কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ৪০
তন্ময়ী তিতিক্ষা
ঘোর আঁধারে ছেয়ে আছে চারপাশ। সামান্য আলোর ছোঁয়াটুকুও নেই কোথাও। চারিপাশ নিস্তব্ধ, শব্দহীন শান্ত। এই নিস্তব্ধতার মাঝে চক্ষুদ্বয় মেলে চাইলো আযরান। নিভু নিভু নেত্রপল্লব মেলে চারিদিকে দৃষ্টিপাত করতেই অন্ধকার আর কুয়াশা ব্যাতীত কিছুই নজরে এলো না। প্রচন্ড অবাক হলো আযরান। শোয়া থেকে উঠে পরিস্থিতি বুঝার চেষ্টা চালালো। নিজের ডান হাতটা চোখের সামনে নিয়ে আসতেই অদ্ভুত অনুভূতি হলো আযরানের। আঙ্গুলগুলো নাড়াচ্ছে তবে তা স্পষ্ট দেখতে পারছে না। সব কেমন আঁবছা। নিজের দিকে তাকাতেই লক্ষ্য করলো সম্পূর্ণ সাদা পোশাকে আবৃত। ভরকে গেল আযরান৷ ঠিক তখনই মনে পড়লো তার এক্সিডেন্টের কথা৷ সে কি মারা গেছে? তার গায়ে কি সাদা কাফন জড়ানো? আযরান কাউকে ডাকতে চাইলো। কিন্তু কন্ঠনালি ভেদ করে সামান্য শব্দটুকুও বের করতে পারলো না। উন্মাদের মতো আযরান পুরো হাতড়াতে লাগলো। নাহ! তার শরীরে কোথাও আঘাতের চিহ্ন নেই। তাহলে? তাহলে সে কি করে মরলো? আর কিছু ভাবার সময় পেলো না সে। এর পূর্বেই কিছুটা দূর থেকে ভেসে এলো ক্ষীণ কান্নার আওয়াজ। কে কাঁদছে এভাবে? কৌতূহলী মন নিয়ে ধীরে সুস্থে সামনে এগোলো আযরান। পায়ের নিচে শক্ত আবরণ অনুভব করলো। কিন্তু সেদিকে মনোযোগী হলো না। যত সামনে এগোচ্ছে কান্নার শব্দ যেন তত বাড়ছে। সেই সাথে কর্ণে এসে বারি খেলো কারোর ক্রন্দনরত অস্থির কন্ঠস্বর। কেউ একজন আহাজারি করে বলছে,
“আযরান এই আযরান। উঠ না! দেখ আমি এসেছি। উঠ না আযরান। এভাবে শুয়ে আছিস কেন? আমাকে জড়িয়ে ধর। দেখ না তোর মুটি কাঁদছে। তুই তো বলেছিলি আমাকে কখনো কাঁদতে দিবি না। তাহলে আজ কেন এভাবে কাঁদাচ্ছিস? জবাব দে না।”
মুটি? তার মুটি তাকে ডাকছে? কিন্তু কোথায়? সে কেন আর্শিকে দেখতে পারছে না? শব্দের উৎস খু্ঁজে ছুট লাগালো আযরান। আকস্মিক থমকে গেল সে। তার থেকে কিছুটা দূরেই আর্শি হাঁটুতে মুখ গুঁজে কাঁদছে। কান্নার কারনে ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে আর্শির সমস্ত শরীর। আযরানের বুক মোচড় দিয়ে উঠল। আর্শির দিকে ছুটতে ছুটতে ডেকে উঠল,
“আর্শি! আমি আসছি। তুই কাঁদছিস কেন?”
এক মুহূর্তেই সব ভুলে গেল আযরান। তার সমস্ত অস্তিত্বে তখন একটাই তাড়না আর্শির কাছে যেতে হবে। যত এগোচ্ছে ততই যেন আর্শি তার থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। বহুকষ্টে আর্শির কাছে এসে পৌছালো আযরান। আর্শিকে স্পর্শ করতে যাবে হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে উঠলো চারপাশ। আযরানের ঠিক সামনের মাটিটা মুহূর্তের মধ্যে ফেটে দু’ভাগ হয়ে গেল। বিশাল এক খাদ তৈরি হলো তাদের মাঝখানে। আর এক কদম এগোলেই হয়তো সেই অতল গহ্বরে তলিয়ে যাবে আযরান। তবুও সে থামলো না। খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে দুই হাত বাড়িয়ে মরিয়া হয়ে চিৎকার করে বলে উঠল,
“মুটি! আমার দিকে তাকা! আমি এখানে..আমি এসেছি। দেখ আমাকে।”
আর্শি শুনলো না। পূর্বের মতোই মাথা নিচু করে কাঁদছে। অদৃশ্য কোনো শক্তি যেন আযরানের পা আটকে দিয়েছে। শত চেষ্টা করেও একপাও এগোতে পারছে না। মনে হচ্ছে খাদটা আরও প্রশস্ত হয়ে যাচ্ছে।
অসহায় হয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো আযরান। কাঁপা কন্ঠে আওড়ালো,
“মুটি! আমি এখানে..”
এবার বোধহয় আর্শি শুনলো আযরানের কথা। ধীরে ধীরে মাথা তুলে নেত্রপল্লব স্থির করল আযরানের পানে। অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো তারই দিকে। আযরানের চক্ষুদ্বয় ছলছল করে উঠল। বার বার ডাকতে থাকলো আর্শিকে। কিন্তু আর্শি কিছুই বললো না। অকস্মাৎ আর্শির শরীরটা হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে শুরু করলো। আযরান আতঙ্কিত হয়ে পড়লো মুহূর্তে। হাত বাঁড়িয়ে ধরার চেষ্টা করলো তার মুটিকে। শেষবারের মতো আর্শির অবয়বটা হালকা কেঁপে উঠলো। তারপর মুহূর্তের মধ্যেই সাদা ধোঁয়ায় বিলীন হয়ে গেল সবটুকু। চারপাশ পুনরায় ছেয়ে গেল নিস্তব্ধতায়। শুধু আযরানের বুকফাঁটা চিৎকার প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো।
“মুটি! কোথায় যাচ্ছিস? আমাকে ছেড়ে যাস না! প্লিজ।”
হাসপাতালের কেবিনে বেডে শুয়ে থাকা নিশ্চল আযরানের বন্ধ চোখের কোণ বেয়ে নীরবে গড়িয়ে পড়ল একফোঁটা অশ্রু। সে কিছু বলতে পারছে না। আর না পারছে চক্ষুদ্বয় মেলে তাকাতে কিন্তু তার অবচেতন মনে এখনো বাস্তবের কিছু অনুভূতি আঁকড়ে ধরে আছে। পাশে থাকা আর্শি লক্ষ্য করলো আযরানের গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুবিন্দু। সাথে সাথে অস্থির হয়ে পড়লো সে। আযরানের চোখের কোণ মুছে দিয়ে স্মিত স্বরে আওড়ালো,
“আযরান..শুনছিস? কাঁদছিস কেন? দুঃস্বপ্ন দেখেছিস? আমরা আছি এখানে। ভয় পাস না। এই আযরান!”
আর্শি আর সময় নষ্ট করলো না। তড়িৎ বেগে বেরিয়ে এলো কেবিন থেকে। করিডোরে দায়িত্বে থাকা চিকিৎসককে দেখেই প্রায় দৌড়ে এগিয়ে গেল তার নিকটে। আর্শির এহেম অবস্থায় বাহিরে থাকা সকলে চমকে উঠল। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো সকলের মাঝে। আর্শির অস্থিরতা দেখে চিকিৎসক সময় নষ্ট করলেন না। দ্রুত পা চালিয়ে কেবিনে প্রবেশ করল। পিছু পিছু ঢুকলো সিতারা হায়দার, নীলা, মিহির আর প্রহরও। তারা চাইলেও যেতে পারেনি। পুরোটা সময় পার করেছে হসপিটালে। ডাক্তার সবকিছু একে একে পরীক্ষা করলো৷ পরক্ষণেই আর্শিদের উদ্দেশ্যে বলে উঠল,
“পেশেন্ট হয়তো নিজের কল্পনার জগতে বিচরণ করছে। মানুষ যখন দীর্ঘ সময় অচেতন অবস্থায় থাকে, তখনও তার মস্তিষ্কের কিছু অংশ কাজ করতে পারে। বাইরের জগতের সঙ্গে সে যোগাযোগ করতে না পারলেও মস্তিষ্ক কখনো কখনো নিজের ভেতরেই এক ধরনের কল্পনার জগৎ তৈরি করে। সেখানে সে বিভিন্ন স্মৃতি, অনুভূতি কিংবা প্রিয় মানুষদের নিয়ে যেন নিজের মতো করে বেঁচে থাকে। হয়তো এই চোখের পানি এই অভ্যন্তরীণ অনুভূতিরই বহিঃপ্রকাশ। হয়তো সে কোনো স্বপ্ন দেখছে বা কোনো স্মৃতি অনুভব করছে। যা আমরা বাহিরে থেকে বুঝছি না।”
ডাক্তার থেমে গেলেন। আরও কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করলো আযরানকে। সকলে অধির আগ্রহে চেয়ে আছে তার পানে। আর্শি রুদ্ধশ্বাসে চেয়ে রইলো। অভ্যন্তরে চলছে প্রচন্ড অস্থিরতা। সকলের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ডাক্তার গম্ভীর কন্ঠে বললো,
“২৪ ঘন্টা পেরিয়ে গেছে ঘন্টাখানেকের বেশি হয়েছে। কিন্তু রোগীর জ্ঞান ফেরেনি। সম্ভবত রোগী কোমায় চলে গেছে। ঠিক কবে ঠিক হবে তা বলা যাচ্ছে না।”
আর্শি কিংকর্তব্যবিমুঢ়। নিশ্চুপ, নিস্তব্ধের ন্যায় দাঁড়িয়ে রইলো কেবিনে থাকা প্রত্যেকটা মানুষ। কথাগুলো শুনে সিতারা বেগম দু’হাতে মুখ চেপে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। আর্শির চোখ টলমল করছে। কিন্তু আজ সে কাঁদতে পারছে না। তার মনে হচ্ছে এই মুহুর্তে তার হৃদয় থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। বিষাক্ত যন্ত্রণার বিষ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে ইতিমধ্যে। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই একসময় শরীর ছেরে দিলো। মাটিতে পড়ার পূর্বেই ধরে ফেললো প্রহর। প্রহরের দৃষ্টিতে অসহায়ত্ব। কি করে মানবে তার প্রাণপ্রিয় দুই বন্ধুর এই অবস্থা? কি করে সামলাবে এই মেয়েটাকে? করুণ হলো প্রহরের দৃষ্টি আর্শিকে সোজা করে দাঁড় করালো কোনোমতে। নিজেকে শক্ত করে কম্পিত স্বরে বলল,
“আরে চিল দোস্ত ও নাটক করছে। তোর সাথে মজা নিতে এমন অভিনয় করছে। একটু পরেই দেখবি উঠে যাবে।”
কথাগুলো বলার সময় প্রহরের চোখ ছলছল করছে। তবুও নিজেকে শক্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে ছেলেটা। মিহির কিছু না বলে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। আর্শির বুকে তীব্র তোলপাড় শুরু হলো। তবুও নড়লো না একবিন্দুও। মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলো স্থির হয়ে। কথায় আছে অল্প শোকে কাতর অধিক শোকে পাথর। তবে কি আর্শির ক্ষেত্রেও তাই হলো? কথাটা ভেবেই আঁতকে উঠল প্রহর। আর্শির কাঁধ ঝাঁকিয়ে অস্থির কন্ঠে বলল,
“তুই এমন চুপ করে আছিস কেন? কান্না কর আর্শি। একটু কান্না কর। তোর কান্না করা উচিত।”
আর্শি নেত্রপল্লব উঁচিয়ে চাইলো। নিষ্প্রাণ, নির্জীব সেই দৃষ্টি। কোনো প্রকার অনুভূতি নেই এই দৃষ্টিতে। তীব্র থেকে তীব্রতর আকার ধারণ করছে আর্শির অভ্যন্তরে চলতে থাকা ঝড়। কি করে সামলাবে সে নিজেকে? কি করেই বা আযরানের এই অবস্থা মেনে নিবে?
বাইরে এসেই কান্নায় ভেঙে পড়লো মিহির। আযরান সুস্থ হবে এই আশায় পুরোটা সময় নিজেকে শক্ত খলসে আবদ্ধ করে রাখলেও এখন যেন আর বাঁধ মানতে চাইছে না মন। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কান্না আঁটকানোর চেষ্টা চালালো মিহির কিন্তু অশ্রুকণারা ভেঙে চূড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। হঠাৎ কাঁধে কারো স্পর্শ পেয়ে তৎক্ষনাৎ চক্ষুদ্বয় মুছলো সে। মাথা ঘুরিয়ে পিছু ফিরতেই নজরে এলো মেহরকে। মেয়েটা অশ্রুসিক্ত চোখে তারই দিকে তাকিয়ে। অদ্ভুত মায়াময় দৃষ্টি মেয়েটার। মিহিরকে ফিরতে দেখে শব্দ করে কেঁদে উঠল মেহর। ভাঙা শব্দে বলল,
“কাঁদবেন না মিহির ভাই। আযরান ভাইয়া ঠিক সুস্থ হয়ে যাবে। আপনারা ভেঙে পড়লে আপুকে কে সামলাবে?”
মিহির অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মেয়েটার দিকে। মেয়েটার কান্না দেখে যেন তার কান্নারাও বেরিয়ে আসতে চাইছে। কিন্তু সে কাঁদবে না তাকে যে শক্ত থাকতে হবে। তবুও কি হলো কে জানে। নিজেকে সামলাতে পারলো না মিহির। নিজের থেকে বয়সে ছোট মেয়েটার সামনেই বাচ্চাদের মতো কেঁদে ফেলল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে অভিযোগ করতে লাগলো আযরানের নামে।
“হারামীটা না বলে কোমায় চলে গেছে মেহু। বেয়াদবটা ফিরুক একবার এর হিসেব নিয়ে ছাড়বো। আমাকে বলেছে বউ খুঁজে দিবে। কিন্তু দেয়নি। বউ খুঁজে না দিলে ওই ব্যাটাকে আমি কোমায় কিছুতেই যেতে দিবো না।”
কথাগুলো বলার সময় বিষাদের ছেয়ে গেল মিহিরের মুখশ্রী। কথাগুলো কর্ণভেদ করে সোজা বুকে বিঁধছে মেহরের। প্রভাব ফেলছে প্রগাঢ়ভাবে। বন্ধুত্ব বুঝি এত সুন্দর? এক বন্ধুর জন্য আরেক বন্ধু বাচ্চাদের মতো কাঁদছে। কষ্টের মাঝেও মন জুঁড়িয়ে এলো মেহরের। সাহস নিয়ে হাত রাখলো মিহিরের কাঁদে। ভেজাকন্ঠে মৃদুস্বরে বলে উঠল,
“কাঁদবেন না মিহির ভাইয়া। শান্ত হোন প্লিজ। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
প্রকৃতি নিজেকে আঁধারের মুড়িয়ে নিয়েছে। ঠিক যেমনটা দুঃখ মুড়িয়েছে আযরানের কাছের সকল মানুষগুলো। প্রিয় মানুষের কাতরতায় যেন প্রতিটি প্রাণ আজ নিজেদের বিরহের চাঁদরের আবৃত করে নিয়েছে। হসপিটালের করিডর সম্পূর্ণ ফাঁকা। তার এককোণে মাথা নিচু করে বসে আছে শাহরিয়ার হায়দার৷ অদ্ভুত নিরবতা ঘিরে ধরেছে তাকে। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে বার বার। শাহরিয়ার হায়দারের বড্ড আদরের ছিল আযরান। ছোট থেকে বিন্দুমাত্র কষ্ট পেতে দেননি নিজের ছেলেকে। কখনো প্রকাশ না করলেও আযরানকে প্রচন্ড ভালোবাসেন তিনি৷ কিন্তু হঠাৎ একদিন বাড়ি ফিরে শুনলেন আর্শির জন্য আযরান বাড়ি থেকে চলে গেছে। তখন থেকেই ছেলের প্রতি একপ্রকার অভিমান জমেছিল। দেখতে চেয়েছিলেন তাদের ছাড়া কিভাবে ভালো থাকে আযরান। একপ্রকার আড়ালে থেকেই আযরানের খবর রাখতেন তিনি। আযরানকে কষ্ট করতে দেখে একদিকে যেমন খারাপ লাগতো তেমনি এই ভেবে খুশি হতেন ছেলেটা দ্বায়িত্ব নিতে শিখে যাচ্ছে। কিন্তু সেই আদরের ছেলের এই করুণ অবস্থা বাবা হয়ে কি করে মেনে নিবেন তিনি?
ঠিক তখনই করিডোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে এলো সিতারা হায়দারের কান্নার শব্দ। বুকফাটা সেই আর্তনাদ যেন ছিন্নভিন্ন করে দিল শাহরিয়ার হায়দারের সমস্ত স্থিরতা। মুহূর্তেই উঠে দাঁড়ালেন তিনি। ভারী পায়ে এগিয়ে গেলেন কেবিনের দিকে। কেবিনে প্রবেশ করতেই দেখলেন সিতারা হায়দার আযরানের মাথার পাশে বসে অঝোরে কাঁদছে। কাঁপা হাতে বারবার ছেলের কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। অস্ফুট স্বরে শুধু একটাই কথা বলে যাচ্ছে সিতারা হায়দার,
“একবার চোখ খুলে তাকাও বাবা। একবার শুধু আম্মু বলে ডাক।”
দৃশ্যটা সহ্য করতে পারলেন না শাহরিয়ার হায়দার। অসহ্য ঠেকলো তার নিকট। ধীরগতিতে এগিয়ে গিয়ে হাত রাখলো।সিতারা হায়দার হঠাৎ ঘুরে স্বামীর বুকে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন।দু’হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরলেন তাকে।
“আমার ছেলেটাকে ফিরিয়ে দাও না আযরানের বাবা। ওকে ছাড়া আমি বাঁচবো না।”
এই প্রথম আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না শাহরিয়ার হায়দার। এতক্ষণ বুকের ভেতর জমানো পাহাড়সম কষ্ট মুহূর্তেই বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে এলো। এক হাতে স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে, অন্য হাতটা ছেলের মাথায় রেখে নিঃশব্দে কেঁদে উঠলেন তিনি।
কেবিনের দরজার পাশে নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আর্শি। চক্ষুদ্বয় স্থির আযরানের মুখে। চারপাশে কী হচ্ছে, কারা কাঁদছে কোনোকিছুরই অস্তিত্ব নেই তার কাছে। তার সমস্ত পৃথিবী এসে থেমে আছে ওই বেডে শুয়ে থাকা নিশ্চল মানুষটার মাঝেই। হঠাৎ শাহরিয়ার হায়দারের চোখ পড়লো আর্শির উপর। মেয়েটার জন্য মায়া হলো প্রচন্ড। সাথে সাথে নিজের স্ত্রীকে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। কেবিন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পূর্বে আর্শিকে ভেতরে যেতে বলে গেলেন। ধীরে ধীরে কয়েক পা এগিয়ে এলো আর্শি। কাঁপতে থাকা হাতটা বাড়িয়ে আলতো করে ছুঁয়ে দিল আযরানের শীতল আঙুলগুলো। আঙুলের ফাঁকে নিজের আঙুল জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ নির্বাক দাঁড়িয়ে রইল খানিকটা সময়। অপলকহীনভাবে দেখতে লাগলো নিজের স্বামীকে। আকস্মিক ঝুঁকে এলো আযরানের অতি নিকটে। আযরানের ওষ্ঠে নিজের অধরযুগল ছোঁয়ালো আলতো করে। কয়েকফোঁটা চোখের জল আর্শির গাল বেয়ে গড়িয়ে আযরানের গাল স্পর্শ করল। আর্শি আযরানকে জড়িয়ে ধরার মতো করে কাঁধে মাথা রাখলো। খুব আস্তে করে ফিসফিস করে বলল,
কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ৩৯
“তোকে ফিরতেই হবে আযরান। যেকোনো মূল্যেই ফিরতে হবে। তুই নিজেই বলেছিলি, আমার সব কান্নার দায় তোর। তাহলে আজ আমার চোখের জল মুছিয়ে না দিয়ে কোথায় পালিয়ে আছিস? আমি জানি তুই আমাকে শুনতে পাচ্ছিস। আমার জন্য হলেও ফিরে আসবি বলে দিলাম। নাহলে তোর চোখের সামনে নিজেকে শেষ করে দিবো আমি।”
