Home মেজর কারদার মেজর কারদার পর্ব ৪৫

মেজর কারদার পর্ব ৪৫

মেজর কারদার পর্ব ৪৫
ফিনারা ঝুমুর

অম্বরের বিষাদময় গা হতে কালো মেঘের দল সরে গিয়ে অলৌকিকভাবে মুক্ত হয়েছে ধরণী। তপনের শুভ্র ও প্রখর রশ্মি যেন দিগন্তের মহাকাশ অনায়াসে অতিক্রম করে বিশ্বকূলে আপন আলোকময় জায়গা করে নিয়েছে। এই গোলক চ্যাপ্টা পৃথিবীর একাধারে নেমেছে শান্ত নিশুতি, তো অন্যধারে এক রাজকীয় ঝলমলে দিবসের রাজত্ব বিরাজ করছে। চন্দ্র আর সূর্যের এ যেন এক অদ্ভুত রহস্যময় সন্ধিবন্ধন!

​বিছানার নরম ও তুলতুলে গদিতে শরীর লেপ্টে পরম আরামে এলোমেলো হয়ে ঘুমাচ্ছে এক ষোড়শী শ্যামাঙ্গিনী মেঘ। কোমল বদনের ওপর শুভ্র একখানা মসৃণ ব্ল্যাঙ্কেট আলতো করে জায়গা করে রাখলেও, ওর বক্ষের উপরিভাগ চাদরের বাঁধন মুক্ত। জানলা চিরে আসা সোনালী রোদ্দুর তার প্রতিটি কিরণে কিরণে সতেজ আর উজ্জ্বলিত করছে মেঘের সেই সুকোমল শ্যামকায়া। উন্মুক্ত পা জোড়াও শুভ্র আলোয় স্পষ্ট দৃশ্যমান, কী ভীষণ চকচক করছে সেই মসৃণ ত্বক! জানলার পাতলা পর্দারা হু-হু হাওয়ার প্রচণ্ড দাপটে উড়ে উড়ে এক উন্মাদ পরিবেশের সৃষ্টি করেছে।
​ওয়াশরুমের কাঠের দরজায় পরম হেলান দিয়ে এই অপার্থিব দৃশ্যখানি নিরবে উপভোগ করছে মেজর শীর্ষ। তবে ওর গভীর কালো দু-চোখে যেন এক অচেনা ঈর্ষার আগুন খেলা করছে! নিজের প্রেয়সীর উন্মুক্ত শ্যামলা কায়ায় ভোরের মিঠে রোদ্দুরের এমন অবাধ ও বেলাজ খেলা সহ্য হচ্ছে না তার এক ফোঁটাও। রাগে নিজের মুখখানা একপাশে ভোঁতা করে চাপা কণ্ঠে বিড়বিড় করে বলে উঠল,
“সবে বউয়ের সাথে বাসর সারলাম, এখনই বউয়ের গায়ে এদের ছোঁয়া। উফফ! অসহ্য! আবার বাসর করবো। তোদের দেখিয়ে দেখিয়ে!”

মনে মনে মিঠে রোদ্দুর আর হাওয়াকে ইচ্ছেমতো বকতে বকতে, এক বিশাল দাপুটে হস্তে জানলার ভারী পর্দাসব চারিদিকে টান দিয়ে ছড়িয়ে দেয় শীর্ষ। তীব্র আলোকরশ্মিদের সটান ডেকে আনে পুরো কক্ষ জুড়ে।
​গায়ের ভেজা তোয়ালে সামলে পরম ত্রস্ত পায়ে সটান বিছানার কাছে এসে দাঁড়ায় সে। সেই এলোমেলো ভেজা চুলে নিখাদ ঘুমে তলিয়ে থাকা মেঘের রূপসী আদলের পানে তীক্ষ্ণ ও রহস্যময় চোখে চায়। তারপর জিভ বের করে অতি মৃদু ও আদুরে একখানা চাটা বসিয়ে দেয় মেঘের হালকা তৈলাক্ত কপোলে!
​তবুও যেন মনের গহীনের সুপ্ত মোহের খায়েস মিটতেই চায় না ওর। স্নান সেরে আসার পর শীর্ষর সুঠাম পিঠ ও মাথার এলোমেলো ভেজা চুল হতে টুপটুপ করে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ছে নিচে। ঠাঁই নিয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছে মেঘের অনাবৃত উরোজ ও সুকোমল গ্রীবা!

​মেঘের এই মাদকতাময় আঁধার সৌন্দর্য তীব্রভাবে বিমোহিত করে তোলে মেজর শীর্ষকে। পরম ভালোবাসায় স্ত্রীর ওপর থাকা বাকি শুভ্র ব্ল্যাঙ্কেটটুকুও সটান এক একপাশে সরিয়ে দেয় সে।
উন্মুক্ত বেবি কলার ব্ল্যাউজের ফাঁকে প্রকাশ পাওয়া মেঘের সুকোমল সংবেদনশীল অংশে একের পর এক তপ্ত চুমু আঁকতে শুরু করে শীর্ষ। ঘুমের ঘোরে মিষ্টি সুড়সুড়িতে নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটায় মেঘ তড়িঘড়ি উল্টো পাশ হতে অপর পাশে ফিরতে চাইল। কিন্তু শীর্ষ তাকে বিন্দুমাত্র সুযোগ না দিয়ে এক চটকায় মেঘকে নিজের সুঠাম দেহের নিম্নে ফেলে, পুরো ভর ছেড়ে দেয় ওর ওপর! উন্মুক্ত গলায় ছোট ছোট সোহাগী চুমুতে ভরিয়ে দিতে থাকে একাধারে।
​“উমম… এমন করছেন কেন মেজ–”
​“ডোন্ট কল মি মেজর সাহেব… জাস্ট কল মি শীর্ষ!”
​মেঘের কানের ধারের নরম লতিতে নিজের ঠোঁট দুটো সজোরে দাবিয়ে গম্ভীর ও মিহি কণ্ঠে হিসহিসিয়ে ওঠে সে।​এক লহমায় পুরো নিদ্রা ভঙ্গ হয় মেঘের! নিজের নাজুক দেহের ওপর পাহাড়ে মতো সুঠাম শীর্ষকে এভাবে জেঁকে বসতে দেখে এক নিমেষে ভড়কে যায় সে। চোখের ঘুম উধাও হয়ে ব্যস্ত হয়ে ওঠে বুকের ভেতরের ধুকপুকানি। বেকুব বনে গিয়ে বড্ড অবুঝের মতো প্রশ্ন বাতলায়,

​“আ-আপনি আমার ওপর এভাবে চেপে আছেন কেন?”
​“বাসর করব!”
​শীর্ষর এমন সরাসরি ও বেলাজ উত্তরে চরমভাবে চমকে ওঠে মেঘ! শ্যামা গালের রক্তিম আভা মুহূর্তে লাল হয়ে কাঁপতে শুরু করে। তীব্র লজ্জায় ও শিহরণে তিরতির করে কেঁপে ওঠে ওর শুষ্ক ওষ্ঠ জোড়া। শীর্ষ সেই মাতাল ঠোঁটের পানে নিবিড় তৃষ্ণায় চেয়ে ফাঁকা ঢোক গিলে নিজের থমকে যাওয়া লালা গলধঃকরণ করে। তারপর মেঘের একদম চোখের দিকে চেয়ে বুকফাটা হাঁসফাঁস কণ্ঠে পরম অনুমতি শুধায়,
​“ক্যান আই টাচ ইওর লিপ্স… ওয়ান্স মোর, মাই লাভ?”
মেঘের মাথায় যেন সমগ্র অম্বর এক নিমেষে ভেঙে পড়ে! চরম লজ্জায় মনে মনে কেবল ব্যাকুল প্রার্থনা জানাচ্ছে মাটি যেন দু-ফাঁক হয়ে যায়, আর সে নিজের শেষ লজ্জাটুকু সেখানে ঢুকে নিবারণ করে নেয়!
​গতরাতের গভীর সোহাগ ও ভালোবাসার অজস্র রাঙা নিশান এখনও পুরোপুরি বিদ্যমান তার বিবস্ত্র দেহে। লজ্জায় ও আবেশে যেন ডাঙ্গায় তোলা খাবি খাওয়া মাছের মতো বড় বড় ঘন শ্বাস ফেলছে সে। নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে বড্ড নাজুক ও কাঁপা স্বরে জানায়,

​“গতরাতে এতো কিছুর পরও… আবার চাইছেন আপনি…?”
​কিন্তু শীর্ষর চোখের সেই তীব্র নেশাতুর ও তৃষ্ণার্ত চাহনি দেখে কথার মাঝপথেই সটান ব্রেক কষে থামতে হয় মেঘকে। নিজের একটু ফোলা ফোলা মায়াবী নেত্র দুটি মেলায় শীর্ষর নেশালো চাহনির গভীর ভাঁজে।
​মেঘকে পুরোপুরি ম্যানিপুলেট করার অমোঘ ধারায় এক নিমেষে ধাঁধায় ফেলে হঠাৎ করেই খিঁচে ধরে ওর রসভরা ওষ্ঠ দুটি! প্রথম কয়েকটা পল শান্ত ও অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সোহাগ ছড়ালেও, মিনিট খানেকের মাথায় সেই সোহাগকে ছাপিয়ে এক অধীর হিংস্রতা যেন ছুঁয়ে যায় শীর্ষকে। মেঘের সুকোমল ওষ্ঠ কেটে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়ে পুনরায় পরম আবেশে ডুব দেয় ওর দেহের ভাঁজে ভাঁজে! শুষে নিতে থাকে মেঘের মনের সকল জমাটবদ্ধ কোমলতা, জড়তা আর লজ্জাগুলোকে।
​নতুন উদিত সূর্য যেন কিরণের বদলে শীর্ষর এই মিষ্টি হিংসাত্মক ও উদাম কর্মকাণ্ড দেখে লজ্জায় নিজের হাত-পা গুটিয়ে নেয়! নিমিষে গাঢ় কালো মেঘের আড়ালে ঢেকে দেয় সমগ্র অম্বরকে যাতে ওদের এই নিভৃত, একান্ত ভালোবাসার অপার্থিব মিলন পৃথিবীর কারোর সম্মুখে প্রকাশ না পায়, ঠিক তারই যেন এক লুকোচুরির মায়াবী পায়তারা!

সকালের নাস্তা এবং দুপুরের ভোজন একই সাথে সম্পন্ন হচ্ছে হায়দার বাড়ির ডাইনিং টেবিলে। খাবার টেবিলে সকলের আসন সুনির্দিষ্ট ও আলাদা। একপার্শ্বে পাশাপাশি বসে রয়েছে শীর্ষ এবং মেঘ, আর ঠিক তার অন্য পার্শ্বে মুখোমুখি অবস্থান প্রহর ও কিঞ্জার।
কিঞ্জার চোখে-মুখে দুষ্টুমিরা খেলা করছে। দুষ্টু নজরে মেঘের ভেঁজা কেশকে ইশারা করে প্রশ্নের বাণ ছাড়ছে। লজ্জায় মেঘের অবস্থা পানি ছাড়া মাছের বড় শ্বাস ফেলার দশা। লজ্জায় নেত্র নামিয়ে মনোনিবেশ করে খাবারের দিকে।
​টেবিলের মূল মূলধারার বড় চেয়ারটিতে বসে আছেন আ.খ.ম তোফাজ্জল হায়দার। পরম আকুলতায় একদম নেত্র ঝাপটানোহীন চোখে একটানা চেয়ে আছেন মেঘের বিষাদময় আদলের পানে। প্রাণ ভরে তৃষ্ণার্ত চোখে দেখে নিচ্ছেন নিজের রক্তে গড়া কন্যাকে। যে বড় হয়েছে সাত্তার মাস্টারের নিজের মেয়ের পরিচয়ে। অজান্তেই বুড়ো চোখের কোণ ও নেত্রপল্লব সজল হয়ে ভিজে ওঠে ওনার। উপস্থিত কেউ বিষাদটুকু খেয়াল না করলেও, পাশে থাকা শীর্ষ এবং প্রহরের সজাগ চোখ তা এড়িয়ে যায়নি। সকলের অলক্ষ্যে তোফাজ্জল হায়দারকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও গম্ভীর একটা ইশারা করে শীর্ষ। ইশারা বুঝে তিনি নিঃশব্দে নিজের ভিজে আসা চোখ সামলে চুপচাপ খাবারের পাতে মনোনিবেশ করেন।
​কাজের মেয়ের হাত থেকে তরকারির বাটি আর অন্ন আনান তোফাজ্জল হায়দারের প্রথম স্ত্রী ময়ূরী। বড্ড রুষ্ট ও হিংসাত্মক নয়নে নিজ চোখে পরখ করেন সৎ মেয়ে মেঘকে। হৃদয়ের গহীনে এক ভয়ংকর ও কুৎসিত অভিলাষ দাফন করে রেখে, আপাত বাহ্যিক সহমর্মিতা দেখিয়ে মেঘের খাবারের পাতে পরম যত্নে খাবার বেড়ে দেন তিনি।

​“কেমন আছো, ফুফিমনি?”
​পাতে রাখা ভাত আলতো নাড়তে নাড়তে হঠাৎ ময়ূরীর উদ্দেশ্যে সটান প্রশ্ন ছুড়ে মারে শীর্ষ।​শীর্ষর এমন বরফশীতল ও রুদ্ধস্বর শুনে নিমেষে ময়ূরীর হাতের ভাতের চামচ থমকে যায়! কথাটার মধ্যে সামান্যতম ভালোবাসা কিংবা স্নেহের পরশ নেই, বরং এক স্পষ্ট ও ভয়ংকর সতর্কবাণীর অস্তিত্ব বিদ্যমান।​ময়ূরী নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়ে শুষ্ক গলায় পালটা প্রশ্ন ছুড়ে দেয়,
​“ভালো। তা তুই আর তোর নতুন বউয়ের সংসার কেমন চলছে, শুনি?”
ময়ূরীর হাত থেকে হঠাৎ চামচটা আলতো করে কেড়ে নেয় শীর্ষ। ডাইনিং টেবিলে উপস্থিত সকলের হতবাক চাহনির কোনো তোয়াক্কা না করে পরম যত্নে মেখে নেওয়া খাবারের প্রথম লোকমাটা সোজা মেঘের গোলাপী ওষ্ঠের সামনে তুলে ধরে সে।
​শীর্ষর এমন প্রকাশ্য কাণ্ড দেখে মুহূর্তের মধ্যে হতবিহ্বল হয়ে পড়ে মেঘ! সকলের সামনে চরম লজ্জায় চকিত চোখে ইশারা করে বারণ করতে গেলেও শীর্ষ যেন একদম অনড়, বিন্দুমাত্র শুনছে না ওর আকুতি।

মেজর কারদার পর্ব ৪৪

​“হাঁ করো তো… পাখি!”
​মেঘ অগত্যা নিরূপায় হয়ে বাধ্য মেয়ের মতো মুখ হাঁ করতেই তার মুখে পরম মায়ায় লোকমাটা তুলে দেয় শীর্ষ। তারপর পাত্রে নিজের হাত মেছাল করতে করতে ময়ূরীর দিকে তাকিয়ে বরফশীতল কণ্ঠে জবাব দেয়,
​“বউ আমার মাশাল্লাহ্! আর আমাদের সংসারও আলহামদুলিল্লাহ্ বেশ চমৎকার চলছে! তবে একটা বড় সমস্যা কী জানো ফুফিমনি? আমার এই বোকা বউটার আশেপাশে কিন্তু শত্রুর একদম অভাব নেই! বুঝেছ কি না? দেখা যাচ্ছে আমার জন্মধাত্রী মা-ও তার পরম শত্রু, আবার আশেপাশের চেনা মানুষগুলোও বড্ড ক্ষতিকর বিষাক্ত শত্রু! তাই সতর্ক করে দিচ্ছি। মাথা গরম হলে কবে কাকে সটান মেরে একদম ধড় থেকে মাথা আলাদা করে দিই, তা কিন্তু নিজেও বলতে পারব না! আর্মি মানুষ কি না। বন্ধুক, রাইফেল, ছুরি, নানচাক্স চালাতে হাত কাঁপে না, তেমন মানুষ খুন করতেও কলিজা দূর হাতও কাঁপবে না!”

মেজর কারদার পর্ব ৪৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here