রাগে অনুরাগে পর্ব ৩৮
সুহাসিনি ফাতেহা
“আমি এতবড় সাইন্সের টিচার হয়ে তোমাকে সাইন্সের সাবজেক্ট অন্য টিচারের কাছে পড়তে দেওয়ার প্রশ্নই উঠেনা। এ সাবজেক্ট তো মোটেই না। কজ এসব বিষয়ে তোমার হাসবেন্ড খুবই এক্সপার্ট!”
ফারাজ তিতলির মুখের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকেই পুরো কথাটা শেষ করল। তিতলি একপলক ফারাজের দিকে তাকিয়ে টেবিলের উপর নিজের তুলতুলে দুহাত রেখে বসেছে। সামনে জীব বিজ্ঞান বই। ভাবছে, আগে তো মনে হয় সে আর জীব বিজ্ঞান বই আরিফ স্যারের কাছে পড়েনি। আর এখন পড়লে মহাপাপ হয়ে যাবে।
টেবিলে আঙুল খুঁটতে খুঁটতে মিনমিনিয়ে বলল,
“এখন তো আপনি অন্য ক্লাসে যাবেন ক্লাস করাতে।”
ফারাজ গম্ভীর কন্ঠে বললো,
“সব ক্যান্সেল। আমি এখন তোমার ক্লাস নিবো।”
তিতলি চোখ ছোট ছোট করে তাকায় ফারাজের দিকে। হিজাবটা একটু গালের পাশে নেমে গিয়েছে। কখনো হিজাব না পরায় হিজাব যেন খুলে যেতে চাচ্ছে। আসার সময় ফারাজ নিজের হাতে করে দিয়েছে। সে হিজাব ঠিক করতে করতে ঠোঁট উল্টে বলে,
“আমি কি আগে এসব পড়া আরিফ স্যারের কাছে পড়িনি? তখন আপনি কোথায় ছিলেন হু? যত্তসব ঢং!”
ফারাজ রিভলভিং চেয়ারে দুলতে দুলতে চোয়াল শক্ত করে নিলো। ধমকের সুরে একনাগাড়ে বলল,
“তখন তোমার নামের পাশে মিসেস ফারাজ খান ট্যাগ ছিলো না। এখন তুমি অলরেডি মিসেস ফারাজ খান বুকড! তোমার মুখে শুধু একটাই নাম থাকবে সেটা শুধু ফারাজ। ভবিষ্যতে আরিফ স্যার কেন? বাদবাকি পরপুরুষের নাম মুখ দিয়ে বের হওয়ার আগে আমার এই কথাটা ১০০ বার ভাববে। আন্ডারস্ট্যান্ড!”
তিতলি শুনলো না ফারাজের কথা। কেন শুনবে কেন? এখন থেকে যতদিন তাকে ভালোবাসি বলবে না ততদিন সে ওসব কাজ বেশি করবে যেসব কাজ ভাল্লুক অপছন্দ করে। সেও দেখবে কিভাবে তাকে ভালোবাসি না বলে। একটা জেদ চেপে বসেছে সপ্তদশীর কিশোরী মনে। মনে পড়ল বিয়ের কিছুদিন আগে আরিফ স্যারের দেওয়া চিঠির কথা। ফারাজকে আরো রাগিয়ে দেওয়ার জন্য সহসা একটা কুবুদ্ধি চেপে বসল মাথায়।
বেঘোরে দাঁত কেলিয়ে বলল,
“আরিফ স্যার দেখতে ভালোই তাই না? স্মার্ট আছে হালকাপাতলা। আমাকে দেখলে রোমান্টিক চোখে তাকিয়ে থাকে।”
ফারাজকে চেয়ারে দুলতে থাকা অবস্থায় থেমে যেতে দেখা গেল। গম্ভীর মুখশ্রী আরও গম্ভীর হয়ে উঠলো। কটমট করে তিতলিকে চোখ রাঙিয়ে তাকাল। শক্ত মুখাবয়বে চিড়বিড়িয়ে আওড়াল,
“আমাকে রাগিয়ে দিচ্ছো কেন? দিনকে রাত বানিয়ে কলেজকে বেডরুম বানানোর ইচ্ছে আছে স্টুপিড!”
তিতলি ফারাজের কথা শুনে বাচ্চাদের মতো হো হো করে হাসছে। ফারাজ নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে নিয়েছে। সব ভুলে গিয়ে তিতলির হাসতে থাকা পেলব মুখখানার পানে তাকিয়ে থাকে। বড্ড শীতল,স্থির সে দৃষ্টি। কিন্তু তিতলি এবারও ফারাজকে শান্ত থাকতে দিলো না। সে আবার বলে উঠল,
“আরিফ স্যার আমাকে প্রপোজ করেছে। বলছে আমাকে নাকি ভালোবাসে সত্যি। আপনি তো আমাকে ভালোবাসেন না। তাই ভাবছি একচেপ্ট করে নিবো।”
সহসা মেজাজ বিগড়ে গেলো যুবকের। বোকা মানবীর প্রত্যেকটা বাক্য উচ্চারণ করার সাথে সাথে রাগে ক্রমেক্রমে চোয়াল শক্ত করে নিচ্ছিলো সে। আ’গ্নেয়গিরির লা’ভার মতোন জ্ব’লন্ত চোখ দুটোতে স্পষ্ট রাগের বহিঃপ্রকাশ। কপালের সবকটি রগ ফুলে উঠেছে। শক্তপোক্ত পেশিবহুল দুহাত দিয়ে আওয়াজ করে টেবিলে থাপ্পড় বসিয়েছে। সে আওয়াজে তিতলি কেঁপে উঠেছে। ফারাজের দু হাতের তালু নিসপিস করছে। যুবক দাঁত কিড়মিড় করতে করতে শব্দ করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে ।
তিতলি কিছু বুঝে উঠার আগেই রুঢ় মানবের লম্বা পদযুগল এসে দাঁড়াল তিতলির সামনে। তক্ষুনি সপ্তদশীকে টান মে’রে বসা থেকে উঠিয়ে নিয়ে এসে পাশের দেওয়ালে চেপে ধরলো। রমণীর তুলতুলে নরম হাতদুটোকে দেওয়ালের উপরে তুলে নিজের বলিষ্ঠ একহাতে মুঠোবন্দি করে নেয়। অন্যহাতে তিতলির নরম গাল শক্ত করে টেনে ধরল। তীক্ষ্ণ চোয়ালের পেশি গুলো আরও খানিকটা শক্ত করে গমগমে আওয়াজে বলল,
“আমার হাত দুটো কাঁপছে এখন। নিশ্চয় তোমার থাপ্পড় খাওয়ার ইচ্ছে নেই? আমি চাইনা! একদম চাই না, তোমার গালে আমার হাতের চ’ড় পড়ুক। জানের ভয় নেই তোর?”
আকস্মিক ঘটনায় তিতলি ব্যাথায় কেঁদে দিবে প্রায়। গালের ব্যাথায় মুখ টনটন করছে বেচারির। এত শক্ত কেন এই লোকের হাতগুলো। আসলেই লোহার রডের মতো শক্ত। তার যেন গাল ছিড়ে ফারাজের হাতে চলে যাবে। এটা কি থাপ্পড়ের চেয়ে কম? মোটেও না। এই লোক মুহূর্তেই এমন রেগে বোম হয়ে গেলো কেন?
কথা ঘুরানোর জন্য আমতাআমতা করল,
“আ..আসলে ইয়ে মানে আসলে আমি বলতে চেয়েছি যে বিয়ের আগে যদি আপনি আমাকে এভাবে ডেকে এনে পড়াতেন তাহলে এতদিনে আমি টুনাটুনিদের মা হয়ে যেতাম।”
ফারাজের অভিব্যক্তি কঠিন। সে পড়ে আছে কিছুক্ষণ আগে তিতলি কি বললো সেটা নিয়ে। আশ্চর্য! সে-কি তবে জেলাস? মেয়েটার মুখে এসব শুনে সে এত অস্থির হয়ে গেলো কেন? সে যাই হোক, অন্যসময় হলে তিতলির এমুহূর্তে বলা কথাটার উত্তরে সে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে জ্বালানোর জন্য আরও দশটা কথা বানাতো। তবে এবার সে তিতলিকে শেষ বারের মতো হুশিয়ারি দিলো,
“যদি আর একবার আমার সামনে আরিফ স্যারের গান গাইছো না? আই সোয়ার, যেসব পেন্ডিং কাজ এতদিন বেডরুমে করিনি সব এক্ষুনি এখানে ফিনিশ করে ফেলব।”
মুখ নড়াতে পারছে না তিতলি। ফারাজ সেদিন তিতলির পায়ে ব্যাথা দেওয়ার পর থেকে আর তেমন পা কেন গালও টেনে ধরে না। এই ভেবে যদি ব্যাথা পায়। কিন্তু এই মেয়ে নিজেই নিজের বিপদ ডেকে আনে। সে আবার তিতলিকে বুঝালো,
“আমি যেটা বলতে নিষেধ করি সেটা বলে আমাকে রাগিয়ে দিতে ভালো লাগে? থাপ্পপড় দিয়ে সব দাঁত ফেলে দিবো বেয়াদব! জানো তুমি? আমার সামনে পরপুরুষের নাম মুখে নেওয়াও তোমার জন্য পাপ!”
তিতলি এবার কেঁদে উঠল। পিটপিট করছে আখিযুগল। আল্লাহ তার গাল তো ছিড়ে গেলো। কোনোমতে রয়েসয়ে বলে,
“গাল ছিড়ে যাবে আমার।”
“ছিড়ে যাক!”
“ব্যাথা পাই ছাড়ুন প্লিজ!”
“শর্ত আছে আমার।”
তিতলি চাউনিতে প্রশ্ন,
“কি..কি?”
ভাবনা গালটা ছেড়ে দিলেই দৌড়ে পালাবে। হেব্বি রেগে গেছে ভাল্লুক। আজকে সোজা বাপের বাড়ি চলে যাবে। শুধু ছাড়ুক।
ফারাজ তিতলির কম্পিত অধরের পানে তাকিয়ে নিজ নিম্নাংশের অধর কামড়ে ধরল। একবার তিতলির মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে নিলো। অতঃপর হিসহিসিয়ে হুকম ছাড়লো,
ওকে ফাইন! তাহলে আমি যা বলছি সেটা বলো,
“আমি আপনার সামনে অন্য পুরুষ ভালোবাসে কথাটা বলার শাস্তিসূরপ এখন এই মুহূর্তেই আপনার ঠোঁটে স্বেচ্ছায় চুমু খেতে চাই। শুধু ঠোঁটে না আপনার সবকিছুতেই চুমু খাবো। আর যদি না পারি, তাহলে আপনি আমার গাল টেনে ছিড়ে দিন।”
কথাটা বলে ফারাজ ভ্রু উঁচিয়ে তাকায়।
তিতলি হতভম্ব বিস্মিত নয়নে তড়াক চোখে তাকায়। কি বললো? এটা কেমন শাস্তি? সে বলবে আপনি আমার গাল টেনে ছিড়ে দিন। আমি ঠোঁটে চুমু খাবো। লজ্জায় লাল হয়ে গেলো ফারাজের কথা শুনে। ওদিকে ফারাজ এখনো তার গাল টেনে ধরে। তবে এখন একটু হাতের জোর কমিয়েছে। তবে ব্যাথা তো আর চলে যায় না। তিতলির নরম গালে স্পষ্ট দাগ বসেছে আঙুলের, লাললাল হয়ে গেছে ফর্সা গাল।
ফারাজ আবার তিতলিকে ভয় দেখিয়ে বলল,
“আজকে তোমার গাল ছিড়ে আমার হাতে আসবে নয়তো, তোমার ঠোঁট আমার ঠোঁটে আসবে দুইটা অপশন আছে তোমার কাছে? কোনটা বলো?
আম ওয়াটিং!”
তিতলি ভ্রু কুঁচকে বিড়বিড় করে বলে,
” বুড়ো লোক! ভাল্লুক কোথাকার একটা।”
মুহূর্তেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল ফারাজ। অতি কাছে থাকায় স্পষ্ট কানে পৌঁছালো তিতলির বলা সম্পূর্ণ কথা। কপালটা ভীষণ ভাবে কুঁচকে রেখে শক্ত গলায় বললো,
“হোয়াট দ্যা হেল! স্টুপিড! কি বললে তুমি? আমি বুড়ো হয়ে গেছি? ওয়েট! জাস্ট ওয়েট! কোনদিক দিয়ে আমি বুড়ো হয়ে গেছি, এক্ষুনি তার প্রমাণ দাও। আজকে প্রমাণ দিতে না পারলে খবর আছে তোমার।”
ফারাজ শার্টের বোতামে হাত দিয়েছে। আজকে পিচ্চি বউকে দেখাবে তাকে ঠিক কোনদিক দিয়ে বুড়ো লাগে।
তিতলি শুকনো ঢোক গিলল। ইসস রে শুনে গেলো কথাটা। কান লম্বা বেশি তাই শুনেছে। তাও ভয় পেলো না সামনে থাকা রুঢ় মানবকে। মানে গাল ছেড়ে দিয়েছে বলে সাহস বেড়ে গিয়েছে।
মেকি হেসে বলল,
“এ বয়সে এসেও আপনার কথার মাঝে এত তেজ কেন? হুহ!”
ফারাজের রাগ তরতর করে বাড়ছে। তাও নিজেকে শান্ত করে রেখেছে সে ভীষণ। কত বড় স্পর্ধা সে বুড়ো হয়ে গেছে।
“এ বয়স মানে? আমার বয়স কত জানো তুমি?”
“জানি তো ৪০ বছরের বুড়ো।
ফারাজ পরনের শার্টের সবগুলো বোতাম খুলে ফেলেছে। সাদা শার্টটা দুপাশ থেকে হা হয়ে ওর সুঠাম শক্তপোক্ত বুক উন্মক্ত। সেখানে ছয়টি শক্ত ফোলা ফোলা ভাঁজ স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। তিতলি চোরাচোখে তাকাতেই ফারাজ বাঁকা হেসে প্যান্টের বেল্টেও হাত দিলো।
তিতলির প্রাণ যায় যায় অবস্থা। কেন যে ভাল্লুককে রাগিয়ে দিতে গেলো। এখন কি করবে সে? এই লোক প্যান্ট খুলতে চাইছে কেন? আসতাগফিরুল্লাহ! তিতলি ভয়ার্ত গলায় শুধালো,
“কি..কি করছেন?”
ঠোঁট কামড়ে হাসল ফারাজ। বুড়ো বলার শাস্তিটা আপাতত পেন্ডিং-এ রেখেছে। গ্রীবাটা সামান্য ঝুঁকিয়ে এনে মুখ নামালো মেয়েটার কানের কাছে। ধীরলয়ে ফিসফিসিয়ে আওড়াল,
“তোমার সাথে আমার কি কথা ছিলো হুমম? ঠোঁটে চুমু দিবে নাকি গাল টেনে ছিড়ে দিবো। ডিপেন্ডস অন ইউ! আমি ক্রেভিং হচ্ছি!”
তিতলি কোনোমতে জিভ দিয়ে অধর ভিজিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,
আর বলব না বিশ্বাস করুন। আমি চ..চলে যায় হে….চ…”
ফারাজ আর তিতলির তোতলানো শোনার অপেক্ষা করলো না, তার আগেই ধৈর্য হারা হয়ে তরিৎ গতিতে অধর ডোবালো তিতলির ওষ্ঠাধরের ভাঁজে।আচমকা আ ক্র ম ণে তিতলি থরথর করে কেঁপে ফের দেওয়ালে মিশে গেল। চোখজোড়া শক্ত করে বুঝে গিয়েছে। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। কাঁপতে থাকা শরীরে স্পষ্ট ফারাজের বেসামাল স্পর্শ অনুভব করছে। ফারাজ একহাতে তিতলির হিজাব খোলার চেষ্টা করছে। তিতলি ছটফট করে সরতে চাইলেও পারছেনা।
তিতলির ঠোঁটে একের পর এক গাঢ় চুমু একে দিতে দিতে থাকে। শুধু তাই নয়, নিজের রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে তিতলির ঠোঁটে ধারালো দাঁতের রুষ্ট চাপে কয়টা কামড়ও বসিয়েছে। তিতলি ব্যাথায় নড়েচড়ে উঠতেই ফারাজ ঠোঁট একটু উপরে তুলে অস্পষ্ট সুরে আওড়ালো,
“উমমম! ডিস্টার্ব কোরো না।”
ধৈর্য হারা ভঙ্গিতে রাগের বশে ঠোঁটে ঠোঁট মিলেছে ঠিকই তবে এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। নে শা য় হারিয়ে গিয়েছে ফারাজ। তিতলিও প্রথমে ভয়ে মরে গেলেও পরে নিশ্বাস বন্ধ রেখে অনুভব করেছে অনুভূতিটা। দুজনের কাছেই এই অনুভূতি নতুন।
ফারাজ শান্ত হয়েছে খুব সময় নিয়ে। তবে এখনো ঘনঘন শ্বাস ফেলছে। তার নেওয়া একেকটি শ্বাসপ্রশ্বাস তিতলির ঠোঁটে পড়ছে। তিতলি খনেখনে কেঁপে উঠছে এখনো। সময় নিয়ে মাথা ঘুরিয়ে নিয়েছে। চোখের দৃষ্টি নিচে। ভুলবসতও ফিরে তাকাচ্ছে না। ফারাজ বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে নিজের ঠোঁট মুছে নিয়ে ডান হাতে তিতলির দু’গাল চেপে ধরেছে। মুখ নিজের দিকে ফিরিয়ে এনেছে। তার কন্ঠের স্বর আঁধার রাতের থেকেও গভীর, ‘
মুড চেঞ্জ হয়ে গেছে। তাই এখন বেঁচে গেলে। বাই দ্যা ওয়ে, এখনো বুড়ো বলার শাস্তি দেওয়া হয়নি। সেটা রাতে বিছানায় গেলেই বুঝে নেবো। মাইন্ড ইট!
বাড়িতে আসার পর থেকে আর লজ্জায় ফারাজের চোখে চোখ রাখতে পারে নি। রুমেও থাকেনি আর। ফারিন বেগম তখন থেকে পুত্রবধুকে জিজ্ঞেস করছেন,
“তোমার গাল এত লাল হয়ে আছে কেন তিতলি?”
তিতলি কি উত্তর দিবে বুঝতে পারছে না। সে কিভাবে বলবে আপনার গুনধর ছেলে আমার গাল টেনে লাল করে দিয়েছে। আয়নায় দাঁড়িয়ে নিজের গাল দেখে কিছুক্ষণ আফসোসও করেছে। ফারাজকে সিঁড়ি নামতে দেখা গেলো। ফারিন বেগম আর তিতলি সোফায় বসে আছে। তিতলি ফারাজকে দেখে না দেখার ভান করে বলল,
“মশা কামড়ে দিয়েছে আম্মু। কলেজে অনেক মশা শুধু কামড়ে দেয়।”
ফারিন বেগম তিতলির মুখে তাকিয়ে থেকে বলল,
“কিন্তু এটা তো মশার কামড়ের মতো লাগছে না।”
তিতলি ফারাজের পায়ের শব্দ নিজেদের সামনে দিয়ে যাচ্ছে দেখতেই আওয়াজ করে বলল,
“আরে ডেঙ্গু মশা। তাই গাল লাল হয়ে গিয়েছে আম্মু।”
তিতলি ফারাজকে ডেঙ্গু মশা বানিয়ে দিয়েছে। এখন শান্তি লাগতেছে। ফারাজ তখন তাদের সামনে দিয়ে যাচ্ছে। তিতলির কথা শুনে একটু থেমে যেতে দেখা গিয়েছে তাকে।
ফারিন বেগম ছেলেকে বললেন,
“কী রে কোথায় যাচ্ছিস?”
“বাইরে।”
“তোরা দু ভাই কি শুরু করছিস বলতো? একটা তো একমাস ধরে কানাডা গিয়ে বসে আছে। এখন তুইও সারাদিন বাইরে বাইরে কি করিস? সবে তো দুপুরের ভাত খেলি।”
ফারাজ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল এবার। দৃষ্টি গিয়ে পড়েছে তিতলির উপর। দুজনের চোখাচোখি হলে। তিতলি চোখ নামিয়ে নিতেই ফারাজ গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“কাজ আছে আর্জেন্ট!” বলে বেরিয়ে গেলো।
তিতলি মুখ ভেংচি কাটে। গেলে তারই তো ভালো একটু রুমে যেতে পারবে।
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে।
নাছিমা বেগম এখনো যায়নি। সেদিন ফারিন বেগমের কাছে মাফ চেয়েছে। আর কখনো এমন ভুল করবে না। ফারাজের কাছেও মাফ চেয়েছে কিন্তু ফারাজ তিতলির কাছে মাফ চাইতে বলেছে। এখনো ভদ্রমহিলা ঠিক হয়নি। উপরে সুন্দর ভেতরে কুৎসিত মন নিয়ে হাঁটছেন। কখন একটু সুযোগ পাবেন। ছেলেকেও আসতে বলেছেন। এখন বসে বসে মেয়েকে বুঝাচ্ছেন,
“আজকে যা দেখলাম মনে হয় ফারাজ ওই মেয়েকে থাপ্পড় দিয়েছে। গালটা একদম লাল হয়ে ছিলো দুপুরে।”
“তো আমি কি করবো আম্মু?”
“তুই কি করবি মানে? আজকে থেকে প্রতিদিন ফারাজ কলেজ থেকে আসলে লেবুর সরবত নিয়ে ওর রুমে যাবি।”
নীলা ভীত মুখে বলল,
“আমি পারব না আম্মু। ফারাজ ভাইয়াকে আমার ভয় লাগে।”
“ভয়ডর সব ভুলে যা। আমি যেটা বলছি সেটাই করবি।”
নীলা উঠে চলে গেলো। তার মা কি চাইছে আসলে? তাকে একটা বিবাহিত ছেলের পেছনে থাকতে বেন বলছে? ভাবনায় রয়ে গেলো।
পরেরদিন। আজকে ঝিলিককে দেখতে এসেছে শেখ বাড়ির সবাই। এতক্ষণে প্রায় সবকথা পাকাপোক্ত হয়ে গিয়েছে। রিং পরানো শেষে ঝিলিক আর তুষার এসেছে ছাদে। ঝিলিক একটা মেরুন রঙা কারুকাজ করা জামদানি শাড়ি পড়েছে। মুখে সাজ জুয়েলারি সব মিলিয়ে অপ্সরী লাগছে। তুষার যেন আজ চোখ ফিরাতে পারে না আর তার রমণীর উপর থেকে। দুজন রেলিং ঘেষে দাঁড়িয়ে। অনেকক্ষণ পর তুষার নীরবতা ভেঙে বলল,
“যেদিন থেকে ভেবেছি আপনাকে আমার চাই। সেদিন থেকেই মনেমনে ভেবে নিয়েছি বিয়ে করলে আপনাকেই করবো। কি কথা রাখলাম তো?”
বলে তুষার ঝিলিককে নিজের দিকে ঘুরিয়ে আনল। কপালে ছোট করে চুমু খেল। ঝিলিকের শরীরে অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেলো। সে নিচু সুরে বলল,
“আমাকে এত ভালো লাগার কারণ কি?”
“উঁহু! অনেক কারণ আছে। পুরো কারণ আপনাকে ঘিরেই। আপনার মুখ না দেখলে ঘুম হবে না। কন্ঠ না শুনলে তৃষ্ণা মিটবে না। আরো অনেক কারণ আছে সেগুলো পরে শুনাবো।”
“আপনাকে অনেক ভালো তুষার ভাই। আমি কখনো ভাবিনি আপনি আমাকে এত ভালোবাসবেন।”
তুষার চোখ পাকিয়ে তাকাল। রাগ দেখিয়ে বলল,
“এই আমি তোমার ভাই লাগি? এখন তোমার হবু হাজবেন্ড! পরেরবার যেন এই ভুল আর না হয়।”
ঝিলিক কানের পিঠে চুল গুঁজে বলল
রাগে অনুরাগে পর্ব ৩৭ (২)
“মুখ দিয়ে বের হয়ে যায়।”
তুষার ঝিলিককে কাছে টেনে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আচ্ছা! মুখ দিয়ে যাতে বের না হয় সে ব্যবস্থা করতে হবে তো। শুধু বিয়েটা হোক তারপর আপনার মুখ দিয়ে বের হওয়া বন্ধ করবো।”
