Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৬ (২)

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৬ (২)

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৬ (২)
jannatul firdaus mithila

“ গলায় যত জোর আছে আজ দেখাস ওকে? আ’ই ওন্ট মাইন্ড টুডে!”
যুবকের এহেন বেফাঁস বাক্যবাণে মুহুর্তেই জমে গেল বোকা মানবী। বিস্ফারিত চোখদুটো তার একমুহূর্তের অভিঘাতে আতঙ্কে স্থির হয়ে রইল সম্মুখে। রূঢ় মানবের ঘোরলাগা দু’টো চোখ! ক্ষনে ক্ষনে তৃষ্ণার্ত পথিকের ন্যায় সিক্ত জিভ ঠেলে ভেজাচ্ছে অধর। গভীর দৃষ্টে একমনে পরোখ করে যাচ্ছে সপ্তদশীকে। ধীরলয়ে ঝোঁকাচ্ছে পাহাড়সম দেহটা! সহসা লজ্জার উত্তাপে গালদুটো টকটকে রক্তিম হয়ে উঠল মাহি’র। শঙ্কিত আতঙ্কে বুকের খাঁচায় লুকায়িত হৃদপিণ্ডটা বোধহয় হারিয়েছে নিজের বেগ! ছুটতে লাগল দূর্বার গতিতে। যেন এক্ষুণি বুক পাঁজরের বেড়া ভেঙে বেরিয়ে আসবে বেয়াদব অঙ্গটা! বোকা রমণী তৎক্ষনাৎ নজর নামালো। সর্বাঙ্গের তীব্র কম্পনে হুট করেই খামচে ধরল বিছানার চাদরের দুপাশ।

রূঢ় মানব এগিয়েছে বেশ। ধীরলয়ে ভয়াতুর রমণীর ওপর বেশ ঝুঁকে এসে, তার তুলতুলে মসৃণ কপোলের ত্বকে ছোঁয়ালো নিজ রুক্ষ আঙুল! সেথায় এক আজগুবি অদৃশ্য আকিঁবুকিঁ চালাতেই বদ্ধ হলো মাহি’র চোখদুটো। কেঁপে কেঁপে উঠল তার ক্ষুদ্র বদন! বাদামী চোখদুটোর মালিক অস্থির! প্রমত্ত উষ্ণ নিশ্বাসের ঝাপ্টায় রাঙিয়ে দিচ্ছে রমণীর পেলব মুখখানা। দৃষ্টিযুগল আঁটকে আছে ভয়াতুর মানবীর সুশ্রী মুখমণ্ডলে। গালদুটোতে সে-কি লালিমা মেয়ের! যেন একমুঠো রং লেপে আছে সেথায়। তিরতির করে কাঁপছে রমণীর নরম তুলতুলে অধরযুগল। এক বিধ্বংসী মোহাচ্ছন্নতায় ফের বুদ হলো মুগ্ধ! প্রমত্তডায় হুট করেই মুখ ডোবালো রমণীর রাজহংসীর ন্যায় সুকোমল কন্ঠত্বকে। ঘষতে লাগল টিকালো নাকের ডগা! এহেন কান্ডে মুহুর্তেই প্রস্তরখন্ডের ন্যায় জমে গেল মাহি। ধড়াস ধড়াস শব্দ হলো বুক পিঞ্জরে। সর্বাঙ্গে ঝংকার বইতেই কর্ণকুহরে ভেসে এলো মুগ্ধের ঘোরলাগা কন্ঠ!
“ ড্যাম! ইউ স্মেল লাইক ফা’কিং রেড ওয়াইন। ওহ ফা’ক! আ’ম গেটিং সো ড্রাঙ্ক!”
নিজ অসহায়ত্বে ভঙ্গুর মাহি। গায়ের জোরে দু’হাতে ঠেলে সরাবে লোকটাকে — তার বালাই নেই! মুগ্ধ কেমন আষ্টেপৃষ্টে আঁটকে নিয়েছে তাকে। কোমল মানবী এবার অধর নাড়ালো। ভয়ার্ত কন্ঠে আমতা আমতা করে শুধালো,

“ আমার… খ-খারাপ লাগছে বিস্ট!”
কথাটা বেশ শুনলো মুগ্ধ। অথচ গা-ছাড়া ভাবটা যা ধরেছে না! নিজ মোহাচ্ছন্নতায় মত্ত থেকে আচানক দাঁত বসালো রমণীর কোমল কন্ঠত্বকে। ওমনি বেচারির ওষ্ঠপুটের ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে বেরিয়ে এলো এক টুকরো ব্যথাতুর ধ্বনি! মুখাবয়বে আহত ভাবভঙ্গিমা লেপ্টে, মানবী তক্ষুনি দু’হাতে ঠেলতে লাগল রূঢ় মানবকে। অথচ মুগ্ধ নিরুত্তাপ! রমণীর কোমল কন্ঠার একপাশ হতে দাঁত সরিয়ে এনে, ফের বসালো আরেক পাশে। মেয়েটা এবার বড্ড অতিষ্ঠ হলো। চোখদুটো আপনাআপনি ভিজে উঠতেই ভগ্ন কন্ঠে শুধালো,
“ থামুন বিস্ট! আমি সহ্য করতে পারছিনা এসব।”
থামেনি মুগ্ধ! নিজ রুক্ষ হাতদুটোর বেপরোয়া স্পর্শ রমণীর কোমল উদরজুড়ে বিচরণ করিয়ে, মত্ত রইলো রমণীতে। আবেশিত কন্ঠে কেবল প্রতুত্তর ছুঁড়ল –

“ মুখ বুঁজে সহ্য করে নে চাশমিস! ইউ নো না? আ’ই কান্ট স্টপ টুডে।”
“ আমি ব্যথা পাচ্ছি বিস্ট! গলার কাছটা ছিঁড়ে যাচ্ছে মনে হচ্ছে।”
মাহি’র সুকোমল কন্ঠ ত্বকে রূঢ় মানবের তীক্ষ্ণ দাঁতের রুষ্ট স্পর্শ চলমান। সেথায় ইতোমধ্যেই বসেছে ছোপ ছোপ দাগ। তবুও মুগ্ধের থেমে যাবার নাম-গন্ধও নেই। সে কেমন বেপরোয়া ভঙ্গিতে তক্ষুনি নিজ পাহাড়সম বদনের ভর ছাড়লো মেয়েটার ওপর। ওমনি নিঃশ্বাস আঁটকে যাবার যোগাড় হলো মাহি’র। নাক-মুখ কুঁচকে যেই-না কিছু আওড়াবে তার পূর্বেই কর্নধার হলো মুগ্ধের ব্যাকুল কন্ঠ!
“ এটুকু ব্যথা কিছুই না পিচ্চি! আমার রুষ্ট ছোঁয়ায় তোর এখনো বেশ জখম হওয়া বাকি। এখনো বড্ড কান্না করা বাকি। এন্ড ইউ হেভ টু টলারেট অল দোজ ফা’কিং থিংগস। বাট ডোন্ট ওয়ারি মা’ই গার্ল! আমি আছি তো। তোর দেহের সকল ক্ষত মিটিয়ে দিবো খুব তাড়াতাড়ি।”
নিঃশ্বাস নিতে না পারার কষ্টের চাইতেও যুবকের এহেন বাক্যে রমণীর অন্তঃকোণে ক্ষত হলো বেশ। ঠোঁটের কোণে আচমকা উত্থাপিত হলো এক চিলতে ব্যথাতুর হাসির টান! সিক্ত চোখদুটো আপনা-আপনি বুঁজে আসতেই অভ্যন্তরে আওড়ালো সে,

“ যার প্রয়াস ছিলো — দেহের দৃশ্যমান ক্ষতগুলো মেটানো। আফসোস! সে এখন অদৃশ্য আত্মাটাকে ক্ষত-বিক্ষত করতে ব্যস্ত!”
ক্ষুদ্র বদনে অসারতা নেমেছে মাহি’র। নিঃশ্বাস আঁটকে এসেছে গলার কাছে। তবুও মুগ্ধকে থামালো না মাহি। যার কাজ কেবল দৈহিক সুখ খোঁজা, তাকে বাঁধা দিয়ে আত্মার গান শোনানোর থোড়াই মানে হয়! রমণী পাথরের ন্যায় পড়ে রইলো বিছানার কোলে। চোখদুটো বুঁজে রেখে অধর কামড়ে কাঁদছে সে। কাঁদছে নিজ অসহায়ত্বে! রূঢ় মানবের বেপরোয়া হাতের প্রতিটি অনিচ্ছের পরশ গায়ে কাঁটার ন্যায় বিঁধছে তার। লাগামহীন ঘোরার ন্যায় ছুটছে রমণীর ধনুকের ন্যায় বাঁকানো নারী কায়ায়। ধীরলয়ে মসৃণ উদরত্বক হতে উঁচুতে গড়িয়ে উঠতে গেলেই নিজেকে আর স্থির রাখতে পারলোনা মায়াবিনী। তৎক্ষনাৎ দু’হাতে খামচে ধরল মুগ্ধের ব্যস্ত হাত। তীব্র আত্মমর্যাদার ডোরে আষ্টেপৃষ্টে লেপ্টে থেকে ডুকরে উঠে আওড়াল,
“ আমার কষ্ট হচ্ছে। বিশ্বাস করুন বিস্ট! আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। আমি পারছিনা এসব মানতে। দয়া করে আপনি আমার ওপর থেকে সরুন। আমার নিঃশ্বাস টানতে কষ্ট হচ্ছে! এই দেখুন, আমার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। আমার…ভীষণ.!”
বলতে বলতেই রমণীর হাঁপিয়ে ওঠার যোগাড়। তা টের পেয়ে সহসা থমকে গেলো মুগ্ধ। চোখদুটো টেনেহিঁচড়ে সরালো নিজেদের পর্দা। বিচক্ষণে মস্তিষ্ক তার হুটহাট সাইরেন বাজলো যেন। কানের কাছে কেমন হুট করেই শোনা গেলো —

“ মেয়েটার সাইকোজেনিক সিউডোসিনকোপ রয়েছে! অধিক ভয়ে যদি আবারও জ্ঞান হারায় তখন?”
উপলব্ধির একমুহুর্তের অভিঘাতে তৎক্ষনাৎ নড়েচড়ে ওঠে মুগ্ধ। সহসা পাহাড়সম দেহটার ভর সরালো রমণীর ওপর থেকে। একটুখানি ছাড়া পাবার স্বস্তিতে তক্ষুনি জোরালো নিঃশ্বাস টানে মাহি। চোখদুটো বুঁজে রেখে কেমন উম্মাদের ন্যায় হাঁপাতে থাকে সে। এদিকে বেপরোয়া মুগ্ধ! অনিয়ন্ত্রিত কামনার ভাবাবেগে কাঁপছে তার সর্বাঙ্গ। মেয়েটাতে জোরপূর্বক ডুব দিতে গিয়েও বাঁধছে বিবেকে। যুবক তক্ষুনি মাহি’কে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। শুকনো ঢোক গিলে দাঁতে দাঁত চেপে খানিক পায়চারী চালায় পুরো ঘরময়। একহাতে কোমর চেপেছে মুগ্ধ, অন্যহাতে ঘাড় ডলছে অনবরত! চিড়বিড়িয়ে বিড়বিড় করে আওড়াচ্ছে —
“ ওহ ফা’ক! নো…নো..! জোর করিস না। জোর করিস না। নাহলে আবারও জ্ঞান হারাবে বান্দীর মেয়ে! জোর করিস না, জোর করিস না। কন্ট্রোল!”

রূঢ় মানবের উত্তেজনার তীব্র ঢেউয়ে ভাটি পড়ছেনা এখনো। বরং হাল হচ্ছে বেগতিক। সে তক্ষুনি পা বাড়ালো কক্ষের একপাশের দেয়ালঘেঁষা কাউচের পানে। কাউচের সম্মুখে একখানা ছোট্ট টেবিল, সেথায় সাজিয়ে রাখা বিদেশি কিছু এলকোহল। মুগ্ধ ত্বরিত এগিয়ে এসে গা এলিয়ে বসলো কাউচের কোলে। ব্যস্ত হাতে সম্মুখ থেকে একখানা রা-মের বোতল হাতে তুলে নিয়ে, বেপরোয়া আঙ্গিকে খুললো বোতলের ক্যাপ। অতঃপর কোনোদিক না তাকিয়ে ঢকঢক করে গিলতে লাগলো বোতল ভর্তি এলকোহলটুকু। সপ্তদশীর সিক্ত চোখ, ভয়ার্ত চাহনিতে বারংবার আড়দৃষ্টে অবলোকন করে যাচ্ছে রূঢ় মানবের অস্থির কর্মকাণ্ড। মুগ্ধ থামছেনা। মিনিট তিনেকের ব্যবধানে সম্পূর্ণ রা-মের বোতল শূন্য করেও মন ভরেনি তার। পাশ থেকে তৎক্ষনাৎ হাতে নিলো আরেকটি বোতল। তন্মধ্যে পকেট হাতড়ে বার করল ক্রুটস নিকারাগুয়ান সিগার! ঠোঁটের ফাঁকে গুঁজে নিয়ে তাতে লাইটার ধরাতেই যাবে ওমনি রূঢ় মানবের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি গিয়ে ফের ঠেকল অদূরে মাথানত করে বসে থাকা রমণীর পানে। মেয়েটা আবার সিগারের কলুষিত ধোঁয়া সইতে পারে না। কথাটুকু ভাবনায় উদয় হতেই চোয়াল শক্ত হলো মুগ্ধের। মুখাবয়বে একরাশ বিরক্তি নিয়ে যুবক তৎক্ষনাৎ রা-মের বোতল নিয়ে উঠে দাঁড়ায় বসা ছেড়ে। ব্যস্ত পায়ে ঘর লাগোয়া বারান্দার অভিমুখে হেঁটে এসে দাঁড়ায় সে। ধীরলয়ে মনের সুখে আগুন ধরায় সিগারের শেষভাগে। মুখভর্তি সিগারের কলুষিত ধোঁয়া টেনে নিয়ে, পরক্ষণেই রা-মের বোতলে চুমুক বসায় বেপরোয়া ছেলে! একদিকে গিলে ঢোক, আরেকদিকে নাক দিয়ে ছাড়ে ধোঁয়া। নিজেকে শান্ত করার প্রয়াসে চেয়ে রয় দূর আকাশে!

এদিকে, রূঢ় মানব দৃশ্যপটের আড়াল হতেই সুযোগ পায় বোকা মানবী। জল্লাদের হাত থেকে বাঁচার ক্ষুদ্র প্রয়াসে পা টিপে টিপে এগোয় বিছানা ছেড়ে। এক-দুবার সর্তক দৃষ্টে পেছনে তাকিয়ে, পরমুহুর্তেই একনাগাড়ে ছুট লাগায় দুয়ার পানে। দুটো সিগার শেষ! সঙ্গে শেষ হলো আরেক বোতল রা-ম। ক্রমশ স্তিমিত হয়ে এলো রূঢ় মানবের উত্তেজনার ঢেউ। কম্পন কমলো বদনের! নিজ উপচে পড়া কামনার আগুনটুকু কোনমতে অভ্যন্তরে লুকিয়ে রেখে শরীর ঘুরিয়ে দাঁড়ায় মুগ্ধ। লম্বা লম্বা কদমে বারান্দা ছেড়ে ঘরে ফিরতেই তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিযুগল আঁচানক গ্রাস করল বোকা মানবীকে। মুহুর্তেই বিরক্তির ভাঁজ পড়ল রূঢ় মানবের রুক্ষ ললাটতটে। দাঁত খিঁচে কদম বাড়িয়ে গমগমে গলায় শুধায়,

“ কোথায় যাচ্ছিস রে বান্দীর মেয়ে?”
সহসা থমকে দাঁড়ায় মাহি। আঁতকে উঠে সঙ্গে সঙ্গে তাকায় পেছনে। কয়েক হাত দুরত্বে শক্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা। দু’হাত গুঁজেছে পকেটে। এতক্ষণ স্থির থাকলেও কদম বাড়াচ্ছে এবার। ওমনি ভয়ে ভয়ে কদম পেছায় মাহি। মুগ্ধ তখন দাঁত খিঁচে ফের আওড়াল,
“ গায়ের ওপর সামান্য ভর ছাড়তে গেলে — উহঃ আহঃ, ছাড়ুন, কষ্ট হচ্ছে, মরে যাচ্ছি, হ্যান-ত্যান বেরিয়ে আসে তোর মুখ দিয়ে! অথচ পালানোর মতো বা*লপাকনামি করতে গেলে একেবারে সুস্থ! তাই না?”
ফাঁপা ঢোক গিলে মাহি। ত্রস্ত ঘাড় নুইয়ে দাঁড়িয়ে রয় চুপচাপ। রূঢ় মানব ততক্ষণে সম্মুখে এসে দাঁড়িয়েছে তার। রুক্ষ হাতের অনমনীয় তালুর চাপায় আচানক টেনে ধরে রমণীর নরম কব্জিসন্ধি। অতঃপর জোরপূর্বক বেচারিকে একপ্রকার টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে বসায় বিছানার কোলে। ভয়ার্ত বোকা মানবী উঠে যেতে চাইলেই বাঁধ সাধল মুগ্ধ। আগ বাড়িয়ে পাশে বসে আচমকা জোরালো হাতে চেপে ধরল সপ্তদশীর মেদহীন বাঁকানো কোমর। তৎক্ষনাৎ ভয়ে সিটিয়ে গেল মাহি। সাপের ন্যায় মোচড়াতে লাগলেই ধৈর্য্যহীন মানব দিলো এক ধমক!

“ মোচড়ানো বন্ধ কর বেয়াদবের বাচ্চা! দেখছিস না? তোর এই মোচড়ামুচড়ির জন্য আগাতে পারছিনা আমি! কিছু করতেও তো দিচ্ছিস না বেয়াদব মেয়েছেলে কোথাকার!”
হতবিহ্বল মাহি! সহসা বোকার ন্যায় চোখ তুলে তাকায় মুগ্ধের পানে। নিষ্পাপ সন্দিগ্ধ কন্ঠে বলেই বসে —
“ আর কি করার মতো বাকি রেখেছেন? এতকিছু করেও মন ভরলো না আপনার? গলাটা বোধহয় আর নেই আমার। ছিড়েখুঁড়ে খেয়েছেন রাক্ষসের মতো! জ্বলে যাচ্ছে জায়গাটা। তারপরও বলছেন কিচ্ছু করতে পারেননি?”
বিরক্তির চরম শিখরে পোঁছে গিয়েছে দ্য মাফিয়া বিস্ট! চোয়াল শক্ত করে ফুটিয়ে, দাঁতে দাঁত চাপলো বেশ। কটমট কন্ঠে বলে উঠল,

“ হ্যাংকি-প্যাংকির কাছে এগুলো কিছুই না বান্দীর মেয়ে!”
হতভম্বতার সাগরে কেউ বুঝি টেনেহিঁচড়ে নামালো বোকা মানবীকে। অবোধ্য ভাবস্রোতে লেপ্টে গিয়েছে মুখ! সে কেমন বোকার ন্যায় প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ কি করতে চাচ্ছেন আপনি?”
কঠোর মুখ অভিব্যক্তিতে অটল মুগ্ধ! রমণী এসবে বড্ড অজ্ঞ তা আর বুঝতে বাকি নেই তার। সে সহসা মুখ নামালো মাহি’র অভিমুখে। দৃষ্টিযুগল স্থির রেখে বেশ বিজ্ঞ কন্ঠে শুধালো —
“ লুক চাশমিস! আ’ই ওয়ান্না গেট ইন্টি**মেট উইথ ইউ্য ওকে? সো…”
একপল থামল মুগ্ধ। কৌতুহলী মানবীর মুখপানে এক-আধবার দৃষ্টি বুলিয়ে ফের শুধালো,
“ সো ডু ইউ নো হাউ টু গেট স্টার্টেড?”
হতবুদ্ধির ন্যায় দু’ধারে মাথা নাড়ায় মাহি। বোকা কন্ঠে বলেই বসে,

“ কি করে জানবো? এর আগে কারো সঙ্গে ইনভলব হইনি তো।”
মুহুর্তেই চোয়ালের পেশি টানটান হলো মুগ্ধের। চোখদুটোয় দেখা গেলো আগুনের ছাপ! রাগের তোড়ে আচানক হিং স্র থাবায় আঁকড়ে ধরল মাহি’র নরম গ্রীবাদেশ। ক্ষুব্ধ বাঘের ন্যায় গর্জন তুলে আওড়াল,
“ কি বলছিস তুই কু***বাচ্চা? কি করে মুখে আনিস এসব কথা? আমায় ছেড়ে কার সাথে ইনভলব হবি তুই? এতোবড় স্পর্ধা আসে কোত্থেকে তোর? একদম জানে মে’রে ফেলব, চিনিস আমায়?”
আঁতকে উঠে মাহি। ভয়ার্ত কন্ঠে আমতা আমতা করে শুধায়,
“ আমিতো… কেবল বললাম।”
“ কেন বলবি তুই জানোয়ারের বাচ্চা? কেন বলবি বল? কেন অন্যের প্রসঙ্গ উঠাবি তুই? মা’র খাস না কতদিন হয়েছে বল? তাড়াতাড়ি বল বেয়াদব!”
ক্ষ্যাপাটে ষাঁড়টা ক্ষেপেছে ভীষণ। তাকে সামলাতে এবার বড্ড বেগ পোহাতে হচ্ছে রমণীর। কন্ঠার ব্যথা তরতর করে বাড়ছে তার। ছাড়াবার প্রয়াসে মত্ত তার হাতদুটো!

“ সই? এই সই? কোথায় তুই?”
অস্থির পদযুগলে ছুটছে নিরু। জমিদার বাড়ির ঠিক পেছনে অবস্থিত পদ্ম বিলের অভিমুখে সে-কি মস্তবড় জঙ্গল। অষ্টাদশীর ছুটন্ত পাদু’টো বড্ড অশান্ত যেন। সইয়ের চিন্তায় ব্যাকুল হয়েছে অন্তরাত্মা! ঘন-জঙ্গল ভেঙে কয়েক গজ এগোতেই আচানক থমকে দাঁড়ায় নিরু। কানখাড়া করতেই শুনতে পায় — কারো অগ্রসর পদধ্বনি। খুব কাছ থেকে ভেসে আসছে শব্দযুগল। শুকনো পাতার গায়ে জোরালো পায়ের চাপ পড়তেই কেমন মর্মর শব্দ হচ্ছে! নিরু বিরক্ত হলো এবার। তৎক্ষনাৎ পিছু না ফিরে, বুকের কাছে বাঁধলো দু’হাত। তেঁতো কন্ঠে বলল,

“ আর ঢং করতে হবে না সই। আমি বুঝে গিয়েছি এটা তুই ছাড়া অন্য কেউ নয়। তাই বলছি এক্ষুনি ওমন লুকোচুরি বন্ধ করে আমার সামনে আয়।”
প্রতুত্তরে কেবল নিস্তব্ধতা পেলো নিরু! এতে যেন বিরক্তির রেশ তরতর করে বেড়ে গেল অষ্টাদশীর। ঝাঁঝ লেপ্টে গেল সুশ্রী মুখমণ্ডলে। দাঁত খিঁচে পিছু ফিরতে ফিরতে শুধালো —
“ তুই কি কোনোদিন মানুষ হবি না সই? কতবার করে বলেছি পেছন থেকে এভাবে…..!”
বাক্যটুকু সম্পূর্ণ করতে গিয়ে বাকরুদ্ধ হলো নিরু। বিস্ফোরিত রূপ ধরল তার চোখদুটো। ভয়ে থেমে গেলো হৃৎস্পন্দন! দু’হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে এক অশরীরী। বিশাল সুঠাম দেহ তার! মাথার ওপর ফেলে রাখা বড় একখানা কালো রঙা কাপড়। অশরীরির মুখটা অস্পষ্ট। ঢেকে আছে কালো রঙা কাপড়ের আড়ালে। আকাশে মেঘ জমেছে বিধায় চারপাশের অন্ধকারে অশরীরীর পাদু’টো অদৃশ্য মনে হচ্ছে! তার বলিষ্ঠ হাতে কি যেন একটা উচুঁ করে রাখা। ধীরলয়ে ঘাড় বাঁকাতেই অশরীরির চোখে চোখ পড়ল নিরুর। ওমনি বেচারির নিঃশ্বাস আঁটকে গেল গলার কাছে। একদম ধবধবে শেতাঙ্গের ন্যায় গায়ের রঙ অশরীরির, চোখদুটো ভিন্ন রঙের। একটা চোখ হুবহু মানুষের মতো দেখতে হলেও অন্যটা একদম ভুতের চোখ! সম্পূর্ণ সাদা আইরিশের মাঝে ছোট্ট একখানা কালো রঙা পিউপিল। বাদিকের কপাল হতে ডানপাশের গালের ত্বক বরাবর বিশাল এক ক্ষতের দাগ! অশরীরীর চোখদুটো কেমন মুহুর্তেই রঙ পাল্টালো মনে হচ্ছে। আগুন দৃষ্টে অষ্টাদশীর পানে তাকিয়ে থেকে এগোতে চাইলেই গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে ওঠে নিরু!

“ হে ভগবান!!!!! ছোটবেলায় যে-ই আহট দেখেছিলাম তার শাস্তি আমায় এভাবে দিলে তুমি? আহটের সবচেয়ে ভয়ানক মমি’র এসিস্ট্যান্টকে এভাবে আমার সামনে এনে দাঁড় করালে ভগবান? আমি…আমি…”
বলতে বলতেই ভয়ার্ত রমণী জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়লো জঙ্গলের স্যাতস্যাতে জমিনে। এদিকে তার এহেন অতর্কিত কান্ডে যারপরনাই বিরক্ত হলেন অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা রাশিয়ান মানব এডউইন। কপালের চামড়ায় গোটাকতক ভাঁজ টেনে ধীরলয়ে এগিয়ে এলেন তিনি। দু’হাতে আলগোছে মাথার ওপর থেকে নামালেন কালো রঙা ওভারকোটটা। খানিক মাথা তুলে তাকালেন আকাশের পানে। মেঘ জমেছে ফের। কিছুক্ষণ আগে যেভাবে বৃষ্টি হলো! এখন সেভাবে নাহলেই চলে। অগত্যা যুবক ফের ঘাড় নামিয়ে তাকালেন নিজ হাতের পানে। ফোনটা উঁচিয়ে রেখেছে সে-ই কখন থেকে। তাও আবার একটুখানি সিগনালের আশায়! অথচ কান্ড দেখো। আশেপাশে সিগনালের “ স ” ও নেই! এ নিয়ে বড্ড বিরক্ত রাশিয়ান মানব। দাঁত কিড়মিড় করতে করতে আনমনে একবার তাকালো অচেতন নিরুর পানে। তৎক্ষনাৎ মুখাবয়বে এক আকাশসম বিরক্তির ছাপ ফুটলো তার। বিড়বিড়িয়ে শুধালো,
“ হোয়াট দা ফা’ক ইজ দিস? একটা সাধারণ মানুষকে দেখে ওভাবে ভয় পেয়ে জ্ঞান হারানোর কি আছে? যত্তসব ঢং!”
বলতে বলতেই উল্টোপথে পা ঘোরায় এডউইন। হাতের ফোনটার পানে তাকিয়ে থেকে গম্ভীর কন্ঠে আওড়ায়,
“ কোথায় আপনি মনস্তার? অবশেষে এ কোন জঙ্গলে এনে ফেললেন আমায়?”

ওড়নার কোণে নাক ডুবিয়ে ফোঁপাচ্ছে মাহি! ফোপাঁতে ফোঁপাতে বারকয়েক আড়চোখে দেখছে সম্মুখে শক্ত মুখে বসে থাকা রূঢ় মানবকে। মুগ্ধ হিসহিসিয়ে যাচ্ছে সে-ই কখন থেকে। মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছে খেয়ে ফেলার দৃষ্টিতে। মাহি দেখেও না দেখার ভান ধরে বসে আছে। অধৈর্য্য মানব এবার কেমন ধৈর্যহারা হয়ে বাজখাঁই কন্ঠে বলে ওঠে,
“ কাছে আয়!”
কেঁপে ওঠে মাহি! নতমুখে ফোপাঁতে ফোঁপাতে খানিকটা এগিয়ে এসে বসলো মানবী। মধ্যকার দু-আঙুলের ফাঁকা জায়গাটুকু পরক্ষণেই গ্রাস করে বসল মুগ্ধ। রমণীকে একহাতে জড়িয়ে ধরে ধৈর্যহীন কন্ঠে গমগমে গলায় আওড়াল,

“ লিসেন বি’চ! এখন যা যা করব তুই জাস্ট কো-অপারেট করবি আমার সাথে। কোনোরকম ন্যাকাগিরী করলে একদম গলা টিপে মে’রে ফেলব! গট ইট?”
ভয় বাড়ল মাহি’র। নরম চিত্তে ওড়নায় নাক মুছে প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ আগেভাগে বলে দিন কি কি করবেন। তাহলে সেভাবেই কো-অপারেট করব।”
বোকা মানবীর এহেন বাক্যালাপে হতবাক মুগ্ধ! মেয়েটা কি এমুহূর্তে ইচ্ছে করে ন্যাকা সাজছে? না-কি ও এমনিতেই এমন? মুগ্ধ কেমন গম্ভীর ভাবস্রোতে ধীরলয়ে মুখ নামিয়ে আনলো মাহি’র কানের কাছে। আগাম সর্তকতা হিসেবে রমণীকে জড়িয়ে ধরল ভালো করে। যেন চড়ুই ছুটতে না পারে বাঁধন ছেড়ে। খানিকক্ষণ সময় নিয়ে বলতে লাগলো কিছু উদ্ভট কথাবার্তা! যার সঙ্গে পূর্ব পরিচিতি নেই মাহি’র। উটকো বেয়াদবি কথাবার্তা কর্ণকুহরে প্রবেশ করতেই সটান হয়ে গেল বেচারি। রূঢ় মানবের অশ্লীল বাক্যালাপ যত গভীরে যাচ্ছে ততই গা গুলিয়ে উঠছে তার। নাকমুখ কুঁচকে বমি বমি ভাব ধরেছে চঞ্চলা চড়ুই। একপর্যায়ে নিজের সংবরণ আর ধরে রাখতে না পেরে রমণী তক্ষুনি ভকভক করে উগড়ে দিলো পেটে যা ছিলো! তার এহেন অতর্কিত কান্ডে হতভম্ব মুগ্ধ। ত্বরিত মেয়েটার মাথা টেনে এনে জড়িয়ে ধরল নিজ বুকের সঙ্গে। উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,

“ কি হলো তোর? বমি করলি কেনো? ওয়েট, পানি খাবি?”
মাহি’র গা গুলাচ্ছে এখনো। দূর্বল মাথাটা কোনমতে টেনেহিঁচড়ে সরালো রূঢ় মানবের রুক্ষ বক্ষভাঁজ হতে। মুগ্ধ অস্থির! তক্ষুনি ছুটে গেল রমণীকে ছেড়ে দিয়ে। মুহুর্তব্যয়ে পানিভর্তি গ্লাস নিয়ে ফিরে আসতে গেলেই হতবিহ্বলতার জড়তা গ্রাস করল তাকে। যে-ই দেখল চঞ্চলা চড়ুই বিছানা ছেড়ে ছুটে গিয়েছে দেয়ালে টানানো পর্দার আড়ালে! মুগ্ধ কপাল গোছালো। মন্থর পায়ে এগিয়ে এসে সন্দিগ্ধ গলায় শুধালো,
“ পর্দার পেছনে কি করছিস? এদিকে আয়।”
সপ্তদশী মুখ কুঁচকায়। দূর্বল কন্ঠে ঝাঁঝ ঢেলে শুধালো,
“ জানোয়ার লোক! মুখে ছাই পড়ুক আপনার বেলাজা, অসভ্য, বেয়াদব! লজ্জা করে না হাঁটুর বয়সী একটা মেয়ের সঙ্গে এসব বাজে বাজে কথা বলতে?”

মুহুর্তেই সুদর্শনের সুশ্রী মুখাবয়বে রাগের ছাপ স্পষ্ট হলো। হাতে থাকা গ্লাসটা তক্ষুনি রাগের মাথায় ছুঁড়ে ফেলল মেঝেতে। কাঁচের ঝনঝন শব্দে মুখরিত হলো চারপাশ। যে শব্দের অভিঘাতে কেঁপে ওঠে মাহি! অথচ মুগ্ধ অধর কোণে দাঁত বসিয়ে হিসহিসিয়ে যাচ্ছে কেমন। চঞ্চলা রমণীর ঝাঁঝাল বাক্যবাণে রাগের পারদ আকাশ ছুঁই ছুঁই তার। দাঁতে দাঁত চেপে হাতদুটো করেছে মুষ্টিবদ্ধ! হিসহিসিয়ে সম্মুখে এগোতে চাইলেই বিচক্ষণ মস্তিষ্ক তার, সপ্তদশীর অসুস্থতার কথা স্মরণ করিয়ে দিলো ফের। মুহুর্তেই অভ্যন্তরে উপচে পড়া রাগগুলো কোনমতে আঁটকে রেখে, জায়গায় স্থির হলো মুগ্ধ! মনে মনে নিজেকে স্বান্তনা দিয়ে শুধালো,
“ কন্ট্রোল! কন্ট্রোল! মুরগিটা অসুস্থ। যা করার বাগে এনে কর। বুঝিয়ে শুনিয়ে আগে শান্ত কর! নয়তো আবার জ্ঞান হারাবে।”
অভ্যন্তরের স্বান্তনার বাণী আওড়ে খানিক শান্ত হলো মুগ্ধ। পাহাড়সম বলিষ্ঠ দেহখানা মৃদুমন্দ নাড়িয়ে হেঁটে এলো কয়েক কদম। তক্ষুনি ভয়ে কদম পেছালো মাহি। ঝুলন্ত পর্দার আড়ালে গা লুকিয়ে বলে উঠল,

“ থেমে যান বলছি!”
রূঢ় মানব থামল এবার। অস্থিরতায় মেদহীন কোমরের দুপাশে হাত ঠেকিয়ে গমগমে গলায় আওড়াল,
“ এ্যাই বান্দীর মেয়ে এ্যাই! অতিরিক্ত নাটক করবি না বলে দিলাম। ভদ্র বলে এখনো জোর করছিনা কু***বাচ্চা! নয়তো এতক্ষণে তিনবার জ্ঞান হারাতি। অসভ্য মেয়েছেলের মতো কানে কানে কথাগুলো শুনতে গিয়েছিলি কেনো বেয়াদব? যখন প্র্যাক্টিক্যালি করতাম, তখন নাহয় নিজ চোখে দেখতি। ভালো বলে বুঝিয়ে শুনিয়ে নিচ্ছিলাম তা গায়ে সয়নি তাই না? লিসেন বি’চ, টুডে আই ডোন্ট ওয়ান্না টেক এনি রিস্ক। সো কাম ফরওয়ার্ড!”
বিরক্তিতে নাকমুখ কুঁচকায় মাহি। ঘৃণ্য কন্ঠে তৎক্ষনাৎ প্রতুত্তর করে —

“ কিসের বুঝিয়ে শুনিয়ে নেওয়া হ্যাঁ? হাঁটুর বয়সী একটা মেয়ের সঙ্গে নষ্ট নষ্ট কথাবার্তা বলতে লজ্জা করছে না আপনার? আপনি জানেন? আপনার কথাগুলো মনে পড়তেই এখনো আমার গা গুলাচ্ছে?”
চোয়ালের পেশি টানটান হলো মুগ্ধের। বেয়াদব জিভটা বোধহয় আর ধরে রাখতে পারলোনা নিজের কপটতা! সঙ্গে সঙ্গে দাঁত খিঁচে কটুবাক্য ছুড়ঁল!
“ ওরে আমার বা*লছিঁড়ু সতী রে! এখনো কিছু করলামই না, তার আগেই বমি বমি পাচ্ছে? আয়, আয়, কাছে আয় বান্দীর মেয়ে, সঠিক সময়ে সঠিক কাজটা এক্ষুণি করব আমি। মরলে ম*রবি। জ্ঞান হারালে, হারাবি! বেঁচে থাকলে কালকেই বমি পাওয়ার আসল কারণ পেয়ে যাবি! কাছে আয়। কাছে আয় বান্দীর মেয়ে!”
অজান্তেই এক পা পিছিয়ে গেল মাহি। কাঁপলো তার তুলতুলে অধরজোড়া। কিছু বলতে গিয়েও গলা থেকে কোনো শব্দ বের হলো না যেন। ভীত-লজ্জাতুর দৃষ্টিতে একবার তাকাল রূঢ় মানবের চোখের দিকে, অতঃপর তৎক্ষণাৎ চোখ নামিয়ে নিয়ে ছুটলো বা-দিকে। ওতোবড় কামরায় প্রাণভয়ে ছুটতে ছুটতে চিৎকার দিয়ে শুধালো,

“ শেষ! আমি শেষ। আমি আর এসবে নেই। আল্লাহর ওয়াস্তে আমায় ছেড়ে দিন বিস্ট!”
রমণীর পেছন পেছন ছোটার বদলে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে মুগ্ধ! কোমরের দুপাশে হাত বেঁধে কটমট কন্ঠে আওড়াল,
“ দেখ সিগনোরা! আই হেভ নো মোর পেশেন্স টুডে। জাস্ট স্টপ রানিং আই সে।”
শুনলো না বোকা মানবী! উল্টো দ্রুত পায়ে আচানক উঠে গেলো বিছানায়। বলল,
“ না না না! দূরে যান। দূরে যান বলছি। আপনার মতো দৈত্যের কাছে আমি একটা পিচ্চি মানুষ। ম’রে যাব আমি।”
এপর্যায়ে ব্যাকুল মুগ্ধ! পায়ের তাল বিছানার পানে এগিয়ে এনে কপট মোলায়েম ভঙ্গিতে বলতে লাগল,
“ না না! দেখ সিগনোরা। দেখ, আমি আছি তো। আমি থাকতে এতো ভয় কিসের তোর?”
বোকা সপ্তদশীর ভয়ের চোটে মাথার তার হয়েছে এলোমেলো। আচমকা রূঢ় মানবের মুখের ওপর বলে বসল,
“ ওরে মাথামোটা দৈত্য! আপনাকেই তো ভয় লাগছে আমার।”

কথায় কথায় বাক্যটা জিভ খসতেই টনক নড়ল মাহি’র। ত্বরিত দু’হাতে ঢেকে নিলো নিজ মুখ। ভয়াতুর দৃষ্টে সম্মুখে তাকাতেই দেখে — ক্ষুব্ধ বাঘের ন্যায় হিসহিসিয়ে যাচ্ছে মুগ্ধ। দাঁত খিঁচে হুংকার ছুঁড়ে বলে ওঠে,
“ মুখ সামলে কথা বল বেয়াদবের বাচ্চা! ভুলে যাস না কার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিস!”
কাঁপছে মাহি। রূঢ় মানবের ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে কদম পেছাতে চাইলেই আচানক ছুটে এসে বিছানায় লাফ দিলো মুগ্ধ! ওমনি রাশিয়ান দৈত্যের ভারে বেচারা খাটের তক্তাগুলো কেমন মর্মর শব্দে ভেঙে পড়লো নিচে। এহেন অতর্কিত কান্ডে কপোত-কপোতী যুগল আচানক ধপাস করে পড়ে গেল ভাঙা খাটের ঠিক মাঝখানে। ওপর থেকে বাদবাকি কাঠের তক্তাগুলোও পড়ল পরক্ষণে। চোখের পলকে ঘটে যাওয়া এরূপ ঘটনায় হতভম্ব মাহি। ধীরলয়ে স্বাভাবিক হতেই নিজেকে আবিষ্কার করে রূঢ় মানবের উষ্ণ আবেশে। কাঠের তক্তাগুলোয় পিঠ ঠেকিয়ে রাখা মুগ্ধের। নিজ দৃঢ় বাহুবন্ধনে আড়াল করে রেখেছে বোকা মানবীকে। পেতে দেয়নি একচুল ব্যথা! রয়েসয়ে যুবকের উষ্ণ আবেশ হতে মাথা তোলে মাহি। ক্ষুদ্র চোখে মানবের পানে তাকাতেই ভড়কায় সে। রূঢ় মানবের ফর্সা ললাটতটের পাশ কাটিয়ে অবলীলায় গড়াচ্ছে লহু। তবুও তার চোখদুটোতে বিন্দুমাত্র ব্যাথাতুর ছাপ নেই। সেথায় লেপ্টে আছে এক আকাশসম অপেক্ষা! রমণী উদ্বিগ্ন হলো। নিজের সকল ভয়ডর কাটিয়ে পরমুহূর্তেই হাত রাখলো রূঢ় মানবের রুক্ষ গালে। ব্যাকুল কন্ঠে শুধালো,

“ এ কি! আপনার কপাল ফেটে র* ক্ত পড়ছে বিস্ট। আপনি…!”
বাকিটা বলার ফুরসত দিলো না মুগ্ধ। তার পূর্বেই মাথাটা খানিক এগিয়ে এনে আলগোছে টেনে ধরল মাহি’র নরম ওষ্ঠপুট! দীর্ঘ সময়ের স্থায়িত্বে, গভীর আশ্লেষে রমণীর ফিনফিনে অধরজোড়ায় কর্তৃত্ব চালিয়ে ধীরলয়ে বিচ্ছিন্ন করল ওষ্ঠপুটের মেলবন্ধন। স্থবির রমণীর গালে হাত ঠেকিয়ে, চোখে রাখলো চোখ। অত্যন্ত শান্ত অথচ গভীর কন্ঠে আওড়াল,

“ আগেই বলেছি — আমি কোনোকিছু হাসিল করা বলতে জোরজবরদস্তি বুঝি! তোকে আমার চাই সিগনোরা! ট্রাস্ট মি, তোকে আমি একান্তভাবে, গভীরভাবে চাই। এতটুকু কাছে চাই, যতটুকু কাছে এলে তোর প্রতিটি নিশ্বাসের শব্দ আমার কর্ণকুহরে পৌঁছাবে। তোর দেহ ক্ষত-বিক্ষত — তা আমি জানি মেয়ে! তবে আমার কনক্রিটের আস্তরণে বন্দী থাকা হৃদয়টা ঠিক কতটা ক্ষত-বিক্ষত, তা তুই আমাতে ডুব না দিলে কি করে বুঝবি বল তো?

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৬

শুধু শুধু কেনো অপেক্ষার প্রহর বাড়াচ্ছিস সিগনোরা? পরে আবার প্রহর গুনতে চাইলে আমাকেই না হারাতে হয় তোর! জীবন ক্ষনস্থায়ী হলেও, আমার বেঁচে থাকা তার চেয়েও ক্ষনস্থায়ী। অন্তত তোর মাঝে এই আমাকে — চাইলেই একটুখানি জায়গা দিতে পারিস। কথা দিচ্ছি মেয়ে — তোর দুঃখের ফুলবাগানের প্রতিটি কাটা আমি হাসিমুখে নিজ গায়ে মেখে নিবো।”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৭