কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ৩৮
তন্ময়ী তিতিক্ষা
নীল রঙের শাড়ি পড়ে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আর্শি। আজ খুব একটা গরম নেই। আবার বাতাসেরও ছিটেফোঁটাও নেই। গাছের পাতাগুলোও কেমন ঝিম ধরে আছে। যেন একফোঁটা জল পেলেই নিজের স্নিগ্ধ রূপখানা মেলে ধরবে সকলের সামনে। আর্শির মায়া হলো। মনোযোগ দিয়ে দেখলো চুপসে যাওয়া গাছগুলো। নিচে হৈ চৈ এর শব্দ পেতেই মাথা নুয়িয়ে উঁকি দিলো আর্শি। নিচে ফুটবল খেলছে ছেলেদের দল। আযরানের দেখতেই নতুন করে ক্রাশ খেল সে। শান্ত আর্শির হৃদস্পন্দন হয়ে উঠল অশান্ত। স্লিভলেস গেঞ্জি পরনে আযরানের। বলিষ্ট হাতের পেশিগুলো স্পষ্ট হয়ে আছে। উন্মুক্ত লোমশ বক্ষখানা নজরে আসতেই সূক্ষ্ম ঢোক গিলল আর্শি। বুকের মাঝে হাত দিয়ে নিজের হৃদস্পন্দন মেপে নিয়েছে আর্শি। কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছে না। বেহায়া নজরে একপ্রকার গিলতে লাগলো আযরানকে।
খেলার মাঝে একপর্যায়ে আযরানের নজর পড়ল আর্শির দিকে। চারিদিকে একবার নজর বুলিয়ে দৃষ্টি স্থির করল আর্শি পানে। ভ্রুঁ উঁচিয়ে কৌশলে জিজ্ঞাস করল,
“কি?”
কোনো রূপ জবাব দিলো না আর্শি। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো আযরানের দিকে। আযরানের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো। আর্শির ঘোরলাগা চক্ষে নিজের চক্ষুদ্বয় স্থির করল। পরক্ষণেই কিছু একটা ইশারা করতেই লজ্জায় রাঙা হলো আর্শি কপোলদ্বয়। সাথে সাথে চক্ষুদ্বয় নামিয়ে নিলো মেঝেতে। আযরান ঠোঁট কামড়ে হাসলো। মনে মনে আর্শি আযরানকে খুব করে বকলো। ছেলেটা দিন দিন কেমন অসভ্য হয়ে যাচ্ছে। আর্শিকে বার বার লজ্জায় ফেলে দেয় কারনে অকারণে। আকস্মিক উচ্চস্বরে বলে উঠল আযরান,
“ভিতরে যা।”
আর্শি চমকে উঠল। পরক্ষণেই বুঝলো তাকে ভিতরে যেতে বলার বিষয়টা। আর্শি দ্বিমত করল না। ধীর কদমে চলে গেল ভিতরে। নিচে থাকা সকলেই দেখলো ব্যাপারটা। মিহির এগিয়ে এলো। রুমাল দিয়ে কপালের ঘামটুকু মুছতে মুছতে বলে উঠল,
“দুনিয়া উল্টাই যাইবো। কিন্তু এই বান্দা গো ভালোবাসা কমতো না।”
“কেন তোর জ্বলে নাকি? শালা সিঙ্গেল।”
মিহির নাক মুখ কুঁচকে চাইলো প্রহরের দিকে। বিয়ে করতে না করতেই তাকে সিঙ্গেল বলে অপমান করছে। আঁড়চোখে প্রহরকে পর্যবেক্ষণ করে মিহির নাক ছিটকালো। তাচ্ছিল্য করে বলল,
“তুই চুপ থাক খবিশ। বাসর কইরা গোসল করে না আবার আমারে সিঙ্গেল কইতে আইছে।”
প্রহর চোখ বড় বড় করে তাকালো। কি সব বলছে এই ছেলে? প্রহর হতাশ হলো ভীষণ! কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলল,
“বিশ্বাস কর ভাই। কিছু করি নাই আমি। ওই মাইয়া আমারে মাইরা অজ্ঞান কইরা দিছিলো।”
মিহিরের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। সাথে সাথে মুখ ঘুরিয়ে তাকালো আযরানের দিকে। আযরানও তারদিকে তাকিয়েছে। দুইজনেই বেশ অবাক হয়েছে বুঝতে বাকি নেই। মিহির পুনরায় নেত্রপল্লব ছোট ছোট করে চাইলো প্রহরের দিকে। সন্দিহান কন্ঠে বলে উঠল,
“ভাই সত্যি কইরা কো তোর কোনো সমস্যা নাই তো?”
“কেন?”
মিহির পুনরায় নাক কুঁচকে বলে উঠল,
“নাইলে ব্যাটা ছেলে হয়ে তুই মাইর খাইলি ক্যা?”
প্রহর কথা বাড়াতে চাইলো না। ভ্রুঁ কুঁচকে তাকিয়ে থেকে ফ্যাসফ্যাসে কন্ঠে বলে উঠল,
“বিয়া করো নাই তো চান্দু। যেদিন করবা সেদিন বুঝবা বউ কি জিনিস।”
প্রহরের কথা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করলো মিহির। নিমিষেই মেয়েদের মতো ভেংচি কেটে মুখ ঘুরালো সে। প্রহর অবাক হলো না বরং চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে রইলো সামনে দাঁড়ানো বন্ধু নামক মানুষটার দিকে। আযরান এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছিলো পুরো ব্যাপারটা। এবার রুমালের সাহায্যে কপালের ঘামটুকু মুছতে মুছতে বাড়ির দিকে পা বাড়ালো। গম্ভীর কন্ঠে মৃদুস্বরে বলল,
“আমি আর আর্শি বিকেলে ফিরে যাচ্ছি।”
মিহির আর প্রহর অবাক হলো ভীষণ। কপালে ভাঁজ পড়লো কয়েকটা। নিজেরাও পা বাড়ালো আযরানের পিছু পিছু। প্রহর চিন্তিত স্বরে বলল,
“এত তাড়াতাড়ি ফিরবি? কোনো সমস্যা হয়েছে?”
“নাহ বিয়ে তো হয়েই গেছে। আর আজ না ফিরলে চাকরি হারাতে হবে। এমনিই কষ্টের চাকরি।”
দুজনেই বুঝলো ব্যাপারটা। একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করে মিহির কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল,
“আমিও ফিরবো তোদের সাথে। টিউশনি মিস হয়ে গেছে অনেকদিন।”
“তোরা গেলে আমি কি করবো এখানে থেকে? আমিও যাবো।”
অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকালো মিহির। কপালে ভাঁজ ফেলে নাক কুঁচকে তাকালো কিছুটা সময়। বোধহয় প্রহরের কথাটা পছন্দ হয়নি। যদিও প্রহরের বেশির ভাগ কথাই তার পছন্দের হয়না। প্রহরের কথার প্রেক্ষিতে এবার ক্ষেপে গিয়ে বলল,
“তুই কেন যাইবি? বিয়া করছোস ক্যান শালা। কয়দিন থাক পরে, কত নিয়ম কানুন আছে। শেষ কইরা বউ নিয়া ফিরবি।”
মিহিরের কথাটা কর্ণপাত করলেও পাত্তা দিলো না প্রহর। প্রয়োজনে সকলে একসাথে ফিরবে নয়তো কাউকেই যেতে দিবে না। তাদের মাঝে কোনোরুপ প্রতিক্রিয়া করল না আযরান। মনে মনে চলছে কতশত চিন্তা। ঢাকায় ফিরলে আবার আগের জীবনে ফিরতে হবে। আরেকটু ভালো চাকরি খু্ঁজতে হবে এবার। এই ডেলিভারি ম্যানের কাজ তাদের সংসার চালানোর জন্য যথেষ্ট নয়।কথাগুলো ভেবে অভ্যন্তর ভেদ করে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো আযরানের। পূর্বে জীবন যতটা সহজ ছিল। বর্তমানে জীবন যেন ঠিক ততটাই কঠিন হয়ে উঠেছে।
“প্রিয় সুদর্শন পুরুষ। আপনি কি জানেন ঘুমন্ত আপনিটা কতটা স্নিগ্ধ? জানবেন কিভাবে আমি তো বলিই নি।”
কথাটা বলেই আনমনে মৃদু শব্দে হেসে উঠল মেহর৷ মিহিরের ঘুমন্ত চেহেরায় মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে রইলো অপলকহীন ভাবে। বাসের জানালা গলিয়ে আসা রাতের শীতল হাওয়ায় ক্ষণে ক্ষণে দুলে উঠছে মিহিরের চুলগুলো। সন্ধ্যার বাস না পেয়ে রাতেই রওনা হয়েছে তারা। রাইসা আর প্রহরকে আসতে দেয়নি তাদের পরিবারের মানুষ আর নীলাও কয়েকদিন ঘুরবে বলে রয়ে গেছে। তাই আযরান আর্শি মিহির আর মেহরই রওনা দিয়েছে ঢাকার উদ্দেশ্য। প্রথম আধঘন্টা মিহির আর আযরান একসাথে বসলেও পরবর্তীতে আযরান একপ্রকার জোর করে আর্শিকে নিয়ে গেছে তার পাশে। তাই বর্তমানে মিহির আর মেহর পাশাপাশি সিটে বসেছে। এতে মেহর মনে মনে খুশি হলেও মিহির যেন খুব বিরক্ত। মেহরের সাথে কোনো প্রকার বাক্যও ব্যয় করেনি। একটা সময় প্রচন্ড বিরক্তি থেকেই ঘুমের দেশে পারি জমিয়েছে ছেলেটা। আর এই সুযোগটাই কাজে লাগিয়েছে মেহর। এটাই তো মুখ্য সুযোগ মিহিরকে মন ভরে পিঞ্জিরায় বন্দি করার। ঢাকায় গেলে তো আর দেখাই পাবে না মানুষটার। অপলক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকেই চক্ষুদ্বয় জু্ঁড়িয়ে এলো মেহরের। মনে ছেঁয়ে গেল একরাশ প্রশান্তি। তাকিয়ে থাকতে থাকতেই একসময় ঘুমে ঢলে পড়ল মেয়েটা। সাথে সাথে চক্ষুদ্বয় মেলে চাইলো মিহির। ঘুমে আধো আধো দৃষ্টি ফেরালো মেহরের পানে। ঘুমে বার বার একসাথে হেলে পড়ছে সে।
মৌন মুখে স্থির রইলো মিহির। মেহরের বলা বাক্যটা স্পষ্ট কর্ণপাত হয়েছে তার। এতক্ষণ চোখ বুঁজে থাকলেও ঘুমায়নি। মেহরের উচ্চারিত প্রত্যেকটা বাক্য সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো আঁছড়ে পড়েছে তার কর্ণে। প্রচন্ড রকমের অবাক হয়েছে সে। তার প্রতি মেহরের অনুভূতি রয়েছে সে কল্পনাতেও ভাবতে পারেনি। তার বুক কাঁপছে কি কিছুটা? হয়তো! কিন্তু কেন? জানতে ইচ্ছে হলো না তার। আর না মানতে ইচ্ছে হলো মেহরের বলা কথাটা। গভীর হলো মিহিরের দৃষ্টি। মেহরের হেলে পড়া মাথাটা সোজা করে দিয়ে চক্ষুদ্বয় বুলালো পুরো মুখশ্রীতে। কিন্তু বিন্দুমাত্র অনুভূতি কাজ করল না। মুহুর্তে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো সে। সিটে হেলান দিয়ে চক্ষুদ্বয় বু্ঁজতেই চক্ষু পর্দায় জ্বলজ্বল করে ভেসে উঠল নীলার হাস্যজ্বল মুখশ্রী। আনমনে বিরবির করল মিহির,
“ভাগ্যও যেন অদ্ভুত খেলা খেলতে ভালোবাসে। একজন যার দিকে হাত বাড়ায়, সে তাকিয়ে থাকে অন্য কারও অপেক্ষায়। আর যে নিঃশব্দে নিজের পুরো পৃথিবীটা উজাড় করে দেয়, সে-ই থেকে যায় সবচেয়ে অবহেলিত।”
কথাটা বলতে বলতে চক্ষুকার্নিশ বেয়ে গড়ালো একফোঁটা অশ্রু। সেদিকে খেয়াল নেই তার। সে তো মগ্ন কোনো এক রমনী সাথে কাটানো স্মৃতিগুলোর স্মৃতিচারণ করতে।
উত্তপ্ত দুপুর৷ সূর্য্যিমামা যেন তার উত্তাপে জ্বালিয়ে দিতে চাইছে সবকিছু। একটু প্রশান্তির আশায় মানুষ ছুটে চলেছে বিভিন্ন ক্যাফে রেস্টুরেন্টে। আবার কিছু মানুষ এক মুঠো ভাতের আশায় এই জ্বলন্ত তাপেই খেটে চলেছে। বাদ যায় নি আযরান নিজেও। সূর্যের এই তেজী রুপেও সাইকেল চালিয়ে চলেছে আযরান। উদ্দেশ্য খাবার ডেলিভারি দেওয়া। প্রচন্ড গরমে যেন শরীর ছেড়ে দিতে চাচ্ছে। তবুও থামতে রাজি না সে। হঠাৎই রাস্তার একপাশে কিছু একটা চোখে পড়ল আযরানের। সাইকেলের গতি কমিয়ে এগিয়ে যেতেই দেখল, সাত-আট বছরের একটা ছেলে কাঁদছে। তার পাশেই খাবারের প্যাকেট পড়ে রাস্তার ধুলোয় মাখামাখি হয়ে গেছে। পাশে দাঁড়িয়ে আছে মধ্যবয়সী এক মহিলা। সম্ভবত ছেলেটির মা। অসহায় মুখে বারবার বলছেন,
“এখন আবার খাবার কিনতে গেলে টাকা লাগবে বাবা।”
ছেলেটি ফুঁপিয়ে কেঁদেই চলেছে। শরীর জীর্ণশীর্ণ অবস্থা। পরনে ছেঁড়া কাপড়। সম্ভবত খাবার পড়ে গেছে ছেলেটার হাত থেকে। ছেলেটা কাঁদতে কাঁদতে জেদি স্বরে বলল,
“আমারে কিইন্না দেও। আমি খামু মা, ক্ষিধা লাগছে।”
বাচ্চাটার কথায় চোখ মুছলো মহিলাটি। হয়তো অভাবের কাছে নত হতে বাধ্য হচ্ছে এক মা। আযরানের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। মায়া হলো ভীষণ। নিজের ডেলিভারির ব্যাগের দিকে একবার তাকাল। তারপর পকেট হাতড়ে দেখলো কিছুক্ষণ। সকালের নাস্তার জন্য রাখা অল্প কিছু টাকা এখনও আছে। এক মুহূর্তও দেরি করল না সে। রাস্তার পাশের হোটেলে ঢুকে সেই টাকাতেই একটা ভাতের প্যাকেট কিনে এনে ছেলেটার হাতে ধরিয়ে দিল। খুশিতে চকচক করে উঠল ছেলেটার মুখশ্রী তা দেখে অজান্তেই ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি খেলে গেল আযরানের। মহিলাটা কৃতজ্ঞতা থেকে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো আযরানের। আযরান সামান্য হাসল। প্রশান্তি ছড়ালো শরীরজু্ঁড়ে। বৃদ্ধার নিষ্পাপ হাসিটুকু দেখে নিজের সমস্ত ক্লান্তি যেন ভুলে গেল আযরান। পরক্ষণেই ঘড়ি দেখে আঁতকে উঠল। তড়িঘড়ি করে উঠে বসলো সাইকেলে। সময়মতো খাবার পৌঁছে দিতে হবে। না হলে কাস্টমারের অভিযোগ, আর অভিযোগ মানেই চাকরিটা আরও অনিশ্চিত। প্রচণ্ড রোদের মধ্যে আবারও প্যাডেলে জোরে চাপ দিল। কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে অঝরে। শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী হয়ে আসছে।
কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ৩৭
তবুও থামল না। সামনে থাকা মোড়টা দ্রুত পার হওয়ার জন্য গতি আরেকটু বাড়াল। ঠিক সেই মুহূর্তেই বিপরীত দিক থেকে ছুটে এলো একটি বালুবোঝাই ট্রাক। আযরান কিছু বুঝে উঠার আগেই নিমিষেই বিকট শব্দে ট্রাকটার সঙ্গে সজোরে ধাক্কা খেল সাইকেলটা। চারপাশ যেন মুহূর্তেই থমকে গেল। কয়েক হাত দূরে ছিটকে পড়ল সাইকেলটা। মুহুর্তে আছড়ে পড়লো আযরানের শরীর। কয়েক সেকেন্ড নিরবতায় ছেয়ে গেল চারপাশ। পরমুহূর্তে ভেসে এলো মানুষের চিৎকার। ট্রাকচালক তড়িঘড়ি করে ব্রেক কষলেও ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে। ভিড় জমতে লাগল ধীরে ধীরে। রক্তের স্রোত বইতে শুরু করলো। চক্ষুদ্বয় নিভে আসার পূর্বে আযরান অস্পষ্ট কণ্ঠে শুধু একটাই শব্দ উচ্চারণ করল,
“আর্শি..”
