ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ২৯
মুশফিকা রহমান মৈথি
কাঞ্চন স্তম্ভিত চোখে চাইলো স্নিগ্ধের দিকে। তার চোখে কৌতুহল, বিস্ময়, জিঘাংসা। মুজাহিদের এমন অবস্থার জন্য কি করে স্নিগ্ধ ভাই দায়ী? কাঞ্চনের মস্তিষ্ককোষগুলো শার্লক হোমসের মতো হতে চাইলো। জানার আগ্রহে মন আঁকুপাঁকু করছে। কিন্তু সাসপেন্সে বিরামচিহ্ন দিলো স্নিগ্ধ। সে কোনো কথা না বলেই মুজাহিদকে জড়িয়ে ধরলো। মুজাহিদের স্বচ্ছ হাসিটা দেখে আরোও বিষাদে মুড়ে গেলো কাঞ্চনের মনটা। ভাগ্য কতটা নির্মম হতে পারে? মুজাহিদের বয়স স্নিগ্ধের মত অথবা তার চেয়ে বড় হবে। অথচ তার জীবনটা কেমন বেরং হয়ে গেছে। কাঞ্চন আমেনার দিকে চাইলো। মেয়েটার মুখ হাস্যোজ্জ্বল, মায়ায় ভরা। লাবণ্য হারায় নি। কাঞ্চনের থেকে বয়স হয়তো তিন-চার বছর বেশি। অথচ কতটা অদম্য মনোবল থাকলে ভাগ্যের সাথে লড়াই করে মন খুলে হাসা যায়। মুজাহিদের সামনে বসলো স্নিগ্ধ। সম্পর্কটা খুব বন্ধুসুলভ। তাইতো তুই করেই সম্বোধন করলো স্নিগ্ধ,
“কেমন চলছে দিন?”
“একেবারে ফাটাফাটি। কোনো স্ট্রেস নেই, শান্তি আর শান্তি। তুমি তো মিয়া বিয়ে শাদী করে গৃহস্থ হয়ে গিয়েছো।“
“করতে তো হবেই।“
“এই সময় খুলনায় আসবি ভাবতেও পারি নি। ছুটি নিয়েছিস নাকি ডিটেনশনে?”
“সেকেন্ড ওয়ান। তিন মাসের। রেস্ট করবো এই তিনমাস। এরপর আমাকে এপোয়েন্ট করা হবে।“
“ইঞ্জয় করে নে। তবে সিলেট, চিটাগং ছেড়ে খুলনা কেন?”
“একটু উই টাইম কাটানোর জন্য। নিরিবিলি, সংসার।“
মুজাহিদ হাসলো। লোকটার হাসিতে বিন্দু মাত্র বিষন্নতা লক্ষ্য হলো না। বরং আত্মবিশ্বাসে ঝলমল করছে। এতো বড় দূর্ভাগ্যকে সে হাসি মুখে বরণ করে বেঁচে আছে। ভাবতেই একটা ভালো লাগা কাজ করলো কাঞ্চনের। আমেনা কাঞ্চনের হাত ধরে বললো,
“এরা কথা বলুক, আপনি আমার সাথে আসেন ভাবী।“
আমেনার সাথে রান্নাঘরে গেলো কাঞ্চন। আমেনা খাবার গুলো সাজাচ্ছে। কাঞ্চন তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। কাঞ্চন নিজের কৌতুহল দমাতে পারলো না। এই দম্পতির সম্পর্কে জানতে ইচ্ছে করছে। প্রথম প্রশ্নটাই মুজাহিদের প্যারালাইসিস নিয়ে করলে খুব অভদ্রতা হয়ে যাবে। তাই কাঞ্চন শুধালো,
“আপনাদের বিয়ের কত বছর হলো ভাবি?”
“এই নভেম্বরে আট বছর হবে। টিপস নিয়ে নিন ভাবী, ভবিষ্যতে কাজে লাগবে।“
“লাভ ম্যারেজ?”
আমেনা তাকালো কাঞ্চনের দিকে। কাঞ্চন একটু বিব্রত হলো। সে কি ভুল প্রশ্ন করে ফেললো। আমেনার কি মন খারাপ হলো? কিন্তু তার ভাবনাগুলো অবান্তর প্রমাণ করে আমেনা হাসি মুখে বললো,
“হ্যা, লাভ ম্যারেজ। লুকিয়ে বিয়ে করেছিলাম।“
“লুকিয়ে?”
“হ্যা, ও তখন আর্মিতে। বিয়ের পারমিশন পায় নি। এদিকে আমি মিডল ক্লাস ঘরের মেয়ে। বাবা পাত্র খুঁজছিলেন তখন। পড়াশোনা শেষ হয় নি। প্রতিদিন পাত্র দেখতে আসছে। এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে বিয়েই করে ফেললাম।“
“তারপর?”
“তারপর আর কি? বাসায় জানাজানি হলে প্যাদানি খেলাম। দু বছর পর ও বিয়ের অনুমতি পেলো। তারপর ঘটা করে বিয়ে করে ফেললাম।“
আমেনা গল্পটা শুনেই মন খারাপ হয়ে গেলো কাঞ্চনের। এতো চমৎকার মানুষদের জীবনেই কেন দুঃখ থাকে। কেন তারা সুখ পেয়েও কাঙ্গাল হয়ে যায়। আমেনা নিরবতার অর্থ বুঝলো হয়তো। তাই খুব স্বাভাবিক স্বরে বললো,
“আল্লাহর অশেষ রহমত জানেন। ও বেঁচে আছে, এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে পাওয়া।“
“একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?”
“করুন।“
“ভাইয়ার এমনটা হল কি করে?”
আমেনার চোখে বিষন্নতা হাতছানি দিলো। ঠোঁটে হাসি থাকলেও চোখের দৃষ্টিতে বিষাদের মেঘ জমলো। চিংড়ি মাছটা একটা বাটিতে ঢালতে ঢালতে বললো,
“মিশনের জন্য। ও তখন হরহামেশাই মিশনে যেত। র্যাবে নতুন নতুন জয়েন হয়েছিলো। পাঁচ বছর আগে একটা ড্রাগ র্যাকেট ধরার মিশনে ছিলো। ওখানে ওর মাজায় গুলি লাগে। অপারেশন হয়। তখন সুস্থ হয়ে গিয়েছিলো। আমরা ভেবেছি, যাক আলহামদুলিল্লাহ বিপদ কেঁটে গেছে। সমস্যা শুরু হলো তিন বছর পর। ওর পায়ে নাকি জোর পাচ্ছিলো না। বিষয়টা প্রথমে কেউ ই পাত্তা দেই নি। একদিন সকালে বিছানা থেকে উঠতে যেয়ে ও পড়ে গেলো। পা চলছে না। নিচের অংশ তুলতে পারছে না। হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। অনেক পরীক্ষা করলো ডাক্তার। পরে জানতে পারলাম, ওর মেরুদন্ডে গুলির ছোট অংশ থেকে গেছে। সেখান থেকে স্নায়ু দূর্বল হতে হতে ও নিচের অংশ অক্ষম হয়ে গেছে। চেষ্টা যে করা হয় নি এমন না। করা হয়েছে। অনেক টাকা খরচ হয়েছে, লাভ হয় নি। এখন অবশ্য ও মাঝে মাঝে ধরে দাঁড়াতে পারে। সেটাও কম কি বলো?”
কাঞ্চনের চোখটা কেন যেন ভিজে এলো। হৃদয় দ্রবীভূত হয়ে গেছে। সে নিজেকে সামলালো। আমেনার কণ্ঠে অব্যক্ত যন্ত্রণা থাকলেও তার মুখমন্ডলে তা প্রকাশ পেলো না। কাঞ্চনের অবচেতন মন কেন যেন কিছু একটা আন্দাজ করলো। মুজাহিদ ভাই কি সেই ব্যক্তি যিনি স্নিগ্ধ ভাইয়ের মিশনে আহত হয়েছিলেন উনার পরিবর্তে। কাঞ্চন শুনেছিলো লোকটি বেশি আহত হয় নি। তবুও তখন খুব গ্লানিবোধ হয়েছিলো। তার একটা ছোট্ট মিথ্যে কাউকে আঘাত দিয়েছে। স্নিগ্ধ ভাইও ছয় মাস সাসপেন্ডেড ছিলেন। তবে আজ সেই গ্লানিটা বেড়ে গেছে। কাঞ্চনের মনে হচ্ছে সে পৃথিবীর নিকৃষ্ট কোনো মানুষ। নিজের উপর রাগ হচ্ছে, ঘৃণা হচ্ছে। ফুপুর কথা মত সেদিন এমনটা না করলেই পারতো। বয়স ছোট থাকার জন্য ওই সময় তার কাজের প্রভাবের ভারটা অনুভূত হয় নি। আজ ভীষণভাবে হচ্ছে। আমেনা খাবার গুছিয়ে ফেলেছেন। কাঞ্চনের দিকে চেয়ে বললেন,
“চলেন ভাবি খেতে যাই।“
“একটা প্রশ্ন করি ভাবি?”
“আবার?”
“ঠিক আছে, থাক।“
“না না করুন।“
কাঞ্চন একটু থেমে বললো,
“আপনি ভাইয়াকে খুব ভালোবাসেন তাই না?”
আমেনা উত্তর দিলো না। শুধু হাসলো। রান্না ঘর থেকে দুজনে মিলে সব খাবারদাবার টেবিলে সাজালো। তারপর আমেনা হাক দিলো,
“এসে পরুন। খাবার রেডি।“
স্নিগ্ধ মুহাজিদের হুইল চেয়ার ঠেলে টেবিলের কাছে নিয়ে এলো। আমেনা এবং স্নিগ্ধ তাকে ধরে বসালো চেয়ারে। আমেনা অনেক প্রিপারেশন করেছে। তার রান্নার হাতও ভালো। অথচ কাঞ্চনের গলা থেকে খাবার নামতে চাইছে না। ব্যাপারটা নজর এড়ালো না স্নিগ্ধের। সে আড়চোখে নিজের স্ত্রীকে দেখছে। কানের কাছে মুখটা নিয়ে এসে বললো,
“খাচ্ছিস না কেন?”
“খাচ্ছি তো।“
“মাথাটাকে রেস্ট দে একটু। এতো ভাবিস না।“
কাঞ্চন স্নিগ্ধের দিকে তাকাতেই সে খাওয়ার জন্য ইশারা করলো। কিন্তু কাঞ্চনের খেতে ইচ্ছে করছে না। মনে হচ্ছে ভাত না ইট চাবাচ্ছে। খাওয়া দাওয়া শেষে বেশ কিছুক্ষণ গল্প করলো তারা। মুজাহিদ সামনের মাসে ইন্ডিয়ায় যাবে। অপারেশন হবে স্পাইনাল কর্ডের। বিষয়টা নিয়ে সে খুব এক্সাইটেড। তার বিশ্বাস এবার হয়তো সে সুস্থ হয়ে যাবে। আমেনাকে দেখে মনে হলো সে আশাবাদী নয়। তবুও সে মুজাহিদের আশাভঙ্গ করতে আগ্রহী নয়। স্বামীকে আশ্বাস দিলো,
“তুমি চাইলেই পারবে।“
এমন ভালোবাসাও হয়? ভালোবাসাগুলো এমন হলেই বোধহয় সুন্দর লাগে। যেখানে স্বচ্ছতাই একমাত্র সম্বল। আমেনার জন্যই হয়তো মুজাহিদ এতোটা হাসিখুশি। সেও হয়তো আমেনাকে এতোটাই ভালোবেসেছে। সেই গচ্ছিত ভালোবাসাই এখন আমেনা দ্বিগুণ করে ফেরত দিচ্ছে। এমন আদুরে ভালোবাসাগুলো দেখলে কাঞ্চনের মন থেকে একটা দোয়াই বের হয়,
“এরা সুখে থাকুক। ঝড় ঝাপটা যাই আসুক, এরা যেন দুজন দুজনকে এভাবেই ভালোবাসে।“
প্রতিটা মুজাহিদের জীবনে একটা আমেনার খুব দরকার। নয়তো বিষাক্ত জীবনে বেঁচে থাকা দায় হয়ে উঠে।
মুজাহিদদের বাসা থেকে বের হতে হতে বিকাল গড়ালো। দক্ষিণ আকাশে মেঘ গুড়গুড় করেছে। এখনই বৃষ্টি নামবে হয়তো। গাড়ি চালাচ্ছে স্নিগ্ধ। এসির তাপমাত্রা কম। গান বাজছে মৃদু লয়ে। কাঞ্চন গাড়ির গ্লাসে মাথা ঠেকিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। এতো সুন্দর লাগছে রাস্তাটাকে। অথচ মোবাইল বের করতে ইচ্ছে হচ্ছে না। স্নিগ্ধ রাস্তার দিকে তাকিয়েই গাঢ় স্বরে শুধালো,
“খিজ খেয়ে আছিস কেন?”
“সত্যি করে বলো তো মুজাহিদ ভাইয়ের এমন অবস্থার জন্য কোনো ভাবে কি আমি দায়ী?”
অকপটে প্রশ্ন করলো কাঞ্চন। স্নিগ্ধ সরু দৃষ্টিতে চাইলো কাঞ্চনের দিকে। কাঞ্চন আগের মতোই বাহিরে তাকিয়ে আছে। একটা বিশ্রী অনুভূতি হচ্ছে গলার কাছে। খচখচ করছে মনটা। বারবার একটা প্রার্থনা করলো যেন সে দায়ী না হয়। স্নিগ্ধ আবার গাড়ি চালানোতে মনোযোগী হলো। গাঢ় স্বরে বললো,
“মে বি। মে বি নট। হয়তো ওর ভোগান্তি ছিলোই।“
কাঞ্চন দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে ধরলো। সে ভুল করে নি, একপ্রকার পাপ করেছে। অজান্তে করা পাপের কি শাস্তি? কাঞ্চনের বিশ্বাস এই শাস্তিটা সে দুনিয়াতেই পাবে। প্রতিটা মানুষ তার কর্মফল দুনিয়াতেই ভোগ করে। সেও করবে। তবে সবচেয়ে বড় শাস্তি এই গ্লানিটাকে সারাটা জীবন বয়ে বেড়ানো। এর থেকে কষ্টের হয়তো কিছুই নেই। ক্ষমা চাইলেও এই অপরাধবোধ কমবে না।
গাড়িতে নীরবতা নেমে এসেছে। গাড়ি থামলো রুপসা নদীর ঘাটে। আকাশে নিকষ কালো মেঘ জমেছে। বাতাস ছেড়েছে। এরমধ্যে স্নিগ্ধ গাড়ি থেকে নামলো। কাঞ্চনের পাশের দরজাটা খুলে বললো,
“বের হ।“
কাঞ্চন হতবাক চোখে চাইলো। স্নিগ্ধ পকেটে এক হাত গুঁজে বললো,
“নৌকায় চড়বো।“
“আমি সাঁতার পারি না। যদি নৌকা উলটে যায়?”
“মরে যাবি। সমস্যা কি?”
কাঞ্চনের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো। সে কখনো নৌকায় চড়ে নি। চড়ার সুযোগ হয় নি। সাঁতার পারে না বিধায় তার সুইমিং পুলে নামাও নিষিদ্ধ। তবে পানি খুব ভালো লাগে তার। নীরব চোখে স্বচ্ছ পানির দিকে তাকিয়ে থাকতেও কেন যেন শান্তি লাগে। আকাশের প্রতিচ্ছবিতে সেই নীলচে পানিতে তাকিয়ে থাকতে মনের ভার হালকা হয়ে যায় তার। রুপসা নদীর পানি আর কালো। কারণ মাথার উপর আকাশটাই কালো। সূর্যটা দানবী মেঘেদের আড়ালে থাকায় নদীর বুকজুড়ে বিষন্নতা ছেয়ে আছে। উত্তাল ঢেউ উঠছে। জোয়ার চলছে নাকি? একটা নৌকা ভাড়া করলো স্নিগ্ধ। কাঠের পাটাতন দিয়ে খুব সাবধানে নৌকায় উঠলো কাঞ্চন। উঠতে নৌকা দুললো। স্নিগ্ধর হাত খামচে ধরলো সে। স্নিগ্ধ সতর্ক গলায় বললো,
“নড়িস না। বসে পড়।“
কাঞ্চ বসে পড়লো সাথে সাথে। নৌকা এখনো দুলছে। স্রোতে এসে বাড়ি খাচ্ছে নৌকার গায়ে। স্নিগ্ধ বসলো তার ঠিক পাশে। একটা শক্ত হাত রাখলো কাঞ্চনের কোমড়ে। নৌকা মেশিনের।
ভটভট শব্দ করে ইঞ্জিন ছাড়লো। নৌকার গতি পেল। ঢেউ বেড়েছে। মেঘ ডাকছে। সে কি গর্জন। নৌকাটা বেশ বড়। তাই প্রবল ঢেউয়ের আঘাতেও কিছুই হচ্ছে না। দু পাশের দু কূল ঝাপসা হয়ে আছে। সবুজ গাছগুলোকে কোনো জলরঙ্গের ছবির অংশের মতো লাগছে। বাতাসে কাঞ্চনের খোলা চুল উড়ছে। সেই চুল এসে লেপ্টে যাচ্ছে স্নিগ্ধ মুখে। কাঞ্চন বাধা দিচ্ছে না। বিষন্ন মনটায় শান্তির লহর বইছে যেন। এই ভয়ংকর নদীর দৃশ্যটাও ভীষণ জীবন্ত আর সুন্দর লাগছে। এখন যদি বৃষ্টি নামে তবে দৃশ্যটা আরোও ভয়ংকর সুন্দর হয় যাবে। কাঞ্চন আনমনেই বললো,
“সুন্দর না?”
স্নিগ্ধ গাঢ় স্বরে বলল,
“হুম। শান্ত থাকলে সুন্দর লাগে। তবে অবাধ্যতায় নেশা নেশা লাগে।”
কাঞ্চন চোখ তুলে তার দিকে তাকালো। স্নিগ্ধর চোখে চোখ রাখলো সে। মলিন স্বরে শুধালো,
“গ্লানি নিয়ে কি করে থাকো?”
“আমি খুব একটা গা করি না।“
“অপরাধবোধ হয় না বলছো?”
“না। কারণ জীবন অনেক ছোট। মৃত্যুর আগে মরার ইচ্ছে নেই। গ্লানিতে কুড়ে কুড়ে খাওয়ার থেকে আমার মনে হয় এগিয়ে যাওয়া উচিত। মানুষ ভুল করবে। ভুল থেকে শিখবে। আমিও শিখেছি। তাই আমি ইমোশনকে খুব বেশি প্রাধান্য দেওয়া কমিয়ে দিয়েছি।“
“আমি তো পারছি না। আমার তো মরে যেতে ইচ্ছে করছে।“
স্নিগ্ধ কঠিন গলায় বললো,
“ইউ কান্ট চেঞ্জ ইট। জাস্ট গো উইথ দ্যা ফ্লো।“
কাঞ্চন চোখ সরিয়ে নিলো। কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না। এর থেকে প্রকৃতির এই মায়াবী দৃশ্য দেখা শ্রেয়।
পটনভী মঞ্জিলে খুব চটপটে কিছু হচ্ছে না। পারভেজের আগমণ ব্যতীত কোনো আকর্ষনীয় ঘটনা নেই। অঞ্জনার দিন কাটছে খুব বোরিং ভাবে। কোনো গসিপ নেই, কোনো আলোচনা নেই। তাশদীদের থেকে দূরত্ব রাখবে বিধায় কাজিনদের সাথেও ঘেষা হচ্ছে না। একটা দিক ভালো। আকাম করা হচ্ছে না। সেমিষ্টার ফাইনাল সামনে। পড়ার অভাব নেই। লয়ের স্টুডেন্টের এই এক ঝামেলা। পড়ার শেষ নেই। অঞ্জনার ক্ষেত্রেও ভিন্ন নয়। সে একটা মোটা বই নিয়ে দোতালায় যাচ্ছিলো। ঠিক তখন ই মৃদু চিৎকার কানে এলো। উঁকি দিতেই দেখলো তাশদীদ এবং রফিকুল্লাহ পটনভীর মধ্যে কথা কাটাকাটি হচ্ছে। বিষয় কি শোনা যাচ্ছে না। রফিকুল্লাহ পটনভী রেগে গেলে মাঝে মাঝে কথা জড়িয়ে ফেলেন। আজ অন্যথা নয়। তাশদীদ পকেটে হাত গুঁজে বেপোরয়া ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। যেন বাবার এমন গলাবাজিতে তার কিছুই যায় আসে না।
ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ২৮
এতে করে রফিকুল্লাহ পটনভী যে আরোও রাগান্বিত হচ্ছে সেটা বুঝতে বাকি রইলো না অঞ্জনার। এই ছেলেটা এমন কেন? ছন্নছাড়া, বেক্ষাপ্পা। রফিকুল্লাহ পটনভীর শুভ্র মুখ রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। ছেলের অবাধ্যতা অসহ্য লাগছে। ফলে স্বভাবত কাজ তিনি করে বসলেন। একটা থাবা বসালেন অবাধ্য ছেলের গালে। তাশদীদ সেই প্রচন্ড থাবা খেয়ে ছিটকে গেলো। ঠোঁট দাঁতে লেগে কিছুটা কেটেও গেলো। গাল লাল হয়ে গেছে। অথচ তাশদীদ এখনো ভাবলেশহীন। বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে রক্তটা মুছে ফেললো। কিন্তু তার চোখ গেলো দেওয়ালের কোনে লুকিয়ে থাকা মোটা চশমা পরা নারীর দিকে। সে এক হাতে মুখ চেপে বড় বড় চোখ তাকিয়ে আছে। রফিকুল্লাহ পটনভী রাগে গজগজ করতে করতে চলে গেলেন। ছেলেকে নিয়ে নিরাশ তিনি। অঞ্জনাও কেটে পড়তে গেলো। কিন্তু সেই সুযোগ পেলো না। বলিষ্ট হাতটা তাকে টেনে চেপে ধরলো দেওয়ালে। হিসহিসিয়ে বলল,
“অবশেষে চোখের শান্তি লাগলো তাই না পাপা কি পারী?
