রাগে অনুরাগে পর্ব ৪৭
সুহাসিনি ফাতেহা
“সবাই তো শাড়ি পরিয়ে দেই, কিন্তু তোমার বর অন্যকিছু করার চেষ্টা করছে।”
রমণীর আজ লজ্জায় মরে যাওয়ার দিন। নরম তুলতুলে হাতদুটোর আঁজলায় নিজেকে আড়াল করার সে-কি অপ্রাণ চেষ্টা তার। কিন্তু তা-কি সম্ভব হয়? তার চিকন চিকন হাত দিয়ে আর কতটুকু-ই বা নিজেকে আড়াল করতে পারছে। তাও নিজ চেষ্টা থেকে একটু নড়বড়ে হচ্ছেনা লাজুকময়ী সপ্তদশী। এই অবস্থায় খাটের নিচে ঢুকে যেতে পারলে মন্দ হতোনা। অনুভব করল একদম সম্মুখে দাঁড়িয়ে ফারাজ। ধীরলয়ে ঝুঁকিয়ে আনছে তার পাহাড়সম বলিষ্ঠ দেহটা। তিতলি চোখ বন্ধ করে ফারাজকে ঠেলে সামনে এগোতে চাইল। তবে উপলব্ধি করলো ফারাজ একইভাবে দাঁড়িয়ে। নড়ছে না। কেন? তিতলিও দাঁড়িয়ে রইলো কাঠকাঠ হয়ে। সে ভয় পাচ্ছে নাকি লজ্জা, নার্ভাস ঠিক বুঝতে পারছেনা। কিন্তু কিছু একটা অদ্ভুত অনুভব করছে। খুব অদ্ভুত উত্তেজনা, ভালোলাগা, ভয়, সব মিলিয়ে জড়সড় হয়ে পড়েছে। গলার সুর সরু রাখার চেষ্টা করে ফারাজকে জিজ্ঞেস করলো,
“আপনি আমাকে এভাবে দেখছেন কেন?”
ফারাজের অভিব্যক্তি একটু বদলাল না। কেমন গা ছাড়া ভাব নিয়ে তিতলির শাড়ি পাশের সোফায় রাখল। যেন এখন তিতলির শাড়ি সমেত সবকিছু খুলে ফেললেও কিছুই আসবে যাবেনা তার।
ফারাজ কোনোরকম ওয়ার্নিং ছাড়াই এগিয়ে এসে বাম হাতে তিতলিকে নিজের সাথে চেপে ধরে। তিতলি হাঁসফাঁস করে উঠল। ফারাজকে দুহাতে ধাক্কা দিয়ে সরে আসতে চাইলো। ফারাজ ঘোরের মধ্যে থাকায় তিতলি একটু সফল হলোও বটে। তড়িগড়ি করে ত্রস্ত এক পা বাড়িয়েছে? ওমনি ঝড়ের গতিতে পেছন থেকে শক্তপোক্ত দুহাতের হেঁচকা টান পড়ল পাতলা কোমরে। তিতলি নিজের তাল হারিয়ে আবারও ঘুরে এসে ফারাজের কাছে চলে এলো। পুনরায় দু দেহের সংঘর্ষ হলো। এবার প্রখরভাবে। তিতলির তুলতুলে নরম উঁচু বুক ফারাজের উদোম দেহের সাথে মিশে একাকার। বড়বড় নিশ্বাসের সাথেসাথে বুক ক্রমাগত উঠানামা করছে। কোনো দুরুত্ব নেই দুজনের মধ্যে। ফারাজ মাথাটা সামান্য ঝুঁকিয়ে এনে তিতলির চুলে ঠোঁট ছুঁয়ে দিলে ফিসফিস করে শুধাল –
“কে বলছে আমি তোমাকে দেখছি?”
তিতলি চোখ মেলে তাকাল না। ফারাজের বুকের সাথে ওভাবেই মিশে রইলো। ফারাজের শরীরের পুরুষালি সুবাস নাকে আসতেই তার সব ছটফটানি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। অজান্তেই দুহাত চলে গেলো ফারাজের পিঠে, খামছে ধরে ধারালো নখ দিয়ে। কণ্ঠ খাদে নামল তার। জবাবটা আওড়ানোর মতো এল –
“আমি..আমি নিজের চোখে দেখলাম আপনি আমাকে দেখছেন।”
গালের ভাঁজে জিভ ঠেলে হাসছে ফারাজ। নিজের বুক থেকে তিতলির মুখটা তুলল সামান্য। কিন্তু ওভাবেই আগের ন্যায় চেপে ধরে রাখল। নিজ হাতের মধ্যমা ও তর্জণী আঙুল দিয়ে তিতলির পুরো মুখে স্লাইড করতে শুরু করল। তিতলি আবেশে দুচোখ বুঁজে নিলো। ফারাজের আঙুলের সুড়সুড়ি তিতলির কপাল থেকে ধীরলয়ে সরু নাকে নামল তারপর তা বেয়ে তুলতুলে নরম ঠোঁটে এসে থামল। তারপর তা চিবুক বেয়ে গলায়, গলা থেকে ধীরেধীরে বুকে নামল। যুবক থামল এবার। ডান হাতে তিতলির গাল আলতো করে স্পর্শ করে একপ্রকার দুষ্ট কন্ঠে ফারাজ বললো,
“ওহ রিয়েলি? তুমি নিজের চোখে দেখছো আমি তোমাকে দেখছি? শিওর? এখন কথা হলো আমি তোমার কি দেখছিলাম? বলো? আ’ম ওয়াটিং!”
লজ্জায় কেঁপে উঠল তিতলি। কিছু দেখেনি? তার দিকে তাকিয়ে থেকে এখন তাকে এসব বলা হচ্ছে? এখনও তো তাকে চেপে ধরে রেখেছে। শাড়ি খুলে দিয়ে তাকে দেখেছে? এসব কি দেখা না?
কম্পিত কণ্ঠে বলল,
“সবকিছু দেখছিলেন আমার। সব দেখার জন্য শাড়ি টেনে খুলে ফেলেছেন।”
ফারাজ চোখ ছোট করে আচমকা কোনোরুপ বলা-কওয়া ছাড়াই তুলোর সদৃশ রমণীর কোমরের নিচ বরাবর দুহাতে আকড়ে ধরে শূন্য তুলে নিলো উপরে। ঘটনাপ্রবাহে পা দুটো ভাসমান হয়ে গেল তিতলির। পরে যাওয়ার ভয়ে ফারাজের গলা জড়িয়ে ধরে দুপা দিয়ে আঁকড়ে ধরল ফারাজের পেটানো কোমর। ভড়কে উঠে কিছু বলতে মুখ খুলতে উদ্যোত। তার আগেই কর্ণকুহরে পৌঁছালো ফারাজের নিরুদ্বেগ কন্ঠসুর,
“নাতো? সবকিছু কই দেখলাম? সব তো কাপড় দিয়ে ঢেকে আছে? আমিতো শুধু তোমার মুখটা-ই দেখছিলাম।”
“কি দেখছিলেন আমার মুখে?”
ফারাজের জবাব এলো সময় নিয়ে,
“জানিনা।”
ফারাজ তিতলিকে শূন্য তুলে নেওয়ায় তিতলির বুক ফারাজের মুখের কাছে চলে এসেছে সহজে। ফারাজের ঘোর লেগে এলো। ক্ষনে ক্ষনে তৃষ্ণার্ত
পথিকের ন্যায় সিক্ত জিভ ঠেলে ভিজাচ্ছে অধর।
অস্থির হয়ে নাক দিয়ে ঘষতে লাগল নারী দেহের তুলতুলে নরম বুকেরভাঁজ।
তিতলির পুরো শরীর সুরসুর করে উঠল সহসা। ফারাজের নাক, ঠোঁটের ওমন বেসামাল স্পর্শে অনুভূতিরা সব জানালার ফাঁক দিয়ে পালিয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যেই। অস্বাভাবিক গতিতে বুক উপরনিচ উঠতে শুরু করল। এটা ফারাজকে আরও উত্তেজিত করে দিলো। সে তিতলিকে আরেকটুও উপরে তুলল এবার। পরক্ষণেই ব্লাউজের উপর দিয়েই ধারালো দাঁতের রুষ্ট ছোঁয়ায় চেপে ধরল তুলতুলে নরম বুকের খাঁজ। তিতলি কুঁকিয়ে উঠে ব্যথায় অর্তনাদ করে উঠে। উপায়ন্তর না পেয়ে তৎক্ষণাৎ ফারাজের শক্তপোক্ত বলিষ্ঠ বাহুতে ধারালো নখের আছড় বসিয়ে দিলো। ফারাজের শক্তপোক্ত বাহুতে নখের আছড় বসে গেলো মুহূর্তেই। এতেও ফারাজের মধ্যে কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। সে তো ব্যস্ত নিজের নারীর দেহের মাতাল করা স্মেল নিতে। পরপর আবারও একই কাজ করতে গেলো। তিতলি এবার দুহাতে ফারাজের চুল টেনে ধরে বললো,
“মু-মুখ নামান।”
“যদি না নামায়?”
“আপনার চুল টেনে ছিড়ে ফেলব।”
“কাজে ডিস্টার্ব করা পছন্দ নয় আমার।”
“দেখুন ভালো….”
সুযোগ সন্ধানি ফারাজ। চোখের সামনে এতবড় একটা সুযোগ পেয়ে থোড়াই হাত ছাড়া করবে সে? মুখটা তিতলির বুক থেকে সামান্য তুলে দৃষ্টিজোড়াতে গভীরতা নামিয়ে একবার আপাদমস্তক পরোখ করল বউকে। তিতলির কথা পথিমধ্যে টেনে নিয়ে নিজের ঢঙে উত্তর দিলো,
“ভালো করে দেখাতে চাও? তাহলে তো কোনো কথায় নেই। তুমি নিজ থেকেই দেখাতে চাইলে আমি কেন থোড়াই না করব? আমিও তো চাই সব দেখতে।”
হতভম্ব তিতলি। সে কি বলতে চাইছে সেটা পুরো না শুনেই কিসব বলছে এই লোক? মিনিট খানেক সময় লেগে গেলো বুঝতে। বুঝলো ইচ্ছে করেই তার সাথে এমন করছে। কন্ঠে ঝাঁঝ এনে আবারও একই বাক্য আওড়াতে লাগল,
“আমি বলছি দেখুন ভালো…”
“হুমম বললাম তো দেখব ভালো করে।”
“আমি বলছি দেখুন ভালো হবেনা বলে দিলাম। আপনি আমার কথা শেষ করতে দিচ্ছেন না কেন?”
“আমিও তো বলছি তোমাকে দেখলে খারাপ হবেনা। কজ তুমি আমার বিবাহিত স্ত্রী আর স্ত্রীকে দেখলে খারাপ হয়না বরং ভালোই হয় তাইনা?”
তিতলি তালগোল হারিয়ে ফেলল এবার। বোকার ন্যায় হতবিহ্বল ভাব ধরলো মুখবয়বে। এই লোকটাকে কিছু বলায় যেন তার ভুল। কথার জ্বালে তাকে ফাঁসিয়ে দেয়। তখন সে কি বলবে কিছুই বুঝতে পারেনা। এখনও হলো তাই।
অনেকসময় পর দুঃখিত গলায় বললো,
“সবাই আমাদের রেখে ঘুরতে চলে যাবে।”
“তো কি হয়েছে? আমরা বাইকে করে পরে যাবো।”
“আপনি এখানে বাইক পাবেন কোথায়? আপনার বাইক তো বাড়িতে।”
“সেটা নিয়ে তোমাকে চিন্তা করতে হবেনা। তোমাকে বাইক করে গোটা টাঙ্গাইল শহর ঘুরিয়ে আনার দায়িত্ব আমার। এখন শুধু আমার একটু কথা শুনবে তাহলেই হবে।”
তিতলির চোখমুখ উজ্জল হয়ে উঠলো। খুশির ঠেলায় ফারাজের কি কথা শুনতে হবে সেটা বেলামুল ভুলেই গেলো। তাকে যদি ঘুরিয়ে আনে তার জন্য সামান্য কথা শোনায় যায়। কিন্তু বেচারি কি জানে তার বিশুদ্ধ পুরুষ তাকে কি কথা শোনার কথা বলতেছে? না! ভাবলোই না একটুও, বললো,
“সত্যি গোটা টাঙ্গাইলে ঘুরাবেন? আমি আপনার সব কথা শুরতে রাজি বলুন কি কথা শুনতে হবে?”
“যা বলছো ভেবেচিন্তে বলছো তো?”
“একদম!”
চোখে হাসল ফারাজ। তবে মুখে কিছু না বলে হাত এগালো তিতলির ব্লাউজের ফিতায়। সময় নষ্ট না করে এক টান দিলো চিকন ফিতেয়। তিতলির চোখজোড়া কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসার যোগার তৎক্ষণাৎ। এত কষ্ট করে সে ফিতে বেধেছে কই তখন তো কেউ সাহায্য করেনি। এখন খুলতে চলে এসেছে। না এটা ভারী অন্যায়। প্রয়োজনে সে ঘুরবে না। ওনার সাথে যাবেনা। ঝিলিক আপুরা আছে। ফারাজকে কিল ঘুষি দিয়ে কোনোরকমে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো বেচারি। কোল থেকে নেমে পেটিকোট টেনেটোনে পেট ঢাকার চেষ্টা করছে। তারপর বললো,
“স্যরি, আপনার কথা শোনা ক্যান্সেল! আমি ওই সময় খুশির ঠেলায় মুখ ফসকে বলেছি। এখন হুঁশে ফিরে এসে বুঝলাম আপনার কথা শুনতে শুনতে রাত হয়ে যাবে তাও আপনার কথা শোনা শেষ হবেনা।”
ফারাজ আর কথা বাড়ালো না। তিতলির পানে শীতল দৃষ্টি নিক্ষিপ্ত করে বললো,
“শাড়ি পরতে জানো না?”
তিতলি মনমনে ভাবে, জানিনা বললে মনে হয় তাকে শাড়ি পরিয়ে দিবে। ঢং করতে জায়গা পায়না। বিয়ের প্রথম প্রথম শাড়ি পরার সময় শাশুড়ির কাছে যেত। গোসল করে পরতো ফারাজ কলেজে থাকতো দেখতোও না কে পরিয়ে দিয়েছে। জিজ্ঞেস ও করতো না এমনকি তার দিকে তো ভালো করে ফিরেও তাকাতো না, যে শাড়ি পরে তাকে কেমন লাগছে? শুধু ধমক আর খোঁচা মারা কথা ছাড়া কিছুই বলতে শোনিনি। সেসব কথা মনে করে তিতলি এখন নিজেনিজে হাসে। বুঝে না? একটু হলেও বুঝে সে ভাল্লুকের মনে জায়গা করে নিচ্ছে। একদিন ভালোবাসিও বলবে। কিন্তু এত লাগামছাড়া হয়ে গেলো কীভাবে? সেটা ভেবেই তার রাত-দিন যায়। বোকা মেয়েটা জানেনা তার এসব খোলামেলা হাঁটাচলা দেখে তার ফারাজ এমন লাগামছাড়া হয়ে গিয়েছে। মূলত বাধ্য করেছে লাগামছাড়া হতে।
তিতলিকে একমনে কিছু ভাবতে দেখে ফারাজ কোনো কথা না বলে নিজের মোবাইলটা পকেট থেকে বের করে ইউটিউবে গিয়ে সার্চ করে একটা শাড়ি পরানোর ভিডিও অন করলো। তারপর সেটা টেবিলে রেখে সোফা থেকে শাড়িটা হাতে নিলো। তিতলি অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছে ফারাজের কার্যকলাপ। সত্যি তাকে শাড়ি পরিয়ে দিবে নাকি? ফারাজ তিতলির সামনে দাঁড়িয়ে বললো,
“সোজা হয়ে দাঁড়াও?”
তিতলি কথা শুনলো। সোজা হয়ে দাঁড়াল সে।
প্রথম শাড়ির পেঁচ টুকু দিলো তিতলি নিজেই দিলো। বাকিটা ফারাজ ভিডিও দেখতে দেখতে পরানো শুরু করল। কুঁচি গুছাতে গিয়ে ফারাজের চোখ হঠাৎ তিতলির গোল নাভিতে আটকে গেল। ঘোরলাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। ফর্সা মসৃণ পেটের সৌন্দর্য যেন এই নাভি একাই কেড়ে নিচ্ছে। ঢোক গিলে ফারাজ। শাড়ির কুঁচিগুলো হাতে ধরে মাতাল কন্ঠে বলে উঠলো,
“ওটা কি?”
“ককোনটা?”
ফারাজ খুব ভালো করেই বুঝলো যে তিতলি “ওটা কি” তার মানে বুঝেছে। তাও কোনটা বলে তাকে জ্বালাচ্ছে। কথা বাড়াচ্ছে। বুঝলো তার মুখে শুনতে চাই ক, খ করে বুঝাবে না সে? এমনিতে সে অনেক কষ্টে নিজেকে কন্ট্রোল করে রেখেছে। তিতলির কথা শুনে ফিসফিসিয়ে শুধালো,
“বৃত্তের মতো দেখতে কিন্তু গভীর। ”
“আপনি আমাকে শাড়ি পরাচ্ছেন নাকি গনিত বইয়ের জ্যামিতি করাচ্ছেন?”
“জ্যামিতি করাচ্ছি না তবে নিজস্ব ফ্যাক্টরির গভীরতা দেখছি।
“আপনি আমাকে শাড়ি পরানো লাগবে না সরুন তো।”
“আমিতো শাড়ি খুলেই দিয়েছিলাম। তবে তুমি চাইলে…”
“আমি কিছু চাইনা।”
তিতলি একটু থামল ঢোক গিলে নেওয়ার জন্য। পরপর আবার বললো,
“আপনি কি জানেন? আপনি দিনদিন অসভ্যতামির মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন?”
“বউয়ের কাছে পুরুষদের অসভ্য-ই হতে হয়। তাছাড়া আমি সভ্যই ছিলাম প্রথমে, তুমি নিজেই আমাকে অসভ্য হতে বাধ্য করেছ। বারবার ওয়ার্নিং দেওয়া সত্ত্বেও আমার সামনে এলোমেলো হয়ে এসেছ।”
তিতলি মুখ ভেংচি কাটল। সরু নাকের ডগাটা সামান্য ফুলিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিলো। তাকে কি এভাবে ছোঁয়ার জন্য আর লাগামছাড়া কথা বলার জন্যই একটু কেয়ার করে? ভালোবাসেনা তাকে? তবে সেটা মুখে বললনা মনের কথা মনেই থেকে গেল। সে-কি কম বলেছে ভালোবাসার কথা? কখনও তো উত্তর পায়নি। তাই আর জিজ্ঞেস করবেনা। একদম করবোনা।
শুধু গাল ফুলিয়ে বলে,
“এখন সব আমার দোষ?”
ফারাজ তিতলির কথার জবাব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা না দেখিয়ে কুঁচি ঢুকাতে গেলো। তিতলি বুঝতে পেরে ফারাজের হাত ধরে আটকে দিলো। ফারাজ চোখ ছোট করে তাকাতেই তিতলি নিজের কুঁচি ঢুকানো জায়গাটা দুহাতে ঘুরে রেখে জবাব দেয়,
“আমি ঢুকাতে পারবো।”
ফারাজের ত্যাড়া জবাব,
“শাড়ি যেহেতু প্রথম থেকে আমিই পরিয়েছি এটাও আমি করবো নয়তো সবটা খুলে দিতে এক সেকেন্ড সময় লাগবেনা আমার।”
ফারাজের নিরব হুং’কার। তিতলির করার কিছু নেই, ফারাজ ওভাবেই তিতলির কুঁচি ঢুকালো। তিতলি বরফের মতো জমে গিয়ে তাকিয়ে ছিল জীবন্ত মূর্তির মতো । ফারাজ সম্পূর্ণ শাড়ি খুব মনেযোগ দিয়ে পরানো শেষ করল। তিতলি আয়নায় সামনে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকে। এত সুন্দর করে শাড়ি পরিয়েছে তা ছাড়া হালকা রঙা ঝড়ির কারুকাজ করা শাড়িটা তার ফর্সা শরীরে দারুন মানিয়েছে। দুপুরের মধ্যেই ফারাজ শাড়ি, চুরি, কানের দুল,গলার চেইন, জুতো, এক সেট কম্বো কিনে এনেছে তিতলির জন্য। এখানে তো কোনো শাড়ি আনা হয়নি। তিতলি আবদার করেছে সবাই নাকি শাড়ি পরে যাবে তাই সেও পরতে চাই। এখন শাড়ি পরেও ফেলল অবশেষে। যে কেউ তাকিয়ে থাকবে এই রুপে। তিতলি ফারাজকে মৃদুস্বরে বললো,
“কেমন লাগছে আমায়?”
ফারাজ চোখের সামনে লতানো শরীরের নারীটিকে গভীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছে এক ধ্যানে। তর্জণী আর মধ্যমা দুটো একত্রে কপালের উপর বোলাতে বোলাতে মোহাবিষ্ট নয়নে দেখে চলেছে সিক্ত রমণীর প্রতিটি আবেদনময়ী ঢং। কখনো তার আনমনা স্নিগ্ধ হাসি কখনো বা আয়নায় তাকিয়ে ছোট্ট ছোট্ট হাতে এলোমেলো চুল ঠিক করে কানের পিঠে গুঁজে দিচ্ছে। দেখতে দেখতেই অভিব্যক্তি পাল্টে গেলো ফারাজের। গম্ভীরতা ছাপিয়ে দু’চোখে জড়ো হলো অপার মুগ্ধতা। সময় নিয়ে গভীর গলায় বললো,
“ভালো।”
“শুধু ভালো?”
“এখন আবার তোমাকে এলোমেলো করতে ইচ্ছে করছে।”
ফারাজের ঘোরলাগা কন্ঠসুর। কথাটুকু বলে ধুপধাপ পা ফেলে তক্ষুনি রুম থেকে বেরিয় গেল। মেয়েটার এত সাজগোজও তার সহ্য হয়না। এখন বাইরে নিয়ে গেলে মানুষ দেখবে আর সে ছুঁতেও পারবেনা। ভাবতেই ইচ্ছে করছে শাড়ি খুলে দিতে এলোমেলো করে দিতে। আশ্চর্য ব্যাপার স্যাপার!
সময় চারটা বাজে ঘড়িতে।
ইতিমধ্যেই সবাই ঘুরতে যাওয়ার জন্য রেডি। ঝিলিক,আয়েশা ও শাড়ি পরেছে। সাথে হাশেম আলীর মেয়ে ময়না, কাশেম আলীর মেয়ে পলিও যাচ্ছে। তিতলি আগে আগে বেরিয়ে সবার সাথে বাইরে চলে এসেছে। শাড়িটা ভালোভাবে জড়িয়ে নিয়েছে। ফারাজ এমনভাবে পরিয়েছে যে কোনো জায়গা দিয়ে পেট পিঠ দেখা যাবে তার বালাই নেই। নিধিও এসেছে সে একটা নেভিল্লু রঙা শাড়ি পরেছে। তিতলিকে দেখেই বলে উঠলো,
“মাশাআল্লাহ বেইবি আগুন সুন্দবী লাগছে তোকে।
তোকেও সুন্দর লাগছে।
শাড়িটা কে পরিয়ে দিয়েছে?
তিতলি এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখল কোথাও ফারাজ নেই। ভালোই হয়েছে। ফারাজের মোবাইলও তার কাছে। তাকে এখনো মোবাইল কিনে দেইনি। তাই ফারাজের মোবাইল নিয়ে নিয়েছে। তার নাকি মোবাইল ব্যবহার করা লাগবেনা। যে মোবাইল হাতে নিয়ে বসে থাকে তাও
ফারাজের কল রিসিভ না করে ইগনোর করে সে মোবাইল তিতলি ব্যবহার করতে পারবেনা। না কিনে দিলে নাই তিতলি এখন থেকে এটা দখল করে নিবে। দামও লাখের উপরে হবে। ওনি একটা কিনুক। তিতলির কি? অনেক ভাবনাচিন্তা করার পর নিধিকে ভাব নিয়ে বললো,
আমি পরেছি। কেন রে? সুন্দর হয়নি?
মিথ্যা বলছিস তুই,এত সুন্দর করে শাড়ি পরতে জানিস না।
তিতলি মোবাইলটা ক্রসবডি ব্যাগ থেকে বের করলো। স্ক্রিনে ফারাজের একটা ছবি। ফেসবুকেও এটা দিয়ে সেভ করা। কে জানি এই পিকে কি পায়। বাট..বাট তিতলির কাছেও ভালো লাগে পিকটা। লক খুলে একটা পিক তুলতে তুলতে বলে,
“তুই পরিয়ে দিয়েছিস মনে হয়।”
“কিহহ আমি? ”
“তাহলে বলছিস যে আমি মিথ্যে বলছি।”
“তুই তো শাড়ি পরতে জানিস না তাই বলছি।”
তিতলি আফসোসর সুরে নিধিকে বললো,
“বিয়ে হয়ে গেলে মেয়ে মানুষ সব শিখে যায় আমিও শিখে গেছিরে।”
ঝিলিক তুষারকে ভিডিও কল দিলো। তুষার অফিসে বসে এই বিকেল টাইমে। আজকে অফিসে অনেক প্রেসার। তাছাড়া বাবার অফিসের পাশাপাশি সেও একটা অফিস খুলেছে। দুটাতেই সময় দিতে হয়। আজকে জুরুরী মিটিং থাকায় দেরি হয়ে গেছে। ঝিলিকের কল আসায় ঠোঁটের কোণে ফুঁটে উঠলো হাসি। ভিডিও কল রিসিভ করতেই তুষারের পিএ সানভি দরজা খোলে ভেতরে ঢুকলো। দুইটা ফাইল টেবিলে রেখে বললো,
“স্যার ফাইল গুলো চেক করে এনেছি। দেখে নিন।”
“যাও।”
সানভী তুষারের বলার পরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। তুষার আবার কিছু বলতে নিলে থেকে চলে গেলো। ২২ বছরের যুবতী সানভী। কিছুদিন ধরে তার আচার আচারণ স্বাভাবিক লাগছে না তুষারের কাছে। যত দ্রুত সম্ভব নতুন পিএ আনতে হবে। আর সেটা ছেলে।
ঝিলিক ওপাশ থেকে সব শুনলো। প্রায় সময় মেয়েটার কথা শুনে তুষারের সাথে কথা বলার সময়। এটা নিয়ে তাদের মধ্যেও মান অভিমান হয়। ঝিলিক এখন কথা বলবেনা। কেন বলবে? সে কল দিয়েছে সকাল থেকে। কোনো কল রিসিভ করেনি। এখন কল ধরে কথা বলছেনা। সে একদম বলবেনা। কল কেটে দিলো। আবার তুষারের থেকে কল এলো। ঝিলিক রিসিভ করে বললো,
“আমি কল দিয়েছি মনে হয় ভুলে গিয়েছিলেন? যান ঠিকাছে আপনার পিএ সাথে কথা বলুন। আমার কি?”
“তুমি কি আমাকে সন্দেহ করছো?”
“না। সন্দেহ করবো কেন?”
“তিতলি কোথায়? ওর মোবাইলে কল ঢুকছেনা কেন?”
“মোবাইল নাকি নষ্ট হয়ে গেছে।”
“আমি টেনশন করছিলাম।
একটু দেখে রেখো ওকে। আম্মু আব্বু টেনশন করছে।”
“আপনি চিন্তা করবেন না। ফারাজ ভাইয়া তো আছেই তিতলিকে দেখে রাখার জন্য।”
তুষারের অত্যন্ত শীতল কন্ঠ ভেসে এলো ওপাশ থেকে,
“ভিডিও কল দাও তোমাকে দেখব ঝিলিক।”
ঝিলিক শাড়ি পরেছে। প্রথমে ভিডিও কল দিলেও সামনে যায়নি। ভেবেছিলো তুষার কথা বললে তারপর যাবে সামনে। কথা না বলায় তো সেটা কেটে দিয়েঝে। এখন ভিডিও কল দিতে বলায় বুকটা কেঁপে উঠল সহসা। চুপ হয়ে থাকল কিছুক্ষণ ওপাশ থেকে তুষারের অধৈর্য হয়ে বললো,
“রাগ করে আছো এখনো? আমি ব্যস্ত ছিলাম বোঝার চেষ্টা করো। এখন ভিডিও কল ধরো নয়তো মনটা ছটফট করবে দেখার জন্য। ট্রাস্ট মি আর কখনো ব্যস্ত থাকব না তোমার জন্য।”
ঝিলিক আর রাগ করে থাকতে পারল না। ভিডিও কল দিলো তুষারকে। দুজনের দুষ্টমিষ্টি কথা চলল
দু কপোতকপোতির।
গাড়িতে উঠবে এখন সবাই। তিতলিও প্রস্তুত গাড়িতে উঠবে। সে যে গাড়িতে উঠবে সে গাড়িতে মেয়েরা সহ ড্রাইভার সীটে আলভী আর ফরহাদ আছে। রীতিমত ভুলেই গিয়েছে ফারাজ তাকে বাইকে করে নিয়ে যাবে কথাটা। তিতলি তাও ঘুরে ঘুরে দরজার দিকে তাকাচ্ছে যেন বাড়ির ভেতর থেকে কারো আসার অপেক্ষা করছে। ওই পাশে কালো বাইকও একটা দেখল। ওদিকে ঝিলিক নিধি জোর করছে তিতলিকে গাড়িতে উঠার জন্য। আলভী বললো,
“কি ব্যাপার ভাবি উঠবেন নাকি গাড়ি স্টার্ট দিবো?”
“ও তোদের সাথে যাবেনা।”
আলভীর কথার মাঝেই এগিয়ে আসতে আসতে গম্ভীর কন্ঠে ফারাজ বললো কথাটা। তিতলি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। ফারাজ ক্যাজুয়াল ড্রেসআপে রেডি হয়েছে। তিতলি হা করে তাকিয়ে থাকে।
আমাদের সাথে যাবেনা মানেকি? ভাবি আসেন আমাদের সাথে। গাড়িতে গান চলবে। বাইকে চলবেনা।
তিতলি একবার ফারাজের দিকে তাকাল আরেকবার আলভীদের দিকে। গাড়িতে সবাই আছে। তিতলির ভাবনার মাঝেই ফারাজ ওপাশ থেকে বাইকটা আনতে আনতে মনেমনে বলে,
বাইকে গান না চললেও অন্যকিছু চলবে।
বাইকটা নিয়ে তিতলির সামনে এসে আলভীকে রাগ দেখিয়ে বললো,
“তোরা যাবি?”
রাগে অনুরাগে পর্ব ৪৬
তিতলি দুহাত বুকে গুঁজে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিনেমা দেখছে। সে তো অবশ্যই ফারাজের সাথে যাবে। কিস্তু সেটা সবার সামনে বলতে পারছেনা। কি ভাববে? অত্যন্ত এটুকু বুঝ তার হয়েছে। কিন্তু তার ভাবনার মাঝেই আলভি গাড়ি স্টার্ট দিয়েছে। বলা তো নেই আর কিছু কথা বলতে গেলে তাদের গাড়ির কাঁচ ভেঙে দিয়ে বলবে তোদের যাওয়ার দরকার নেই। তাই আগেভাগেই বিপদ মুক্ত হয়ে চলে গেলো। যার বউ তার সাথেই যাক।
ফারাজ একটা হ্যালমেট তিতলির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে নিজেও বাইকে বসলো। নিদারুন সুরে ডাকল বউকে,
“উঠো!”
