রাগে অনুরাগে পর্ব ৪০
সুহাসিনি ফাতেহা
“যাবে না তো কি হয়েছে তার বাপ তো যাবে। ফারাজ না গেলে আমরা তিতলিকে নিয়ে চলে যাবো। তোমার ছেলে বাড়িতে একা থাকুক। যখন দেখবে বউ চলে যাচ্ছে তখন ঠিকই দৌড়াবে।”
তিতলি কেশে উঠল শাশুড়ির কথা শুনে। লজ্জা পেলো কিনা। ফারাজকে সিঁড়ি দিয়ে থেমে যেতে দেখা গেলো। গম্ভীর সুদর্শন মুখখানা আরও গম্ভীর হয়ে উঠল। কে-জানি কি ভাবলো। তবে পেছন ঘুরে তাকাল না। তিতলি নিজেও ফারাজকে শুনিয়ে সবার মাঝে বলে বসল,
“আমরা সবাই যাবো আম্মু। ওনি না গেলে কি আমাদের যাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে? আমরা সবাই ঘুরেই আসতে পারি।”
আফজাল খান, ফারিন বেগম, ফরহাদ সবাই তিতলির কথায় সায় জানাল। ফারিন বেগম তো ভাবলেন একদম মনের মতো একটা বৌমা পেয়েছেন। ফারাজের চিবুক শক্ত হয়। চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। করিডোর পেরিয়ে যেতে যেতে ঘাড় ঘুরিয়ে নিজের বউয়ের দিকে তাকায় বারবার। তিতলিও তাকিয়েই ছিলো সঙ্গে সঙ্গে চোখ মিলল দুজনের। তিতলি মুখ ভেংচি কাটল। ততক্ষণে ফারাজকে আর দেখা গেলো না। ফারাজ চলে যেতেই ফরহাদ হেসে গড়াগড়ি খেয়ে বলল,
“মাশাআল্লাহ এই না হলেন আমার ভাবি। এতদিন যেসব কেউ বলতে পারেনি আপনি সেসব বলে আগুনে পেট্রল ঢেলে দিলেন। ঠিকই বলছেন, একজন না গেলে আমাদের যাওয়া বাদ যাবে কেন? আমরা সবাই একমাস থেকে তারপর আসবো।”
তিতলি নিজের প্রশংসা শুনে খুব খুশি হলো। বারবারই সে নিজের প্রশংসা শুনলে খুশিতে গদগদ হয়ে যায়। মেকি হেসে বলল,
“জ্বি ভাইয়া।”
আফজাল খান হাতের পেপারস টেবিলে রেখে দিলেন। মাঝেমাঝে তিনি খবরের কাগজ পড়েন। শুধুমাত্র ছুটির দিনে। উঠে দাঁড়িয়ে স্ত্রীকে বললেন,
“তাহলে আজকে বিকালেই আমরা সবাই রয়না দিবো। যা যা লাগবে সব লিস্টি করে দিও তো। অনেকদিন পর শ্বশুর বাড়ি যাবো যা যা লাগবে সব নিয়ে যেতে হবে।”
ওনারা কথা বলায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন নিজেদের মধ্যে। অয়নের বাবা আমরুল খানকে কল দিয়েছেন যাওয়ার কথা বলতে। ওনারা যাবেন বলে জানিয়েছেন। হুশিয়ার সাহেব আগেই আমরুল খানকে ফোন করে জানিয়েছেন। এখন আফজাল খান আবার শিউর হয়ে নিলেন। ফরহাদ সুযোগ বুঝে একটু উঠে এসে ভাবির থেকে দুরুত্ব বজায় রেখে বসে বলল,
“ভাইয়াকে মানুষ করার জন্য আপনি একাই একশো সেটা আমি প্রথম দিনই বুঝতে পেরেছি ভাবি।”
তিতলি বুঝলো ফরহাদ তার সাথে মজা করছে। সেও উত্তরে মজার জবাব দিলো
“আপনার ভাই এখনো শিশু? আমি শিশুটাকে বড় করে মানুষ করবো।”
ফরহাদ একটু হাসিখুশি মজা করা স্বভাবের ছেলে। যদিও সেও ফারাজের মতো সাইন্সেরই স্টুডেন্ট কিন্তু সে পড়ছে ডাক্তারি নিয়ে। চিল আড্ডা এসব বেশি পছন্দ করে। তিতলিকে খটখট করে বলল,
“ওইযে সারাদিন মুখটা শেওলা গাছের পেচার মতো করে রাখে সেটা একটু হাসিখুশি বানানোর চেষ্টা করবেন। আমি জানি আপনি পারবেন। ”
তিতলি ভাবে হাসে তো। তাকে দেখলে ঠোঁট কামড়ে হাসে,রহস্যময় হাসে, চওড়া হাসে, চোখ টিপ দেয় এগুলো গত কয়েকদিন ধরে খেয়াল করছে সে। আরো কত কি। ফরহাদ আবার বলল,
“আবার দেখবেন আপনি গিয়ে ভাইয়াকে যেন না বলেন আমি এসব বলছি পরে আমার কান টেনে ধরবে।’
“আচ্ছা বলব না।”
এটা বলার পর তিতলি আর কিছু বলল না। সে উঠে রুমের উদ্দেশ্য পা বাড়াল।
নাছিমা বেগম মুখ বাঁকালেন আড়ালে। ছেলেকে আসতে মানা করেছেন। একেবারে নানার বাড়িতে আসবে। তিতলি চলে যাওয়ার পরপরই সুন্দর করে বোনকে বললেন,
“আপা আমাদেরও তো আপনাদের সাথে যেতে হবে। আব্বা কল দিয়ে যেতে বললো।”
“যেতে হলে যাবি। তুই নীলা তো আর অন্য গাড়ি দিয়ে যেতে হবে না। আমাদের চারটা গাড়ি আছে সেগুলো দিয়ে হয়ে যাবে।”
নাছিমা বেগম বোনের কথা শুনে চলে গেলেন।
ফারিন বেগম মাঝেমাঝে বুঝতে পারেন না তার বোনটা কার মতো হলো। মায়ের পেটের বোন বলে কিছু বলতেও পারছেন না। অবশ্যই সেদিন তিতলির ব্যাপারটা নিয়ে অনেক কথা শুনিয়েছে। তখন মাফও চেয়েছে তার কাছে। তিনি আর না ভেবে দৌড়াদৌড়ি করে বাড়ির কাজ করা শুরু করলেন।
তিতলি রুমে এসে দেখল ফারাজ স্টাডি টেবিলে ম্যাককুক নিয়ে বসেছে। তাকে রুমে আসতে দেখে একবার তাকিয়ে চোখ নামিয়ে আবার ম্যাকবুকে মনেযোগ দিয়েছে। সে সোজা ফারাজের সামনে গিয়ে হেটে এসে আবার আলমারি খুলে কাপড়চোপড় নিয়ে ট্রলি ব্যাগ নিয়ে বসলো। আজকে দুপুরের দিকেই রয়না দিবে। মানে তিনটা নাগাদ করে। এখন প্রায় সকাল দশটা বেজে এসেছে। জামাকাপড়ও তো গুছিয়ে নিতে হবে। ট্রলিতে নিজের দশ-বিশটা বেশির গোল ফ্রক, ওড়না, পাজামা যাবতীয় সবকিছু গুচাচ্ছে সে। এমনিকি পাশে পাশে ফারাজের শার্ট প্যান্ট, ট্রাউজার গেঞ্জিও নিচ্ছে যেগুলো সে পছন্দ করে সব নিজের জামার সাথে মিলিয়ে মিলিয়ে নিচ্ছে। ভাল্লুক কি তাকে দেখছে না সে কাপড় গুচাচ্ছে কিছু বলছে না কেন? এগুলো তো সংসারী বউ হওয়ার লক্ষণ। তার ইচ্ছে হয় ফারাজের জন্য সব কাজ করতে। যখন যা যা প্রয়োজন হয় সব সামনে নিয়ে হাজির থাকতে। এখন তো সকালে উঠে বিছানা টাও সে গুছায়। কিছু একটা মনে করে সে ফারাজকে শুনিয়ে শুনিয়ে গুনগুন করে গান গাইতেছে,
“ফাগুন মাসে কাচা বাসে….. গুনগুনিয়ে বোমর আসে প্রেমের লাইগা বুকটা করে আহআহ উহু। দুষ্ট কুকিল ডাকেরে কু কু কু…..!”
ফারাজ তিতলির গান গাওয়া শুনে পুরো তব্দা মেরে গেছে। ম্যাকবুক চালাতে পারছে না। সে ম্যাকবুকে নজর দিচ্ছে কম তিতলির দিকে তাকাচ্ছে বেশি। তার বুদ্ধিমতি বউ হয়তো জানে না সে এতক্ষণ তাকিয়েই ছিলো যখন তিতলি তাকাচ্ছিলো তখন সে ম্যাকবুকে নজর দিয়েছে। এবার সে সোজা উঠে এলো। তিতলি ফারাজের উঠে আসার আওয়াজ পেয়ে মুচকি মুচকি হাসলো। সে ইচ্ছে করেই এই গান গেয়েছে। যাতে ফারাজ তার দিকে মনেযোগ দেয়। এবারও যেন ফারাজ আসে বুঝতেই পারেনি তেমন ভাব ধরে রেখে আবার আরেকটা গান গেয়ে উঠল,
লা..লা লা…”
তিতলির গান গাওয়া পথিমধ্যেই থেমে গেলো। হুট করেই ঠোঁটে ফারাজের খসখসে হাতের তালুর চাপ বসল। তিতলি ফারাজের হাত ধরে হাসফাস করতে লাগলো৷ ফারাজ তিতলির মুখ ছেড়ে দিয়ে কপাল কুঁচকে রাখল কিছুক্ষণ। রুঢ় মানব অন্যন্ত ঠান্ডা স্বরে আওড়াল,
“এত জামাকাপড় ট্রলিতে কেন ঢুকাচ্ছো?”
তিতলি ছাড়া পেয়ে ট্রলি ব্যাগে আরও কাপড় গুছাতে গুছাতে বলল,
“নিচে আম্মু আব্বুরা কি বলছে শুনেন নি? টাঙ্গাইলে যাবে আপনার নানার বাড়ি। সেখানে যাওয়ার জন্য কাপড়চোপড় গুচাচ্ছি।”
“তো আমার শার্ট প্যান্ট কেন নিচ্ছো?”
“শার্ট প্যান্ট মানুষ কেন নেয়? নিশ্চয় আপনি পরার জন্য নিচ্ছি।”
“আমি যাবো বলছিলাম? আর তুমিও কার পারমিশন নিয়ে জামাকাপড় গুছাতে বসেছো?”
তিতলি মুখ ভেংচিয়ে নেয় একবার। যাবে নাকি যাবে না সেটা সেও দেখে নিবে। ফারাজের কথার প্রত্যুত্তরে তেজ ধরে বলল,
“আপনি না গেলে আপনার শার্ট প্যান্ট সেখানে গেলে আমি পরবো।”
ফারাজের কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়েছে। তিতলির পাশে দাঁড়িয়ে থেকে ভয় দেখিয়ে বলল,
“আমি কয়দিন একটু ছাড় দিচ্ছি বলে মনে হচ্ছে না তুমি বেশি উড়ছো? ভয় লাগে না আমায়? আমি যেখানে যাবো না বলছি সেখানে তুমি নিজে নিজে এত এত কিছু ভেবে বসে আছো? আমি বলছি তোমার যাওয়া ক্যান্সেল!”
তিতলির চোখজোড়া ভিজে উঠেছে। পিটপিট করে তাকায় ফারাজের দিকে। কাঁদোকাঁদো মুখে জেদ দেখিয়ে বলল,
“না আমি যাবো। আর যদি না-ই যায় তাহলে আমি আব্বুর বাড়ি চলে যাবো। আপনি একা থাকবেন ঘরে। আমি কল করবো না আপনাকে।”
ঠোঁট কামড়ে হাসল ফারাজ। ভ্রু উচিয়ে শুধায়,
“ওয়েট! তো কাকে কল করবে হুমম? আমকে কল না করে থাকতে পারবে? একদিন কল রিসিভ না করলে কেঁদেকেটে বন্যা করো যে সে মেয়েটা তুমি না?”
তিতলি বুঝলো ফারাজ নিজের কথা দিয়ে আবারও গুলিয়ে ফেলতে চাইছে তাকে। তাই তো সে বুদ্ধি দিয়ে উত্তর দিলো,
“আবেগের বশে তখন কান্না করেছি ঠিকই কিন্তু এখন অনেক ভেবেচিন্তে বুঝেছি আবেগ দিয়ে দুনিয়া চলে না। তাই আর আপনার জন্য আমি কাঁদবো না।”
তিতলি একটু থেমে ফারাজের মুখের দিকে তাকালো। ফারাজ উঠে পিঠ ঘুরিয়ে অন্যদিকে মুখ করে নিয়েছে। তিতলির কথাটা শুনে চেহারাটায় কেমন আমাবস্যা নেমেছে। ঘোর আমাবস্যা। অন্তকোণে চোট লেগেছে কি তার। সুদর্শন মুখখানা তার ওমন ফ্যাকাশে হয়ে গেলো কেন?
তিতলি আবার মিটিমিটি হেসে বলল,
“আমি গেলে যাবেন না গেলে নাই। শুনেছি আপনার নাকি কয়টা মামাতো ভাই আছে.?”
ফারাজ রেগে যাচ্ছে যেমন। তিতলি সেটা দেখে আবার বলল,
রাগে অনুরাগে পর্ব ৩৯
“টাঙ্গাইলে অনেক ঘুরবো। আপনি না গেলে অয়ন ভাইয়া আছে, আপনার মামাতো ভাইরা আছে বোনেরা সবার সাথে ঘুরবো।”
ফারাজ এবার তিতলির দিকে ঘুরে কপালটা মাত্রাতিরিক্ত কু্ঁচকে নিয়ে শক্ত গলায় চিড়বিড়িয়ে বলল,
“যাবো।”
তিতলি খুশিতে গদগদ হয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“এইতো ভাল্লুক লাইনে এসেছে।”
