ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৩২
মুশফিকা রহমান মৈথি
পৃথুলার জেদ সম্পর্কে খুব ভালো করেই জানা আছে রিদমের। ফলে খুব একটা বিচলিত সে হল না। পৃথুলা সজোরে দরজাটা আঁটকালো। রিদম স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মেয়েটির দিকে। পৃথুলা হনহন করে পা চালিয়ে একটা সিএনজিতে উঠে গেলো। এই নারীর কাছে একটা পয়সা নেই। অথচ জেদ দেখানোর সময় একটুও পিছ পা হয় না। মজার ব্যপার সিএনজিও সিগ্ন্যালেই আঁটকা পড়েছে। ফলে জেদ দেখিয়েও খুব একটা দূরে যেতে পারলো না পৃথুলা। রিদম গাড়িটা এগিয়ে থামালো ঠিক সিএনজির পাশে। চোখের সানগ্লাসটা ঠিক করে বললো,
“গরমে আলুসিদ্ধ হয়ে হবু ভ্যাড়া থুক্কু বরের সামনে চাইলে আমার কোনো আপত্তি নেই। আমি তো তোর শাকচুন্নী রুপের সাথে অভ্যস্ত। বেঁচারা পারভেজ হার্ট এট্যাক না করে। বাই দ্যা মামা, আপনার প্যাসেঞ্জারকে ঝাড়লে একটা টাকাও বের হবে না।“
সিএনজি চালক পৃথুলার দিকে তাকালো। ঝাঁঝালো স্বরে বলল,
“আপা আপনের কাছে টেকা নেই?“
“টাকা আছে মামা, আপনি পাগলের কথা শুইনেন না। আমার টাকা বিকাশে আছে।“
রিদম হাসতে হাসতে বললো,
“নাই নাই মামা, ভাওতাবাজি করতেছে।“
পৃথুলা কঠিন চোখে তাকালো রিদমের দিকে। রিদম দায়সারাভাব অক্ষত রাখলো। পৃথুলা সিএনজি থেকে বেরিয়ে গেলো। চালককে বললো,
“মামা আমি যাবো না।“
রিদম ভেবেছিলো এই জেদি মেয়েটার জেদ ভাঙ্গতে সে সফল হয়েছে। কিন্তু পৃথুলা তার চিন্তা থেকে ব্যতিক্রম একটা কাজ করলো। ঠিক দাঁড়ালো গাড়ির সামনে। জুতোটা খুললো পায়ের। সুঁচালো দু ইঞ্চি হিল। ভালো একটা হাতিয়ার। এই হাতিয়ার হাতে নিয়ে সজোরে প্রহার করলো গাড়ির হেডলাইটে। রিদম অবাক হলো না। সে স্থির চোখে তাকিয়ে রইলো পৃথুলার দিকে। পৃথুলার জেদ, রাগ, পাগলামী শুধু তার জন্যই বরাদ্দ। সেটাও তার অজানা নয়। এখনো খুব ভালো করেই মনে আছে, ভার্সিটিতে একবার একটা মেয়ে রিদম রিলেশনে জেনে তাকে প্রপোজ করেছিলো। রিদম তাকে খুব শান্ত ভাবেই প্রত্যাখ্যান করেছিলো। কথাটা যখন পৃথুলার কানে যায় সে মেয়েটির চুল কেটে দিয়েছিলো। যার ফলস্বরুপ তাকে ছয় মাসের জন্য বরখাস্ত করা হয়েছিলো। একটা সেমিস্টার ড্রপ করেছে পৃথুলা। সেখানে হেডলাইট ভাঙ্গা খুব অবাককর ব্যাপার নয়। টুই টুই করে বাজছে হেডলাইটগুলো। মঞ্জিলের কেউ জিজ্ঞেস করলে হয়তো বলবে,
“রিদম গাড়ি ঠুকেছে।“
এটাই রিদমের বিরুদ্ধে তার প্রতিশোধ। রিদম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। পৃথুলা যখন খুব চেষ্টা করছিলো রিদমের গাড়ির গ্লাস ভাঙ্গার, সে জুতা সমেতটা হাতটা ধরে বসলো। পৃথুলা কঠিন চোখে চাইলো তার দিকে। বিদ্রুপ টেনে বললো,
“আঁটকালে থেমে যাবো নাকি?”
রিদম কোনো কথা বললো না। পৃথুলা হাত ছাড়াতে চাইলো কিন্তু শক্ত হাতের বাঁধন থেকে নিজের হাতটা ছাড়াতে পারল না। রিদম তার হাত থেকে জুতাটা একপ্রকার ছিনিয়ে নিলো। তারপর হাটু গেড়ে তার পায়ে পরিয়ে দিলো। পৃথুলা হতবাক চোখে তাকিয়ে রইলো। রিদম তার পায়ে জুতোটা পরিয়ে তাকে পাজাকোলে তুলে নিলো। পৃথুলা বেকুবের মতো চেয়ে রইলো রিদমের চোয়াল কঠিন হয়ে আছে। এই পুরুষকে কতটা আকর্ষনীয় লাগছে সেটা হয়তো সে নিজেও জানে না। গাড়ির দরজাটা খুলে সিটে বসালো পৃথুলাকে। সিটবেল্টটা শক্ত করে লাগিয়ে কঠিন গলায় বললো,
“পুরো রাস্তা এভাবেই বসে থাকবি। আরেকবার ফাজলামি করতে দেখলে ঠাঁটিয়ে থাপড়া লাগাবো। জেন্ডার দেখবো না তখন।“
পৃথুলার চোখ থেকে নোনাজল গড়ালো। রিদমের বুকে চিনচিনে ব্যথা হলো সেই নোনাজল দেখে। ইচ্ছে হলো সযত্নে সেই অশ্রুগুলো মুছে দিতে। বাড়ন্ত হাতটা মুঠোবদ্ধ করে নিজেকে সামলালো সে। গাড়ির দরজাটা আঁটকে আরোও একবার তিক্ত দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে। ভালোবাসার মতো মধুবিষ পান করেছে সে। আগে জানলে মনটাকে কষিয়ে দুটো থাপ্পড় দিত।
ফ্রিজ খুলে চিকেন বের করলো স্নিগ্ধ। কফি মেশিনে এক্সপ্রেসো শট রেডি করলো। ব্লাক কফি ছাড়া মাথাটা কাজ করতে চায় না। অভ্যাস হয়ে গেছে। গতকাল রাতে সবচেয়ে নিঁখুত ঘুম হবার কথা ছিলো। কিন্তু কিছুই হয় নি। এখন মাথাটা টনটন করছে ব্যথায়। গা ম্যাজম্যাজ করছে। অথচ গতকাল রাতটা সুন্দর ছিলো।
আবহাওয়ার দোষ অথবা মনের দূর্বলতা স্নিগ্ধর জানা নেই। তবে সেই মুহূর্তটায় কিছু একটা ছিলো। মাতাল নেশা চেপেছিলো মাথায়। নিজের সংযমকে ভেঙ্গে গুড়িয়ে বারবার মনে হচ্ছিলো কাঞ্চনকে আরেকটু কাছে পেলে মন্দ হয় না। অথচ সবচেয়ে আবেদনময়ী মুহূর্তে সে সরে এসেছে। কোথাও না কোথাও একটা ফাঁকা ভাব রয়ে গিয়েছিলো। মনে হচ্ছিলো কিছু একটা যেন পাজেলের মধ্যে ফিট হচ্ছে না। এমন মনে হবার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। আসলেই কি নেই? না, এটা মনে হবার প্রধান কারণ কাঞ্চন নিজ থেকে বাঁধা দেয় নি। কাঞ্চনের মতো জেদি, রগচটা, আত্মসম্মানী মেয়েটি কি না একটিবারও স্নিগ্ধকে বাঁধা দেয় নি। কাঞ্চন বাঁধা দিলে স্নিগ্ধ থেমে যায়। এর আগেও থেমেছে। নিজেকে আঁটকেছে। বিয়ের পর থেকে সেটাই করে যাচ্ছে। স্নিগ্ধ যতবার এগোতে চায় ততবারই কাঞ্চন বাঁধা দেয়। অথচ গতরাতে সে বাঁধা দেয় নি। বরং চোখ বন্ধ করে ঠোঁট কামড়ে পড়েছিলো সে। তার ঠোঁটে রক্ত জমে গিয়েছিলো। ফলে স্নিগ্ধ উদারতা দেখিয়ে বলেছিলো,
“ইউ ক্যান বাইট মি!”
কাঞ্চনের মুখটা তখন আরোও লজ্জায় রাঙ্গা হয়ে উঠেছিলো। সেই লজ্জা রাঙ্গা মুখটার দিকে চাইতেই বুকে ব্যাথা হলো স্নিগ্ধের। সেই প্রথম তার অন্তস্থলে এক বিচিত্র অনুভূতি হচ্ছিলো। সেটা কামনা ছিলো না। সেই ব্যাথার কারণেই হয়তো সে সরে এসেছিলো। অবাধ্য জঙ্গলি কাঞ্চনের সেই ভোঁতারুপটা তাকে শান্তি দিচ্ছিলো না। মনে হচ্ছিলো এই পাওয়া পাওয়া নয়। কাঞ্চন পালিয়ে যাবে। এভাবে তাকে বেঁধে রাখা সম্ভব নয়। কাঞ্চনের এই কাছে আসা সমর্পণ নয় বরং একটা ক্ষুদ্র মুহূর্তের ভ্রম। মুজাহিদের প্রতি অপরাধবোধ, নিজের জন্মদিনের এমন আশ্চর্যজনক সারপ্রাইজ তার মনকে দূর্বল করে দিয়েছিলো। তাই খুব বেশি কিছু চিন্তা ভাবনা করার ইচ্ছে হয়ত করে নি তার। নিজের মধ্যেই সে ছিলো না। সেই অবস্থাতে তার আবেদন গ্রহণ করাটা নিছক কাপুরুষতাই হত। অনেকটা সুযোগ নেওয়া হত। সরফরাজ পটনভীকে যেকোনো খারাপ বিশেষণে আখ্যা দিলেও কাপুরুষ, সুযোগসন্ধানী বিশেষণে আখ্যা দেওয়াটা তার সহ্য হবে না।
স্নিগ্ধ যখন সরে এসে কাঞ্চনের টিশার্টটা তাকে পরিয়ে দিয়েছিলো। কাঞ্চন হতভম্বের মত তাকিয়ে ছিলো। স্নিগ্ধ তার কপালে চুমু খেয়ে বললো,
“আজ থাক!”
বলেই কাঞ্চনকে বুকে টেনে নিলো। কাঞ্চনের বিস্ময় তখনও কাটে নি। স্নিগ্ধ ফিঁচেল হেসে বললো,
“ইফ ইউ ওয়ান্ট, দেন!”
কাঞ্চন সাথে সাথে ঝাঁঝালো স্বরে বললো,
“নো নিড!”
বলেই নিজেও স্নিগ্ধর থেকে সরে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলো। স্নিগ্ধ আবার ভুল করতে চায় না। কোনো আফসোস রাখতে চায় না। কাঞ্চনকে সে তখন-ই নিজের করে নিবে যখন কাঞ্চনের দিক থেকেও সম্মতি থাকবে। রাতটা বেদনাতুর ছিলো। মাঝরাতে নিজের ভেতর জ্বলতে থাকা পৌরষকে ক্ষান্ত করতে গোসল অবধি করেছে সে। তাও নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়েছে। ঘুম এসেছে ভোরে। নিজের স্ত্রীর জন্য আর কত ত্যাগ স্বীকার করতে হবে ভাবতে ভাবতেই কিচেন কাউন্টারে দু হাত ভর করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। বারবার কাঞ্চনের সেই লাজে রাঙ্গা মুখটা মাথায় ভাসছে। নিজের পৌরষবোধ তাকে ধিক্কার জানাচ্ছে। এতো বড় সুযোগ কোন গাধায় হাত ছাড়া করে?
আয়নার সামনে চুল মুছছে কাঞ্চন। সারা গায়ে স্নিগ্ধের স্পর্শের চিহ্ন। নিজেকে যত গালি দেওয়া হবে ততই কম। চিরুণীটা দিয়ে ঠাস করে মাথায় একটা চাটি দিলো সে। গতকাল রাতে কতবড় ছাগলামি করতে গিয়েছিলো সে। এই আফসোসেই তো মরে যেত। ভাগ্যিস সিমেন্টের বস্তা তাকে দয়া দেখালো। কোনো বার্থ পিলও কিনে নি সে। স্নিগ্ধ একবছরে তার কাছে কখনো আসবে না এটা ভাবাই বোকামি, কিন্তু সে কেনো নিজেকে সামলালো না। কাঞ্চন নিজেকে খুব একটা দোষ দিতেও পারছে না। গতকাল তার মন ভার হয়েছিলো। মনে হচ্ছিলো এমন কিছু হোক যেন সে সব ভুলে যেতে পারে। আবেগপ্রবণ হৃদয় আরোও দ্রবীভূত হলো জন্মদিনের সারপ্রাইজে। স্নিগ্ধ একটা চালাক শেয়াল। ওর মতো ম্যানুপুলেটিভ মাইন্ড দ্বিতীয়টি নেই। তাইতো এতোটা সহজেই সে কাঞ্চনকে বশ করে ফেললো। আর বোকা কাঞ্চন নিজেকে সপে দিলো। ভাবতেই আবার মাথায় চিরুনি দিয়ে চাটি মারলো। নিজেকে কঠিন ধমক দিয়ে বললো,
“ছাগল তুই? গাধা? এতো বড় বড় বুলি মেরে এই তোর অবস্থা? ছিঃ”
এরমধ্যেই কানে এলো,
“আহারে আমার ওয়াইফির মাথা তো এভাবে করলে দুভাগ হয়ে যাবে।“
কাঞ্চন চোখ তুলে চাইলো। ট্রেতে করে একটা চিকেন স্যান্ডুইচ এবং ক্যাপাচিনো কফির কাপ এনেছে স্নিগ্ধ। ড্রেসিং টেবিলের পাশের ছোট্টটেবিলে সেটা রেখে বললো,
“বিশেষ রাতের পর বিশেষ ব্রেকফার্স্ট।“
কাঞ্চন চোখ ছোট ছোট করে চাইলো স্নিগ্ধের দিকে। নিজেকে খুব স্বাভাবিক রেখে কফির কাপটা হাতে নিলো। একটা চুমুক দিয়ে শান্ত গলায় বললো,
“ধন্যবাদ, কিন্তু তার আগে বলি, লাস্ট নাইট ওয়াজ এ মিস্টেক। আমার ব্রেইন ফাংশন করছিলো না। একেই মন ভালো ছিলো না। উপর থেকে আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম। তারপর ব্রেইন শাট ডাউন মুডে চলে গিয়েছিলো। সো, ভুলে যাও। আর আমার থেকে একশ হাত দূরে থাকবা।“
স্নিগ্ধ তীক্ষ্ণ চোখে কিছুসময় তাকিয়ে রইলো কাঞ্চনের দিকে। পকেটে হাত গুঁজে বললো,
“তুই আমার শরীর ভোগ করে এখন আমাকে ডিচ করছিস?”
কাঞ্চনের আর কফি খাওয়া হলো না। বিষম উঠে গেলো নাকে মুখে। কাঁশতে কাঁশতে একাকার অবস্থা। স্নিগ্ধ তার পিঠে হাত বুলাচ্ছে। কাঞ্চন নিজের মাথায় নিজে চাপড় দিচ্ছে। কাশি থামার পর খাবি খাওয়া গলায় বললো,
“নিজের কানে যাচ্ছে তো যা বলছো?”
স্নিগ্ধ নির্লিপ্ত স্বরে বললো,
“ভুল তো বলছি না। আসলে তুই খেলা নারী। আমার ফয়দা তুলে এখন আমাকে রাস্তা মাপতে বলছিস, ছিঃ। আমার মতো অসহায়, ভার্জিন পুরুষের ভার্জিনিটি…”
আর কথা বলার সুযোগ পেলো না স্নিগ্ধ। কাঞ্চন দু হাতে তার ঠোঁট চেপে ধরে বললো,
“আর একটা কথা তুমি বলবে না। মানুষ শুনলে ভাববে আমি পার্ভার্ট। অসহ্য, নকটা পুরুষ কোথাকার!”
স্নিগ্ধের চোখ হাসলো। সে কাঞ্চনের হাতের তালুতে চুমু খেলো। সাথে সাথেই ছ্যাকা খাওয়ার মত হাত সরিয়ে নিলো কাঞ্চন। স্নিগ্ধ গলার নিচে টকটকে লাল অংশখানা কাঞ্চনের চোখের সামনে উন্মুক্ত করে বললো,
“তাহলে এটা কি?”
কাঞ্চন পারে না মাটি খুঁড়ে ঢুকে যেতে। এতো লজ্জা ইহজনমে পায় নি সে। ঠোঁট কামড়ে বললো,
“হরমোনাল গোলযোগ।“
স্নিগ্ধ মুখটা বেজার করলো। একটা হতাশ নিঃশ্বাস ফেলে বললো,
“গোলযোগ? আমার শরীর কামড়ে ভোঁতা করে এখন সেটাকে হরমোনাল গোলযোগ বলছিস? আমার ইমোশনের কোনো দাম নেই। আমি তো তোকে ভালো মেয়ে মনে করতাম। এখন আমি এই মুখ কাকে দেখাবো? ইউ হ্যাভ টু টেক রেসপন্সিবিলিটি।“
“এই একদম নিরুপা রায় সাজবা না। আমি দেখাবো তুমি কি করেছো?”
“দেখা।“
“নির্লজ্জ লোক। আমি তোমার মত নাকি? আমাদের মধ্যে কিছুই হয় নি। কিসের রেসপন্সিবিলিটি। রাত গায়ি বাত গায়ি। সো মামলা ডিসমিস, আসামী খালাস।“
স্নিগ্ধ ঝুঁকে এসে বলল,
“তুই তো মানুষ ভালো না কাঞ্চন। কোথায় ভাবলাম, গতরাতে আমার ভালোমানুষীর জন্য আমাকে বাহবা দিবি।“
“কিসের বাহবা?”
স্নিগ্ধ হাসলো। দুষ্টুমির ছলে বললো,
“আমি না থামলে কি তুই বাঁধা দিতি?”
কাঞ্চন বাকরুদ্ধ হলো। দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। স্নিগ্ধ পকেটে হাত গুঁজে বলল,
“আমি চাই নি বলে কিছু হয় নি। কারণ আমি চাই না আমাদের মুহূর্তটা শুধু ক্ষণিকের আবেগের তাড়না হোক। এর পরের বার যখন কাছে আসবো, আমি তোর দূর্বল মনের আকর্ষণ নয় আত্মার টান হতে চাই। আমি তোর আফসোস না, প্রিয় স্মৃতি হতে চাই। ঘটে গেছে কথাটা?”
“খুব দয়া দেখালে। খুশি হলাম।”
“তুই দয়ার পাত্র নস।“
“তাহলে আমি কি?”
“আমার একমাত্র ওয়াইফ। যাকে দয়া দেখানোর স্পর্ধা আমার নেই।“
কাঞ্চন মনে হলো কেউ যেন বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটাচ্ছে। সে কি দূর্বল হয়ে যাচ্ছে? স্নিগ্ধ একটা স্যান্ডুইচ হাতে নিলো। কামড় বসিয়ে চিবুতে চিবুতে বললো,
“তোর বার্থডে গিফটা এখনো দেওয়া হয় নি। বল কি চাই? এবং সেটা ডিভোর্স ছাড়া। আমার এতো বাজেট নেই।“
“তোলা থাক, সময় হলে চাইবো।“
“ওকে। এখন রেডি হয়ে নে।“
“কোথাও যাব?”
“বাগেরহাট।“
কাঞ্চনের চোখ চকচক করে উঠলো। সে আশা করে নি এমন কিছু। স্নিগ্ধ মৃদু হেসে বললো,
“আমাদের ঢাকায় ফিরতে হবে। আমার ডিটেনশন ক্যান্সেল হয়েছে। সামনের উইকেই জয়েনিং।“
“ওহ।“
“মন খারাপ হলো নাকি?”
“নাহ। আমারও ভার্সিটির সেমিস্টার ফাইনাল চলে এসেছে। পড়তে হবে।“
“আব্দুল্লাহ নামক ছেলেটি কি একই ক্লাসে পড়ে?”
“হ্যা কেন?”
স্নিগ্ধ কিছু বললো না। ঘড়ির দিকে চেয়ে বললো,
“একঘন্টার মধ্যে বের হব। ড্রাইভ করে যেতে যেতে আমাদের প্রায় দু ঘন্টা লাগবে। সো খেয়ে রেডি হয়ে নে।“
“থ্যাংকস।“
“কেন?”
“এমনি।“
বলেই খাওয়ায় মনোযোগ দিলো কাঞ্চন। স্নিগ্ধ হাসলো। এই মেয়েকে পড়া এতটাও কঠিন নয়।
এয়ারপোর্টের বাহিরে একটা প্লাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে আছে পৃথুলা। তার চোখ ফুলে গেছে। নাক লাল হয়ে গেছে। সে পুরো রাস্তা নিঃশব্দে কেঁদেছে। ব্যাপারটা যে রিদম খেয়াল করে নি এমনটা নয়। অথচ সে নির্লিপ্ত থেকেছে। এখনো সে বিকারহীন। সিগারেট জ্বালিয়ে আঙ্গুলের ফাঁকে রেখেছে। এমন ভাব যেন কিছুই যায় আসে না। এটাই বেশি আহত করছে পৃথুলাকে। সেই বোকা। সে কি আশা করেছিলো? রিদম অন্যের পাশে তাকে দেখতে পারবে না। হিরোয়িক ভাবে বলবে,
“চল পালিয়ে যাই।“
ওয়ান্স এ পটনভী, অলওয়েজ এ পটনভী—এই কথাটাই ভুলে গিয়েছিলো পৃথুলা। সে নিজেকে শক্ত করে নিলো। সে আর মিথ্যে আশায় থাকবে না। পারভেজকে তার বিয়ে করতেই হবে। সে যেমন হোক না কেন তাকে তার বিয়ে করতে হবে। মাথার উপর তপ্ত সূর্য। তার প্রখর তাপে মস্তিষ্ক টগবগ করছে। পারভেজের আসার কথা দেড়টায়। এখন তিনটে বাজে। সে এখনো এয়ারপোর্ট থেকে বের হয় নি। হয়তো প্রসেডিওরে দেরি হচ্ছে। ল্যান্ড করার পর অনেক কাজ থাকে। ক্ষুধায় পেট জ্বলছে রিদমের। ইচ্ছে করছে ছেড়েছুড়ে হাটা দিতে। কিন্তু তাও পারছে না। চাচা, ফুফা ঘাড় কামড়ে দিবে। পারভেজ বের হলো ঠিক চারটার সময়। চোখে সানগ্লাস। পরণে একটা Celine ব্রান্ডের শার্ট, বেইজ রঙ্গের প্যান্ট। শার্টটা গোটানো বলে হাতে কালো রঙ্গের অনেকগুলো ব্রেসলেট দেখা যাচ্ছে। ট্রলিটা টেনে হেটে হেটে সামনে আসছে সে। মুখে বিরক্তির ছাপ। রিদম ডাকলো,
“ব্রাদার, পারভেজ?”
পারভেজ ডাকটা শুনলো। তার বিরক্তি কিছুটা লোপ পেল। সে এগিয়ে এলো। রিদমের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো। রিদম হ্যান্ডশেক করে বললো,
“রিদম।“
“নাইচ টু মিট ইউ। ইওর কাস্টমস অ্যান্ড এয়ারপোর্ট আর টেরিবল। আই হ্যাড আ হরিবল জার্নি। ডু ইউ নো, দে লস্ট মাই ব্যাগ। উফ! হাউ ডার্টি।”
রিদম প্লাস্টিকের হাসি ঝুলিয়ে বললো,
“আউচ। সরি টু হেয়ার দ্যাট। কাম অন, লেটস গো হোম। ইউ শ্যুড ফ্রেশেন আপ, দেন উই’ল হ্যাভ সাম ফুড।“
পৃথুলা মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলো। পারভেজ চোখের চশমাটা খুলে বললো,
“ইউ আর পৃথুলা, রাইট। সরি, আই কান্ট স্পিক ইন বাংলা। আপ হিন্দি জানতে হ্যায়?”
পৃথুলা মিষ্টি করে হাসলো। ইংলিশেই বললো,
“সরি, মাই হিন্দি ইজ ভেরি পুওর।“
“ইটস ওকে। ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলা, ভাঙ্গা ভাঙ্গা হিন্দি। চালবে?”
পারভেজের মিষ্টি কথা শুনে কেন যেন রিদমের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। একমিনিট হলো না ভেড়া তুই মেয়েটার সাথে দেখা হয়েছে। এখনই পটানোর চেষ্টা করছে। কি পরিমাণে চালু! ভাঙ্গা ভাঙ্গা হিন্দি দিয়ে বিদেশী ভেড়ার মাথা ভাঙ্গতে ইচ্ছে হলো। পৃথুলাও তাল দিয়ে বললো,
“ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলা চালবে।“
এই মেয়ে একটু আগে রিদমের গাড়ির হেডলাইট ভাঙ্গছিলো। রিদম পৃথুলা এবং পারভেজের কথায় বা হাত দিলো,
“যে গরম। এখানে আমরা সংসার না পাতি। বাড়ি যাই কেমন?”
পারভেজ বুঝলো না। শুধু হাসলো। গাড়িতে পেছনে বসলো পারভেজ। পৃথুলা বসলো তার পাশে। রিদম রিয়ার ভিউ মিররে সরাসরি চাইলো পৃথুলার দিকে। পৃথুলা সেই দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলল,
“চালা, বাড়ি যাব তো।“
রিদমের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। শাকচুন্নীটা তাকে ড্রাইভার বানিয়ে দিলো! সে গাড়ি স্টার্ট দিলো না। তাকিয়েই থাকলো। যার অর্থ সামনে এসে বস। পৃথুলাও নড়লো না। সে পারভেজের পাশেই বসে রইলো। ফলে রিদম পেছনের এসিটা বন্ধ করে দিলো। পারভেজ কিছু সময়ের মধ্যেই বিরক্ত হয়ে উঠলো। গরমে সে ঘামছে। নিউজিল্যান্ডের আবহাওয়ার সাথে বাংলাদেশের আবহাওয়ার কোনো মিল নেই। ফলে অধৈর্য্য স্বরে সে বললো,
“এসি খারাব হ্যা কেয়া?”
“হ্যা ব্রো। সামনে এসে বসবে? এখানের এসি ঠিক আছে।“
রিদম ইংলিশে তার কথার উত্তর দিলো। পারভেজ প্রায় সাথে সাথেই নেমে সামনে এসে বসলো। রিদম তখন গাড়ি স্টার্ট দিলো। পৃথুলা মিররে তাকিয়ে আছে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। রিদম বাঁকা হাসলো। অন্তত শাকচুন্নী আর তার বরের ড্রাইভার সে হবে না। গাড়ি চলছে স্বাভাবিক গতিতে। পুরো রাস্তা পারভেজ পৃথুলার সাথে কথা বলেছে। এই কথা সেই কথা। এতো কথা বলে এই ছেলে। আর পৃথুলাও তার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে। কথায় কথায় সে শুধালো,
ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৩১
“বিয়ের পর নিউজিল্যান্ডে যেতে তোমার আপত্তি নেই তো?”
পৃথুলা একটু সময় নিয়ে খুব ধীর স্বরে বলল,
“একেবারেই না।“
সাথে সাথেই ব্রেক কষলো রিদম। ফলে পারভেজ ঝুকে পড়লো সামনের দিকে। রিদম কড়া স্বরে বলল,
“মঞ্জিল চলে এসেছে। এবার ঘরে যেয়ে সংসার পাতো তোমরা”
