Home রাগে অনুরাগে রাগে অনুরাগে পর্ব ৩৯

রাগে অনুরাগে পর্ব ৩৯

রাগে অনুরাগে পর্ব ৩৯
সুহাসিনি ফাতেহা

“ওকে ফাইন! শুধু বিয়েটা হোক তারপর আপনার মুখ দিয়ে ভাই ডাক বের হওয়া বন্ধ করবো। বলা তো যায়না ভবিষ্যতে ছেলে-মেয়ে হলে আপনার ভাই ডাক শুনে আমাকে মামা ডেকে বসবে।”
ঝিলিক তুষারের বুকে সামান্য ধাক্কা দিয়ে সরে আসতে চাইলো। এক কদম পা বাড়িয়েছে সবে তক্ষুনি পেছন থেকে টান পড়ল বা হাতের নরম কব্জিতে। লজ্জায় মরিমরি সে। তুষার ঝিলিককে ঘুরিয়ে এনে বড্ড শক্ত করে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়েছে। দু দেহের সংঘর্ষ হলো। প্রখর ভাবে। ঝিলিকের বুক কেঁপে উঠলো৷ নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত করে বলল,
“কি হয়েছে? সবাই অপেক্ষা করছে চলুন।”
তুষারের সোজাসাপটা স্বীকারোক্তি এলো,
– “ভালোবাসি৷”

ঝিলিক নিশ্চুপ হয়ে তুষারের বুকে মাথা গুঁজে পড়ে রইল। ভালোবাসি কথাটা শুনতে কতটাই মুুগ্ধ লাগছে৷ মোহনীয় লাগছে। ঝিলিককে আরো চমকে দেওয়ার জন্য তুষার গভীর গলায় বলল,
“উঁহু! আপনি এতো সুন্দর কেন বলুন তো? আপনার চোখে চোখ রাখলে আমি নিজেকে খুঁজে পাই। মন বলে যুগযুগ ধরে চেয়ে থাকি। নিজেকে হারিয়ে ফেলি আপনার মাঝে।”
“আপনি ভালোবাসেন তাই আপনার চোখে আমি সুন্দর।”
ঝিলিক কথাটা বলে পুনরায় কিছু একটা মনে করে মিনমিনে গলায় বলল,
“আপনাকে একটা কথা বলব?”
তুষার ঠোঁটের কোণে চিলতে বাঁকা হাসির রেশ ফুটিয়ে বেসুরা গলায় ফিসফিসিয়ে বলল,
“যত কথা আছে এই মনে গোপনে। খুলে বলো আজ আমায়।”
গানের লাইনটা গেয়ে তুষার ফের হাস্কি সুরে বলল
“আমি আপনার সব কথা শোনার জন্য কানখাড়া করে দাঁড়িয়ে আছি। দ্রুত বলুন ঝিলিক।”
“আপনি আমাকে তুমি করে ডাকেন না কেন? আপনি ডাক শুনতে কেমন জানি পরপর লাগে।”
তুষার ঝিলিকের মুখ নিজের বুকের থেকে সামান্য তুলে গালে একহাত রেখে অন্য হাত দিয়ে ওর ছোট ছোট চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিতে দিতে নরম সুরে বললো,
“কিছুদিন পর আমাদের মাঝে আর কোনো দুরুত্ব থাকবে না। তুমি, আমি, আমরা আমাদের মাঝে কেন পরপর শব্দ আসবে হুমম? তুমি যা চাইবে তা-ই হবে ওকে? খেয়াল করে দেখো অলরেডি তুমি বলেই ডেকেছি।”
“হুম!”
চোখজোড়া বন্ধ করে ঝিলিক তুষারের আরও মিষ্টি মিষ্টি কথাবার্তা শুনতে থাকলো৷ এগুলো শুনতে কতটাই না ভালো লাগছে। সত্যি? মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কি তুষার তাকে এভাবে ভালোবাসবে? এভাবেই তার জন্য পাগল থাকবে?

তিতলি একটা অঘটন করে বসেছে। দেওয়ালে টাঙানো ফারাজের একটা ফ্রেমে বাধা হাসিমাখা ছবি হাতে নিয়ে দেখতে দেখতে এক সময় হাত থেকে কীভাবে যেন ঠাস করে টাইলেসে পড়ে গিয়েছে। ভেঙে ছুরমার হয়ে গেছে। ভয়ে জান যায় যায় অবস্থা বেচারির। সাথে কেঁদেও দিয়েছে। ফারাজের ছবি ভেঙে গিয়েছে সে সাথে যেন তার বুকের ভেতরে মোচর দিয়ে উঠেছে। ভাল্লুক আসলে আজকে তাকে কাঁচা চিবিয়ে খাবে। এমনিতে বুড়ো বলায় শাস্তি দেওয়ার জন্য হাতেনাতে ধরার সুযোগ খুঁজতেছে। গতকাল রাতে তো সে রুমেই থাকতে চাইনি। কত ফুন্দিনুন্দি করে শাশুড়ি আম্মুকে বুঝিয়ে বলেছিল,
“আজকে আমি আপনার সাথে থাকবো আম্মু। আপনার ছেলে আসলে বলবেন আমি ঘুমিয়ে পড়েছি দরজাটা একদম খুলবেন না।”
তখন উত্তরে ফারিন বেগম বলছিলেন,
“ফারাজ কি তোমাকে কিছু বলেছে? বকছে?”

তিতলি দুপাশে মাথা নেড়ে না সূচক বুঝালো । আরো বানিয়ে পেঁচিয়ে একটা থেকে দশটা কথা বলেছে শাশুড়িরকে। ফারিন বেগম শেষে পুত্রবধুকে নিজের পাশে রেখেছেন। আফজাল খান অন্যরুমে শুয়েছেন।
রাতে যখন তিতলি গভীর ঘুমে বিভোর তখন ফারাজ রেগেমেগে এসে তিতলিকে কোলে করে রুমে নিয়ে এসেছে। তখন তিতলির গভীর ঘুমটা ভেঙে গিয়েছে। কিন্তু ঘুম যাওয়ার ভান ধরে ছিলো পুরোটা সময়।
ফারাজ ফ্রিজ থেকে বরফ এনে তার গালে বরফ লাগিয়ে দিয়েছে। তার আঙুলের দাগ এমন ভাবে বসে যেতে হবে? মেয়েটার সব কিছু ওমন তুলতুলে নরম কেন? সামান্য ছুঁয়ে দিলেই চাপ বসে। শক্ত করে ধরলে দাগ বসে। ফারাজ অনেকক্ষণ বরফ লাগানো শেষ করে তিতলির ঘুমন্ত মুখে কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে তিতলির ভেজা গালে কতক্ষণ যে নিজের নরম ঠোঁট চেপে ধরে রেখেছিল তার ইয়ত্তা নেই। তিতলি সজাগ অবস্থায় কেঁপে কেঁপে উঠছে। তবে চোখদুটি বন্ধ। ভাবখানা এমন যেন সে সত্যি রাজ্যের ঘুম ঘুমাচ্ছে। আর ফারাজ সেটা টেরও পেলো না। ফারাজ একসময় তিতলির কানের কাছে মুখ নিয়ে গলা নামিয়ে মৃদুস্বরে বলে,
“সরি ফর দ্যট!”

কথাটা বলে তিতলির কানের পিঠে শব্দ করে চুমু খেলো। তিতলি নড়েচড়ে উঠল। হতবিহ্বল, বিস্মিত, হতভম্ব, হয়ে গিয়েছিল সে। তাকে সরি বলছে? সে স্বপ্ন দেখছে না তো? বোকা মানবী মুখবয়বে অবিশ্বাস নিয়ে ভেবেছে, সে কি এখন চোখ খুলে ফেলবে? না, চোখ বন্ধ করে রেখেছে সে। তার গাল টেনে ধরে আবার তাকে বরফ লাগিয়ে দিচ্ছে। ব্যাপারটা তিতলির কিশোরী মনে অদ্ভুত ভালো লাগা সৃষ্টি করল। লোকটাকে এতদিন ধরে যতটা পাষাণ ভেবে এসেছে ততটা পাষাণ নয়। সে তো ভেবেছিল এই পাষাণ লোককে ভালোবেসে কোনদিন জানি তাকে বেদুইন চলে যেতে হয়।
ফারাজ কিছুক্ষণ পর বাম কাত হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। পেশিবহুল হাতের সাহায্য আলগোছে তিতলির পেট জড়িয়ে তিতলিকে টেনে এনে তিতলির পিঠ তার বুকের মিশিয়ে নিয়ে বিড়বিড় করে বলছিল,
“ইউ নো! আমি ৮০ বছরের বুড়ো হয়ে গেলেও তোমাকে আমার সাথে থাকতে হবে সারাজীবন।”
তিতলি চুপচাপ কানখাড়া করে দিয়ে শুনেছে সব। চোখ বন্ধের মাঝে ওপাশ ফিরে মিটিমিটি হাসছিল।
মনে মনে তিতলি বলছিল,

“আহারে বুড়ো বলায় মনে হয় গায়ে লেগেছে।
আন্দাজ করলো, সে প্রথম থেকেই ফারাজকে জ্বালিয়ে আসছে। এক মিনিট শান্তি দেয়নি ফারাজকে। যেদিন কলেজে প্রথম দিন ফারাজ জয়েন করেছিল,,তিতলি সেদিনই ক্রোন আইসক্রিম খেতে খেতে ভুলবসত ধাক্কা লেগে ফারাজের সাদা শার্টে গোটা আইসক্রিম মেখে দিয়েছিল। সেদিন ফারাজ তাকে কিছুই বলেনি শুধু তিতলির উপর কটমট দৃষ্টি ফেলে চলে গিয়েছিল। সেদিনের পর থেকে আরো কত ঘটনা ঘটেছে। তখন থেকে তার এসব ভুলবাল,উল্টাপাল্টা কাজ, মুখেমুখে তর্ক করা সব সহ্য করে আসছে,এটা কম কথা নয়! তিতলির আজ সত্যিই ভাল্লুকের উপর মায়া হচ্ছে।
তিতলি রুমে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফারাজের হাসিমাখা ছবিটা হাতে নিয়ে রাতের কথা ভাবছিল আর মুচকি মুচকি হাসছিল তখন হুট করেই ঘটনাটা হলো। কাঁচের ছবিটা ভেঙে শেষ। কাঁচের ফ্রেম ভেঙে চারপাশে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছে। তিতলি কি করবে না করবে কিছুই বুঝতে পাচ্ছে না। শাশুড়ির কাছে শুনেছে এটা নাকি ফারাজের খুব শখের ছবি। ভয়ে কেঁদে দিয়েছে মেয়েটা। বিড়বিড়িয়ে আওড়ালো,

“আল্লাহ বাঁচাও আমাকে।”
অনেকক্ষণ ভাবার পর একটা শপিং ব্যাগ নিয়ে সেটার ভেতরে ভাঙা কাঁচ গুলো ঢুকাতে শুরু করল। হাতে কাঁচ লেগে কেটে গেছে। রক্ত বের হয়েছে। ব্যাথা পেয়ে,
“উফফ!”
শব্দ করে উঠলেও থামল না। অন্য সময় হলে কেঁদেকেটে মাথা তুলত কাটা হাত নিয়ে। সব ঢুকিয়ে শপিং ব্যাগ সহ খাটের নিচে লুকিয়ে রেখেছে। মন থেকে ভয় কমানোর জন্য বাবাকে ফোন করল। ফোন রিসিভ হতেই তিতলি বলল
“আসসালামু আলাইকুম আব্বু।”
তৌসিফ শেখ :- ‘ওয়ালাকুমুস সালাম। কেমন আছো আম্মা?’
তিতলি:- ‘ভালো। তুমি কেমন আছো আব্বু।’
তৌসিফ শেখ :- ‘আলহামদুলিল্লাহ্‌ ভালো। গলা এমন শুনাচ্ছে কেন?’
তিতলি:- ‘কই না তো আমি একদম ঠিক আছি আব্বু।’
তৌসিফ শেখ:- ‘আব্বুকে মিথ্যা বলো না আম্মা। কোনো কিছু নিয়ে ভয় পেয়ে আছ বলো?’
তিতলি নিজের ভয় আড়াল করে আব্বুকে বলল,

“কোনো কিছু নিয়ে ভয় পায় নি আব্বু।”
তৌসিফ শেখ:- ‘জামাই কোথায়?’
জামাইর কথা জিজ্ঞেস করে। তিতলি যার ভয়ে নিজেকে শান্তনা দিতে বাবাকে ফোন করল। তার কথা জিজ্ঞেস করেছে। সে বলল,
“বাইরে গেছেন।”
বাবা মেয়ে আরো কিছুক্ষণ কথা বলে রেখে দিলো।
আব্বুর সাথে কথা বলা শেষে তিতলি নিধির সাথে কথা বলে ঘটনাটা শেয়ার করেছে। নিধি বলেছে ধমকাতে আসলে রোমান্টিক কথা বলবি।

ফারাজ বাড়িতে এসেছে প্রায় রাত এগারোটায়। তিতলি ড্রয়িংরুমে বসে ছিলো। ফারিন বেগমের কোমরের ব্যথা বেড়েছে। তাই টেবিলে ফারাজের জন্য খাবার বেড়ে রেখে তিতলিকে বলছেন ফারাজ আসলে শুধু খেতে দিলে হবে। তাই তিতলি ঘুম না গিয়ে ফারাজের আসার অপেক্ষা করছে। ভাবতেই কেমন বউ বউ লাগে। ফারাজ ড্রয়িংরুমের কোনদিকে না তাকিয়ে সোজা রুমে চলে গেলো। তিতলি ফারাজের হাতে আইসক্রিমের বক্স দেখল। সে নিজেই বলেছিল আনতে। আইসক্রিমের লোভ সামলাতে না পেরে তিতলি কিছুক্ষণ পর প্লেট হাতে নিয়ে নিজেও খুশিতে গদগদ হয়ে রুমের উদ্দেশ্য পা বাড়ালো। দরজা ঠেলে ভেতরে তাকাল প্রথমে। ফারাজের পরনে একটা ঢিলেঢালা কালো ট্রাউজার উপরের অংশ উদোম। তিতলি মনে মনে ভাবে দৈত্যের মতো বডি এটা তাকে না দেখালে শান্তি লাগেনা মনে হয়। চোরাচোখে সে ফারাজের খালি গায়ের দিকে তাকিয়ে ঢোক গিলল। রুমে ঢুকে টেবিলে প্লেট রেখে বলল,

“আপনার জন্য ভাত নিয়ে এসেছি।”
ফারাজ কপালে কুঁচকে তাকায় তিতলির পানে। সুদর্শন মুখখানায় তার সে-কি সন্দিহান ভাব। দুষ্টমি লেপ্টে পরপরই গমগমে কন্ঠে শুধায়,
“এতটা পরিবর্তন? মতলব তো সুবিধার লাগছে না ম্যাডাম?”
তিতলি সোফায় বসল পাশে আইসক্রিমের বক্স। হাত বাড়িয়ে সেটা হাতে নিয়ে বসল। অনেক ভেবেচিন্তে এসেছে ছবিটা ভেঙেছে সে কথা কি করে বলবে। তারপর পটানোর সুরে বলল,
“আপনি আমার দশটা না বিশটা না একটা মাত্র স্বামী আপনার জন্য নিজেকে পরিবর্তন করে নিয়েছি হুহ!”
ফারাজ চোখ ছোট করে তাকাতেই তিতলি ফের বলল,
“আপনি যাওয়ার পর আপনার খালামনি রুমে এসেছিল।”
ফারাজ শক্ত চেহারা টানটান করে ফেলল। শক্ত গলায় বলে,
“কিছু বলছে তোমাকে? দরজা লাগিয়ে রাখলে না কেন?”
“না কিছু বলেনি। কিন্তু এসে আপনার দেওয়ালে টাঙানো ছবিটা ভেঙে দিয়ে গেছে।”
তিতলি কথাটা বলে আইসক্রিমের বক্স খুলাতে মনেযোগ দিয়েছে যেন সে ধোয়া তুলসি পাতা। ফারাজ ডান পাশে দেওয়ালে টাঙানো ছবিটা না দেখে রেগে গেলো।

“মিথ্যা বলছো কেন?”
“মিথ্যা বলছি না একদম। খালামনি রুমে এসে আপনার ছবিটা হাতে নিয়ে হাসতে হাসতে বললেন,
“আগে ফারাজ কত হাসিখুশি ছিলো। আহারে এখন ছেলেটা কেমন গম্ভীর হয়ে গেছে। দেখলে মায়া হয়। বলতে বলতে হঠাৎ হাত থেকে ছবিটা পড়ে গেলো। আপনার খালামনি চিৎকার করে উঠলেন। প্রায় কেঁদে দিয়েছেন। আমি তো ওনার নাটক দেখে অবাক হয়ে গিয়েছি। আমাকে আরো অবাক করে দিয়ে বললেন,
“হাত থেকে ভুল করে পড়ে গিয়েছে।”
” আমি অনেক কথা শুনিয়েছি।”
ফারাজের বিশ্বাস হলো না তিতলির কথা। কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়েছে। তরন্ত ক্ষীপ্ত চোখে আশেপাশে চাইল। তিতলি আইসক্রিম খাওয়া শুরু করেছে। সে আড়চোখে ফারাজের মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবছে, এখনো কি বিশ্বাস করছে না তার কথা। সে আবার বলল,
আমাকে আবার বড় মুখ করে বললো,
“ফারাজ আসলে আমার কথা বলে দিও। আমি মাথা পেতে যা শাস্তি দিবে তাই মেনে নিবো। ভুল যেহেতু করেছি মেনে নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ।”
“তারপর চলে গেলেন। আমি অনেক কষ্ট পেয়েছি আপনার ছবিটা ভেঙে দিলো। কোমর বেঁকিয়ে আপনার ছবিটা শপিং ব্যাগে ঢুকিয়ে খাটের নিচে রেখেছি।”

ফারাজ খুব মনেযোগ সমেত সবগুলো কথা শুনলো। আদৌ বিশ্বাস করলো কিনা কে-জানে। যু্বক কেমন শক্ত মেজাজ নিয়ে দরজা খুলে বাইরে যাবে। তিতলি তো খুশিতে শেষ। তার কথা বিশ্বাস করে নিয়েছে। কিন্তু এখন মনে হয় নাছিমা বেগমের কাছে যাচ্ছে। এটা এখন কিছুতেই সে হতে দিবে না। চঞ্চল পায়ে দৌড়ে এসে ফারাজকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। বলিষ্ঠ পুরুষের পেট জড়িয়ে রাখতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে রমণী। ফারাজের উদোম পিঠ থেকে পুরুষালী শরীরের সুবাস তার নাসারন্ধ্র ভেদ করেছে। যেমন মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে কিশোরীর। চোখদুটো বন্ধ করে প্রেমপ্রেম কন্ঠে বলল,
“থাক লাস্টবারের মতো ঘোষেটি খালামনিকে মাফ করে দেন। সেদিন বমি করতে করতে যাওয়ার পথে বসেছিল। কিন্তু পরেরবার যদি এমন ভুল করে তাহলে আপনার আগে আমি ওই মহিলার সবগুলো চুল টেনে ছিড়ে ফেলব কেমন? এখন তো অনেক রাত হয়ে গিয়েছে। অসহায়দের মাফ করে দিলে আল্লাহও খুশি হোন। সাথে আমিও খুশি হবো।”

ফারাজ থমকায়। যুবকের পাদুটো থেমে গিয়েছে। সে চোখ নামিয়ে তাকায় তার খালি পেটে জড়ানো তিতলির মোলায়েম দুহাতের পানে। এই কী কখনো বড় হবে না? বুদ্ধি সুদ্ধি হবে না? তাকে বোকা বানায়। কত সুন্দর করে মিথ্যা বানিয়ে তাকে বুঝাচ্ছে। ভাবে মে বুঝে না কিছু। নিজের কথা নিজে কীভাবে সাজিয়ে বলছে তাকে। ইচ্ছে করছে কয়টা কড়া কথা শুনাতে। কিন্তু তার রাগ হচ্ছে না কেন জানি। পাখি ভাল্লুকের খাঁচায় পা দিচ্ছে নিজ থেকে তখন পাখিকে একটু শিক্ষা দেওয়া যাক। সহসা ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসির রেশ ফুটিয়ে শুধালো,
“ওটা নিয়ে তোমাকে ভাবতে না। তোমাকে খুশির চূড়ান্ত লেভেল অবধি ঘুরিয়ে আনার দায়িত্ব আমার।”
তিতলি নিশ্চুপ হয়ে আছে। ভেবেছিলো ফারাজ তার কথা বিশ্বাস-ই করবে না। যে ভয়টা না পেয়েছিল। তার অনেক কষ্টও লাগছে ছবিটা ভেঙে যাওয়ায়। সে ঠিক এমন একটা ছবি এভাবে বানিয়ে আবার দেওয়ালে টাঙাবে। কিন্তু আসলে কি তার কথা বিশ্বাস করেছে? যদি বিশ্বাস না করে তাহলে কিছু বলছে না ধমকাচ্ছে না কেন? বিশ্বাস না করলে না করুক। এমনিতে ওই ডাইনী ঘোষেটি খালামনিকে তার একটুও ভালো লাগেনা। এখনো যায় না কেন কে জানে। এতকথা শুনিয়েছে সে হলে তো জীবনে আর এই বাড়ির চৌকাটেও পা দিতো না। আসলেই ভদ্র মহিলাটার সাহস আছে বলতে হবে। তিতলি তখনো ফরাজকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। ফারাজ নিদারুণ স্বরে বলল,

“তো? জেনেবুঝে কাছে আসছো তো? এখন যদি আমি কিছু করে দিই? পরে কাঁদবা।”
“কি করবেন?”
“তোমার সাথে এখনো আমার অনেক বুঝাপড়া বাকি আছে ভুলে গেলে? কাল রাত থেকে যে পালিয়ে বেড়াচ্ছো সেটার ফল কি হতে পারে একবারও ভেবেছ? আমি এখনো রেগে আছি।”
তিতলি কথা ঘুরানোর জন্য বলল,
“ভাত খেয়ে নিন।”
“উমম আমার তো অন্যকিছু খেতে ইচ্ছে করছে।”
“আপনার যা খেতে ইচ্ছে করবে তা নিচে গিয়ে এনে দিবো। ”
“নো নিড. ইউ আর মাই মোস্ট ফেবারিট ডিশ! ”
তিতলি ভীতি ঢোক গিলে। সে ফারাজের খালি গা থেকে ধীরলয়ে নিজের হাত আলাদা করতে থাকে। তার কেমন কেমন জানি লাগছে। এই প্রথম নিজের দোষ ঢাকতে গিয়ে উদোম গায়ের ফারাজকে জড়িয়ে ধরেছে। ভাবতেই লজ্জায় মরে যাচ্ছে।

ফারাজ পেছনে ঘুরে তাকায়। ঠোঁট কামড়ে হাসে সে। এবার সে নিজেও সামনে ঘুরে তিতলির কোমর জড়িয়ে নিজের সাথে চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলল,
“এবার তো তোমাকে ছাড়ছি না আমি। আগেই বলছি হুটহাট আমার কাছ ঘেষবে না। আমি বড্ড ভয়ঙ্কর কখন কি করে বসব সেটা বুঝতেও তোমার গোটা রাত কেটে যাবে।”
ফারাজ তিতলিকে কিছু বলার সুযোগ দিলো না। গলায় মুখ ডুবিয়ে কামড়ে দিলো। তিতলির নাকের ডগায় নাক ঘষলো। জোড়ালো পায়ে এক পা দু পা সামনে এগাতে এগাতে আচমকা জিভ দিয়ে তিতলির ঠোঁটের পাশে শুকিয়ে লেগে থাকা ভ্যানিলা আইসক্রিম খেয়ে নিলো। ইয়াম্মি!

এর মাঝেই আরো তিনটা দিন কেটে গেল। ফারাজ তিতলির সম্পর্ক একটু হলেও স্বাভাবিক হয়েছে। তবে পুরোপুরি নয়। সময়ের সাথে সাথে দুজন দুজনকে বুঝবে, জানবে তারপরই তো ভালোবাসার উতপত্তি। অনেক বোঝার বাকি জানার বাকি।

আজকে শুক্রুবার। ঘড়িতে সকাল নয়টা। সবার ছুটির দিন।
সকাল সকাল হুশিয়ার সাহেব ফোন করেছেন। সবাইকে নিয়ে যাতে আজকের মধেই টাঙ্গাইল রয়না দেয়। হুশিয়ার সাহেবের বাবা মায়ের মৃত্যুবার্ষিকীতে বড় করে মেজবান দিবেন পরশু। ফারিন বেগমও অনেক দিন হয়ে গেলো বাপের বাড়ি যান না। তাই তিনি যাওয়ার জন্য এক পা খাড়া করে দাঁড়িয়ে আছেন। কালকে ফরহাদও কানাডা থেকে এসেছে। ড্রয়িংরুমে সবাই বসে আছেন। এমনকি ফারাজও। সবার মাঝে হুশিয়ার সাহেবের সাথে কথা বলেছেন ফারিন বেগম। ফরহাদ মাকে বলল
“কি বললো নানাভাই?”
“আমার নানা নানীর মেজবান দিবো। তোর নানা আমাদের সবাইকে যেতে বলছে। তোর চাচাদের ও বলছে ফোন করে।”
“তাহলে ভালোই হবে আম্মু। এতদিন কানাডায় থেকে বোরিং হয়ে পড়েছি। ওখানের খাওয়াদাওয়া ও কেমন জানি।”

ফারাজ সবার কথা শুনে উঠে চলে যাবে। ছোট বেলায় সে বেশির ভাগ টাঙ্গাইলে থেকেছে। প্রায় ক্লাস ৫ পর্যন্ত পড়েছে সেখানে। নানাভাইয়ের ন্যাটা ছিলো। এখন বড় হতে হতে বদলে গিয়েছে সব। বদলে গিয়েছে বলতে সে বদলে গিয়েছে। ভাইকে বলল,
“তোর ডাক্তারি পরিক্ষা আর কতদূর আছে?”
আরো দুইটা পরিক্ষা দিতে হবে।
“ওহ।”

ফারাজ উঠে চলে গেলো। তিতলি বসে আছে। ফারাজ চোখেচোখে তিতলিকে রুমে ডাকলো। নাছিমা বেগমও আছেন। ফারাজ চাইনা নাছিমা বেগমের চোখের সামনে তার অনুপস্থিতিতে তার বউকে রাখতে। তিতলি তো খুশিতে আধখানা। টাঙ্গাইল যাবে। সে তো দুপায়ে খাড়া হয়ে আছে যাওয়ার জন্য। সে আরো কথা শুনতে বসে আছে। ফারাজ যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। যেতে যেতে শুনে বাবার কথা।
আফজাল খান পেপারস থেকে মুখ সরালেন। ফারাজের যাওয়া দেখে তিনি ভাবলেন ছেলের মত নেই। তাই স্ত্রীর মুখের দিকে চেয়ে বললেন,

রাগে অনুরাগে পর্ব ৩৮

“সত্যি যাবে বলছো তো? তোমার বড় ছেলে” আদৌ যাবে কি না সে মতামত নিয়েছো?”
ফারিন বেগম ছেলেকে শুনিয়ে শুনিয়ে বড়গলায় আওয়াজ করে বললেন,
“যাবে না তো কি হয়েছে তার বাপ তো যাবে। ফারাজ না গেলে আমরা তিতলিকে নিয়ে চলে যাবো। তোমার ছেলে বাড়িতে একা থাকুক। যখন দেখবে বউ চলে যাচ্ছে তখন ঠিকই দৌড়াবে।”

রাগে অনুরাগে পর্ব ৪০