ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ১১
শানজানা আলম
সুবহানার সাথে ঐশি একজন এ্যাডভোকেটের সাথে দেখা করতে গেল। ওনার কাছ থেকে পুরো বিষয়টা জানা থাকলে ঐশির সুবিধা হবে।
চেম্বারে আরো ক্লায়েন্ট ছিল, ঐশি অপেক্ষা করতে করতে বলল, টেনশন লাগছে, একটা জব হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলে ভালো হতো।
সুবহানা বলল, এতদিন অপেক্ষা করতে পারবি, এমনিও একটা সময় লাগবে তো, সব মিটমাট হতে।
এ্যাডভোকেট নায়লা মতিন সময় দিলেন বেশ কিছুক্ষণ পরে।
সুবহানা বলল, ও আমার বান্ধবী, ও আসলে সেপারেশন চাচ্ছিল, বিষয়টা নিয়ে একটু জানতে চাই।
কি জানতে চান? সাধারণত তালাক হয় কাজী অফিসে, সেটা কি উনি দেবেন? নাকি ওনার স্বামী?
না ওই দিবে। ও থাকতে চাচ্ছে না।
আচ্ছা আপনি কথা বলুন, স্বামী কি খারাপ নাকি পরকিয়া আছে, নাকি মারধোর করে?
এডজাস্টমেন্টে সমস্যা- ঐশি বলল।
আচ্ছা, তালাকের বেশ কিছু ভাগ আছে, সাধারণভাবে যদি আমি বলি, তাহলে মোহরানা উসুল হয়ে গেলে আপনি আর কিছু পাবেন না। ভরণপোষণ বলতে ইদ্দতকালীন তিন মাসের খোরপোশ পাবেন। মোহরানা উসুল হয়েছে?কত ছিল মোহরানা?
দশ লাখ টাকা, ছয় লাখের গয়না দেওয়া হয়েছিল।
আচ্ছা। আপনার কি বাচ্চা আছে?
না।
আচ্ছা। বাচ্চা থাকলে বাচ্চার কাস্টডি বা খরচ নিয়ে সমস্যা হলে মামলা করতে পারতেন। এখন তো আপনিই থাকতে চান না। এটা আসলে আলোচনার বিষয়, আপনার স্বামী তালাক দিলে, মোহরানার বাকি টাকা পাবেন। এক্ষেত্রে কিছু বিষয় আছে,
১. মোহরানা (মহর)
মহর স্ত্রীর অধিকার — এটা বিয়ের সময় নির্ধারিত থাকে।
যদি মহর আগেই পরিশোধ করা না হয়ে থাকে, তাহলে তালাকের সময় পুরো মহর পরিশোধ করতে হবে।
মহর আংশিক দেওয়া থাকলে বাকি অংশ দিতে হবে।
তালাকের কারণে মহর বাতিল হয় না।
তবে:
যদি খুলা হয় এবং স্ত্রী নিজে থেকে বিচ্ছেদ চায়, অনেক ক্ষেত্রে স্ত্রী মহর ফেরত দেয় (সমঝোতা অনুযায়ী)।
২. ইদ্দতকালীন খোরপোষ
তালাকের পর স্ত্রীকে ইদ্দতকাল পর্যন্ত ভরণপোষণ (খোরপোষ) দিতে হয়।
এতে অন্তর্ভুক্ত:
খাবার
বাসস্থান
চিকিৎসা
প্রয়োজনীয় খরচ
সময়কাল:
সাধারণ তালাক হলে → প্রায় ৩ মাসিক সময়কাল
গর্ভবতী হলে → সন্তান জন্ম দেওয়া পর্যন্ত
৩. সন্তানের খরচ
যদি সন্তান থাকে:
সন্তানের ভরণপোষণ বাবার দায়িত্ব।
তালাক হলেও এই দায়িত্ব শেষ হয় না।
সন্তানের বয়স ও প্রয়োজন অনুযায়ী খরচ দিতে হবে।
৪. বাংলাদেশি আইন অনুযায়ী
বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী:
মহর পরিশোধ বাধ্যতামূলক।
ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ দিতে হয়।
সন্তানের দায়িত্ব বাবার।
তবে ইদ্দতের পর স্ত্রী নিজের জন্য খোরপোষ পাবে কি না — এটা মামলা ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে বা কোর্টের সিদ্ধান্ত লাগে।
সুবহানা বলল, আমার আপু তো পুরো টাকা পেয়েছে, মাসে মাসে খরচও পাচ্ছে।
-ওনার কি বাচ্চা আছে? -নায়লা মতিন জানতে চাইল।
-হ্যা, একটা ছেলে। ওর পড়ার খরচ বা বেশ ভালো অংকের টাকাই আপু পায়।
-সেটা বাচ্চার জন্য পায়। এক্ষেত্রে মেয়ে তালাক দিলে ছেলেপক্ষ কিছু নাও দিতে পারে।
বাংলাদেশে স্ত্রী যদি দাবি করে:
সে ফ্যামিলি কোর্টে মামলা করতে পারে।
আদালত উভয় পক্ষের আর্থিক অবস্থা যাচাই করে সিদ্ধান্ত দেয়।
অনেক ক্ষেত্রে সমঝোতাও হয়। সন্তানের ক্ষেত্রে আলাদা বিষয়
মা সন্তানের হেফাজতে থাকলে:
সন্তানের খরচ বাবাকেই দিতে হবে।
এটা স্ত্রীর ব্যক্তিগত খোরপোশের অংশ নয় — আলাদা অধিকার।
ওখান থেকে বের হয়ে ঐশি বলল, শুনলি?
সুবহানা বলল, তাহলে এমন কিছু কর যেন তালাকটা এহসান দেয়। সেটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। গয়নাগুলো সরিয়ে ফেলতে হবে।
ঐশি একটু ভেবে বলল, দেখি কি করা যায়!
ঐশির বিয়েতে দশ ভরির মত সোনায় গয়না ছিল, সাত ভরির গয়না এহসানের ফ্যামিলি থেকে দিয়েছিল, আর তিন ভরি ঐশির বাবা মা।
ঐশি অনেক চিন্তা করে ঠিক করল গয়নাগুলোকে সে পাল্টে ফেলবে, আর বলবে আগের গয়না খুঁজে পাচ্ছে না। আব্বা আম্মা ঢাকায় আসার আগেই ঐশি গয়নাগুলো নিয়ে একটা গোল্ডের দোকানে গেল। ছোট ছোট গয়না কিনলে রাখতে সমস্যা হবে, সে সব গয়না একচেন্জ করে একটা সীতাহার নিলো শুধু। এমনিতেও গোল্ড পরা হয় না৷
তারপরে বাসায় ফিরে আলমারি খুলে সব জামাকাপড় এলোমেলো করে ফেলে রাখল ড্রয়িংরুমের কয়েকটা শোপিস এলোমেলো করে মেঝেতে ফেলে ভাঙল। তারপর দরজা লক না করে বের হয়ে গেল।
এহসান বাসায় ফিরে দরজা খুলতে গিয়ে দেখল লক খোলা। ভেতরে ঢুকে সব এলোমেলো দেখে ঐশিকে ফোন করল।
ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ১০
ঐশি, তুমি কোথায়?
এই তো, আসছি।
বাসায় লক করে যাও নি?
কেন কি হয়েছে?
বাসায় চুরি হয়েছে।
মানে, কি বলছ তুমি? চুরি কেন হবে? আমার স্পষ্ট মনে আছে আমি লক করেছি।
এহসান শান্ত স্বরে বলল, বাসায় ফিরে এসো তাড়াতাড়ি।
