Home রাগে অনুরাগে রাগে অনুরাগে পর্ব ৩৭ (২)

রাগে অনুরাগে পর্ব ৩৭ (২)

রাগে অনুরাগে পর্ব ৩৭ (২)
সুহাসিনি ফাতেহা

“মনে হয় প্রেগন্যান্ট হয়ে গেছে ভালোই হয়ছে ডাইনী মহিলা। এবার বড় পেট নিয়ে ঘুরবে।”
তিতলি মনেমনে কথাটা বলে না খেয়ে নাছিমা বেগমের দিকে তাকিয়ে আছে। সেখানে ফারিন বেগম আর নীলা, নাছিমা বেগমের মাথায়, পিঠে হাত দিয়ে মালিশ করছেন। নীলা কেঁদে দিয়েছে প্রায় মায়ের এমন অবস্থা দেখে। নাছিমা বেগমের মুখ একদম দেখার মতো হয়ে গিয়েছে। গা থরথর করে কাঁপছে ভয়ে। মুখে ঘনঘন ঘাম জমতেছে। মাথায় একটাই ভাবনা ঘুরছে, ওই প্লেট টা তো তিতলির জন্য রেখেছে তাহলে? তাহলে কে করলো এটা? ফারাজ করলো না তো? ফারাজ জানলে তো এতক্ষণে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়ার কথা। এখনো কিছু না বলে চুপ রয়েছে কীভাবে? না না আর ভাবতে পারছেন না নাছিমা বেগম।
নীলা উদ্বিগ্ন কন্ঠে মাকে বলল,

“হঠাৎ কি হলো আম্মু? বমি করছো কেন?”
নাছিমা বেগম নিজের মধ্যে নেই। চোখ মুখ উল্টে ফেলে বললেন,
“জানি না রে জানিনা। গলা দিয়ে মাছের বড় কাটা আটকে গেছে।”
ফারিন বেগম বোনকে বললেন,
“দেখে খাবি না। এখন এই কাটা কেমনে বাহির করবি? তিনবার বমি করেও তো বের হচ্ছে না।”
নাছিমা বেগমের কথার মাঝেই ফারাজ শব্দ করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। যেন চেয়ারের উপর সমস্ত রাগ ঝাড়ছে। খালাকে এখন গলা ধরে উপরে ঝুলিয়ে রাখতে ইচ্ছে করছে। কতবড় স্পর্ধা। তার বাড়ি থেকে আবার তার বউয়ের ক্ষতি করার চেষ্টা করছে। এর শেষ সে তো দেখেই ছাড়বে।
চেয়ারের এমন শব্দে তিতলি কেঁপে উঠে চোখের দৃষ্টি ঘুরিয়ে আড়চোখে ফারাজের দিকে তাকালো। ফারাজের অভিব্যক্তি কঠিন। চিবুক শক্ত। চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। সে গলার শব্দ উঁচু করে তিতলির উদ্দেশ্য ধমকের স্বরে বলল,

“না খেয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছো কেন?”
“দেখছি খালামনিকে।”
“আশেপাশে যাই হয়ে যাক সেদিকে নজর না দেওয়া-ই তোমার জন্য ভালো। খেয়ে সোজা রুমে আসো।
ফারাজের কথাটা ড্রয়িংরুমের সবাই শুনলো। নাছিমা বেগম ঢোক গিলছেন ভয়ে। ওষুধ টাতে অতিরিক্ত প্যানিক ছিলো। যে খাবেই খাক কয়দিন ওয়াশরুমে যাবে আর আসবে। সাথে কোনোদিন বাচ্চা না হওয়ার মেডিসিন মেখে দিয়েছিলেন।
তিতলি আমতাআমতা করে ফারাজকে আস্তে করে বলল,
“ইয়ে মানে আসলে খালামনি কি প্রেগন্যান্ট?
দেখুন বুড়ো বয়সে এসে প্রেগন্যান্ট হয়ে গেছে ..
ফারাজ চোখ ছোট করে তাকাতেই তিতলির বকবক করা ঠোঁটদুটো থেমে যায়। ফারাজের চোখের দৃষ্টি স্থির হয়। আশ্চর্য! পিচ্চি বউকে ইদানীং তার এত ভালো লেগে যাচ্ছে কেন?
কারণে-অকারণে সারাক্ষণ জ্বালাতে মন চাই। দুচোখের সামনে বসিয়ে রেখে মেয়েটার সব বাচ্চামো সহ্য করার ধৈর্য বাড়ছে। এত ধৈর্যশীল পুরুষ সে হলো কবে? তিতলি বেঘোরে দাঁত কেলিয়ে বলল,

“প্রেগন্যান্ট হলেই তো খাওয়ার সময় বমি করে তাই না….”
ফারাজ চোখ রাঙিয়ে তিতলিকে থামিয়ে দিয়ে গম্ভীর সুরে বলল,
“আমি এখানে দাঁড়িয়ে থাকবো যতক্ষণ না তুমি প্লেটের সব ভাত খেয়েছ। চুপচাপ খাওয়া শেষ করো।”
তিতলি মুখ ভেংচি কাটল। রুমে গেলে তখন শুধু কাছে আসো, কাছে আসো বলে ডাকবে। আর এখন বিশুদ্ধ পুরুষ সাজতেছে। সহসা একটা আবদার করে বসে সপ্তদশী,
“আপনি খাইয়ে দিন!”
ফারাজ কিছু বলেনা। বউ এভাবে তার কাছে আবদার করেছে খাইয়ে দিলে তাতে মন্দ কি? গভীর দুষ্টিতে তিতলির মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে আবার চেয়ার টেনে বসল। প্লেট টেনে এনে তিতলিকে খাইয়ে দিতে শুরু করলো।
তিতলি মুখটা উজ্জল হয়ে গেলো। সে তো এসবই চাই ফারাজ তাকে এভাবে সবসময় খাইয়ে দিবে।
তার কেয়ার করবে। শাসন করবে। অনেক বেশি ভালেবাসবে। কিন্তু আফসোস তাকে ভালোবাসি বলেনা। এজন্য সপ্তদশীর দুঃখে রীতিমত দুঃখবোধের শেষ নেই। মুখ ফস্কে বলে বসল,

“আপনি আমাকে এভাবে সবসময় খাইয়ে দিলে আমি নাস্তা, ভাত,চা মুড়ি,ব্রেড,তিতা করলা, লতাপাতা যা দিবেন সব খাবো।”
সহসা ধারালো দাঁতের স্পর্শে নিচের অধর কামড়ে ধরল ফারাজ। বা হাতে প্লেট সাইডে রাখল। গম্ভীর মুখখানায় আচমকা শ্লেষাত্মক ভাবভঙ্গি ধরে রেখে মুখ নামালো মেয়েটার কানের কাছে। অতঃপর ফিসফিস করে আওড়াল,
“চাইলে আমাকেও তো টেস্ট করতে পারো। এতে কিন্তু অটোমেটিক মোটা হওয়ার চান্স বেশি।”
কপাল গোছালো তিতলি। মুখাবয়বে হতভম্বতার রেশ ধরে আচানক মুখ তুলে শুধালো,
“আপনাকে টেস্ট করবো মানে ?”
ফারাজ ভ্রু উঁচিয়ে হাসল,
“ইউ ডোন্ট নো দ্যাট! পুরুষ মানুষের ঠিক….”
“সরুন। আম্মু এদিকে তাকাবে।”

ফারাজ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো।
ফারিন বেগম বেসিনের দিক থেকে এদিকে তাকালেন। ততক্ষণে ফারাজ নিজেকে সরিয়ে এনেছে। তাই কানের কাছে মুখ নেওয়া ওসব দৃশ্য দেখতে পায়নি। ফারাজের ভাব-ভঙ্গিমা এমন যেন কিছুই হয়নি। ফারিন বেগম ছেলের উদ্দেশ্য বললেন,
“ডাক্তারের কাছে ফোন দে তো ফারাজ। তোর খালার বমি তো থামতেছে না। গলায় নাকি মাছের বড় কাটা আটকে গেছে।”
ফারাজ তিতলিকে প্লেটের সব ভাত খাইয়ে দিয়েছে সবে। তিতলি শাশুড়ির দিকে তাকাল। ফারাজের বলতে ইচ্ছে করল, গলায় কিছু আটকায় নি সব ওনার কুকর্মের ফল।
আবার ঘাড় ঘুরিয়ে বাঁকা চোখে তাকালো অদূরে খালার দিকে। ভদ্রমহিলার মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছেনা। ফারাজ বিদ্রুপ কন্ঠে বলল,

“ডাক্তার ডাকার প্রয়োজন নেই। প্লেটের যে ভাতগুলো এখনো শেষ করতে পারেনি সেগুলো পুনরায় খেতে বলো তাহলে বমি আরও করতে করতে একসময় বন্ধ হয়ে যাবে।”
নাছিমা বেগম হঠাৎ বেসিনের দিক থেকে উঠে দৌড় দিলেন। অনেক বেশি পেটে চাপ দিয়েছে। না গেলেই যেন নয়।
ফারিন বেগম বললেন,
“কী রে এভাবে দৌড় দিচ্ছিস কেন? ভাত তো খেতেই পারিস নি। খেয়ে নে।”
নীলাও মায়ের পেছন পেছন চলে গিয়েছে। হুশিয়ার সাহেব আর ছকিনা খাতুন টাঙ্গাইল চলে গিয়েছেন দুদিন হলো। যাওয়ার আগে নাতিকে বলে গিয়েছেন,
“দুইমাসের ভেতরে খুশির খবর না দিতে পারলে তুই আর হুশিয়ার সাহেবের নাতি না? খুশির খবর দিয়া প্রমাণ করে দিস তুই যে আসলেই হুশিয়ার সাহেবের নাতি।”
নাছিমা বেগমেরা চলে যেতেই ফারাজ তার মাকে সতর্কতার বানী ছুড়ে দিলো।,

“তোমার বোনকে সাবধান করে দাও আম্মু। আর যত দ্রুত পারো বিদায় করো। আজকের মতো কোনো ঘটনা যদি আমি আর টের পায়, আই সোয়ার, সম্পর্কে আমার তোমার বোন বলে কিছু হয় সেটা ভুলে যাবো আমি। মাইন্ড ইট!
ফারিন বেগম তাজ্জব বনে গেলেন যেন ছেলের কথা শুনে। আজকের মতো কিসের কথা বলছে? নাছিমা আড়ালে কোনো ঝামেলা করেনি তো?
বোনটা কেন এমন করছে ফারিন বেগম বুঝতে পারছেন না। তিনি ছেলেকে বললেন,
“কি করেছে? আমাকে বল বাপ। তোর খালা কি করেছে? আমি দেখছি ব্যাপার টা তুই ঝামেলা করিস না।”
নাছিমা বেগম যে রুমে থাকে সে রুম ড্রয়িংরুমের পাশেই। নিচের ঘর গুলোতে থাকে। ফারাজ গলার স্বর উঁচু করে নাছিমা বেগম শুনবেন তেমন খিটখিটে মেজাজে একপ্রকার হুমকি দিয়ে বলল,
“কি করেছে সেটা তোমার বোনকে গিয়ে জিজ্ঞেস করো আম্মু। আমি লাস্ট ওয়ার্নিং দিলাম ওই মহিলাকে। তাকে জানাও পরেরবার এমন কিছু দেখবো জাস্ট গলা আছে না গলা ধরে উপরে তুলবো আর বুদ্ধিহীন মাথাটা আলাদা করে নদীতে ভাসিয়ে দিবো।”

নাছিমি বেগম রুমে বসে এসব শুনে অজ্ঞান হওয়ার পথে। নিজের গলা চেপে ধরেছেন। ইন্নালিল্লাহ!
ফারাজ থেমে নেই। আবার শক্ত গলায় শুনিয়ে শুনিয়ে বলল,
“সাহস থাকলে আমার সামনে এসে দাঁড়াতে বলো ওই মহিলাকে। কলিজাটা মেপে দেখবো ঠিক কোন সাহসে আমার বউয়ের ক্ষতি করার চেষ্টা করছে।”
কথাটা বলেই আকাশসম রাগ নিয়ে ফারাজ তিতলিকে একাহাতে বগলদাবা করে ধুপধাপ পা ফেলে সিঁড়ি বেয়ে চলে গেলো। ফারিন বেগম আর হতভম্ব হয়ে গেলেন ফারাজের কথা শুনে। যা বুঝার বুঝে গেলেন। নিশ্চিত নাছিমা কোনো কিছু করেছে যেটা ফারাজ দেখেছে। এবার কিছু না করলেই নয়।

আজকে রবিবার। তিতলি কলেজে এসেছে প্রায় কয়টা দিন পর। তিতলি নিধি প্রিমা স্মৃতি ওদের সাথে বসে আছে আমতালায়। এতদিন পর বান্ধুবিদের কাছে পেয়ে খুব ভালো লাগছে তার। প্রিমা তিতলিকে মজা করে বলল,
“কী রে? স্যার কি তোর সাথে এখনো তোর সাথে ইটিসপিটিস কিছু করেনি?”
তিতলি লজ্জায় মরিমরি। নিধির পিঠে থাপড়ে দিয়ে বলল,
“এই তোরা এসব কি বলিস?”
প্রিমা তিতলিকে আরো ক্ষেপিয়ে দিতে বলল,
“আরে ব্যাটা নারী আর পুরুষ হলো চুম্বক। দুলাভাই যদি এখনো তোকে কিছু না করে থাকে তাহলে দুলাভাইয়ের সিস্টেমে গন্ডগোল আছে বুঝলি।”
তিতলি রেগে গিয়ে বলল,

“খবরদার। তোদের সবার মাঝে গন্ডগোল আছে।”
নিধি কিছু একটা মনে করে তিতলিকে বলল,
“শুনলাম তুষার ভাইয়া নাকি ঝিলিক আপুকে বিয়ে করবে।”
“হে। কালকে রিং পরিয়ে আসবে।”
নিধি ছোট করে বলল,
“ওহ।”

আরিফ স্যারের ক্লাসে জীব বিজ্ঞান ঘন্টা করার সময় ফারাজ তিতলিকে নিজের ল্যাবে নিয়ে এসেছে। তিতলি এখন ফারাজের সামনে চেয়ার টেনে বসে। টেবিলে জীববিজ্ঞান বই। ফারাজ ভ্রু কুঁচকে শক্ত কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়লো,
“আরিফ স্যার কি পড়াচ্ছিলো যেন? সব খুলে বলো। আ’ম ওয়াটিং।”
তিতলি কি করবে কিছুই,ভেবে পাচ্ছেনা।
ফারাজ তাকে সবার সামনে ঢেকে এখানে নিয়ে এসেছে। ঠিকমতো ক্লাসও করতে দিবে না নাকি তাকে? সহজ সরল স্বীকারোক্তি দিলো,

রাগে অনুরাগে পর্ব ৩৭ 

“সেক্স ক্রোমোজোম, XX,YX, শুক্রাণু ডিম্বানু এসব। এবার ক্লাস করতে যেতে দিবেন?”
ফারাজের অভিব্যক্তি একটুও বদলাল না। নাক কুঁচকে মৃদু গলায় বলল,
“এই ক্লাস অন্য স্যারের কাছে করার প্রয়োজন নেই।আমি এতবড় সাইন্সের টিচার হয়ে তোমাকে সাইন্সের সাবজেক্ট অন্য টিচারের কাছে পড়তে দেওয়ার প্রশ্নই উঠেনা। এ সাবজেক্ট তো না।
কজ এসব বিষয়ে তোমার হাজবেন্ড খুবই এক্সপার্ট।”

রাগে অনুরাগে পর্ব ৩৮