছে দিয়ে শক্ত হাতখানার রুক্ষ তালু উঠিয়ে রাখল মানবীর মাথার তালুতে। এক স্পষ্ট স্বীকারোক্তিতে ভনিতা হীন কন্ঠে শুধালো,
“ তোর নামে দেওয়া কোনোকিছুতে অন্য কেউ অধিকার বসানো তো দূর, হাত বাড়ানোর সাহস করেই দেখুক একবার! তোকে ছুঁয়ে বলছি পিচ্চি, আমি ঐসব কিছু জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেবো। নিঃশেষ করে দেবো পৃথিবী থেকে, মিটিয়ে দেবো তাদের অস্তিত্ব! তা হোক সামান্য ক’টা কাপড় কিংবা গোটা আমিটাই!”
থমকায় মাহি! যুবকের স্পষ্ট স্বীকারোক্তিতে থমকায় তার অন্তর। কাঁপতে থাকে ক্ষুদ্র বদনখানি! মুগ্ধ বোধহয় টের পেলো তা। তক্ষুনি এগিয়ে এসে প্রথমবারের মতো স্বেচ্ছায় জড়িয়ে ধরল সপ্তদশীকে। দু’হাতের দৃঢ়বন্ধনে মুহুর্তেই আঁটকে নিলো সপ্তদশীর ক্ষুদ্র বদনখানা। জোরালো হাতের জোরে রমণীর পাদু’টো ইতোমধ্যেই শূন্যে উঠেছে বেশ! বেপরোয়া যুবক নিজেকে শান্ত করার প্রয়াসে মুখ ডুবিয়েছে মাহি’র কাঁধে। অনবরত ঘষছে নাক। টানছে জোরালো নিঃশ্বাস! মাঝেমধ্যে বসাচ্ছে রুক্ষ অধরযুগলের অবিন্যস্ত ছোঁয়া। মাহি স্থির! কন্ঠে দৃঢ়তা নামিয়ে আচমকা প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ ডু ইউ লাভ মি বিস্ট?”
থামল মুগ্ধ! কয়েক মুহুর্তের জন্য থামালো নিজের বেপরোয়া পাগলামিগুলো। ধীরলয়ে মুখ সরিয়ে আনলো রমণীর কাঁধ হতে। পরক্ষণেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিজোড়া আলগোছে ডোবালো মেয়েটার সন্দিগ্ধ আঁখিদ্বয়ে। কোনরূপ ভনিতা ছাড়াই দৃঢ় কন্ঠে প্রতুত্তরে বলল,
“ নো! আ’ই ডোন্ট ট্রাস্ট ইন দিস লাভ এন্ড অল বুলশিট!”
রমণীর মুখো অভিব্যক্তিতে খানিকটা পরিবর্তন নামলো যেন। ক্ষুদ্র দৃষ্টে ফের জিজ্ঞেস করল,
“ তাহলে এমন করছেন কেনো বিস্ট? কেনো আমার জন্য এতো পাগলামি করছেন আপনি? ভালো যদি না-ই বাসেন, তাহলে এভাবে আগলে রাখার মানে কী?”
যুবক কেমন এলোমেলো! অস্থির পদযুগল তার, দৃষ্টি অবিন্যস্ত। রমণীকে নিজের বুকের সনে আঁটকে রেখে পরপরই গমগমে গলায় শুধালো,
“ কজ আই ডোন্ট নো! আমি কেনো এমন করছি, আমি জানি না। তোকে সবসময় চোখের সামনে রাখতে ইচ্ছে করে শুধু! ইদানীং তোকে না দেখলে নেশা হয়না। তোকে সবসময় নিজের করে রাখতে হবে — এতটুকুই জানি! তোর প্রতি আমার একটা অদ্ভুত এট্রাকশন কাজ করে বিউটি। তোকে দেখলে শান্তি লাগে এটুকুই! তুই.. তুই.. আচ্ছা বাদ দে ওসব। চল! চল আমরা ইন্টি*মেট হবো চল!”
মুগ্ধের এরূপ পাগলামিতে হতবিহ্বল মাহি! কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে তা নিয়ে সন্দিগ্ধতায় ভুগছে বেচারি। মুগ্ধ পা বাড়িয়েছে। রমণীকে কোলে নিয়েই এগোচ্ছে ঘরের বাইরে। মাহি’র নতমুখ! ভগ্ন কন্ঠ ফুঁড়ে অস্ফুটে আওড়াল,
“ আমাদের বিয়ে হয়নি বিস্ট!”
সহসা থমকে দাঁড়ায় মুগ্ধ! কপাল কুঁচকে ক্ষুদ্র দৃষ্টিতে তাকায় মাহি’র পানে। মেজাজ খিচেঁ যাওয়ায় গমগমে গলায় বলে ওঠে,
“ উই হেভ ডান আ কন্ট্র্যাক্ট ম্যারেজ রাইট? সেদিক থেকে তুই আমার সিগনোরা! এন্ড দ্যাট’স ইট।”
জনসমাগমে পরিপূর্ণ জমিদার বাড়ির বহির্মহল। ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি দেখেই ছুটেছেন তারা। উৎসুকের ন্যায় ভীড় জমিয়েছেন চারপাশে। প্রায় মিনিট বিশেকের প্রচেষ্টায় আগুন থামাতে সক্ষম হলেন ফায়ারফাইটাররা। চলছে বাদবাকি কাজ! হিমাংশু রায় কেমন গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে অন্দরমহলের প্রশস্ত অঙ্গনে। ঘাড় উঁচিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে তিনতলার দিকে। তন্মধ্যে বেশ পরিচিত দু’জন প্রতিবেশী এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন মধ্যবয়স্কের দুপাশে। কাঁধে হাত রেখে সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“ ওমন করে আগুন লাগলো কি করে হিমাংশু দা? ইলেক্টিক সার্কিট ব্রাস্ট হয়েছিল নাকি?”
হিমাংশু রায়ের দৃষ্টি অটুট! গম্ভীর কন্ঠে কেবল প্রতুত্তর করলেন,
“ ধরে নাও তাই!”
ঠকঠক ঠকঠক!
ঘর লাগোয়া ওয়াশরুমের দরজায় অনবরত পড়ছে জোরালো চাপড়। দরজার ওপাশ থেকে রূঢ় মানব কেমন অস্থির কন্ঠে বলে যাচ্ছে,
“ সিগনোরা? ক’দিনের জন্য ঢুকলি ভেতরে? তারাতাড়ি বের হ। সিগনোরা?”
ভয়ে ভয়ে শুকনো ঢোক গিলছে মাহি! ওয়াশ-বেসিনের ফসেট ঘুরিয়ে পানি ছেড়ে দিয়েছে উদ্দাম বেগে। তবুও দুয়ারের ওপাশ থেকে রূঢ় মানবের কন্ঠ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। মাহি পেছালো দু-কদম। এরইমধ্যে ওপাশ থেকে ফের ভেসে এলো —
“ তুই বের হবি? না-কি আমি দরজা ভেঙে ঢুকবো কোনটা?”
ভীত রমণী! রূঢ় মানবের ভয়ে কাঁপছে কেমন। কাঁপতে কাঁপতে গিয়ে লুকলো বেসিনের নিচে। দু’হাত দিয়ে চেপে ধরল নিজ কানদুটো। ওদিকে দুয়ারের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা বেপরোয়া যুবকের লাগামহীন কান্ড বাড়ল! চোয়াল শক্ত করে আচানক পেছালো এক কদম। অতঃপর বলিষ্ঠ পায়ের জোরালো শক্তিতে দরজার গা বরাবর সজোরে দিয়ে বসল এক লাথি! ওমনি বেচারা দরজাটার গায়ে কেমন বিকট শব্দে ধীরে ধীরে ফাটল ধরতে লাগলো। একবার, দু’বার! পরপর তিনবার জোরালো পায়ের আঘাত গায়ে পড়তেই বেচারা দরজাটার বেহাল অবস্থা হলো! মাঝখান থেকে চিড় চিড় করে দুপাশ দিয়ে ভেঙে গেলো কাঠের দরজাটা। ক্ষ্যাপাটে ষাঁড়ের ন্যায় ফুঁসতে থাকা মুগ্ধ তক্ষুনি ঢুকলো ওয়াশরুমে। অগ্নিদৃষ্টে এদিক-ওদিক নজর ঘোরাতেই তার দৃষ্টি গিয়ে আচানক ঠেকল বেসিনের নিচে জড়সড়ভাব নিয়ে বসে থাকা মাহি’র পানে। ওমনি ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসির রেশ দেখা গেলো মুগ্ধের! দৈত্যের ন্যায় পাদু’টো বাড়ালো বেসিনের দিকে। ধীরলয়ে মেঝেতে হাঁটু ঠেকিয়ে বসল মুগ্ধ। দু’হাতে মুখ ঢেকে কাঁপতে থাকা রমণীর পানে তাকিয়ে থেকে ভরাট কন্ঠে শুধালো,
“ সিগনোরা?”
আঁতকে উঠে মাহি। ধীরলয়ে হাত সরায় মুখাবয়ব থেকে। শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলে আওড়ায়,
“ আমার খুব ভয় করছে বিস্ট!”
ভ্রু গোটায় মুগ্ধ! সন্দিহান গলায় প্রশ্ন ছুড়েঁ,
“ কেনো?”
রমণীর সে-কি ভয়! মাঘ মাসের ঠান্ডার ন্যায় হাড় হিম ধরে যাচ্ছে তার। সর্বাঙ্গের কম্পন হয়েছে স্পষ্ট! কম্পিত কণ্ঠে কোনমতে জবাব দিলো —
“ আপনি… আপনি একটা দৈত্য! আপনার ঐ হাত দিয়ে আমায় ধরলে আমি সত্যিই ম’রে যাবো বিস্ট!”
“ তাহলে কি হাতদুটো কেটে ফেলব?”
যুবকের সন্দিগ্ধ কন্ঠ! তার পিঠে বোকা মানবী তৎক্ষনাৎ প্রতুত্তর করল না। রয়েসয়ে শুধালো,
“ আপনি আমায় সবসময় ব্যথা দেন বিস্ট!”
গা-ছাড়া ভাব ধর মুগ্ধ! হাত বাড়িয়ে আলগোছে টেনে ধরে মাহি’র নরম কব্জিসন্ধি! হালকা একটু টান বসাতেই কেমন ককিয়ে ওঠে মাহি। অস্ফুটে শুধায়,
“ আল্লাহ গো! শেষ… আমার হাত শেষ।”
হতভম্ব মুগ্ধ! হতবাক চোখে তাকিয়ে রইলো একপল। পরপরই সন্দিগ্ধ গলায় আওড়াল,
“ স্ট্রেঞ্জ! আমি তো একদম হালকা ভাবে ধরলাম! এতেই হাত শেষ হয়ে গেলো?”
কব্জিসন্ধি চেপে ধরে ফোঁপাচ্ছিলো মাহি। যুবকের কথা শেষ হতে না হতেই তড়াক বাড়িয়ে দিলো আহত হাতটা। ঝাঁঝাল কন্ঠে বলে উঠল,
“ দেখুন! এটা হালকা ছিলো? মনে হচ্ছে কব্জিটা বোধহয় জায়গা থেকে ছিঁড়ে যাচ্ছে! এটাকে হালকা মনে হলো কোনদিক থেকে আপনার?”
মুগ্ধের সন্দিষ্ট দৃষ্টিজোড়া মেয়েটার ফর্সা হাত পানে নিবদ্ধ! কব্জিসন্ধি বরাবর লাল দাগ বসে গিয়েছে ইতোমধ্যে। ফোলা ফোলা ভাবটা বোধহয় সদ্যই হয়েছে। মুগ্ধ কেমন হতভম্বের ন্যায় ধীরলয়ে তাকালো নিজ বলিষ্ঠ হাতটার দিকে। মনে মনে শুধালো,
“ এতো হালকাভাবে ধরেও এ-ই অবস্থা? ওর সাথে হ্যাংকি-প্যাংকি করতে গেলে ও আদৌও বাঁচবে?”
নিজ ভাবনার জলাঞ্জলি দিতে খুব একটা সময় নিলো না মুগ্ধ। গম্ভীর মুখে পরপরই শুধালো,
“ চল! চল! বেরিয়ে আয়। হ্যাংকি প্যাংকি করতে হবে।”
আঁতকে উঠে মাহি। আহত কব্জিসন্ধি বুকের কাছে চেপে রেখে ত্বরিত দু’ধারে মাথা নাড়িয়ে শুধায়,
“ না না! আমি ম’রে যাবো। আপনার মতো দৈত্যের কাছে গেলেই আমি ম’রে যাব।”
বিরক্ত মুগ্ধ! মেয়েটাকে জোরপূর্বক পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে প্রতুত্তরে বলে ওঠে,
“ ইন্টি*মেট হলে কেউ ম’রে না মন্সটারের বান্দী!”
“ কেউ ম’রে না, তবে আমি ম’রব শিওর।”
মুগ্ধ হাঁটছে এবার। ভাঙা দরজা দিয়ে বেরোতে বেরোতে বলে ওঠে,
“ আমি আছি তো! ডাক্তারের বন্যা বইয়ে দিবো না চারপাশে।”
মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৫ (২)
শুকনো ঢোক গিলে আর-ও ক’টা বাক্য আওড়াতে উদ্যোত মাহি। কিন্তু তা আর হলো কই? তার আগেই দুটো রুক্ষ অধর এসে আচানক মিলন ঘটালো তার নরম তুলতুলে ওষ্ঠপুটের সনে। গভীর, উন্মত্ত টানে কুপোকাত করে দিচ্ছে রমণীর তুলতুলে অধরযুগল! সহসা প্রস্তরখন্ডের ন্যায় জমে গেল মাহি। চোখমুখ খিঁচে নিলো একপ্রকার। অথচ অধৈর্য রূঢ় মানব! রুক্ষ অধরযুগলের বেপরোয়া স্পর্শে সপ্তদশীকে ভেঙে গুড়িয়ে দিতে বড্ড দক্ষ সে। বিছানার ধারে এগিয়ে এসে সযত্নে রমণীকে নামিয়ে দিলো মখমলি বিছানার কোলে। ওষ্ঠপুট মুহুর্তখানেকের জন্য বিচ্ছিন্ন করে মিলন ঘটালো দৃষ্টিযুগলে। সিক্ত ঠোঁটে বাঁকা হাসির রেশ টেনে আচানক শান্ত কন্ঠে শুধালো,
“ গলায় যত জোর আছে আজ দেখাস ওকে? আ’ই ওন্ট মাইন্ড টুডে!”
