Home ইশকে এ নিকাহ ইশকে এ নিকাহ পর্ব ১৭

ইশকে এ নিকাহ পর্ব ১৭

ইশকে এ নিকাহ পর্ব ১৭
লাইরা আয়নাত

আয়াজ আর অরুর বিয়েটা শেষমেশ ভেঙেই গেল। তবে এই ব্রেকআপের কারণ নিয়ে গুঞ্জনের শেষ নেই, গল্পের আসল টুইস্ট লুকিয়ে আছে সম্পূর্ণ অন্য জায়গায়। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, সম্পর্কটা শেষ করেছে স্বয়ং অরু। যে মেয়েটি আয়াজের বউ হওয়ার স্বপ্নে বিভোর ছিল, সে-ই নিজ হাতে নিজের ড্রিম লাইফের ইতি টানল।
আসলে আয়াজ তাকে ঠিক কী বুঝিয়েছে এবং এমন কী ইনফরমেশন দিয়েছে, সেটা আজও এক ডার্ক সিক্রেট। ধারণা করা যায়, অন্ধকার ঘরে তাদের মাঝে কোনো গোপন কনভারসেশন হয়েছে, যার রেশ শুধু ওই দুজনের ভেতরেই আটকে আছে। বাইরের মানুষ স্রেফ ধোঁয়ার মতো উড়তে থাকা রিউমার শুনেছে। বাকি সবাই দেখেছে এর চূড়ান্ত পরিণতি, একটি ভাঙা সম্পর্ক এবং ফিরে যাওয়া একজন মানুষ।

এরপর বাধ্য হয়েই অরুর ফ্যামিলি সকলের কাছে দুঃখপ্রকাশ করে বিদায় নিয়েছে। মাথা নিচু করে, এক ধরনের অপরাধবোধ ও অসহায়ত্ব নিয়ে তারা এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে। যাওয়ার পথটাও তাদের কাছে অভিশপ্ত মনে হচ্ছিল। এত বড় অন্যায়ের পরেও আয়াজের বাবা-মা হঠাৎ করে সিনারিওতে আসা ইনায়াতকে উদ্দেশ্য করে একটি কথাও বলার সাহস পাচ্ছেন না। কারণ, সেই মুহূর্তেই আয়াজ সবাইকে তার ফাইনাল ডিসিশন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে।
“ইনায়াতই হবে আমার ওয়াইফ। এই ব্যাপারে অন্য কোনো আর্গুমেন্ট আমি টলারেট করব না।”
তার এই ঘোষণায় ছিল তীব্র অহংকার, সেই সঙ্গে ছিল এক অনড় অবস্থান। মনে হচ্ছিল পাথরে খোদাই করা কোনো অমোঘ বিধান।
অথচ ইনায়াতকে ঘিরে পরিস্থিতি হঠাৎ এমন ড্রামাটিক টার্ন নিলেও সে এসবের ধারেকাছেও নেই। তার চোখেমুখে নেই কোনো বিজয়ের হাসি, নেই পরাজয়ের ছাপ। তার এই শীতল ও এক্সপ্রেশনলেস ভাইবটাই মূলত নতুন গসিপের জন্ম দিল।

পুরো নাটকের আড়ালে আরও একটি নির্মম বাস্তবতা লুকিয়ে আছে। ইনায়াতের বাবা শুধু আয়াজের পরিবারের কাছ থেকেই নন, গোপনে আয়াজের কাছ থেকেও বড় অঙ্কের ক্যাশ নিয়েছেন। মেয়ের ভবিষ্যৎ নয়, তার কাছে প্রায়োরিটি ছিল নিজের ব্যাংক ব্যালেন্স। এ কারণেই মেয়েকে বিকল্প কিছু ভাবার সুযোগ না দিয়ে তিনি সোজা এসে ইনায়াতকে আলাদা ডাকেন। তখন তার গলার স্বরে ছিল সরাসরি থ্রেট, এক বাবার কণ্ঠে যা একেবারেই অপ্রত্যাশিত।
“ডিল কমপ্লিট হওয়ার আগে এখান থেকে পালানোর ট্রাই করলে নাভিদকে আর কোনো ড্রাগস প্রোভাইড করা হবে না। কিপ দ্যাট ইন মাইন্ড।”
বাবার এমন ব্ল্যাকমেইলের পর ইনায়াত পালানোর অনেক চেষ্টা করল, সব পথ যাচাই করে দেখল। দরজার পাশাপাশি জানালাগুলো পর্যন্ত চেক করল, কিন্তু বের হওয়ার কোনো রাস্তা মিলল না। তাই বাধ্য হয়েই তাকে থেকে যেতে হলো। সে মনে মনে ভাবে, এই মুহূর্তে হয়তো নয়, তবে একদিন সে ঠিকই এখান থেকে বের হবে, তবে আজ নয়। আজ সারেন্ডার করাটা তার পরাজয় নয়, এটি তার এক দীর্ঘমেয়াদী অপেক্ষা।

ইনায়াতের এই থেকে যাওয়ার পেছনে বাবার হুমকি ছাড়াও আরও একটি জোরালো কারণ নিহিত। এমন একটি কারণ যা সম্পর্কে আয়াজের কোনো ধারণাই নেই।
মূলত ওই ড্রাগসগুলো ইনায়াতের কাছে লাইফ সেভিং উপাদান, আর সেগুলো বর্তমানে খোদ আয়াজের কন্ট্রোলে। শুধু তাই নয়, খেয়াল করলে দেখা যায় সম্প্রতি আয়াজের সঙ্গে ‘কেওস’-এর বেশ কিছু মিল তার চোখে পড়ছে। ছোট ছোট ক্লু এবং রহস্যময় কিছু কাকতালীয় ঘটনা প্রতিনিয়ত ইনায়াতকে ভাবিয়ে তুলছে। এলোমেলো পাজলের টুকরোর মতো এই ঘটনাগুলো তাকে ভাবতে বাধ্য করছে, আসলে ব্যাকগ্রাউন্ডে কী চলছে এখানে? কার কানেকশন কার সাথে কীভাবে জড়িয়ে আছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পেয়ে সে হঠাৎ করে হাল ছাড়বে কীভাবে? অমীমাংসিত রহস্য তার কাছে অসমাপ্ত যুদ্ধের মতো। মাঝপথে ময়দান ছেড়ে যাওয়া অন্তত তার পার্সোনালিটির সাথে যায় না।
সবদিক হিসেব করে এক অন্ধকার রাতে একা বসে ইনায়াত মনে মনে সাজিয়ে ফেলে তার চূড়ান্ত মাস্টারপ্ল্যান। একদম কুল হেডে, ধাপে ধাপে দাবার ঘুঁটি সাজানোর মতো করে সে নিজের ছক তৈরি করে।

“আয়াজকে ডেস্ট্রয় করতে হবে একদম রুট থেকে। তারপরই আমি এখান থেকে যাব। মাঝপথে এস্কেপ করলে ওর পানিশমেন্ট অনেক কম হয়ে যাবে। তাহলে আমার পুরো গেমপ্ল্যানটাই মাঝপথে রুইন হয়ে যাবে।”
অন্যদিকে আয়াজ ভাবছে ইনায়াত পুরোপুরি তার কন্ট্রোলে আছে এবং তার নির্দেশের বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা মেয়েটির নেই। কিন্তু ইনায়াত খুব ভালো করেই জানে, সে এখানে আছে সব হিসাব পুরোপুরি চুকিয়ে ফেলার জন্য। সে আয়াজের বন্দি নয়, বরং সে নিজেই এখানে এক ট্র্যাপ হিসেবে প্রবেশ করেছে।
সার্বিক পরিস্থিতি এখন ঠিক এমন দাঁড়িয়েছে যেখানে দুজনেই একে অপরকে দাবার বোর্ডের মতো সামনে রেখে বসে আছে। দুজনেরই চোখে প্রতিপক্ষের প্রতি একই মাত্রার আত্মবিশ্বাস, খেলাটা আমিই জিতব। শেষ পর্যন্ত এই ভয়ংকর মাইন্ড গেমে কে আসল খেলোয়াড় এবং কে শুধুই দাবার ঘুঁটি, সেটা এখনো কেউই জানে না। কেওসের সঙ্গে আয়াজের সম্পর্কের আসল সত্য এবং নাভিদের অদেখা শিকল এখনো উন্মোচনের অপেক্ষায়।

সন্ধ্যা নামছে ধীরে ধীরে, ক্লান্ত কোনো রাজা নিজের সিংহাসন ছেড়ে পশ্চিমের দিগন্তে নেমে যাচ্ছে অনিচ্ছুক পায়ে। আকাশের বুকে ছড়িয়ে পড়েছে কমলা ও বেগুনি রঙের এক মায়াবী আভা। মনে হয় কেউ আগুন ও রক্ত মিশিয়ে ফুঁ দিয়েছে মেঘের আঁচলে। সেই ফুঁয়ে ছড়িয়ে পড়েছে এমন এক আলো, যা দেখলে বোধ হয় দিন শেষ হচ্ছে না, বরং কোনো মহাকাব্যিক গল্পের একটি চ্যাপ্টারের সমাপ্তি ঘটছে। পেন্টহাউসের প্রশস্ত ব্যালকনিটা সেই মায়ার মাঝে ভাসছে নীরবে, যা দেখে আকাশের বুকে ঝুলে থাকা একটুকরো থমকে থাকা সময় বলে মোহ জাগে।
সেই ব্যালকনির এক কোণে একা বসে আছে ইনায়াত। হাঁটু মুড়ে বুকের সাথে চেপে ধরা, চিবুকটা রাখা হাঁটুর ওপর, দুটো হাত পেঁচিয়ে আছে নিজের পায়ের সাথে। দেখে মনে হয় সে নিজেকে নিজেই সুরক্ষিত করে রেখেছে পুরো পৃথিবী থেকে। চোখ দুটো স্থির, দূর আকাশের কোনো এক অজানা বিন্দুতে। সেখানে হয়তো কিছুই নেই, অথচ তার দৃষ্টিতে আছে সবকিছু। এই মুহূর্তে তার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে একটাই চিন্তা, তা হলো তার প্রথম পদক্ষেপ। প্রতিশোধের প্রথম পদক্ষেপ। ঠিক সেই অবস্থানে দাঁড়িয়ে সে দেখতে চায় দুটো সাম্রাজ্যের পতন। সে নিজের চোখে দেখতে চায়, ইটে ইটে কীভাবে ধ্বংস হয়ে যায় সেই দুর্গ, যেটা গড়ে উঠেছিল তারই মায়ের কান্না এবং আত্মসম্মানের ভাঙা টুকরোগুলোর ওপর।

সন্ধ্যার মৃদু হাওয়ায় তার এলোমেলো চুল উড়ছে মুখের ওপর, চোখের ওপর এবং ঠোঁটের ওপর। কিন্তু সে একেবারে এক্সপ্রেশনলেস। একটা চুলও সরায়নি সে, এমনকি একটা আঙুলও তোলেনি। সে এই মুহূর্তে বাস্তবতা থেকে বহু দূরে, নিজের ভেতরে গড়ে তোলা এক ধ্বংসস্তূপের নকশায় ফোকাসড। মনের ভেতর সে অনবরত ইট বসাচ্ছে, মাপছে ফাটল, হিসাব করছে কোন দেয়ালটা ভাঙলে পুরোটাই ধুলোর মতো ধসে পড়বে। সে খুঁজছে সেই স্তম্ভ, যেটা টানলে গোটা ছাদ ভেঙে পড়বে দুই সাম্রাজ্যের ইগোর মাথায়।

তখনই দরজা ঠেলে ব্যালকনিতে প্রবেশ করে আয়াজ। তার পদক্ষেপে মিশে আছে সারাদিনের সিদ্ধান্ত, চুক্তি ও ক্ষমতার ক্লান্তি। প্রতিটি পা মেঝেতে ফেলার আগে সে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মেপে নিচ্ছে কোথায় ফেললে শব্দ সবচেয়ে কম হবে। এরপর ক্লান্ত পায়ে এগিয়ে এসে ধপ করে সোফায় গা এলিয়ে দেয় সে। বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে একটা দীর্ঘশ্বাস। মনে হলো সারাদিনের বিজনেস চালানোর চাপ সে এখন রিলিজ করল কাঁধ থেকে। সেই চাপের সাথে সাথে নেমে এলো এমন এক অবসাদ, যা টাকা দিয়ে কেনা যায় না, ঘুম দিয়েও দূর করা যায় না।
ইনায়াতের দিকে এক পলক তাকিয়ে সে দৃষ্টি সরিয়ে নেয় আকাশের দিকে। এরপর শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ স্বরে বলে ওঠে, “ফ্লোরেন্স, আই নো তুমি আমার ওপর রেগে আছো। বাট ডিলটা তোমার বাবা করেছে, আই অ্যাম জাস্ট আ বায়ার। তুমি আমার কেনা প্রোপার্টি হলেও আমি তোমায় ফুল ফ্রিডম দেব। তোমার যা পছন্দ তুমি করতে পারো, শুধু আমার সাথে নরমাল হাজবেন্ড-ওয়াইফ রিলেশনশিপটা মেইনটেইন করে চলো।”
কথাগুলো শোনাল একটি ব্যবসায়িক চুক্তির শর্তের মতো। ঠিক যেভাবে কোনো বড় লেনদেনের কাগজে লেখা শর্তগুলো থাকে, যেখানে কোনো আবেগ নেই, আছে স্রেফ দেওয়া-নেওয়ার নিরেট হিসাব।

ইনায়াত ঘাড় ঘোরায় না। চোখ আকাশেই স্থির রেখে, কণ্ঠে বিষ ঢেলে সে বলে, “আমি আপনার মতো মানুষের সাথে থাকতে চাই না, আয়াজ। ইউ আর সো চিপ অ্যান্ড কমপ্লিটলি আ সেলফিশ পারসন।”
প্রত্যুত্তরে আয়াজ হাসে। তার এই তাচ্ছিল্যভরা হাসি, যেটা তার ঠোঁটের কোণে সবসময় লেপ্টে আছে। মনে হয় দুনিয়ার সব অপমান তার কাছে একটি হালকা বিনোদন মাত্র। সে অনেক আগেই শিখেছে অপমানকে অলংকারের মতো গায়ে জড়াতে। তাই অত্যন্ত নির্লিপ্ত স্বরে সে উত্তর দেয়, “যা ভাবার ভেবে নাও, বাট আই অ্যাম নট লেটিং ইউ গো। গট ইট?”
কথাটা ইনায়াতের ভেতরের আগুনে ঘি ঢেলে দিল। এবার সে ঘুরে দাঁড়ায়। সেই মূর্তি হঠাৎ একটি আক্রমণাত্মক তীরে পরিণত হলো। এতক্ষণ যে নীরবতা জমা হচ্ছিল তার ভেতরে, সেটা এখন বিস্ফোরিত হলো। তার চোখে তীব্র ঘৃণা, ঠোঁটে চাপা ক্ষোভ। এক সেকেন্ডও চিন্তা না করে সোজা আয়াজের মুখ বরাবর থুতু ছিটিয়ে দেয় সে। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে, আত্মবিশ্বাসের সাথে বলে, “দ্যাটস মাই আনসার।”

বলেই সে পা বাড়ায় ভেতরের ঘরের দিকে। তার পায়ে পায়ে খেলছে আগুন, প্রতিটা পদক্ষেপে মেঝেতে খোদাই হয়ে যাচ্ছে একটি গোপন প্রতিজ্ঞা।
কিন্তু আয়াজ নড়ে না। সোফায় বসেই ধীরগতিতে রুমাল বের করে মুখ মুছে নেয় সে। দেখে মনে হচ্ছে সে মুছে নিচ্ছে না কোনো অপমান, বরং মুছে নিচ্ছে একটি দামি গিফটের স্পর্শ, যেটা সে জীবনে প্রথমবার রিসিভ করল কারো কাছ থেকে। তখনই তার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে সেই চেনা ডেভিলিশ স্মাইল। সে বিড়বিড় করে বলে, “জাস্ট একটু স্পিট, টলারেট করে নিলাম।”
তার চোখে কোনো ঘৃণা নেই, আছে এক অবিশ্বাস্য মুগ্ধতা। যেভাবে থাকে আগুনের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া পতঙ্গ দেখার জাদু, ঠিক সেভাবে থাকে ঝড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির প্রথম ফোঁটার স্বাদ নেওয়ার পাগলামি। এই আগুনটাই তার প্রয়োজন, এই বিষটাই তার তৃষ্ণা, আর এই ঘৃণাটাই তার নেশা।

কিছুক্ষণ পর আবারও ফিরে আসে ইনায়াত। এবার তার দৃষ্টিতে ভিন্ন এক দৃঢ়তা। ঘৃণার পাশে এখন এসে দাঁড়িয়েছে নিখুঁত হিসাবনিকাশ। সে খুব ভালো করেই বুঝে গেছে, ঘৃণা একা কিছু ভাঙতে পারে গঠনমূলক কৌশল ছাড়া। সে সরাসরি আয়াজের সামনে দাঁড়িয়ে হাত পাতে, “আমার ওই ড্রাগসটা লাগবে। ডি-থ্রি, যেটা নিলে তিন মাস কোনো কমপ্লিকেশনস হয় না, ওটা দিন আমাকে।”
আয়াজ ভ্রু কোঁচকায়। ঠোঁট বাঁকিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে, “এতে আমার প্রফিট কী হবে?”
ইনায়াত সামনের দিকে ঝুঁকে আসে। এক হাতে চেপে ধরে আয়াজের কলার, অন্য হাত রাখে সোফার পেছনের অংশে। পুরো শরীরটা শিকারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া এক বাজপাখির মতো, যার প্রতিটি পালক এই মুহূর্তে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে প্রস্তুত। মুখটা এতই কাছে যে আয়াজ তার নিশ্বাসের উত্তাপ অনুভব করতে পারে, অথচ সেই উত্তাপের ভেতর লুকিয়ে আছে হিমশীতল থ্রেট। চোখে চোখ রেখে, ভয়ংকর স্বরে সে বলে, “আপনার এত ড্রামা আর ফেক স্টোরি সাজানোর পর, টুমরো যে আপনার ‘ওয়াইফ’ হওয়ার ক্রাউনটা আমি পরব, সেটার রিটার্ন হিসেবে যদি এটা না দেন, তাহলে রাইট নাউ আমি সব ডেস্ট্রয় করে দেব।”

আয়াজ একটুও পলক ফেলে না। ওর এই ক্ষুব্ধ চোখের গভীরতায় তাকিয়ে শান্ত স্বরে সে বলে, “ওয়াইফ হলে তো আমার প্রফিটের চেয়ে তোমার বেনিফিটই বেশি।”
ইনায়াতের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। দাঁত চেপে সে আয়াজের চিবুক চেপে ধরে। সে নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে তার অহংকারের উৎসটুকু, কারণ এই চিবুকের নিচেই লুকিয়ে আছে এই সব শব্দ, যেগুলো তার সহ্যক্ষমতার বাইরে। তার কণ্ঠস্বর ধারালো ছুরির মতো শোনায়, “কতবার বলেছি, আপনাদের এই হাই-সোসাইটির মিস, মিসেস, এসব টাইটেলে আমার জিরো ইন্টারেস্ট। সো প্রফিট-লসের ক্যালকুলেশন আমি করছি না।”
আয়াজ আলতো করে তার হাতটা ছাড়িয়ে নেয়। তবে সে হাতটি ছেড়ে দেয় না, বরং নিজের বুকের ঠিক মাঝখানে চেপে ধরে, ঠিক হৃৎস্পন্দনের ওপর। এই স্পর্শের মাধ্যমে সে বোঝাতে চাইল, পৃথিবীর সব বিষ এখানে ঢেলে দাও, এটা সহ্য করার জন্যই এর জন্ম হয়েছে, এই হৃদয়ের প্রতিটা স্পন্দন তোমার নামেই যুক্ত। এরপর সে জিজ্ঞেস করে, “আন্ডারস্টুড। তা এটা দিয়ে তোমার ইনটেনশন কী? তুমি তো আগেই নিয়ে নিয়েছো।”
ইনায়াতের কণ্ঠে বরফশীতল সুর, “দিবেন কি না? জাস্ট সে ইয়েস অর নো।”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে আয়াজ বলে, “ফাইন, দিচ্ছি।”

ইনায়াত পিছিয়ে আসে। তবে বিজয়ীর মতো নয়, বরং একজন সংগ্রাহকের মতো। আয়াজ উঠে গিয়ে ঘরে প্রবেশ করে। এরপর আলমারি খুলে, লকারের ভেতর থেকে বের করে আনে একটি কাঁচের ছোট শিশি। ফিরে এসে সেটা সে তুলে দেয় ইনায়াতের হাতে। শিশিটার ভেতর তরলটা এমনভাবে নড়ে ওঠে, মনে হয় সেও খেয়াল করছে সে কারো মাস্টারপ্ল্যানের একটি ক্ষুদ্র অথচ ভয়ংকর অংশ।
ইনায়াত শিশিটা নিজের হুডির পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে বলে, “ওকে, এবার আমার সাথে চলুন।”
আয়াজ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, “কোথায়?”
ইনায়াত নিজের আলমারি খুলে এক জোড়া ফ্ল্যাট শু বের করতে করতে উত্তর দেয়, “আমার নাভিদের সাথে মিট করতে হবে। এখন একা বের হলে থাউজেন্ডস অব কোয়েশ্চেন ফেস করতে হবে। সবাই জিজ্ঞেস করবে কোথায় যাচ্ছি। সো আপনি আমায় হেল্প করবেন। আমি আপনার সাথে যাব এবং স্ট্রেট বলে দেব উই আর গোয়িং অন আ ডেট।”
শুনে আয়াজের ভেতরটা হালকা বোধ করে, ডেট! কথাটা মিথ্যে জানা সত্ত্বেও তার বুকে আলাদা এক উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে, ঠিক শীতের সকালে হাতের মুঠোয় ধরা প্রথম কফির কাপের ছোঁয়ায় যেমন অনুভব হয়। কিন্তু মুখে সে ধরে রাখে এক সাধারণ ভাব, “আমি যেতে পারি, বাট আই হ্যাভ আ কন্ডিশন।”

ইনায়াত বিছানায় বসতে বসতে বিরক্তিকর ভঙ্গিতে বলে, “ফাইন, যেতে হবে না। আপনার কোনো কন্ডিশন আমার পক্ষে অ্যাকসেপ্ট করা পসিবল না।”
কথাটা শেষ হতে না হতেই আয়াজ এগিয়ে আসে। ইনায়াতের সামনে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে সে। এক সম্রাট নিজের সিংহাসন ভুলে একজন রণদেবীর পায়ের কাছে মাথা নত করলে দৃশ্যটা যেমন দেখায়। নিজের হাতে সে তুলে নেয় ইনায়াতের এক পা। এরপর ধীরগতিতে, অতি যত্নের সাথে তার পায়ে জুতো পরিয়ে দিতে দিতে বলে, “আরে না, আমি তো যাবই। ডিনাই করলাম কবে? আই উইল ডেফিনেটলি গো।”
ইনায়াত তাকিয়ে থাকে আয়াজের হাতের দিকে। তার ঠোঁটে ফুটে ওঠে তাচ্ছিল্যের হাসি। তারপর বিষাক্ত স্বরে বলে সে, “মিস্টার ক্রাউন, আপনি ক্রাউন হয়ে একজন রক্ষিতার… আই রিপিট, একজন রক্ষিতার মেয়ের পা টাচ করছেন। আপনার ইগোতে একটুও লাগছে না? ডোন্ট ইউ ফিল শেইম?”

আয়াজ মাথা তোলে। প্রশান্ত দৃষ্টিতে তাকায় সে, সেই চোখে লজ্জার বদলে আছে একটি রাজত্ব। সে হালকা হেসে বলে, “নাহ, নট অ্যাট অল। কেন, তোমার এতে কোনো প্রবলেম হচ্ছে?”
ইনায়াত বিরক্তির সাথে মুখ ঘুরিয়ে নেয়, “ওভারঅ্যাক্টিং করা ভালো, বাট নট দিস মাচ। এনিওয়ে, গেট আপ, যাওয়ার টাইম হয়ে গেছে।”
ইনায়াত উঠে দাঁড়ায়। আয়াজ ফোনটা পকেটে রেখে অনুসরণ করতে থাকে ইনায়াতকে। এরপর করিডোর ধরে সামনের দিকে হাঁটতে থাকে ইনায়াত। এক পলক আড়চোখে দেখে নেয় পেছনের মানুষটাকে। তারপর হুডির ক্যাপটা টেনে তোলে মাথায় সে। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে এক ডেভিলিশ স্মাইল। অন্ধকারের মধ্যে জ্বলে ওঠা ফুসফুসের এক আগুন, যা কেউ দেখতে পারে না, শুধু নিজেই অনুভব করে তার উত্তাপ।
মনের ভেতর সে বলে, “আপনি আমার প্রতি অবসেসড, মিস্টার ক্রাউন। এই অবসেশনটাই হবে আপনার কবর খোঁড়ার মেইন উইপন। আপনার থ্রুতেই আমি আপনাকে এবং আমার বাবাকে, দুজনকেই সেইম ট্র্যাপে ফেলব। আপনি ভাবছেন আমাকে কিনেছেন, বাট ইউ হ্যাভ নো আইডিয়া, আপনি নিজেই একটা ক্যাশ নোট হয়ে বসে আছেন আমার পকেটে।”

পেছনে হাঁটতে হাঁটতে আয়াজের চোখ আটকে যায় ইনায়াতের হাঁটার ভঙ্গিতে। এই দৃঢ়, আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপ, প্রতিটি পা মনে হচ্ছে মেঝেকে নির্দেশ করছে, মেঝে তা বিনা প্রশ্নে মান্য করছে। তার ঠোঁটেও ফুটে ওঠে শয়তানি হাসি। মনে মনে সে বিড়বিড় করে ওঠে, “তোমার এই হাঁটার অ্যাটিটিউডটাই আমার ভীষণ ফেভারিট, ডার্লিং। তোমার এই কনফিডেন্সই তোমায় একজন পারফেক্ট গ্যাংস্টার-ওয়াইফ হওয়ার জন্য ডিজার্ভিং করে তুলেছে। তুমি খুঁজছ আমার রুইন হওয়ার রুট, আমি প্ল্যান করছি তোমার সাথে আমার ফিউচারের। তুমি যত নাইফ শার্প করবে, আমি ততই তোমার হাতে তুলে দেব আরও ধারালো ওয়েপন। বিকজ, ওই ছুরির প্রতিটা স্ট্রাইক আমার কাছে তোমার ফিঙ্গার-টাচের মতো।”

ইশকে এ নিকাহ পর্ব ১৬

দুজন মানুষ। একই করিডোরে হাঁটছে, পায়ের শব্দের রিদমও হয়তো অজান্তেই মিলে গেছে, দুটো হৃৎস্পন্দনও হয়তো এক স্পন্দনেই বাজছে দেয়ালে দেয়ালে। অথচ একজন বুনছে ধ্বংসের জাল, অন্যজন দেখছে সংসারের স্বপ্ন। একই ছাদের নিচে, একই ট্র্যাকে হাঁটলেও দুজনের গন্তব্য দুই মেরুতে। উত্তরে এবং দক্ষিণে, আগুনে এবং বরফে।

ইশকে এ নিকাহ পর্ব ১৮