সাঁঝের মায়া পর্ব ৬৮ (২)
দুর এ দিলশাদ্ দুআা
বেলা গড়িয়ে দুপুর হয়েছে। সূর্য মাথার ওপর একেবারে। যোহরের ওয়াক্ত। অন্য দিন নামাজ পরতে রাহাত বাইরে গেলেও, তিতিরকে একা রেখে আজকে যায়নি। বাড়িতেই নামাজ পরে নিয়েছে। একা নিজের ব্যাচেলর জীবনে যা টুকটাক রান্নাবান্না শিখেছে, সে-সব বড্ড যত্ন করে রেঁধে ফেলেছে আজকে । অনলাইনে অর্ডার করে এরই মধ্যে তিতিরের জন্য কয়েক সেট জামাকাপড়ও নিয়ে আসা হয়েছে। তিতির বাড়িতে ফোন করেনি। রাহাত কয়েকবার সাধলেও, সে নিজেই ইচ্ছে করেই ফোন দেয়নি বাড়িতে। কেনো,কি কারণে সে-সব জিজ্ঞেস করে ব্যাতিব্যাস্ত করেনি রাহাতও। খাবার টেবিলে মনমরা হয়ে আছে মেয়েটা। ভাতের থালায় আঙুলের উদাস পায়চারি করে যাচ্ছে তখন থেকে। গোসল করে নিয়েছে, সকালের তুলনায় বেশ ফ্রেশ লাগছে দেখতে। রাহাত, মাংশের প্লেটখানা মেয়েটার দিকে এগিয়ে দিতে দিতে আলতো গলায় ডাকলো।
—’ তিতির? ‘
—’ হু। ‘
—’ খাচ্ছো না কেনো? ‘
তিতির জবাব দিলো স্বাভাবিক ভাবেই। ভাতের লোকমা মুখে তুলতে তুলতে।
—’ খাচ্ছি। ‘
—’ রান্না ভালো হয় নি? আমি আসলে সেরকম পারিনা। মা অসুস্থ হওয়ার পর, টুকটাক যা শিখেছি। ‘
মৃদু হাসলো মেয়েটা। খাবার মোটেই কাঁচা হাতের রান্নার মতো লাগছে না। বরং যেকোনো রেস্তোরাঁর শেফ কে হার মানাবে বোধহয়।
—’ খাবার পারফেক্ট একদম। আসলে আমারই খিদে নেই তেমন। ‘
মেয়েটার চোখের নিচের কালচে ভাব নজর এড়ায় নি রাহাতের। ঈশানের কেস টা নিয়ে, কয়েকদিন যে ভীষন মানসিক চাপ গিয়েছে মেয়েটার ওপর, তা আর বুঝতে বাকি রয় না তার।
—’ তোমার বাড়ির মানুষ কে ফোন করতে দিলে না কেনো? ফিরতে চাও না? ‘
—’ চাইবো না কেনো? না ফিরে উপায় কি? কে আছে আমার! ঘুরেফিরে গন্তব্য তো ওখানেই। বাবা মা বেচে থাকলে বিষয় অন্য হতো । যাই হোক, একটু সময় নিচ্ছি নিজেকে গুছিয়ে নিতে। যে বেই মানির স্বীকার হয়েছি, ক্ষত সারতে একটু সময় লাগবে তো নাকি? যে স্বামী ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে ছুঁয়েছে দিন কে দিন। আচমকা তার হাতে মানুষের র ক্ত দেখা কতটা ভয়ংকর, ভাবতে পারেন? এক দু’দিন কি আশ্রয় দেবেন না?’
বড্ড ব্যাস্ত হলে রাহাত। তিতিরের কথাগুলো আচমকাই তার ভীষন অভিমানী লাগলো। মেয়েটা খুবই হতাশা মাখা কন্ঠে আউরিয়েছে বাক্যখানা।
মেয়েটার এমন অভিমানি কথার জবাবে দ্রুত গলায় বললো,
—’ আমার বাড়িতে তোমার জায়গা হবে না! এটা কি করে জিজ্ঞেস করতে পারলে, পরীই?’
তিতির আর কথা বাড়ালো না গোটা টা সময়। আর না তো রাহাত। নিঃশব্দে খাবার শেষ করলো দু’জনেই। খাবার শেষে মেয়েটা নিজের জন্য বরাদ্দকৃত কামড়ায় চলে গেলো দ্রুত পায়ে। বাইরে বাতাস বইছে। গোটা দিনের খাঁ খাঁ করা তপ্ত রোদ আচমকাই পরে গিয়েছে। রাহাতের বাড়ির পশ্চিমের বারান্দার এপাশটা বড্ড সুন্দর। এখানে দাঁড়ালে সামনে বুড়িগঙ্গার সুন্দর ভিউ দেখতে পাওয়া যায়। বাতাসে নদীর পানিতেও ঢেউ খেলে যাচ্ছে জোরে জোরে। কচুরিপানা গুলো আপনমনে ভেসে চলেছে। উত্তাল ঢেউয়ে দলছাড়া হচ্ছে সে-সব।
হিসেব মতে কালকে কোর্টে তোলা হবে ঈশান কে। তিতিরের সাথে যখন ফোনে কথা হচ্ছিলো, তখন যে বললো – সে নাকি জেলে নেই, ছিলো না কখনোও। তাহলে! জেলে নেওয়া হবে কেনো। আর আচমকা কোথা থেকেই বা পাওয়া গেলো তাকে। এ-সব সাতপাঁচ ভাবাভাবির মধ্যেই টোকা পরলো দরজায়।
রাহাত এলো হাতে কফির কাপ নিয়ে। নিজের জন্যও এনেছে সম্ভবত। তিতির মৃদু হেসে বসতে ইশারা করলো তার পাশের বেতের মোড়াটায়।
—’ ভীষন সুন্দর করে সাজিয়েছেন ফ্ল্যাটটা। ‘
ইষৎ উষ্ণ কফিতে চুমুক দিতে দিতে সামান্য ঘাড় ঝুঁকালো সে।
—’ তা সাজিয়েছি। ‘
—’ জায়গাটাও ভীষন সুন্দর। এপাশের বেলকনিতে দাড়িয়ে একেবারে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছি।’
—’ যাক, আমার কিছু তো তোমাকে মুগ্ধ করলো অন্তত।’
তিতির সরু চোখে তাকালো মানুষটার দিকে। লোকটার বাম ভ্রু ওপরের দিকটায় ছোট্ট কাটা দাগ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। বেশ ক্ষত হয়ে আছে জায়গাটায়। এতটাই যে, চোখে পরছে স্পষ্টত।
—’ কপালে কেটেছিলো কি করে? ‘
বাঁ হাতে কপালের নিদ্রিষ্ট জায়গাটায় আঙুল ছুঁয়িয়ে হাসি হাসি মুখ করে বললো,
—’ ছোট বোন ফুলদানি ছুঁড়ে মেরেছিলো।’
—’ বলেন কি! সোজা ফুলদানি? ‘
হাসলো রাহাত। কফির আরেক সিপ নিতে নিতে বললো,
—’ মা অসুস্থ হওয়ার পর… আমি আর ও। সত্যি বলতে ক্লান্ত। আমার হয়তো একটা বয়স হয়েছে। কিন্তু মেয়েটা ছোট থেকে এই একঘেয়েমি বিষয়টা ফেস করে আসছে। দু’জনেই একপ্রকার নিজেদের জীবন বিকিয়েই দিয়েছি মায়ের পেছনে। সেটা অবশ্য আফসোসের কিছু বলে মনে করি না, তবে যার কাধের দায়িত্ব, রেগে যাওয়াটা তাকেই মানায়। ওরও তাই। হুট করে একদিন মানসিক চাপে রেগে গিয়েছিলো। ছোড়াছুড়ি করছিলো ঘরের জিনিসপত্র। তখনই আরকি ছোট্ট একটা কাচের টুকরো এসে বেঁধে। ‘
তিতির বুঝদারের মতো মাথা ঝাকালো। দিনের ভ্যাপাসা গরম কেটে শরীর শিরশির করছে এই ঝরো বাতাসে।
—’ আপনার মা আর বোন কোথায় এখন? ‘
—’ আমার বোনের কাজের সূত্রে উত্তরা থাকতে হয়। সেখানে রেখেছি। আমিও সেখানেই থাকি। তোমাকে নিয়ে…’
—’ বুঝতে পেরেছি। ‘
আবার কিছুক্ষণের নিরবতা চললো দু’জনের মাঝে। রাহাতের মুগ্ধ চোখ তখনো তিতিরেই স্থির। বহুদিন পর এমন এক অভাবনীয় সময় পার হচ্ছে তার জীবনে। নিরবতা ভেঙে কথা বললো তিতিরই প্রথম। নদীর বেগুনি রঙা কচুরিপানার ফুল গুলোর দিকে দৃষ্টি রেখে নিচু গলায় বললো,
—’ তখন যে বললেন না– আপনার কোনো কিছু অন্তত আমাকে মুগ্ধ করেছে। কথাটা আংশিক ভুল, রাহাত ভাই। ‘
এতক্ষণ পর সেই আগের কথার রেশ টেনে পুনরায় কথা বলায়, বেশ অবাকই হলো ছেলেটা। সুদর্শন মুখটা চকচক করে উঠলো। তিতির হাসলো একপেশে। মৃদু গলায় বললো,
—’ আপনি আপাদমস্তক একজন মুগ্ধ হওয়ার মতো মানুষ, রাহাত ভাই। আমার জীবনে আপনার মতো পারফেক্ট একজন পুরুষ আমি খুব কম দেখেছি। আসেনি আমার জীবনে…’
দম নিলো মেয়েটা।
—’ আমি যার ঘর করেছি, তার সাথে শুরুর দিনগুলো জা হান্নাম কেটেছে আমার। তবে আপনি এমন একজন ব্যাক্তি যে আমাকে আগলে রেখেছে দীর্ঘ সময়। দিনাজপুরে যখন প্রথম গেলাম, মনে আছে সে-সব দিন? ‘
—’ ভার্সিটির ছেলেরা তুমি বলতে পাগল হয়ে থাকতো। রাতদিন বিরক্ত করতো। ‘
—’ আর আপনি সে-সব জঞ্জাল পরিষ্কার করে ফেলতেন টের পাওয়া মাত্র। আমাকে কখনো কোনো ইমবয়ারেসিং পরিস্থিতিতে পরতেই হয়নি। ছোট বাচ্চার মতো ট্রিট করে, আগলে রাখতেন। ‘
শব্দ করেই হাসলো ছেলেটা। সে-সব দিন ভুলবে কি করে সে! ওরকম মধুর মূহুর্ত তার জীবনে আর আসবে? আসবে না হয়তো। প্রথম প্রেম এসেছিলো জীবনে। প্রেমে পরেছিলো সামনের ওই মেয়েটির। এখন পূর্নযৌবনা একজন রমনী হলেও, তখন মেয়েটা নিছকই বাচ্চা! তেরো- চৌদ্দ বছরের সদ্য বয়ঃসন্ধিতে পা দেওয়া কিশোরি। দু’পাশে লম্বা বেণি করে স্কুলে ছুটতো। পাতলা গরনের মেয়েটার কাধের ভারি ব্যাগাটায় কুঁজো হয়ে হাটতো একপ্রকার। মাথা নিচু করে যেতো, মাথা নিচু করে ফিরতো। আশেপাশে তাকাতো না কখনো। পথেঘাটে আর বাকিদের মতো হি হি করতে দেখতো না কখনো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাহাত কিছু বলবে তার আগেই তিতির নিজের হাতের কাপটা বেতের টেবিলে রেখে খানিকটা ঝুঁকে এসে হাঁটুতে নিচের হাতের কনুই ঠেকিয়ে বললো,
—’ আপনাকে পায়ে ঠুকরে, পরিবারের চাপে হোক বা নিজের আবেগে– ঈশাান আরশাদ দেওয়ান কে বিয়ে করা, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল, রাহাত ভাই । ‘
থমকালো রাহাত । বড্ড চমকালোও। বুকের বাঁ পাশের বিদ্রোহ জোরালো হলো বড্ড । কোনোমতে অস্পষ্ট আওরালো,
—’ ভুল না হলে, সঠিক চিনতে কি করে ! ‘
—’ তা ঠিক। ‘
—’ ভাগ্য সবই।’
—’ নিষ্ঠুর ভাগ্য। ‘
—’ আপনি নিজের জীবনটা নতুন করে শুরু করেননি কেনো? ‘
—’ তোমাকে ছাড়া? ‘
—’ আমি ছিলামই বা কবে।’
—’ এখনো আছোই। প্রথম দিনের মতোই।’
—’ আমি বিবাহিত। ‘
—’ এখন ডিভোর্সি।’
—’ ডিভোর্সি মানে বোঝেন?’
চোখে চোখ রাখলো মেয়েটা। শান্ত, অথচ দৃঢ় গলায় বললো,
—’ এটা কতটা গভীর একটা শব্দ। ডিভোর্সি! ‘
—’ হোক। ‘
—’ তারপরও অনূভুতি কমেনি?’
—’ বিন্দুমাত্র নয়। ‘
আরেকটু একপেশে হাসলো মেয়েটা। কানের পিঠে ছোট্ট ছোট্ট চুলগুলো গুঁজে দিতে দিতে ভাবলেশহীন গলায় বললো,
—’ বিবাহিত, ডিভোর্সি – এসবের মানে বুঝতে পারছেন? আমরা টিভি স্ক্রিনের কোনো কাল্পনিক চরিত্র নই কিন্তু, রাহাত ভাই। যে, বিয়ের তিন-সাড়ে তিন মাসের মাথায় এসেও বলবো, “ আমাকে এখনো আমার স্বামী স্পর্শ করেনি, আমাদের মধ্যে কিচ্ছু হয়নি। আমরা আলাদা ঘুমাতাম। ‘
রাহাত কিছু বলতে যাবে, হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলো রমনী।
—’ আমাকে বলতে দিন। আমার প্রতি ভ্রান্ত ধারনা নিয়ে, আপনি আমার প্রতি ভালোবাসা রাখেন। আমি আপনার সেই আগের তিতির নেই। যাকে আপনি ভালোবেসেছিেন। সে এখন..।’
—’ আমি তোমাকে ভালোবাসি। তোমার গর্ভে যদি ঈশানের সন্তানও থাকে, তবুও ভালোবাসি। সেই বাচ্চাটাকেও ভালোবাসবো আমি। এ-সব কথা আমি তোমাকে আগেও বলেছি। তোমার বিয়ের পর, যতবার দেখা হয়েছে, ততবার বলেছি। ‘
তিতির অনিমেষ তাকিয়ে থাকে সামনের মানুষটার দিকে। রাহাতও বেশ ঘনিয়ে বসেছে এদিকটায়। দমকা বাতাসে এদিকে তাকিয়ে থাকতে সম্ভবত কষ্ট হচ্ছে মানুষটার। তিতির বিস্ফোরণ ঘটালো এবারে। ঠোঁট কামঁড়ে নিজেকে ধাতস্থ করে, আচমকাই বলে উঠলো,
—’ বিয়ে করবেন আমায়? ‘
শ্বাস ফেলতেও ভুলে গেলো ছেলেটা। ভুল শুনছে কি-না বুঝে এলো না তার। অস্ফুটস্বরে শুধালো,
—’ কী-ই? ‘
—’ বিয়ে করবেন আমাকে? ‘
—’ ভেবে বলছো? ‘
—’ সম্পূর্ণ সজ্ঞানে । ঈশান আরশাদ দেওয়ান কে শাস্তি দিতে এর থেকে ভালো উপায়, আমার জানা নেই…’
—’ শুধু ওকে শাস্তি দিতে? ‘
—’ নাহ, হয়তো নিজের জীবনটা পুনরায় গুছিয়ে নিতেও। করবেন?’
—’ তুমি চাও?’
—’ চাইছি বলেই জিজ্ঞেস করলাম। ‘
দু’হাতে মুখ ডললো রাহাত। তিতিরের ধারনা হলো, হয়তো ভাবছে বিষয়টা নিয়ে। তবে তা নয়। রাহাতের রক্তিম চোখ দেখে ভুল ভাঙলো তার। কাঁদছে নাকি লোকটা!
—’ ভাগ্য সবসময় নি’ষ্ঠুর হয়না, পরীই। বলো? সময় মতো সব আপনা-আপনিই আসে। ‘
বেতের চেয়ারে গা এলিয়ে তিতির বুকে আড়াআড়ি হাত ভাজ করে বসলো। চারমাস আগের দেখার সেই তিতিরের সাথে আজকের তিতিরের অনেক তফাত। আগের তিতিরের চোখমুখে অজানা একটা সরলতা, ভিতু ভিতু ভাব, সবসময় দেখতো। আর এই তিতির! এই তিতির একদম বুঝদার, প্রাপ্ত বয়ষ্ক বাঙালি নারী!
—’ আমাকে একটা সাহায্য করতে হবে, রাহাত ভাই।’
—’ বলো।’
—’ তমা…’
—’ তমা? ‘
—’ তমার খোঁজ বের করতে হবে। ‘
—’ নিশ্চয় খুঁজবো। আমি আমার পরিচিত লোক লাগিয়ে দিয়েছি। সকাল থেকেই খোঁজ করছে তারা। বাড়িতে যায়নি ও। ‘
—’ ওকে খুজে এনে দেবেন। ‘
—’ দেবো। ‘
তিতির নিজের শীতল হয়ে আসা মুখটা দু’হাতে ঢেকে বসে রইলো মিনিটখানেক। সেভাবেই মুখ গুঁজে ভীষন দৃঢ় গলায় বললো,
—’ এই সবের জন্য দায়ি ঈশান আরশাদ দেওয়ান। আমি সবকিছুর জন্য তাকে ক্ষমা করতে রাজি। কিন্তু… কিন্তু তমার যদি কিছু হয়ে যায়, এই একটা জিনিসে আমি ইহকাল, পরকাল কোনোকালেই তাকে ক্ষমা করবো না। তার নোংরামির জন্য আমাদের পরিবার ধ্বংস হলো। প্রথমে ছোটপু, তারপর আমি, তারপর এবার তমা! সব মানবো। কিন্তু তমার কিছু হলে…’
—’ জানি না, নিজের দেওয়া কথা কতটুকু রাখতে পারবো। তবে তমা কে খুঁজে পেতে যা করতে হয়, সেটাও করবো । ‘
*
—’ বের হচ্ছেন কোথাও ? ‘
রাহাত, টিভি ক্যাবিনেটের ওপর থেকে নিজের ওয়ালেট খানা পকেটে গুঁজে, মৃদু হেসে বললো,
—’ আমার বোন কে নিয়ে আসি । রাতে, এই গোটা বাড়িতে তুমি আর আমি – বুঝতেই পারছো। বিষয়টা খারাপ দেখায় । প্রতিবেশী রা মাইন্ড করে ফেলতে পারে । ‘
মাথা দোলালো তিতির। মাগরিবের নামজ পরে সবেই বেরিয়েছে রুম থেকে। মাথায় এখনো ওড়নাটা গোল করে প্যাচানো।
—’ ফিরতে কতক্ষণ লাগবে? ‘
—’ ভয় পাবে কি? ‘
—’ নাহ, তার জন্য নয়।’
—’ জ্যাম ঠেলে আসতে – যেতে যতক্ষণ আরকি। ‘
—’ তমার কোনো খোঁজ পেলেন। ‘
—’ সেটাও নেবো। ‘
রাহাত বেড়িয়ে যেতেই এগিয়ে গিয়ে দরজা টা লক করে দিলো তিতির। গোটা ঘর জুড়ে শুধু ঘড়ির টিকটিক শব্দ। শব্দহীন পায়ে চলেও এলো নিজের রুমের মধ্যে। বাঁকা চাউনি দিলো গোটা কামড়ায়। নজরে পরলো না কাঙ্ক্ষিত জিনিসটা। আচমকা দরজার কোনা থেকে একটা ঝাড়ু টেনে বের করে দেয়ালের কোনায় তাকিয়ে খেদোক্তি ছেড়ে বললো,
—’ তেলাপোকার বা চ্চা… তোকে তো আজ আমি! ‘
একপ্রকার ছুটে গিয়েই সজোরে আঘাত করলো দেয়ালের এদিক-সেদিক। গোছানোর বিছানার ওপর উঠেও লম্ফঝম্প চললো একদফা। তেলাপোকা বাবাজি যে কিছুতেই মনুষ্য জাতির কাছে ধরা দিতে নারাজ, তা তিতিরের হতাশ মুখাবয়ব দেখেই বুঝতে পারা যায় । সময় গড়ালো প্রায় পাঁচ থেকে সাত মিনিট। রুমের ওপরের দিকে এক কোণায় চোখ সরু করে তাকালো মেয়েটা। বিরবির করে তেলাপোকা টাকে গালিও দিলো কয়েকবার। তারপরই সজোরে বারি বারলো সেখানে। বিজয়ীর হাসি জুটলো গোটা মুখ। একপ্রকার লাফিয়েই উঠলো খুশিতে।
শব্দ করে হেসে উঠলো রাহাত। রাহাতের ড্রাইভার ছেলেটা অল্প বয়সের। আচমকা কি এমন দেখল তার স্যার! বে – আক্কেল হয়ে তাকাতেই দেখলো হাস্যজ্জল মানুষ টাকে। ফোনে কিছু একটা দেখছে। তিতির তারপর বড্ড স্বাভাবিক ভাবে পায়চারি করে গেলো। ঘরে সাজানো এনটিক গুলো মুগ্ধ চোখে দখলো, জানালা খুলে রাতের চাঁদ – তারকাময় আলো ঝলমলে রাত্রি দেখলো। তারপর বিছানায় গা এলিয়ে দিলো। এসির পাওয়ার কমিয়ে দিলো অনেকটা। রাহাত চ সূচক শব্দ করলো মুখে। এমনিতেই জ্বর৷ তারপরও এসি কমিয়ে দিচ্ছে এতটা। একবার ভাবলো ল্যান্ড লাইনে কল করবে কি-না। কল করে কি বলবে! সে কি করে জানলো তিতির এসির পাওয়ার এতোটা কমিয়েছে। গোটা বাড়িতে তারই সুরক্ষার জন্য সিসিটিভি সেট করে এসেছে, এটা জানতে পারলে মেয়েটার নিশ্চয় ভালো লাগবে না। তবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো খানিকের মধ্যেই। কমফোর্টার মুড়ি দিয়েছে মেয়েটা।
আজকে জ্যাম কমই। রাহাতের নিজের গন্তব্যে পৌছুতে অন্যদিনের থেকে সময় বেশ কম লাগছ। তবে জ্যাম লাগলো বলে। ঘন্টা খানেক হলো ঘুমিয়েছে তিতির। রাহাতের হাতে ফোনটা তখনো একই ভাবে ধরে রাখা। ধ্যান ভড়কালো তখন, যখন আচমকাই ব্লার হয়ে এলো স্ক্রিন! ভ্রু কোঁচকালো ছেলেটা। একে একে চেক করলো বাকি ঘরগুলো। সব গুলোই ব্লার! আচমকা? সার্ভার ডাউন বুঝি? এমনটা আগেও হয়েছে।
তিতির হাসফাস করে মুখ বের করলো কমফোর্টার থেকে। এসির পাওয়ারও বাড়িয়ে দিলো। বড্ড শীত করেছে। উঠে গিয়ে বসার ঘর থেকে তুলে নিলো টেলিফোন খানা।
—’ কতদূর পৌঁছেছেন ? ‘
—’ আর মিনিট বিশেক। ‘
—’ জ্যাম আছে রাস্তায়? ‘
—’ একটু। ‘
—’ কতক্ষণ লাগলো তাহলে পৌছাতে? ‘
—’ ঘন্টাখানেক। ‘
—’ আমি কি করবো এখন? ‘
—’ বুকে আসলে, আসতেই পারে কেউ। ‘
খেদোক্তি বের হলো তিতিরের মুখ থেকে। কি থেকে কি উত্তর! আশ্চর্য। তেঁতো গলায় বললো,
—’ বুকে আসার সময় হয় নি এখনো। বিয়ে টা হোক। যাবো। ‘
শব্দ করে হাসলো ওপাশের মানুষটা । গাড়ির হর্নের তীক্ষ্ণ আওয়াজে কান সরিয়ে নিলো তিতির।
—’ আপনার ড্রাইভার টাকে পাঠান। ‘
—’ হুমম। ‘
তিতির এসে আবার বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই, মিনিট খানেকের মাথায় সচল হলো সার্ভার। রাহাতের চোখের সমানে আমার স্পষ্ট হলো মনিটর। ফোন হাতে ধরেই তাকিয়ে ছিলো সে। মেয়েটাকে একই ভাবে দেখে মৃদু হাসলো ছেলেটা।
নিস্তব্ধতায় ঘেরা পাতালপুরীর মতো আশপাশটা। ঘুটঘুটে অন্ধকার। মানুষ কেনো, সামান্য কাকপক্ষীরও সাড়াশব্দ পাওয়া দুষ্কর। এটা সেই আগের জায়গাটা নয়, যেখানে তাকে আর তিতির কে প্রথম বার নিয়ে আসা হয়েছিলো। কারণ সকালে তবুও বাড়ির আলো-বাতাস অনূভব করতে পেরেছে। এখন সে-সব কিচ্ছুর বালাই নেই। ঢাকা শহরের মতো ব্যাস্ত, জনবহুল শহরে– এরকম শুনশান পাতালপুরী এরা কোথা থেকো আবিষ্কার করে বসে আছে কে জানে!
—’ আমার সাথে কি করবে উনি ? এভাবে এরকম একটা ঘরে কেনো নিয়ে আসা হলো আমাকে ? ‘
তমার কম্পিত কন্ঠের আওয়াজে, সাড়া দেওয়ার মতো কেউ নেই। যারাই তাকে নিয়ে এসেছে সবার মুখেই একপ্রকার কুলুপ এঁটে রাখা। হাজার বার জিজ্ঞেস করে, আর্তনাদ করেও কারোর মুখ থেকে একটা শব্দ অবধি উচ্চারণ করাতে পারেনি মেয়েটা । তবুও ভালো এখন মুখটা খুলে দিয়েছে, এতক্ষণ তো সেটাও দেওয়া হচ্ছিলো না। শ্বাস আঁটকে আসছিলো মেয়েটার । একপ্রকার জোরজবরদস্তি করেই মেয়েটাকে যে ঘরটায় নিয়ে আসা হলো, সেটার দক্ষিণের সাইটের দেয়ালে বিশাল একটা জানালা। খট করে দরজা লক করে লোকগুলো চলে যেতেই, বড্ড অসহায় হয়ে গোটা ঘরটা দেখলো মেয়েটা । পশ্চিমের দিকে বিশাল একটা বেড। পাশেই ছোট্ট একটা বেড সাইট টেবিল। যার ওপরে একটা টিমটিমে আলোর ল্যাম্প। গোটা ঘরে আলো বলতে এই এতটুকুই। আজানের শব্দ শুনে হিসেব রেখেছিলো বেলা কত হয়েছে। মাগরিবের আজানা পরেছে খানিক আগেই। এটা যে পুরান ঢাকাই, তা বলার অবকাশ রাখে না। নামাজের ওয়াক্ত হলেই, আশপাশ থেকে একের পর এক মসজিদ থেকে আজানের মধুর ধ্বনি ভেসে আসে। ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে বিছানাতেই বসলো মেয়েটা। তিতিরের কি অবস্থা করেছে লোকটা কে জানে। জ্ঞান ফেরার পর থেকে এখন অবধি তিতিরের কোনো খোঁজ পায়নি। দেয়ও নি কেউ। তমা পায়চারি করলো ঘরময়। বুদ্ধিদিপ্ত চেহারার মলিনতা খানিকটা হলেও কমেছে। গোটা দিনের মাথা যন্ত্রনা কমায়, আরও একটু ভালো লাগছে হয়তো বা।
রাতের খাবার দেওয়া হয়নি তাকে এখনো । গোটা দিনে একবারও দেয় নি যদিও। ভনভন করছে মস্তিষ্ক। কেমন একটা কুটকুট শব্দ হচ্ছে খাটের তলা থেকে। ইদুর হবে কি? এরকম রাত্রির বেলা, বদ্ধ কামড়ায়, আলেহীন বসে থেকে যেকোনো শব্দই বিচ্ছিরি রকমের ভয়ংকর শোনায়। তমা শুকনো ঢোক গিলো আশেপাশে পরখ করে। শব্দ টা ঠিক কোথা থেকে আসছে সেটা বোঝার জন্য। বাথরুম থেকে কি? ওদিকটায় এককোণয় মেজেন্টা রঙের পর্দা ঝোলানো। ধীর পায়ে সেদিকে এগিয়ে গিয়ে, কাঁপা হাতে পর্দাটা সরাতেই চোখে পরলো বাথরুমের দরজা। শব্দটা সেখান থেকেই আসছে । তমা ইতস্তত করলো বেশ সময় ধরে। অতঃপর সাহস জুগিয়ে খুট করে ছিটকিনি খুলতেই হতভম্ব হলো। দু’হাতে মুখ চেপে চ্যাঁচিয়ে উঠলো সজোরে। ভিতরের পুরুষটা বড্ড নির্বিকার। বসে ছিলো কমোটের ওপর। নাহ, কোনো বিশেষ কাজ সারছিলো না। ঢাকনা নামিয়েই দেওয়স কমোটের। তমা ভয়ার্ত হয়ে পিছিয়ে এলো কয়েক পা। আতঙ্কিত হয়ে মুখ চেপে ধরে আছে সে।
ভিতরের লোকটি বিরক্ত হলো বোধহয়। বিরক্ত গলাতেই বললো,
—’ আমাকে বোধহয় প্রথম দেখছো, এমন ভাব করছো কেনো?
—’ আ..আপনি…’
—’ কাকে এক্সপেক্ট করেছিলে? ‘
—’ বাথরুমে কাকে এক্সপেক্ট করবো? যাকেই করি, আপনাকে অন্তত না। ‘
—’ তা-ও ঠিক! ‘
তমা হুড়মুড়িয়ে সরে গিয়ে দাঁড়ালো ঘরের মাঝামাঝি। গায়ের নোংরা ওড়নাটা ঝটপট গায়ে জড়িয়ে চাপা গলায় শুধালো,
—’ আপনিই সব করেছেন তাহলে, শুরু থেকে? সম্মুখের সবই অভিনয় ছিলো? ‘
বাঁকা হাসলো লোকটা। এলোমেলো চলন ফেলে, বাইরে আসতে আসতে বললো,
—’ নাহ তো। তবে অভিনয় ভালোই করি তাই না বলুন, মিস নুসাইবা দেওয়ান? ‘
বিতৃষ্ণা ফুটে উঠলো মেয়েটার চোখেমুখে।
—’ জা নোয়ার। ‘
—’ অভিনয় না হয় করেছি। তাই বলে জা নোয়ার? আমি বিচার দেবো… ‘
ঘড়ির কাঁটা তখন নিজ মনে টিকটিক করছে রাত দশটার ঘরে। দশটা বেজে তেরো মিনিট। তমা হাঁটুতে মুখ গুঁজে বিছানায় বসা। কাঁদতে কাঁদতে বিধ্বস্ত চেহারা। এ কোথায় এসে আঁটকে গেলো! গায়ের লোমকূপ জেগে উঠছে। বাইরের উত্তাল আবহাওয়া জানান দিচ্ছে ভয়ংকর কিছু ঘটবে তার সাথে। ভাবাভাবির জন্য দীর্ঘ সময় দেওয়া হয়েছে আদতে তাকে।
কোনো পূর্ন সংকেত ছারা শব্দ করে দরজা টা খুলে যেতেই কাচুমাচু হয়ে এলো মেয়েটা। আতঙ্কিত নয়নে তাকাতেই দরজার সামনে ভেসে উঠলো পরিচিত মুখাবয়ব । রাগে, ঘৃনায় রক্তিম হয়ে উঠলো মেয়েটা। সঙ্গে সুশ্রী মুখে ফুটলো একরাশ জড়তা আর ভয়।
—’ সুইটহার্ট? অল গুড? হাহ? ‘
—’ আর আঁধারে দাঁড়িয়ে কেনো? এগিয়েই আসুন। রুপ টা দেখি ভালো করে । তিতিরের সামনে তো শুনলাম মুখদর্শন করেন নি। আমার ক্ষেত্রে উল্টো কেনো? ‘
ইয়াজ এগিয়ে এলো। গায়ের শার্ট টা প্যান্টের ভাজ থেকে আলগা করতে করতে বললো,
—’ ওকে আমাদের বা সর রাতে মুখ দেখাবো! শুধু মুখ কেনো সবই দেখাবো। সবই তো ওর। ‘
—’ পিওর ছেলে পাবে, তিতির। ‘
—’ সন্দেহ আছে? ‘
—’ আর বাকি মেয়েরা? ‘
—’ ট্রায়াল এগুলো। আমার তিতিরপাখির যেনো প্রথম দিন লোড না হয়ে যায়। পরীর মতো মেয়েটা। আমাকে সামলাতে প্রথম দিনই… না না, এটা মানতে নারাজ আমি। নিজেকে কাবু করার প্রচেষ্টায় এতো ট্রায়াল। ‘
তমা দুরুদুরু বুক নিয়েও শক্ত রাখলো নিজেকে। দূর্বলতা প্রকাশ মানেই, হার মেনে নেওয়া। তা হতে দেওয়া যায় না। শেষ মূহুর্ত অবধি নিজের সম্মানের জন্য লড়াই করে না গেলে, সে কেমন মেয়েমানুষ! কেমন নারীজাতি!
—’ তিতির কোথায়? ‘
কু’টিল চেহারাটা আরও তী’ক্ষ্ণ হলো ইয়াজের। দাঁতে দাঁত পিষে অতর্কিত চেপে ধরলো মেয়েটার গলা। তমার মনে হলো থা’বা বসেছে গলায়। শ্বা’স বন্ধ হয়ে গেলো। গোঁ গো করলো শ্বাস নিতে, মুখে কোনো শব্দ উচ্চারণ করতে।
—’ তিতির কোথায়, সেটা আমি বলবো? বলবি তো তুই। ‘
—’ আমাকে দয়া করে স্পর্শ করবেন না। আমি জানি না, তিতির কোথায়!’
ঝটকা দিয়ে বি’ছানায় ফেলো দিলো মেয়েটাকে। এক হাঁটু বিছানায় ঠেকিয়ে বাঁ হাত বিছানায় ভর রেখে ঝুকলো।
—’ তিতির কে কি দরকার ? দেওয়ান বাড়ির যেকোনো মেয়ে হলেই চলবে আজ রাতে। ‘
—’ অভিনয় টা বেশ ভালো করেই করে গিয়েছেন, এতগুলো দিনে। ‘
—’ না হলে দেওয়ান বাড়ির মেয়ে তিনটে বছর আমার প্রেমে হাবুডুবু খায়? ‘
—’ আদতে আপনি একটা জা’নোয়ার। আমি সেদিন ভুল দেখিনি তাহলে…’
কথা শেষ হয় না। সজোরে থা’প্পড় পরে মেয়েটা ফুলো গালে। দাঁত নড়ে গেলো বোধহয়। শব্দ করে কেঁদে ফেললো তমা। পা গুটিয়ে পিছিয়ে যাওয়ার আগেই টান পরলো পায়ে। হিড়হিড় করে টেনে নিজের কাছে নিয়ে এলো ইয়াজ। তপ্ত গলায় বললো,
—’ তোমাদের বাড়ির সবার সমস্যা কি জানো? প্রত্যেকটা এক লাইন বেশি বোঝো। আচ্ছা, তোমার রক্তা ক্ত দেহটা কাল তোমার ভাইকে উপহার দিলে কেমন হয় ? ভালো না ? ‘
বিষ্ফরিত নয়নে তাকিয়ে রইলো তমা। কাঁদছে হেঁচকি তুলে ।
—’ আর একটা কথা । কেমন হয় তোমার খু নের মামলায় তোমার ভাইকে ফাঁসিয়ে দিলে? “নিজের প শুত্ব ফলাতে গিয়ে, ঈশান আরশাদ দেওয়ান বলি দিলেন – নিজেরই আপন চাচাতো বোনকে।” হেডলাইন হবে। ওয়াহ্। সেরাহ্। তাই না? ‘
—’ এই খু ন, ধ র্ষন সব আপনার করা ? ‘
—’ না তো। ঈশান আরশাদের। সত্যি। তিন সত্যি। তোমার কসম, সুইটহার্ট । নাহ, নাহ। তোমার নূরি আপুর কসম। আমি ভদ্রলোক। পুরোপুরি। ‘
—’ আমাকে নিয়ে এসেছেন কেনো? ‘
— ভাবো ভাবো। ততক্ষণে আমি সিগারেট টা জ্বালাই। ‘
বিছানা ছেড়ে সরে গিয়ে পকেট থেকে সিগারেট জ্বাললো লোকটা। ব্যাস্ত হাতে গায়ের শার্টটা খুলে মাটিতে ফেললো। রুহ অবধি কাঁপলো তমার। এই মূহুর্তে চোখের সামনে ভাসছে আরেকটা অনাকাঙ্ক্ষিত মুখ। অনাকাঙ্ক্ষিত কি? নাহ। বড্ড কাঙ্ক্ষিত। এখন তার সাথে যে সর্বনাশ ঘটতে চলেছে, সেটার সম্পূর্ণ হকদার হিসেবে তমা আজীবন যাকে ভেবে এসেছে, সেই পুরুষের মুখ ভাসছে। তমা ঠোঁট টিপে, চোখ বুজে ফেললো। ঝরঝর করে কেঁদে, অস্ফুটস্বরে উচ্চারণ করলো,
—’ ন-নয়ন ভা-ইই। ‘
ইয়াজ ঘামছে। হাতের সিগারেটটা উ’ন্মাদের মতো টেনে শেষ করছে। তমা আতঙ্কিত হলো বড্ড। পালানোর কোনো উপায়ই নেই তবে। খোদা কে ডাকলো ব্যাগ্র কন্ঠে। নিজের সম্মান ভিক্ষা চেয়ে আর্তনাদ করে গেলো নিঃশব্দে। নয়নকে শেষ বারের মতো ব্যাক্ত করে গেলো কিছু বলতে না পারা আক্ষেপ।
—’ যে পুরুষের কাছে কলঙ্কহীন একটা নারী হয়েও, বিন্দুমাত্র ভালোবাসা পেলাম না। তার কাছে এই কলঙ্কের বোঝা নিয়ে কি করে আর , ভালোবাসার দাবি জানাবো! আজকে থেকে আপনার কাছে আমার ভালোবাসার দাবি ফুরালো, নয়ন ভাই । আপনি একজন ভালো, চরিত্রবান জীবনসঙ্গী ডিজার্ভ করেন । আমাকে ভুলে যাবেন কি? নাকি ঘৃনা করবেন? আপনার ভুলে যাওয়া, সইবে আমার। তবে ঘৃ না সইবে না। আমি ছিলামই না আপনার জীবনে। তমা বলে কেউ ছিলো না। কেমন? ভুলে যাবেন। ‘
ইয়াজ হাতের সিগারেটটা ছুঁড়ে কা’মুক চোখে পিছনে তাকাতেই, খোদাকে আরেকদফা ডেকে উঠলো মেয়েটা।
—’ কাউকে ডেকে লাভ হবে না, সুইটহার্ট। ‘
—’ আপনি আমার বোন কে ভালোবাসেন, বলেছিলেন। তিতির যদি কখনো জানতে পারে। আমার মৃ ত্যুর জন্য আপনি দায়ি। তখন? ও ইহজীবনে আপনার হবে বলে মনে করেন? ‘
বিজ্ঞের মতো ডানে- বায়ে মাথা নাড়লো লোকটা। আফসোসে যেনো ক্ষত বিক্ষত হচ্ছে। এমন মুখ করে বললো,
—’ সেটাই তো। তোমাকে আমার নিচে পি ষ্ট করার কোনো শখ বা পরিকল্পনা, কোনোটাই ছিলো না, সুইটহার্ট। ওটার পরিকল্পনা হয়েছে আজ সন্ধ্যায়। কেনো? জানতে চাও না? ‘
তিরতির করে কাঁপছে মেয়েটার ঠোঁট। তাকে কিছু জিজ্ঞেস ও করতে হলো না। ইয়াজ প্যান্টের বেলে হাত রাখতে রাখতে বললো,
সাঁঝের মায়া পর্ব ৬৮
—’ তোমার বোন কি বলেছে জানো? ঈশান আরশাদ দেওয়ানের সব পাপ সে মাফ করতে রাজি। কিন্তু আজকে তোমার যদি কিছু হয়ে যায়– তাহলে সে কখনো ঈশান কে মাফ করবে না। এখন তুমিই বলো, তিতির যদি ঈশানকে মাফই করে দেয়। আমার লাভ না ক্ষতি? অবশ্যই ক্ষতি? আর কাল যদি খবরের হেডলাইন হয় – তোমার খু ন ঈশানের হাতে! ভাবতে পারো। চেকমেট! তাই না? হুম? ‘
