Home ইশকে এ নিকাহ ইশকে এ নিকাহ পর্ব ১৮

ইশকে এ নিকাহ পর্ব ১৮

ইশকে এ নিকাহ পর্ব ১৮
লাইরা আয়নাত

শহরের গ্ল্যামারাস প্রাণকেন্দ্র থেকে অনেক দূরে, এক সরু গলির মুখে ম্লানভাবে জ্বলছিল একটা হাফ-ভাঙা নিয়ন সাইন, “স্টার হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট”। নামটা যতটা জাঁকজমকপূর্ণ, ভেতরের সিনটা ঠিক ততটাই উল্টো। ভাঁজে ভাঁজে আঠালো হয়ে যাওয়া প্লাস্টিকের টেবিল, দেয়ালে সেঁটে থাকা হলদেটে পুরোনো মেনু-কার্ড, সিলিং ফ্যানের একঘেয়ে ক্যাঁচ-ক্যাঁচ শব্দ, আর বাতাসে সস্তা পাম অয়েলে ভাজা খাবারের একটা ভারী, তেলচিটে গন্ধ, সব মিলিয়ে জায়গাটা মনে হচ্ছে কোনো ভুলে যাওয়া ডিকেডের ফরগটেন কর্নার।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে ইনায়াত। ঠিক তার পেছনেই আয়াজ ঢুকে তার মাথায় ডিপলি টানা একটা কালো ক্যাপ, চোখের চাহনি কনস্ট্যান্টলি অ্যালার্ট, ঠিক মনে হচ্ছে প্রতিটা কোণায় লুকিয়ে আছে কোনো আনওয়ান্টেড ক্যামেরা। যে মানুষটার নাম উচ্চারিত হলে শহরের প্রতিটি ফাইভ-স্টার রেস্তোরাঁর ম্যানেজার নিজেই দৌড়ে আসে টেবিল রিজার্ভ করতে, সে-ই আজ পাবলিক অ্যাপিয়ারেন্সের রিস্ক এড়াতে মুখ ঢেকে হেঁটে ঢুকল একটা ফুটপাতঘেঁষা লো-এন্ড হোটেলে। আইরনি, বড্ড আইরনি।

দুজনে বসে কোণঘেঁষা একটা টেবিলে। প্লাস্টিকের চেয়ার সামান্য কাত হয়ে আছে, তবে ইনায়াত নোটিসও করে না। সে মেনুতে চোখ বুলিয়ে অর্ডার করে একেবারে বেসিক কিছু ফাস্টফুড, দামের লিস্টের একদম বটমে থাকা আইটেমগুলো। সিলেকশনটা ক্যাজুয়াল, কিন্তু ডেলিবারেট।
খাবার আসতেই আয়াজ এক মোমেন্টের জন্য ফ্রিজ হয়ে যায়। প্লেটে রাখা বার্গারের বান নরম নয়, চিজের গন্ধে কোনো ব্যালেন্স নেই, সসের নামটাও সে আইডেন্টিফাই করতে পারে না। জীবনে প্রথমবার এই টাইপের প্লেবিয়ান ফুডের ফেস-টু-ফেস সে। মুখমণ্ডলে বিন্দুমাত্র বিরূপ ভাব ফুটতে না দিয়ে সে খেতে শুরু করে। ফার্স্ট বাইটটা অড লাগলেও, সেকেন্ড বাইটে মিশে যায় এক স্পিচলেস অ্যাকসেপ্টেন্স, মনে হচ্ছে এই বার্গার নয়, আসলে সে চিবিয়ে গিলছে নিজের ইগোর লাস্ট পিসটা।

সামনে বসে ইনায়াত সবটা অবজার্ভ করছে। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে এক রেখা তাচ্ছিল্যের সাটল হাসি। ভ্রু সামান্য বাঁকিয়ে সে বলে, “ওয়াও মিস্টার ক্রাউন! ইউ ইট লোকাল স্ট্রিট ফুড টু? ইম্প্রেসিভ।”
কথাটায় ছুরির বদলে সুঁচের ফোঁড়। আয়াজ থামে না, চিবোতে থাকে। তারপর শান্ত, প্রায় নিষ্প্রাণ দৃষ্টিতে ইনায়াতের চোখের ভেতর তাকায়। ধীর গলায় উত্তর আসে, “হুহ, নেভার। আজই ফার্স্ট টাইম। জাস্ট ফর ইউ।”
শেষ কথাটার ওজন বাতাসে ঝুলে থাকে, ছাদের ফ্যানের ক্যাঁচ-ক্যাঁচ শব্দের সাথে মিশে যায়। কিন্তু ইনায়াতের অবয়বে সেই ওজন কোনো রিঅ্যাকশন তৈরি করে না। বরং সে আরেকটু ঝুঁকে আসে টেবিলের ওপর দিয়ে। আয়াজের চোখের একদম ভেতরে দৃষ্টি গেঁথে শীতল কণ্ঠে বলে, “আমার সাথে বেবি নেওয়ার জন্য আর কত ড্রামা করবেন মিস্টার? আই অ্যাম নট কম্প্রোমাইজিং উইথ ইউ। পিরিয়ড।”
আয়াজের গলা প্রথমবারের মতো ভাঙে। মরিয়া একটা সুর ঝরে পড়ে তার কণ্ঠে, “কম্প্রোমাইজ করতে হবে না! আই জাস্ট ওয়ান্ট টু বি উইথ ইউ, ইনায়াত। এতটুকু কেন বুঝতে পারছ না, ড্যামিট?”
“আই নো দ্যাট!” দাঁতে দাঁত চেপে ফোঁপায় ইনায়াত। চোখজোড়া শুকনো, কিন্তু ব্লেডের মতো তীক্ষ্ণ। “আসলে বেবি চান, সেটাই ক্লিয়ারলি বলুন না? বি অনেস্ট ফর ওয়ান্স।”
আয়াজের মুখের পেশিগুলো টাইট হয়ে ওঠে। সে আর কোনো লজিক দাঁড় করায় না। এক্সট্রিম ফ্রাস্ট্রেশনে ছুঁড়ে দেয়, “তোমাকে বোঝানো ইম্পসিবল। জাস্ট লিভ ইট।”

ঠিক সেই মোমেন্টে হোটেলের কাঠের দরজা ধাক্কা খেয়ে খুলে যায়। ব্যস্ত পায়ে ঢুকে পড়ে নাভিদ তার হাতে সময় নেই, চোখদুটো ওয়ারিড। টেবিলের পাশে এসে সে দাঁড়াতেও পারে না একটা রাশড “হাই” ছুঁড়ে দিয়ে প্যাকেটগুলো দ্রুত হাতে বুঝে নেয়। “কথা লেটার হবে”, এইটুকু জানিয়েই সে পা বাড়ায় বাইরের দিকে। তবে এই এন্টায়ার রাশের মধ্যেও সে ভোলে না, হাতের ব্যাগ থেকে একটা ডার্ক চকলেট বের করে টেবিলে রেখে যায় ইনায়াতের জন্য।
ছোট্ট এই কেয়ারিং জেসচার আয়াজের শার্প চোখ থেকে এস্কেপ করে না। তার ঠোঁটের কোণে এক মুহূর্তের জন্য কিছু একটা সংকুচিত হয়, জেলাসি, নাকি আনস্পোকেন কনফেশন, সে নিজেও জানে না।
নাভিদ চলে যেতেই ইনায়াত ওয়েটারকে ইশারায় ডাকে। বিলের মেশিন টেবিলে আসতেই, ইনায়াতকে কার্ড বের করার এক বিন্দু সুযোগ না দিয়ে আয়াজ নিজের ব্ল্যাক কার্ডটা পাঞ্চ করে দেয়। ইনায়াত এক পলক তাকায় তার দিকে, সেই চাহনিতে কোনো থ্যাংকস নেই, শুধু বরফ। এরপর চুপচাপ উঠে দাঁড়ায় সে। আয়াজও বিনা বাক্যব্যয়ে ফলো করে।

বাইরে তখন ডিপ নাইট। ফুটপাত ফাঁকা, স্ট্রিটলাইটগুলোর ইয়েলো টিন্টেড আলো ভেজা পিচঢালা রাস্তার ওপর ছড়িয়ে পড়েছে, অবিকল কেউ ক্যানভাসে সোনালি জল ঢেলে দিয়েছে। দুজনে পাশাপাশি হাঁটছে, তবু তাদের মাঝখানে বোধহয় একটা আনসিন গ্যাপ, যা মিটার নয়, মাইলে মাপা যায়। আয়াজের মাথায় ক্যাপ, ইনায়াতের গায়ে ওভারসাইজড হুডি, দু’হাত পকেটে গোঁজা।
এই নিস্তব্ধতা সহ্য করতে না পেরে আয়াজই প্রথম কথা বলে ওঠে, “তোমার কি ডার্ক চকলেট ফেভারিট? তোমার ভাই ওই রাশের মধ্যেও রেখে গেল।”
ইনায়াত এক নজর তাকায় তার দিকে, সেই চোখে ঝড়ের আগের স্থিরতা। “হোয়াই? আমার প্রেফারেন্স জেনে আপনি ঠিক কী করবেন মিস্টার ক্রাউন?”
“নো, জাস্ট… কিউরিয়াস ছিলাম।”
“নিজের কিউরিওসিটিটাও কাইন্ডলি নিজের কাছে রাখুন। আই হেইট ননসেন্স টকস।”
আয়াজ থেমে যায় এক পা। তার কণ্ঠে এবার আক্ষেপের এক ডিপ টোন, “ইউ আর বিয়িং টু রুড, ইনায়াত। আমার সাথে অ্যাটলিস্ট একটু তো ডিসেন্টলি বিহেভ করতে পারো।”
“ইউ ডোন্ট ডিজার্ভ ইট।”

আয়াজ বুক ভরে বাতাস টেনে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। “দ্যাটস মাই ফেইলিওর, আই অ্যাডমিট। তারপরও… একজন হাসবেন্ড হিসেবে আমাকে একটা লাস্ট চান্স তো দাও। প্লিজ।”
তবে ইনায়াতের চেহারায় সেই বিনয় এক ফোঁটা ভাবও তোলে না। সে হাঁটতে থাকে, তার চোখ সামনের অন্ধকারে ফোকাসড, কণ্ঠ পাথরের মতো শক্ত, “ডোন্ট গেট ইমোশনাল মিস্টার ক্রাউন। আই অ্যাম জাস্ট আ ভেরি অর্ডিনারি, কমনার, ক্লাসলেস গার্ল। আমার সাথে আপনার স্ট্যাটাস ম্যাচ করে না, আর ফ্র্যাংকলি স্পিকিং, আপনিও আমার যোগ্য নন।”
“ক্লাসলেস”, শব্দটা ঠিক কোনো একদিনের নিজেরই ছুঁড়ে দেওয়া কথার ইকো। আয়াজের বুকের ভেতর সেটা রুট গেড়ে ওঠে, স্লো পয়জনের মতো। তার কণ্ঠে এবার স্পষ্ট রিগ্রেট ঝরে পড়ে, প্রায় ভাঙা কাঁপুনিতে, “দ্যাট ওয়াজ মাই স্টুপিডিটি, সুইটহার্ট। আই ওয়াজ আ কমপ্লিট ইডিয়ট। জাস্ট গিভ মি ওয়ান চান্স।”
রাস্তা প্রতি স্টেপে আরও নির্জন হয়ে আসছে। আয়াজ ডেসপারেটলি বোঝাচ্ছে, বোঝাচ্ছে, আর ইনায়াত এক কথার মানুষ, কোনো আর্গুমেন্ট তার কানের সাইড দিয়ে এক ইঞ্চিও এগোয় না।

ঠিক তখনই…
অন্ধকার চিরে এক তীব্র ইঞ্জিনের গর্জন হয় কুচকুচে কালো একটা ফোর্ড মাস্টাং পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটে আসছে সোজা ইনায়াতের দিকে। সেটা ওর গা ঘেঁষে বেরিয়ে যাওয়ার আগের সেই এক্সপ্লোসিভ সেকেন্ডে আয়াজের বডি ব্রেনের চেয়ে আগে রিঅ্যাক্ট করে, ছোঁ মেরে সে ইনায়াতকে টেনে নেয় নিজের বুকের কাছে। গাড়িটা বাতাস চিরে বেরিয়ে যায় তাদের সাইড দিয়ে, পেছনে রেখে যায় বার্নিং রাবারের একটা ঝাঁঝালো গন্ধ।
একটা মুহূর্ত। হার্টবিট থেমে যাওয়ার মতো একটা মুহূর্ত। ইনায়াতের হুডির ফ্যাব্রিক আয়াজের বুকে চেপে আছে, তার নিজের স্পন্দনটাও সে শুনতে পাচ্ছে।
তারপর ইনায়াত রেজ-এ ফেটে পড়ে। দূরগামী গাড়ির দিকে চিৎকার করে ওঠে, “হেই! আর ইউ ব্লাইন্ড? চোখে দেখে ড্রাইভ করতে পারো না, ইডিয়ট?”

সাধারণ পথচারী ভেবেছিল সম্ভবত, গাড়িটা কিছু দূরে গিয়ে ব্রেক কষে থামে, টায়ারের একটা তীক্ষ্ণ স্ক্রিচে। দরজা খুলে নেমে আসে উনিশ-কুড়ি বছরের এক ছেলে। চুলে তার ফ্যাশনেবল ব্লিচ, কানে আর ঠোঁটে সিলভার রিং, হাঁটার ভঙ্গিতে উঠতি বয়সের ফুল-লেভেল অ্যারোগ্যান্স। সে এসে দাঁড়ায় তাদের সামনে, একটা তাচ্ছিল্যের স্মার্ক ঝুলিয়ে, “মাই কার, মাই রুলস। মাল কাছে আমি আমি চালাচ্ছি। প্রবলেম কোথায় তোদের?”
আয়াজের মাথায় রাগের লহর ওঠে। সে মুখ খুলবে, ঠিক তার আগেই ঘটে যায় এমন একটা কাহিনি, যা সে জীবনেও ভুলতে পারবে না।
ইনায়াতের নিজের কোমর থেকে আয়াজ কিছু বলার আগে বের করে আনে একটা পিস্তল। কালো ধাতব ব্যারেলটা সোজা তাক করে সে ছেলেটার কপালের দিকে,সাথে ইনায়াতের চোখজোড়ায় জ্বলে ওঠে এমন এক আগুন, যার সামনে রাতের বাতাসও কয়েক ডিগ্রি ঠান্ডা হয়ে যাবে,
“মাল তো আমার কাছেও আছে। আমি কেন চালাচ্ছি না, বলতে পারো? চেষ্টা করে দেখব? শ্যাল আই ট্রাই ইট অন ইউ?”

ছেলেটার সব অ্যাটিটিউড, সব সোয়্যাগ, নিমেষে ইভ্যাপোরেট হয়ে যায়। তার মুখ শাদা হয়ে যায়, ঠোঁট কাঁপতে থাকে। ট্রেম্বলিং হাতে কান ধরে ওঠবস করতে শুরু করে সে, গলা তোতলায়, “স-সরি ম্যাম! সরি সরি! আই ডিডন্ট মিন ইট!”
ইনায়াত পিস্তল কুলি রি-হোলস্টার করে কোমরে। কড়া, অবিচল গলায় বলে, “গেট লস্ট। চুপচাপ ভালোয় ভালোয় গাড়ি চালিয়ে কাট এখান থেকে। নাউ।”
ছেলেটা আর এক মুহূর্তও দেরি করে না। সুড়সুড় করে গাড়িতে উঠে ইগনিশন ঘোরায়, আর কয়েক মোমেন্টের মধ্যে মাস্টাংটা মিলিয়ে যায় রাস্তার শেষ প্রান্তের অন্ধকারে, রিয়ার লাইটের দুটো লাল বিন্দু ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে যেতে।

আয়াজ পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে পুরো সিনটা প্রসেস করে। তার চোখে হতবাকতা, ফ্যাসিনেশন, আর তারও গভীরে, কিছু একটা ব্যাখ্যাতীত, ডেঞ্জারাসলি ইনটক্সিকেটিং লাভ।
ইনায়াত তাকে পাত্তা না দিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করে, ঠিক আগের মতোই। হঠাৎ পেছন থেকে আয়াজ এসে তার শোল্ডারে হাত রাখে, আর তারপরই আনবিলিভেবল ক্ষিপ্রতায় পাঁজাকোলা করে তুলে নেয় তাকে নিজের কোলে। আর তার চোখের ভেতর তাকিয়ে মেসমেরাইজড কণ্ঠে আয়াজ বলে, “ইউ আর আ কুইন, সুইটহার্ট! আর কুইনের পা মাটিতে থাকাটা তো একদমই আনফেয়ার। ইট’স কমপ্লিটলি আনজাস্ট।”
তবে ইনায়াত রেজিস্ট করে না। স্ট্রাগল করে না। ভয়ও পায় না। সে অ্যাবসোলিউটলি স্থির থেকে, আয়াজের চোখের দিকে বরফশীতল চাহনিতে তাকিয়ে থাকে, এই চোখে ঘৃণা, ডিসবিলিফ, আর গভীরে লুকানো এক পুরোনো ক্ষতের হিমশীতল অস্তিত্ব,সে বলে,

“আপনার কি একটুও সেলফ-রেসপেক্ট নেই, মিস্টার ক্রাউন?” হাউ ক্যান ইউ বি দিস শেমলেস? যে মুখে একদিন আমাকে ডিনাই করেছিলেন, একদম ট্র্যাশের মতো, আজ সেই মুখেই এত অ্যাটেনশন দিচ্ছেন? সিরিয়াসলি?চুপচাপ আমাকে নিচে নামিয়ে দিন। নয়তো যে বুলেটটা ওই ইডিয়টটার ব্রেনে ঢোকার কথা ছিল, আই সোয়্যার অন মাই লাইফ, সেটা আপনার হেডে শুট করে দেব। ট্রাই মি।”
আয়াজ মৃদু হেসে বলে ওঠে,
“বুলেট? ওটা তো তুমি অনেক আগেই আমার বুকে গেঁথে দিয়েছো। তোমার ওই চোখের তীক্ষ্ণ চাহনিই আমাকে মেরে ফেলার জন্য যথেষ্ট।”
এ কথাটা শুধু কথা নয়, অন্তরের গভীর থেকে উঠে আসা এক কনফেশন, যা ঠোঁটে এসে বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার মতো নয়।

রাত এখন বেশ গভীর, ঘড়ির কাঁটায় ঠিক একটা। চারপাশে সবকিছু পুরোপুরি স্থবির, শুধু দূরের কোনো পোকার ডাক আর জানালার কাঁচে লেগে থাকা ক্ষীণ বাতাসের শব্দ রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে দিচ্ছে মাঝে মাঝে। একই রুম, একই ছাদের নিচে দুটো শ্বাস-প্রশ্বাস, কিন্তু দুজনের মাঝখানে এক না-দেখা দেয়াল।
রুমের এক পাশের সোফায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে ইনায়াত। জ্বরের ঘোরে ওর সারা শরীর কাঁপছে, ওর শ্বাসপ্রশ্বাস অস্থির, আর মাথার রগগুলো প্রতি মুহূর্তে যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যেতে চাইছে। ব্ল্যাংকেটটা টেনে চিবিয়ে ধরেছে ও, ঠিক ওই ব্ল্যাংকেটটাই ওর একমাত্র সঙ্গী এই অন্ধকার রাতে।
আর মাত্র কয়েক পা দূরে, বিছানার ওপর এপাশ-ওপাশ করছে আয়াজ। চোখের পাতায় ঘুম নেই বিন্দুমাত্র তার। অন্ধকারে ওর দৃষ্টি বারবার গিয়ে আটকে যাচ্ছে সোফার দিকে, ইনায়াতের গুটি মেরে শোয়া আকৃতিটার দিকে। একই রুমে থাকার এই সুযোগটাই ওর জন্য পানিশমেন্ট আর পিস, দুটোই একসাথে। এত কাছে, তবু এত দূরে।
ইনায়াতের ঘুমিয়ে পড়ার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে সে, ঠিক যেভাবে কেউ তার প্রার্থনার দরজা খুলে যাওয়ার অপেক্ষা করে। উদ্দেশ্য, ও ঘুমিয়ে গেলে চুপিচুপি গিয়ে ওকে একটু প্রাণভরে দেখতে পারা, কেউ না দেখলেও,ও নিজে না জানলেও।

ইনায়াত এখন ওর কাছে একটা নেশার মতো, এক তীব্র এডিকশন। এমন আসক্তি যার কোনো লজিক্যাল ব্যাখ্যা আয়াজের নিজের কাছেও নেই। শুধু জানে, এই একই রুমে ওর নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে না পেলে, ওর নিজের শ্বাস আটকে আসে।
ইনায়াত ঘুমিয়ে পড়েছে ভেবে আয়াজ নিঃশব্দে বিছানা ছাড়ে। পায়ের তলায় পালক বিছিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় সোফার দিকে। মাত্র কয়েকটা পা, কিন্তু প্রতিটা পদক্ষেপে ওর হার্টবিট বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। কাছে যেতেই সেই ম্লান অন্ধকারেও ও স্পষ্ট দেখতে পায়, যন্ত্রণায় ইনায়াতের চোখ-মুখ কুঁচকে আছে, কপালে ভাঁজ পড়েছে, ঠোঁট দুটো শুকিয়ে কাঁপছে। দৃশ্যটা আয়াজের বুকের ভেতরটা মুচড়ে দিল।
সন্তর্পণে ওর পাশে হাঁটু গেড়ে বসে, আলতো করে, পালকের স্পর্শের মতো কোমলভাবে ওর কপালে হাত রাখে আয়াজ। ইনায়াত উপস্থিতি টের পেয়েও চুপচাপ পড়ে থাকে, ওর এখন রেসপন্স করার মতো এনার্জিও নেই। কিন্তু কপালে হাত স্পর্শ করতেই আয়াজ আঁতকে ওঠে, প্রচণ্ড জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে মেয়েটার!
বুকের ভেতর একশত সুই একসাথে গেঁথে উঠল। উদ্বিগ্ন, প্রায় কাঁপা কণ্ঠে আয়াজ বলে ওঠে, “ইনায়াত! তোমার তো ভীষণ জ্বর এসেছে। আমি কি এখুনি ডাক্তার ডাকব?”

ক্লান্ত, ভারী চোখ দুটো সামান্য খুলে ইনায়াত বিরক্তি আর যন্ত্রণামিশ্রিত ক্ষীণ গলায় ফিসফিস করে বলে, “দয়া করে আপনি সোফার কাছ থেকে যান। এমনিতেই আমার মাথা ব্যথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে, প্লিজ আর পেইন দেবেন না।”
তার কথাগুলো ছিল বেশ কঠোর, কিন্তু আয়াজের কানে সেগুলো এক অসহায় মানুষের কাতরতার মতোই শোনায়।
ওর কথা শুনে আয়াজ একটুও রাগ করে না। কোনো কথা না বলে, বিনা প্রতিবাদে সে আলতো করে ইনায়াতকে সোফা থেকে নিজের কোলে তুলে নেয়। ঠিক যেভাবে কেউ একটা ভাঙা ফুল তুলে নেয়, যাতে আর একটুও ড্যামেজ না হয়। সোজা নিজের বিছানার দিকে এগিয়ে যায় সে আর বলে,
“আজ অন্তত বিছানায় ঘুমাও। তোমার শরীর একেবারেই ভালো নেই। আর টেনশন করো না, আমি তোমার কোনো ক্ষতি করব না, আমি সোফাতেই থাকব,”
ইনায়াত কে নিজের বিছানায় শুইয়ে দিয়ে, বালিশটা ঠিক করে গুঁজে দিয়ে আয়াজ ক্যাবিনেট থেকে একটা পেইন-রিলিফ বাম নিয়ে আসে। ইনায়াতের মাথার কাছে বসে ওর গরম মাথাটা অত্যন্ত সাবধানে নিজের কোলে তুলে নেয়। আঙুলে বাম মেখে কপালে মাসাজ করতে করতে প্রায় ফিসফিস করে বলে, “চোখ বন্ধ করে রাখো। এতে ব্যথাটা একটু কমবে।”

ওর আঙুলের স্পর্শে, এই জেন্টল মাসাজের তালে তালে ইনায়াতের সত্যিই কিছুটা আরাম বোধ হয়। চোখ বন্ধ রেখেই হাঁপাতে হাঁপাতে সে বলে, “আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, মনে হচ্ছে আমি মরে যাব। শরীরটা আগুনে পুড়ে যাচ্ছে। আমাকে একটু বাথটাবে নিয়ে যাবেন? হয়তো পানিতে গেলে একটু বেটার লাগবে।”
কথাগুলো শোনা মাত্রই আয়াজ আর এক মুহূর্তও দেরি করে না। ওকে কোলে তুলে সোজা ওয়াশরুমে নিয়ে যায়। বাথটাব ঠান্ডা পানিতে ভরে সেখানে আলতো করে বসিয়ে দেয় ইনায়াতকে, ঠিক পুড়ে যাওয়া এক আগুনকে পানিতে শান্ত করার মতো। পানির শীতল স্পর্শে ইনায়াতের অবশ শরীরে ধীরে ধীরে প্রাণ ফিরে আসে, ছটফট করা চোখের পাতাগুলো কিছুটা স্থির হয়।

আয়াজ বাথটাবের পাশে মেঝের ওপর হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে। ওর চোখেমুখে এখন রাজ্যের দুশ্চিন্তা, মাথার ভেতর অসংখ্য প্রশ্ন আর ভয় জমে গেছে। ইনায়াতের একটা ভেজা হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ও ব্যাকুল হয়ে জানতে চায়, “এখন একটু বেটার ফিল করছো? আর ইউ ওকে?”
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চোখ বন্ধ রেখেই ইনায়াত বলে, “আপনি গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন। আমার জন্য আপনাকে এত সাফার করতে হবে না। আমি ঠিক উঠে আসতে পারব।”
আয়াজ বাধ্য ছেলের মতো চুপচাপ উঠে চলে যায়। আর ওর চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইনায়াতের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে সূক্ষ্ম হাসি ফুটে ওঠে, এমন একটা হাসি যার মিনিং হয়তো ও নিজেও পুরোপুরি বোঝে না।
কিন্তু কিছুক্ষণ পরই আয়াজ আবার ফিরে আসে, ওর হাতে ইনায়াতের একটা টি-শার্ট আর ট্রাউজার। ইনায়াতের বুকের ভেতরটা আচমকাই নড়ে ওঠে ও কি সত্যিই মন থেকে ওর কেয়ার করছে?
কাপড়গুলো হ্যাঙ্গারে রাখতে রাখতে আয়াজ বেশ ক্যাজুয়াল গলায় জিজ্ঞেস করে, “টি-শার্ট আর ট্রাউজার তো পেলাম, কিন্তু ইনার তো খুঁজে পেলাম না। কোথায় রাখা আছে বলো, আমি এনে দিচ্ছি।”
কথাটা শুনে ইনায়াত লিটারেলি হতবাক! গা গুলিয়ে ওঠে ওর, এই লোকটা এসবও ভাবছে? অস্বস্তি নিয়ে তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে সে বলে, “না, আর কিছু লাগবে না।”

আয়াজ ওর আরও কাছে এগিয়ে এসে নরম, প্রায় অনুনয়ের স্বরে বলে, “আরে, বলো না। শাই ফিল করছো কেন? আমি এনে দিচ্ছি।”
ইনায়াত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, “এখানে লজ্জার কী আছে? রাতে আমি ওসব পরি না। আপনি এবার যান, আমি উঠব আর চেঞ্জ করব।”
আয়াজের ঠোঁটে এবার একটা দুষ্টু হাসি খেলে যায়, পরিচিত স্মার্ক, যা দেখলে ইনায়াতের ইচ্ছে করে ওকে কষে একটা চড় মেরে দেয়। “তাতে প্রবলেম কী? আমি তো তোমার হাসবেন্ড। আমি থাকি, তুমি আমার সামনেই চেঞ্জ করে নাও। প্রমিস, আমি কিচ্ছু দেখব না!”
দাঁত চেপে ইনায়াত বলে, “আমার হাতে খুন হওয়ার অনেক শখ জেগেছে আপনার, তাই না? তাই এমন রাবিশ বকছেন!”

কথাটা শুনে আয়াজ বাথটাবের ধারে দুহাত রেখে ইনায়াতের একদম মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে। দুজনের মাঝখানে এখন মাত্র কয়েক ইঞ্চি গ্যাপ। ওর চোখের দিকে সরাসরি, দৃষ্টির গভীরে ঢুকে গভীর স্বরে বলে,
“আমার মৃত্যু? সে তো তোমার হাতে অনেক আগেই হয়ে গেছে।”
মুহূর্তটা থমকে দাঁড়ায়। পানির ফোঁটা পড়ার শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না। ইনায়াত রেগে গিয়ে আয়াজের থুতনিটা শক্ত করে চেপে ধরে মুখ বাঁকিয়ে বিরক্ত হয়ে বলে, “ননসেন্স বকা বন্ধ করুন। এত চিপ রোমিও-মার্কা ডায়লগ তো চাইনিজ শর্ট ড্রামাতেও দেয় না! পুরাই ক্র্যাপ।”
আয়াজ একটুও দমে না। বরং ইনায়াতের ভেজা হাতের ওপর নিজের হাত রেখে ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত স্মার্ক ঝুলিয়ে বলে, “তাহলে চলো, এবার আমার নিজের ভাষায় বলি।”

বিরক্ত হয়ে ইনায়াত ওকে ধাক্কা দিয়ে সরাতে যায়, কিন্তু পারে না। আয়াজ একটা হাত ইনায়াতের ভেজা চুলের ভেতর ঢুকিয়ে মাথার পেছনে রাখে সে। খুব আলতো করে, অথচ এমন এক ফার্মনেস নিয়ে যে ইনায়াতের সরে যাওয়ার কোনো অপশন থাকে না। আয়াজের চোখে এখন এক মাতাল করা দৃষ্টি, সে নিজেই আর নিজের কন্ট্রোলে নেই। সেই ঘোরের মাঝে, বুকের গভীর থেকে উঠে আসা ভারী স্বরে আয়াজ বলতে থাকে,
​”আমার ভাষায় যদি বলি, তাহলে আমার শুধু তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করে। আমি জানি না এটা কেন হয়। কিন্তু ট্রাস্ট মি, ঘুম ভাঙলেই আমার চোখ পাগলের মতো তোমাকেই খোঁজে। তুমি এই রুমের এক কোণে শুয়ে থাকো, আর আমি ওই কোণে, তবু আমার পুরো পৃথিবী তোমার দিকেই ঝুঁকে থাকে। ঘুমের ঘোরেও আমি তোমাকে দেখি। তোমার ওই রাগ, তোমার কথা বলার স্টাইল, তোমার হাঁটার ধরন, সবকিছু আমার বুকের ভেতর একটা আননোন সুরের মতো বাজতে থাকে, একদম ক্রেজিদের মতো।”

​কথাগুলো শেষ হতেই আয়াজ কোনো সুযোগ না দিয়ে বাথটবের কিনারা ঘেঁষে আরও কিছুটা ঝুঁকে আসে। ইনায়াতের কাঁপতে থাকা ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দেয় সে। ইনায়াত চমকে ওঠে, ওর পানিসিক্ত ভেজা হাত দুটো তড়িঘড়ি করে উঠে আসে আয়াজের শক্ত বুকে। দুহাতে ধাক্কা দিয়ে ওকে সরাতে আপ্রাণ ট্রাই করে সে।
​কিন্তু আয়াজের এই বন্য, গভীর কিসের কাছে ওর সব রেসিস্ট্যান্স ধীরে ধীরে হার মানতে শুরু করে। আয়াজের কাছে ইনায়াতের ঠোঁটের স্বাদটা ছিল ঠিক পুরোনো কোনো কড়া নেশার মতো, যা একবার ছুঁলে আর ফেরা যায় না। বাথটবের উষ্ণ পানি আর ইনায়াতের ভেজা ত্বকের বুনো ঘ্রাণ মিলেমিশে তৈরি করেছিল অন্যরকম এক মাদকতা। ওর কাঁপতে থাকা নরম ঠোঁট জোড়ার স্পর্শে আছে এক মিষ্টি অথচ ইনটেন্স আবেশ। এই টেস্টের সাথে মিশে আছে হালকা একটু নোনতা ভাব, হতে পারে সেটা বাথটবের ছিটকে আসা পানির।

​আয়াজ যত গভীরে ডুব দিচ্ছে এই স্বাদ ওকে ততটাই মাতাল করে তুলছে। ইনায়াতের বাধা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা, ফাস্ট হয়ে আসা শ্বাস-প্রশ্বাস আর ঠোঁটের কাঁপন মিলিয়ে আয়াজের মনে হচ্ছে সে জীবনের সবচেয়ে দামি কোনো সুধা পান করছে। এই অনুভবে কোনো স্যাটিসফ্যাকশন নেই, আছে শুধু আরও পাওয়ার এক বন্য হাহাকার। যে টেস্ট একবার পেলে শিরায় শিরায় আগুন ধরে যায়, ঠিক ততটাই ডেসপারেশন নিয়ে আয়াজ ইনায়াতের ঠোঁটের প্রতিটা বিন্দু নিজের মাঝে শুষে নিতে চাইছে।

ইশকে এ নিকাহ পর্ব ১৭

​ইনায়াতের দুর্বল হয়ে আসা হাত দুটো আয়াজের শার্ট খামচে ধরে, সরাতে গিয়েও শেষমেশ পুরো এনার্জি হারিয়ে ফেলে। আয়াজ ওকে নিজের থেকে এক ইঞ্চিও দূরে সরতে দেয় না। ওর কাছে ঠিক এই মুহূর্তটাই ওর পুরো এক্সিস্টেন্সের সারমর্ম, ওকে একটু ছাড়লেই সব হারিয়ে যাবে।

ইশকে এ নিকাহ পর্ব ১৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here