অভিসৃতি পর্ব ২
নওরিন কবির তিশা
খুলনার সুপরিচিত নিরালা আবাসিক অঞ্চলের কেন্দ্রস্থলেই শহরের তীব্র যান্ত্রিক কোলাহল থেকে যোজন-যোজন দূরে অবস্থিত এক বিচ্ছিন্ন শান্ত অরণ্যভূমি। চওড়া পিচঢালা রাস্তার দু’ধারে পরিকল্পিত সবুজের সমারোহে আভিজাত্যের নীরব আস্ফালন বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সুউচ্চ অট্টালিকাটির নাম আহসান কুঞ্জ।
ঘন তরুচ্ছায়া সন্নিবেশিত বহুতল এ ভবনের দোতলায় পাশাপাশি দুটি বিশাল ফ্ল্যাটেই মালিকদের অবস্থান। ডান পাশের অপেক্ষাকৃত বৃহৎ ও সুসজ্জিত ফ্ল্যাটটি খুলনা ব্রজলাল কলেজের অবসরপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল ইকবাল আহসান সাহেবের, আর বাম পাশেরটি ওনার ছোট ভাই ইমতিয়াজ আহসান সাহেবের।
বহুদিনপর,আজ জমজমাট ইকবাল আহসানের ফ্ল্যাটের বিশাল ড্রয়িংরুম। একমাত্র ছেলের প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে দুই পরিবারের মানুষই একত্রিত হয়েছে সেথায়। সদস্য সংখ্যা যে খুব বেশি তেমনটা নয়। গুটিকয়েক সদস্যের উপস্থিতিতে ছোট্ট মিলনায়তন। দূর্জয় আহসান ইকবাল সাহেবের একমাত্র ছেলে। অন্যদিকে ইমতিয়াজ সাহেবের দুই ছেলে মেয়ে- উজান আর ঊষা।
তবে মজার ব্যাপার হলো, দুর্জয়ের চেয়ে বছর চারেকের এর ছোট হওয়া সত্ত্বেও সংসার পেতেছে আরো বছর ছয়েক আগেই। এই ঘরেরই একমাত্র উজ্জ্বল নক্ষত্র কুহেলিকা আহসান কুহু। ড্রয়িংরুমের সোফায় আরাম করে বসে ছিলেন পরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্যরা। একদম কোণের সিঙ্গেল সোফাটাতে জাঁকিয়ে বসেছে ছোট্ট কুহু।
বড় দাদুর দেওয়া চিপসের প্যাকেট থেকে একটা একটা করে চিপস মুখে পুরছে আর তার গোলগাল ফর্সা গালে লেগে থাকা চকলেটের দাগ স্পষ্ট জানান দিচ্ছে একটু আগেই বড়সড় একটা মিষ্টির আক্রমণ শেষ হয়েছে। হুট করেই সদর দরজায় কলিংবেল শব্দ তুললো।
ইথিকা শাশুড়ি আর চাচী শাশুড়ির সঙ্গে কিচেনে ব্যস্ত ছিলো। সকলের হাতে কাজ থাকায়,বেল বাজতেই ও বলল,
“আমি দেখছি।”
চটজলদি পদক্ষেপে এগিয়ে গিয়ে দরজা খোলামাত্রই বাইরে ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা উজানকে দেখে ইথিকা বেশ অবাক হয়ে বলল,
“আরে, তুমি এত তাড়াতাড়ি চলে এলে? বললে না,একটু দেরি হবে?”
“দেখলাম কাজ শেষ, তাই। তোমরাও দেখি চলে এসেছো।”
“ হ্যাঁ,ওই আরকি রাস্তায় ভাইয়ার সাথে দেখা হয় গেলো!”
উজান ভেতরে পা রাখতেই ভেতরের সোফা থেকে কুহু একলাফে নেমে দৌড়ে এলো। বাবার পা জড়িয়ে ধরে উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,
“পাপ্পা! পাপ্পা জানো, চাচাই এসেছে!”
উজান ঈষৎ হাস্যে ভেজা ছাতাটা একপাশে রেখে সে নিচু হয়ে আলতো স্পর্শে মেয়েকে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিল। কুহুর নরম চকলেটে মাখা গালে পরপর কয়েকটা চুমু খেয়ে বলল,
“সত্যি নাকি?”
কুহু মাথা দুলিয়ে বলল,,
“হ্যাঁ তো!”
দুর্জয় তখন সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। সুঠাম-ঋজু দেহাবৃত গ্রে কালার শার্টে,হাতা দুটো কনুই অবধি গোটানো। ছোট ভাইয়ের দেখা পেতেই গাম্ভীর্যের মোড়কাবৃত মুখশ্রীতে এক চিলতে অতি ক্ষীণ হাসির দেখা মিললো।উজান মেয়েকে কোলে নিয়েই এগিয়ে গেল দুর্জয়ের দিকে। ডান হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“ওয়েলকাম ব্যাক, ভাইয়া। রাস্তায় যা জ্যাম আর বৃষ্টি! ঝক্কি পোহাতে হয়েছে তো বহুৎ!”
দুর্জয় উজানের বাড়ানো হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে আলতো জড়িয়ে ধরল। মৃদু হেসে বলল,
“থ্যাংক ইয়্যু । হ্যাঁ, হাইওয়েতে একটু বৃষ্টি ছিল, তবে লাকিলি বেশি সময় লাগেনি। তুই কেমন আছিস?”
“আমি তো ফার্স্ট ক্লাস। চাচাই-ভাতিজির টিম তো অলরেডি জাস্ট জমে গেছে দেখছি!”
উজান কুহুর নাকে একটা টোকা দিয়ে হাসল। পাশ থেকে ঊষা চায়ের কাপ হাতে কিচেন থেকে বের হতে হতে ফোড়ন কাটল,
“আর বোলো না ছোট ভাইয়া! বড় ভাইয়া আসার পর থেকে কুহুর আর মাটিতে পা পড়ছে না। ভাব বেড়েছে তোমার মেয়ের!”
ইকবাল আহসান সাহেব চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে হেসে উঠলেন,
“তা যা বলেছিস। দুর্জয়কে দেখলে কুহু আমাকেও চেনে না।”
ইথিকা মুচকি হেসে বলল,
“তোমরা ভাইয়ার সাথে গল্প করো, আমি সবার জন্য গরম গরম কফি আর পাকোড়া নিয়ে আসছি।”
সবার হয়ে ইমতিয়াজ আহসান জবাব দিয়ে বললেন,,
“আচ্ছা যাও।”
অনুমতিক্রমে সেখান থেকে প্রস্থান করলো ইথিকা। তবে,বাবাদের পাশে বসেই গল্পে মশগুল হলো ঊষা।
“ফুপি কি ড্রয়িংরুমে রে?”
কায়রার ভয়ার্ত প্রশ্নের উত্তরে নিশ্চুপ রইল অপরপক্ষ। বিরক্তি আর ভয়ের মিশেলে, এবার কিঞ্চিৎ ঝাঁঝালো শোনালো কায়রার কন্ঠ,,
“এ বা’ল! শুনতে পাচ্ছিস না? বল!”
“সাবধানে কথা বল বেয়াদব! বড় আমি তোর।”
“সম্মান করলে তো,তোমার মুখে কথা আসে না। বলবি?”
“কি বলবো?”
“বললাম না, ফুপি ড্রয়িংরুমে কি না?”
পায়রা সোফায় হেলান দিয়ে আপন মনে নখ পলিশ করতে করতে, সামনে বসা বড় ফুপু আঞ্জুমান ইয়াসির আর বাবা আনোয়ার ইয়াসিরের দিকে চাইলো,তারপর বেশ আয়েশ করে বলল,
“হ্যাঁ, আব্বুর সাথে বসে কীসের যেন সালিশ করছে।তবে, আঞ্জুমান বিবি আজ বেশ ফর্মে আছেন!”
সালিশের কথা শুনেই কায়রার কলিজা শুকিয়ে কাঠ। ওদের বড় ফুপু আঞ্জুমান ইয়াসির —তেজস্বী মহিলার সামনে ওদের বাবা অব্দি টু শব্দ করার সাহস পান না। অবশ্য এটা ভয় আর সম্মান উভয় থেকেই। ছোটবেলা থেকে বড় বোনের ছায়া তলেই বড় হয়েছে কিনা। সে যাইহোক,সেই খাঁটি সিংহীর সামনে দিয়ে এই সন্ধ্যারাতে বাড়ি ফিরবে,তবে আজ কায়রা ইয়াসিরের জীবনের ইতি এখানেই!
মনে মনে কাল্পনিক কা”ফ”নের কাপড় চশমা দিয়ে দেখতে দেখতে কায়রা এবার ফোনের এপাশ থেকেই বোনের পা জড়ানোর ভঙ্গিতে মিনমিন করে বলল,
“আপু… লক্ষ্মী আপু আমার, একটু ম্যানেজ কর না প্লিজ! তুই না আমার জানের জান, পরানের পাখি?”
পায়রা নখ শুকানোর জন্য বাতাসে হাত নাড়াতে নাড়াতে বাঁকা হাসল,
“ওমা! গালিগালাজ বন্ধ হতেই এক লাফে ‘আপু’ হয়ে গেলাম? একটু আগে যে ‘বা’ল-ছা’ল’ কি যেন বলছিলি, সেটার কী হবে?”
কায়রা বাচ্চার মত মুখ করে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
“ভুল হয়ে গেছে ওস্তাদ। এক্কেবারে কান ধরছি। এই যাত্রায় বাঁচিয়ে দে, দাদুর ওই হাই-ভোল্টেজ চাহনি আমি সহ্য করতে পারবো না। জাস্ট ম’রেই যাবো!”
বোনের এই নিষ্পাপ আর্তিতে বরাবরের ন্যায় গলে গেল পায়রা। ওষ্টাধর বাঁকিয়ে বলল,
“হুহ, গলে গেলাম ভাবিস না! ভেতরে তোকে আস্তে দিবো,বাট শর্ত একটাই, আগামী একমাস আমি যা বলব তা-ই করবি। ডান?”
“সুযোগের সদ্ব্যবহার! জা’নো’য়ার একটা!” মনে মনে বড় বোনকে সহস্রাধিক গালি ছুঁড়লেও মুখে বলল,,
“একশবার ডান! তুই যা বলবি তা-ই হবে। গুনে গুণে দুই বছরের বড় একমাত্র বোন আমার। না শুনলে হবে? সব শুনবো,তুই শুধু দাদুর সামনে একটু ঢাল হয়ে দাঁড়া।”
পায়রা নখের দিকে তাকিয়ে সন্তুষ্টির হাসি হেসে বলল,
“হইছে আর পাম দিতে হবে না।আয়, আমি ম্যানেজ করছি। তবে সাবধান, মুখটা একদম নিরীহ ছাগলের বাচ্চার মতো করে রাখবি!”
গুটিগুটি পায়ে একজোড়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টির আড়ালে লুকিয়ে বাইরে যাওয়ার পরিকল্পনা আঁটছে পায়রা। ড্রয়িং রুম পেরিয়ে সদর দরজার কাছে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে আঞ্জুমান ইয়াসির ডেকে উঠলেন,,
“কই যাস?”
পায়রা শুকনো না ঢোক গিললো,,
“ফুপি আসলে!”
বেচারী পিছন ঘুরতেই দেখলো আঞ্জুমান ইয়াসির তাকে নয় বরং বাসার এক পরিচারিকাকে ডেকে হুকুম জারি করছেন। এবং ভাগ্য সহায় থাকার দরুণ ওদের বাবা আনোয়ার ইয়াসির আর আঞ্জুমান ইয়াসির দুজনেই ড্রয়িং রুম থেকে উঠে নিজ নিজ কক্ষে উদ্দেশ্যে এগিয়ে যাচ্ছেন। আল্লাহর দরবারে লাখ লাখ শুকরিয়া জানিয়ে, পায়রা দ্রুত পায়ে গিয়ে দরজা খুলে দিল। কায়রার ততক্ষণে ভিজে জুবুথুবু অবস্থা, পায়রা কোনোমতে নিজের ওড়নার আড়ালে লুকিয়ে ভেতরে নিয়ে এল ওকে।
আহসান কুঞ্জের দোতলার শান্ত ফ্ল্যাটটিতে নিশীথ নিস্তব্ধতা নেমেছে। দেয়ালঘড়ির কাঁটা দশটা পেরিয়ে এগারোটার ঘর ছুঁইছুঁই। রুটিনমাফিক কঠোর শৃঙ্খলায় অভ্যস্ত মেজর দুর্জয় আহসান এতক্ষণে রাতের আহার সমাপন করে শয্যাগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
হঠাৎ, টেবিলের ওপর রাখা ওয়ানপ্লাস ফোনটি মৃদু কম্পনে একটা তীক্ষ্ণ শব্দ করে উঠল। নিশুতি নিস্তব্ধতায়, আকস্মিক এহেন শব্দে দুর্জয়ের ভ্রু জোড়া কুঁচকালো সামান্য। হাত বাড়িয়ে ফোনটি তুলেই দেখলো লকস্ক্রিনে ভেসে উঠেছে সায়মনের নাম।
বার্তাটি উন্মোচন করতেই স্ক্রিন জুড়ে ভেসে উঠল একটি মেয়ের যাবতীয় জীবনবৃত্তান্ত। সায়মন কথা রেখেছে; কাঙ্খিত সময়ের একটু বিলম্ব হলেও নিখুঁত সামরিক ক্ষিপ্রতায় অজ্ঞাত অপরাধীর নাড়িনক্ষত্র তুলে এনেছে সে।ছক কাটা অক্ষরের সারিতে জ্বলজ্বল করছে নাম- কায়রা ইয়াসির।
দুর্জয় স্ক্রিনের ওপর আলতো করে আঙুল ছুঁইয়ে নিচে নামল। সঙ্গে একটা ছবিও জুড়ে দিয়েছে সায়মন। ফর্মাল কোনো কাগজের জন্য তোলা সাদামাটা ছবি, তবে চঞ্চল চোখের চাউনি আর অবাধ্য কেশরাজ যেন চিত্রের মাঝেও কথা বলে উঠছে। শুধুমাত্র,শৃঙ্খলাভঙ্গের তদন্ত রক্ষায় দুর্জয় মেয়েটির মুখের অবয়বের দিকে খুব একটা গভীর দৃষ্টি দিল না।
তবে পৃষ্ঠার একটু নিচের দিকে আসতেই কিছুটা বিস্ময় আর কৌতুহলের মিশ্রণে তার চোখ দুটি হঠাৎ আটকে গেল। মেয়েটি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। শুধু তা-ই নয়, তার স্থায়ী নিবাস এবং বর্তমান হোমটাউনও এই খুলনা শহর জুড়েই। দৃষ্টিজোড়া সুতীক্ষ্ণ সে আরও একটু মনযোগ দিয়ে দেখল খুলনার ঠিক কোথায় মেয়েটির বাস? স্পষ্ট অক্ষরে লেখা-সোনাডাঙ্গা।
সোনাডাঙ্গা শব্দটা মনে মনে একবার উচ্চারণ করলো দুর্জয়। তবে বিষয়টা ঘাটালো না আর। কুঁচকে আসা ভ্রু যুগল ততক্ষণে সূক্ষ্ম শিথিল হয়েছে। ফোনটা লক করে বিছানার পাশে টেবিলের ওপর রেখে দিল কোনো এক অবহেলিত, তুচ্ছ বস্তুর ন্যায়।
ঘরের আলো নিভিয়ে; হিমেল হাওয়া জানালার পর্দা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দুর্জয় চোখ বুজল। ঘটনাটাকে খতিয়ে দেখার এক সৈনিক প্রয়োজন বোধ থেকেই ব্যাপারটা বিশ্লেষণ করল ও। তবে মেয়েটার পূর্বের কোনো রেকর্ড খারাপ না হওয়ায়, আপাতত ব্যাপারটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে অতল নিদ্রার রাজ্যে পাড়ি জমালো।
“এ ভাই,ট্রিট দে!”
“ফকিন্নির বাচ্চারা! নিজেরা কিন্না গিলতে পারো না। তোগে কারণে,দু’দিন বাদে রাস্তায় থালা নিয়ে বসতে হবে আমার।”
কায়রা আর নিহারের কথোপকথনে মাথা চাঁপড়ালো বাকি চার মানিক। তুজা ফোড়ন কেঁটে বলল,,
“তোর মত মিসকিনের কত সাহস! তুই আমাদের ফকিন্নি কস!”
“এ্যাই কি বললি তুই?”
নিহার ক্ষিপ্ত বেগে এগিয়ে এলো তুজার দিকে। বেচারী তৎক্ষণাৎ মেধার পিছনে লুকিয়ে বলল,,
“যা বলছি ঠিক বলছি!”
নিহার ওর মাথায় গাট্ট মারতে যেতেই পাশ থেকে রুশাফ বলল,,
“আরে ভাই, বাদ দে! পাগলে কিনা বলে!”
“এ্যাই টিকটিকির পুত? কি বললি তুই আমায়?”
ইভান বসা থেকে লাফিয়ে উঠে বলল,,
“যা বলেছে ঠিক বলেছে। তোদের কত সাহস? আমার ভাইরে মিসকিন কস!”
অতঃপর ও নিহারের কাঁধে হাত রেখে চাঁপড়িয়ে বলল,,
“আমার ভাই হচ্ছে বড়লোক্স আলট্রা প্রোম্যাক্স। তাই না রে দোস্ত?”
নিহার ভ্রু কুঁচকে তাকালো। “অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ” প্রবাদটা চিৎকার করে বলছে ওর ভেতরের সত্তা। আর সেটাকেই সঠিক প্রমাণ করে পরক্ষণেই ইভান বলল,,
“তো নিজের বড়লোক্স সত্তাটা একটু দেখ ভাই। খাওয়া আমাদের কিছু।”
নিহার কষিয়ে একটা গাট্টা মারল ইভানের মাথায়, সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলো ইভান,,
“শালা, তেল মারলাম তাও ফ্রিতে থাবড়া পাইলাম?”
“তোর তেলের কোয়ালিটি থার্ড ক্লাস, বুঝছিস? ফ্রিতে রিচার্জ করতে আসছিস, চামচামি করে খাওন আদায় করবি!”
মেধা এবার ওদের আটকে বলল,,
“এই নিহার, ইভানরে মারিস না। ও তো সত্যি কথাই বলছে। তুই তো আসলেই বড়লোক! তোর পকেটের সাইজ আর আমাদের পকেটের সাইজ কি এক? দে না ভাই, একটা ছোটখাটো কাবাব ট্রিট!”
মেধার পেছন থেকে মুখ বাড়িয়ে তুজা বললো,,
“কাবাব? ধুর, এই কিপটার দল ওসব খাওয়াবে না। বড়জোর এক কাপ লাল চা আর দুই টাকার টোস্ট বিস্কুট!”
“তুজা, তুই আরেকবার মুখ খুলবি না, তোরে আমি ল্যাবের ওই ফরমালিনের ড্রামে চুবায় রাখব! বোটানির প্র্যাক্টিক্যাল বানায় দিব একদম।”
“আইডিয়াটা খারাপ না! তবে নিহার, তুই যতই চিল্লাইস, আজকে কিন্তু পার পাচ্ছিস না। কালকে যে অ্যাসাইনমেন্টের জন্য তুই আমাদের খাটাইলি, সেটার পারিশ্রমিক কই?”
রুশাফের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এবার কায়রাও বললো,,
“একদম ঠিক! আমার তো মনে হয় নিহারের ওয়ালেটে টাকা না, ইটের টুকরা থাকে। বের করতে গেলেই ও ওমন চিল্লাইয়া ওঠে।”
“এই কায়া, তুই তো চুপই থাক! কালকে মেজরের ভয়ে যার কলিজা শুকাইয়া আমসি হয়ে গেছিল, সে আসছে এখানে আমার ওয়ালেট নিয়ে কথা বলতে! কী রে, মেজর সাহেব ট্র্যাকিং টিম পাঠাইছে নাকি রে?”
“এই ব্যাটা, একদম মুখ সামলে! ওই টপিক তুলবি না বলছি। আমার এমনিতেই প্রেসার হাই হয়ে আছে।”
ইভান কায়রার দিকে তাকিয়ে বললো,,
“শালিরে শালি তাইতো বলি,প্রেসার হাই তো ট্রিট খা, ঠান্ডা হয়ে যাবি। নিহার, চল ভাই, ক্যাফেটেরিয়ার দিকে পা বাড়াই। তুই শুধু পকেটটা একটু আলগা কর।”
নিহার এবার পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে সিলিংয়ের দিকে তাকানোর ভান কর বললো,,
“ উফফ! খোদা, এই রাক্ষসগুলারে আমার পেছনেই কেন লেলিয়ে দিলা? চল শালা ফকিন্নির দল, চল! আজকে তোদের খিলগাঁও স্টাইলের চিজ বার্গার খাওয়ামু। এরপর যদি কেউ আমার কাছে এক টাকার চকলেটও চাস, ওরে ভৈরবে নিয়া চুবামু!”
মেধা উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বললো,,
“ইয়েসসস! বার্গার! চল জলদি, ও যেন আবার মন পরিবর্তন না করে ফেলে!”
রুশাফ আবেগে গদগদ হয়ে নিহারের গলা জড়িয়ে ধরে বলল ,,
“তুই আসলে একটা হীরা রে দোস্ত! খাঁটি হীরা!”
“হ্যাঁ, আর তোমরা অ্যানলারগ্রেড জা’উ’রা।”
ওর এমন কথায়, ইভান বেশি জোরে হেসে বলল,,
“দিছেরে দিছে! রুশাফের আবেগে মু’তে দিছে।”
ঝাল বার্গারের বদৌলতে কয়রার বর্তমান অবস্থান হয়েছে পার্শ্ববর্তী আইসক্রিমের ভ্যানের কাছে। তবে,সবাই নাই। শুধু সে আর মেধা। মূলত এরা দুটোই ঝাল সহ্য করতে পারে না। তাই বাকিগুলো দুষ্টুমি করে করে ভেগেছে। দুটিতে মিলে মনের সুখে আইসক্রিম খেয়ে চলেছে।
খাওয়া শেষে কোনোদিকে না চেয়েই আইসক্রিমের বাটিটা শূন্যে ছুঁড়ে মারলো কায়রা। ফাঁকা বাটিতে আর লক্ষ্যপাত না করে স্বভাবসুলভ, অলস ভঙ্গিতে হামি তুললো। তবে,হালকা বাতাসে উড়তে থাকা আইসক্রিমের বাটিটা ঠিক লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো না। ক্যাফেটেরিয়ার চত্বরে দাঁড়িয়ে ফোনে এক অত্যন্ত জরুরি আলাপে মগ্ন থাকা মেজর দুর্জয় আহসানের চওড়া পিঠের ঠিক মাঝ বরাবর গিয়ে আছড়ে পড়ল সেটা। চকলেট আর স্ট্রবেরির আঠালো মিশ্রণটা মুহূর্তে ওর দামি নেভি ব্লু শার্টের শৃঙ্খলতা ধূলিসাৎ করে নিচে গড়িয়ে পড়তে লাগল।
ফোনে কথা বলতে বলতেই পিঠে এক অদ্ভুত ঠান্ডা-চটচটে অনুভূতি টের পেয়েই শক্ত হয়ে গেলেন দুর্জয়। টানটান চোয়াল আরও শক্ত হলো, ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেল চরম বিরক্তিতে। মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো,,
“হোয়াট দ্য—!”
বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা মেধার চোখ তখন চড়কগাছ। কায়রার এই কাণ্ড দেখে ও ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“কী করলি কায়া!”
মেধার চাপা চিৎকারে বোকা বনে গেলো কায়রা। প্রশ্নত্মক দৃষ্টি মেলে চাইতেই তুজা সম্মুখে ইশারা করলো। দৃষ্টি অনুসরণ করে পাশ ফিরতেই, নয়ন বিস্ফোরিত। অচেনা আগন্তুকের ধমকের ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে ও বলল,,
“দৌড়া মেধা!”
ওরা দুজনেই ওখান থেকে চম্পট দেওয়ার জন্য ক্ষিপ্র পায়ে দৌড় লাগাল। ওদিকে পিঠের শার্টের দফারফা দেখে দুর্জয় ফোন কান থেকে নামিয়ে ঝড়ের বেগে পেছনে ঘুরলো; সুক্ষ বিবেচনাবোধ অপরাধীকে চিহ্নিত করতে ভুল করল না। ক্যাম্পাসের ভিড় ঠেলে দুটো মেয়েকে প্রায় অলিম্পিকের গতিতে পালিয়ে যেতে দেখে গমগমে, গম্ভীর কণ্ঠ পুরো চত্বর কাঁপিয়ে আদেশ জারি করল,
অভিসৃতি পর্ব ১
“এই, স্টপ! স্টপ রাইট দেয়ার!”
কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। মেজরের সেই বজ্রকঠিন কণ্ঠের ধমক বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই, কায়রা আর মেধা ততক্ষণে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটা অটো রিকশায় হুড়মুড় করে উঠে ড্রাইভারকে তাড়া দিয়ে হাওয়া হয়ে গেছে। দুর্জয় ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে দূর দিয়ে চলে যাওয়া অটোর দিকে তাকিয়ে রইলো, সুপুরুষ মুখাবয়ব রাগে রি-রি করেছে।
