Home মেজর কারদার মেজর কারদার পর্ব ৩১

মেজর কারদার পর্ব ৩১

মেজর কারদার পর্ব ৩১
ফিনারা ঝুমুর

নীল-সাদা গগনে উড়ে খেলা করছে সফেদ মেঘের দল। ছোট ছোট আকারে পুঞ্জীভূত হয়ে যেন ছুট লাগিয়েছে নিজেদের দলের পানে। নদীর ধারে আর সবুজ ঘাসের প্রান্তরে ফুটে উঠেছে শরতের প্রতীকী পুষ্প কাশফুল। দখিনা হাওয়ার আলতো দোলায় হেলেদুলে নাচছে তারা। কোনো কোনো ফুলগুটি আবার মূল ফুল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে হাওয়ার তোড়ে ভেসে চলেছে এলোমেলো নীল গগনের পানে।
​দীর্ঘ একটি মাস পর ফের কারদার বাড়িতে চরণ পড়েছে মেঘালয়ার। সঙ্গে দেহরক্ষী হিসেবে হাজির হয়েছে ওর নিজের বড় ভাই নোমান। মেঘ আজও মনে মনে ভেবে কূল পায় নাশীর্ষ আর ওর ভাই নোমান ঠিক কীভাবে এত পাকা বাল্যবন্ধু হলো? দুজনের বয়সের ফারাকও তো কিছুটা আছে, তার ওপর স্থান, কাল, পাত্র সবই ভিন্ন! কীভাবে গড়া হলো এই গভীর বন্ধুত্বের বন্ধন? আদৌ কি ওরা বাল্যবন্ধু, নাকি অন্য কিছু? শত ভেবেও কোনো সটান উত্তর খুঁজে পায় না অভিমানী রমণী।​কারদার বাড়ির ফটকের সামনে এসে নোমান থামল। পকেট থেকে হাত বের করে বলল,

​“তুই তবে ভেতরে যা, মেঘ। আমি আসি?”
​“সেকি, ভাইয়া! তুই একদম সদর দুয়ার থেকে ফিরে চলে যাবি কেন, হ্যাঁ?”
​ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে মেঘ। নোমান যে হুট করে ভেতরে ঢুকতে চাইছে না, তার কোনো যথাযথ কারণ রমণী খুঁজে পেল না। নোমান নিজের চোখের ওপর থাকা দামি রোদচশমাটা খুলে বোনের ব্যস্ত আনন দেখে আলতো করে হাসল। মেঘের মাথায় ডান হাতটা পরম স্নেহে রেখে মুখের সূক্ষ্ম হাসিটা আড়াল করার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে বলল,
​“আরে বোকা মেয়ে, প্রথমবার তোদের এই সংসারে এসেছি, বোনের শ্বশুরবাড়িতে কি খালি হাতে ঢুকতে আছে?”
​“একদম বাজে তর্ক করবি না, ভাইয়া! আগে এটা তোর খালার বাড়ি, আর পরে আমার শ্বশুরবাড়ি! কোনো বাহানা শুনব না, সোজা চল আমার সাথে!”
​একপ্রকার জোড় খাটিয়ে ভাইয়ের হাত বগলদাবা করে ভেতরে প্রবেশ করল মেঘ। বসার ঘরে পা রাখতেই চোখ পড়ল এ বাড়ির দুই বিখ্যাত ‘মণি’র ওপর! সুদৃশ্য ড্রয়িংরুমের সোফায় কুশন নিয়ে তুমুল যুদ্ধ আর মারামারিতে ব্যস্ত দুই বয়সে বাড়া চরম বিচ্ছুরাহাত আর মিথিলা!

​“রাহাতের ছাগল, তুই আমার চুল ছাড় বলছি!”
​মিথিলার একগাছি চুল ডানহাতে শক্ত করে টেনে ধরে খেসখেস করে কূটিল ভঙ্গিতে হাসছে রাহাত। অন্যহাতে ঢাল হিসেবে আঁকড়ে ধরে রেখে সোফার কুশন।
​“আরে ও শাকচুন্নি, তোর এখনও বিয়ে হয় না কেন রে? তোর এই জটলা চুলের সুশ্রী কিঞ্জার সাথে তুইও বিদায় হ দেখি এ বাড়ি থেকে!”
​“ছাগলের তিন নম্বর পঙ্গু পা, তুই আমার চুল ছাড় বলছি, ছাগল কোথাকার!”
​রাহাত তবুও চুল ছাড়ে না। মিথিলাও হার মানার পাত্রী নয়। হাতের কুশনটা ধপাস করে নিচে ফেলে দুই হাতের মুঠোয় চেপে ধরল রাহাতের শখের সিল্কি চুল! দুই মূর্খের মাঝে জোরসে টানা হেঁচড়া আর চুলোচুলি চলতে লাগল। ওদের এমন ছোটদের মতো মারামারি দেখে দুনিয়ার কারোর বোঝার উপায় নেই যে রাহাত বয়সে মিথিলার চেয়ে বড়!

​“এমা! রাহাত দেওরা, কিতা করছো তুমি এসব, হ্যাঁ?”
​হঠাৎ খুব পরিচিত আর মিষ্টি কণ্ঠ পেয়ে মারামারিতে ব্যস্ত থাকা দুই জোড়া চোখ সোজা তাকায় সদর দরজার পানে। মেঘ আর নোমানকে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এক মুহূর্তের জন্য একেবারে হা করে স্থাণু হয়ে যায় ওরা!
​মেঘ নিজের কাঁধের সাইড ব্যাগটা অলসভাবে নোমানের ওপর ছুড়ে ফেলে ছুটে আসে সোফার কাছে। মুখ টিপে মিটমিট করে হেসে ওদের এই বিচিত্র চুলোচুলি দেখে হাততালি দিয়ে বলে,
​“ধরি বান্দরও কি শেষমেশ এভাবে চুলোচুলি করে? বিশ্বের অষ্টম আশ্চর্য বললেও ভুল হবে না তো!”
মেঘের হাস্যোজ্জ্বল কথায় ওদের মুখখানা দেখার মতো একখান করুণ অবস্থা ধারণ করল! ফুলানো বেলুনের হাওয়া হুট করে উবে গেলে যেমন চ্যাপ্টা হয়, এই দুই বদমাশের রূপও একদম হুবহু তেমনই দাঁড়িয়েছে। রাহাত অপরাধীর মতো জোরপূর্বক ফিক করে হেসে মিথিলার চুলে থাকা নিজের মুঠি ছেড়ে দিল। মিথিলাও গাল ফুলিয়ে রাহাতের চুল ছেড়ে ঝটপট নিজের এলোমেলো জামাকাপড় ঠিকঠাক করতে লাগল।
​টানাটানির চোটে মিথিলার মাথার চুল এমন জট পাকিয়ে এলোমেলো হয়ে গেছে যে, মনে হচ্ছে যেন একশত বছর ধরে নদী-পুকুরে গোসল না করা পাহাড়ি সাধুদের রূপ ধরেছে সে! দেখতে ঠিক যেন শেওলা গাছের শুকনো এক শাকচুন্নি!
​মেঘ দুই হাত মুখে চাপা দিয়ে অতিকষ্টে নিজের তীব্র হাসি সামলাতে লাগল। রাহাত মেঘের এই মিষ্টি ও দুষ্টু হাসি দেখে দাঁত কেলিয়ে পিরপিরে কণ্ঠে শুধাল,

​“ওমা! ভাবিসাব, আপনে কহন আইলেন, হ্যাঁ?”
​রাহাতের এই তড়িঘড়ি করা পেঁচামুখো অবস্থা আর আজব বাংলা উচ্চারণ দেখে মিথিলা ততক্ষণে ঠোঁট চেপে হেসে কুটিকুটি হচ্ছে। মেঘও বহু কষ্টে হাসি চেপে গম্ভীর ভাব ধরে উত্তর দিল,
​“আইলাম তো মাত্রই! আইয়াই তো আমার পরানের দেওরা আর লক্ষ্মী ননদিনীর এমন মধুর চুলোচুলি চক্ষের সামনে পড়লো, রাহাত দেওরা!”
​“আরেহ না না ভাবিসাব, মারামারি তো আমি শুরু করি নাই, এই শাকচুন্নিটাই আগে গায়ে হাত তুলছে!”
কথাটা বলেই নিজের ঘাড়ের চুল ঠিক করতে করতে মিথিলার দিকে কটমট করে রাগী চোখে তাকাল সে।​মিথিলাও রাগ সামলাতে না পেরে দুই চোখ একদম রাগে রক্তিম লাল করে রাহাতের দিকে তর্জনী উঁচিয়ে উচ্চস্বরে অভিশাপ ছিটাল,

​“মিছা কথা কইলি ক্যান রে বাঁদর? তোর বউ তোরে বিয়ের পর রোজ সকালে ওঠা-বসায় ঝাড়ু দিয়া পিটাইবো! তিনদিনের বাসি পচা খাবার খাওয়াইবো, তোর পেছনে কুত্তা দিয়ে দৌড়ানি খাওয়াইবো, আর তোরে শায়েস্তা করতে তোর টুথপেস্টে পেস্টের বদলে গু ভইরা দিবো!”
​“কী কইলি তুই, হাভাতে মেয়ে? নাহ্! এই কিঞ্জার বিয়ের আগেই তোরে কারোর সাথে বিয়া দেওন লাগবো! ভালো হইছে নোমান ভাই আসছে। নোমান ভাই তুমি ওরর জন্য উপযুক্ত ভাদাইম্মা পোলা খুঁজো! এবার এই কারদার বাড়ি থাইকা কুত্তীরে বিদেয় কইরা ছাইড়া ভাগাবো!”
​কথাটা শোনামাত্রই বিষাক্ত কুশনটা সজোরে রাহাতের মুখের দিকে ছুড়ে মারল মিথিলা! কিন্তু মিথিলার নিখুঁত আন্দাজ বুঝতে পেরে রাহাত চট করে নিজেকে আড়াল করতে ডুব দিল সোজা নোমানের চওড়া পিঠের পেছনে! আর ব্যাস! দিকভ্রষ্ট হয়ে সেই ভারী কুশনটা সোজা গিয়ে কষে ধপাস করে আছড়ে পড়ল নোমানের মুখ বরাবর!

​“মিথুউউউ!”
​নোমানের সেই গম্ভীর অথচ মৃদু গর্জনের মতো চিৎকারে মিথিলা ভয়ে এক লহমায় কেঁচো হয়ে গুটিয়ে গেল! ওড়না দিয়ে মুখ পেঁচিয়ে দ্রুত লম্বা লম্বা পায়ে দৌড়ে পালিয়ে চলে গেল সোজা দোতলার দিকে।
​মেঘ এবার দুই কোমরে হাত রেখে রাহাতের দিকে একখানা হুকুমের দৃষ্টি নিক্ষেপ করল,
​“এবার নোমান ভাইয়ের পেছন থেকে বাইরে বের হও, রাহাত দেওরা!”
​“হইছি ভাবিসাব, শান্ত হন!”
​“যাও, এবার রান্নাঘরে গিয়া আমাগো দুই ভাই-বোনের লাইগা একদম ঠান্ডা দুই গ্লাস শরবত বানাইয়া আনো দেওরা!”
​“কামডা কি আদেও ভালা করলেন, ভাবিসাব? আমার মতো এই একরত্তি ছোটখাটো দেওরে এভাবে কাজের হুকুম মারেন? দেখিয়েন, ওপরের আল্লাহ কিন্তু আপনারে বেজায় পাপ দিবে!”
​বোনের এই একচ্ছত্র রাজত্ব আর রাহাতের করুণ কাকুতি-মিনতি দেখে নোমান হো হো করে সশব্দে হেসে ফেলল! মেঘ যে এ বাড়ির ছোটদের একদম নিঃশব্দে নিজের দলপতি বানিয়ে ফেলেছে, তা বুঝতে নোমানের আর বিন্দুমাত্র বাকি রইল না। মানিয়েছেও বেশ খাসা! যেমন ভাইয়ের মিষ্টি বউ তেমনই তার এই ছটফটে দেওর আর পাগলাটে ননদিনী! সবাই কারদার পরিবারের এক একটা খাঁটি রত্ন!

পিংকি বেগম আজ বেজায় ব্যস্ত! নিজের গর্ভের না হলেও বোনের পরম স্নেহের ছেলে এসেছে বলে কথা। নোমানকে কাছে পেয়ে কী রেখে কী খেতে দেবেন, যেন ভেবেই পাচ্ছেন না তিনি। তাও তো কতগুলো দিন পর ছেলেটা এই বাড়িতে পা রাখল!
​“আহা, তুই আরেকটু খেয়ে নে না রে, আব্বা! দেখ তো দিন দিন কী বাজেভাবে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছিস তুই!”
​সরা থেকে ইলিশ মাছের পেটি দিয়ে ভাত মেখে মুখে পুরতে পুরতে খালামনির উৎকণ্ঠিত মুখের দিকে তাকায় নোমান। গাল ভর্তি ভাত নিয়ে চিবাতে চিবাতেই চওড়া হেসে বলে,
​“কী যে বলো না খালামনি! কই আবার শুকিয়ে গেলাম, হ্যাঁ? ডাক্তারির জন্য ডায়েট আর এক্সারসাইজে উল্টো আরও চার কেজি ওজন বেড়েছে আমার!”

​“রাখ তোর ওই চার কেজির ওজন! এই বয়সে ধুমসে খাবি-দাবি, আনন্দ করবি, তা না করে মিলিটারি আর ক্যাডেটদের মতো কিসব ছাইপাঁশ ডায়েট-ফায়েট করছিস!”
“সুস্থ না থাকল্ব মানুষের সেবা কিভাবে করি, খালামনি?”
​নোমানের শেষ হতে যাওয়া খাবারের পাতে জোড় জবরদস্তি করে আরও এক হাতা সুবাসিত ভাত আর মাখানো তরকারি দিতে দিতে বেশ ঝাঁঝালো গলায় বলেন পিংকি বেগম,
​“আজকে গিয়ে তোর আম্মা আলেয়া আপাকে বলেই তোর বিয়ের বন্দোবস্ত পাকা করছি! ঘরে একবার মিষ্টি একটা বউ এলে তোর মাথা থেকে এই ডাক্তারির ভূত আর ওজন কমানোর ভূত—সব অমনি নিমেষে উড়ে পালিয়ে যাবে!”
​কথাটা শোনামাত্রই নোমান গালভর্তি ভাত নিয়েই ফিক করে হেসে ওঠে,
​“তা কেন, খালামনি? আমার বউ খোঁজার অত কী দরকার! তুমি বরং সোজা জুলেখা ইয়াসমিনকে আমার কাছে এনে দাও, এক বাক্যে ‘কবুল’ বলে নিজের ঘরে তুলে নিই!”
​নোমানের এমন আজব কথা শুনে পিংকি বেগম একগাল হাসেন। পরম মমতায় নোমানের চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে মৃদু চড় মেরে বলেন,
​“তাহলে তো হয়েছে! ওই ডাক্তার আকবর জুলান তোরে জ্যান্ত খুন করবে! বউয়ের প্রতি কী ভীষণ পাগল একটা লোক, তা তো ভালো করেই জানিস!”
​নোমান প্লেট থেকে হাত গুটিয়ে হাসতে হাসতে শুধায়,

​“আচ্ছা খালা, তোমার বাপটা আসলে এমন অদ্ভুত কেন বলো তো? আমার মিষ্টি জুলেখা ইয়াসমিন বুড়ি কী এমন ছাই দেখে তোমার ওই রগচটা বাপের গলায় নিজের সাধের বাসরমালা পরিয়েছিল, হ্যাঁ?”
​“আমার আম্মা আবার স্বেচ্ছায় মালা দিতে গেছে নাকি রে বোকা? তোর নানা তো আমার আম্মাকে একদম নিজের ডেরা থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে সোজা মসজিদে ঢুকিয়ে বিয়ে করেছিল!”
​এইসব পুরনো গল্প তাদের সবারই নকদর্পণে। জুলেখা ইয়াসমিনের প্রেমে একেবারে গলে পানি হয়ে বিয়ের সাজানো আসর থেকেই তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন দুর্ধর্ষ ডাক্তার আকবর জুলান। সোজা মসজিদে নিয়ে কাজী ডেকে বিয়ে সম্পন্ন করেছিলেন। তবে নোমান মনে মনে ভাবে নানা-নানির বিয়ের থেকেও বেশি রোমাঞ্চকর আর ইউনিক বিয়ে করেছে ওর নিজের বাবা-মা! সাত্তার মাস্টার নাকি কলেজের ক্লাসরুম থেকে সোজা আলেয়া বানুকে বাইকে তুলে নিয়ে গিয়ে কাজী অফিসে ঝুলিয়ে বিয়ে করেছিলেন!
​আর ওর এই পিংকি খালা আর রাশেদ খালুর রোমান্স তো আরও এক ধাপ ওপরে! হাসপাতালের সাদা বেডে শুয়ে শুয়ে পিংকি বেগমকে একপ্রকার জোরজবরদস্তি করেই নিজের বউ বানিয়েছিলেন রাশেদ কারদার। পিংকি খালাকে কোনোমতে নিজের মন দিতে রাজি করাতে না পেরে ওই মানুষটা সোজা নিজের হাতের রগ কেটে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন! খালা বেচারিও দয়া দেখিয়ে হাসপাতালে দেখতে গিয়ে একেবারে রাশেদ কারদারের চরম বিয়ের তোপে পড়ে গেলেন! কী এক বিচিত্র কিসিমের ভালোবাসার কাহিনী এদের সবার জীবনে! নোমান মনে মনে ওসব অতীত ভেবে ঠোঁট চেপে হাসে।

​ওদিকে এক পাশে চেয়ারে বসে থুতনিতে হাত দিয়ে হিংসুটে দৃষ্টিতে নিজের খালা আর সঘোষিত ভাই নোমানকে দেখছিল মেঘ। ডাগর দুটো হিংসুটে নয়নে ভাইয়ের থালার উপচে পড়া হরেক পদ আর গরুর কলিজার ভুনার দিকে তাকিয়ে ফোঁস করে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
​“হুমম! ভালোই তো! সব রসালো গরুর কলিজা আর ইলিশ মাছের পেটি কেবল নিজের বোনপুতকেই থালায় সাজিয়ে দাও খালামনি! আমি তো রাস্তা কুড়িয়ে পাওয়া ভাগনি বৈ তো আর কিছু নই! তাই আমার তো আর এই কারদার পরিবারে কোনো কদরই নাই, তাই না?”
​মেঘের এমন ন্যাকামিময় ও অভিমানী কথায় পিংকি বেগম সশব্দে হেসে ওঠেন। বড্ড ভারী আর পাজি একটা মেয়ে! দেখলে বোঝার উপায় নেই যে মেঘ ওনার নিজের বোনের পেটের মেয়ে নয়, কিংবা বোনের ননদের মেয়ে! নিজের বুকে আগলে কী ভালোবাসায় না উনি মেয়েটাকে গড়ে তুলেছেন! পরম সুখে মেঘের চিবুক ছুঁয়ে মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে দেন উনি।
​তবে কারদার বাড়ির দোতলার সিঁড়ির কোণ থেকে এই থমথমে ও মধুর দৃশ্যটা কুটিল দৃষ্টিতে দেখে চলেছেন শিউলি বেগম। ওনার দু-চোখে ফুটে উঠেছে এক চরম বিষাক্ত আর রুষ্ট দৃষ্টি! শত চেষ্টা করেও তিনি নিজের মন থেকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না এই একরত্তি অহংকারী মেঘকে নিজের মেজাজী ছেলে শীর্ষর অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে!
​মনের গহীনে কালো চক্রান্ত পাক খেতে থাকে ওনার যেভাবেই হোক, যে কৌশলেই হোক না কেন, এই বাড়িতে কিঞ্জার বিয়ে মেটার আগেই মেঘকে এই কারদার বাড়ির সীমানা থেকে চিরতরে তাড়াতে হবে!

খেয়েদেয়ে পেটপুজো সেরে অলস পায়ে কিঞ্জার ঘরে ঢু মারে মেঘ। ঘরে ঢুকে দেখে, খাটের ওপর বালিশের ওপর বিশাল এক ডাক্তারি বই রেখে উপুড় হয়ে গভীর মনোযোগে পড়ছে কিঞ্জা। কিসব কঠিন আর বিদঘুটে সব মেডিসিনের নাম! মেঘের মাথায় কিছুতেই খেলে না দুনিয়ায় এত সহজ আর সুন্দর সব পড়া থাকতে মানুষকে কেন যে এভাবে মাথা খারাপ করে ডাক্তারি পড়তে হয়!
​নিজের মনেই একবার ভেবে হেসে ফেলে ও নিজের ভাই নোমান ডাক্তার, নানা আকবর জুলানও বিখ্যাত ডাক্তার, আর এখন ওনার এই মিষ্টি ননদিনী কিঞ্জাও হতে চলেছে হবু ডাক্তার! কী কিসমত ওর, চারপাশে শুধু ডাক্তারের মেলা!

​“কী করছ, আপু?”
​আচমকা কারোর গলার আওয়াজ পেয়ে চোখের ওপর নেমে আসা পাতলা চশমাটা আঙুলের ডগায় একটু ওপরের দিকে ঠেলে দরজার পানে তাকায় কিঞ্জা। মেঘকে ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একগাল মিষ্টি হাসিতে ওর মুখশ্রী উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
​“আরেহ! দরজার গোড়ায় দাঁড়িয়ে আছ কেন, ভাবি? ভেতরে এসো!”
​“কিসব খালি ভাবি-ভাবি করো বলো তো! আগের মতো সোজা ‘মেঘ’ বলেই ডাকবে, বুঝেছ?”
​ঘরে ঢুকতে ঢুকতে একরাশ কৃত্রিম রুষ্ট গলায় জবাব দেয় মেঘ। সুতির সুন্দর টু-পিস থাকলেও এতে পরার ওড়না না থাকায়। আলাদা এক হিজাব ওর গায়ে পরা রয়েছে। যা ওর মাথার ওড়না হিসেবেও কাজে দিচ্ছে। মেঘ ওর মাথার আলাদা সুতি হিজাবটা হাতে অলসভাবে পেঁচাতে পেঁচাতে কিঞ্জার তুলতুলে বেডে এসে বসে ও।

​বেশ গুছানো আর চমৎকার শৌখিন এ ঘরখানা! দক্ষিণ দিকে বিশাল এক ফরাসি জানালা, তার সাথে লাগোয়া পড়ার টেবিল। ঘরের একপাশে কাঠের রাজকীয় খাট, তার ওপর সুন্দর ফ্লাওয়ার প্রিন্ট করা বেডশিট বিছানো। ঘরের এক দেয়ালজুড়ে কিঞ্জার বেশ কিছু স্মৃতিময় ফ্রেম করা ছবি, আর অন্য দেয়ালে কিঞ্জার নিজের হাতে আঁকা অসাধারণ কিছু পেইন্টিং—যার চারপাশে পেঁচানো হালকা ফেইরি লাইটের আলো জ্বলজ্বল করছে। আর লাগোয়া ছোট্ট ব্যালকনিটায় ঝলঝল করছে কৃত্রিম এক বাবুই পাখির বাসা, হরেক রকমের পাতাবাহারি গাছগাছালি আর একটা নান্দনিক কাঠের দোলনা।
​ঠিক একজন নিখুঁত শৌখিন নারী যেমন হয়, কিঞ্জাও যেন ঠিক তেমনই রুচিশীল। চোখের ওপর পাওয়ারি চশমাটা উঠালে এই মিষ্টি নারীটার সৌন্দর্য যেন নিমেষে বহুগুণ বেড়ে যায়! আর তার ওপর কপালের সামান্য নিচে ছোট্ট একবিন্দু কুচকুচে কালো তিল যা দেখতে একদম জন্মগত টিপের মতোই মায়াবী লাগে! সাথে ওই দুটো ডাগর ডাগর হরিণী নয়ন তো রয়েছেই।
​মেঘের চোখে কিঞ্জা সত্যিই অনন্যা আর রূপসী এক নারী! দু-গালে হাত রেখে মুগ্ধ নয়নে ননদিনীর পানে চেয়ে থেকে মন থেকে প্রশংসা করে উঠে মেঘ,
​“কী যে অপরূপা সুন্দরী গো তুমি! আমি যদি এই জন্মে একটা পুরুষ ছেলে হতাম, তবে বাজি ধরে তোমাকেই নিজের বউ করে বিয়ে করে ঘরে আনতাম!”
​কিঞ্জা চশমার ওপাশ থেকে খিলখিল করে হেসে উঠে চটপট জবাব দেয়,

মেজর কারদার পর্ব ৩০ (২)

​“তুমিও তো কম মায়াবতী আর মোহময়ী নও, মেঘ! আমার ওই জাঁদরেল কাঠখোট্টা ভাইটা যে একদম তোমার রূপের প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে মাতোয়ারা হয়ে আছে, তা তো ওর চাউনি দেখলেই বোঝা যায়!”
​কিঞ্জার মুখে নিজের স্বামীর এমন বেপরোয়া ভালোবাসার কথা শোনামাত্রই রক্তিম লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে মেঘের দু-গাল! দু-হাতে নিজের মুখটা ঢেকে একবারে লাজুক লতার মতো দুমড়ে-মুচড়ে খাটে গড়িয়ে পড়ে ও,
​“ইশশশ! কী যে যাতা সব যা নয় তা বলছ তুমি, আপু!”

মেজর কারদার পর্ব ৩২