Home অবেলায় ফোঁটা পুষ্প অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৫৪

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৫৪

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৫৪
রুপা

আজকে শুক্রবার, জুমার দিন। বাড়ির সবাই একটু বেশি ব্যস্ত। সকালে গায়ে হলুদ এবং জুমার নামাজের পরে বিয়ে পড়ানো হবে। এখনো রোদ পুরোপুরি ওঠেনি, এই সময়ে সরকার বাড়ির রান্নাঘরে মহিলারা কাজ করছেন—কেউ হলুদ বাটছেন, কেউ পেঁয়াজ-রসুন ছিলে দিচ্ছেন। সরকার বাড়ির পেছনের দিকে রান্নার প্রস্তুতি চলছে আর সামনে গায়ে হলুদের প্রস্তুতি। সবার যেন নিঃশ্বাস ফেলার ফুরসত নেই!
এর মধ্যে আর্যকে দেখা গেল হাতে একটা শপিং ব্যাগ নিয়ে বাড়িতে ঢুকতে। সে কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। রান্নাঘরে আর্যকে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে অনেকেই। আর্য সেদিকে নজর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না। সে এগিয়ে গিয়ে দেখল রান্না হয়েছে কি না, কিন্তু এত তাড়াতাড়ি এখনো কিছুই রান্না হয়নি। আর্য এবার মায়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল—

– “আম্মু, এখনো কিছু রান্না হয়নি?”
আর্যর কথা শুনে শেহনাজ সরকার সময় দেখলেন—এখনো সাতটা বাজতে দশ মিনিট বাকি আছে। এত তাড়াতাড়ি তো রান্না হয় না বাড়িতে, তার ওপর গায়ে হলুদের প্রস্তুতি নেওয়ায় ব্যস্ত থাকায় এখনো রান্না শুরু হয়নি। তিনি আর্যর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন—
– “নাহ্‌! এত সকালে খাবার কার জন্য?”
– “বউয়ের জন্য!”
সোজাসুজি উত্তর দিল আর্য। কথাটা শুনে শেহনাজ সরকার কিছু না বললেও রান্নাঘরে থাকা বাকি মহিলারা ফিসফিস করতে ভুললেন না, কেউ কেউ আবার মুখ টিপে হাসলেন। আর্য সেদিকে পাত্তা দিল না। সে নিজেই দুটো ব্রেড টোস্ট করে নিল, সাথে ডিম পোচ করল। এক গ্লাস দুধের সাথে এক চামচ কোকো পাউডার অ্যাড করে ট্রেতে করে নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরোতে গেলেই আর্যর কানে এল একটা কথা—
– “আগেকার দিনে বউরা সকালে উঠে সবার জন্য রান্না করত আর এখন বউরা ঘুমিয়ে থাকে, স্বামী বউয়ের জন্য রান্না করে! আর ওই মেয়েই বা কেমন? আজকে এই বাড়িতে এসেছি, দু-তিন দিন হয়ে গেল—এক দিনও দেখলাম না রান্নার কোনো কাজে হাত লাগাতে!”
আর্যর পা থেমে গেল। সে একবার পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখল কথাটা কে বলেছে। সেদিকে তাকিয়ে সে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল—

– “নেক্সট টাইম কথা বলার সময় কাকে নিয়ে কোথায় কী কথা বলছেন, ভেবে বলবেন। আমি আবার আমার মায়ের মতো ছোট-বড় দেখে সম্মান দিই না। নেক্সট টাইম আমার বউকে নিয়ে একটা কথাও যদি কারও মুখ থেকে বের হয়, আই উইল মেক শিওর, সেই মুখ দিয়ে যেন দ্বিতীয় কোনো কথা বের না হয়! আর বউ আমার, আমি বউয়ের জন্য রান্না করব নাকি খাইয়ে দেবো—ইটস কমপ্লিটলি মাই চয়েস।”
কথাগুলো বলে কারও কথা শোনার প্রয়োজন মনে করল না আর্য, সোজা ওপরে চলে গেল। এদিকে রান্নাঘরের পরিবেশ থমথমে হয়ে গেল। যে মহিলা কথাটা বলেছিলেন, ওনার মুখ অপমানে লাল হয়ে গেছে। শেহনাজ সরকার সবার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ছেলে যে বাপের চেয়ে তিন কাঠি ওপরের—তা বুঝতে ওনার আর বাকি রইল না! তবুও তিনি আর কিছু বললেন না, গ্যাসে রান্না বসিয়ে দিলেন।

আর্য যেই না নিজের রুমে ঢুকবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে সারা ডেকে উঠল—
– “ভাইয়া, আমার আপনাকে কিছু বলার আছে!”
সারার ডাকে আর্য থেমে গেল। তবে এই মুহূর্তে আর্য কথা শুনতে ইচ্ছুক নয়, সবার আগে বউকে কিছু খাওয়াতে হবে—কাল রাত থেকে কিছু খায়নি, নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে! তাই আর্য গম্ভীর কণ্ঠে বলল—
– “পরে শুনব, আগে তোমার ফ্রেন্ডকে নাস্তা খাইয়ে দিই।”
– “অনেক জরুরি কথা, ভাইয়া!”
– “ওকে খাওয়ানোর চেয়ে জরুরি এই মুহূর্তে আর কিছু নয়।”
কথাটা বলে আর্য রুমে ঢুকে গেল। এদিকে সারা কী করবে বুঝতে পারছে না। সে কাল রাত থেকে ছটফট করছে, কখন সকাল হবে আর সে কথাগুলো বলবে—তা না হলে যে অনেক বড় বিপদ ঘনিয়ে আসবে!

আর্য রুমে ঢুকে দেখল পুষ্পকে যেভাবে শুইয়ে দিয়ে গেছিল, পুষ্প সেভাবেই ঘুমিয়ে আছে। আর্য নাস্তার ট্রেটা পাশের টেবিলে রেখে বিছানায় পুষ্পর পাশে বসল। মাথা থেকে কমফোর্টার সরাতেই দেখল পুষ্পর পুরো মুখ চুলে ঢেকে গেছে। আর্য আলতো হাতে চুলগুলো রমনীর কানের পিঠে গুঁজে দিতে গিয়ে বুঝল—পুষ্পর সারা শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে! ফর্সা মুখটা জ্বরের তোপে লাল হয়ে গেছে।
আর্য উদ্বিগ্ন ও অস্থির হয়ে ডাকল—
– “ফ্লাওয়ার?”
পুষ্প কোনো সাড়া দিল না। আর্য আবারও ব্যাকুল হয়ে ডাকল—
– “জান?”
– “উমম!”

পুষ্প চোখ পিটপিট করে তাকাল। জ্বরের কারণে চোখের সাদা অংশ লাল হয়ে গেছে। আর্য আঁতকে উঠল। পুষ্প আবারও চোখ বন্ধ করে ফেলল, সে চোখ খুলে রাখতে পারছে না; চোখ দুটো অস্বাভাবিক ভারী হয়ে আছে, যেন চোখের পাতায় পাথর বসিয়ে দেওয়া হয়েছে! আর্য অস্থির হয়ে বলল—
– “জান, ওঠো, কিছু খেতে হবে তো!”
– “উঁহু!”
পুষ্প না সূচক মাথা নাড়ল, সে খাবে না। তবে আর্য শোনল না, সে আলতো করে পুষ্পকে হেলান দিয়ে বসিয়ে দিয়ে পেছনে বালিশ দিল, যাতে পুষ্প সাপোর্ট পায়। পুষ্প খেতে না চাইলেও আর্য জোর করে খাইয়ে দিতে লাগল। খাওয়ানো শেষ করে ব্যথার ওষুধ, জ্বরের ওষুধ আর বার্থ কন্ট্রোল পিল খাইয়ে দিয়ে সব একপাশে রেখে নিজেও কমফোর্টারের ভেতর ঢুকে পুষ্পকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। রমনী বিড়ালছানার মতো গুটিসুটি মেরে আর্যর প্রশস্ত বুকে ঢুকে যেতে চাইল। আর্য পুষ্পর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করল—

– “জান, বেশি কষ্ট হচ্ছে?”
– “উঁহু!”
আর্য কিছু বলল না, পুষ্পর মাথায় আদুরে চুমু দিয়ে বলল—
– “আস্তে আস্তে ব্যথা কমে যাবে।”
– “সরকার সাহেব?”
– “হুম!”
– “আমি আপনাকে অনেক ভালোবাসি!”
– “জানি তো!”
– “আপনি ভালোবাসেন?”
– “জানি না!”
আর্যর কথায় রমনীর মন বেশ ক্ষুণ্ন হলো। এত কিছুর পরেও নাকি সরকার সাহেব জানে না ভালোবাসে কি না! রমনী এবার অভিমানী সুরে বলল—
– “আপনি আমাকে ভালোবাসেন না?”
পুষ্পর অভিমানী কণ্ঠ শুনে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল আর্য। আর্য এবার নরম কণ্ঠে বলল—
– “তোমাকে আমি প্রথমে দেখতে পারতাম না, কেন জানো?”
– “কেন?”
আর্য এবার শুরু থেকে বলতে লাগল—

– “তুমি জানো, আমার একজন ফ্রেন্ড ছিল—বেস্ট ফ্রেন্ড। ক্লাস ফোর থেকে সে আমার ফ্রেন্ড ছিল। আমি খুব ইন্ট্রোভার্ট টাইপ ছিলাম, কারও সাথে মিশতাম না, কাউকে ভালো লাগত না। মেয়েদের দুচোখে দেখতে পারতাম না, দেখলে মনে হতো ন্যাকা—কিছু হোক আর না হোক অমনিতেই কান্না শুরু করে! ওসব আমার বিরক্ত লাগত। আমি তোমার সিমরান আপুকেও কোনোদিন কোলে নিইনি, সবসময় দূরে দূরে থাকতাম।”
আর্যর কথা শুনে পুষ্প মাথা তুলতে চাইল, তবে পারল না। আর্য নিজের চিবুক ঠেকিয়ে রেখেছে পুষ্পর মাথায়, ফলে রমনী মাথা নিচু করা অবস্থাতেই জিজ্ঞেস করল—
– “তাহলে এখন আমাকে সহ্য করেন কীভাবে?”
রমনীর প্রশ্নে আর্য আলতো হাসল। সেও নরম কণ্ঠে বলল—
– “এটার উত্তর তো আমার কাছেও নেই, ফ্লাওয়ার! তুমি কী জাদু করেছ আমার ওপর!”
– “আমি কোনো জাদু করিনি আপনার ওপর!”
– “করেছ! না হলে যে আমি মেয়েদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলতাম, এখন তোমার দূরত্ব সহ্য হয় না কেন?”
আর্যর কথায় পুষ্প ঠোঁট উল্টে বলল—
– “আমি কী করে জানব?”
– “আচ্ছা, তোমাকে জানতে হবে না, আমি যা বলছি তা শোনো!”
– “আচ্ছা!”

ইয়াসার ছিল অনাথ। একটা এনাথ আশ্রম থেকে সে পড়ালেখা করত আর আর্য ছিল ভীষণ ইনট্রোভার্ট স্বভাবের; কারও সাথে মিশত না, মেয়েদের একদমই সহ্য করতে পারত না। অথচ ইয়াসার ছিল একদম তারই বিপরীত স্বভাবের—মিশুক ও প্রচুর মেধাবী। ভাগ্যক্রমে সেই বিপরীতমুখী ছেলে দুটোর বন্ধুত্ব হয় ক্লাস সিক্স থেকে বন্ধুত্ব এতটাই গভীর হয় যে, স্কুলে যতক্ষণ থাকত, ওই দুজন একে অপরকে ছাড়া কিছুই বুঝত না। একে অপরের টিফিন শেয়ার করা, স্কুল ফাঁকি দিয়ে আইসক্রিম খাওয়া, একে অপরের ড্রেস চেঞ্জ করে পরা—সবকিছু! বলতে গেলে দুই দেহের এক আত্মা। কিন্তু এর মধ্যে ক্লাস এইটে উঠে আরও একটা মেয়ের সাথে বন্ধুত্ব হয় ইয়াসারের। মেয়েটার নাম ছিল আমিরা তাসনিম। আর্য মেয়েদের পছন্দ করত না, তাই আমিরাকেও পছন্দ করত না, কিন্তু প্রাণের বন্ধুর জন্য কিছু বলতে পারত না।

এভাবেই দুজনের বন্ধুত্ব চলতে থাকে। হাইস্কুল শেষ করে কলেজে ওঠার মধ্যে ইয়াসার আর আমিরা একে অপরকে ভালোবাসতে শুরু করে। আর্য সেটা জানার পরে বন্ধুর সাথে খুব রাগারাগী করে; বারবার বলেছে, বন্ধুত্ব ঠিক ছিল, তাই বলে এখন ভালোবাসা কেন? কিন্তু ইয়াসার বারবার বুঝিয়ে শান্ত করে। আর্যর আমিরাকে মোটেও পছন্দ ছিল না। ইয়াসার যখনই আমিরার সাথে কথা বলত বা তার সাথে ভাব জমাতে চাইত, তখন আর্য এমনিতেই মেয়েদের সহ্য করতে পারত না, আর আমিরাকে দেখে তার আরও অসহ্য লাগতে শুরু করত। কিন্তু ইয়াসার আমিরা বলতে পাগল! তত দিনে আমিরাকে ছাড়া আর কিছুই বুঝত না ইয়াসার। ইয়াসার অনাথ ছিল, তাই আমিরা আর আর্যকে সে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসত।

এর মধ্যে স্কলারশিপের সুযোগ আসে। আর্য আর ইয়াসার দুজনেই সিলেক্ট হয়। পরিবারের সবাই আর্যকে পাঠাতে চাইলেও ইয়াসার আমিরাকে ছেড়ে যেতে নারাজ। আর্য এত করে বোঝানোর পরেও ইয়াসারকে রাজি করাতে পারে না। ইয়াসার রাজি না হওয়ায় আর্য বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যেতে বারণ করে দেয়। কিন্তু ইয়াসার আর্যকে অনেক বুঝিয়ে রাজি করায়। আর্য রাজি হতে না চাইলে ইয়াসার বন্ধুত্ব রাখবে না বলে—তাই আর্য যেতে রাজি হয়।
আর্য উচ্চশিক্ষার জন্য প্যারিস চলে যায়। ইয়াসার দেশে নিজের পড়ালেখা, আর্যর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ আর আমিরার সাথে সম্পর্ক—সবকিছু ভালোভাবে চালিয়ে যাচ্ছিল। এভাবেই কেটে যায় অনেকগুলো বছর। তিনজনই গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করে। আরও তিন বছর পরে আর্য দেশে ফিরে আসে। সে এয়ারপোর্ট থেকে বাড়িতে না গিয়ে আগে গিয়েছিল ইয়াসারের সাথে দেখা করতে।

আর্য নতুন অফিসে জয়েন করে, ইয়াসারও একটা কোম্পানিতে জয়েন করে। অফিস থেকে ছুটি হওয়ার পরে আর্য, ইয়াসার ও আমিরা—তিনজনে আড্ডা দেয়। এত বছর কেটে গেলেও মেয়েদের প্রতি আর্যর বিরক্তি কমে না, ফলে সে কোনো প্রেমঘটিত সম্পর্কে জড়ায় না। কিন্তু এর মধ্যে আমিরা পাল্টে যেতে শুরু করে। ইয়াসারের দশটা ফোন দিলে একটা রিসিভ করে, দেখা করা কমিয়ে দেয়। এতে ইয়াসার প্রচুর কষ্ট পায়, কিন্তু সেটা আর্যকে বুঝতে দেয় না। সে আর্যর সামনে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে, আর্যকে সে আমিরার অবহেলার কথা জানতে দেয় না। এভাবেই আরও অনেক দিন কেটে যায়। আমিরার অবহেলায় ইয়াসার ভেতর থেকে ভেঙে পড়ে। ইয়াসার বারবার আমিরাকে জিজ্ঞেস করে কেন সে তাকে অবহেলা করছে? সে কি কোনো ভুল করেছে? তাকে বললে সে সেই ভুল দ্বিতীয় বার করবে না কিন্তু আমিরা কোনো উত্তর দেয় না। এর মধ্যে আর্য একদিন আমিরাকে অন্য আরেকটা ছেলের সাথে দেখে ফেলে। আর্য আমিরার কাছে জবাবদিহি চাইলে আমিরা সোজাসুজি বলে দেয় যে সে ইয়াসারকে ভালোবাসে না, এসব কম বয়সের আবেগ! কিন্তু আর্য এই সত্যি ইয়াসারকে বলতে পারে না; কারণ সে দেখেছে তার বন্ধু আমিরাকে কতটা ভালোবাসে—যার জন্য সে সুযোগ পেয়েও উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পড়তে যায়নি সুযোগ ছেড়ে দিয়েছিল, আর সেই মেয়ে কি না বলছে ভালোবাসে না, কম বয়সের আবেগ!

আর্য যতক্ষণে ভাবছিল কীভাবে ইয়াসারকে সত্যিটা বলবে, মনে মনে অশান্তিতে ভুগছিল আর ভাবছিল বন্ধু তার কথা বিশ্বাস করবে তো, ততক্ষণে দেরি হয়ে যায়। আমিরার সত্যিটা ইয়াসার জেনে যায়। সে উন্মাদ হয়ে ওঠে, পাগলের মতো কেঁদে কেঁদে আমিরার পা জড়িয়ে ধরে ভালোবাসার ভিক্ষা চায়। কিন্তু আমিরার মন গলে না! সে ইয়াসারকে সাফ সাফ জানিয়ে দেয় যে সে ইয়াসারকে ভালোবাসে না, তার সাথে থাকলে তার কোনো ভবিষ্যৎ নেই।
আর্য বন্ধুর পাগলামি দেখে, বন্ধুকে আমিরার পা ধরে ভালোবাসার ভিক্ষা চাইতে দেখে—যে মেয়েদের সহ্য করতে পারে না, সেই ছেলে আমিরার কাছে হাত জোড় করে অনুরোধ করেছিল শুধু ইয়াসারের সাথে থাকার জন্য, তার যা প্রয়োজন, যত টাকা প্রয়োজন আর্য দেবে—ভালোবাসা কিনতে চেয়েছিল সে বন্ধুর জন্য! কিন্তু আমিরার মন গলেনি, সে ইয়াসারকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। এরপর ইয়াসার চুপচাপ হয়ে যায়, যেন পাথর হয়ে গেছে! এর মধ্যে আরও কয়েক দিন কেটে যায়। আর্য ইয়াসারকে এক মুহূর্তের জন্য চোখের আড়াল করে না, অফিস যাওয়া বন্ধ করে দেয় বন্ধু কে সামলাতে থাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে।

কিন্তু একদিন আর্যর একটা জরুরি মিটিং থাকায় তাকে অফিসে ডাকা হয়। সে তবুও যেতে চায় না, কিন্তু ইয়াসার সেটা জানার পরে আর্যকে জোর করে পাঠিয়ে দেয়। ইয়াসারের অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল, সে আর্যকে যেকোনো কাজের জন্য রাজি করিয়ে ফেলত। সেবারও সে রাজি করিয়ে ফেলে। আর্য অফিসে চলে যায়, কিন্তু আর্য জানত না যে সেই যাওয়ার পর ফিরে এসে তাকে তার প্রাণের বন্ধুর ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত মৃত লাশ দেখতে হবে!
সেদিন আর্য অফিসে যাওয়ার পরে ইয়াসার বাইরে বেরিয়েছিল, কিন্তু বাইরে বেরোনো যেন কাল হয়ে দাঁড়ায়! ইয়াসার তাদের এক ক্লাসম্যাটের কাছে জানতে পারে আমিরার বিয়ের কথা। সে আমিরাকে এতটাই ভালোবাসত যে, বিয়ের কথা শুনে এত অপমান ও অবহেলা সব ভুলে আবার সেই বিয়েবাড়িতে চলে যায়। বউ সেজে বসে থাকা আমিরাকে সে বারবার অনুরোধ করে বিয়ে না করার জন্য—সে তাকে বিয়ে করবে, সে আমিরাকে ছাড়া মরে যাবে! কিন্তু তার বিপরীতে নিষ্ঠুর আমিরা বলেছিল, “তাহলে মরে যাও! তুমি মরে গেলেও আমি তোমার সাথে থাকব না, আমি তোমাকে ভালোবাসি না।”
ওই একটা কথা ইয়াসারের কানে বাজতে থাকে। চোখের সামনে আমিরা বিদেশে সেটেল হওয়া একজনকে বিয়ে করে নিল, আর ইয়াসারের কানে বারবার বাজতে লাগল সেই কথাটা—‘মরে যাও, তুমি মরে গেলেও আমি তোমার সাথে থাকব না।’ বাড়ি এসে সে গলায় ফাঁস দিল। তার ডানে-বাঁয়ে আপন বলতে কেউ ছিল না, সে আর্য আর আমিরাকে নিজের জীবন বানিয়েছিল; কিন্তু এক বেইমান নারীর জন্য সে ভুলে গেল তার জন্য জান দিতে পারা প্রাণের বন্ধুর কথা!

আর্য বন্ধুর মৃত্যু মানতে পারে না। সে বন্ধুর মৃত লাশকে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে প্রশ্ন করেছিল, “কেন করলি এমনটা? তোকে আমি ভালোবাসতাম না? একটা মেয়ের জন্য তুই আমার ভালোবাসা ভুলে গেলি কেন?” এরপর থেকে পারফেক্ট আর্য নিজের বন্ধুর মৃত্যুর শোক ভুলতে নেশা করতে শুরু করল। মেয়েদের প্রতি থাকা বিরক্তি চরম ক্ষোভ ও ঘৃণায় রূপ নিল। একটা বেইমান নারী একটা ছেলের সুন্দর সাজানো জীবন কেড়ে নিল!
– “আমি আপনাকে ছেড়ে কোনোদিন কোথাও যাবো না!”

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৫৩

পুষ্প কাঁদতে কাঁদতে আর্যর গলা জড়িয়ে ধরে কথাটা বলল। আর্য অতীত থেকে বেরিয়ে এল। আর্যর চোখ ইতিমধ্যে লাল হয়ে গেছে; হয়তো ছেলে বলে সে কাঁদতে পারছে না, মেয়ে হলে হয়তো পুষ্পর মতো ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলত। আর্যও দুই হাতে পুষ্পকে জড়িয়ে ধরল, বুঝে আসা গলায় বলল—
– “তুমি চাইলেও আমি তোমাকে যেতে দেবো না, জান! তুমি চাও বা না চাও, এই জীবনে তোমার মুক্তি নেই!”

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৫৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here