মেজর কারদার পর্ব ৩২
ফিনারা ঝুমুর
বিকেলের নরম সোনাঝরা রৌদ্দুর হালকা ছুঁয়ে যাচ্ছে চারপাশের সবুজ বৃক্ষের শাখা-পত্রকে। একটি ফিঙে পাখি হালকা ডানা ঝাঁপটিয়ে এসে বসল ছাদের লাগোয়া নাম না জানা এক গাছে।
প্রকৃতির এমন মনোরমা সৌন্দর্যকে যেন দ্বিগুণ মাত্রা দিতেই কারদার বাড়ির সুপ্রশস্ত ছাদে চলছে ধামাকা রমরমা আয়োজন! এক কোণে রাখা ছোট আকৃতির সাউন্ড মিউজিক বক্স। ছাদের ঝকঝকে মেঝেবিক জুড়ে তখন পা পড়েছে মোট ৬ জোড়া পায়ের।
“আচ্ছা, এবার কীভাবে কী করব রে?”
পড়ন্ত বিকেলের বাতাসে নিজের ঘাড়ের চুল চুলকাতে চুলকাতে প্রশ্ন করে আদর।
“প্ল্যান খুব সিম্পল! আমি আর রাহাত ভাইয়া এক সাথে, আর মিথু আপু আর আদর ভাইয়া এক সাথে যুগল নৃত্য প্র্যাকটিস করব!”
মেঘ একগাল হেসে প্ল্যান বাতলে দেয়।
“কিন্তু কিঞ্জা কী করবে?”
আদর ফের কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করে। মেঘ পাশ ফিরে কিঞ্জার দিকে তাকিয়ে দেখে ও এক ধ্যানে ছাদের রেলিং ধরে প্রকৃতি দেখতে মশগুল। মেঘ মুচকি হেসে জবাব দেয়,
“কিঞ্জা আপুর ডান্স অনেক পরে আসবে, যখন পুরো গানের ফোকাসটা ওনার ওপর যাবে। তার আগে আমরা যুগলগুলো ভালো করে প্র্যাকটিস করে নিই।”
“কিন্তু এত সব তো বুঝলাম, তোদের নাচের মেগা গানের নামটা কী, হ্যাঁ?”
মিথিলা আর রাহাত ছাদের কার্নিশে থোতা মুখ করে চুপটি করে বসে ছিল। সেভাবেই ভুরু কুঁচকে মেঘের দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করে মিথিলা। মেঘ পাশে থাকা লম্বা একখানা টকটকে লাল ওড়না ঝটপট তুলে নিজের ঘাড়ে ফেলে দেয়। তারপর ওড়নার দুই প্রান্ত দু-হাতে আলতো ধরে চরম ঢংকি স্টাইলে নাচের ভঙ্গি নিয়ে বলে,
“সং একটাই -চুনারি চুনারি-!”
মেঘের মুখে এই নামটা শোনামাত্রই উপস্থিত সবগুলো যেন একযোগে আনন্দ আর হুল্লোড়ে হেই হেই করে চেঁচিয়ে ওঠে! আদর, শীর্ষ আর কিঞ্জা এই তিনজন আপন ভাই-বোন, আর অন্যদিকে রাহাত আর মিথিলা দুজন। তবে বয়সের হিসেবে রাহাত আর আদর দুজনই কিঞ্জা ও মিথিলার চেয়ে কিছুটা হলেও বড়।
কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো দল মিলে সাউন্ড বক্সে বিট তুলে নাচের জোরদার মহড়া শুরু করে দেয়। নাচের এক চমকপ্রদ পর্যায়ে সাউন্ড মিউজিক সিস্টেমে বেজে ওঠে ট্রেন্ডিং পপ গান,
—Tere Pe Kya Karun Jawaani Pe Reham…—
গানের এই রোমান্টিক তালের সাথে তাল মিলিয়ে মিথিলা তার তন্বী আঙুলটি পরম আদরে আদরের গালে ঠেকিয়ে গোল করে ঘোরাতে থাকে। আদরও নিখুঁত মুদ্রায় মিথিলার কোমর ধরে ছন্দের সাথে শূন্যে কোল তুলে নাচের বিশেষ মুদ্রাটি অনুশীলন করে।
ছাদের লাগোয়া সিঁড়ির কার্নিশ আর রেলিংয়ের ওপর হাত রেখে একজোড়া অতি বিষাক্ত আর তীক্ষ্ণ নজর নজর রাখছিল ওদের ওপর! আদর আর মিথিলার এই নিখুঁত যুগল বন্ধনী দেখে নোমানের দুই চোখে নেমে আসে তীব্র ঈর্ষা আর অধিকারবোধের প্রলয়ঙ্করী বহর! যেন এক ক্ষুধার্ত হিংস্র ঈগল পাখির মতো তীক্ষ্ণ চোখে দেখে চলেছে ওদের নাচের প্রতিটি ক্লোজ স্টেপ!
“এবার মনে হচ্ছে সোনার খাঁচায় চিরতরে বন্দী করার সময়টা একদম কাছে এসে গেছে! একটু বেশিই ডানা মেলে উড়ছে আমার পাখিটা!”
নোমানের সেই চাহনিতে ফুটল ধারালো ক্ষুরের মতো মারাত্মক এক খুনী চাউনি! ওর মনে হলো স্রেফ সেই চাউনি দিয়েই যেন সামনের সকল দূরত্ব আর বাধা চোখের নিমেষে কেটে-কুটে ছাড়খার করে ফেলবে সে!
পকেট থেকে নিজের ফ্ল্যাগশিপ মোবাইলটা বের করে তড়িঘড়ি করে কাউকে একটা কল ডায়াল করে নোমান। এক মিনিটও পার হওয়ার আগেই ওপাশ থেকে রিসিভ হয় ফোনটা।
“কী চাই, নোমান?”
ওপাশ থেকে ভেসে আসে মেজরের গম্ভীর, রাশভারী ও নির্লিপ্ত কণ্ঠ। ছাদের বুকে আদর আর মিথিলার নাচের ঘনিষ্ঠ মুদ্রার দিকে রক্তচক্ষু স্থির রেখে নোমান চাপা গর্জনে জবাব দেয়,
“তোর ওই পিচ্চি চাচাতো বোন মিথিলাকে আমার এখনই চাই, শীর্ষ!”
“পছন্দ যখন হয়েছে, সোজা গলার নলি চেপে তুলে নে!”
একবারে একরোখা ও ঠান্ডা মাথায় জঘন্য উত্তর ঠুকে দেয় শীর্ষ। নোমানও নিজের দাঁতে দাঁত চেপে গম্ভীর হয়ে বলে,
“তোর আর আমার মাঝে কিন্তু একটাই সুনির্দিষ্ট ডিল হয়েছিল, মনে রাখিস! আমার একমাত্র বোন মেঘালয়া তোর জীবনের বউ হবে, আর বিনিময়ে তোর বিচ্ছু চাচাতো বোন মিথিলা হবে আমার! আমি যেমন পাহাড়ি কুটির থেকে তোদের দুজনের চার চোখের মিলন ঘটিয়ে জবরদস্তি বিয়ের সুব্যবস্থা করে দিয়েছি, ঠিক তেমনি এবার আমার বিয়ের পাকা বন্দোবস্তও তোকেই করতে হবে!”
ওদিকে রামু ব্যারাকে নিজের চওড়া হাতে বো অ্যান্ড অ্যারো পয়েন্টে নিখুঁত নিশানা তাক করে খটাস করে তীর ছুড়ে মারে শীর্ষ! ছাঁৎ করে গিয়ে একদম সামনে থাকা গাছের কাঠের গোল চক্রের ঠিক মাঝের লাল বিন্দুতে গেঁথে যায় সেই তীক্ষ্ণ তীর! কানে থাকা ব্লুটুথ এয়ারবার্ডসের ওপর আলতো আঙুল চেপে নিজের এমন চরম লক্ষ্যপূরণের পানে তাকিয়ে সুগভীর এক বিজয়ীর হাসি হাসে শীর্ষ,
“তোকে কিন্তু এই বিয়ের জন্য আরও আস্ত একটা বছর ব্যাকুল হয়ে ওয়েট করতে হবে, চান্দু! তুই যেমন আমায় আর আমার মেঘকে অতীতে নানারকম ঘোরানোর ওপর রেখেছিলি, আমিও তোর সাথে ঠিক সেই কাজটাই ফেরত করব!”
শীর্ষর এমন বদমাইশি কথা শুনে নোমানের মুখ থেকে একরাশ কড়া আর তপ্ত গালি ছিটকে বের হয়ে যায়,
“শালা কুত্তার বাঁকা লেজ! শোন, তুই আবার শালা আমার একরত্তি নিষ্পাপ বোনকে কবে মনে মনে চেয়েছিলি, হ্যাঁ?”
“ওর বয়স যখন স্রেফ বারো!”
শীর্ষর সটান ও ঠান্ডা জবাব।
“শালা, বেশি ইতরামি আর বিতলামি না কইরা সোজা আমার বিয়ার সুব্যবস্থা কইরা দে না ভাই!”
“ক্যান ভাই? ওনে নিচে কি পানির তৃষ্ণা আর সমস্যা মাত্রাতিরিক্ত বেশি করতাসে নাকি?”
শীর্ষর এমন অশ্লীল ও উসকানিমূলক বার্তার ইঙ্গিত এক সেকেন্ডে বুঝে নিয়ে নোমানও গলার স্বর নিচু করে জবাব দেয়,
“তোর যেমন বউয়ের লাইগা তোর সাপের দিঘির খোঁজ করতাসে, ঠিক তেমনি আমারটাও এখন খাঁচায় সই পাতাতে চাইছে! তোরে তো আমি– শালা–”
আর কথা না বাড়িয়ে ফট করে মেজরের মুখের ওপর কলটা কেটে দেয় নোমান! বুকচাপা এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে সে। শীর্ষ কারদার আসলেই শুরু থেকে এমনই এক জেদী, ঘাড়তেরা আর বদমাশ কিসিমের মানুষ!
“এই মেয়ে!”
ছাদের দরজার পাশ থেকে শিউলি বেগমের কর্কশ গলা ভেসে আসে। ওনার এই উচ্চ আর মেজাজী ডাক শুনে মুহূর্তের মধ্যে সবার নাচ থেমে যায়। শিউলি বেগম ঠিক কাকে উদ্দেশ্য করে ডেকেছেন, তা বুঝতে কারো এক সেকেন্ডও সময় লাগে না।
“জ্বি, আন্টি?”
গলাটা কিছুটা নিচু করে শিউলি বেগমের সামনে গিয়ে নম্রভাবে জবাব দেয় মেঘ। বাঁকা ও তাচ্ছিল্যের চোখে মেঘকে আপাদমস্তক মেপে নেন শিউলি বেগম। ঠোঁট উল্টে নির্দয় ভঙ্গিতে বলেন,
“সোজা রান্নাঘরে যাও! গিয়ে সবার জন্য সন্ধ্যার ভারী টিফিন বানাও গে এখন।”
শিউলি বেগমের এমন অযাচিত ও রুক্ষ নির্দেশে উপস্থিত সবাই ভীষণ চমকে ওঠে! সবচেয়ে বেশি হতবাক হয় মেঘ নিজে। ও অবিশ্বাস্য নয়নে নিজের দিকে তর্জনী আঙুল উঁচিয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলে,
“আ– আমি বানাব?”
“হ্যাঁ, তুমি বানাবে না তো কি আমি বানাব? কেন, তোমার মা বুঝি তোমায় কোনো কাজকর্ম বা রান্নাবান্না শেখায়নি?”
শিউলি বেগমের কথায় মেঘ কষ্ট পায়, সাথে রাগও হয়। নিচু স্বরে শিউলি বেগমের করা অপমানের প্রত্যুত্তর করে,
“আমাকে যা বলার বলুন, আন্টি। আমি মাথা পেতে নেবো, কিন্তু আমার মাকে নিয়ে বাজে কথা বলবেন না।”
“বাব বাহ! কি কথা! খুব তো বড় লোক ছেলে পটাতে শিখিয়েছে তোমার মা। রান্না-বান্না শেখাতে পারেনি কেন?”
শিউলি বেগমের এমন চরম কুৎসিত আর অপমানজনক কথা শুনে ছাদের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা নোমান আর চুপ থাকতে পারল না। ওর মুখমণ্ডল রাগে থমথমে হয়ে ওঠে। দ্রুত এগিয়ে এসে মেঘের হাতটা নিজের শক্ত মুঠোয় ধরে নিজের আড়ালে টেনে নেয় সে। একবারে বরফশীতল কণ্ঠে জবাব দেয়,
“ আমার বোন মেঘ রাজকন্যার মতো আদরে বড় হয়েছে, শিউলি আন্টি! কোনোদিন কোনো কাজের জন্য একটা কুটোও দুটো করে নাড়তে দেয়নি ওকে আমাদের পরিবার। আর, আমার মা কখনও আপনাদের মতো নিচু মানসিকতার মানুষকে কিভাবে পটাতে হয় তা শেখায়নি। বড়লোক ছেলে পটানো তো দূরের কথা। আন্দাজের উপর কারোর চরিত্রে কালিমা লেপ্টাবেন না।”
“হাহ! গায়ের রঙের যা অনবদ্য ছিড়ি, সে নাকি আবার রাজকন্যা!”
মুখ একবারে ঝামটা মেরে কুৎসিত হাসেন শিউলি বেগম।ওনার এমন চরম বর্ণবাদী ও কুরুচিপূর্ণ ব্যবহারে ছাদ জুড়ে নেমে আসে এক শ্মশান নীরবতা! কিঞ্জা আর আদর নিজেদের মায়ের এমন বিষাক্ত রূপ দেখে মনে মনে চরম কষ্ট পায় ও লজ্জিত হয়।
“তুমি কবে থেকে এভাবে মানুষের গায়ের রঙ বাছ-বিচার করা শুরু করলে, আম্মু? মেঘকে বিনা কারণে সবার সামনে এভাবে জঘন্য অপবাদ আর অপমান কেন করছ, বলো তো?”
কিঞ্জা তড়িঘড়ি এগিয়ে এসে বেশ শক্ত গলায় প্রশ্ন করে। শিউলি বেগম মেয়ের দিকে ফিরে গর্জে ওঠেন,
“বাহিরে থেকে আসা একটা পরজাতের মেয়ের জন্য তুই জন্মদাত্রী মায়ের মুখে মুখে এভাবে বেয়াদবের মতো তর্ক করছিস, কিঞ্জা?”
“এটা বেয়াদবি বা তর্ক নয়, আম্মু! কিঞ্জা একদম সঠিক প্রশ্নটা করছে তোমায়! তাছাড়া, মেঘ কিন্তু কোনো বাইরের কেউ নয় ও এই কারদার বাড়ির বড় ছেলের বিবাহিত বউ!”
বোনকে এভাবে অযথা বকা খেতে দেখে আদর আর নীরব থাকতে পারল না। সোজা এসে বোনের পাশে দাঁড়িয়ে মায়ের দিকে তীক্ষ্ণ চোখ তুলে প্রত্যুত্তর করে সে। শিউলি বেগম এতে আরও তেতে ওঠেন,
“দুদিনের একটা পরকন্যার জন্য তোরা আজ নিজের মায়ের সাথে এভাবে বিবাদে জড়িয়ে পড়ছিস?”
“বড় ভাইয়া যদি একবার মেঘের সাথে করা এই সব অন্যায় অত্যাচারের কথা জানতে পারে, তবে সোজা এসে কারদার বাড়িতে এক লহমায় আগুন জ্বালিয়ে দেবে, মা! দয়া করে আর নতুন করে সংসারে কোনো অশান্তি ডেকে এনো না!”
কথাটা শেষ করে পাশ ফিরে ছোটদের দিকে তাকিয়ে কড়া হুকুম দেয় আদর,
“মিথু আর কিঞ্জা, তোরা মেঘকে সাথে নিয়ে চটপট নিচে নিজের নিজের ঘরে চলে যা তো!”
মায়ের সাথে তীব্র কথাকাটাকাটি করে ওদের নিচে পাঠানোর আদেশ দেয় আদর। মেঘের হাত ধরে বিষণ্ণ মুখে ওরাও নিচে নেমে যায়। মেঘ চলে যেতেই আদর আর রাহাতকে আড়ালে রেখে নোমানের কাছে এগিয়ে এসে নিচু গলায় বলে,
“আমি সত্যিই ভীষণ লজ্জিত আর দুঃখিত, নোমান ভাইয়া। মায়ের এমন জঘন্য আচরণের জন্য।”
নোমান নিজের চোখ-মুখ একবারে পাথরের মতো শক্ত ও হিংস্র করে ফেলে। জাঁদরেল কণ্ঠে জবাব দেয়,
“তোমার ভাই শীর্ষ কারদারের ভরসাতেই আমার মা-বাবা নিজেদের এত সাধের একরত্তি মেয়েকে এই বাড়িতে স্থান দিয়েছে, আদর! কারো কটু কথা বা অসম্মান সহ্য করার জন্য নয়! ওর চোখ থেকে যদি অন্যায়ভাবে এক ফোঁটা অশ্রুও গড়িয়ে পড়ে, তবে মনে রেখো কারদার বাড়িতে আসল কেয়ামত ঘটে যাবে!”
কথাটা বলেই চোখজোড়া হিংস্র করে শিউলি বেগমকে পার করে গটগট করে নিচে নেমে যায় নোমান।শিউলি বেগম এখনও জেদের বশে ছাদের ঠিক মাঝখানে স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রয়েছেন দেখে আদরের মেজাজ এবার চরম চড়ে যায়। ও বেশ উচ্চগলায় গর্জে ওঠে,
“ওই হিংসুটে সূচির কথা শুনে শুনে পুরো সংসারে অযথা আগুন ছড়াতে এসো না তো, আম্মা! মেঘের যদি ন্যূনতম কোনো ক্ষতি হয়, তবে কিন্তু বড় ভাইয়া তোমাকেও ছাড় দেবে না! তোমায় শেষবার সতর্ক করে দিচ্ছি আরেকবার এই শান্ত কারদার বাড়িটাকে নিজের জেদের বশে জ্বালিও না তুমি!”
রাহাতকে সাথে নিয়ে বেশ ক্ষুব্ধ পায়ে আদরও ছাদ ত্যাগ করে চলে যায়।সবাই চলে যেতেই শিউলি বেগম রাগের মাথায় ছাদের কোণে রাখা একটা টবের সদ্য ফোটা সুন্দর চারাগাছ মাটিতে সজোরে আছড়ে ভেঙে চুরমার করে ফেলেন! দাঁতে দাঁত চেপে বিষ ছড়ানোর ভঙ্গিতে আওড়ান,
“একটা কুলক্ষণী কালীনির জন্য আজ আমার নিজের গর্ভের ছেলে-মেয়েগুলো পর্যন্ত আমার বিপক্ষে চলে গেল? বেশ তো! এই কালকুচকুচে মেয়েকে এবার এমন এক মারাত্মক আর জঘন্য অপবাদ আমি এনে দেব নাযে স্বয়ং আমার শীর্ষই ওকে পা দিয়ে ঠেলে দূর দূর করে এ বাড়ি থেকে চিরতরে খেদিয়ে বের করে দেবে!”
কিঞ্জাদের সাথে নিচে নামলেও ওদের সাথে ওদের ঘরে না গিয়ে সোজা শীর্ষর ঘরে চলে যায় মেঘ। ভেজা চোখে ঘরের দরজাটা শক্ত করে আটকে দেয়। ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে বিছানার ওপর নিঃশব্দে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে সে। চোখ গড়িয়ে জল না নামলেও ওর বুকটা এক অজস্র না-বলা কষ্টে নিংড়ে মোচড় দিয়ে উঠছে।
“সবাই খালি মানুষের গায়ের রূপ আর রঙটাই দেখে ভেতরের মানুষটাকে কেউ দেখে না, মনটাকেও বোঝে না!”
ঘরের ধবধবে সাদা দেয়ালটার দিকে নিথর একমনে চেয়ে থাকে মেঘ।
“তোমরা আমায় কোথায় দিয়ে গেলে বাবা-মা? সবাই আমার গায়ের রঙ নিয়ে নোংরা কথা বলে।”
মন খারাপের দূরত্ব আরো বাড়তে থাকে। মন খারাপের তীব্র কষ্ট সামলাতে না পেরে কাঁপা হাতে পকেট থেকে মোবাইল বের করে ব্যস্ত হয়ে ডায়াল করে শীর্ষকে। ওপাশ থেকে প্রথম রিং হতেই কল রিসিভ হয়,
“প্রিয়া!”
ফুঁপিয়ে ওঠে শীর্ষর গলা শুনে। আস্তে করে ওকে ডাকে,
“মেজর সাহেব!”
মেঘের একরত্তি ভাঙা ও ভেজা গলার আওয়াজ শোনামাত্রই থমকে যায় শীর্ষ। মুহূর্তেই চিন্তার গাঢ় ছায়া নেমে আসে জাঁদরেল মেজরের চোখেমুখে
“কী হয়েছে, সোনা? কান্নাকাটি করছ নাকি? মন খারাপ তোমার?”
শিউলি বেগমের বলা সেই কুৎসিত অপমানজনক কথাগুলো মুখে এসেও থেমে যায় মেঘের। মনে মনে ভাবে কী দরকার অযথা মা আর ছেলের ভেতরে বিষাক্ত অশান্তি ডেকে আনার! নিজের কষ্টটা বুকের ভেতর চেপে ধরে হুট করে প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলে মেঘ,
“আপনাকে বড্ড মিস করছি! কবে বাড়ি আসবেন আপনি?”
মেঘের মুখে আকুল মন খারাপ আর সোহাগী সুর শুনে শীর্ষর কঠোর ঠোঁটের কোণে ফোটে এক মায়াবী চওড়া হাসি,
“আমি এখন বিশেষ এক ডেঞ্জারাস মিশনে আছি, সোনা! ঠিক সময় সুযোগ বুঝে এক ছুটে তোমার কাছে হাজির হয়ে যাবো, প্রমিজ!”
মেঘের মনটা আবারও দমে যায়। কে জানে আবার কবে সেই ‘ঠিক সময়’ আসবে আর লোকটা ফিরে আসবে!
“স্যার!”
হঠাৎ দরজার কাছ থেকে সেনাদলের এক সৈনিকের দ্রুত পদশব্দ আর কড়া সালামের আওয়াজ পায় শীর্ষ।
“পরে তোমায় কল দিচ্ছি, সোনা। নিজের খেয়াল রেখো।”
ফোনটা ঝটপট কেটে দিয়ে দাঁড়ানো সৈনিককে ভেতরে ঢোকার ইশারা করে শীর্ষ। টেবিলের ওপর হেলান দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে শুধায়,
মেজর কারদার পর্ব ৩১
“কী খবর, গালিব?”
সৈনিক গালিব কিছুটা এগিয়ে এসে নিচু অথচ জরুরি কণ্ঠে খবর পৌঁছে দেয়,
“স্যার, আমাদের গোপন সূত্রের খবর সত্যি! আজ গভীর রাতেও বর্ডার দিয়ে এক বিশাল নারী পাচার চক্র সক্রিয় হচ্ছে!”
