Home মেজর কারদার মেজর কারদার পর্ব ৩৩

মেজর কারদার পর্ব ৩৩

মেজর কারদার পর্ব ৩৩
ফিনারা ঝুমুর

ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে ডাক নিঝুম রাতটাকে আরও গম্ভীর করে তুলেছে। আকাশে মেঘের আড়ালে লুকোচুরি খেলা নিশাচর চাঁদটা যেন বাতাসের তোড়ে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলেছে।
​সেই রূপালী চাঁদের আলো এসে আছড়ে পড়ছে নিভৃত এক জরাজীর্ণ ওয়্যারহাউজের ওপর। হাতে অস্ত্র আর লাঠি উঁচিয়ে কালচে অন্ধকারের ভেতর এখানে-সেখানে সন্দেহজনকভাবে পাহারা দিচ্ছে কতক লোক।
​স্থানটি বাংলাদেশের বান্দরবান সীমানার একেবারে সন্নিকটে অবস্থিত ঘুমধুম। এই দুর্গম সংযোগস্থল দিয়ে সোজা মিয়ানমারের সীমান্ত অতিক্রম করা যায়। সেই ঘুমধুমেরই এক পরিত্যক্ত, স্যাঁতসেঁতে পুরনো ওয়্যারহাউজে আস্তানা গেড়েছে পাচারকারী চক্রের ওই অসাধু লোকগুলো।

​“বস এখনও পৌঁছায় নাই কেন রে?”
​“কী জানি! বর্ডার পার হওয়ার রাস্তায় কোনো বিপদ-আপদ হলো না তো আবার?”
​ছেঁড়া, রংচটা শার্ট আর হাঁটুর ওপরে লুঙ্গি পরা দশ-বারোজন সশস্ত্র লোকের মাঝে ফিসফিস করে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল। পুরু ঘন গোঁফের আড়ালে লুকিয়ে আছে ওদের ধারালো বিষাক্ত মুখ। কালকুটের ন্যায় কুচকুচে কালো তাদের গায়ের রঙ, আর হিংস্র চোখগুলো লাল হয়ে আছে পানের রসে কিংবা মাদকের প্রভাবে। গলায় ও হাতে রূপালী মোটা চেইন, কবজিতে রূপালী চুড়ির মতো ব্রেসলেট আর কোমর শক্ত করে বাঁধা লাল গামছা। একেকজন যেন সাক্ষাৎ সন্ত্রাসের মূর্ত প্রতীক!
​“শোন, একটু পর এই গোপন পথ দিয়ে চার-চারটা বিশাল ট্রাক ঢুকবে আজ। সবাই চোখ-কান খোলা রেখে সাবধানে থাকিস!”
​ঠিক তখনই দূরের গহীন অন্ধকার চিরে হালকা ট্রাকের হর্নের বিকট শব্দ ভেসে এলো। আবছা অন্ধকারের বুক চিরে কাদা-মাটিতে এসে পড়ল হেডলাইটের হলদেটে আলোর রেখা। দেখতে দেখতে দূরত্ব কমে এলো, কাছে চলে এলো ভারী যানবাহনের বহর।

​“কী হইলো ড্রাইভার সাব? হুট কইরা মাঝপথে গাড়ি থামাইয়া দিলেন ক্যান?”
​ঘাট থেকে আসা ধুমসে বিশাল গড়নের মূল ড্রাইভারের মুখ একরাশ বিরক্তিতে থমথমে। একগাল ভর্তি জর্দা-পান চিবোতে চিবোতে পাশে থাকা লোকটিকে কড়া গলায় বলল,
​“কইবার পারতাছি না, কবির! তুই একটু গাড়ি থাইকা নাইম্মা দেখ তো যে চাকা ফাঁটলো নাকি ঠিক আছে!”
​হেলপার গোছের ছোকরা কবির ধুপ করে ট্রাক থেকে নিচে লাফিয়ে নেমে পড়ল। হাঁটু গেড়ে বসে গভীর মনোযোগে চাকা পরখ করে আচমকা উচ্চস্বরে চেঁচিয়ে উঠল,
​“ও ড্রাইভার সাব! চাকার সব হাওয়া তো নিমেষে একবারে নাই হয়ে গেছে গা! চাকা দেইখা মন কইতাছে বিষাক্ত বড় পেরেকে গাড়ি পড়ে গেছে!”
​“কী কস তুই, কাবিরা? বলিস কী রে ভাই? দাঁড়িয়ে না থেকে
বাকি ট্রাকগুলোর চাকাও চটপট পরখ করে দেখ তো!”
​“যাইতাছি!”

​কবির তড়িঘড়ি করে পেছনের বাকি তিনটি বিশাল ট্রাকের চাকায় হাত দিয়ে দেখল। ওগুলোরও চাকা একবারে পাংচার হয়ে বসে আছে।
​“ড্রাইভার সাব! এইডিও যে হাওয়া নাই হয়ে পুরো মাটিতে শুয়ে গেছে গা!”
​ঘটনা বেগতিক দেখে একে একে চার ট্রাকের চারজন ড্রাইভার ও সাহায্যকারীরা নিচে নেমে এলো। মাঝরাস্তায় ট্রাকের এমন বেহাল দশা দেখে রাগে-ক্ষোভে একবারে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল মূল ড্রাইভার,
​“মাদারচো*! কোন বা* এর বাচ্চা এনে রাস্তার মাঝখানে পেরেক আর কাঁটা বিছায়া রাখছে, হ্যাঁ?”
​ঠিক তখনই কাছকাছি জঙ্গল থেকে কতগুলো ভারী দুইপেয়ে মানুষের নিঃশব্দ পদশব্দ ভেসে এলো। মুহূর্তে কান খাড়া হয়ে গেল পুরো পাচারকারী দলের। অন্ধকারে আবছা অবয়ব দেখে অচেনা একজন হাঁক ছাড়ল,

​“বস, আন্নেরা আইয়া পড়ছেন নাকি?”
ড্রাইভার সন্দেহের চোখে আবছায় তাকিয়ে রয়। ভারি গলায় জিজ্ঞাসা করে,
​“কেডা তোরা? এখানে কী করতাছিস?”
​“আরেহ, মন্দার বসের লোক আমরা! ওনার হইয়াই তো এত রাতে এই মালামালের কাম করতে নামছি!”
​’মন্দার’ নামটা শোনামাত্রই ড্রাইভার আর তার লোকজনের কুঞ্চিত কপালে জমে থাকা ভাজ শান্ত হলো। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
​“চাকা দ্রুত ঠিক করবার পারবি তোরা?”
​“হ, নিমেষে পারি!”
​“তাইলে আর দেরি না কইরা কাজ শুরু কর!”
​ড্রাইভারের কথায় অন্ধকারের লোকগুলো দ্রুত চাকার কাছে
গিয়ে কাজ শুরু করল। হঠাৎ করে ড্রাইভারের পেছনের ঘাড়ের রগে কিসের যেন এক প্রচণ্ড বরফশীতল চাপ পড়ল! খটকা লেগে পেছনে তাকাতেই দেখে এতক্ষণ ধরে হেলপার সেজে থাকা কবিরের দুটো চোখ জ্বলজ্বল করে ওর দিকে হিংস্রভাবে তাকিয়ে আছে!

​“কব—কবিরা? তুই এমন কইরা”
​“কবির নয়—মেজর কারদার!”
​ড্রাইভারের চোখ জোড়া এক লহমায় ভয়ে ছানাবড়া হয়ে কপালে উঠে গেল! আছড়ে পড়া আতঙ্ক সামলে কিছু বলার বা চিৎকার করার আগেই, শীর্ষ তার হাতের লোডেড ভারী বন্দুকের পেছনের বাট দিয়ে সজোরে রগে এক মোচড় আর মাথার পেছনে কষে এক বাড়ি মারল! এক নিমিষে নিস্তেজ হয়ে মুখে গ্যাঁজলা তুলে মাটিতে ধপাস করে লুটিয়ে পড়ল মূল ড্রাইভার।​হুট করে নিজেদের লোক আর ড্রাইভারকে মাটিতে ঢলে পড়তে দেখে বাকি পাচারকারী ড্রাইভাররা অস্ত্র উঁচিয়ে হেই হেই করে গর্জে উঠল,
​“হাল্লারপুত ডাবল ক্রস করছস? আইজ তোরে জ্যান্ত খাইছি!”
​মুহূর্তের মধ্যে পুরো দলটা ক্ষিপ্ত হয়ে শীর্ষকে চারিদিক থেকে হিংস্র পশুর মতো ঘিরে ধরল! আর ওদের উচ্চস্বরে চিৎকার আর গালিগালাজ শুনে অন্ধকারের ঝোপঝাড় আর ওয়্যারহাউজের ভেতর থেকে একদল রামদা, তলোয়ার ও কুড়াল হাতে হিংস্র গুন্ডা দৌড়ে বের হয়ে এলো! ​পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে দেখে শীর্ষ ছায়াসঙ্গীদের দিকে ঘুরে গর্জে উঠে হুকুম দিল,
​“গালিব, মুসা! ব্যাকআপ টিম নিয়ে দ্রুত ট্রাক চারটা সীমানা পার করে সেফ জোনে নিয়ে সরাও! মুভ, ফাস্ট–!”

​জাঁদরেল মেজরের আদেশ পেতেই গালিব আর মুসা এক মুহূর্তও দেরি করল না। আরও দুজন চৌকস সেনার সাহায্য নিয়ে ওরা চোখের পলকে অন্ধকারের সুযোগ কাজে লাগিয়ে পাচারকারীদের চোখে ধুলো দিয়ে ট্রাকগুলোকে সেখান থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিল।
​আর রামুর সীমান্ত সংলগ্ন সেই রক্তাক্ত অন্ধকার ওয়্যারহাউজের মাঠে পেছনে রয়ে গেল স্বয়ং মেজর শীর্ষ কারদার সহ তার সাথে থাকা মাত্র গুটি কতক বুলেটপ্রুফ সেনাদল!

ভোর হয়েছে অনেকক্ষণ। নতুন সকালের সোনাঝরা আলো এসে পড়েছে কারদার বাড়ির আঙিনায়, তবে সেই শান্ত আলোর বিপরীতে বাড়ির ভেতর চলছে চরম হুলুস্থুল কাণ্ড! কিঞ্জার বিয়ের কেনাকাটার জন্য আজ সবাইকে দ্রুত শপিংয়ে বের হতে হবে।
​“মিথু! জলদি রেডি হ তো, বোন! শপিংয়ে যেতে হবে, দেরি হয়ে যাচ্ছে!”
​“এই তো, আসছি!”
​হালকা গোলাপি রঙের সুতি পাল্ম কুর্তির ব্যাক ফিতে বাঁধতে বাঁধতে তাড়াহুড়ো করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসে মিথিলা। বসার ঘরে এসে দেখে মেঘ, রাহাত, আদর, নোমান, কিঞ্জা সবাই একবারে টিপটপ রেডি হয়ে সোফায় বসে ওর জন্যই অপেক্ষা করছে। মিথিলা একগাল মেকি হেসে দাঁত কেলিয়ে বলল,
​“ভীষণ সরি, বেহনা! একটু বেশিই দেরি হয়ে গেল রে–

​আদর হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে মহা বিরক্ত মুখে গজগজ করে উঠল,
​“একবারে হোপলেস লেটলতিফ একটা! এবার জ্ঞান না দিয়ে সোজা জলদি গাড়ির দিকে আয় তো!”
​সবাই একসাথে গল্প করতে করতে সদর গেটের দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু পুরো দলের মাঝে কেবল মেঘের মুখটা ভীষণ মনমরা ও থমথমে। সে বারবার নিজের মোবাইল স্ক্রিনের দিকে তাকাচ্ছে, কিন্তু সেখানে কাঙ্ক্ষিত কোনো নোটিফিকেশন বা কলের চিহ্ন নেই! গতকাল বিকেল থেকে মেজর সাহেব আর একটা কলও করেনি ওকে। কাল বিকেলের সেই সংক্ষিপ্ত কথোপকথনের পর থেকে মানুষটা যেন উধাও! একটাবারও নতুন করে যোগাযোগ করেনি। মনের ভেতর এক আজব আর অজানা অস্থিরতা দানা বাঁধছে মেঘের।
​হাঁটতে হাঁটতেই একটু সুযোগ বুঝে বড় ভাই নোমানের খুব কাছাকাছি এসে হালকা কানে ফিসফিস করে নিচু স্বরে জিজ্ঞাসা করল মেঘ,
​“আচ্ছা ভাইয়া— তোর সাথে কি ওনার কোনো কথা হয়েছে রে?”
​নোমান দুষ্টুমির ভঙ্গিতে নিজের একপাশের ভ্রু কিছুটা কুঁচকে নিষ্পাপ মুখে শুধাল,
​“কে ‘উনি’? স্পষ্ট করে বল তো, বোন?”
​কথাটা শুনে চরম লজ্জায় লাল হয়ে গেল মেঘের দুই গাল! ধুর! কী বলবে এখন? ভাইয়ার সামনে নাম ধরে ডাকবে লোকটাকে?

​“আহা! ওই যে তোর সেই জাঁদরেল বন্ধুটা!”
​“কিন্তু আমার তো অগুনতি বন্ধু রে মেঘ! ঠিক কোন বন্ধুর কথা বলছিস তুই?”
​নোমানের ঠোঁটের কোণে ফোটে কৌতুকপূর্ণ ও দুষ্টু এক চিলতে হাসি। মেঘ ভাইয়ের চালচাতুরি ধরে ফেলে লাজুক মুখে নোমানের চওড়া বাহুতে ধুপ করে একটা কিল বসিয়ে দিল,
​“একদম শয়তানি করবি না, ভাইয়া! সোজা বল না ওনার সাথে তোর আজ সকালের মধ্যে কোনো কথা হয়েছে কি না?”
​বোনের এমন ব্যাকুল ও বিষণ্ণ মুখশ্রী দেখে নোমান আর বেশি শয়তানি করার সাহস পেল না। এক মুহূর্তে গম্ভীর ও সিরিয়াস হয়ে মাথা নেড়ে বলল,

মেজর কারদার পর্ব ৩২

​“না রে, কাল বিকেলের পর থেকে ওর সাথে আমার আর কোনো যোগাযোগ বা কথা হয়নি।”
​কথাটা শোনামাত্রই মেঘের শুভ্র কপালে চিন্তার গাঢ় ভাঁজ এসে জমা হলো। লোকটা ভাইয়ার সাথেও কোনো যোগাযোগ রাখেনি! সীমানার দুর্গম পাহাড়ে কোনো বাজে বিপদ-আপদ ঘটেনি তো আবার? রামুর সেই ভয়ঙ্কর মিশনে মানুষটা আবার নিজেকে কোনো বিপদের মুখে ঠেলে দেয়নি তো?
​আশঙ্কায় বুকের ভেতরটা ছাঁৎ করে উঠল মেঘের। দু-হাত এক করে মনের গহীনে আকুল হয়ে ডেকে উঠল স্রষ্টাকে,
​“হে আল্লাহ! তুমি আমার বরকে রক্ষা করো। সকল বিপদ-আপদ থেকে লোকটাকে সহিসালামতে আমার কাছে ফিরিয়ে আনো!”

মেজর কারদার পর্ব ৩৪