অভিসৃতি পর্ব ১
নওরিন কবির তিশা
গতকাল বান্ধবীকে কল দিতে গিয়ে ভুলবশত সেনাবাহিনীর এক মেজরের নম্বরে কল করে গালাগালী করার পর কায়রা জেনেছে তার পরিচয়।
সেই থেকেই ভীষণ ভয়ে ভয়ে আছে চঞ্চল হরিণীটি। যদিও পরিচয় পাওয়ার পরমুহূর্তেই নম্বরটার অবস্থান দিয়েছে ব্লক লিস্টে। তবুও, ভয়ের পরিমাণ এক ইঞ্চিও হ্রাস হয়নি তার।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃহৎ ক্যাম্পাস। চতুর্দিকে সবুজের সমারোহ বেষ্টিত এক শান্তির উদ্যানে ঘাসের ওপর দু’হাঁটু ভাঁজ করে বসে আছে ছয় সদস্যের এক অন্তরঙ্গ বন্ধু মহল। সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে—‘দ্য ব্লুম ক্রু’ নামে খ্যাত এই দলবলের প্রত্যেকেই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় জীবভূগোল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
সদস্যদের রয়েছে একে অন্যের থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। কথায় আছে না একের ভেতর সব। তবে এদের ক্ষেত্রে কথাটা উল্টে হয়, ছয়ের ভিতর সব। নিহার,মেধা,কায়রা,ইভান,রুশাফ,তুজা—ছয় সদস্যের ছয় রুপ।
এ যেমন এখন সদ্য ভূমিষ্ঠ পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্পাপ বাচ্চাটার মত মুখ করে বসে আছে এলাকার বিশিষ্ট শিল্পপতি মহোদয়ের একমাত্র ছোট কন্যা কায়রা ইয়াসির। আর পাশে তার খিল্লি উড়াচ্ছে বাকি পাঁচজন। শেষমেষ মেজাজ হারিয়ে হাতে থাকা ক্যান-টা দূরে ছুঁড়ে মেরে সে বলল,,
“হ্যোয়াট দা! ইয়ার, অন্তত বোঝ এটা। আমি তাকে কত গালাগালি দিলাম! ছিঃ! সব দোষ এই মেধাটার। হা’রা’মি যদি কাল প্রেজেন্টেশনটা মিস না করতে তাহলে আমি ওকে কল করতাম না আর গালাগালিও দিতাম না।”
এতক্ষনের দমফাটা হাসির রেশ কমিয়ে এবার বোকা কণ্ঠে মেধা বলল,,
“মানে কি ভাই? নাম্বারের ডিজিট ভুল বসিয়েছিস তুই, গালাগালি করেছিস তুই, আর এখন যত দোষ এই মেধা ঘোষ! বললেই হল?”
বাকি পাঁচজন সায় জানিয়ে বলল,“হ্যাঁ, নিজের দোষ মেধার ঘাড়ে দিস না কায়া!”
কায়রা অবিন্যস্ত কেশরাজ ক্ষিপ্র বেগে দু’হাতের মুঠোয় পুরে,মাথা নুইয়ে ঘাসের পানে চেয়ে বলল,
”ইয়ার! তোরা বুঝছিস না,এখন যদি কিছু হয়। মেজর! ভাই!”
পাশে বসা ইভান ক্যানে চুমুক দিতে দিতে বলল,,
“আরে,চিল। মেজর মানে বুঝিস? কত প্রেসার থেকে তার। তার উপর অত উচ্চপদে যেতে যেতে এক পা কবরে! এত কিছু মনে রাখার সময় বা ইচ্ছা কিছুই থাকবে না।”
কায়রা মুখ তুলে চাইলো,,
“মানে কি? মেজররা বুড়ো হয়?”
“তা ছাড়া কি?বেহুদা প্যানিক করিস না।”
কায়রা এক মুহূর্ত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। চুপটি করে বসে থাকা ওর কপালে চিন্তার ভাঁজ দেখে মেধা একটু এগিয়ে এসে ওর কাঁধে হাত রাখল। কিন্তু সান্ত্বনা দেওয়ার বদলে মুখ টিপে হেসে বলল,
“আচ্ছা কায়া, তুই যখন ওনাকে গালি দিচ্ছিলি, তখন ওনার রিঅ্যাকশন কেমন ছিল রে? মানে, মিলিটারির কায়দায় রিভার্স গালিটালি খেছিস নাকি?”
কায়রা মেধার হাতটা ঝাড়া মেরে সরিয়ে দিয়ে চোখ রাঙাল,
“মেধা, তুই জাস্ট চুপ কর! তোর ওই পঁচা ডোবার মতো প্রেজেন্টেশনের চক্করে আমার লাইফ এখন ডার্ক মোডে চলে গেছে। আর তুই এখানে রসদ খুঁজছিস?”
পাশ থেকে রুশাফ ঘাসের ওপর চিৎপটাং হয়ে শুয়ে একটা হাই তুলে বলল,
“আরে ধুর! ইভান যেটা বলল, লজিক আছে। আর্মি পারসনরা এমনিতেও সারাদিন ‘লেফট-রাইট’ আর ডিউটি নিয়ে বিজি থাকে। তোর মত একটা পুঁচকে মেয়ের ফালতু গালি মনে রাখার মতন ফালতু সময় ওনাদের নেই। চিল মার!”
তুজা এতক্ষণ চুপচাপ নখ খুঁটছিল, এবার সে কায়রার দিকে তাকিয়ে ফোড়ন কাটল,
“তা ঠিক। তবে ভাব তো একবার, মেজর সাহেব যদি ট্র্যাকিং টিম বসিয়ে দেয়? খুলনা ইউনিভার্সিটির বোটানি ডিপার্টমেন্টের সেকেন্ড ইয়ারের কায়রা ইয়াসিরকে যদি একদম জিপ গাড়ি নিয়ে এসে ক্যাম্পাস থেকে তুলে নিয়ে যায়? জাস্ট ইমাজিন!”
“তুজা! তুই কি একটুও পজিটিভ কথা বলতে পারিস না?”
কায়রা এবার সত্যিই কেঁদে ফেলার মত মুখ করল,,
“এমনিতেই কাল রাত থেকে আমার হার্টবিট নরমাল হচ্ছে না। আর হাবা ইভান, উল্টাপাল্টা থিওরি ঝাড়ছে!”
ইভান ক্যানের শেষ চুমুকটা দিয়ে শব্দ করে সেটা মাটিতে রাখল। তারপর কায়রার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলল,
“হ্যালো ম্যাডাম, আমি অলওয়েজ কমন সেন্স খাটাই। তুই কি ভাবিস বর্ডার পার হয়ে এসে কোন ইয়াং ড্যাশিং মেজর তোকে ডায়েরি মেইনটেইন করে খুঁজতে আসবে? ওনারা বুড়ো না হলেও ম্যাচিউরড তো বটেই। তোর মত পিচ্চির ওপর রাগ দেখানোর চেয়ে ওনাদের অনেক বড় বড় কাজ আছে। সো, বেহুদা প্যানিক করিস না।
“তোর মত গাধারে বিশ্বাস নেই।”
ইভান এবার ক্ষেপে উঠলো,,
“মানে? বলল তুই? রিপিট কর আবার!”
“বা’ ল বলছি! সবজান্তা সমসের তুমি? না জেনে জ্ঞানী সাজো। সর সামনে থেইক্কা, নাহলে।”
“এ্যাই,এ্যাই কি করবি তুই?”
“কি করবো?”
বলেই হস্ত চালান করে দিলো ইভানের চুলের মাঝে। যন্ত্রণায় মুখ বিকৃত করে কুকিয়ে উঠলো ইভান,,
“চুন্নি রে! ছাড় চুল। হুশ,হুশ, ছাড় বলছি। ডিরেক্ট স্ক্যাল্প উপড়ে চলে আসবে তো!”
নিহার আর মেধা ততক্ষণে হাসতে হাসতে একে অপরের গায়ের ওপর গড়িয়ে পড়ছে,,
“মার কায়া, আরও জোরে মার! মেজরের রাগটা ইভানের ওপরই ঝাড়!”
পাশ থেকে রুশাফ এবার চেঁচিয়ে উঠল,,
“অ্যাই! থামবি তোরা?”
কায়রা ইভানের চুল শেষ একটা ঝাঁকুনি দিয়ে ছেড়ে দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“ধুর, বা’ল।”
ইভান নিজের চুলগুলো হাত দিয়ে ঠিক করতে করতে কায়রাকে ভস্ম করে দেওয়ার মত লুক দিল। বন্ধুমহল হুহা করে হাসতে হাসতে সময় গড়িয়েছে অনেকটাই। তাই আড্ডা আর জমলো না। নিজ নিজ গন্তব্যে রওনা হলো সবগুলো।
অপরাহ্নের সমাপ্তি লগ্ন। ফালাকুন জুড়ে গোধূলির কমলাভ রশ্মির বিচ্ছুরণ। বিকেলের আলো তখন শেষ হয়ে আসছে। বেলা ফুরানোর সঙ্গে সঙ্গে ধেয়ে আসছে হেমন্তের মিঠে বাতাস। প্রাকৃতিক এত আয়োজনের মাঝে, যশোর-খুলনা হাইওয়ে ধরে তীব্র গতিতে ছুটে চলেছে একটি কালো রঙের হ্যারিয়ার গাড়ি।
স্নিগ্ধ গোধূলির আলো এসে পড়েছে স্টিয়ারিং হুইলে রাখা শক্ত-পোক্ত হাত দুটোর ওপর। চালকের চওড়া কাঁধ, টানটান চোয়াল আর ঋজু বসার ভঙ্গিই বলে দেয় সে নিয়মতান্ত্রিকতার কঠিন ছাঁচে গড়া একজন সৈনিক। তবে এই মুহূর্তে তার গায়ে কোনো সামরিক পোশাক নেই। দীর্ঘ সুঠামদেহে শোভা পাচ্ছে সাধারণ একটা নেভি ব্লু পোলো শার্ট আর কালো ট্রাউজার্স।
নিখুঁতভাবে ট্রিম করা চুল, গভীর ও তীক্ষ্ণ চক্ষুদ্বয় যেন সম্মুখের পিচঢালা পথ ভেদ করে বহুদূর চলে যাচ্ছে। সুপুরুষ বলতে যা বোঝায়, মেজর দুর্জয় আহসান ঠিক তাই। আচমকা একটা রিংটোন শান্ত পরিবেশটাকে এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিল। ড্যাশবোর্ডে রাখা ওয়ানপ্লাস ফোনটার স্ক্রিন জ্বলে উঠেছে। ব্লুটুথ কানেক্টিভিটিতে ভেসে উঠল ওপাশে থাকা মানুষটার নাম- সায়মন, দুর্জয়ের শৈশবের বন্ধু।
দুর্জয় স্টিয়ারিংয়ের বাটনে চাপ দিয়ে কলটা রিসিভ করল। ওপার থেকে এক চিলতে হাসির আওয়াজ ভেসে এলো,
“কী খবর, মেজর সাহেব? শুনলাম,খুলনা ব্যাক করছিস? কতদূর? নাকি চলে এলি?”
দুর্জয়ের গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“হ্যাঁ, আর আধঘণ্টা লাগবে। যশোর পার হয়ে গেছি। বাট দ্য থিং ইজ, আই অ্যাম নট ইন আ গুড মুড, সায়ান।”
“কেন? কী হয়েছে? এনিথিং সিরিয়াস?”
“নাহ, প্রফেশনাল কিছু না। পারসোনাল এনঅয়েন্স।”
“পারসোনাল এনঅয়েন্স? কি হয়েছে?”
“গতকাল রাতে এক অদ্ভুত কল এসেছিল আমার এই পারসোনাল নম্বরে। ট্রাস্ট মি, সাম আননোন গার্ল কলড মি অ্যান্ড জাস্ট স্টার্টেড অ্যাবিউজিং। আই মিন, টানা দুই মিনিট ধরে নন-স্টপ খিস্তি করল মেয়েটা! কোনো ম্যানার্স নেই, কোনো সেন্স নেই।”
ওপাশে সায়মন কিছুক্ষণ স্তব্ধ থেকে তারপর সশব্দে হেসে উঠল,
“হোয়াট? সিরিয়াসলি? তোকে গালি দিল? তুই ওটার পর কী করলি? ধমক দিসনি? তোর ধমকেই তো পরান পাখি খাঁচা ছাড়া হয়ে যাওয়ার কথা!”
“ধমক দেওয়ার সুযোগ পেলে তো! আই ওয়াজ লাইক— হ্যালো, কে বলছেন? আর ওপাশ থেকে গালিগালাজ বন্ধ করে জাস্ট কোন একটা মেয়ের নাম বললো তারপর আমি জাস্ট নিজের পরিচয়টুকু দিয়েছি ধুম করে কলটা কেটে দিল। তারপর যখন আমি ট্রাই করলাম, দেখলাম নম্বরটা ডিরেক্ট ব্লক লিস্টে ফেলে দিয়েছে। সি দ্য অডাসিটি!”
সায়মন এবার খানিকটা রসিকতার সুরে বলল,
“আরে ভাই, রিল্যাক্স! হয়তো কোনো বাচ্চা মেয়ে ভুল নাম্বারে কল করে তার বয়ফ্রেন্ডের ওপর রাগ ঝেড়েছে। ওসব পাত্তা দিস না।”
”নো, সায়মন। ইট’স নট অ্যাবাউট পাত্তা দেওয়া। আমি মিলিটারির অফিসার হতে পারি, কিন্তু তার আগে আমি একজন সিটিজেন। ওয়ান ক্যাননট জাস্ট কল আ স্ট্রেন্জার অ্যান্ড স্পিট দিস কাইন্ড অব ফিলথ। আই ওয়ান্ট টু নো, মেয়েটা আসলে কে? ওর সাহস কতটুকু যে এই কাজ করার পর আমাকে ব্লক লিস্টে রেখে ঘুরে বেড়াচ্ছে।”
ওপাশে সায়মন এবার সোজা হয়ে বসল। সে জানে, দুর্জয় সহজে কোনো বিষয় নিয়ে মাথা ঘামায় না, কিন্তু একবার ধরলে সেটা শেষ না করে ছাড়ে না। সে বলল,
“ওকে, ওকে। কুল ডাউন। নম্বরটা আমাকে টেক্সট করে দে। আই উইল রান আ ট্র্যাকিং অন দিস। ওই নম্বরের নাম, লোকেশন, এনআইডি— সব ইনফরমেশন আধঘণ্টার মধ্যে তোর ফোনে চলে যাবে।”
“ওক, আই নিড দিস। কুইক।”
খট করে লাইনটা কেটে দিলো। অতঃপর কাঙ্খিত নম্বরটা টেক্সট করে পাঠালো সায়মনের নম্বরে।
হেমন্তে আষাঢ়ে বর্ষণ নামলে যে তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয় সেই বিরক্তিকর পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছে কায়রা আর মেধা। ছুটির পর ওরা মূলত পার্শ্ববর্তী একটা ক্যাফেতে গিয়েছিলো। ফেরার পথেই ঝুম বৃষ্টি। ইতিমধ্যেই ঘণ্টা খানিক ধরে মুষলধারে ঝরছে আকাল বর্ষণ;আকাশের মেঘগুলো যেন আজ সমস্ত জল ঢেলে দেওয়ার পণ করেছে।
ভারী বৃষ্টি থেকে বাঁচতে রাস্তার ধারের একটা জীর্ণ ছাউনির নিচে আশ্রয় নিয়েছিল ওরা। অপেক্ষার প্রহর ভেঙে এখন বৃষ্টি কিছুটা কমে আসায় চারিদিকে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি মেলল ওরা। রাস্তায় গাড়ি চলছে প্রচুর, কিন্তু সবগুলোই বুকড, ভেতরে মানুষ গিজগিজ করছে। কায়রা হতাশ হয়ে মেধার হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিল।
হুট করেই ওদের দৃষ্টিগোচর হলো পাশে একটা আইসক্রিমের ভ্যান যাচ্ছে। আর তার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে একটা বাচ্চা মেয়ে, বয়স হয়তো বড়জোড় চার কি পাঁচ বছর। গোলুমোলু, তুলতুলে গাল দুটোর দিকে তাকালেই মন ভালো হয়ে যায়। বাচ্চাটার পাশে সুতির শাড়ি পরা এক তরুণী রমণী— দেখেই বোঝা যায় উনি ওর মা। কায়রার চেয়ে খুব বেশি বড় নন; বড়জোড় তেইশ-চব্বিশ বছরের হবেন। বাচ্চাটা আইসক্রিমের ভ্যানের দিকে তৃষ্ণার্ত চোখে তাকিয়ে মায়ের আঁচল টানছে, কিন্তু মা যেন মৃদু ধমক দিয়ে বারণ করছেন।
বাচ্চা পছন্দ করা চঞ্চল কায়রা আর স্থির থাকতে পারল না। বৃষ্টির ছাঁট উপেক্ষা করেই ও গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেল ওদের দিকে। বাচ্চাটার তুলোর ন্যায় কোমল গাল হালকা টিপে দিয়ে বলল,
“হাই কিউটি! আইসক্রিম খাবে?”
তারপর তরুণীটির দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলল,
“আরে আপু, ও তো পিচ্চি মানুষ, আইসক্রিম খেতে চাচ্ছে যখন কিনে দিচ্ছেন না কেন? প্লিজ, বকবেন না ওকে।”
রমণীটি মৃদু হাস্যে রিনরিনে কন্ঠে বললো,
“আরে না আপু, বকছি না। এই ঠান্ডায় আইসক্রিম খেলে যদি আবার ঠান্ডা লেগে যায়, সেই ভয়েই…”
“ধুর আপু! কিচ্ছু হবে না। বৃষ্টির দিনে আইসক্রিম খাওয়ার মজাই আলাদা। জাস্ট ট্রাস্ট মি!”
কায়রা চোখের ইশারায় ভ্যানওয়ালা মামাকে ডাকল।বাচ্চাটার দিকে ঝুঁকে কায়রা আদুরে গলায় শুধাল,
“বলো তো কিউটি, তুমি কোন ফ্লেভারের আইসক্রিম খাবে?”
বাচ্চাটা লাজুক হেসে মায়ের পেছনে একটু লুকিয়ে বলল,,
“স্ট্রবেরি!”
কায়রা উচ্ছ্বাসিত কন্ঠে বলল,,
“দ্যাটস মাই গার্ল! স্ট্রবেরি আমারও মোস্ট ফেভারিট ফ্লেভার!”
কায়রা নিজের আর বাচ্চাটার জন্য দুটো স্ট্রবেরি কোণ নিল, আর মেধা ও বাচ্চাটার মায়ের জন্য নিল ভ্যানিলা। ওরা পাশেই একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে আইসক্রিমগুলো খাচ্ছিল। বিভিন্ন কথার ফাঁকে হুট করে কায়রা বাচ্চাটার উদ্দেশ্যে বলল,,
“বাই দ্যা ওয়ে, কুটিবুটি? তোমার নামটা কি?”
তুলতুলে পেজা তুলোর ন্যায় মেয়েটা ওর দিকে এক ঝলক চাইলো। গোলাপি ওষ্টাধর প্রান্তে মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে বলল,,
“কুহেলিকা আহসান কুহু।”
“ওএমজি! জানু, তোমার নামের সাথেও আমার মিল আছে।”
“তোমার নাম কি আন্টি?”
“কায়রা ইয়াসির কায়া।”
কুহু মায়ের শাড়ির আঁচল টেনে বলল,,
“মাম্মা দেখো, আন্টিটার আর আমার নাম একরকম।”
কুহুর মা মেয়ের কপালে আলতো চুমু একে বলল,,
“শুনেছি মা।”
কায়রা এবার রমনীটির পানে চেয়ে বলল,,
“আপনার নামটাই তো জানা হলো না আপু।”
“আমি ইথিকা জান্নাত, আপু।”
পুনরায় আপু বলায় কিছুটা প্রস্তুত হয়ে উঠল কায়রা। ও ঘোর বিরোধিতা করে বলল,,
“আরে আপু আমি আপনার জুনিয়র। আপু বলছেন কেন? ইউ ক্যান কল মি কায়রা ওর কায়া, বাট প্লিজ, ডোন্ট কল আপু। আই ফিল আনইজি।”
কায়রার কথায় মৃদু হাসলো ইথিকা,
“আমি জানি তুমি আমার জুনিয়র। তবে, জুনিয়রদের আপু বলাও কিন্তু একটা আর্ট।”
“হোগ-গে আর্ট। বাট আপনি প্লিজ কায়রা অথবা কায়া বলুন। আপু বললে কেমন লাগে!”
“ওকে জুনিয়র—কায়া! এবার ঠিক আছে?”
কায়রা ওষ্টাধর প্রসারিত করে বিস্তর হাস্যে সম্মতি সূচক মাথা নাড়ালো। মেধা এতক্ষণ যাবৎ ওদের কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করছিলো। ইথিকা মেধার সাথে ও টুকিটাকি আলাপ সেরে বলল,,
“তা তোমরা, এই টাইমে এখানে?”
উত্তরটা মেধা দিল, “আর বলবেন না আপু! এই মেয়ের যখন-তখন কফি খাওয়ার বাতিক ওঠে। আর আজকে কফি খেতে গিয়ে পড়েছি ধরা। ঝুম বৃষ্টি, আর এখন গাড়িও পাইনা!”
“ইসস, বাই দ্যা ওয়ে তোমাদের বাসা কোথায় জুনিয়র?”
“সোনাডাঙ্গা আপু।”
“দুজনেরই?”
“না আমার সোনাডাঙ্গা আর ওর গল্লামারি।”
মেধার দিকে ইশারা করলো কায়রা।
“বলো কি? গাড়ি না পেলে সন্ধ্যা রাত হবে তো।”
“ব্যাপারনা আপু অভ্যাস আছে। বাই দ্য ওয়ে, আপনার বাসাটা?”
“এইতো নিরালা। এখানে কুহুর জন্য টুকিটাকি জিনিসপত্র কিনতে এসেছিলাম। বাট ফেরার পথে একটা প্রবলেম হয়েছে। সমস্যা নাই ওর বাবা চলে আসবে।”
ইতিমধ্যেই খুলনায় ঢুকে পড়েছে মেজর দুর্জয় আহসান। কিছুক্ষণের মধ্যেই কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে যাবে। ব্যস্ত রাজপথ বর্ষণ সিক্ত তবুও নিজ গতিতে ধাবমান দুর্জয়ের গাড়ি। আকস্মিক তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সম্মুখে নিবদ্ধ হলো। রুদ্ধ হলো গাড়ির গতি। ততক্ষণাৎ,ব্রেক কোষে জানলার কাঁচ নামিয়ে পুনরায় দৃষ্টি বুলালো নিশ্চিত হতে। হঠাৎ, চঞ্চল দৃষ্টি কিছুটা সামনে চেনা মুখটা ভেসে উঠতেই কুহুর কচি মুখটা আহ্লাদে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে এক ঝটকায় মায়ের শাড়ির আঁচল টেনে ধরে উত্তেজিত গলায় চিৎকার করে উঠল,
“মাম্মা! দেখো!”
বলার পরমুহূর্তেই মায়ের হাতের বাঁধন ফস্কে কুহু একছুটে বৃষ্টির মধ্যেই ওদিকের ফুটপাত ধরে গাড়ির অভিমুখে দৌড় দিল। হুটহাট মেয়ের এমন কাণ্ডে ইথিকা অপ্রস্তুত হয়ে মেয়ের পিছু পিছু দৌড়াল,,
“আরে কুহু! যেও না, বৃষ্টিতে ভিজো না!”
ছুটে গিয়ে গাড়ির দরজা খোলার আগেই দুর্জয় গাড়ি থেকে নেমে ক্ষিপ্র পায়ে এগিয়ে এসে কুহুকে কোল তুলে নিল। কুহু ওর গলা জড়িয়ে ধরে খিলখিল করে হেসে উঠল। কুহুর ভেজা চুলে হাত বুলিয়ে দুর্জয় মৃদু বকুনি দেওয়ার ভঙ্গিতে কিছু একটা বলল। ইথিকা ও দূর্জয়কে দেখে প্রসরিত হাসলো। কিঞ্চিৎ দূরত্ব আর আলো আঁধারের দরুন পুরুষ অবয়বটা অস্পষ্ট দেখালো কায়রাদের কাছে।
ওরা আর চাইল না সেদিকে। এরই মাঝে ইথিকা গাড়ির পেছনের সিটে বসলো। আর দূর্জয় কুহুকে কোলে নিয়েই ড্রাইভিং সিটে বসে। গাড়িটা স্টার্ট নেওয়ার মুহূর্তে কুহু পেছনের জানালার কাঁচ নামিয়ে কায়রা আর মেধার দিকে হাত নাড়িয়ে আদুরে গলায় বলল,
“টা-টা কায়া আন্টি! আবার দেখা হবে!”
গাড়ির ভেতর মৃদু আলো থাকার দরুন কায়রা কুহুর দিকে চেয়ে বলল,,
“টা-টা জানু।”
দুর্জয় কুহুর দৃষ্টি অনুসরণ করে এক ঝলক তাকাতে চাইলো। তবে ব্যক্তিত্বের পরিপন্থী হওয়ায় চাইল না।
