Home অবেলায় ফোঁটা পুষ্প অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৪৬

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৪৬

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৪৬
রুপা

পুষ্প রুমে এসে দেখল, আর্য রুমে নেই। চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখল, না—আর্য কোথাও নেই। তখনই দেখল ওয়াশরুমের দরজা বন্ধ, পানি পড়ার মৃদু শব্দ ভেসে আসছে। পুষ্প সেদিকে একপলক তাকিয়ে বারান্দার দিকে ছুটে গেল। সেখানে আপন মনে খেলছে তুলি ও তুলতুল। পুষ্প গিয়ে মেঝেতে পা ভাঁজ করে বসল এবং খরগোশের ছানা দুটোকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করতে লাগল। খরগোশ দুটোও চুপচাপ সাদরে সেই আদর গ্রহণ করতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর আর্য শাওয়ার শেষ করে ওয়াশরুমের দরজা খুলে বেরিয়ে এল। পরনে সাদা ট্রাউজার আর অলিভ কালার টি-শার্ট; বলিষ্ঠ দেহের ভাঁজে ভাঁজে লেগে থাকা ফর্সা গায়ের রংটায় এক অদ্ভুত সৌন্দর্য ভিড় করেছে। চুলগুলো ভেজা, কপালের সাথে লেপ্টে আছে; চুলের ডগা থেকে চুইয়ে চুইয়ে পানি পড়ছে, যেটা গড়িয়ে গলা বেয়ে বুকে গিয়ে টি-শার্ট ভিজে যাচ্ছে। আর্য বিছানা থেকে টাওয়াল নিয়ে মাথা মুছতে লাগল। এদিকে বারান্দার দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা পুষ্প যখন দেখল আর্য নিজে নিজে চুল মুছছে, তখন রমণীর মুখ কালো মেঘে ঢেকে গেল! এতদিন তো তাকে চুল মুছে দিতে বলত সে, ঘুমিয়ে থাকলেও ডেকে তুলত শুধু চুল মুছে দেওয়ার জন্য—তাহলে এখন কেন তাকে ডাকল না? তবে কি সত্যি সত্যি সরকার সাহেব আগের মতো হয়ে যাবেন?

অন্যদিকে আর্য পুষ্পর উপস্থিতি টের পেয়েও কিছু বলল না, পিছন ফিরেও তাকাল না। নিজের প্রয়োজনীয় ম্যানলি-সানস্ক্রিন, ময়েশ্চারাইজার ইউজ করে রুম থেকে এমনভাবে বেরিয়ে গেল, যেন পুষ্পর কোনো অস্তিত্বই ছিল না সেখানে! আর্য চলে যেতেই রমণীর চোখ টলমল করে উঠল। অকারণেই চোখ দিয়ে অবিরাম ধারায় পানি পড়তে লাগল। ধরা গলায় সে ফিসফিস করে বলল—
– “আপনি আবার পাল্টে গেছেন, সরকার সাহেব! আপনি এমন কেন? আমার কাছে এসে ভালোবেসে আদর-যত্ন করেন, আবার যখনই আমি ভাবি এই বুঝি সব ঠিক হয়ে গেছে, আপনি আর দূরে যেতে বলবেন না—তখনই আবার আপনি দূরে চলে যান! দূরে যাওয়ারই যদি হবে, তাহলে কাছে আসেন কেন?”
বলতে বলতে হেঁচকি তুলে কাঁদতে লাগল সে। সে তো বলেছিল বাড়িতে আসবে না, সে থাকবে সরকার সাহেবের সাথে—তাহলে এখন নিজে বাড়িতে নিয়ে এসে কেন তার সাথে কথা বলছেন না?

আর্য নিচে এসে স্নিগ্ধর পাশে বসল। আর্য বসতেই স্নিগ্ধ ফিসফিস করে বলল—
– “আর্য, পুষ্প কোথায়?”
স্নিগ্ধর কথা শুনে আর্যর ভ্রু কুঁচকে গেল। সে গম্ভীরভাবে বলল—
– “নট পুষ্প! কল হার ভাবি!”
স্নিগ্ধ নিজের কথা শুধরে নিয়ে বলল—
– “ওকে, ওকে ভাবি! এখন বল, ভাবি কোথায়?”
– “বিয়ে করবি তুই সিমরানকে, আমার বউয়ের সাথে তোর কী দরকার?”
– “আরে ভাই, অনেক দরকার! তোর বউ ছাড়া আমি বউ পাবো না!”
স্নিগ্ধর কথা শুনে আর্য কী বুঝল কে জানে! হুশিয়ারি দিয়ে বলে উঠল—
– “একদম আমার বউয়ের দিকে চোখ দিবি না! চোখ তুলে নেব আমি। ভুলে যাবো তুই একবার আমার ফ্লাওয়ারকে বাঁচিয়েছিলি।”
কথাটা বলে যেভাবে এসেছিল, ঠিক সেভাবেই আবার ওপরে চলে গেল। এদিকে আর্যর এমন রিঅ্যাকশন দেখে স্নিগ্ধ তো নিজের মুখ থেকে কী বলতে চেয়েছিল, সেটাই ভুলে গেল! বাকরুদ্ধ হয়ে সে তাকিয়ে রইল আর্যর যাওয়ার পথের দিকে। আর্যর দৃষ্টি সীমার বাইরে যেতেই তার হুঁশ ফিরল; বড়দের দিকে একপলক তাকিয়ে সে আবার মাথা নিচু করে রাখল।

সে এখানে আসতে চায়নি, ছোটমা জোর করে তাকে নিয়ে এসেছে। স্নিগ্ধ বাড়িতে থাকে না, তাই রেশমা স্নিগ্ধর বিয়ে দিয়ে তাকে পাকাপোক্তভাবে বাড়িমুখী করতে চান। বাইরে কোনো মেয়ে না খুঁজে ভাইয়ের মেয়ে সিমরানকেই স্নিগ্ধর বউ করে নিয়ে আসতে চান তিনি। কিন্তু কেউ না জানলেও স্নিগ্ধ জানে, তার অলরেডি একটা বউ আছে! একটু ঘাড়ত্যাড়া হলেও সে তার বউকে অনেক ভালোবাসে। সে আছে তার বউয়ের জ্বালায়—বউকেই মানাতে পারছে না, আবার সে করবে বিয়ে! নিশির এক্সিডেন্টের দিন কলেজে সারার সাথে তার কথা হয়েছিল; সেদিন তার বউ বেজায় চটেছিল তার ওপর, তাকে যা-নয়-তাই কথা শুনিয়েছিল। কিন্তু সে কিছু বলবে তার আগেই নিশির এক্সিডেন্টের খবর পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে হাসপাতালে ছুটেছিল সে, তারপর আর বউয়ের সাথে দেখাও হয়নি, কথাও হয়নি। এতে নিশ্চয়ই বউ ভীষণ খুশি হয়েছে যে সে তার পিছু ছেড়েছে!
সে চাইলে এখনই সবাইকে বলে দিতে পারে যে তার বিয়ে হয়ে গেছে, একটা বউও আছে তার। কিন্তু সে তা করবে না! এই বিয়ের সুযোগ নিয়ে যদি বউটাকে নিজের করে নেওয়া যায়, ক্ষতি কী? আর তার জন্য বউটাকে এই বাড়িতে আনতে হবে, আর সেটা পারবে একমাত্র পুষ্প! সেটার জন্যই সে পুষ্পকে খুঁজছিল। কিন্তু আর্য কী না কী বুঝল! সে নাকি তার বউয়ের দিকে চোখ দিচ্ছে! মাথা খারাপ নাকি তার? নিজের বউ থাকতে সে কেন আরেকজনের বউয়ের দিকে চোখ দিতে যাবে? আল্লাহ কি তার পাপ দেবেন না।
বড়রা সবাই কথা বলে বিয়ের দিন ঠিক করলেন আর দশ দিন পরে, শুক্রবার। তারপর সবাই খাওয়া-দাওয়া শেষ করে আরও অনেকক্ষণ গল্প করে। রাত দশটার দিকে রেশমার শ্বশুরবাড়ির সবাই সরকার বাড়ি থেকে বিদায় নেয়। ওনারা সবাই যাওয়ার পরে সরকার বাড়ির সবাইও যে যার ঘরে চলে যায়।

সরকার বাড়ি পুরো নিঝুম, শান্ত। রাত বাজে বারোটা—যে যার রুমে ঘুমিয়ে আছে, ঘুম নেই শুধু দুই রমণীর চোখে। সিমরান নিজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে; বাইরের ঠান্ডা বাতাস তার মনের জ্বালা কমাতে ব্যর্থ হচ্ছে। তার বুক পুড়ছে প্রিয় পুরুষের ভালোবাসা না পাওয়ার দহনে, যেন বুকে কেউ দেশলাই কাঠি দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে! কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানি বোধহয় শুকিয়ে গেছে, তাই তো আর চোখ দিয়ে পানি পড়ছে না। চোখের নিচে শুকিয়ে যাওয়া পানির দাগ তার প্রমাণ।
অদ্ভুত শূন্যতা গ্রাস করছে রমণীর তনু-মন। দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে সে ভাবতে লাগল ইভানের শেষ কথাগুলো! তার কানে বারবার প্রতিধ্বনি হচ্ছে ইভানের সেই কথাগুলো—“আমাকে ভুলে নতুন জীবন শুরু করো, দেখবে দুইদিন গেলে এমনিতেই ভুলে যাবে।” তারপর, কাউকে ভালোবাসে কি না—তা জিজ্ঞেস করায় সেই নীরব সম্মতি। যদি লোকটা অন্য কাউকে ভালো না বাসতো, তাহলে সিমরান হয়তো হাল ছেড়ে দিত না! প্রাণপণ চেষ্টা করত ইভানের ভালোবাসা পাওয়ার জন্য, তাতে যতদিন লাগে লাগতো। কিন্তু যে অন্য কাউকে ভালোবাসে, তার ভালোবাসার আশা কীভাবে রাখবে সিমরান? যেই ভালোবাসা অন্যের জন্য বরাদ্দ, সেই ভালোবাসা নিজের ভাগে আনবে কীভাবে?
ইভানের প্রতি সিমরানের কোনো অভিযোগ নেই, কারণ ভালোবাসা তো আর জোর করে হয় না! সে লোকটার জন্য যেটা ফিল করে, লোকটা তার আগে থেকেই আরেকজনের জন্য ফিল করে—এতে দোষের কিছু নেই। এখন রমণীর অভিযোগ নিজের ভাগ্যের ওপর, ওপরওয়ালার ওপর আর নিজের ওপর—কেন সে লোকটার জীবনে আরও আগে আসেনি? আল্লাহ কেন লোকটার বাঁ পাজরের হাড় দিয়ে তাকে তৈরি করলেন না? এখন যে তার মন পুড়ছে, ভীষণ বাজেভাবে পুড়ে ছাই হচ্ছে, লোকটার দহনে জ্বলছে ভেতরটা—এই জ্বালা কাকে দেখাবে রমণী? এরকম দমবন্ধ করা অনুভূতির সাথে কেন পরিচয় করাল লোকটা?

– “ভুলতে চাইছি আপনাকে, কিন্তু ভোলা কি এতই সহজ, যতটা আপনি বলেছিলেন? বলেছিলেন তো কদুইদিন গেলেই ভুলে যাবো—কই, দুইদিন পার হয়ে আরও সাত ঘণ্টা পার হতে চলল, ভুলতে তো পারিনি! যত ভুলতে চাইছি, তত আরও পরিষ্কার হয়ে ধরা দিচ্ছে আপনার স্মৃতি। আপনাকে ছাড়া অন্য কাউকে ভালোবাসতে চাই না আমি। ভালো যখন বাসবেন না, তাহলে আমার মনে ভালোবাসার ঝড় তুললেন কেন? কেন এই ‘কেন’-র জবাব দিতে পারবেন আপনি?”
কথাগুলো ফিসফিস করে বলতে বলতে আবার ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল রমণী—বিষাদে ভরা এক হাসি, ভাঙা মনের প্রতিফলন যেন সেই হাসি! বিষাদময় কণ্ঠে সে আবার ফিসফিস করে নিজে নিজেই জবাব দিল—
– “পারবেন না! কারণ আপনাকে ভালোবাসার দায় সম্পূর্ণ আমার, সেই ভালোবাসার দায় আপনার নয়। তাই তো সেই ‘কেন’-র জবাব দিতেও আপনি বাধ্য নন; আপনি তো বলেননি আমাকে ভালোবাসতে!”

অস্থির হয়ে রুম জুড়ে পায়চারি করছে পুষ্প। আর্য এখনো রুমে আসেনি; রাত যত গভীর হচ্ছে, রমণীর মন চেয়ে যাচ্ছে অজানা অভিমানের কালো মেঘে। স্নিগ্ধরা যাওয়ার আগেই আর্য বেরিয়ে গিয়েছিল, তারপর থেকে আর আর্যর দেখা নেই। এদিকে আর্যর দেখা না পেয়ে পুষ্প ছটফট করছে পানি ছাড়া মাছের মতো! রাতে খেতেই পারেনি; গত কয়েক দিনে যেন অভ্যেস হয়ে গেছে আর্যর হাতে খাবার খাওয়ার। তাই তো না খেয়েই ওপরে চলে এসেছে সে।
রমণী অস্থির হয়ে এদিক-ওদিক হাঁটতে হাঁটতে একবার দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে, তো আরেকবার দরজার দিকে—এই বুঝি আর্য আসবে! কিন্তু রমণীর অপেক্ষা যেন শেষ হওয়ার নামই নিচ্ছে না। এভাবে আরও এক ঘণ্টা কেটে যায়। আর্যকে আসতে না দেখে একরাশ মন খারাপ আর অভিমান নিয়ে সে সোফায় শুয়ে পড়ল। থেকে থেকে মেয়েটার শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে—বোঝাই যাচ্ছে, সে কাঁদছে! কাঁদতে কাঁদতে একসময় রমণী ঘুমিয়ে পড়ে।
পুষ্প ঘুমিয়ে পড়ার কিছুক্ষণ পরেই আর্য রুমে আসে। সবার প্রথমে তার চোখ যায় সোফায় মুখ ফিরিয়ে শুয়ে থাকা পুষ্পর ওপর। কোনো কিছু না ভেবেই সে সেদিকে এগিয়ে গেল এবং আলতো হাতে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিয়ে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিল। তার চোখ গিয়ে পড়ল রমণীর মুখের দিকে—চোখের পাপড়ি এখনো ভেজা, একটার সাথে আরেকটা লেপ্টে আছে, পানি শুকিয়ে দাগ পড়ে গেছে! সেটা দেখে শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল আর্য। মেয়েটার মাথার কাছে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে সে রমণীর কপালে সময় নিয়ে চুমু দিল। সেভাবেই ফিসফিস করে বলল—
– “আমায় ছাড়া ছটফট করছ, কাঁদছ—তবুও আমার কাছে আসছ না কেন, ফ্লাওয়ার?”

আজানের ধ্বনি কানে আসতেই পুষ্পর ঘুম ভেঙে যায়। উঠে বসতেই নিজেকে বিছানায় আবিষ্কার করে পুষ্প বুঝতে পারে না সে বিছানায় কীভাবে এল! ভাবনাটা মাথায় আসলেও বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না, সেখানে জায়গা করে নিল আর্য নামক পুরুষটা।
চোখ বুলিয়ে দেখল, রুমে আর্য কোথাও নেই! তাহলে কি সে রাতেও আসেনি? আবার মন খারাপ হলো রমণীর। দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, পাঁচটা বাজতে আর তেরো মিনিট বাকি। পুষ্প উঠে বিছানা গুছিয়ে রাখল, তারপর কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। গোসল সেরে বেরিয়ে এল পরনে লাল রঙের একটা থ্রি-পিস। ফর্সা গায়ে যেন লাল রংটা আরও ফুটে উঠেছে! কোমরের নিচ অব্দি চুলগুলো থেকে টপটপ পানি পড়ছে, কয়েকটা ভেজা চুল মুখে লেপ্টে আছে—নামের মতোই যেন স্নিগ্ধ, শুভ্র, সদ্য ফোটা এক পুষ্প!
বারান্দায় গিয়ে ভেজা কাপড় মেলে দিল সে, তারপর ফজরের নামাজ আদায় করে নিল। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করল সবকিছুর জন্য। আর্য নামক পুরুষটার জন্য চাইতে চাইতে সে নিজের জন্য চাওয়ার কথাই ভুলে বসল! নামাজ শেষ করে জায়নামাজ যথাস্থানে রেখে দিয়ে তোয়ালে নিয়ে চুলগুলো মুছতে লাগল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকাতেই আবার চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল ফার্মহাউসে কাটানো আর্যর সাথে সুন্দর মুহূর্তগুলোর ছবি। ওই বাড়িতে থাকাকালীন আর্য পুষ্পর চুল নিজে মুছে দিত, নিজের হাতে খাইয়ে দিত, পুষ্পকে কিচেন ক্যাবিনেটের ওপর বসিয়ে দিয়ে রান্না করত! আর এই বাড়িতে আসার পরে দেখা পাওয়া ও দুস্কর। সবকিছু ভেবে রমণীর চোখের কোণ ভিজে উঠলেও সে নিজেকে সামলে নিল। ওড়নাটা ভালোভাবে জড়িয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

দেখতে দেখতে কেটে গেছে আরও তিন দিন! এই তিন দিনে আর্য আর পুষ্পর দেখা হয়নি বললেই চলে। পুষ্প ঘুমানোর পরে আর্য রুমে আসে, আবার পুষ্প ঘুম থেকে ওঠার আগেই সে চলে যায়। এতে পুষ্পর মন সবসময় খারাপ থাকে বললেই চলে। পুষ্প গত দুই দিন ধরে কলেজে যাচ্ছে; সারাকেও সে সবকিছু খুলে বলেছে সে কেন কলেজে আসেনি। সারা প্রথমে অবাক হয়েছিল পুষ্প বিবাহিত শুনে, তবে সে শুধু এইটুকু জিজ্ঞেস করেছিল সে সুখে আছে তো! পুষ্প সুখে আছে শুনে সেও খুশি হয়েছে।
পুষ্প কলেজ থেকে এসে দেখল, আজকে আবার স্নিগ্ধর বাড়ির সবাই এসেছে। আসার কারণ অবশ্য আছে—আজকে সিমরান আর স্নিগ্ধর বিয়ের শপিং করতে যাবে সবাই। পুষ্প সবাইকে সালাম দিয়ে ওপরে যেতে গেলেই স্নিগ্ধ নিজে উঠে দাঁড়াল। পুষ্পর সাথে একটু কথা আছে বলে সেও ওপরের দিকে এগোলো।
পুষ্পর মন এমনিতেই খারাপ নিজের রুমে ঢুকছিল—কারণ গত তিন দিন সে আর্যকে দেখেনি, কথা বলেনি। এমন সময় স্নিগ্ধ পেছন থেকে ডাক দিল। পুষ্প পেছনে ফিরে স্নিগ্ধকে দেখে মন খারাপ থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম হেসে জিজ্ঞেস করল—

– “কিছু বলবেন, স্যার?”
– “স্যার? আমি তোমার স্যার কলেজে, বাড়িতে ভাইয়া ডাকলে মন্দ হবে না নিশ্চয়ই?”
পুষ্প কী বলবে বুঝতে পারল না। অপ্রস্তুত হয়ে হেসে সে বলল—
– “ঠিক আছে ভাইয়া! বলুন, কিছু বলবেন?”
– “হ্যাঁ, তোমাকে একটা কাজ দিলে করতে পারবে?”
কাজ করতে অবশ্য পুষ্পর কোনোকালেই সমস্যা থাকে না, বরং এই বাড়িতে আসার পরে কেউ তাকে কাজের আশেপাশেও যেতে দেয় না! তাই হেসে সে জবাব দিল—
– “জ্বী ভাইয়া, বলুন কী কাজ করতে হবে? আমি করে দেবো।”
স্নিগ্ধ পুষ্পকে কী কী করতে হবে, সবকিছু খুলে বলল। পুষ্প অবাক হলেও স্নিগ্ধর সিরিয়াস মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে পারল না, শুধু বলল—

– “ভাইয়া, ও যদি আসতে না চায়?”
পুষ্পর কথা শুনে স্নিগ্ধ অদ্ভুত জোর দিয়ে বলল—
– “এই জন্যই তো তোমাকে বলছি! তুমি বললে অবশ্যই আসবে, তোমাকে অনেক ভালোবাসে ও, তোমাকে বারণ করতে পারবে না। আর যদি বারণ করে, একটু জোর খাটিয়ে হলেও নিয়ে এসো। তবে কোনোভাবেই যেন জানতে না পারে ওকে আনতে আমি তোমাকে বলেছি।”
পুষ্প মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বলল—
– “ঠিক আছে ভাইয়া!”
– “আচ্ছা, ওকে আনতে কখন যাবে তুমি?”
– “আমি ফ্রেশ হয়ে ফুফুমনিকে বলে যাবো।”
– “আচ্ছা শোনো, কাউকে বলবে না যে ওকে আনতে আমি বলেছি। বলবে তোমার ফ্রেন্ডকে তুমি ইনভাইট করতে চাও!”
স্নিগ্ধর কথা শুনে পুষ্প বুঝতে পারছে না, স্যার হঠাৎ সারাকে কেন আনতে চাইছে! তবুও সে আর কিছু জিজ্ঞেস করল না, শুধু হেসে বলল—

– “ঠিক আ…”
রমণীর গলার কথা আটকে গেল! স্নিগ্ধর পেছনে আর্যকে দেখে, যে এই মুহূর্তে তীক্ষ্ণ ধারালো চোখে তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। চোখ থেকে যেন আগুনের ফুলকি বেরোচ্ছে আর্যর লাল হয়ে যাওয়া চোখ দুটো দেখে ঢুক গিলল পুষ্প। হঠাৎ পুষ্পকে চুপ করে যেতে দেখে স্নিগ্ধ বলল—
– “কী হয়েছে?”

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৪৫

কথাটা যেন পুষ্পর কানেই গেল না! সে তো অপলকভাবে তাকিয়ে আছে তার সরকার সাহেবের দিকে। আজ তিন দিন পর লোকটাকে দেখল সে! আর্যও পুষ্পর দিকে তাকিয়ে আছে। হুট করে কী হলো কে জানে, রমণী চোখ নামিয়ে নিল। তীব্র অভিমান হলো তার সরকার সাহেবের ওপর—তিন দিন তার সাথে কোনো কথা বলেনি, তার কাছেও আসেনি, দেখাও দেয়নি! সরকার সাহেবের কি একটুও খারাপ লাগেনি?

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৪৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here