সাঁঝের মায়া পর্ব ৬৮
দুর এ দিলশাদ্ দুআা
—’ সরি, মিস্টার ঈশান আরশাদ দেওয়ান। আপনার নামে যে এলিগেশন গুলো এসেছে, তার ভিত্তিতে বহু আগেই গ্রেফতারের আদেশ দেওয়া হয়েছিলো থানা থেকে। কাগজ পত্রের হিসেব দেখাচ্ছে, আপনি জেলে ছিলেন এ কটা দিন। আদতে তা নয়। ‘
পৌঢ় ভদ্রলোকটি পুলিশের পোষাক গায়ে জড়ানো। ঈশানরা হাসপাতালের মর্গের সাইট থেকে বের হয়ে আসছে। সামনে গটগট পায়ের আওয়াজ করে দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসা পুলিশ অফিসার কে দেখে নিজেদের পায়ের কদম থমকালো। ঈশান তখনো বেশ ডিসটার্ব। চোখমুখ কুঁচকে রয়েছে তখন থেকে। ফর্শা, পুরুষালি মুখটা কালচে হয়ে আছে গোটা দিনের দৌড়ঝাপে! সে মুখ ফুটে কিছুর বলার আগেই, সাজিদ পাশ থেকে এগিয়ে এলো।
—’ মিস্টার রহমান, আসলে…’
—’ আপনার কোনো কৈফিয়ত আমরা শুনতে রাজি নই, সাজিদ সাহেব। বন্ধুকে এ-সব এলিগেশন থেকে বাঁচানোর অভিযোগে আপনাকে সাসপেন্ড করা হয়েছিলো। জানি না আবার কি করে, আপনাকে কাজে জয়েন করতে বলা হলো। কোন ক্ষমতার ব্যবহার করেছেন। তবে কেসটা যখন তাহমিদের থেকে আমার ওপর হস্তান্তর করা হয়েছে, আমি নিশ্চয় আপনার কথা মেনে চলবো না? ‘
ভদ্রলোক পদের দিক থেকো সাজিদের সম পর্যায়ে হলেও, বয়সে বেশ সিনিয়র। কোনো ধরনের বেয়াদবি করা মোটেই ভালো দেখায় না।
—’ তা কেনো চলবেন! আপনার ওপর যেহেতু দায়িত্ব পরেছে, আপনার হান্ড্রেড পারসেন রাইট আছে নিজের মতো সিদ্ধান্ত নেবার। ‘
ভদ্রলোক সৌজন্যের তাগিদে মেকি হাসলেন। রাত হয়েছে অনেক। তবে রোগ আর রুগীর তাগিদে হাসপাতাল তখনও মুখর। নার্স থেকে শুরু করে রুগীর সজনরা ব্যাস্ত পায়চারি করেছে গোটা করিডর জুড়ে। পুলিশের পোষাকে এভাবে এতজনকে দেখে কেউ কেউ গভীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়েও আছে । ঈশান দুরত্ব ঘুচিয়ে এগিয়ে এলো ভদ্রলোকটির মুখোমুখি। শীতল সুরে বললেন,
—’ আমার স্ত্রীর মিসিং নিয়ে ডায়েরি করেছিলাম আপনাদের থানায়। এতোটা তৎপরতা তো দেখলাম না। ‘
বাঁকা হাসলেন লোকটি। হাতের হ্যান্ডকাফে ঝনঝন শব্দ করতে করতে বললেন,
—’ আপনি হিসেব মতে একজন রে প কেসের আসামি। পাঁচ পাঁচটি মা র্ডার প্লাস রে প এলিগেশন আপনার নামে। একজন সচেতন, শিক্ষিত নাগরিক হিসেবে নিশ্চয় আপনার ধারনা আছে, কতটা জটিল বিষয় এটা? গোটা দেশের আইন নাড়িয়ে দিয়েছেন আপনি। আপনাকে রেখে অন্য দিকে দৃষ্টি দেওয়ার সময় কোথায়? ‘
বাঁকা হাসলো ঈশানও।
—’ কি যে বলেন! অতো ক্ষমতা কোথায় আমার! ‘
—’ নেই বলছেন? ‘
—’ নাহ তো । ‘
—’ আমি যদি বলি আছে । নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরিয়েছেন। ‘
ঈশান ধীর গলায় নির্বিকার শুধালো,
—’ নাকের দড়ি ছুটে গিয়েছে মনে করছেন নাকি? ‘
—’ ছোটেনি? আরও কি ছলচাতুরী করছেন? ‘
—’ সেটা না হয় শেষ চাল টা দিয়েই বোঝাবো, এখন চলুন না হয়। জেলের ভাত খেয়ে দেখি…’
ঈশান সাজিদের দিকে একনজর তাকাতেই বন্ধুকে ভরসা দিলো ছেলেটা। কাঁধে হাতখানা রেখে আস্বস্ত করলো যেনো। তিতিরের খোঁজ তারা করবে। এবং তাতে যে কোনো প্রকার অবহেলা করা হবে না এই নিশ্চয়তা নিয়ে ঈশান পা মেলালো পুলিশের সাথে।
ছোট্ট একটা কেবিন রুম। একদম ঝকঝকে তকতকে যাকে বলে আরকি। এ রুমে হাসপাতাল হাসপাতাল, সেই অস্বস্তি হওয়া ঘ্রান টা নেই। পরিষ্কার করে রাখা সবকিছু । ছোট্ট কামড়ার দু’পাশের দেয়াল ঘেঁষা দু’টো বেড। সফেদ, পরিষ্কার বেডশিট পাতা তাতে। তিতির পিটপিট করে তাকাতেই, ঘোর অন্ধকারের বদলে একদম চকচক করা সফেদ সিলিং চোখে পরলো। এক মূহুর্তের জন্য স্বপ্নই ঠেকলো তার কাছে। শরীর কম্পন দিয়ে উঠলো। মনে হলো কোনো এক অতলে তলিয়ে যাচ্ছে সে, বাঁচার জন্য আকুপাকু করছে। খুব জোর খাঁটিয়ে তাকাতে চেয়েও কাজ হলো না, যতটুকু আঁখি মেলতে পারলো, দৃশ্যমান ততটুকুই ঘোলাটে। পেশিতে খিঁচ ধরে আছে যেনো। একটু নড়াচড়া করতেই সেই খিঁচুনি টের পেলো স্পষ্টত।
রাহাত জেগেই ছিলো। তিতিরের বেডের পাশের চেয়ারটাতে পিঠ ঠেকিয়ে বসা। ক্লান্ত শরীরে রাজ্যের ঘুম এসে জড়ো হয়েছে। সকালে নদীর তীর থেকে মেয়েটাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসার পর, গোটা দিন কেটে, রাতও শেষ হওয়ার পথে। জ্ঞান ফিরেছে মেয়েটার দিনের বেলাতেই। তবে ডাক্তারের ভাষ্যমতে সাঁতার না জেনে পানিতে ঝাপ দেওয়ায় একপ্রকার মানসিক ট্রমা হয়ে গিয়েছে। জ্ঞান ফেরা মাত্রই ছটফট করছিলো। কড়া ঘুমের ওষুধের ডোজ দিয়ে রাখা হয়েছে আপাতত। তিতিরের ব্যাস্ত হাত পা নড়াচড়ায় সদ্য লেগে আসা চোখজোড়া খুলে গেলো। বড্ড অস্থির হয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে তিতিরের দিকে ঝুঁকে আদুরে গলায় ডেকে উঠলো,
—’ পরীই? ‘
—’ উমমম । ‘
বহুদিন, বহুদিন পর রাহাতের ডাকে সাড়া দিলো মেয়েটা । যদিও এরকম আদুরে ডাকে, ওকে সময় অসময় ডাকা হতো এমনটা নয়। বুকের গহীনে লুকায়িত থাকতো এ-সব ডাক। তবে, ঈশানের সাথে মেয়েটার বিয়ের পর, রাহাত যতবার নির্লজ্জের মতো মেয়েটার কাছে যেতো, ততবারই এই নামেই আর্তনাদ করতো। তবে তিতির কখনো সেই ডাকে সাড়া দিয়েছে বলে, মনে পরলো না তার । আজকে চেতনাহীন তিতির উত্তর নিলো, তাতে কি! রুক্ষ বুকটা বৃষ্টির ছোঁয়া পেলো যেনো।
—’ পরীই? খারাপ লাগছে কি খুউব? হ্যা? শুনতে পাচ্ছো আমার কথা? ‘
—’ ঈ..ঈশা..ন ভা…’
জ্ঞান ফিরলেও ঘুমের ওষুধের প্রভাব এখনো শরীর থেকে কাটেনি মেয়েটার । ঘুমের ঘোরেই গু’ঙিয়ে উঠছে বারংবার । বিরবির করে বলছে কিছু, যদিও বোধগম্য হচ্ছে না সে-সব। শুধু ফ্যাকাসে হয়ে থাকা পাতলা ঠোঁটজোড়া নড়ছে সামান্য । তবে এতক্ষণ পর এই প্রথম, একটা বাক্য খানিকটা বোধগম্য হলো রাহাতের! তিতির অস্পষ্ট, ভাঙা ভাঙা শব্দে ঠোঁট ফুলিয়ে অভিযোগের সুরে বলে উঠলো,
—‘ ঈশাআআন ভাইই…একটাবার জড়িয়ে ধরেন না! ভালোবাসি তো…’
রাহাত আচমকাই ঝুঁকে থাকা থেকে, সোজা হয়ে দাড়ালো । ঝিমঝিম করে উঠলো কান জোড়া। অসহায় হাসলো । নড়াচড়ায় মেয়েটার ক্যানোলা লাগানো হাতটা বেকায়দায় পরে গিয়েছে খানিকটা,
হাত বাড়িয়ে নার্সের কথামতো ক্যানোলা পরানো হাতটা পেটের ওপর ঠিকঠাক করে দিতে দিতে মলিন গলায় বললো,
—‘ স্বপ্নেও ঈশানের বিচরণ বুঝি! এতো ভালোবাসা? আর এই ছয় বছরে আমাকেই ভালোবাসা গেলো না শুধু। তাই না পরীই? ‘
তিতিরের পুনরায় কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেলো না। ঘুমের দেশে তলিয়েছে মেয়েটা। রাহাত আলতো হাতে গায়ের সফেদ চাদর খানা টেনে দিতে দিতে গভীর চোখে পরখ করে গেলো ভালোবাসার নারীটিকে। তিতির যখন সজ্ঞানে আসবে, তখনও নিশ্চয় ব্যাস্ত হয়ে ঈশানকেই খুজবে। কে জানে, সে বাঁচিয়েছে বলে হয়তো বিরক্তই হবে খানিকটা। স্বামীকে একপলক দেখার জন্য ছটফট করে উঠবে। যেমনটা এখন করে যাচ্ছে!
—’ রেহনুমা হেলাল তিতির, মমতা বেগম, রাসেল শেখ এই তিনটা নাম বললো পেশেন্টের। রাতে দুই ডোজ ওষুধ আছে ওনাদের। আমি প্রথম ডোজ টা দিয়ে যাবো। ভোর ছয়টার দিকে আরেকটা দিয়ে দেবেন আপনি। ‘
দু’জন নার্সের কথোপকথনে পা থমকালো ঈশানের। কানে সঠিক শুনেছে কি-না তা বোঝার জন্য ঘাড় বাঁকিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো বাঁয়ের সাজিদের দিকে। বলাবাহুল্য সবারই কর্ণগোচর হয়েছে কথাগুলো । তবে চকিত ঈশান তৎক্ষনাৎ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাতে না পারলেও, সাজিদ ঝড়ের গতিতে এগিয়ে গেলেন নার্সদুটোর দিকে।
—’ এক্সকিউজ মি! ‘
পুলিশের পোষাকে এতগুলো লোকজন দেখে মহিলা দুটোর মুখ চুপসানো দেখলো। তাঁদের ভয় না পেতে আস্বস্ত করলো সাজিদ। এক পা, দু পা করে ঈশান, নাঈম, নিয়াজও এগিয়ে এসেছে এদিকটায়।
—’ কি নাম বললেন পেশেন্টের? ‘
মুখ চাওয়া চাওয়ি করলো দুজনেই। নিচু গলায় ইতস্তত জবাব দিলো।
—‘ কার? ‘
—‘ প্রথম নামটা?’
—’ রেহনুমা। ‘
—’ পুরো নাম? ‘
—’ রেহনুমা হেলাল তিতির। ‘
—’ কি কেস? ‘
—’ পানিতে ডুবেছিলো। ‘
যা শুনেছে তাতে কোনো ভুল নেই। ঈশানের হাঁটু কেঁপে উঠলো ঠকঠক করে। নিছকই কল্পনা ঠেকলো তার কাছে। মেয়েটাকে যে হারে, পাগলের মতো এতগুলো লোক এদিক-সেদিক খুঁজছে গত দিন থেকে। আজকেও কিছুক্ষণ আগে কি পরিমাণ জঘন্য পরিস্থিতিতে ছিলো তারা। এতো আচমকা, এভাবে খোঁজ পাবে তা বোধহয় কারোরই কল্পনায় ছিলো না। এ যাত্রায় ব্যাতিব্যাস্ত হলো ঈশান। নাঈম, নিয়াজকে দু’হাতে ঠেলে সরিয়ে সামনে এসে ব্যাগ্র কন্ঠে শুধালো,
—’ কোথায় পেশেন্ট? কত নাম্বার রুমে? এখন কেমন আছে সে? ‘
—’ ছয়তলাতে । ছয়শো আঠারো নাম্বার কেবিনে। ‘
ঈশান দেরি করে না একমুহূর্ত। পা ছুটে গিয়েছে তার।
—’ কে এডমিট করিয়েছে ওনাকে? ‘
—’ ওনার হাসবেন্ড সম্ভবত । রাহাত নাম। ‘
ছুটে যেতে গিয়েও থেমে গেলো ঈশান। রাহাত এডমিট করিয়েছে, তার থেকেও কানে তীক্ষ্ণ হয়ে যে শব্দটা এসে লাগলো, সেটা হলো হাসবেন্ড! খেদোক্তি প্রকাশ করে চেচিয়েই উঠলো ছেলেটা। অশান্ত হয়ে বললো,
—’ আমি ওর হাসবেন্ড । কেউ এসে রুগী এডমিট করালেই আপনাদের এখান থেকে, তাদের হাসবেন্ড -ওয়াইফ ট্যাগ দেওয়া হয় কি? ‘
দাঁতে জিব কাটলো মেয়েটা। তারা কি করে জানবে। লোকটা মেয়েটাকে নিয়ে আসার সময় যে পরিমাণ হাউমাউ করে কাদছিলো আর আর্তনাদ করে করে ভালোবাসি ভালোবাসি বলছিলো। সে কি করে টের পাবে এটা হাসবেন্ড বা বয়ফ্রেন্ড নয়!
ঈশানকে অনুতপ্ত হয়ে কৈফিয়ত দিতে যাওয়ার আগেই তপ্ত দৃষ্টি তাক করে প্রস্থান করলো ঈশান। নার্স দুটোকে ধন্যবাদ জানিয়ে বাকিরাও ছুটলো তার পিছু পিছু।
বদ্ধ কেবিন। ঈশানরা হুড়মুড়িয়ে এগিয়ে গিয়ে ভিতরে ঢুকতে চাওয়া মাত্রই বাঁধা দিলো, ভিতর থেকে বের হওয়া নার্স। জানানো হলো রুগী ঘুমে আছে, ভিতরে এতো মানুষ এলাও না মোটেই । তবে পুলিশ পোশাকধারী লোকজন এবং ঈশানের স্বামী পরিচয় দেওয়ার পর, নার্স সদয় হলো খানিকটা। জানানো হলো, যিনি নিয়ে এসেছেন পেশেন্ট কে তিনি খানিক আগেই বেরিয়েছেন একটু। বাকিরা কেউ প্রবেশ করলো না। ঈশানকে একাই যেতে দেওয়া হলো ভিতরে।
গোটা কামড়াই নিস্তব্ধ। বিপ বিপ শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দই নেই। কেবিনের দরজা ভেজিয়ে সম্মুখের ওই সফেদ বেডটার দিকে তাকাতেই বুকের ধুকপুকানির শব্দটা জোড়ালো হলো বড্ড । বুক অবধি চাদর টেনে দেওয়া মেয়েটা। মাথার লম্বা চুলগুলো সুন্দর করে বেণী করে রাখা দু’পাশে। একপাশের চুলের অংশ বেড ছেড়ে বাহিরে এসে ঝুলছে৷ বাতাসে উড়াউড়ি করছে বেবি হেয়ার গুলো। হাতে ক্যানোলা লাগানো, অক্সিজেন মাস্কখানা পাশেই সাজিয়ে রাখা। মেয়েটা স্বাভাবিকের থেকে খানিকটা দ্রুতই শ্বাস নিচ্ছে মনে হলো। ঈশান এসে মেয়েটার পাশে বসতেই কেমন গুঙিয়ে উঠলো মেয়েটা । ছেলেটা তখনো স্থির চোখেই তাকিয়ে। কতদিন পর দেখা! কাঁপতে থাকা হাতটা আলতো করে মেয়েটার মাথায় ছুঁয়িয়ে, ফিসফিস করে ডেকে উঠলো ঈশান।
—’ তিতির ? বউ ? ‘
সাড়া মিললো না অপর পাশের মেয়েটার থেকে । তবে ঘুমের মধ্যেও ভ্রু জোড়া কোঁচকানো লক্ষ্য করলো ঈশান । এখন ঘুম ভাঙবে না মেয়েটার। ঢোকার সময় নার্স বলেই দিয়েছিলো ।
—’ বড্ড জ্বালালি, জানিস কি সেটা ? কে বলেছিলো বাড়ি থেকে বের হতে? আমি তো জানতাম এরকম কিছুই হবে, আর এ কারণেই নিষেধ করেছিলাম পইপই করে। তারপরও কেনো এতো অবাধ্য? হুম? কোথায় না কোথায় খুঁজেছি জানিস? আন্দাজ আছে তোর? ম রেই যাচ্ছিলাম। ‘
মেয়েটার কপালের ভাজ গাঢ় হলো আরও খানিকটা । ঘুমের মধ্যেও পরিচিত মানুষের, সেই প্রিয় ঘ্রানটা বোধহয় পাচ্ছে সে । তিতিরের বুঝি এটাকে স্বপ্নই মনে হলো। পাতলা ঠোঁটজোড়া নাড়িয়ে কিছু বলতে গিয়েও, বললো না। শুধু তিরতির করে কাঁপলো। ঈশান পরখ করে সে-সবই। বৃদ্ধাঙ্গুলি ছোঁয়ায় মেয়েটার শুষ্ক ঠোঁটের ওপর। দু’বার স্লাইড করে ভেজা কন্ঠে বলে,
—’ মর্গ অবধি গিয়েছিলাম আমি । মর্গ মানে বুঝতে পারছিস? সেখানে একটা মানুষেরও শ্বাসপ্রশ্বাস চলে না। মৃ ত সবাই। ওখান অবধি যেতে হয়েছে তোর জন্য। তোর শ্বাস নেই, এটা ভাবতেই শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিলো আমার। এই মূহুর্তের যন্ত্রনা কি করে বোঝাই বলতো ? ‘
—’ ঈশা…আন ভাই?’
—’ হুমম।
—’ কোথায়…’
—’ কি কোথায়? ‘
—’ চলে গেছিলেন? খুঁজে-ছি তো আমি…’
মেয়েটার ঘুম ভাঙেনি একফোঁটাও।ঘুমের ঘোরেই বিরবির করে যাচ্ছে । মৃদু হাসলো ছেলেটা। নাক টানলো, বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে সরিয়ে ফেললো চোখের কোণে জমতে থাকা অশ্রুকণা। মুখটা ঝুঁকিয়ে শব্দ করে চুমু খেলো তিতিরের ফুলো গালটায়। সেখানেই নাক ঘঁষে ফিসফিস করে বললো,
—’ আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ। তোর কন্ঠস্বর শোনার জন্য ছটফট করছিলাম আমি । এক মূহুর্তের জন্য মনে হয়েছিলো, এই বুঝি একেবারে হারিয়েই ফেললাম। তোকে ছুঁতে পারার এই মূহুর্তটা আমার জন্য যে কি, সেটা বোঝানোরও সাধ্য আমার নেই। ‘
রমনীর পেলব গাল শিক্ত হলো স্বামীর অশ্রুজলে। ঈশান মুখ তুললো না। ওভাবেই কেটে গেলো বোধহয় দীর্ঘ সময়। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হচ্ছে। পুলিশ অফিসার তাড়া দিচ্ছে। ঈশানকে নিয়ে যাবে। সাজিদ কোনোমতে সময় চেয়ে নিয়ে অপেক্ষা করাচ্ছে তাদের। ঈশান বুঝলো এখানে আর সময় কাটাতে পারবে না। নিয়াজ কে ডেকে দ্রুত খবর পাঠাতে বললো দেওয়ান বাড়িতে। যতক্ষণ না পরিবারের সবাই আসে ততক্ষণ তাকে তিতিরের কাছেই থাকতে বললো । তবে ঈশান ঘুরেফিরে এতোটা সময় ব্যায় করছে সম্পূর্ণ অন্য একটা কারণে। নাঈম বোধহয় টের পেলো সেটা। চাপা গলায় শুধালো,
—’ বিশ্বপ্রেমিক কে দেখতে এতো অপেক্ষা, নাকি? ‘
—’ কে বিশ্বপ্রেমিক? ‘
—’ তোর বউয়ের জন্য যে দিওয়ানা।’
ঠোঁট উল্টালো ঈশান। পকেটে দু-হাত গুঁজতে গুঁজতে বললো,
—’ সে তো সবাই বিশ্বপ্রেমিক তাহলে! আর আমার বউয়ের পিছনে শেয়াল- কুকুরের লাইন দেখেছিস? ‘’
হাসলো নাঈম। বাকা গলায় শুধালো,
—’ জেলাস? ‘
—’ হবো না? ভাগ্যের পরিহাস দেখ। পাগলের মতো খুঁজে ফিরলাম আমি। অথচ উদ্ধার করে, কোলে তুলে নিয়ে এলো ওই রাহাত। যেটাকে নিয়ে আমি , বিয়ের আগে থেকে বিরক্ত। ‘
ঈশানকে এই মূহুর্তে ভীষন চনমনে লাগাছে। লাগবে না-ই বা কেনো। এতক্ষণ তো বউকে জড়িয়ে ধরো হু হু করে কেঁদে এলো। তা কি তারা দেখেনি! বউকে হারিয়ে ফেলার যে ভয়টা, সেটা মুছেছে মন থেকে। তাই খানিকটা ক্ষেপানোর সুযোগও হাতছাড়া করলো না সে। ফিসফিস করে বলে উঠলো,
—’ পানিতে ডোবা রুগীদের নাকি সিপিআর দেয়। তিতির কে যখন, রাহাত পানি থেকে…’
আঁতকেই উঠলো ঈশান। মুখের আদল কঠিন হয়ে এলো তৎক্ষনাৎ। বাঁ হাতে কলার চেপে হিসহিসিয়ে বললো,
—’ বাজে বকিস না। কিসের সিপিআর? কোনো সিপিআর লাগেনি ওর। আমার বউ ও, এতো সহজে শ্বাস ফুরাবে না ওর।’
আসলেই লাগেনি। নিয়াজ গিয়েছিলো তিতিরের ট্রিটমেন্ট যিনি করছে সেই ডাক্তারের কাছে। রুগীর বর্তমান অবস্থা থেকে শুরু করে সব খবরাখবরই নিয়ে এসেছে। সবাইকে সবটা বুঝিয়ে আরেকদফা এসে দাড়ালো মেয়েটার কাছে। একটাবার ঘুম ভাঙলে! তবে তা সম্ভব নয় এই মূহুর্তে। আর ঈশানের হাতেও সময় নেই অতটা। তিতির নিরাপদে থাকলেও, তমা ভীষন বিপদে। ইয়াজ মির্জার মতো মানুষকে বিশ্বাস নেই একবিন্দুও। তবে ঈশানের এই দেরি করাটা স্বার্থক হলো না। না তো তিতিরের ঘুম ভাঙলো, আর না তো রাহাত ফিরলো এর মধ্যে।
ঈশান অজস্র চুমু আঁকলো স্ত্রীর গোটা মুখে । এমন একটা সময় এভাবে রেখে যেতে মন সায় দেয়? কিন্তু তাছাড়া উপায়ই বা কি! চিবুকের শব্দ করে চুমু খেয়ে ঠোঁটের কিনারায় এসে থামলো ছেলেটা। নিঃশ্বাস বারি খাচ্ছে দু’জনেরই।
—’ ভাগ্যিস সিপিআর লাগেনি তোর । এতো এতো অশান্তির মধ্যে এটা আমার জন্য আরেক অত্যাচার হতো, জানিস ? আমার বউয়ের ঠোঁ ট আমি খা বো। অন্য কেউ কেনো স্পর্শ করবে! গড! ভাবতেই মাথায় চক্কর খায় আমার। ‘
—’ উমমম। ‘
—’ উমম, উমম করছিস কেনো? উঠলি তো না। দেখা পেলি না আমার। ঘুমের ঘোরে তোর ফায়দা লুটে কত কি-ই করে গেলাম! ‘
—’ ভালোবাসি, ঈ..ঈশা-ন…’
—’ জানি তো। ‘
—’ উমমম। ‘
—’ একটা চু মু খাবো। কেমন? তোর অনুমতি নেওয়ার সময় নেই। যেতে হবে। নরম সরম চু মু না কিন্তু। তোর শাস্তি এটা। আমার অবাধ্য হয়ে বের হওয়ার। বের না হলে তোর একেকজন আশিক রা কি খোঁজ পেতো তোর? রাহাত নাকি কোলে করে নিয়ে এসেছে তোকে। মানা যায়, বলতো? ‘
—’ উহু..’
ঈশান হাসলো খানিকটা শব্দ করেই। দু গাল চেপে ধরতেই ঠোঁট জোড়া গোল হয়ে এলো। হয়তো ব্যাথাও লাগছে খানিকটা, কপাল তো কুঁচকে রেখেছে সেই কখন থেকেই! ঈশান ঢোক গেলে ওই লোভনীয় ঠোঁট জোড়ার দিকে তাকিয়ে। ঝুঁকে এসে ঠোঁটে ঠোঁট মেলাতে যাওয়ার আগে হাস্কিস্বরে বলে উঠলো,
—’ অনুমতি নিলাম না কিন্তু। কাছে চাচ্ছিলি আমাকে। দেখেছি আমি সবই। আজকে চু মু অবধিই মুলতবি থাকুক। ফিরে এসে বাকিসব হকও বুঝিয়ে দেবো, আমিও বুঝে নেবো। আর আমাকে পোড়াস না, কেমন? তুই হেফাজতে থাকলে, দুনিয়ার সব লড়াই আমি একা হাতেই লড়তে পারবো। যেতে হবে, মাই লাভ। বি আ গুড গার্ল৷ খুব দ্রুতই ফিরবো আমি। ‘
নাইট ডিউটিতে এখন যে ডাক্তারের ভিজিটিং আওয়ার, তিনি রুগীর কেবিনের সামনে এতো ভিড় দেখে অবাকই হলেন। পুলিশের লোকসহ, একগাদা মানুষ। কি হেতুতে, সেটা জিজ্ঞেস করার আগেই কেবিনের দরজা খুলে ফেললেন। ঈশান তখন গভীর মনোযোগে তিতিরের অধরসুধা পানে মত্ত। একহাতে মেয়েটার কন্ঠনালি আঁ’কড়ে, অন্য হাত বেডের হেডবোর্ডে ঠেকিয়ে নিজের কাজ করে যাচ্ছে। হাসফাস করছে তিতিরও। তবে আশ্চর্যের বিষয়, সে তাল মিলিয়েছে ঈশানের সাথে। দরজা খোলার শব্দ পেতেই তিতিরকে ছেড়ে বিরক্ত নজরে ঘাড় বাকিয়ে তাকাতেই, চোখে পরলো ডাক্তার মহিলাটিকে। অপ্রস্তুত হলো ঈশান। ওদিকে সাজিদ, নাঈম ঘাড় উচিত তাকিয়ে আছে ভিতরের দিকে। ঈশান উঠে দাঁড়ালো। অপ্রস্তুত হেসে, কৈফিয়ত দেওয়ার ভঙ্গিতে বললো,
—’ সিপিআর দিচ্ছিলাম, ডাক্তার। ‘
—’ কি-ই? ‘
—’ সিপিআর দিচ্ছিলাম। এরকম রুগীকে একা রেখে কেউ বাইরে যায় ? দায়িত্ব জ্ঞান একদম নেই আপনাদের। ভাগ্যিস ঠিক সময়ে ঠোঁটে ঠোঁট… মানে সিপিআর দিতে পেরেছি। ‘
—’ অক্সিজেন মাস্ক তো পাশেই। ওটা পরিয়ে দেওয়া যাতো না? ‘
—’ আমি…মানে ওর হাসবেন্ড থাকতে অক্সিজেন মাস্ক? সো লেম! তাছাড়া অক্সিজেন মাস্ক পরাই নি কারণ, কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস দেওয়ার থেকে…ভালো করেছি না বলুন? ‘
ডাক্তার রাগী মুখে কিছু বলতে যাওয়ার আগেই পাশের নার্সটি কানে কানে জানালো পেশেন্টের সাথে ঈশানের পরিচয়। মহিলাটি নরম হলেন খানিকটা। তাকিয়ে দেখলেন। হার্টবিট দ্রুত হয়েছে। সম্ভবত এই ঘনিষ্ঠতার কারণেই। তবে স্বাভাবিক হচ্ছে ধীরে ধীরে। ঈশানের দিকে তাকিয়ে হতাশ সুরে বললেন,
—’ ভালোই করেছেন। সুস্থ রুগীকে সিপিআর! ‘
ঈশান অমায়িক হাসলো। দরজার দিকে ইশারা করে বললো,
—’ তাই না? তাহলে আর একটু যদি বাইরে যেতেন। মানবসেবা টা শেষ করতে পারতাম… ‘
এক শ্বাসরুদ্ধকর রাত্রীর সমাপ্তি ঘটেছে। ফজরের আজান হচ্ছে। তিতিরের কেবিনের সামনেই গোটা রাত ধরে বসে আছে নিয়াজ । নাঈম আর সাজিদ গিয়েছে ঈশানের সাথে। দেওয়ান বাড়িতে ঈশান-তিতির দুজনের সংবাদই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে তমার কথাটা এখনো খোলাসা করতে পারেনি তারা । সেটা ঈশান আর সাজিদ সামলে নেবে বলে গিয়েছে। ঘড়ি দেখলো নিয়াজ। হিসেব মতে আরও ঘন্টা দুয়েক সময় লাগবে সবার এসে পৌছাতে। রাতে তারা ফোন করে জানানো মাত্রই রওনা হয়েছে সবাই । তিতির বেঘোরে ঘুমাচ্ছে এখনো। ডাক্তারের থেকে খোঁজ নিয়ে যেনেছে, আর ঘন্টাখানেক থাকবে ওষুধের ডোজ। তারপর আপনাআপনিই জ্ঞান ফিরবে মেয়েটার। ক্লান্তিতে ভেঙে আসছে শরীর, তারও কম ঝক্কি গেলো না শরীরের ওপর দিয়ে । আজানের শব্দ পেয়ে ফ্রেশ হয়ে এলো। হাসপাতালের নামাজঘর একদম টপ ফ্লোরে। খানিক আগেই নার্সরা এসে দেখে গিয়েছে তিতিরকে। ঝটপট ছোট্ট করে নামাজ টা পরে আসার সিদ্ধান্ত নিলো সে।
এরকম একটা মূহুর্তের অপেক্ষাতেই বোধহয় ছিলো রাহাত। নিয়াজ ব্যাস্ত পায়ে প্রস্থান করতেই, দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলো সে । বিনা শব্দে কেবিনের ভিতর ঢুকে পরলো। হাতের কাগজের ফাইলখানা কাঁধের ব্যাগে তুলতে তুলতে নিচু স্বরে ডাকলো তিতিরকে। খানিক আগেই হাসপাতাল থেকে রিলিজ নিয়েছে সে। একটু কায়দা করতে হয়েছে। কিছু টাকাও খরচ করতে হয়েছে। তবে সুবিধা হয়েছে অন্য কারণে। ঈশান রা যে সময়ে এখানে ছিলো, সেই সময়ের নার্স বা ডাক্তার সবারই শিফট পরিবর্তন হয়েছে। একটুর চেষ্টাতেই সফল হয়েছে সে-ও। বাইরে দিনের আলো ফোটেনি এখনো । তিতির হেঁটে বাইরে অবধি যেতে পারবে কি-না সেটাও বুঝতে পারছিলো না। বাধ্য হয়ে একজন ওয়ার্ড বয় কে দিয়ে হুইলচেয়ারের ব্যবাস্থাও করে ফেলেছে সে। রাহাতের ক্রমাগত ডাকে চোখ মেললো তিতির। রাহাত আলতো হাতো তুলে বসালো মেয়েটাকে। কড়া ওষুধ, আর টানা ঘুমের প্রভাবে চোখ মেলেই তৎক্ষনাৎ চিনে উঠতে পারলো না সামনের মানুষটাকে। এটায় অবশ্য সুবিধাই হলো ছেলেটার। সময় নষ্ট করলো না মোটেই। তিতিরকে ধরে বিছানা থেকে নামিয়ে বসিয়ে ফেলোো হুইলচেয়ারে। এই শিফটের নার্স আসতেই তাকে রিলিজের কাগজপত্র দেখিয়ে আলগোছে প্রস্থান করে গেলো হাসপাতাল থেকে!
দু কামড়ার একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট । দেখে হুট করে কিছুতেই মনে হবে না , এটা কোনো ব্যাচেলর পুরুষ মানুষ থাকে। একদম ছিমছাম, গোছানো সবকিছু । তিতিরকে সোফায় বসিয়ে রাহাত দ্রুত পায়ে কিচেনের দিকে গেলো। রান্নার প্রয়োজনীয় সবকিছুই আছে এখানটায়। মিনিট পনেরোর মাথায় গরম গরম স্যুপ করে এনে রাখলো তিতিরের সামনে। তিতির দু’হাতে মাথা চেপে বসে আছে। কাঁচের টেবিলে স্যুপ বোল টা রাখার শব্দে মাথা তুললো। মাথা পরিষ্কার হয়েছে খানিকটা। রাহাত কে দেখে চমকালো না মোটেই। কারণ নদী তীর থেকে সে যখন জ্ঞান হারায়, তার আগে দেখেছিলো রাহাতকে। এতক্ষণ মনে না পরলেও এখন মনে পরেছে ভালোমতো। রাহাত মুখোমুখি সোফায় বসে বাটিখানা তুলে নিলো হাতে। চামচ নেড়েচেড়ে, ফুঁ দিয়ে তিতিরের সামনে ধরতেই, তিতিরই হাত বাড়িয়ে চামচখানা হাতে নিলো।
—’ বোল টা টেবিলে রাখুন । আমিই খেতে পারবো । ‘
রাহাত বাধ্যের মতো শুনলো । স্যুপ মুখে দিতে দিতে নিচু গলায় শুধালো,
—’ অনেক ধন্যবাদ, রাহাত ভাই। আমাকে বাঁচানোর জন্য, যতটুকু কৃতজ্ঞতাই প্রকাশ করি, কম হবে। ‘
—’ আমার কাছে এতো ফরমালিটির প্রয়োজন আছে কি? ‘
তিতির জবাব দেয় না। হাত দূর্বল লাগছে। ধীরেসুস্থে ঈষৎ উষ্ণ স্যুপ মুখে তুলছে । চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে উত্তাল শীতলক্ষ্যায় ডুবতে ডুবতে বেঁচে ফেরার সেই মূহুর্ত।
—’ তমাকে কেউ নিয়ে গিয়েছে, আমাকে নেয় নি কেনো? ‘
—’ তোমাকে তুলে গাড়িতে রেখে, তমাকে আনতে গিয়ে ওকে আর পাই নি। সম্ভবত স্থানীয় কেউ উদ্ধার করেছে। স্থানীয় লোকজন যারা ছিলো। আমি খোঁজ করছি ওরও। ইনশাআল্লাহ খবর পেয়ে যাবো। কিন্তু ওখানে কি করছিলে দুজন? ‘
তিতির অতি সংক্ষেপে যতটুকু না বললেই নয়, ততটুকু বলে থামলো। খাবার টুকু শেষ করে পানি মুখে দিতে দিতে বললো,
—’ আমার বাড়িতে যোগাযোগ করেছেন? ‘
—’ কারোর নাম্বার নেই । ‘
—’ তাও তো কথা । আপনার ফোনটা দিন, আমি কল করছি । ‘
রাহাত ইতস্তত করলো খানিকটা । ফোনটা বের করতে করতে মিহি গলায় বললো,
—’ তারা সম্ভবত একটু ডিসটার্ব। “‘
—’ হ্যা। বাড়ির দু’দুটো মেয়ে কিডনাপ হয়েছে। ডিসটার্ব হবে না? ‘
—’ তার জন্য নয়। ‘
—’ তাহলে? ‘
রাহাতের মুখ শুকিয়ে এলো খানিকটা। তিতিরকে কিভাবে বলবে বিষয়টা সেটা বুঝে এলো না।
—’ কি হলো, কেনো বললেন না তো? ‘
—’ তোমার হাসবেন্ড কে নিয়ে। ‘
তিতির থমকালো। মলিন মুখটা তুলে স্থির দৃষ্টি ফেললো ঈশানের দিকে। দূর্বল গলায় বললো,
—’ কেমন আছেন উনি? ‘
—’ সুস্থ। ‘
—’ তাহলে? ‘
—’ আজকের নিউজপেপার দেখবে? ‘
—’ কি হয়েছে? ‘
রাহাত উঠে গিয়ে সকালের সংবাদপত্রখানা এনে শব্দহীন ফেললো তিতিরের সামনে। লাস্ট পেজে একদম বড় বড় করে হেডলাইন হয়েছে। বিশাল করে রঙিন একটা ছবি সেঁটে রাখা। যেখানে দেখা যাচ্ছে, ঈশানকে ঘেরাও করে থানায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অদূরে সাজিদ আর নাঈম কেও চোখে পরলো তিতিরের। দ্রুত লেখাগুলোয় চোখ বুলিয়ে গেলো তিতির। পুলিশ ,ডাকে নি মিডিয়াকে। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে মিডিয়া উপস্থিত হয়েছে সেখানে। কি মামলায় ঈশান আরশাদ দেওয়ান গ্রেফতার সেটা পুলিশকে জিজ্ঞেস করেও জানা যায়নি। তবে মিডিয়া ধারনা করছে, ধারনা নয়, বলা যায় গোপন সোর্সের মাধ্যমে জেনেছে, বর্তমান সময়ের চাঞ্চল্যকর ধ র্ষন, মামলা ও একেরপর এক নারী খু ন করা সিরিয়াল কিলার সন্দেহে পুলিশ তাকে এরেস্ট করেছে। আগামীকাল কোর্টে তোলা হবে তাকে! তিতির পাথর হয়ে তাকিশে রয় কাগজের দিকে। অক্ষরগুলো কেমন এলোমেলো ঠেকলো। ইয়াজ মির্জার দেখানো ভিডিওটা চোখের সামনে ভাসলো চালচিত্রের মতো করে ।
—’ পরীই? ‘
কাগজ থেকে চোখ তুললো না তিতির। ওভাবেই একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ধীর গলায় বলে উঠলো,
—’ তিতির। তিতির ডাকবেন, রাহাত ভাই। আপনার মুখে এই ধরনের শব্দ শুনে আমি খুব আনইজি ফিল করি৷ ‘
রাহাতের মনঃক্ষুণ্নই হলো খানিকটা । ঠোঁট কামড়ে গলার মধ্যে আঁটকে থাকা কথাগুলো গুছিয়ে নিলো। ঈশান আরশাদ দেওয়ানকে নিয়ে পুলিশ মহলের ভিতরে যা যা হচ্ছে, সে-সব সে জেনেছে খোঁজ নিয়ে।
—’ তুমি কি ঈশানের সঙ্গে খুশি, তিতির? ‘
—’ কেনো? ‘
—’ প্রশ্নটা করা কি যুক্তিযোগ্য লাগলো না? বর্তমান পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে? ‘
—’ মানে? ‘
রাহাত খানিকটা নড়েচড়ে বসলো। এসির রিমোট হাতে, পাওয়ার টা খানিকটা কমিয়েও দিলো। কেমন ভ্যাপসা গরম লাগছে। তিতির দূর্বল শরীরটা একপ্রকার এলিয়েই রেখেছে সোফায়। মেয়েটা এই মূহুর্তে শুতে পারলে হয়তো কমফোর্ট ফিল করতো। রাহাত গলা খাঁকারি দিয়ে উঠে বললো,
—’ তুমি জানো কেনো বলছি এটা । আজকের নিউজপেপার দেখার পর অনেক কিছুই খোঁজ নিয়েছি আমি। বর্তমানে সেরকম চর্চা না হলেও, ভিতরে ভিতরে এ-সব নিয়ে অনেক তদন্ত চলছে। ঈশান আরশাদ কে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে আরও সাত দিন আগে থেকে। অথচ…অথচ সে নাকি এতোদিন জেলে ছিলোই না। ধ র্ষন মামলায় এরেস্ট। শুধু তাই নয়। খু নের মামলায়ও…’
তিতির হাত নাড়িয়ে থামিয়ে দিলো রাহাত কে। আচমকাই শ্বাসকষ্ট হচ্ছে বোধহয়।
—’ আমি জানি সে-সব। আর বলবেন না প্লিজ। ‘
—’ তোমার উচিত এবার অন্তত একটু শক্ত হওয়া। ‘
—’ এবার বলতে? ‘
—’ মানে যা হচ্ছে আরকি। দুনিয়ার সবাই তো আর ফেক হতে পারে না। বলো? ‘
তিতির চোখ তুলে তাকালো রাহাতের মনমরা মুখের দিকে। লোকটা এখনো আগের মতোই আছে কি? নাহ, নেই। আগের সেই জৌলুশপূর্ণ চেহারা আর নেই। শুকিয়েছে অনেকটা । মসৃণ ত্বকে কেমন খসখসে ভাব। তিতির আচমকাই ভারি কন্ঠে বলে উঠলো,
—’ আমি দুনিয়ার সবাইকে ফেক ভাবছি। এটা কেনো মনে হলো আপনার? ‘
—’ মানে!’
—’ মানে আমি নরম হতে পারি ক্ষেত্রবিশেষে। একদম বোকা নই। ‘
রাহাত অপেক্ষা করে তিতিরের পরের কথাগুলো শুনতে। মেয়েটার মুখের ভাবভঙ্গিই বলে দিচ্ছে আরও কিছু বলে যাবে সে। হলোও তাই।
—’ আমার আর ঈশান আরশাদের ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে, রাহাত ভাই। গতকালকেই আমি সে কাগজে সই করে রেখে এসেছি। ‘
আসমান থেকে পরলো যেনো রাহাত। হতভম্ব হয়ে শুধালো,
—’ ডিভোর্স? কাল কে? ‘
মাথা নাড়লো তিতির।
—’ ইয়াজ মির্জার ওখানে। ঈশান আরশাদ দেওয়ানের ওরকম একটা নৃ শংস খু নের প্রমান দেখার পর, আমি এখনো তাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করবো? ‘
—’ কিসের ভিডিও? ‘
সংক্ষেপে আউরালো ইয়াজ মির্জার দেখানো সেই ভিডিওটার কথা। রাহাত কপাল চেপে ধরলো। বিরবির করে বললো,
—’ ওর এই অন্ধকার দিক সম্পর্কে আমার সন্দেহ হয়েছিলো বহু আগে। ‘
—’ আমার হয়নি। তাই ঠকে গেলাম। হেরে গেলাম জীবনের কাছে । ‘
ছলছল করে উঠলো মেয়েটার চোখজোড়া। দু’হাতে মুখ ঢাকলো। এই মেয়ের চোখের পানি সহ্যসীমার বাইরে রাহাতের। সহ্য হলোও না। বুকটা দুমড়েমুচড়ে উঠলো। নরম গলায় বললো,
—’ যা হওয়ার হয়ে গেছে, তিতির। জীবনটা এতো ঠুনকো নয়।’
—’ নয় তো। জানি সেটা। এ কারণেই আমাকে বাচানোর জন্য কৃতজ্ঞ আপনার প্রতি। না হলে তো ম রেই যেতে চাইতাম । ‘
ফুঁপিয়েই উঠলো মেয়েটা । রাহাত দ্রুত পায়ে কিচেন থেকে এক গ্লাস পানি এনে রাখলো মেয়েটার সামনে। দিনের পর দিন ভালোবেসে আগলে রেখেছে সে। আর সেই নারী অন্য পুরুষের জন্য আর্তনাদ করে!
—’ সে-ই কিন্তু তোমাদের পথ আলাদা হলোই, পরীই। মাঝখান থেকে খোদা, আমার কাছ থেকে তোমাকে কেড়ে নিলো। ‘
—’ খোদার মর্জি ঠিক- কি, আমার জানা নেই, রাহাত ভাই। তবে আজকে সত্যিই অভিযোগ জানাতে ইচ্ছে হচ্ছে তার মর্জির ওপর। জীবনটা অন্য রকম হলেও হতো, তাই না! সেদিন যদি আমি বাড়ি না আসতাম, আজকে আপনি আমি বোধহয় অন্য ভাবে থাকতাম। বলুন? ‘
এতক্ষণ শক্ত হয়ে বসে থাকা রাহাত, পানির মতো গলে গেলো। তীক্ষ্ণ আঁখিজোড় অশ্রুসিক্ত হলো। এরকম কথা কি সে ভাবেনি! ভেবেছে তো। আজও ভাবে। এই মেয়েকে সবভাবে গ্রহন করতে প্রস্তুত সে। আজ, অথবা – আজ থেকে আরও বিশ বছর পর। তিতির নাক টানলো। হাত বাড়িয়ে গ্লাস নিয়ে, পানিটুকু একঢোকে শেষ করে বললো,
সাঁঝের মায়া পর্ব ৬৭
—’ আমাকে ক্ষমা করবেন, রাহাত ভাই । ‘
—’ আমার কাছে তুমি কখনো দোষি ছিলেই না । ‘
—’ ভাগ্য কোথায় এনে দাঁড় করালো বলুন। আপনার আমার যে সমীকরণ, এক লহমায় মিলে যেতো। সেটার সমীকরণ আজকে এতো জটিল।’
মলিন হাসলো রাহাত।
—’ আমি গনিতে দক্ষ। হিসেব মেলাতে খুব একটা দেরি হওয়ার কথা নয়। ‘
