Home ভুলভাল অন্তরাল ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৩১

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৩১

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৩১
মুশফিকা রহমান মৈথি

ঘরময় নিগূঢ় নীরবতা। বিশালতার কারণে নীরবতাটা গাঢ় লাগছে। উপরে থাকলে নিচের নীরবতা আরোও গা কাঁটা দেয়। সেকারণেই নিচে নামলো না কাঞ্চন। ভুত যদি থেকেও তাকে তাহলে হাই হ্যালো করার কোনো ইচ্ছে নেই তার।
নিজের ঘরের বিছানায় বসে ভিডিও এডিট করছে। একটা লাইট জ্বলছে। এসি চালায় নি। ঠান্ডা লাগছে। রুমের জানালাটা অতিরিক্ত বিশাল। আশেপাশে বড় বিল্ডিং নেই। তাই বাতাসও ভালোই ঢুকে।

কাঞ্চন বাসায় এসেই আগে গোসল করেছে। চুল ভেজা। মাথায় এখনো গামছা বাঁধা। খুব আয়েশ করে শ্যাম্পু করেছে। শ্যাম্পু করতে তার বরাবর বেশি সময় লাগে। আজও তাই লেগেছে। ঘর নীরবতায় ডুবে আছে। গোসল করে এসে ঘড়ির দিকে তাকালো। সাড়ে নয়টা বাজে। এখনো ফিরে নি স্নিগ্ধ। নিচে যেতে ভয় করছে কাঞ্চনের। মাথার মধ্যে ভুতের ব্যপারটা ঘুরছে। ছোটবেলা থেকে নিজের এমন একটা বাসা চাইতো কাঞ্চন। পটনভী মঞ্জিল থেকে যদি কখনো বের হয় তবে এমন একটা বাসায় সে থাকবে। ডুপ্লেক্স, কাঠের সিড়ি। ওয়াল আলমারী থাকবে প্রতিটা ঘরে। বিশাল বিশাল জানালা আর ঝুলানো ব্যালকনি। রান্নাঘরটা পরিপাটি করে গুছানো। ডাইনিং এ ঝাড়বাতি থাকবে। দোতালায় বেডরুমের মাঝে থাকবে একটা ছোট লিভিংরুম। কোনো একটা নাটকে এমন ঘর দেখেছিলো সে। সেই থেকে মনের ইচ্ছে। এই বাসাটা ঠিক সেভাবেই তৈরি। এগুলো কি কাঞ্চন ডাইরিতে লিখেছিলো? মনে নেই। তবে এখন মনে হচ্ছে বাসাটা অনেক বেশি বড়। খুব বেশী নীরব। পটনভীদের সাথে থাকতে থাকতে এখন নীরবতা গায়ে কাঁটা দেয় কাঞ্চনের। কি অদ্ভুত!

মোবাইলের সাথে একটা ছোট ব্লুথুথ সাউন্ডবক্স কানেক্ট করলো কাঞ্চন। সাউন্ডবক্সটা তাদের ঘরেই সে পেয়েছে। উচ্চ শব্দে গান ছাড়লো। যেন নীরবতা তাকে তা ছুঁতে পারে। মোবাইলের মেমোরিতে অনেকগুলো শট একত্রিত আছে। এডিট করে দেখা গেলো মোট পাঁচটা রিল হয়ে যাবে। কাঞ্চন কম সময়ের রিল বানায়। ভিউ বেশি হয়। বিবাহ রিলেটেড কিছু পোস্ট করলেই ভিউ। যেমন একটা ছবি পোস্ট করেছিলো। এমন ভাবে ছবিটা তুলেছিলো যেখানে স্নিগ্ধর বাহু দেখা যাচ্ছে শুধু আর চুলার উপরের কড়াই। ছবিটাতে দু হাজারের বেশি লাইক এসেছে। ভিউ প্রায় লাখ ছাড়িয়ে গেছে। তাই এখন মোটামুটি পোস্ট করলে ভালোই রিচ পাওয়া যাচ্ছে। একশ ডলার হতে বেশি দেরি নেই। একশ ডলার উঠিয়ে কি করবে? কোথাও ঘুরে আসবে? আচ্ছা খুলনায় আর কতদিন থাকবে? বাগেরহাট ঘুরে আসলে কেমন হয়? বেশি দূর কি? সুন্দরবন ঘুরা গেলেও ভালো হত। কিন্তু সিমেন্টের বস্তা কি যাবে? বলে দেখবে?

ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে টুটাং করছে। পারভেজ বাংলাদেশে আসছে। এই বিষয় নিয়ে বেশ হুল্লোড়। পৃথুলার অবশেষে বিয়ে হচ্ছে। ওর সাথে কথা বলা প্রয়োজন। অবশ্য পৃথুলা খুব বিচিত্র। সে হুট হাট নিজেকে একটা খোলসে আটকে ফেলে। তখন চিরচেনা পৃথুলাকেও অচেনা লাগে। এই যে পারভেজের সাথে বিয়ে হবার বিষয়টা নিয়ে তার মধ্যে কোনো হেলদোল নেই। সে যদি বিয়েতে রাজী নাও হয় সে প্রকাশ করবে না। এটাই সমস্যা। সে যদি একবার প্রকাশ করে তবে কাজিনমহল এই বিয়ে হতে দিবে না। তবুও ঢং করবে। অবশ্য তার ঢং করার কারণ ফুপু। ফুপুর মতো আত্মসম্মানহীন নারী এ জগতে দ্বিতীয়টি নেই। সবাই চায় কাঞ্চনও ফুপুর মতো হোক। সরফরাজ পটনভীর দম্ভে আহত হয়েও নিজেকে বিলীন করে দিক। কাঞ্চনের মতে কখনো নিজেকে বিলীন করা উচিত নয়। নিজের জন্য কিছু অবশিষ্ট না থাকলে একটা সময় অন্যকে দেওয়ার মতো ও কিছু থাকবে না।
এডিটিং শেষ করে ফোনটা রেখে দিলো কাঞ্চন। তার ঘুম আসছে। হাই তুলতে তুলতে ঘড়ির দিকে তাকালো সে। এখন সাড়ে দশটা বাজে। লোকটা এখনো ফিরে নি? একবার কি ফোন দিবে? এতো দেরি কেন হচ্ছে? ক্ষুধা পেয়েছে। নিচে রান্নাঘরে যেতে হবে। কিন্তু ভয় করছে। বাহিরে আবার ঝুম বৃষ্টি পড়ছে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে একটু পর পর। সেই ক্ষণসময়ের জন্য সাদা আলো পুরো ঘর আলোকিত করে দিচ্ছে। কাঞ্চন কললিস্টে যেয়ে একটা ধাক্কা খেলো। স্নিগ্ধের নাম্বার, “Hubby ❤️” লিখে সেভ করে। কেমনটা লাগে। কাঞ্চন আবার নাম বদলালো, “Devil”. এরপর ফোন করলো। ফোন ধরতেই স্নিগ্ধ বললো,

“হুম?”
“কই তুমি?”
“ভয় করছে?”
“ধ্যাত, বাসায় আসবা কখন?”
লোকটা হাসলো। কাঞ্চনের রাগ হলো। কঠিন গলায় শুধালো,
“হাসছো কেন?”
“দেরি হবে। একটু অপেক্ষা কর।“
“বাহিরে বৃষ্টি হচ্ছে।“
“এজন্যই আঁটকে গেছি।“
“আচ্ছা, সাবধানে আসো।“
“মিস মি?”
“তোমার মাথা।“

বলেই ফোন কেঁটে দিলো কাঞ্চন। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিলে মন্দ হবে না। কলিংবেল না শোনা গেলেও সমস্যা নেই। স্নিগ্ধ তাকে ফোন করবে। ভাবতে ভাবতেই কাঞ্চনের চোখ লেগে এলো। যখন ঘুম ভাঙ্গলো তখন ঘর একেবারে অন্ধকারে নিমজ্জিত। বিদ্যুৎ নেই। বাহিরে মেঘের গর্জন শোনাচ্ছে। মনে হচ্ছে কোনো দৈত্য চিৎকার করছে। বৃষ্টির বেগ বেড়েছে হয়তো। কাঞ্চন হাত বাড়িতে নিজের ফোনটা হাতে নিলো। সময় ১১.৪৮। স্নিগ্ধ কি এখনো ফিরে নি। বাসায় জেনারেটর বা আইপিএসের ব্যবস্থা নেই হয়তো। তাই ঘুটঘুটে অন্ধকার। অন্ধকারটা চোখে সইছে না। কেমন গিলে খাওয়ার মতো ঠেকছে। মোবাইলের ফ্লাশলাইটটা অন করলো সে। গানটা বন্ধ করতেই ঘর আবার নীরবতায় ভেসে গেলো। হঠাৎ টুং করে একটা শব্দ কানে এলো। শব্দটা নিচ থেকে আসছে। কেন যেন বুকটা ধক করে উঠলো কাঞ্চনের। কে শব্দ করছে? চোর? নাকি অশরীরী কিছু? আবহাওয়াটাই কেমন ছমছমে। কাঁটা দেয়।

কাঞ্চনের হাত পা ঠান্ডা হয়ে এলো। ভয় করছে। এই ভয়টা মানসিক একটা ভ্রম। কাঞ্চন জানে। তবুও তার বুকটা কাঁপছে। আবার আরেকটা শব্দ কানে এলো। এবার ভয় তীব্র হলো। সেই সাথে কৌতুহল। নিচে যাবে একবার? কাঞ্চন জানে এটা হয়তো খুব বাজে একটা সিদ্ধান্ত। কিন্তু একটা বার নিচে যাওয়া উচিত। ইন্টারকমও নিচেই। তার আগে স্নিগ্ধকে একটা ফোন করলে হয় না? কাঞ্চন স্নিগ্ধকে ফোন করলো।
“কাঙ্খিত নম্বরে সংযোগ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না।“
কথাটা আরোও বেশি ভয় ধরালো কাঞ্চনের বুকে। দুরুদ শরীফ, আয়াতুল কুরসী পড়লো সে। বুকে ফু দিয়ে দোয়া ইউনুস পড়তে পড়তে পা বাড়ালো নিচের দিকে। একটা সিড়ি, দুটো সিড়ি। মোবাইলের ফ্লাশলাইট দিয়ে যতটুকু আলোকিত হয় সেটাই দেখছে সে। কাঁপা স্বরে আওয়াজ দিলো,
“কে?” “কে?”

এরমধ্যে বাঁধলো আরেকটা বিপদ। মোবাইলটা ফট করে বন্ধ হয়ে গেলো। চার্জ নেই। সে চার্জে না লাগিয়েই ঘুমিয়ে গিয়েছিলো। গান বেজেছে। চার্জ না থাকার ই কথা। আলো চলে যেতেই কাঞ্চনের বুক ধক করে উঠলো। গলা শুকিয়ে আসছে। বড্ড পানি পিপাসা লাগছে। হাত পা জমে যাচ্ছে। পা চলতে চাইছে না। ভয় খুব মারাত্মক জিনিস। যখন একবার মস্তিষ্কে ভয় ঢুকে যায় তখন হাজার বুঝালেও কাজ হয় না। কাঞ্চনের ক্ষেত্রেও সেটাই হচ্ছে। সিড়ির রেলিং ধরে আসতে আসতে নামলো সে। রান্নাঘরে মোম আছে নিশ্চয়ই। নয়তো ইন্টারকমে দারোয়ানকে বলবে। বাহিরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। জানালা দিয়ে সেই আলো ক্ষণিকের জন্য ঘরে প্রবেশ করছে। আলোকিত হচ্ছে ঘর। এই আলোতেই একটা বিশাল প্রতিবিম্ব চোখে পড়লো কাঞ্চনের। তার জমাটবাঁধা ভয়টা এবার আরোও বেশি শাখা প্রশাখা মেললো। চোর নাকি অশরীরী সে জানে না। গলা থেকে স্বর বের হচ্ছে না। সারা শরীর ঘাম দিলো তার। এতোটা ভয় কখন পায় নি সে। অস্পষ্টভাবে গোঙ্গালো,
“কে?” “কে?”

ধপ করে জ্বলে উঠলো মোমবাতি। একটা নয় অনেকগুলো। সোনালি নরম আলোয় আলোকিত হলো ঘর। মানুষটির প্রশস্ত কাঁধ তার দিকে ফিরলো। মুখমন্ডলে আলো পড়লো। স্নিগ্ধ ভাই? ওই মুহূর্তে কাঞ্চনের শরীর থেকে একটা ভার নেমে গেলো যেন। মুহূর্তেই সে তরতরিয়ে নেমে গেলো। তড়িৎ গতিতে ছুটে একপ্রকার লাফিয়ে পড়লো স্নিগ্ধের বুকে। ফলে স্নিগ্ধর তাল নড়েচড়ে গেলো। সে পেছনের টেবিলে হাত ঠেঁকিয়ে নিজের ভারসাম্য বজায় রাখলো। তার স্ত্রী তাকে দু হাতে পিঠটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছে। এতোটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছে যেমন ভাসমান কেউ খড়কুটোকে আঁকড়ে ধরে। একটু পর খেয়াল করলো কাঞ্চন ফ্যাচফ্যাচ করছে। স্নিগ্ধ এমন কিছুর জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলো না। সে কাঞ্চনের নরম শরীরটা দুহাতে আঁকড়ে ধরল। পিঠে আলতো করে হাত বুলাতে বুলাতে বললো,

“আমি ই তো। ভয় পেয়েছিলি।“
কাঞ্চন তার বুকের উপর ধুমধাম কিল বসিয়ে বললো,
“না, আমার মজা লাগছিলো। আর একটু হলে আমি হার্ট ফেইল করতাম। আমার সারা শরীর কাঁপছে।“
সত্যি কাঞ্চনের শরীর কাঁপছে। স্নিগ্ধ আরোও সতর্কতার সাথে তাকে জড়িয়ে ধরলো। কতটা সময় তারা একে অপরের আলিঙ্গনে ছিলো তার হিসেব হয়তো দুজনের কারোর কাছেই নেই।
কাঞ্চন একটু স্বাভাবিক হতেই তার দৃষ্টি আশেপাশে গেলো। আরোও এক দফা চমকালো সে। বাম পাশের সাদা দেওয়ালে সোনালি বেলুন দিয়ে লেখা, “Happy Birthday”. তার চারিপাশে কালো এবং সোনালি বেলুন ঝুলছে। বেলুনে নরম মোমের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। ফলে তার গা চকচক করছে। তার ফাঁকে ফাঁকে ছোট কালো ফিতার বো এবং হৃদয় আকৃতির সাজ। ডাইনিং টেবিলের উপর একটা চকলেট কেক। তার উপরও “Happy Birthday” লেখা। কেকের চারিপাশে ছোট ছোট টি-লাইট মোমবাতি। এছাড়াও অনেকগুলো লম্বা মোমবাতি জ্বলছে যে পথে কাঞ্চন ছুটে এসেছে পুরোটা গোলাপের পাঁপড়িতে সাজানো। কেকের পাশে একটি গোলাপের তোড়া। যাতে হয়তো গুনলে ২৪টা গোলাপ পাওয়া যাবে। কেকের চারপাশে কাঞ্চনের ছোটবেলা থেকে এখনের নানা প্রকার ছবি ফ্রেমে বাঁধা। কাঞ্চনের ঠোঁট ফাঁক হলো। ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না সে। এর মধ্যেই স্নিগ্ধ কানে ঠোঁট ছুঁয়ে বললো,

“হ্যাপি বার্থডে ওয়াইফি।“
আজ রাত বারোটা থেকে কাঞ্চন চব্বিশ বছরে পা রাখবে। পটনভী মঞ্জিলে জন্মদিন পালন করার রীতি নেই। পটনভীরা জন্মদিন পালন করে না। এটাই তাদের নিয়ম। ফলে কখনো কাঞ্চনের বা অন্যদের জন্মদিন পালিত হয় নি। পায়েশ রান্না হয়েছে এতোটুকুই। বড় হবার পর কাজিনমহল আলাদা করে একে অপরের জন্মদিন পালন করে। কিন্তু আজ যে কাঞ্চনের জন্মদিন, মনেই ছিলো না কাঞ্চনের। ৩ আগষ্ট এতো দ্রুত চলে এসেছে? সে হতভম্বের মতো বললো,
“তোমার মনে ছিলো?”
“আমার ওয়াইফ রিলেটেড কিছুই আমি ভুলি না।“
বলেই কপালে গাঢ় চুমু আঁকলো স্নিগ্ধ। সেই উষ্ণ ঠোঁটের স্পর্শে সারা শরীর কেঁপে উঠলো কাঞ্চনের। তার মনটা কেমন দ্রবীভূত হয়ে আছে। অনাকাঙ্খিত মানুষের কাছ থেকে অনাকাঙ্খিত চমক তার লজিক্যাল মস্তিষ্ককে ভোঁতা করে দিয়েছে। স্নিগ্ধ আবার চুমু আঁকলো কাঞ্চনের নাকের উপর। ফলে নড়েচড়ে উঠলো কাঞ্চন। নাক চেপে ঝাঁঝালো স্বরে বললো,

“তুমি হুটহাট না বলে কয়ে চুমু খাও কেন?”
স্নিগ্ধ হাসলো। ফিঁচেল স্বরে বললো,
“তাহলে এখন থেকে ঘোষণা দিয়ে চুমু খাবো, “সাহেবান, কাদারদান পারিজাত পটনভীর একমাত্র পার্ফেক্ট হাসবেন্ড চুমু খাবে। কপাল পাতো।””
কাঞ্চন আবার তার বুকে ধুমধুম করে কিল বসিয়ে দিলো। রাগী স্বরে বললো,
“তোমার সারপ্রাইজের ঠেলায় আমার হার্টফেইল হচ্ছিলো। কোন কপাল পাঁতবো না।“
স্নিগ্ধ তার দুহাত খপ করে ধরে ফেললো। শক্ত হাতের বাঁধন থেকে নিজের হাত দুটো ছাড়াতে পারলো না কাঞ্চন। নিজের বুকের উপর চেঁপে ধরে গাঢ় স্বরে সতর্ক করলো,
“If you don’t stop, I will kiss you harder. I SWEAR.”
“I dare you”
কাঞ্চনের কথায় নিঃশব্দে হাসলো স্নিগ্ধ। মোমবাতির নরম আলোয় কাঞ্চনের ফ্যাকাশে মুখটা লাবণ্যময়ী লাগছে। বা হাত তার নরম ঠোঁটের উপর হাত বুলিয়ে নিচু স্বরে বললো,
“Dare accepted.”

কাঞ্চনের কিছু বোঝার আগেই স্নিগ্ধর নরম ঠোঁটজোড়া নিজের দখলে নিয়ে নিলো স্নিগ্ধ। আবেদনময়ী এক শিহরণ বয়ে গেলো শরীরময়। মস্তিষ্ক অসাড় হয়ে এলো উষ্ণ স্পর্শ। স্পর্শ গাঢ় হলো, অথচ বাঁধা দেবার শক্তি পেলো না কাঞ্চন। মনটা দূর্বল নাকি শরীর টের পেলো না। অথচ তার বিদ্রোহ করার কথা। বিদ্রোহ করতে করতে কি ক্লান্ত হয়ে গিয়েছে? তাও জানা নেই। তবে কাঞ্চন আর নিরুত্তাপ। চুম্বনের আগ্রাসন বাড়ল। স্নিগ্ধের চোখে ধরা দিলো এক অজানা উন্মাদনা। কাঞ্চনের ঠোঁটজোড়া যখন মুক্তি পেলো তখন তার লাল বর্ণ ধারণ করলো। স্নিগ্ধ কপালে কপাল ঠেঁকিয়ে বললো,
“আমার কাঞ্চনজঙ্ঘা আজ জয়ে বাঁধা দিবে না?”
কাঞ্চন চোখ বুজে আছে। কোনো কথা বের হলো না তার মুখ থেকে। স্নিগ্ধ তার নাকে নাক ঘষে বললো,
“এটা কি আমার রিটার্ণ গিফট?”
এবার কাঞ্চন চোখ তুললো। চোখে চোখ রেখে বললো,

“কেন করছো এগুলো?”
“কোনগুলো?”
“এই কাজগুলো। তুমি জানতে আমার এমন একটা সারপ্রাইজ পাবার ইচ্ছে ছিলো।“
স্নিগ্ধ কথাটার উত্তর দিলো না। কপালে কপাল ঘষে বললো,
“আই ক্যান গিভ ইউ এনিথিং।“
“এনিথিং?”
“এনিথিং। শুধু নিজের বন্ধ দরজাটা খুলে দেখ।“
“কেন?”
স্নিগ্ধ তার গাল নিজের দুহাতের আদলে ভরে বললো,
“কারণ তুই আমার ওয়াইফ।“
“আমি তোমাকে কখনো ভালোবাসবো না।“
“আমি জানি।“
বলেই কাঞ্চনের নরম ঠোঁটজোড়া নিজের দখলে নিল সে। কাঞ্চন বাঁধা দেবার সুযোগ পেলো না। স্নিগ্ধের রুক্ষ্ণ আঙ্গুলের ডগা তার ঘাড়ে বিচরণ করছে। বৃষ্টিতে ভিজে শুকিয়ে যাওয়া শার্টটার শীতলতা এবং তার উষ্ণ হাতের স্পর্শে কাঞ্চনের সারা শরীর কাঁটা দিচ্ছে। মস্তিষ্ককোষগুলো ভোঁতা হয়ে আছে। মনের ভেতর প্রহসন চলছে। শরীর দখল হলেই কি মস্তিষ্কে বিচরণ হয়? কখনোই না। সেই টানটা শুধু শারীরিক-ই।

ঘুম ভাঙ্গলো কাঞ্চনের দেরিতে। কলিংবেল বাঁজছে। ঘড়ির কাঁটা তখন দশটার ঘরে। চোখ মেলতেই দেখলো স্নিগ্ধ ঘুমে। আজকাল কি একটু বেশি ঘুমকাতুরে হয়ে গিয়েছে সে? হাসলো কাঞ্চন। তার সারাশরীর ময় ব্যথা। শরীরের ব্যথাটা খুব বেশি পীড়া দিচ্ছে না। দিচ্ছে মনের ব্যথা। মনের সাথে ছলনা করেছে সে। তাই মন তার সাথে রাগ করেছে। বিছানা ছাড়তে ইচ্ছে হলো না। স্নিগ্ধের শান্তিময় ঘুমও দেখতে ইচ্ছে হলো না। তাই ধাক্কা দিলো সে,
“উঠো। কে জানে আসছে।“
স্নিগ্ধ ঘুমঘুম চোখে একবার তার দিকে চাইলো। কপালে চুমু আঁকলো। মৃদু স্বরে বললো,
“গুড মর্ণিং। আর ইউ ওকে?“
এই প্রশ্নটা গতরাতে বহুবার শুনেছে কাঞ্চন। তাই এবার শুধু উত্তর দিলো,
“হুম”

কলিংবেল বাজছে। ওই মানুষটার ধৈর্য কুলাচ্ছে না। স্নিগ্ধর কপালে ভাঁজ পড়লো। সে একটা টিশার্ট গায়ে গলিয়ে নিচে চলে এলো। দরজা খুলতেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। মাহফুজ নামক ছেলেটি। হাতে একটা ট্রে। ট্রে তে নাস্তা। খিঁচুড়ি, গরুর মাংস, বেগুণ ভাঁজা, আলু ভর্তা। মাহফুজ স্নিগ্ধের দিকে কিছু সময় চেয়ে রইলো। স্নিগ্ধের দিকে নয়, তার গলায় লাল হয়ে থাকা অংশটার দিকে। তারপর হেসে বললো,
“মা আপনাদের জন্য পাঠিয়েছে।“
স্নিগ্ধ ট্রেটা নিলো। সৌজন্যমূলক হাসি ঠোঁটে আঁকিয়ে বললো,
“থ্যাংক্স। আন্টিকে আমাদের ধন্যবাদ জানাবেন। কিন্তু আমার ওয়াইফের এলার্জি আছে। তাই ওর খাবারটা ফেরত দিব। আমরা তো দুজন ই। আজ ঘরেও থাকবো না। খাবারটা নষ্ট হবে। কিছু মনে করবেন না।“
মাহফুজ কিছু বললো না। স্নিগ্ধ কাঞ্চনের খাবারটা সমেত ট্রে ফেরত দিলো। মাহফুজের মুখখানা কাল হয়ে গেলো। স্নিগ্ধ একটাবারও তাকে ভেতরে আসতে বলল না। মুখের উপর ই দরজা আঁটকে দিলো।

পটনভী মঞ্জিলে সকাল থেকে সেই আয়োজন। পারভেজের আগমন, শুভেচ্ছায় স্বাগতম—এই কথাটা লেখাই শুধু বাকি। তাশদীদ ভোরে রওনা দিয়েছে। কাজিনমহলে তাই একটা ম্যারম্যারে ভাব। কাঞ্চনও নেই। ফলে কাজিনমহল নেঁতিয়ে গেছে। পৃথুলা খুব স্বাভাবিক। ফোলা গালে বরফ ঘষছে। পারভেজের সামনে নিজের কদর্যরুপ দেখানো যাবে না। অঞ্জনা তাকে দেখে নিজেও চিন্তিত। গতরাতে সেও বালিশে মুখ গুজে ছিলো। কেঁদেছে অনেকটা সময়। অথচ আজ সে নির্লিপ্ত। পৃথুলার বাবা সকালে স্পেশাল বাজার করিয়েছেন। রান্নাঘরে মামীদের রান্নার আয়োজন সকাল থেকে। পারভেজকে এয়ারপোর্ট থেকে আনতে কে কে যাবে সেটা নির্ধারিত। পৃথুলা এবং রিদম যাবে। রিদমকে এরমধ্যে কেন জড়ানো হয়েছে সে জানে না। হয়তো গাড়ি চালানোর লাইসেন্স থাকায়। পৃথুলা নাস্তা করে একটা সাদা কুর্তি পড়লো। খুব হালকা সাজলো। সাজার কারণ তার গালের ফোলাটা। মায়ের সাথে শেষবার তর্ক করেছিলো সে। তার ফল এই সজোরে চড়।
গাড়িতে পাশাপাশি বসে আছে রিদম এবং পৃথুলা। পৃথুলার দৃষ্টি বাহিরের দিকে। রিদমের দৃষ্টি রাস্তায়। নিরবতার মধ্যে একটা তিক্ত গন্ধ। রিদম একবার আড়চোখে পৃথুলাকে দেখলো। স্বাভাবিক স্বরে শুধালো,

“কয়টায় মালটা নামবে?”
“পারভেজ নাম ওর।“
“হ্যা, হ্যা ওই মাল।“
“একটায়।“
“আমরা এতো দ্রুত কেন যাচ্ছি?”
“যেন দেরি না হয়।“
আবার কোনো কথা হলো না। গাড়ি আঁটকালো সিগন্যালে। রিদম গা এলিয়ে দিলো। স্টিয়ারিং হুইলে আঙ্গুলের টোকা দিতে দিতে বললো,

“বিয়ে তাহলে করছিস ই?”
“উপায় কি বল? তুই তো আমাকে বিয়ে করবি না।“
রিদমের চোয়াল শক্ত হলো। বিড়বিড় করে বললো,

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৩০

“আমি তোকে বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি তো দেই নি। তোর বিয়ে হলে বরং আমি বাঁচি।“
কথাটা কানে বিষের মতো ঠেকলো পৃথুলার। কঠিন চোখে তাকালো সে। তারপর একটা সাংঘাতিক কাজ করলো সে। সিগন্যালের মধ্যেই গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে গেলো। সজোরে দরজা আঁটকে বলল,
“তোর সাথে আমি কোথাও যাবো না। মরে যা তুই।“

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৩২