Home ভুলভাল অন্তরাল ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৩৩

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৩৩

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৩৩
মুশফিকা রহমান মৈথি

পটনভী মঞ্জিলে পারভেজের “শুভেচ্ছায় স্বাগতম” করা হলো। কাঞ্চনের মেজো চাচা সিরাজুল পটনভী একটা ব্যানার বানিয়ে এনেছেন। তাতে বড় বড় অক্ষরে “WELCOME DEAR POTNOVI”। রিদমের মতে এটা অতিরিক্ত। পারভেজকে নিয়ে এতো আদিখ্যেতার কি আছে বোধগম্য হচ্ছে না। সে আর পাঁচটা পটনভীর মতোই একটা পটনভী, অথচ তাকে এমনভাবে মাথায় তোলা হচ্ছে মনে হচ্ছে সে ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প এলেও পটনভীরা এতো আদিখ্যেতা করবে না। বুক বাকিয়ে বলবে,

“এই মাথাপাগল বুড়োকে নিয়ে এতো লাফালাফির কি আছে! এই ছাগলের মাথা ভর্তি গোবর।“
অথচ পারভেজকে নিজে আহ্লাদীর শেষ নেই। মামীরা সকাল থেকে এই একজনের আপ্যায়নে ঘরকে বিয়ে বাড়ি বানিয়ে রেখেছেন। মনে হচ্ছে আজকেই পৃথুলার বিয়ে। পটনভী পরিবার একটা বিশাল পরিবার। প্রতিদিন এখানে চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ জনের জন্য রান্না হয়। মামীরা সেই রান্না নিজে হাতে না করলেও তদারকি তাদের। আজকে মনে হচ্ছে তদারকি শতগুণ বেড়ে গেছে। পটনভী মঞ্জিল ঝা চকচক করছে।
জুলফিকার পটনভী অবধি উঠে নিচে এলেন বোনের নাতীর আগমণে। বার্ধক্যজনিত কারণে বর্তমানে শরীরটা ভালো নেই তার। জ্বর আসে মাঝে মাঝে। সর্দি কাশি লেগে আছে। মেহেদী পটনভী সপ্তাহে সপ্তাহে টেস্ট করাচ্ছেন। কিন্তু তাতে লাভ হচ্ছে না। একদিন ভালো থাকলে পরদিন ঝিমিয়ে আসে শরীর। এজন্যই পারভেজ এবং পৃথুলার বিয়ে নিয়ে জুলফিকার পটনভীর খুব একটা মাথা ব্যথা নেই। পারভেজের জন্ম ভারতে হলেও তার বেড়ে ওঠা নিউজিল্যান্ডে। পরিবার সমেত তারা সেখানেই থাকে। পটনভী বংশের একটা ভালোগুণ হলো পৃথিভীর যে প্রান্তেই থাকুক না কেন, তারা পটনভী এই ব্যাপারটা তারা ভুলে না। যোগাযোগ কোনো না কোনোভাবে অক্ষত থাকেই।

পারভেজের দাদী অর্থাৎ জুলফিকার পটনভীর মেজো বোন শিরিন পটনভীর বিয়ে হয় ইন্ডিয়ায়। বিশাল ব্যবসা তাদের। তবে পারভেজের বাবা ব্যবসাতে আগ্রহী ছিলেন না। পড়াশোনায় ভালো ছিলেন। বাহিরে পিএইচডি করতে যেয়ে সেখানেই স্থায়ী হয়ে যান। ভালো বেতনের চাকরি করেন। পারভেজের বেড়ে ওঠা সেকারণেই নিউজিল্যান্ডে। তবুও দাদার বিষয় সম্পত্তি কম পায় নি সে। শুধু তাই নয়। মৃত্যুর আগে শিরিন পটনভী তার আয়ত্তের শেয়ার পারভেজের বাবার নামে লিখে দিয়েছেন। একারণেই ইলিয়াস পটনভীর তার প্রতি আগ্রহ বেশি। উপরন্তু শিরিন পটনভীর খুব ইচ্ছে ছিলো ভাইয়ের কোনো একটা মেয়েকে তার পুত্রবধূ করা। কিন্তু এমন কিছুর সুযোগ হয় নি। ফলে মৃত মায়ের ইচ্ছে রক্ষার্থে পারভেজের বাবাই এই বিয়ের প্রস্তাব রাখেন। ইলিয়াস সুযোগটা হাতছাড়া করতে চায় নি। মেয়ে নিশ্চয়ই বিয়ের পর বাবাকে অগ্রাহ্য করবে না।
পারভেজ দেখতে নিঃসন্দেহে সুদর্শন পুরুষ। লম্বায় স্নিগ্ধকে টেক্কা দিতে পারবে। গড়ণও মডেলদের মত। প্রশস্ত কাঁধ। পটনভীরা প্রায় সবাই শুভ্র বদনের। পারভেজও আলাদা নয়। অঞ্জনা তাকে খুব খুঁতে খুঁতে দেখলো। পটনভীদের গ্রুপে পারভেজ আছে ঠিকই। কিন্তু কখনো সে কথা বলে না। তাই ফেসবুকে কানেক্টেড হলেও কখনো তার সাথে কথা হয় নি মঞ্জিলের মানুষের। পারভেজ আসছে শোনার পর থেকে ভবিষ্যতের উকিল অঞ্জনা তার নাড়িনক্ষত্র বের করেছে। তবে বাস্তবে এতোটা সুদর্শন হবে আশা করে নি। ফলে পৃথুলাকে বেশ সন্তুষ্ট গলায় বললো,

“পারভেজ দেখতে সেই কিন্তু!”
অঞ্জনার ভাষ্যে পৃথুলা মৃদু হাসলো। নরম স্বরে বললো,
“নাকটা খাঁড়া। বোঁচা নাক আমার ভালো লাগে না। খাড়া নাক পুরুষের দর্পের প্রমাণ!”
ইঙ্গিতটা রিদমের দিকে ছিলো। পটনভীদের মধ্যে বোঁচা নাকের অধিকারী হাতে গোনা। রিদম তাদের মধ্যে একজন। ফলে তার গায়ে লাগলো কথাটা। ফলে সাথে সাথেই রিদম নির্লিপ্ত গলায় বলে উঠলো,
“খাঁড়া নাকের উপর তাবু খাঁটিয়ে সংসার পাত যা! বাঁশ আমি কিনে দিব।“
পৃথুলা খুব অনীহার সাথে বললো,
“সেটার প্রয়োজন নেই। তুই না বললেও আমি ওর সাথেই সংসার করবো।“
“ওবাবা, ঘন্টা খানেকের মধ্যে দেখি পুরো একশ আশি ডিগ্রী ঘুরে গেলি।“
পৃথুলা উত্তর দিলো না। অঞ্জনা এদের ঝগড়ার মধ্যেই নিজের চশমাটা ঠিক করে বলল,
“এতো তাড়াহুড়োর কিছু নেই। বিয়ে তো হবেই। বাট আমি একটা বিষয় নিয়ে একটু বিরক্ত।“
“সেটা কি শার্লক?”

“পারভেজ যতটা ভদ্র শান্ত দেখাচ্ছে, সে তার ফিডে এমন না। আমি ওর ইন্সটা ঘেঁটে ট্যাটুর ছবিও পেয়েছি। আই থিংক ও ড্রিংকও করে। নিউজিল্যান্ডে মানুষ হয়েছে সে। সুতরাং বিষয়গুলো খুব কমন। কিন্তু এজ হাসবেন্ড খেয়াল করলে একটু অড। তোর প্রিফারেন্সের সাথে মিলে না পৃথুলা।“
পৃথুলা আর কথা বললো না। সে অঞ্জনার কথাগুলো না শোনার ভান করে নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালো। তবে রিদম কেন যেন একটা কথাও কর্ণগোচর করলো না। মনোযোগ দিয়ে শুনলো। তার মনের ভেতরে খচখচ করছে। অব্যক্ত অস্বস্তি তাকে গিলে খাচ্ছে। তাশদীদ থাকলে অন্তত তার সাথে কথা বলা যেত। চট্টগ্রামে পা রাখার পর থেকে তাশদীদকে খুব একটা পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যস্ত হয়ে গিয়েছে সে তার জীবনে। রিদমও ঘাটাচ্ছে না। নয়তো শালা একটা কথাই বলবে,
“বিয়ে করে ফেল।“

স্নিগ্ধর চোখে মুখে বিরক্তি। স্টিয়ারিং হুইল ডান হাত। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাস্তায়। এতোসময়ে তাদের বাগেরহাট পৌছে যাবার কথা ছিলো। কিন্তু তারা এখনো রাস্তায়। পাঁচটার আগে পৌছাবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ আছে। এর কারণ অবশ্য পাশেই বসে আছে। মুখটা ফুলিয়ে চরম অসন্তুষ্ট চোখে সে গ্লাস দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে আছে। একটু আগে স্নিগ্ধ এবং কাঞ্চনের মধ্যে বিশাল ঝগড়া হয়েছে। ঝগড়ার কারণটাকেও অপছন্দ তার। কারণটার নাম মাহফুজ। সুন্দর তৈরি হয়ে স্নিগ্ধ এবং কাঞ্চন বাড়ি থেকে বের হচ্ছিলো, লিফট থেকে নেমেই মাহফুজের সাথে দেখা হয় তাদের। মাহফুজকে দেখতেই স্নিগ্ধর মেজাজটা খারাপ হলো। কঠিন হলো চোয়াল, তীক্ষ্ণ হলো দৃষ্টি। মাহফুজ সরাসরি কাঞ্চনকে দেখেই গদগদ স্বরে বলল,

“অবশেষে বের হচ্ছো তোমরা?”
তোমরা? এতোটা সখ্যতা কাঞ্চনের সাথে এই ছেলের। বিষয়টা আরোও বেশি উত্যক্ত করলো স্নিগ্ধকে। নেহায়েত নিজেকে স্থির রাখার স্বভাবটা স্নিগ্ধের চিরচারিত বৈশিষ্ট্য। তাই খুব একটা বিচলিত তাকে দেখালো না। কাঞ্চন একটু অপ্রস্তুত হলো। মাথা চুলকে বললো,
“হ্যা, ভাইয়া। আপনি কি করে জানলেন?”
“ভাইয়া, জানিয়েছেন। আসলে মা খুব আফসোস করছিলো। তোমার গরু মাংসে এলার্জি সেটা মায়ের জানা ছিলো না। আগে জানলে মা মুরগী রাঁধতো। একারণে আজকে রাতে তোমাদের দাওয়াত দিয়েছে।“
গরু মাংসে এলার্জি আছে কাঞ্চনের। কিন্তু তাই বলে সে খায় না এমন না। তবে মাহফুজের কথাগুলো সে বুঝতে পারলো না। তাকে হতবিহ্বল দেখে মাহফুজ বললো,
“সকালে আমি তোমাদের জন্য নাস্তা নিয়ে এসেছিলাম। ভাইয়া বললেন তোমার গরু মাংসে এলার্জি। তাই শুধু নিজের নাস্তাটাই রেখেছিলেন।“

কাঞ্চন আড়চোখে স্নিগ্ধের দিকে তাকালো। কিন্তু স্নিগ্ধের মধ্যে কোনো ভাবাবেগ দেখা গেলো না। সে নির্লিপ্ত, নির্বিকার। কাঞ্চন বেশ বিব্রত হলো। কেউ তার যত্ন করে কিছু বানিয়ে পাঠিয়েছে অথচ সে সেটা ফেরত দিয়েছে এমন ঘটনা সচারচর ঘটে না। বেসিক কার্টেসি সে অবলম্বন করে। ফলে খানিকটা অস্বস্তিতেই পড়লো সে। আমতা আমতা করে বললো,
“আসলে আমার শরীরটা ভালো নেই, স্নিগ্ধ ভাইয়া হয়তো সে কারণেই ফেরত দিয়েছেন। আন্টিকে সরি বলিয়েন।“
“তুমি নিজে বলিও রাতে।“
এর মধ্যেই স্নিগ্ধ বলে উঠলো,
“আমরা আজকে দাওয়াতটা নিতে পারছি না। আসতে আসতে রাত হতে পারে।“
“তাহলে কাল?”

“আমরা ঢাকায় ব্যাক করছি কালকে। সো সরি। এন্ড থ্যাংক ইউ। নাউ এক্সকিউজ আস।“
মাহফুজ এবং কাঞ্চন সৌজন্যমূলক হাসি বিনিময় করলো। তবে কাঞ্চনের মেজাজ খারাপ হলো স্নিগ্ধের উপর। গাড়িতে উঠার সাথে সাথেই সে বললো,
“ইচ্ছে করে করেছো এটা তাই না?”
স্নিগ্ধ বরাবরের মতো কোনো ভনীতা না করেই বললো,
“হ্যা, আমার এই ছেলেটাকে পছন্দ না। গায়ে পড়া মানুষ আমার ভালো লাগে না।“
“তাই বলে সৌজন্যবোধটাও কি ভুলে গেছো?”
“গরু আর বেগুণে তোর এলার্জি।“
“কিন্তু আমি খাই সেগুলো।“
“তারপর গা চুলকাতে থাকিস।“
“তো?”
স্নিগ্ধ গাড়ি চালাতে চালাতে কঠিন গলায় বললো,

“তো মানে? যেটা ক্ষতিকারক সেটা কেন খেতে হবে?”
“আমি খেতাম সেটা তো বলি নি। গ্রহণ করতে তো সমস্যা নেই। আন্টি কি মনে করছেন?”
“কি যায় আসে?”
“অবশ্যই যায় আসে। তারা আমাদের প্রতিবেশী। উপর থেকে তারা আমাদের জন্য মন থেকে খাবার পাঠিয়েছে।“
“আমাদের সেটার প্রয়োজন নেই। এতো আদিখ্যেতা দেখানোর কিছু হয় নি।“
স্নিগ্ধ বরাবরই এমন। তার নিজস্ব বৃত্ত ব্যতীত মানুষ কি ভাবছে তা নিয়ে মাথা ব্যথা নেই। শুধু শুধু তো তাকে সিমেন্টের বস্তা বলে না কাঞ্চন। কাঞ্চন খানিকটা ক্ষিপ্র স্বরে বলল,

“আদিখ্যেতা বলে না। এটাকে সৌজন্যবোধ বলে। যা তোমার মধ্যে নেই। ইউ ডোন্ট কেয়ার।“
“এটাই কি স্বাভাবিক না। আমি এখানে চিরকালের জন্য থাকছি না। জাস্ট চারদিন হয়েছে এখানে আমরা। ওদের চিনি অবধি না। এতো ফ্রেন্ডলি হওয়াটাই বরং সন্দেহজনক।“
“তোমার মনটাই কালা তাই তোমার কাছে কারোর ভালো দিকটা চোখেই পড়ে না।“
এবার স্নিগ্ধ রাস্তা থেকে চোখ সরিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে তাকালো কাঞ্চনের দিকে। গমগমে স্বরে বলল,
“তুই সবার ভালো দিক দেখতে পাস, আমারটার বেলায় কি হয়?”
“নেই তো দেখবো কি?”
স্নিগ্ধ কঠিনভাবে ব্রেক করলো। তার মুখ কঠিন হয়ে আছে। দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। সে স্থির, শীতল চোখে তাকিয়ে আছে কাঞ্চনের দিকে। এমন দৃষ্টিকে কাঞ্চন মাত্রাতিরিক্ত ভয় পায়। মনে হয় হিংস্র কোনো পশু তার শিকারের দিকে অধিক আগ্রহে চেয়ে আছে। এখনই একটা থাবা মেরে বসবে আর শিকারের প্রাণ হরণ করে ফেলবে। স্নিগ্ধ শীতল গলায় বললো,

“ঐ ছেলেটার প্রতি এতো দরদ থাকলে সেটা মনেই রাখবি। আই এম ওয়ার্নিং ইউ। আই ওন্ট টলারেট দ্যাট।“
“দরদ দেখাচ্ছি আমি?”
“তাহলে আমার সাথে ঝগড়া করছিস কেন?”
“আমার ভালো লাগে তোমার কাছে ঝগড়া করতে।“
কাঞ্চন চোখ সরিয়ে নিলো। সেখানেই স্নিগ্ধ বসে রইলো ঘন্টাখানেক। মেজাজ যখন ঠান্ডা হলো সে আবার গাড়ি চালাতে লাগলো। কাঞ্চন সেই থেকে মুখ ফুলিয়ে বাহিরে তাকিয়ে আছে। কথা বলে নি। এই লোকটা মানুষের ইমোশন বুঝে না। বোঝার ক্ষমতা নেই। অহেতুক রাগ দেখাবে। যা মন চায় তাই করবে। এটাই তার ধর্ম।

ষাট গম্বুজ মসজিদে এসেই মনটা ভালো হয়ে গেলো কাঞ্চনের। এই প্রথম মসজিদটা কাছ থেকে দেখছে। মসজিদে এসেছে অথচ নামায পড়বে না এমনটা হয় না। তাই স্নিগ্ধ তাকে অশ্বথ গাছের নিচে বসতে বলে নামাজ পড়তে চলে গেলো। কাঞ্চন ঘুরে ঘুরে ভিডিও করলো। বিকালের প্রায় শেষ লগ্ন। সূর্যটা পশ্চিমে হেলে গেছে। দীঘির স্বচ্ছ পানিতে সেই সোনালি আলো পড়ছে। কি চমৎকার লাগছে দেখতে। দীঘির কাছে মানুষের জটলা হলেও এই জায়গাটায় শান্তি আছে। শীতল বাতাস ছুঁয়ে যাচ্ছে তার গাল। এখানের লোকালরা ভিন্ন গল্প বললো। মসজিদটা জ্বিনের দ্বারা তৈরি। এই দীঘিটাও তারাই কেঁটেছে। এই দীঘির নিচে সোনার মসজিদ আছে। মাঝে মাঝে সেটা দেখা দেয়। আরোও অনেককিছু। কিন্তু এই সব গল্প খুব একটা আকৃষ্ট করে নি কাঞ্চনকে। করেছে মসজিদটা। কতটা চমৎকার চিত্রকল্প। খুব খুতিয়ে দেখলে পোড়ামাটির কারুকাজগুলো বোঝা যায়। এতো এতো বছর আগের নিদর্শন। অলৌকিক ই বটে। সবচেয়ে অলৌকিক এখানের শান্তিটা। এক অদ্ভূত শান্তি আছে এখানে। এই শান্তির মধ্যে অনেক অনেক অবান্তর প্রশ্ন তার মাথায় ঘুরলো। গতরাতে স্নিগ্ধ এবং তার মধ্যে কিছুই ঘটে নি। স্নিগ্ধ নিজ থেকে সরে এসেছিলো। তাহলে এই বিয়ে থেকে স্নিগ্ধ কি চায়? কেন তাকে বিয়ে করেছে? কাঞ্চনের ডায়েরিটা কবে পেয়েছে স্নিগ্ধ? সে কি তাকে ভালোবাসে নাকি কেবল ই জেদ? প্রশ্নগুলো পীড়া দেয় কাঞ্চনকে।

এতোকাল স্নিগ্ধ কখনোই তাকে এতোটা প্রাধান্য দেয় নি। সে বরাবর ই স্নিগ্ধের কাছে অদৃশ্য ছিলো। ফলে হঠাৎ করে তার এমন পরিবর্তন হজম হচ্ছে না। মাহফুজকে অপছন্দ করার কোনো কারণ নেই। অথচ স্নিগ্ধ তাকে অপছন্দ করে। এমন একটা ভাব করে যেন সে ঈর্ষান্বিত। অথচ কাঞ্চন এই ঈর্ষার কারণটকুও বুঝছে না। সে তো স্নিগ্ধর ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। কোনোকালে ছিলোও না। আগেও তো কাঞ্চনের ছেলেবন্ধু ছিলো। স্নিগ্ধ কখনোই গা করে নি। মাঝে মাঝে তো স্নিগ্ধকে শোনানোর জন্যও কাঞ্চন ইচ্ছে করে তাদের উল্লেখ করতো। তবুও সে নির্লিপ্ত ছিলো। তবে এখন কেন? প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়াটা খুব দরকার।
মাগরিবের নামাজ শেষেই স্নিগ্ধ বের হলো। এখন রওনা দেওয়া প্রয়োজন। যদিও কাঞ্চনের আরোও সময় থাকতে ইচ্ছে করছিলো কিন্তু সেই সুযোগ হলো না। কারণ সন্ধ্যে হয়ে গেছে।

দামী ফ্রেঞ্চ কফি শপ। নামটাও পোশ মার্কা, “Torrazur”। মেন্যু কার্ড দেখলেই খাওয়ার ইচ্ছে চলে যায়। ডেকোরেশন খুব মিনিমাল কিন্তু কোজি ভাইব আসছে। পারভেজ এবং পৃথুলা বিশাল থাই গ্লাসের পাশের দুই সিটের একটা টেবিলে।
পারভেজ সন্ধ্যা থেকেই ঢাকা দেখার ইচ্ছে পোষণ করেছে। এতো লম্বা জার্নি করে এসে কারোর ঘোরাঘুরির শখ হতে পারে সেটা পটনভীদের জানা ছিলো না। তাকে নিয়ে বেরিয়েছে পৃথুলা। অনেকটা জোরাজোরিও ছিলো। একসাথে ঘোরাঘুরি করলে পারভেজ এবং পৃথুলার সম্পর্ক ভালো হবে বলেই ধারনা সবার। পারভেজও পৃথুলাকেই জোর করছিলো। ফলে এক প্রকার বাধ্য হয়েই তার সাথে পৃথুলাকে বের হতে হয়েছে।
রিক্সাতে চড়েছে তারা দুজন। অনেকক্ষণ ঘুরাঘুরি করার পর এখানে এসেছে। এই রেস্টুরেন্টে আগে কখনো পৃথুলা আসে নি। পারভেজের সাথে এই রেস্টুরেন্টটাই মানাবে। তাই এখানে আসা। পারভেজকে কোনো টঙ্গে নিয়ে গেলে সে নির্ঘাত ” কিটানু” “কিটানু” করে অজ্ঞান হয়ে যেত।

আজকে বেশ মানুষের ভিড়। হয়তো দিনটা ছুটির বলে। রোমান্টিক গান বাজছে। পারভেজ পুরুষটি দেখতে প্রচন্ড সুদর্শন। তার চলাফেরা, বেশভূষা খুব আপ টু ডেট। ফ্যাশন সেন্স বেশ চৌকস। পরণে ব্লু ডেনিম জ্যাকেট, একটি লুজ celine এর ট্যাংক টপ এবং বেইজ রঙ্গের প্যান্ট। হাতে Titan এর ঘড়ি। চোখে সানগ্লাস। ফ্রেঞ্চ মডেল টাইপ তার অঙ্গভঙ্গি। পারফিউমটা বেশ দামি। তার সাথে পৃথুলা কিছুতেই যায় না। পৃথুলার সাজসজ্জা খুব সাধারণ। একটা বেগুণী রঙ্গের কুর্তি এবং কালো লেগিংস। গলায় একটা কালো ওড়ণা। একটা দুল পরেছে সেটাও মেলা থেকে বারগেইন করে কেনা। কত নিয়েছিলো? ৬০ টাকা। পৃথুলার পছন্দও খুব সাধারণ। এই দামী ফ্রেঞ্চ ক্যাফের বদলে একটা ফুচকার দোকানে নিয়ে গেলে বুঝি সে বেশি খুশি হত। কিন্তু পারভেজ রিক্সাতে উঠেই যেমন নাক শিটকাচ্ছিলো! পারভেজ তাকে মেন্যু এগিয়ে দিয়ে বললো,
“ক্যায়া লেঙ্গে আপ?”
হিন্দি বলতে পারে না পৃথুলা খুব একটা। বুঝতে সমস্যা নেই। তাই ইংলিশেই বললো,
“Whatever you choose”

পারভেজ হাসলো। তাদের ঠিক পেছনের দু টেবিল পরে একটা টেবিলে মুখের সামনে উলটো মেন্যু কার্ড ধরে বসে আছে তাকবির। যেন মুখ না দেখা যায়। আর পাশে রিদম। মুখে কালো মাস্ক, চোখে সানগ্লাস, আর মাথায় ক্যাপ। তাকে যেন একেবারেই না চেনা যায় এমন বেশভুষা। চোরের সে এবং তাকবির পৃথুলাকে ফলো করে এসেছে। যদিও মনে মনে একশবার বললো,
“আমি শুধু এসেছি এই দেখতে যে শাকচুন্নিটা এই বিদেশী পাসপোর্টটাকে টপকায় না দেয়!”
পৃথুলার এমন কোমলবতী স্বভাব তাকে বিস্মিত করছে। বিস্ময়ে মুখ হা হয়ে যাচ্ছে। যেই মেয়ের মুখে একবিন্দু মধুবাক্য সে কখনো শুনেনি সে এমন লজ্জাবতী লতা হয়ে গেলো কি করে! তাকবীর আর না পেরে শুধালো,
“বাড়ি যাবো না? পৃথুলা তো ভালোই আছে।”
“তাই তো দেখতেছি। একেবারে ১৮০° উল্টে গেছে। মুখ দিয়ে মধু ঝড়তেছে। এই শাকচুন্নী তো রাখি সাবান্ত থেকে মাদার তেরেসা হয়ে গেছে। না না, বিশ্বাস নেই। বিদেশী মালটা সহীহ সালামতে ঘরে না যাওয়া পর্যন্ত আমাদের নড়া ঠিক হবে না। আফটার অল আমাদেরও কিছু দায়িত্ব আছে।”

গাড়ি চলছে অন্ধকার রাস্তা চিরে। অনেক দূরে দূরে এক একটা সোডিয়ামের লাইট। বেশির ভাগ ই প্রায় নষ্ট। হেডলাইটের আলোতেই যা একটু আঁধার কাঁটছে। গান বাজছে মৃদু শব্দে। নীরবতা চিরলো স্নিগ্ধই। ভারী স্বরে শুধালো,
“কি খাবি?”
সেই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কাঞ্চন শুধালো,
“তুমি আমাকে কেন বিয়ে করেছো?”

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৩২

স্নিগ্ধ সাথে সাথেই ব্রেক কষলো। সে ইচ্ছে করে নি। গাড়ির টায়ার বাস্ট হয়েছে। শুনশাণ রাস্তায় বিপদের সম্ভাবনা বেশি থাকে। তবে সেই বিপদ যে ডাকাত হবে কে জানতো? র‍্যাবের অফিসারের মাথায় কেউ বন্দুক ধরে তার থেকে সব লুটে নিবে এটা কল্পনাতেও ভাবে নি কাঞ্চন…

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৩৪