ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৩০
মুশফিকা রহমান মৈথি
তাশদীদের এমন কাজে চমকে গেলো অঞ্জনা। হৃদস্পন্দন বেড়ে গেছে। অবাধ্য বুনো দৃষ্টিতে যারপরনাই আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে সে। তাশদীদকে কেমন যেন অচেনা লাগছে। ফাজলামি, বাঁদরামি করা ছেলেটার কঠিন চোয়াল এবং ধাঁরালো দৃষ্টি বড্ড অপরিচিত অঞ্জনার৷ ফিঁচেল হাসিটা আজ ঠোঁটে নেই। বরং নিষ্ঠুর একটা কাঠিন্য তার চোখ মুখে ফুটে উঠেছে। চাপা হিংস্রতা তার নিঃশ্বাসের প্রতিটা কোণায়। তার শক্ত একহাত অঞ্জনার দুটো নরম হাত চেঁপে ধরে আছে। দেওয়ালে প্রচন্ড রুক্ষ্ণ ভাবে ঠেকে আছে অঞ্জনার পিঠ। অঞ্জনা নড়তে পারছে না। শুধু ছটফট করছে। তাশদীদের এই রুপ তার ভয় লাগছে। গলায় এসে বিঁধছে সেই ভয়।
খুব একটা স্বাস্থ্যবানের কাতারে তাশদীদ পড়ে না। লম্বাটে দেহ পারিবারিক জিনগত দান। ঢোলাঢিলে শার্ট পরে বলে তাকে স্বাস্থ্যবান দেখায়। কিন্তু এই টিংটিঙ্গে শরীরের ছেলেটার শরীরে এমনি অশরীরী শক্তি আছে সেটা অঞ্জনার জানা ছিলো না। প্রচন্ড অস্বস্তি লাগছে। ছটফট করতে করতে বললো,
“ছাড় তাশদীদ!”
“আগে বল! এখানে কি করছিস?”
“আমার বাড়ি আমি যেখানে খুশি যাব। তোর কি? ছাড়!”
তাশদীদের দৃষ্টির ধার বাড়লো। একটু ঝুঁকে এলো অঞ্জনার দিকে। মেরুদন্ড বাঁকলো। বা হাত অঞ্জনার কাঁধের পাশ থেকে ছুঁই ছুঁই করে দেওয়ালে রাখলো সে। কেমন ভারী গলায় বললো,
“এখন কি ব্রেকিং নিউজ হবে যে তোফাজ্জল পটনভী তাশদীদ তার বাপের কাছে মার খেয়েছে!”
“আমি কি তোর মত? শোন আমার কোনো শখ নেই তোর মার খাওয়া দেখে আনন্দ পাওয়ার। আমার আনন্দের অভাব নেই।”
ভীতু স্বর অঞ্জনার। খ্যাঁকখ্যাঁক করা মেয়েটির কণ্ঠ কাঁপছে। মিনমিনে বিড়ালের মতো লাগছে। ফলে তাশদীদের ঠোঁট বাঁকলো। কণ্ঠে কৌতুক ছলকালো,
“তাহলে কি কষ্ট লাগলো?”
অঞ্জনা তাশদীদের চোখে চোখ রাখলো। ছটফটানি থামিয়ে দিলো সে। এই তো গম্ভীর তোফাজ্জলের আড়ালে সেই দুষ্টু, অসহ্য তাশদীদ বের হয়ে এলো। অঞ্জনার অন্তঃস্থল থেকে চাপা নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো। এবার নিজের কণ্ঠের জোর ফিরে পেলো যেন,
“কিছুই লাগে নি। আমি চমকেছি খালি। দামড়া ছেলে একটা এখনো বাপের কাছে মার খায়৷ লজ্জা করে না তোর?”
তাশদীদ আরেকটু দূরত্ব কমিয়ে দিলো। চোখের বুনো দৃষ্টি বুলালো অঞ্জনায় মুখমন্ডলময়। তারপর হিসহিসিয়ে বললো,
“সবার তো তোর মত সোনার চামচের ভাগ্য হয় নারে বিল্লি! সবাই এতো তুলতুল করে মানুষ হয় না।”
কথাটা গা জ্বালিয়ে দিলো অঞ্জনার। পটনভী পরিবারের কম বেশি প্রতিটা প্রাণীর ছেলেবেলা খুব বেশি সুখময় নয়। এই বাড়িটা বাড়ি কম চিনের কোনো ছোট খাটো গ্রাম। এতো বেশি মানুষ একত্রে থাকলে যেটা হয় থালাবাসনের মতো মানুষের মধ্যেও ঠোকাঠুকি লেগেই থাকে। সেই ঠোকাঠুকিতে কোন বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ আর কোনটা নয় সেটাই পটনভী মঞ্জিলের মানুষগুলো ভুলতে বসেছে। ব্যবসা, সম্পদ, একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার নেশায় তাদের সন্তানরা অবহেলিত হচ্ছে সেটা তাদের মাথায় নেই। তাদের ধারণা এরা তো ভালোই আছে। খাচ্ছে, দাচ্ছে, অর্থ ধ্বংস করছে আর কি চাই। অবশ্য পটনভীর নতুন জেনারেশন অবশ্য তাতে খুব একটা গা মাখায় না। তারা তাদের একটা আলাদা দুনিয়া বানিয়েছে। এই তথাকথিত নবাবী নসল থেকে তারা একেবারেই বেরিয়ে যেতে চায়। অঞ্জনা এদের মধ্যে একেবারেই আলাদা। মেহেদী পটনভী পেশায় ডাক্তার। পটনভীদের ব্যবসা খুব একটা তাকে প্রভাবিত করে না। মঞ্জিলে তার দুনিয়া তার মেয়ে এবং স্ত্রী। স্ত্রী গত হবার পর থেকে এখন মেয়েই তার চোখের তারা। ছোটবেলায় যখন পটনভীর যখন বাচ্চাদের জন্য ম্যানেজার মুহিব কাকা সবার জন্য এক খেলনা এনে সবার হাতে ধরিয়ে দিতেন, তখন মেহেদী মেয়ের জন্য আলাদা করে খেলনা আনতেন। সবার থেকে আলাদা, সবার থেকে ইউনিক। রিদম, তাশদীদ, পৃথুলা শুধু দেখতো। অঞ্জনা তাদের সাথে খেলনা ভাগ করে নিতে বিন্দুমাত্র কৃপণতা করতো না। সবার এই বিষয় নিয়ে মাথাব্যথা না থাকলেও তাশদীদ তাকে খোঁচা দিতে ভুলতো না। তার চোখে অতিরিক্ত ভালোবাসা পাওয়া অঞ্জনার অপরাধ যেন। “পাপা কি পারি” বলে ক্ষেপাতো। এখনো একটুও বদলায় নি।
অঞ্জনা তিরিক্ষি গলায় বললো,
“তোর ভাগ্য খারাপ বলে অন্যকে দোষ দিষ না। তোর নিজের দোষেই তুই চড় থাপ্পড় খাস।“
“তাই বুঝি?”
তাশদীদের কণ্ঠে বিদ্রুপ ছলকালো। অঞ্জনা আরোও তেজী গলায় বললো,
“হ্যা, নিজে ভালো হলে জগৎ ভালো। তুই তো নিজে ভালো না। তাই তোর জগৎটাও ভালো না।“
“তা ভালো হতে হয় পাপা কি পারী?”
“থাপড়া খাবি তাশদীদ।“
“মার, ষোল কলা পূর্ণ হোক। গাল পাতছি।“
গাল এগিয়ে দিলো তাশদীদ। অথচ অঞ্জনার হাতজোড়া তার হাতের মধ্যে। অঞ্জনা কটমট করে চেয়ে রয়েছে। ইচ্ছে করছে ছেলেটার মাথাটা দুভাগ করে ফেলতে। তাশদীদ আবার বিদ্রুপ ভরে বললো,
“মারতে পারছিস না?”
“হাত ছাড়, মেরে দেখিয়ে দিচ্ছি।“
“ও, পাপা কি পারী লাগ কচ্ছে।“
অঞ্জনার গাল রাগে লাল হয়ে যাচ্ছে। তার চোখ থেকে আগ্নেয়গিরির লাভা বের হচ্ছে যেন। এই লাভায় তাশদীদের ভস্ম হয়ে যাওয়া নিশ্চিত। তাশদীদ এবার তার হাত ছেড়ে দিলো। অঞ্জনা সাথে সাথে তাকে মারা জন্য হাত চালালো। কিন্তু ব্যর্থ হলো। তাশদীদ নিপুণতার সাথে পেছনে সরে গেলো। ফলে অঞ্জনা নাগালে পেলো না। পকেটে হাত ঢুকিয়ে হাটতে লাগলো সে। যাওয়ার সময় বললো,
“আমার কি মনে হয় জানিস, তুই আসলে পটনভী-ই না। কোথা থেকে কুড়িয়ে পাওয়া পুতুল। তাই তো তোকে চড় থাপ্পড়ের বদলে আদর দেওয়া হয়।“
অঞ্জনা রাগে কাঁপছে। তার কপাল, গলা, ঠোঁটের নিচে ঘাম জমেছে। শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে গিয়েছে। এই ছেলেটাকে সে ঘৃণা করে। ভীষণ ঘৃণা করে।
এক ফোঁটা, দুই ফোঁটা করে শ্রাবণের বৃষ্টি নামলো ধরণী জুড়ে। ঝুম বৃষ্টি। বৃষ্টির ধার গায়ে ছোট ছোট নুড়ি পাথরের মতো লাগছে। কিছু সময় ভিজলে একেবারে গোসল হয়ে যাবে এমন বৃষ্টি। শীতল বাতাসের সাথে শীতল বারিধারায় উত্তাল হলো নদী। ঢেউ উঠছে বড় বড়। রুপসা নদী কতটা গভীর? এখন যদি নৌকা উলটে যায় তবে কি সবাই মরে যাবে? হয়তো এই আশংকাই হলো মাঝির। মাঝি নৌকা ঘুরালেন।
কাঞ্চনের মনটা আরোও শান্ত হয়ে গেলো। অন্তস্থলে জ্বলন্ত অনুতাপের লেলিহান শিখাগুলো নিভতে লাগতো। হাত বাড়ালো বৃষ্টির পানি ছোঁয়ার নেশায়। বৃষ্টিতে কি এমন আছে? এতো নেশা লাগে। ছোটবেলা থেকে বৃষ্টি পাগল কাঞ্চন। সুযোগ পেলেই বৃষ্টিতে ভিজবে। তার কখনো জ্বর আসে নি। বৃষ্টিতে বেশি ভিজলে শরীর অভ্যস্ত হয়ে যায়। তাই ইহজীবনে কখনো বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর আসার কোনো কাহিনী তার নেই। এতে অবশ্য লস তার। পৃথুলা এবং অঞ্জনা স্কুল কামাই দিতে পারলেও এই কাঞ্চনজঙ্ঘা কখনোই পারে নি।
এদিকে বৃষ্টি গায়ে লাগতেই স্নিগ্ধের চোখে মুখে তীব্র বিরক্তি ফুটে উঠলো। বৃষ্টি তার একেবারেই ভালো লাগে না। গা প্যাঁচপ্যাঁচ করে। নৌকায় ছাউনি নেই। মাঝি অবশ্য পলিথিন দিতে চাইলেন। কিন্তু মাথায় পলিথিন দেওয়াটা স্নিগ্ধের পার্সোনালিটির সাথে মেল খাবে না। তাই ঘাটে নৌকা ফেরা অবধি কঠিন মুখেই বসে রইলো সে। ভেজা চুল থেকে পানি গলিয়ে পড়ছে। হাত দিয়ে মিনিট খানেক পর পর তা টেনে টেনে পেছনে নিচ্ছে সে। কাঞ্চন মাঝিকে শুধালো,
“মামা, নৌকাটা বন্ধ করে দিন। এখানেই কিছুসময় বসে থাকি।“
স্নিগ্ধ কঠিন গলায় বলে উঠলো,
“মাথার তারগুলো শর্টসার্কিট হয়েছে নাকি?”
“ভালো লাগছে।“
“ঢেউ দেখেছিস। নৌকা উলটে যেতে পারে।“
“সমস্যা কি মরে যাব।“
স্নিগ্ধের কথা স্নিগ্ধকেই ফিরিয়ে দিলো কাঞ্চন। স্নিগ্ধ কিছুসময় নিশ্চুপ তাকিয়ে রইলো কাঞ্চনের দিকে। চঞ্চলহরিনী তার আগের রুপে ফিরে এসেছে। স্নিগ্ধ মাঝির উদ্দেশ্যে বললেন,
“এটার টপ ফ্লোরে ঝামেলা, আপনি ঘাটে চলেন।“
মাঝি তার কথা মান্য করলো। কাঞ্চন হতাশ গলায় বললো,
“আমার ভালো লাগা তোমার ভালো লাগে না, তাই না?”
“পাগলের সবকিছুই ভালো লাগে, তাই বলে তো পাগলকে সাঁকো দেখানো যাবে না।“
“আনরোমান্টিক কোথাকার।“
স্নিগ্ধ কাঞ্চনের কোমড়টা চেপে নিজের কাছে টেনে নিলো। মুখখানা নামিয়ে ঠোঁটটা কানে চেপে বললো,
“রোমান্সের জন্য একটা বেড, আর অন্ধকার রুম যথেষ্ট। আই ক্যান শো ইউ দ্যা লেভেল অফ রোমান্স।“
“ছিঃ”
বলেই নিজেকে দূরে সরাতে গেলো কাঞ্চন। কিন্তু স্নিগ্ধর শক্ত হাতের বাঁধন থেকে মুক্তি হলো না। তার গাঢ় দৃষ্টি কাঞ্চনে নিবদ্ধ। কিছুসময় তার মুখে, ঠোঁটে আবার আটকায় চোখে। কাঞ্চনের গালে রক্ত জমলো। লজ্জা লাগছে না ঠান্ডা বুঝতে পারছে না। স্নিগ্ধ সেই লালিমা চোখ মুদে দেখলো, ফিঁচেল হাসি ঠোঁটে এঁকে বললো,
“আর ইউ শাই ওয়াইফি?”
“তোমার মাথা।“
“সেখানে তোর বাস।“
“ধ্যাত!”
বলেই চোখ সরিয়ে নিলো কাঞ্চন। মনে একটা প্রশ্ন খুব উঁকি দিচ্ছে। না করতে পারলে শান্তি মিলবে না। তাই করেই বসলো সে,
“জীবনে তোমার কখনো রিগ্রেট হয় না, তাই না?”
“না।“
স্পষ্ট, জড়তাহীন উত্তর স্নিগ্ধের। সে আরোও সুন্দর করে ব্যাখ্যা দিয়ে বললো,
“আমার রিগ্রেট করার সময় নেই। হোয়াট ইজ ডান, ইজ ডান। আই ক্যান্ট ডু এনিথিং।“
“কখনো না?”
“কখনো না।“
“তোমার ধারণা তুমি কখনো ভুল করো না?”
“না, তেমন নয়। মিস্টেক সবাই করে। মানুষ, ফেরেশতা তো না। তবে কখনো ভুলের জন্য রিগ্রেট করি না।“
“কখনো যদি তোমাকে সুযোগ দেওয়া হয়, সময়ে পেছনে যেয়ে কোনো ভুল শুধরে নেওয়ার। তুমি কি শুধরে নিবে?”
স্নিগ্ধ কিছু সময় তাকিয়ে রইলো কাঞ্চনের দিকে। কাঞ্চনের উৎসুক চোখ তার উত্তরের অপেক্ষায় আছে। কিছু জানতে চায় সে। স্নিগ্ধ সময় নিয়ে স্পষ্ট স্বরে বললো,
“না। হোয়াট ইজ ডান ইজ ডান। আই ডোন্ট হ্যাভ এনি রিগ্রেট।“
কাঞ্চন প্রসন্ন হতে পারলো না যেন উত্তরে। সে কি আশা করেছিলো স্নিগ্ধ তাকে বলবে, তার জীবনের রিগ্রেট আছে। ভুল করেছে সেও। কখনো যদি সুযোগ হত তাহলে সে কখনোই কাঞ্চনকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলতো না। সূক্ষ্ণ চিনচিনে ব্যথা ধীরে ধীরে হৃৎপিন্ডে ছড়িয়ে গেলো। ব্যথাটা খুব সূক্ষ্ণ। এই ব্যথাটার কারণ কাঞ্চন জানে না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে। জড়তাহীন স্বরে বললো,
“আমি করতাম। দুটো জিনিস, এক তোমার অফিসে আমি কখনো তোমাকে ফোন করতাম না। ফুপুর হাজারবার বললেও করতাম না। আর দুই, আমি তোমার প্রতি কখনোই আকর্ষিত হতাম না। তাহলে এখন আমাদের সমীকরণটা ভিন্ন হত।“
স্নিগ্ধ হতাশ গলায় বললো,
“ইউ আর স্টিল রিগ্রেটিং? কান্ট ইউ মুভ অন?”
“ওই যে, আমি মানুষ ফেরেস্তা না।“
স্নিগ্ধ চুলের ভেতর আঙ্গুল চালালো। চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো তার। চোখে মুখে প্রচন্ড বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠলো।
সন্ধ্যা প্রায় হয়ে এসেছে। রিদমের ঘর অন্ধকার। ঘরে আলো জ্বলছে না। জানালা বন্ধ। এসি চলছে না, ফ্যান চলছে না। তাশদীদ দরজা ঠেলে ঢুকতেই চমকালো না। বাতাস ভারী হয়ে আছে ঘরে। গরম বাতাস, সেই সাথে সিগারেটের ধোঁয়া, কটু গন্ধ। তাশদীদ সিগারেট খায়। কিন্তু এতো বেশি না। সে চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারবে। রিদম প্রায় তিন-চার প্যাকেট বেনসন শেষ করে ফেলেছে। নাকে কনুই চেপে ঘরে ঢুকে প্রথমে লাইট খুঁজলো। লাইট জ্বললো, আলোকিত হয়ে উঠলো ঘর। সেই সা্থে তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সম্মুখীন হলো তাশদীদ। তাশদীদের এতো গা করার সময় নেই। সে এখন ব্যাগ গুছাবে। কালকে সকালেই ঘর থেকে চলে যাবে সে হোস্টেলে। বাবা বলেছে,
“তিন মাস মুখ দেখাবি না। গাধা কোথাকার।“
অবশ্য বাবারও দোষ নেই। সে ভেবেছিলো তাশদীদ তার মতোই লোভী হবে। কিন্তু নিজের বোন কাঞ্চনের সিগ্নেচার নকল করার মতো বিশ্রী কাজ সে করবে না। তাই এখন নির্বাসন। তাশদীদ জানালা খুললো। ফ্যান ছাড়লো। তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে বসলো রিদমের পাশে। টান দিলো দু বার। তারপর স্বাভাবিক স্বরে বললো,
“বিয়ে হচ্ছে পৃথুলার, তুই কেন দেবদাস হচ্ছিস?”
“থাবড়া মেরে দাঁত ফেলে দিব।“
“আজকে সবাই এতো দাঁতের ডাক্তার হচ্ছে কেন? আমার দাঁত ঠিক আছে ভাই।“
রিদম আবার কঠিন দৃষ্টিতে তাকালো। সে আরো একটা সিগারেট শেষ করলো। বমি আসছে এখন। সিগারেট এতো বেশি খেলে বমি আসে। চোখ লাল হয়ে গেছে। নাক জ্বলছে। মাথাটা ঝিম ধরে গেছে। এখন বমি করে ঘুম দিলে লম্বা ঘুম হবে। রিদম উঠতে গেলো কিন্তু পায়ে জোর পাচ্ছে না। তাশদীদ মোবাইলটা বের করে একটা ছবি তুলতেই রিদম সেটাকে কেড়ে নেওয়ার জন্য লাফিয়ে উঠলো। তাশদীদ সেই সুযোগ দিলো না। পকেটে ভরে বললো,
“এগুলো তোর বিয়ের এলব্যামে কাজে লাগবো।“
“মজা নিস না।“
“শালা, তুই নিজেই একটা চলতা ফিরতা হাসির খোরাক। সাত দিনের গার্লফ্রেন্ডের জন্য এতো কে কান্দে?”
“কিডা কান্দে?”
“আচ্ছা, তাইলে এই সিগারেটের পাছায় আগুণ কোন খুশিতে দেওয়া?”
“আমার শখ হইছে।“
“কোন খুশিতে?”
“আমার শত্রু বিদায় হবে তাই।“
“তাই আমার লিভার আর ফুসফুসে আতশবাজি ফুটাবো তাই তো?”
রিদম বিরক্তির সাথে চ সূচক শব্দ করলো। বিরক্তি নিয়ে বললো,
“শালি বিয়ে করতেছিস, কর। আমাকে চুমু খাবি কেন? ওর কি ধারণা আমি ওকে নিয়ে পালায়ে যাবো? আমার জীবনটাকে ত্যানাত্যানা করে ফেলছে।“
“সুযোগ তো তুই দিচ্ছিস।“
“কেমনে? আমি ওর থেকে দশ হাত দূরে থাকি।“
“আমি তো দেখি না। আমি শিওর পারভেজ আসলে তুই ওর পেছনে জোকের মতো লাগবি।“
“আলবত না। আমি তো খুশি আরোও।“
“তাই নাকি?”
“হ্যা।“
“বেট লাগবি?”
“কিসের?”
তাশদীদ মেঝেতে শুয়ে পড়লো। সিগারেটটা ফেলে দিলো ট্রে তে। সিলিংয়ের দিকে চেয়ে বললো,
“তুই পারভেজকে মেরে ভর্তা করে দিবি।“
“কোন খুশিতে?”
“যে খুশিতে তুমি দারাজের দেবদাস সাজছো সেই খুশিতে।“
“আমি জিতে গেছি। টাকা দে।“
তাশদীদ একটা লাথি দিয়ে বললো,
“আগে পারভেজ আসুক তো।“
“তাও আমি জিতবো।“
“তাহলে শাকচুন্নিরে ভালোবাসিস না?”
রিদম এবার থামলো। একটা দীর্ঘশ্বাস বের হলো বুক থেকে। মাথাটা বিছানার কাঠে এলিয়ে দিলো। খুব শান্ত গলায় বলল,
“বাসি। সমস্যাটা এখানেই। ওরে পাইতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ও অনেক পসেসিভ, কন্ট্রোলিং। তুই জানিস না। আমার নিঃশ্বাস বন্ধ করে দিবে শাকচুন্নিটা।“
“কেমনে? কিস করে?”
“জানোস আমার এক বান্ধবীর চুল কাইটে দিছিলো? কারণ ও আমাকে প্রপোজ করছে। কোনো কথা? ভাই আমাকে কেউ পছন্দ করলে আমি কি করতাম। কত বুঝালাম? ফুফা ফুপুর মধ্যে থাকতে থাকতে ওয় পাগলায় গেছে।“
“তাহলে তুই চাস ও পারভেজকে ন্যাড়া করুক?”
“হ্যা, যা পারে করুক। আমি এই টক্সিসিটির মধ্যে নাই। এমনেই বাপে ঘাড়ে উঠছে।“
“তোর বাপে কেন ঘাড়ে উঠছে?”
“তার উপর এখন ম্যানেজিং এর দায়িত্ব। আমি যেন এখন থেকে বুঝে নেই। মানে যাচ্ছে তাই। আমি ভাই এসবে নাই। আমি বিদেশ যাবো ভাইয়ার মত।“
তাশদীদ দীর্ঘশ্বাস ফেললো। কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। রিদম ভক ভক করে বমি করে ঘর ভাসিয়ে দিবে এখনই। ওরে পরিষ্কার কি তাকেই করতে হবে?
সন্ধ্যা হবার পরও বৃষ্টি কমে নি। আকাশ বিকট স্বরে ডাকছে। ঘাটের এদিকে বিশ্রী কাঁদা। হাই হিল পড়ে এই কাঁদায় হাটা এতোটা কঠিন আগে জানলে এই জুতা পরতোই না কাঞ্চন। খুব সাবধানে সে হাটছে তাও হিল কাঁদায় আটকে যাচ্ছে। স্নিগ্ধ তার পাশেই হাটছে। কিন্তু একবারও তার দিকে হাত বাড়ায় নি। ফিট বাবুর মতো পকেটে তার হাত।
সাবধানতা অবলম্বন করেও খুব লাভ হলো না। পা টা মচকেই গেলো। সাথে সাথেই হিলটা ভেঙ্গে গেলো আর বেসামাল হয়ে গেলো কাঞ্চন। অমনি ধপ করে কাঁদায় পরে গেলো কাঞ্চন। পুরো জামা কাঁদা কাঁদা হয়ে গেছে। স্নিগ্ধ নির্বিকার। স্ত্রী কাদাতে পরে আছে তাতে তার অভিব্যক্তি খুব স্বাভাবিক। কাঞ্চন হতাশ চোখে তাকালো স্নিগ্ধের দিকে। কিন্তু তার উদাসীনতা তাকে হতাশ করলো। ফলে মেজাজ খারাপ হলো ভীষণ। ঝাঁঝালো স্বরে বলল,
“এই তোমার পার্ফেক্ট হাসবেন্ডগিরি?”
“ওহ, এখন আমার হেল্প চাই নাকি?”
কাঞ্চন দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
“না।“
বলেই একা একা দাঁড়ালো খুব কষ্টে। বৃষ্টি হওয়াতে কাঁদা ধুয়ে যাচ্ছে জামা থেকে। কিন্তু হিল ভেঙ্গে গেছে। এভাবে জুতা পরে চলা সম্ভব নয়। তাই সে জুতো খুলে ফেলল। হাতে জুতাটা নিয়ে পা বাড়াতেই স্নিগ্ধ তার হাত থেকে জুতোজোড়া ছিনিয়ে নিলো। তারপর অবিশ্বাস্য ভাবে এক হাতে জুতো ধরে অন্য হাতে তাকে শুণ্যে তুলে ধরলো। কাঞ্চন ভয়ের চোটে তার গলা পেঁচিয়ে ধরলো। ইন্সটাগ্রামে এমন রিল হরহামেশা দেখেছে। ছেলেরা এক হাতে তার প্রেমিকাকে কোলে নেয়। কিন্তু এই প্রথম স্বচক্ষে নিদর্শন দেখলো। কাঁপা স্বরে বললো,
“তোমার ঘাড় ভেঙ্গে যাবে!”
স্নিগ্ধ খুব একটা প্রতিক্রিয়া দেখালো না। হনহন করে হাটলো গাড়ির দিকে। গাড়িতে কাঞ্চনকে বসিয়ে সিটবেল্ট পড়িয়ে কঠিন গলায় বললো,
“তুই যে একটা জলজ্যান্ত ঝামেলার থলে জানিস? থলেও না। তুই ঠোঙ্গা!”
“কাককে ময়ুর সাজালে এমন ই হবে।“
ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ২৯
ফ্লাটে ফিরতে আটটা বাজলো। বাসায় খাবার নেই। এখন রান্না করা সম্ভব নয়। তাই স্নিগ্ধ কাঞ্চনকে বললো,
“তুই ঘরে যেয়ে ফ্রেশ হ। আমি খাবার নিয়ে আসছি। বাই দ্যা ওয়ে, বেশি ঘুরঘুর করিস না। ভুত টুত তোকে দেখে ভয় পাবে। ওদের ভয় দেখাস না।“
কাঞ্চন দাঁত কিড়মিড়িয়ে বললো,
“তোমার মতো ব্রহ্মদৈত্যকে ভয় পাওয়াতে পারলাম না, ওই তুচ্ছ ভুতগুলো কি ভয় পাবে?”
বলেই লিফটের দিকে হাটা দিলো। ভূতের ব্যাপারটা ফাজলামি ওই সময় মনে হলেও কাঞ্চন কল্পনা করে নি আসলেই সে কখনো এতোটা ভয় পাবে………
