অভিসৃতি পর্ব ৩
নওরিন কবির তিশা
সার্বক্ষণিক পরিপাটি ছেলের হঠাৎ এমন বিধ্বস্ত রূপ অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করলেন সাজেদা চৌধুরী। দুর্জয় সবে বাসায় ফিরেছে। মায়ের এমন নজরে এতক্ষণের বিরক্তিভাব কমিয়ে নরম কণ্ঠে বলল,,
“হ্যোয়াট হ্যাপেন্ড, আম্মা?”
সাজেদা চৌধুরী বড্ড সন্ধানী কণ্ঠে বললেন,,
“এটা তো আমার শোনার কথা আব্বাজান।”
“মানে?”
“মানে, আমার সবসময় গোছালো ছেলেটার এমন অবস্থার কারণ জানতে পারি?আর পিঠে ওটা কীসের দাগ?”
দুর্জয় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিতির কণ্ঠে বলল,
“আর বোলো না আম্মা! আমি একটা জরুরি ইম্পর্টেন্ট কলে ছিলাম। হঠাৎ কোত্থেকে একটা মেয়ে কোনো দিকে না তাকিয়ে গলানো আইসক্রিমসহ বাটি ঠিক আমার পিঠে ছুঁড়েছে!”
এই প্রথম হয়তো কোনো মেয়ে তার গম্ভীর ছেলেটাকে নাস্তানাবুদ করেছে! কাহিনীর ইতিবৃত্ত শুনে সাজেদা চৌধুরী আর আত্মসংবরণ করতে পারলেন না। আঁচল প্রান্তে মুখ চেপে শব্দ করে হেসে উঠলেন। মায়ের এমন হঠাৎ হাসিতে দুর্জয় আরও খানিকটা ক্ষুণ্ণ হয়ে তাকাল,
“আম্মা! হাসছো তুমি? মাই শার্ট ইজ টোটালি রুইন্ড! আর অডাসিটি দেখো, আমি ধরার আগেই একদম অটোরিকশা নিয়ে!”
সাজেদা চৌধুরী হাসির রেশটুকু মুখে রেখেই ছেলের দিকে চেয়ে স্নেহের সুরে বললেন,
“কিছু না আব্বাজান। তুমি বড্ড বেশি গম্ভীর তো, তাই খোদা বোধহয় একটু আইসক্রিম দিয়ে তোমার মুডটা ঠান্ডা করতে চাইলেন! যাও, আর রাগ করে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না, চটপট গিয়ে একটা শাওয়ার নিয়ে নাও। ফ্রেশ লাগলে মেজাজ এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে।”
মায়ের এমন রসিকতায় দুর্জয় আর কথা বাড়াল না। শুধু মনে মনে সেই তরুণীকে আরেকবার বিরক্তি নিয়ে স্মরণ করে নিজের কক্ষের দিকে পা বাড়াল।
“এ পায়রা এই! বিয়ে করিস না কেন মগা ? তুই বিয়ে না করলে আমিও বিয়ে করতে পারতেছি না! বা”লের পড়াশোনা! এরচেয়ে থালা-বাসনে দুই ঘষা দেওয়া সহজ।”
কায়রার এমন উদ্ভট বিলাপ শুনে পাউডার পাফটা মুখে বুলাতে বুলাতে আয়না থেকে দৃষ্টি সরালো পায়রা। বোনের দিকে তাকিয়ে ও ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কী বললি তুই? মগা? দিন দিন বড্ড বেশি বেয়াদব হয়ে যাচ্ছিস কায়া! তোর দুই বছরের বড় আমি, একটু তো সম্মান দিয়ে কথা বলবি,বে’য়া’দব!”
কায়রা বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে একটা বালিশ বুকের নিচে চেপে ধরে মুখ ভেংচালো,
“আরে ধুর!তোর আবার সম্মান! আগে,আমার কথা শোন,আমাদের সমাজে নিয়ম হলো বড় বোনের বিয়ে না হলে ছোট বোনের লাইন ক্লিয়ার হয় না। তুই একটা ভালো দেখে ছেলে পটিয়ে ঝটপট বিয়ের পিঁড়িতে বসে পড় না আপু! তোর উসিলায় যদি আমার এই বোটানির ল্যাব আর প্রেজেন্টেশনের ন-র-ক গুলজার থেকে মুক্তি মেলে!”
পায়রা এবার বাঁকা হেসে পাউডারের কৌটাটা টেবিলে রাখল,
“আমার বিয়ের চিন্তা তোকে করতে হবে না ম্যাডাম। নিজের চিন্তা কর।তোর জন্য কোন মহাপুরুষ আসবে, ভাই? তোর মতো এক নম্বরের পাগল, যে কিনা দিন-দুপুরে মানুষের পিঠে আইসক্রিম মেরে পালিয়ে আসে, তাকে কোন ভালো ঘরের ছেলে ঘরে তুলবে? সে তো বাসর রাতেই ডিভোর্স পেপার রেডি রাখবে!”
“এ্যাই! খবরদার ওই আইসক্রিমের কথা তুলবি না!এই জন্যই তোকে কিছু বলতে চাই না।”
কায়রা ক্ষিপ্ত হয়ে হাতের কাছের ছোট কুশনটা ছুড়ে মারল বোনের দিকে। পায়রা চট করে মাথা নিচু করে সেটা এড়িয়ে গিয়ে পাশ থেকে একটা বড় বালিশ তুলে নিয়ে কায়রাকে লক্ষ্য করে ছুড়ল,
“কী রে? সত্যি কথা বললেই গায়ে লাগে?”
ব্যাস, শুরু হয়ে গেল দুই বোনের চিরচেনা যুদ্ধ। এপাশ থেকে ওপাশ চলল দেদারসে বালিশ ছোড়াছুড়ি। রুমের ভেতর তুলো আর চাদরের হাহাকার পড়ে গেল। ঠিক তখনই ঝড়ের বেগে ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন ওদের মা, নূরা খান। দুই মেয়ের এমন কাণ্ডে উনি কপালে হাত দিয়ে চাপা গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন,
“কী করছিস তোরা এই দামড়ি বয়সে? বানরের মতো লাফালাফি বন্ধ কর! ফুপি আসছে এক্ষুনি এই করিডোর দিয়ে। ওনার কানে একবার এই হট্টগোলের আওয়াজ গেলে আজ রাতে তোদের দুজনেরই কপালে শনি আছে!”
মায়ের সতর্কবাণীতে ওরা শুকনো ঢোক গিলে সবে সবটা গুছিয়ে নিতে যাচ্ছিলো। ঠিক তক্ষুণি, দরজার চৌকাঠে এসে দাঁড়াল আঞ্জুমান ইয়াসির। কক্ষ অভ্যন্তরে, চতুর্পাশ্বের অবিন্যস্ত অবস্থা আর বিছানার চাদরের দলা-পাকানো রূপ দেখে একবার কড়া চোখে দু’ বোনের দিকে চেয়ে বলেন,,
“ কি করছিলি তোরা?”
আঞ্জুমান ইয়াসিরের কড়া কণ্ঠের প্রশ্নে দুই বোনের হাতের বালিশ হাতেই জমে গেল। আঞ্জুমান ইয়াসির চশমার ওপর দিয়ে ঘরটার চারদিকের ধ্বংসস্তূপ আরো একবার দেখলেন, তারপর কায়রা আর পায়রার দিকে তাকিয়ে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
“ধামড়া ধামড়া দুইখান ধেড়ে মেয়ে, অথচ আক্কেল-জ্ঞান তো দেখছি একদম হাঁটুতে! এই বয়সেও তোদের কোল-বালিশ নিয়ে কুস্তি খেলা লাগে? এইগুলা কোনো ভদ্র বাড়ির মাইয়াদের লক্ষণ?”
কায়রা ততক্ষণে নিজেকে নিরীহ বিড়াল ছানার ন্যায় গুটিয়ে বিছানার এক কোণে সেঁধিয়ে গেছে। পায়রা আমতা আমতা করে বলল,
“না ফুপি… আসলে চাদরটা ঠিক করতে গিয়ে একটু…”
“থামো, ওস্তাদের উপর ওস্তাদি করো না! আমি তো অন্ধ না, চাদর ঠিক করছিলে নাকি চাদরের জান ক”ব”জ করছিলে তা আমি ভালোই বুঝেছি।”
আঞ্জুমান ইয়াসির ঘরের ভেতর দুই পা এগিয়ে এসে কায়রার দিকে আঙুল উঁচিয়ে বললেন,
“বিশেষ করে এই ছোটটা! পড়াশোনার নাম-গন্ধ নেই, সারাদিন টো টো করে ঘুরে বেড়ানো আর বানরের মতো লাফালাফি করা। তোর বাপের মাথায় এত বড় একটা দায়িত্ব, আর তুই কি না ঘরের ভেতর এই হাঙ্গামা বাধিয়েছিস? এরপর থেকে যদি তোদের কারণে আমার রাতে ঘুমের ব্যাঘাত হইছে, তবে দুই বোনরেই একদম রান্নাঘরে ঢুকায় দেব, সকাল-বিকাল শুধু রুটি বেলবি!”
বড় ফুফুর এই ‘রুটি বেলার’ হুমকির তীব্রতা কতখানি, তা দুই বোনের কারোরই অজ্ঞাত নয়। কায়রা চট করে কান ধরে মাথা নুইয়ে বলল,
“আর হবে না ফুপি, একদম স্যরি! আমরা এখনই সব গুছিয়ে শুয়ে পড়ছি।”
আঞ্জুমান ইয়াসির আর কথা না বাড়িয়ে একটা গম্ভীর ‘হুম’ শব্দ করে নূরা খানের দিকে চাইলেন,
“নূরা, মেয়েদের একটু চোখে চোখে রাখ বোন। বড় হচ্ছে, এদের চালচলন একটু শোধরাতে বল।”
কথাটা বলেই আঞ্জুমান ইয়াসির কক্ষ ত্যাগ করলেন। ওনার পায়ের আওয়াজ মিলিয়ে যেতেই কায়রা আর পায়রা বুক ফুলিয়ে এক বিশাল দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।নূরা খান কোমরে হাত দিয়ে মেয়েদের দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙিয়ে বললেন,
“দেখলি তো? আজ তোদের ভাগ্য ভালো যে,তোদের আব্বু নিচে ড্রয়িংরুমে ফাইল দেখছিল, নাহলে তোদের এই বানরনাচ দেখলে উনিও আজ রেগে যেতেন। এখন চটপট বিছানা ঠিক কর, আর কায়া, তুই তোর নিজের রুমে গিয়ে একদম চুপচাপ ঘুমা!”
মায়ের ধমক খেয়ে কায়রা আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। নিজের কুশনটা বাহুতে চেপে, পায়রাকে একটা ভেংচি কেটে বিড়বিড় করে ‘জা-নো-য়া-র’ বলতে বলতে নিজের রুমের দিকে চম্পট দিল।
জলসিক্ত চুলগুলো বেশ পরিপাটি করে শুকিয়ে, লেমন গ্রে কালার শার্টে নিজেকে আবৃত করে, সবে ডাইনিং স্পেসে পা রেখেছে দুর্জয়। তৎক্ষণাৎ ওর দৃষ্টিগোচর হলো, ঘড়ির কাঁটা রাত আটটার ঘরে ঠেকলেও অন্যান্য দিনের মতো আজ খাবার পরিবেশন করা হয়নি টেবিলে। কিঞ্চিৎ বিস্ময়ভরে এগিয়ে এসে চেয়ার টেনে বসতে বসতে ও শুধালো,,
“কি হয়েছে আম্মা? আব্বার সাড়ে আটটায় মেডিসিন আছে তো। খাবার পরিবেশন করোনি এখনও?”
প্রশ্নের প্রত্যুত্তরে এক থমথমে কণ্ঠস্বর শ্রবণগোচর হলো দুর্জয়ের,,
“একা আর কত দিক সামলাবো? আমার তো বয়স হচ্ছে নাকি?”
কথোপকথন ভিন্ন গতিপথ লাভ করছে বোধগম্য হতেই উঠে দাঁড়ায় দুর্জয়,,
“ওকে ফাইন! তুমি আমাকে জাস্ট ইনগ্রেডিয়েন্টস গুলো কোথায় দেখিয়ে দেবে চলো।দ্যান, আই ক্যান হ্যান্ডেল ইট।”
“দুর্জয়!”
সাজেদা চৌধুরী যথাসাধ্য কণ্ঠস্বর শক্ত করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত হন। তবুও নেত্র কার্নিশ ভিজে আসে; মা জাতটাই এমন, সহস্র পূর্বপরিকল্পনা থাকলেও ছেলের সম্মুখে এলেই সমস্ত কিছু তাসের ঘরের ন্যায় ভেঙে যায়।রুদ্রমূর্তি সদ্যরূপ পাওয়া মৃৎশিল্পে পরিণত হয়,
“তুমি কি বুঝছো না?”
“আপাতত বুঝতে চাইছি না আম্মা।”
“ত্রিশ পেরিয়ে একত্রিশের কোটায় বয়স তোমার। তোমার জন্য কি,এ জীবনে আমাদের আর দাদা-দাদি ডাক শোনা হবে না?”
“দায়িত্ব বেড়েছে আম্মা। পার্সোনাল প্রেসার নিতে চাইছি না এখন আর।”
“এটা তোমার কাছে প্রেসার মনে হচ্ছে?”
“সামহাউ!”
“মানে কি, দূর্জয়? তোমার সামনে তোমার ছোট ভাই বউ-বাচ্চা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।লজ্জা করা উচিত তোমার।”
দুর্জয় জবাব দিলো না। সাজেদা চৌধুরী দাঁতে দাঁতে ঘর্ষণ করে স্বামীর দিকে চাইলেন,,
“আর এই যে, মহাশয়। আপনি কি মুখে কুলুপ এঁটেছেন?”
দুর্জয়ের দিকে আগত ঝড়টা দিক বদলে ইকবাল সাহেবের দিকে ঘুরেছে দেখতেই উনি যথাসাধ্য গম্ভীর কন্ঠে ছেলের দিকে ঘুরে বললেন,,
“কি হচ্ছে দুর্জয়? আমাদের কথাও তো একটু ভাবো। তোমার কাউকে পছন্দ আছে? থাকলে নির্দ্বিধায় বলতে পারো আমাদের, উইদাউট অ্যানি হেজিটেশন মাই বয়।”
“অ্যারেঞ্জ ছাড়া উপায় দেখছি না।”
ছেলের থেকে কাঙ্খিত জবাবটা পেতেই, সাজেদা চৌধুরী বললেন,,
“তাহলে সেই ব্যবস্থাটা আমাদেরই করতে দাও। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে, তোমার বিয়ের পাত্রী খুঁজে পাকা কথা সম্পন্ন করব আমরা। তোমার দিক থেকে কোনো ওজোর-আপত্তি শুনতে চাচ্ছি না।”
দুর্জয় কার্যভূমিকা সমাপ্ত করে চেয়ার টেনে বসে পুনরায়।
“তাহলে কি ধর্মঘটের অবসান ঘটছে? অলরেডি, ইট’স এইট টোয়েন্টি।”
ছেলের সম্মতিতে স্মিত হাস্যে কিচেনের দিকে এগিয়ে যান সাজেদা চৌধুরী। ইকবাল সাহেব এগিয়ে এসে ছেলের কাঁধ চাপড়ে বলেন,,
“ম্যারেজ ইজ আ হোলি ইউনিয়ন, মাই সান।এক্সট্রা প্রেসার ক্রিয়েট হয় না এতে। বরং,মানসিক শান্তি হিসাবে কাজ করে।”
হেমন্তের ম্রিয়মাণ রোদ্দুরে আবৃত মধ্যাহ্নে জনাকীর্ণ ডাকবাংলার পথঘাট। হকারদের হাঁকডাক আর কেনাকাটা করতে আসা মানুষের ভিড়ে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। এমন একটা জাঁতাকলে সামান্য তালগোল পাকালেই পদপিষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি। সাজেদা চৌধুরী মূলত ইথিকার সাথে কিছু জরুরি কেনাকাটা সারতেই এই ভরদুপুরে এখানে এসেছিলেন। সেই কোকিলকণ্ঠী ঘোরের মাঝেই ত্রস্ত সুমিষ্ট স্বরে বলে উঠল,
“স্যরি আন্টি স্যরি। আপনার কোথাও লাগেনি তো? ইস, আমি দেখতেই পারিনি। রিয়েলি স্যরি আন্টি।”
কিন্তু আগত মানুষের ধাক্কায় হুট করে একটা ভাঙা ইটের চাঁইয়ে ওনার পা আটকে গেল। ভূপতিত হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে একজোড়া নরম অথচ শক্তপক্ত হাত তাৎক্ষণিক এগিয়ে এসে ওনার কনুই আর পিঠ আঁকড়ে ধরল।
সাজেদা চৌধুরী কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। ওনার বুকটা তখনো ধড়ফড় করছে। সাময়িক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে উনি চোখ তুলে তাকালেন রক্ষাকর্ত্রীর দিকে। সঙ্গে সঙ্গে এক চিলতে বিস্ময় নেমে এলো দৃষ্টিজোড়ায়। মেয়েটার চঞ্চল চোখে উপচে পড়া মায়া, মায়াবী মুখশ্রীতে এক নিষ্পাপ আকুলতা আর কপালের ওপর অবাধ্য কিছু কেশরাজ ঘামে লেপ্টে আছে।
সদ্য প্রস্ফুটিত পদ্ম ফুলের ন্যায় মেয়েটি এই কোলাহলের মাঝেও অপার স্নিগ্ধতা ছড়াচ্ছে। সাজেদা চৌধুরী নিজের শাড়ির আঁচলটা একটু ঠিক করে নিয়ে নরম হেসে বললেন,
“না না মা, আমার কিছু হয়নি। তবে,তুমি ঠিক সময়ে না ধরলে আজ নির্ঘাত হাড়গোড় ভাঙত আমার।”
ঠিক তখনই ভিড় ঠেলে হাতে কয়েকটা শপিং ব্যাগ নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এল ইথিকা। সাজেদা চৌধুরীকে ওভাবে হাঁপাতে দেখে ও বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে ওনার হাত ধরে বলল,
“আপনার কিছু হয়নি তো চাচিআম্মু? আমি জাস্ট দুই মিনিটের জন্য ওদিকের কাউন্টারে গেলাম আর এর মধ্যেই..”
বলতে বলতে ইথিকার চোখ গেল পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার দিকে। আর চোখ মিলতেই ইথিকার মুখের সমস্ত উদ্বেগ কর্পূরের ন্যায় উড়ে গিয়ে চওড়া হাসির রেখা ফুটলো ওষ্টাধর জুড়ে;ব্যাপক বিস্মিত কন্ঠে ও বললো,,
“আরে জুনিয়র! তুমি এখানে?”
কায়রাও ইথিকাকে দেখে সমান চমকে ওষ্টাধর প্রসারিত করে বিস্তর হেসে বলল,
“আরে ইথিকা আপু! আপনি?”
দুই তরুণীর এই আকস্মিক কুশল বিনিময় দেখে সাজেদা চৌধুরী বেশ কৌতুহলী হয়ে উঠলেন। ওদের দিকে পর্যায়ক্রমে চেয়ে শুধালেন,
“তোমরা একে অপরকে চেনো নাকি?”
ইথিকা সাজেদা চৌধুরীর হাত আলতো চেপে ধরে বলল,,
“চিনবো না মানে চাচিআম্মু! পরশুদিন আপনাকে বলছিলাম না একটা মিষ্টি মেয়ের কথা? এই তো সেই মেয়েটা। কায়রা ইয়াসির কায়া।”
ইথিকার মুখে কায়রার পরিচয় শুনতেই সাজেদা চৌধুরী অত্যন্ত স্নেহশীল দৃষ্টিতে কায়রার দিকে আর একবার চাইলেন। কিন্তু এই তীব্র জনজটে এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলা অসম্ভব। চারপাশের ধাক্কাধাক্কি থেকে বাঁচতে ইথিকাই বুদ্ধি দিল,
“চাচিআম্মু, চলেন আমরা ওই পাশের কর্নারটায় গিয়ে বসি। এখানে দাঁড়ানো যাচ্ছে না।”
সবাই সায় দিলে ওরা ভিড় ঠেলে রাস্তার ওপারে একটা শান্ত, এসি যুক্ত জুস কর্নারের দিকে পা বাড়াল। কায়রাও নিজের স্বভাবসুলভ চপলতা লুকিয়ে একদম লক্ষ্মী মেয়ের মতো ওনাদের পিছু নিল।
জুস কর্নারের ঠান্ডা পরিবেশে দেহ জুড়িয়ে যেতেই, সাজেদা চৌধুরী কায়রার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললেন,
“বস মা, আজ তুমি না থাকলে বুড়ো বয়সে বড়সড় একটা অ্যাক্সিডেন্টই হয়ে যেত আমার।”
কায়রা একটু লাজুক হেসে বলল,
“আরে না আন্টি, ওভাবে বলবেন না। ওটা তো আমার দায়িত্ব ছিল।”
সাজেদা চৌধুরীর আলতো হাস্যে কায়রার মুখোমুখি হয়ে বসলেন,,
“তুমি ভীষণ মিষ্টি। তা,তোমার পুরো নামটা যেন কী বললে মা? কায়রা ইয়াসির কায়া? তা বাবা-মা কী করেন?”
“জ্বী আন্টি,আমার বাবা একজন ব্যবসায়ী-আনোয়ার ইয়াসির। আর মা নূরা খান, হোমমেকার।”
“ওহ্, তুমি আনোয়ার সাহেবের মেয়ে?”
“জ্বী আন্টি।”
সাজেদা চৌধুরী বেশ অবাক হলেও পরক্ষণে বিস্তর মুগ্ধ হলেন। চটপটে মেয়েটি স্বভাবে চঞ্চলা হলেও ভেতরে এক অদ্ভুত মায়াভরা ওর। নামকরা রাজনীতিবিদের মেয়ে হওয়া সত্বেও ভদ্রতাবোধের প্রখরতা পারিবারিক শিষ্টাচারের প্রমাণক ওর। সচরাচর শহুরে মেয়েদের মধ্যে এমন নম্রতা পাওয়া দুষ্কর আজকাল। বেশ কিছুক্ষণ ওদের মাঝে নানা বিষয়ে টুকটাক কথা হলো।
কায়রার সহজ-সরল আর প্রাণবন্ত কথাবার্তায় সাজেদা চৌধুরী এতটাই মজে গিয়েছিলেন যে, সময়ের খেয়ালই ছিল না। অবশেষে ওঠার সময় উনি কায়রার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ভীষণ আপন করে বললেন,
অভিসৃতি পর্ব ২
“তোমার সাথে কথা বলে যে কী ভালো লাগল মা, বোঝাতে পারব না। একদম নিজের মেয়ের মতো ফিল হচ্ছিল। তুমি কিন্তু একদিন আমাদের বাড়িতে অবশ্যই আসবে। ইথিকা মা-ই তোমাকে নিয়ে যাবে, কেমন?”
কায়রা আন্টির এমন আন্তরিকতায় বেশ আপ্লুত হলো। ও মাথা নেড়ে মিষ্টি একটা হাসি উপহার দিয়ে বলল,
“ইনশাল্লাহ আন্টি, আমি অবশ্যই আসব। আপনিও কিন্তু আমার বাসায় যাবেন। ও হ্যাঁ,আপনাকে তো ঠিকানাই বলা হয়নি! সোনাডাঙ্গা আবাসিক এলাকার এক নম্বর রোড সাইডের তিন তলা বাড়িটাই আমাদের।”
“ইনশাআল্লাহ মা। অবশ্যই যাবো।”
