Home প্রফেসর উজান চৌধুরী প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৬১

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৬১

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৬১
বন্যা সিকদার

“তোমার একটুও লজ্জা করছে না এখনো এমন নোংরা কথা মুখে আনতে? সত্যি একটাবারও লজ্জা করে না তোমার? এত নোংরা আর নিকৃষ্ট কেন তুমি? এই মাথার খুলিতে একদম সোজাভাবে ঢুকিয়ে নাও‚ আমি কেবলই আমার এই প্রফেসর সাহেব উজান চৌধুরীর ছিলাম‚ আছি আর চিরকাল তাঁরই থাকব। তা ছাড়া তুমি আর যা-ই হও‚ আমার কাছে একটা খুনি ছাড়া কিচ্ছু নও‚ বুঝতে পেরেছো?
আচমকা রোহান উজানে’র কপাল বরাবর রিভেলভার তাক করে। রিভলবারটা দেখা মাত্রই উজান একবিন্দু বিচলিত না হয়ে একদম স্থির‚ নিস্পৃহ দৃষ্টিতে রোহানে’র দিকে তাকিয়ে রইল। উজান নিজেই খুব ভালো করেই জানে দুনিয়ার যত কিছুই ঘটে যাক না কেন‚ রোহানে’র অন্তত এই হাত দিয়ে তাকে আঘাত করার মতো সাহস কখনোই হবে না। তবুও ছেলেটা নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে এমন উন্মাদনা করছে। হয়তো তীব্র‚ অন্ধ ভালোবাসার বিফল দহন আর অনুশোচনার আগুনে পুড়েই সে আজ এমন এক আত্মঘাতী রূপ নিতে বাধ্য হচ্ছে। ​উজান একদম স্বাভাবিক গলায় শান্তভাবে আওড়াল—

​“মারবি আমাকে? নে‚ মেরে ফেল। তোর কলিজায় যদি সাহস থাকে তবে এখনই আমাকে শুট করে মেরে তোর এই ফুলকে তুই চিরকালের জন্য নিজের করে নে।
​উজানে’র সেই চাবুকের মতো বরফশীতল কথাটা কানে আছড়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোহানে’র শিথিল হাত দুটো থেকে ভারী রামদা আর রিভলবারটা বিকট শব্দে মেঝেতে খসে পড়ল। ​রোহান কেবল একজোড়া দিশেহারা অসহায় চোখে উজানে’র দিকে তাকিয়ে রইল। ঠিক তখনই শরীরের ভেতরের জমানো ক্ষতের পৈশাচিক যন্ত্রণায় আর এক মুহূর্তও খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না সে‚ ধপাস করে ধূলিমলিন রক্তভেজা মেঝেতেই ধসে বসে পড়ল। তার মাথার রক্তনালী গুলো যেন ব্যথায় ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে।
​ভাইয়ের এই অসহায় পতন দেখে মেহের কান্নায় ভেঙে পড়ে দৌড়ে এগিয়ে আসতে চাইল কিন্তু রোহান নিজের রক্তমাখা হাত উঁচিয়ে তাকে মাঝ পথেই থামিয়ে দিল। নিজের সমস্ত যন্ত্রণার বিষ সে আজ একাই নিঃশব্দে পান করে নেওয়ার এক শেষ আপ্রাণ চেষ্টা চাজাল। কিন্তু পারল না। সহ্যসীমার বাঁধ ভেঙে আচমকা তার দুই কঠিন চোখের কোণ বেয়ে অঝোর ধারায় গরম জল গড়িয়ে পড়তে শুরু করল। ​ঠিক তখনই সবাইকে অবাক করে দিয়ে‚ রোহান হাঁটুগেড়ে হিঁচড়ে এগিয়ে গিয়ে মৌ’য়ের পা দুটো শক্ত করে আকড়ে ধরে কেঁদে উঠল।

​হঠাৎ এমন এক অবিশ্বাস্য‚ অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্য দেখে থমকে স্তব্ধ হয়ে গেল মৌ। নিজের অজান্তেই পিছন ফিরে খানিকটা দূরে সরে যেতে চাইল সে কিন্তু রোহান ছেড়ে দিল না। সে ব্যাকুলতায় আবারও এগিয়ে গিয়ে মৌ’য়ের দুটো পা আকুলতায় আঁকড়ে ধরল।
​“ফুল! প্লিজ তুই চলে আয় না রে আমার এই ধ্বংস হয়ে যাওয়া অন্ধকার লাইফে। তোকে ছাড়া যে আমি আর কিছু ভাবতে পারছি না…প্লিজ চলে আয় না ফুল। আমি কথা দিচ্ছি‚ এই জঘন্য পাপের জগত সব কিছু আজ এখনই ছেড়ে দেব। শুধু তুই যা বলবি‚ যেমন করে বলবি‚ ঠিক তেমন করেই চলব। তোর একটা কথারও কোনোদিন অবাধ্য হব না‚ তুই আমাকে দয়া করে বাঁচা ফুল। তোকে না পেলে আমি সত্যি সত্যি মরে যাব…তোদের দুজনকে চোখের সামনে এভাবে একসাথে দেখার ন্যূনতম ধৈর্য বা সহ্যশক্তি যে আমার আর অবশিষ্ট নেই। এই অনাথ‚ এতিম ছেলেটাকে তোর ভালোবাসার একটুখানি করুণা ভিক্ষা দে না প্লিজ…!!

​রোহানে’র প্রতিটি অনুনয়-বিনয় আর বুকফাটা আকুতি এক মুহূর্তের মধ্যে যেন সোজা মৌ’য়ের আত্মায় গিয়ে বিধল। তার পুরো বুকটা অজানা এক শিহরণে কেঁপে উঠল। হাত-পা যেন অবশ হয়ে এলো। মৌ চোখ তুলে এক নজর উজানে’র দিকে তাকাল। উজান নিজেও স্থির দৃষ্টিতে পাথরের মতো নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে। নিজের প্রিয় বন্ধুর এই করুণ পরিণতি আর অনুশোচনা দেখে এই মুহূর্তে তার নিজেরও মুখে কিছু বলার ভাষা হারিয়ে গেছে। ​মৌ রোহানে’র আঁকড়ে ধরা হাত থেকে নিজের পা দুটো ছাড়িয়ে নিল। তারপর ধীর পায়ে‚ নিঃশব্দে রোহানে’র ঠিক সামনে হাঁটু মুড়ে বসল। পরম যত্নে রোহানে’র তাজা রক্তে মাখামাখি দুটো হাত নিজের দুটো তুলতুলে হাতের মুঠোয় পুরে নিল। ​তারপর কম্পিত করুণ গলায় ফিসফিসিয়ে বলল….
​”সরি রোহান ভাইয়া। আই’ম রিয়েলি‚ রিয়েলি সো সো সরি। কসম খেয়ে বলছি তোমাকে আমি সত্যি এভাবে আঘাত দিতে চাইনি। এমনকি তুমি কষ্ট পাবে‚ তিল তিল করে শেষ হয়ে যাবে এমন কোনো নিষ্ঠুর কথা ভুলেও তোমায় বলতে চাইনি কখনো। কিন্তু আমি যে আমার এই প্রফেসর সাহেবকে ছাড়া নিজের জীবনে আর দ্বিতীয় কাউকে এক মুহূর্তের জন্যও চিন্তা করতে পারি না।
​মৌ চোখের জল মুছে শান্ত সুরে আবার বলতে লাগল।

“আচ্ছা‚ তুমি কেন বুঝছ না বলো তো। এই বিশাল পৃথিবীর সব মানুষের সব ভালোবাসাই শেষে পূর্ণতা পায় না? আমি তো তোমাকে অনেক আগেও স্পষ্ট করে বলেছিলাম‚ আমি কখনো কোনো জন্মেও তোমার হতে পারব না। তুমিই বিবেক দিয়ে আমায় বলো তো‚ ছোটবেলা থেকে যাকে নিজের রক্ত আর আপন বড় ভাইয়ের মতো ভালোবেসে ডাকলাম। শ্রদ্ধা করলাম‚ শেষমেশ তাকে আমি স্বামী হিসেবে ভালোবেসে নিজের বুকে স্থান দেব কীভাবে? তা ছাড়া…আমি আমার প্রফেসর সাহেবকে অসম্ভব ভালোবাসি‚ তা তো তুমি খুব ভালো করেই জানো। তাকে ছাড়া যে এই তাসফিয়া মৌ চৌধুরী একদম নিশ্বাসহীন।
​রোহান নিজের রক্তভেজা ঝাপসা চোখে মৌ’য়ের মায়াবী মুখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর করুন স্বরে জীবনের শেষ প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল—

​“তাহলে তোকে ছাড়া আমি এই বিরাট পৃথিবীতে কীভাবে বাঁচব‚ তুই-ই বলে দে ফুল?
“ভাইয়া প্লিজ আর পাগলামি কোরো না। আচ্ছা‚ তুমিই বলো একজনের ঘর ভেঙে কি আরেকজনের ঘর তৈরি করা যায়? এটা পাপ…
​রোহান রক্তমাখা ঠোঁটের কোণে বিষাদের হাসি ফুটিয়ে বিড়বিড় করল‚ “একজনের মন ভেঙে তছনছ করা আর পবিত্র মসজিদ ভেঙে দেওয়া তো একই কথা‚ ফুল…তাহলে আমার ভালোবাসার মনটা যে তুই ভেঙে গুঁড়ো করে দিলি‚ সেটা কি পাপ নয়?
​”রোহান ভাইয়া‚ প্লিজ অবুঝ বাচ্চার মতো আচরণ কোরো না। কেন বুঝতে পারছ না যে এসব কখনো সম্ভব নয়? আমি চাইলেও কোনোদিন তোমার হতে পারব না‚ কোনোদিন না।

​রোহান আবারও চরম ব্যাকুলতায় মৌ’য়ের তুলতুলে হাত দুটো আঁকড়ে ধরল। উজান একটু দূরে দাঁড়িয়ে পাথর হয়ে সেই দৃশ্য দেখতে লাগল। আজ তার বুকে এক ফোঁটা ঈর্ষা নেই‚ বরং চোখের সামনে বেস্ট ফ্রেন্ডের এমন বুকফাটা আর্তনাদ আর কান্না দেখে তার নিজের বুকটাই যেন তীরে বিদ্ধ হয়ে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। রোহানে’র এই পৈশাচিক কষ্ট আর সহ্য হচ্ছে না উজানে’র‚ নিজের ভেতরে এক অসহ্য যন্ত্রণায় বুক ফেটে যাচ্ছে তার। ​মৌ দিশেহারা হয়ে ধপাস করে সেখানেই মেঝেতে বসে পড়ল। আর কীভাবে এই বিকারগ্রস্ত মানুষটাকে বোঝাবে সে? আর কী বললে লোকটা তাকে পাওয়ার এই অন্ধ লোভ ছেড়ে দেবে‚ তার জানা নেই। সে সম্পূর্ণ নিরুপায়। সে শত চেষ্টা করলেও নিজের প্রাণের চেয়েও প্রিয় স্বামীকে ছেড়ে এই পুরুষটার হাত ধরতে পারবে না। মৌ হঠাৎ চোখ তুলে একদম তীক্ষ্ণ ও শীতল দৃষ্টিতে রোহানে’র দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।

​”রোহান ভাইয়া তুমি কি সত্যি মন থেকে চাও না যে আমি সুখে থাকি?
​রোহান এক দৃষ্টিতে মৌয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে পরম মমতায় বলল‚ “চাই তো। আমি চাই তুই অনেক‚ অনেক‚ অনেক সুখে থাকবি। পৃথিবীর সমস্ত আনন্দ যেন আমার ফুলের পায়ের কাছে এসে লুটিয়ে পড়ে। কোনো দুঃখ যেন ভুলেও তোর ছায়াও না মাড়াতে পারে।
​রোহানে’র কথার তোড়ে মৌ সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিল‚ “তাহলে আমার জীবন থেকে চিরকালের জন্য চলে যাও। অনেক দূরে হারিয়ে যাও তুমি…অন্য কোনো নারীকে নিজের জীবনে আপন করে নাও। দরকার হলে আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তোমার জন্য ভালো কোনো মেয়ে খুঁজে এনে দেব‚ তবুও প্লিজ আমার জীবন থেকে চলে যাও তুমি।

​রোহান বরফ শীতল চোখে চেয়ে রইল। মেয়েটার এই মায়াবী মুখের দিকে সে চিরকাল মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতে পারবে‚ আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। এই কাজল রাঙা চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে সে সারাজীবন পার করে দিতে পারত কিন্তু আফসোস এই চোখ দুটোতে অধিকার ফলানোর ভাগ্য তার নেই। অনেক আগেই সে নিয়তির কাছে সেই অধিকার হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে। কিন্তু অবাধ্য মন তো মানতে চায় না। মন তো কেবল চায় জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত এই মেয়েটার পাশে বেঁচে থাকতে‚ তার হাত ধরে এক সাথে বৃদ্ধ হতে…কিন্তু নিয়তি তাকে সেই সঙ্গ দিল না। ​সে পরম আবেশে মৃদুস্বরে মৌকে জিজ্ঞেস করল।
“ফুল তুই কি পারবি কোনোদিন উজান’কে ছেড়ে অন্য কারো বউ হতে?
“রোহান ভাইয়া‚ প্লিজ থামো। আমি আমার প্রফেসর সাহেবকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। তাহলে তাকে ছেড়ে আমি অন্য কারো বউ কীভাবে হব‚ বলো? তা তো আমার মৃত্যুর সমান।
​“আমিও তো তোকে নিজের জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসি‚ ফুল। তাহলে তুই কেন বুঝলি না তোকে ছাড়া আমিও যে একদম শূন্য? তোকে ছাড়া অন্য কোনো নারীকে নিয়ে সংসার করার কথা তো এই রোহান তালুকদার কল্পনায়ও আনতে পারে না।

​মৌ একদম নিশ্চুপ হয়ে গেল। তার মুখ দিয়ে আর কোনো শব্দ বের হলো না। ​হঠাৎই রোহান ধীর পায়ে উঠে দাঁড়াল। মৌ’য়ের নরম আঙুল গুলো শক্ত করে ধরে তাকেও নিজের মুখোমুখি দাঁড় করাল। মাঝে সামান্য দূরত্ব রেখে শান্ত কণ্ঠে প্রশ্ন ছুড়ে দিল।
​“ফুল আমি যদি আজ সত্যি তোর এই সুন্দর দুনিয়া থেকে অনেক দূরে চলে যাই‚ তবে কি সত্যি খুব খুশি হবি তুই? আমার এই ভালোবাসা নামক নরকযন্ত্রণা থেকে চিরদিনের জন্য মুক্তি চাই তোর?
​মৌ কোনো উত্তর দিল না। এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো ন্যূনতম শারীরিক ও মানসিক শক্তি আর তার অবশিষ্ট নেই। মানুষটাকে আর কষ্ট দিতে সে চায় না‚ আবার তাকে বোঝাতেও সে সম্পূর্ণ অক্ষম। ​ঠিক তখনই সবাইকে চমকে দিয়ে রোহান এক ঝটকায় মেঝে থেকে রিভলবারটা কুড়িয়ে নিয়ে মৌ’য়ের কাঁপা হাতের মুঠোয় গুঁজে দিল। তারপর নিজের কপালটা রিভলবারের নলের সামনে ঠেকিয়ে স্থির কণ্ঠে আওড়াল।
​“মেরে ফেল ফুল। তুই নিজ হাতে আমাকে চিরকালের জন্য মৃত্যু উপহার দিয়ে তোর জীবন থেকে মুছে ফেল। পারবো না রে আমি তোকে ছাড়া এই নরকে বাঁচতে…তাই আজ তোর পবিত্র হাতেই নিজের মৃত্যু চাই। ভালোবাসতে যখন পারলি না‚ তবে পরম শান্তিতে মৃত্যু দে আমায়।

​মৌ ভয়ে শিউরে উঠে এক ঝটকায় হাত ছড়িয়ে দূরে সরে গেল। ভীত চোখে সে রোহানে’র দিকে তাকিয়ে রইল। মৌ’য়ের এই আতঙ্কিত রূপ দেখে রোহান হঠাৎ উচ্চস্বরে হেসে উঠল। তার পুরো আচরণ যেন এক লহমায় বদলে গেল। সে উন্মাদের মতো হাসতে হাসতে আচমকা রিভলবারটা নিয়ে গিয়ে উজানে’র হাতে গুঁজে দিল। নিজের কপালে অস্ত্রটা ঠেকিয়ে গর্জে উঠল।
​“উজান শুট কর আমায়। আমি তোর আর তোর ফুলের ভালোবাসার পথের কাঁটা…আমাকে এক গুলিতে সরিয়ে দে তোদের চোখের সামনে থেকে। চিরকালের জন্য আমাকে মুক্তি দে ভাই আর কখনো তোর বউকে নিজের করে চাইব না‚ প্রমিস।
​উজান ঝট করে নিজের হাত সরিয়ে নিল। তার চওড়া বুক হাপরের মতো ওঠানামা করতে লাগল। সে রাগে আর কষ্টে চিৎকার করে উঠল।
​“পাগল হয়ে গেছিস তুই রোহান?? কিসব আবোল-তাবোল বকছিস? একটা সামান্য মেয়ের জন্য তুই নিজের জীবনটা এভাবে শেষ করে দিবি?

​“হ্যাঁ। পাগল হয়ে গেছি আমি…পাগল হয়েছি‚ উন্মাদ হয়ে গেছি। আমি ভালোবাসার জন্য পাগল হয়ে গেছি উজান। আমাকে শেষ করে দে‚ মৃত্যু দে আমায়।
​উজান এগিয়ে গিয়ে রোহানে’র দুই বাহু সজোরে ঝাঁকিয়ে রুদ্ধকণ্ঠে গর্জে উঠল।
​“যাহ্। তোকে দিয়ে দিলাম তোর ফুলকে। আজ থেকে তোর ফুল শুধু তোর আর কখনো লাগবে না আমার এই ফুল। নিয়ে যা তুই ওকে‚ আজই সারাজীবনের জন্য নিজের বউ বানিয়ে ঘরে তোল। কথা দিচ্ছি এই উজান চৌধুরী আর কোনোদিন তোদের মাঝে বাধা হয়ে আসবে না‚ তোর কাছ থেকে ওকে কেড়ে আনতে যাবে না। তবুও প্লিজ এমন পাগলামি করিস না ভাই। তোকে যে আমি কোনো অবস্থাতেই হারাতে চাই না।
​উজানে’র এই বুকফাটা ত্যাগের কথা শুনে রোহান উন্মাদের মতো একনজর মৌ’য়ের দিকে তাকাল। তারপর বিকট শব্দে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। হাসতে হাসতেই হঠাৎ তার চোখ দুটো বেয়ে অঝোর ধারায় জল নেমে এলো। সে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলল‚

​“আমি তো আমার ফুলকে কোনোদিন পাব না‚ ভাই। ফুল কোনোদিনও এই পাপিষ্ঠ রোহানে’র হবে না‚ কারণ সে যে তোকে ভালোবাসে। তোকে ছাড়া সে যে মরে যাবে। আমি কী করে তোর বুকের ভেতর থেকে আমার ফুলটাকে নিষ্ঠুরভাবে ছিঁড়ে নেব‚ বল? তবে তোকে আজ আমাকে মারতেই হবে উজান।
​রোহান আবারো ব্যাকুলতায় উজান’কে জড়িয়ে ধরে তার হাতে রিভলবারটা চেপে ধরল। কাকুতি-মিনতি করে বলল‚

“শুট মি উজান। তোদের একসাথে দেখার মতো কলিজা রোহান তালুকদারের নেই‚ এমনকি নিজের বেস্ট ফ্রেন্ডকেও আঘাত করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। প্লিজ‚ মুক্তি দে এই নরকযন্ত্রণা থেকে!
​কিন্তু উজান পাথরের মতো স্থির হয়ে রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে রইল। বন্ধুকে নিজের হাতে শেষ করার কল্পনাও সে করতে পারে না। উজান এক পা‚ দু-পা করে ধীরে ধীরে পেছনের দিকে সরে গেল। ​রোহান নিমিষেই বুঝে গেল। উজান কোনো দিন তার গায়ে অস্ত্র তুলে ধরবে না‚ তাকে আঘাত করবে না।​
অতঃপর…রোহানে’র ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক পরম তৃপ্তির শীতল হাসি। সে আর এক মুহূর্তও কালক্ষেপণ করল না। হঠাৎই গুলির শব্দে পুরো ঘর যেন কেঁপে উঠলো। সবাই আতঙ্কে চিৎকার দিয়ে উঠতেই দেখা গেল‚ রোহান নিজের হাতের রিভলবারটি নিজের মাথার রগে ঠেকিয়ে ট্রিগার চেপে দিয়েছে। ​মুহূর্তের মধ্যে চারদিক রক্তে ভেসে গেল। অক্ষিগোলক উল্টে গিয়ে‚ ধূলিমলিন মেঝেতে একতাল রক্তাক্ত মাংসপিণ্ডের মতো লুটিয়ে পড়ল রোহান তালুকদারের নিথর দেহ।
“রোহান ভাইয়া…!!

​মৌ’য়ের বুকচেরা চিৎকার দিয়ে বিদ্যুতের গতিতে ছুটে গিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে থাকা রোহানে’র মাথাটা পরম আকুলতায় নিজের কোলে টেনে নিল। তার দুই চোখ বেয়ে তখন শ্রাবণের ধারার মতো অঝোর বৃষ্টি নেমে এসেছে। চোখের পানিতে রোহানে’র রক্তাক্ত গাল ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছে। মৌ’য়ের চোখ দিয়ে রক্তচক্ষু খুনির বদলে কেবল ‘রোহান ভাইয়া’র জন্য এই আকুল অশ্রু নামতে দেখে‚ মৃত্যুপথযাত্রী রোহানে’র ঠোঁটের কোণে এক পরম তৃপ্তির মুচকি হাসি খেলে গেল। ​উজান‚ ইফাত‚ তন্ময় আর মেহের সহ সবাই উন্মাদের মতো দৌড়ে এগিয়ে এলো। রক্তের সাগরে ভেসে যাওয়া রোহান’কে তারা চারদিক থেকে ঘিরে ধরল। ভাইয়ের নিথর হয়ে আসা দেহের ওপর আছড়ে পড়ে ডুকরে কেঁদে উঠল মেহের।
​“ভাইয়া এটা তুমি কী করলে? মৌ তুই আমার ভাইকে উঠতে বল না রে। ও ভাইয়া চোখ মেলো। কথা বলো না আমাদের সাথে। কেন করলে এমনটা।

​মৌ কাঁপা কাঁপা হাতে রোহানে’র রক্তমাখা গাল দুটো আঁকড়ে ধরে অঝোরে কেঁদে চলেছে। তার চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে রোহানে’র কপালে। রোহান অপলক‚ শান্ত ও স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে মৌ’য়ের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। মৃত্যুর হিমশীতল পরশ তার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। তবুও তার ঠোঁটের সেই তৃপ্তির হাসি অমলিন। ​হঠাৎই তার বুকের শেষ নিঃশ্বাসটুকু এক তীব্র প্রতিধ্বনি হয়ে ফিসফিসিয়ে বেরিয়ে এলো।
​“তোকে ভালোবাসার অপরাধে নিজের রুহকে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে জানলে‚ কখনোই এই মন তোকে চাইত না ফুল!

​রোহানে’র এই চিরবিদায়ের শেষ কথাটি শোনামাত্রই মৌ’য়ের বুকের ভেতরটা যেন খাঁ খাঁ করে উঠল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে শিশুর মতো হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। ​রোহান তার নিজের বরফ শীতল হয়ে আসা হাতটা অনেক কষ্টে একটু উঁচিয়ে মৌ’য়ের ফর্সা গালে রাখার চেষ্টা করল। নিভু নিভু চোখে পরম মায়ায় বলে উঠল।

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৬০

​“কাঁদছিস কেন পাগলি? তুই-ই তো একটু আগে নিজের মুখে বললি না। তোর জীবন থেকে অনেক দূরে চলে যেতে? তাই তো আজ চিরকালের জন্য মুক্তি দিলাম তোকে। তুই অনেক সুখে থাকবি‚ বুঝলি? অনেক খুশি থাক এবার একদম কাঁদবি না আমার জন্য। রোহান তো তোদের দুজনের ভালোবাসার পথের কাঁটা ছিল। এই পাপিষ্ঠ পুরুষ রোহান তালুকদার আজ নিজ হাতে তোকে সেই কাঁটা থেকে চিরকালের মতো মুক্তি দিয়ে গেল।
“আমি চাইনি এমনটা। প্রফেসর সাহেব ভাইয়াকে হসপিটালে নিয়ে চলুন। ভাইয়া তুমি কোথাও যাবে না। আমি যেতে দেবো না তোমায়।

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৬২