সাঁঝের মায়া পর্ব ৬৩ (২)
দুর এ দিলশাদ্ দুআা
চোখের পলক ফেলতে ফেলতে দিন পেরিয়েছে তিনদিন। ঈশান বাড়ির সাথে আচমকা যোগাযোগ বন্ধ করার পর এ ক’দিন হন্যে হয়ে খুঁজেও তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। তবে নাঈম জানিয়েছে, তার সাথে নাকি একবার যোগাযোগ সম্ভব হয়েছিলো। কোনো এক গুরত্বপূর্ণ কাজে ঢাকা যেতে হয়েছে তাকে। আগামী এক সপ্তাহ সেখানেই থাকবে। যদিও সে কথার একবিন্দুও বিশ্বাস করেনি তিতির। আচমকা এরকম কাউকে না বলে নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার মতো মানুষ ঈশান নয়। তবে দেওয়ান বাড়ির সবাই খুব সাচ্ছন্দ্য মেনে নিয়েছে সে কথা। কারণ ঈশান নাকি বরাবরই এরকম। এর আগেও এরকম বাবার সাথে রাগারাগি করে বহুবার ঢাকা গিয়ে থেকেছে। কিন্তু এবার সেরকমও কিছু হয়নি। বাড়ির কারোর সাথে কোনো ধরনের অশান্তি বা কথা কাটাকাটি হয়নি। আর রইলো বাকি তিতিরের সাথে। সেদিন দুপুরে নাঈমের সাথে দেখা করতে যাওয়ার আগে, যে আদুরে কথাগুলো এক অপরকে বলেছিলো, তারপর আচমকা এমন না বলে চলে যাওয়ার মানেই হয় না। তার থেকেও বড় কথা, এই তিনদিনে কি একবারের জন্যেও যোগাযোগ করার সময় সুযোগ হয়নি!
ঈদ সামনে। শহর বলা হোক বা মফস্বলগুলো। ঈদের ভিরভাট্টা বেশ চোখে পরার মতো। মানুষ জনের সমাগম স্বাভাবিক ভাবেই বেশি। দেওয়ান বাড়ির সামনের শুনশান রাস্তাটাতেও আজকাল বেশ মানুষ জনের সাড়া পাওয়া যায়। ক্রিংক্রিং শব্দ করতে করতে ঘনঘন রিকশা, সিএনজিগুলো পার হতে থাকে। জমিতে সদ্য ধান লাগানো হয়েছে। এখনো সেগুলে মাথা তুলে সেরকম দাঁড়ায়নি। সবুজে সবুজ যেদিকে তাকানো যায়। মাথার ওপর সূর্য তীব্র চোখে কটাক্ষ করতে ব্যাস্ত। গরমে যা তা অবস্থা লোকজনের। ক্লান্ত দুপুরবেলায় এরকম গরম মাথায় নিয়ে বারান্দায় গা এলিয়ে বসে আছে তিতির। এই তিনটা দিন অসহ্য ভাবে পার হয়েছে তার। নাঈম বা পরিবারের সবাই যতই বলুক, সে মোটেই শান্তি পাচ্ছে না। যতক্ষণ না অবধি সে নিজে ঈশানের কন্ঠস্বর শুনতে পাবে,ততক্ষণ অবধি মনকে শান্ত করা অসম্ভব তার জন্য। খাওয়া দাওয়া, ঘুম সবকিছু এলোমেলো হয়ে বসে আছে। এরইমধ্যে ভার্সিটির পরীক্ষার রুটিন দিয়ে দিয়েছে। ঈদের পরপরই পরীক্ষা। পড়াশোনা করা দরকার। সে-সবও হচ্ছে না।
—’ তিতির? ‘
শাশুড়ীর কন্ঠস্বর পাওয়া গেলো পেছন থেকে। গলা উঁচিয়ে ডাকছে তাকে। নিশ্চিত দুপুরের খাবার বয়ে ওপরে নিয়ে এসেছে। খেতে নিচে যায়নি কি-না! হলোও তাই। দরজা ঠেলে রাহেলা ভিতরে ঢুকলেন, হাতে খাবারের ট্রে নিয়ে। তিতির বারান্দার দরজা ভেজিয়ে ভিতরে চলে আসলে। রাহেলা ট্রে খানা টেবিলে রাখতে রাখতে আদুরে গলায় বললো,
—’ স্বামী এক দুদিনের জন্য একটু কাজে গিয়েছে। তাতেই এতো উদাস থাকলে চলে! হুম? খাওয়া দাওয়া সব শিকেয় উঠেছে, আমার পুত্রবধূর!’
রাহেলার মুখে পুত্রবধূ শব্দটা বেশ লজ্জায় ফেলে দেয় মেয়েটাকে। বিয়ের এই তিন মাসেও এখনো এটা যে এখন তার শশুর বাড়ি,এটা ভাবতেই লজ্জারা ভির জমায়। গোটা জীবন এটা তার মামার বাড়ি কম, নিজের বাড়িরই জেনে এসেছে। মানুষ গুলোকে সম্ভোধন করার ক্ষেত্রেও তাই। আচমকা বিয়ের পর শশুরবাড়ি হিসেবে বদলে যাওয়া সম্পর্কের সমীকরণ মেলাতে গিয়ে রাঙা হয়ে ওঠে সে। তিতিরকে কিছু বলতে হলো না। রাহেলা ছেলের বউয়ের হাত টেনে বসালো বিছানায়। মাথার ভেজা, উষ্কখুষ্ক চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দিতে দিতে বললো,
—’ ঈশান সম্ভবত বলে যাওয়ার মতো অবস্থায় ছিলো না। তাই তোকে বলে যায়নি। আমার বিশ্বাস আজ কালের মধ্যে ফোন করে জানাবে। এবং সেটা তোকেই করবে।’
তিতির এ যাত্রায় লজ্জা ভুলে মুখ তুলে তাকালো। শাশুড়ীর দিকে ছলছল করে তাকিয়ে বললো,
—’ সেদিন দুপুরে বলে বের হলো, খানিক সময়ের জন্য বের হচ্ছে। হুট করে কি এমন কাজ পরলো যে– এভাবে কাউকে কিছু না জানিয়েই ঢাকা চলে যেতে হলো। তাও সামান্য একটা মেসেজ লিখে! একটা কল করারও কি সময় পাচ্ছে না। এক মিনিটও সময় নেই?’
—’ বুঝতে পারছি, মা। কিন্তু কি বলবো বল। আগেও বহুবার এরকম ঝড়ের গতিতে ঢাকা যেতে হয়েছে ওকে। কাউকে জানানোর সময়ও হয়নি।’
—’ মামা যে বললো অফিসের কোনো কাজ নয়। তাহলে? তাহলে আর কি কাজ?’
রাহেলা এক মূহুর্তের জন্য থমকে থাকে। ছেলে কোথায় আছে এই মূহুর্তে, সামান্য হলেও আঁচ করতে পারে সে। সে তো মা। তার থেকে ঈশান লুকিয়ে রাখতে পারেনি কোনোকিছু, কোনোদিনই। সে নিজের ছেলের নাড়িনক্ষত্র সম্পর্কেও অবগত। তবে খুব সাবধানে মেয়েটার থেকে সবটা চেপে গেলো সে। নরম গলায় বললো,
—’ ঈশান যে সাইট টা সামলায়, সে টা সম্পর্কে তোর মামা বিন্দুমাত্র খোঁজ খবর রাখলে তবে তো! কত বিদেশি ডিলারদের সাথে ডিল করতে হয়। এসবই হুটহাট হয়ে যায়। আগেও হয়েছে। বললাম না তোকে। আমি জানি তো সবই। এতো চিন্তার কিছু নেই। ব্যাস্ততা কমলেই কল করবে।’
বেশ অভিমান ফুটে উঠলো তিতিরের ভেজা চোখে। রাহেলার অভিজ্ঞ দৃষ্টি পরে ফেললো সে অভিমানের ভাষা। তিতির মিহি সুরে বললো,
—’ এখন তো সে বিবাহিত, মামনী। এখনও এমন করলে কিভাবে হবে? আমাকে বলে গেলে আমি কি বাঁধা দিতাম? কিছুদিন আগেই গিয়ে কতগুলো দিন থেকে এলো। আমি কি কিছু বলেছি? বলিনি তো। তাহলে! এবার ওভাবে কিছু না বলে চলে গেলো কেনো। এতো কিসের ব্যাস্ততা! যে একটা বার যোগাযোগ করতে পারলোনা।
—’ ভীষন মিস করছিস আমার ছেলেটাকে? ‘
—’ নাহ। ‘ গম্ভীর মুখটা অন্য দিকে সরিয়ে কথাটা বললো তিতির।
রাহেলা মৃদু হাসলেন। ছেলেমেয়ে দুটো একে-অপরকে চোখে হারায়। দুজনকেই নিজ হাতে মানুষ করেছে সে। মুখে যতই যাই বলুক না কেনো, এদের মনের খবর পরতে সময় লাগে না তার। হাত বাড়িয়ে ট্রে থেকে খাবারের প্লেটটা হাতে নিয়ে, ভাত মাখাতে মাখাতে বললো,
—’ মিস তো করা উচিত । সদ্য বিয়ে হয়েছে। আমার আর তোর মামার যখন বিয়ে হয়, তখন তোর মামা এরকম উদাসীনতা দেখালে আমি তো কথা বলাই বন্ধ করে দিতাম। তারপর আহ্লাদ করে কাছে আসলে, খুব করে শাস্তি দিতাম। কাছেই ঘেঁষতে দিতাম না। ঈশানটা হয়েছে একদম ওর বাপের মতো। সেই হেতুতে শাস্তিটাও কিন্তু প্রাপ্ত ওর-ও…দেখি হা কর দেখি।’
কথাগুলো বলতে বলতে ভাতের লোকমা এনে তিতিরের মুখের সামনে ধরে আছে রাহেলা। তিতির মলিন মুখে সেদিকে তাকিয়ে, লাজুক গলায় বললো,
—’ পরে খাবো মামনী।’
—’ মুখের সামনে ধরে আছি । মানা করতে নেই। নে এখন, হা কর।’
বড্ড অনিচ্ছা নিয়েও হা করলো তিতির। খাবার টুকু মুখে নিলো। একদম খাওয়ার রুচি নেই। রাহেলা চাইলো আর একটু স্বাভাবিক করতে। আগের কথার রেশ টেনে বললো,
—’ কেমন শাস্তি দেওয়ার পরিকল্পনা আছে, আমার ছেলেকে? বল বল, শুনি একটু। ‘
তিতির মাথা নিচু করে ফেললো।
—’ আহ্ মামনী! কি সব বলছো। কি শাস্তি দেবো আমি আবার।’
—’ দেওয়া তো উচিত। ‘
মামনী যে এখন তাকে খানিকটা মাইন্ড ডাইভার্ট করতে এখানে এসেছে,তা সে খুব ভালো করে বুঝতে পারছে। নিঃশব্দে খাবারগুলো মুখে নিচ্ছে সে। রাহেলা শান্ত মুখে দেখে গেলো মেয়েটাকে। মেয়েটা রীতিমতো অস্থির হয়ে আছে। কিছুতেই একদন্ড স্থির হচ্ছে না, ঈশান যাওয়ার দিন থেকে।
—’ তিতির? ‘
—’ হুম।’
—’ একটা কথা জিজ্ঞেস করতে চাই। সম্পর্কে তোর আমি শাশুড়ী। তবুও, আগের সম্পর্ক মোতাবেক মা, বন্ধু সব। তাই নয় কি? ‘
তিতির মৃদু হেসে তাকালো ভদ্রমহিলার মুখের দিকে। সেটা মুখে বলার যে প্রয়োজন নেই, সেটা বুঝিয়ে দিলো হেসে। রাহেলা আলতো হাতো ভাতের লোকমা মুখে তুলে দিতে দিতে বললো,
—’ এর আগে ঈশান কখনো এতোদিন টানা বাড়িতে থাকেনি। কালেভদ্রে বাড়ি আসতো, অতিথির মতো দু’দিন পরেই চলে যেতো। কখনো কল্পনাও করিনি, ও এখানে এসে ওর বাপের ব্যবসার হাল ধরবে, অথবা এখানে সেটেল হয়ে যাবে। ‘
তিতির স্বাভাবিক নজরে শুনতে থাকে শাশুড়ীর কথাগুলো।
—’ এ-সব হয়েছে কিভাবে, বহু আগেই টের পেয়েছি আমি। ঘরছাড়া পাখি ঘরের টান অনূভব করেছে, তাই। কিসের টান জানিস? তোর টান। তোর টানে ও সংসারি হতে মরিয়া হয়েছে। বাড়িতে শান্ত হয়ে দুদণ্ড বসেছে। দিনের পর দিন কোনো ধরনের ছটফট না করে ঘরকুনো হয়েছে। ‘
তিতির অপ্রস্তুত হলো খানিকটা। এটা সত্যি, ঈশান বরাবরই বাড়িতে থাকার প্রতি বড্ড অনীহা দেখিয়ে এসেছে। সে নিজেও হোস্টেল থেকে ফিরে,কখনো ঈশানকে বাড়িতে পেতো না। বহু বহু বছর যাবৎ এমনই হয়ে আসছে। তবে এই কয়েকটা মাস, সেই মানুষ টা কি হেতুতে ঘরমুখো হয়েছে,তা তলিয়ে দেখা হয়নি। রাহেলার কথায় খানিকটা নড়েচড়ে বসলো সে। আবেগ জাগলো কি? জাগলো বোধহয়। রুক্ষ জমিনে এক পশলা বৃষ্টির ছোঁয়া পাওয়ার মতো হয়ে উঠলো মনটা। শান্ত গলায় বললো,
—’ ওটা তোমাদের মনে হচ্ছে। সেরকম কিছু না।’
—’ সেরকম কিছুই। বিয়ের পর ও এখানে থাকার জন্য মনস্থির করেছে। তোকে ছাড়া ও একদন্ড থাকতে পারে না।’
—’ তাহলে এটা কি হচ্ছে? এখন কি করে থাকতে পারছে? ‘
— ‘ এতো অবুঝের মতো হলে চলবে, মা? মানুষের কাজ থাকে তো কতোই। এক-দুই দিনের মামলা। চলে আসবে। তবে…’
—’ তবে?’
—’ আরও কঠিন করে ঘরে বাঁধতে হবে ওকে। দিনদুনিয়া ঠিক রাখতে গিয়ে, ঘর ভুললে চলবে কেনো? কৈফিয়ত ছাড়া এরকম উধাও হওয়ার সুযোগ তুই দিবি কেনো? ‘
ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসাসূচক দৃষ্টিতে তাকালো তিতির। রাহেলাও ইতস্তত করলো খানিকটা। তবে নিজের ছেলের অতীত, বর্তমান সব সম্পর্কে অবগত সে। ছেলেটা আবার ঘরছাড়া পাখি হয়ে উড়ে চলে যাক, একজন মা হয়ে সে সেটা কিভাবে মানবে? এই যে এখন যেমন হচ্ছে, অজানা এক আশঙ্কা এসে ভির জমাচ্ছে মায়ের মনে। মনটা বড্ড অস্থির হয়ে, বিপদের আশংকা করছে। আলো আবছায়ার ভিরে দেখতে পাচ্ছে তার ছেলেমেয়ে দুটোর সদ্য, সাজানো গোছানো সংসার টা এলোমেলো হতে! তা কি করে হয়! ঈশানের গোপন জীবনের প্রভাব সে তিতিরের ওপর কি করে পরতে দেবে! অসম্ভব সেটা। রাহেলা খুকখুক করে গলাটা পরিষ্কার করলো। খাবার শেষ হয়েছে প্লেটের। হাত ধুয়ে মুখটা মুছিয়ে দিতে দিতে চাপা কন্ঠে বললো,
—’ আমি জানি এখনো তোদের বিয়ের বিষয়টা জানাজানি হয়নি। সবে দু-তিন মাস মাত্র। তোর পড়াশোনা, বয়স সবই কম। ঈশানও সম্ভবত মানসিক ভাবে তৈরি হয়। তুই ও না। তারপরও…’
থামলেন দেওয়ান গিন্নি। এছাড়া ঈশানকে ঘরে আটকানোর উপায় আর কি ! যে মূহুর্তে একজনের মায়ায় কাজ হবে না, তখন আরও গভীরে তো ভাবতেই হবে। কাট কাট কন্ঠে বলে উঠলো,
—’ বাচ্চার পরিকল্পনা করে ফেল। ঈশান এখন চাইবে না। তবুও, না চাইলেও।’
তিতির থমকায়। আড়ষ্ট হয় ভীষন ভাবে। কি থেকে কি! এখানে বাচ্চার বিষয়টা আসে কোথা থেকে।
তিতির মিনমিন করে বললো,
—’ তোমার ছেলে এখন বাচ্চা চাইবে না, মামনী। তাছাড়া তাকে ঘরে রাখতে বাচ্চা দরকার, এটার মানে কি! কোথায় যাবে সে। এখানেই সেটেল, কাজকর্ম সব এখানেই। বেঁধে রাখার প্রয়োজন… ‘
তিতিরকে কথা শেষ করতে দিলো না সে। মাঝেই বলে উঠলো,
—’ আমার ছেলেকে আমি খুব ভালো করে চিনি, মা। আমার আজকাল বড্ড ভয় করে।’
—’ ভয়! কেনো? ‘
—’ জানি না। শুধু মনে হলো তুই ছাড়া ওকে আর কেউ বেঁধে রাখতে পারবে না। আমি চাই তোরা সংসারী হ। চোখের সামনে দুজন হাসিমজা,সুখে গোটা জীবন পারি দে। আর আমরা মৃত্যুর দিন অবধি, সেটা দু-চোখ ভরে দেখে যাই। ঈশানকে তুই মন দিয়ে ওর বাবার ব্যবাসার হাল ধরতে বল। বাকি সব বাদ। তুই বললেই মানবে ও, একটা বাচ্চা হলে তার দোহাই দিলে আর জীবনেও মানা করবে না। নিজের জীবনের মায়াও করবে, তোদের মায়াও করবে। এটা আমার বিশ্বাস। ‘
তিতির যেনো অবুঝই হলো। রাহেলার অস্থির চিত্তে বলা কথাগুলো মাথার ওপর দিয়ে গেলো তার। ঈশান শুধু বাবার ব্যবসা সামলামে! আর কি করে সে? কোথায়ই বা যাবে। সে-সব একশো প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খেয়ে গেলো। মুখ ফুটে জিজ্ঞেস করবে তার আগেই, নিচে হৈ চৈ এর শব্দ কানে ভেসে এলো। ডাকা হচ্ছে রাহেলা, তিতির দু’জনকেই। মুখ চাওয়া চাওয়ি করলো দু’জন। এতো উতলা হয়ে এই ভর দুপুর বেলা কে ডাকছে!
পুরান ঢাকার একেবারে শেষ প্রান্তে বুড়িগঙ্গার ঠিক পাশেই সেই মোঘল আমলের দোতলা একটা বাড়ি। বর্তমান সময়ের সাথে মোটেই দৃষ্টিনন্দন দেখতে লাগে না। বেশ ভাঙাচোরাই বলা যায়। সামান্য যেটুকুন জৌলুশ বেচে আছে তা বাইরে দেখে খালি চোখে দেখে ঠাহর করা যায় না। ঈশান শেষ তিনদিন যাবৎ এই বাড়িতেই আছে। বাড়িটার অতীতে মালিকানা কে বা কার ছিলো সেটা জানা না গেলেও, বর্তমানে এটা কাগজে কলমে রুষমিতা মির্জার নামে। তাহমিদ কায়েস যে কোন হেতুতে তাকে জেলে না নিয়ে এখানে নিয়ে এসে বসবাস করাচ্ছে তার কারণ অজানা। তবে সামান্য হলেও আঁচ করতে পারছে বোধহয়। তাহমিদ আর রুষা একসাথে কাজ করে যাচ্ছে। চোর পুলিশের প্রেম টাইপের হয়ে গিয়েছে ব্যাপারটা! ঈশান অবশ্য বহাল তবিয়তে আছে গোটা বাড়িতে। সমস্যা একটাই, তিতিরের সাথে যোগাযোগ করতে পারছে না। যদিও সে চাইলেই, পাঁচ মিনিটের মাথায় এ বাড়ির বাইরে বের হয়ে যেতে পারবে। তাতে লাভের লাভ কিছু হবে না। মাঝখান থেকে গিটের একটা তাশ খোয়া যাবে আরকি! শত্রুর ঘাটিয়ে আরাম আয়েশে শুয়ে বসে, তাদের মতিগতি বোঝার মজাই আলাদা। তাতে দুচার দিন বউসঙ্গ না পেলে, আক্ষেপ খুব একটা হবে না। পথের কাটাগুলো দূর করতে এতটুকুন স্যাক্রিফাইজ করা যেতেই পারে।
সে ছাড়াও এ বিশাল বাড়িতে আজ সকাল থেকে আর একজনের অস্তিত্ব দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। একজন অল্প বয়সী রমনী। একনজর তার সাথে দেখা হয়েছিলো ঈশানের। এক দেখয় বেশি কিছু ঠাহর করে উঠতে পারেনি। তবে মেয়েটা যে নির্যাতিতা, সেটা বলে দিতে দু সেকেন্ডও সময় লাগে না। বসার ঘরের দেয়ালে বিশালাকার একটা টেলিভিশন। লেটেস্ট মডেলের। সেটায় নাড়াচাড়া করছে ঈশান। ভীষন হাসি পাচ্ছে তার। তাহমিদ কায়েস তাকে এরকম একটা বাড়িতে রেখে, বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছে বাইরে। তার তীব্র ধারনা পাখিকে খাচায় বন্দি করে রেখে গিয়েছে সে! রান্নাঘরের খুটমট আওয়াজে ঘাড় বাঁকিয়ে পিছন ফিরে তাকালো ঈশান। মেয়ে মানুষের অস্তিত্ব টের পেলো বেশ স্পষ্ট। তাকিয়ে থাকার মাঝেই হাতে চায়ের কাপ নিয়ে বেরিয়ে এলো মেয়েটা। ঈশানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
—’ দুপুরের খাবার খান নি কেনো? যেমনটা রেখে গিয়েছিলাম, তেমনই রয়েছে। ‘
মেয়েটার কন্ঠের চাপা অধিকারবোধ টা পছন্দ হলো না ঈশানের। গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,
—’ কে তুমি? ‘
মেয়েটা হাতের কাপটা বাড়িয়ে ধরে আছে তখবো। ঈশান যে হাতে নেবে না, সেটা হয়তো বুঝে গিয়েছে। টেবিলের ওপর কাপটা রেখে সোজা হয়ে উঠে দাড়ালো। সরে গেলো খানিক টা। মাথার ওড়নাটা সামনের দিকে টেনে দিতে দিতে বললো,
—’ রুষা ম্যাডাম আমাকে এখানে রেখে গিয়েছেন। আপনার খেয়াল রাখতে। ‘
—’ আমার খেয়াল রাখতে?’
—’ জ্বী। ‘
—’ তোমার এ হাল কেনো? রুষার সাথে কি ভাবে পরিচয়?’
হাল বোঝাতে ঈশান যে তার মুখের ক্ষত গুলোকে ইঙ্গিত করছে, সেটা বুঝতে পারলো মেয়েটা। মিহি সুরে বললো,
—’ এক্সিডেন্টে। ‘
—’ মনে হচ্ছে মারধোরের।’
—’ নাহ।’
—’ এ বাড়িতে কে কে থাকে?’
—’ কেউ না। রুষা ম্যাডামের মা থাকতেন। আপাতত তালা ঝুলছিলো। সেদিন আপনি এসেছেন। আজ আমি।’
— ‘ এতদিন কোথায় ছিলে তুমি?’
—’ রুষা ম্যাডামের বাড়িতেই। ‘
—’ কি কাজ ছিলো তোমার?’
ইতস্তত করলো মেয়েটা। এলোমেলো দৃষ্টি ফেললো এদিক-সেদিক। হয়তো বলতে চাচ্ছে না আর কিছু। ঈশান মৃদু গলায় বললো,
—’ বয়স কতো তোমার? ‘
—’ বিশ। ‘
—’ পড়াশোনা? ‘
—’ ক্লাস টু অবধি।’
—’ বাড়ি?’
—’ নেই।’
—’ বাবা মা?’
— ‘ বাবার পরিচয় আমার নিজের মা-ও জানতেন না। আমি কোত্থেকে জানবো! আর মা? সে এখন কোথায় তাও জানি না। বেঁচে আছে এটুকু জানি শুধু।’
মেয়েটার জন্মপরিচয় সামান্য হলেও আঁচ করতে পারলো ঈশান। সেদিকে কথা বাড়ালো না। তবে আচমকা একটা প্রশ্ন ছুড়ে দিলো। গম্ভীর গলায় বললো,
—’ ইয়াজ মির্জা কোথায়? দেশেই? নাকি সিঙ্গাপুর? ‘
একপ্রকার থরথরিয়ে কেঁপে উঠলো মেয়েটা। কিয়ৎক্ষন কোনো ধরনের শব্দই উচ্চারণ করতে পারলো না। অতঃপর মিনমিন করে বললো,
—’ সেটা আমি জানিনা। ‘
ঈশান বাঁকা হাসলো। টেবিলের ওপর থেকে চায়ের কাপটা হাতে তুলে নিয়ে সেদিকে স্থির দৃষ্টি তাক করে বললো,
—’ তুমি যে অন্তঃসত্ত্বা, এবং ইয়াজ মির্জার সন্তানের মা হতে চলেছো। এই খবর টা নিজ মুখেই আমাকে দিয়েছিলে। তাইতো?’
বজ্রাহত হয়ে তাকালো মেয়েটা। ঈশান কিভাবে টের পেলো সেই আদতে কল করেছিলো সেদিন! ঈশান চায়ের কাপে চুমুক দিলো না। নরম গলায় বললো,
—’ হ্যা তাইতো? ’
—’ হ্যা। ‘
—’ খবরটা আমাকে দিলে কেনো? আমার সন্ধান কোত্থেকে পেলে?’
—’ পেয়েছি। ‘
—’ কথাটা আমাকে কল করে জানিয়েছিলে, মানে কারণ একটা অবশ্যই আছে। কি সেটা? এখন সামনা-সামনি আছি। বলে ফেলো। এমন সুযোগ আর না-ও পেতে পারো।’
মেয়েটা কাচুমাচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। হাতের মুঠোতে দলিতমথিত করছে ওড়নার অংশ। খানিকটা সময় নিয়ে বিরবির করে বললো,
—’ আপনি রাকিন মির্জার খু নি? ‘
ঈশানের নরম দৃষ্টি মূহুর্তের মধ্যে কঠিন হলো খানিকটা। সম্ভবত খু নি বিশেষন টা তার পছন্দ হলো না। তবে মেয়েটাকে ধমকেও উঠলো না। নরম গলায় বললো,
—’ হ্যা। ‘
—’ আপনার স্ত্রীর নামই তিতির। তাইতো?’
—’ হ্যা । ‘
—’ রুষমিতা ম্যাডাম আপনাকে ভালোবাসে। আর ইয়াজ মির্জা আপনার স্ত্রী কে। দুই ভাইবোনের নজর আপনাদের দিকে। এটাও জানেন।’
মুখে হাসির রেখা ফুটলো ঈশানের। মেয়েটা অনেক কিছুই জানে। একে খুব সহজেই কাজে লাগানো যাবে। ওদিককার সোফাটা ইশারা করে বসতে বললো মেয়েটাকে। মেয়েটা বসলো। ঈশান পায়ের ওপর পা তুলে আরাম করে বসতে বসতে বললো,
—’ পিছনে কুকুর ঘে উ ঘেউ করলে টের পাবো না?’
—’ তা ঠিক। ‘
—’ আর কি কি জানো? ‘
—’ সবই। ‘
—’ কি করে?’
—’ ইয়াজ মির্জার মাধ্যমে। ‘
কপালে ভাজ পরলো ঈশানের। সামান্য একটা কাজের মেয়েকে এতো তথ্য ইয়াজ মির্জা দেবে! অবিশ্বাসের সুরে বললো,
—’ কেনো বলেছে? ‘
মলিন হাসলো মেয়েটা। নত করলো মস্তিষ্ক। বুকের ভিতরের আর্তনাদ গুলো দলা পাকিয়ে আসছে। হালকা গলায় বললো,
—’ রোজ রাতে উনি নে শা করে বাড়িতে ফিরতো। ফিরেই ছটফট করতে করতে আমার ঘরে আসতো। জোরজবরদস্তি করতে। শেষের দিকে অবশ্য আমার সম্মতিতেই কাছে এসেছে। একটা সময় যখন টের পেলাম ওরকম একজন পুরুষ মানুষের জোর থেকে পালাবার পন্থা আমার জানা নেই, তখব স্ব-ইচ্ছায় ধরা দেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ পেলাম না। তাছাড়া সকাল হলেই উনি ভুলে যেতেন সব।’
ঈশান তীক্ষ্ণ নজরে শুনছো সবই। মেয়েটা পুনরায় বললো,
—’ নে শার ঘোরে অনেক কিছুই বলে দিতো। তবে এই গোপন, বিশেষ আলাপ সে আমার সাথে করতো ঠিকই, কিন্তু কাকে মনে করে করতো জানেন? ‘
ঈশান গম্ভীর হয়ে শুধায়,
—’ কাকে? ‘
মেয়েটার মুখে এক মূহুর্তের জন্য কেমন একটা বাঁকা হাসি দেখা গেলো। হাসি মুখেই বললো,
—’ আপনার স্ত্রী, তিতির। তাকে মনে করে এতো গভীর আলোচনা, এতো আবেগের বহিঃপ্রকাশ, এতো গভীর আদর দিতো আমাকে।’
মস্তিষ্কে কেউ আগুন ধরিয়ে দিলো বোধহয় ঈশানের। তার তিতির কে কল্পনা করে অন্য পুরুষ দিনের পর দিন একটা মেয়েকে নির্যা তন করে আসছে, ভাবতেই গা ঘিনঘিন করে উঠলো। অগ্নি বর্ষন হলো তীক্ষ্ণ দু চোখে। মেয়েটা দেখলো সবই।
—’ আমার নাম কিন্তু মিতু। তবে উনি যতক্ষণ আমার কাছে থাকতেম,আমি তিতির হয়ে যেতাম। আমি যে আদতে তিতির নই, সেটা আজকাল ভুলে বসি। জানেন তো! আর ভাবি, বাস্তবে কতটা ভাগ্যবান, তিতির। এরকম উন্মা দের মতো ভালোবাসা, আদর, সব ওর জন্যেই বরাদ্দ। ‘
—’ জাস্ট শাট আপ। শাট আপ।’
গর্জে উঠলো ঈশান। অসহ্য লাগলো মেয়েটার কথাগুলো। দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
—’ তিতির আমার। পুরোটা আমার। আমার বিয়ে করা হালাল বউ ও। ওকে স্পর্শ করার অধিকার শুধু আমার। ওকে নিয়ে কল্পনা করার অধিকার ও শুধুই আমার। আর কারোর নয়। তোমার ইয়াজ মির্জার ম রণ টেনেছে। ওর ভাইকে যেমন খু ন করেছিলাম। ওরও একই অবস্থা হবে। খুব শীগ্রই। কেউ আটকাতে পারবে না।’
মিতুর মুখটা নির্বিকার দেখালো। একটা মেয়ের জন্য এতগুলো পুরুষমানুষ উন্মাদের মতো করছে। অথচ সে নিজে কতটা অপমানিত, অবহেলিত, নির্যাতিত। খোদার কেমন বিচার এটা!
মিতু স্বাভাবিক গলায় বললো,
—’ আপনি যে ধ র্ষন মামলায় ফেঁসে গিয়েছেন তা৷ জানেন? ‘
—’ জানি। ‘
—’ তারপরও এতো স্বস্তিতে আছেন। কারণ জোরালো কোনো প্রমান নেই, তাইতো?’
মুখের রাগ ভাব এখনো একবিন্দুও কমেনি ঈশানের। বাঁকা চোখে মেয়েটার মুখপানে তাকাতেই উঠে দাঁড়ালো মিতু। ভ্রু উঁচিয়ে বললো,
—’ খুব নোং রা ভাবে আপনি ফাঁসতে চলেছেন ঈশান আরশাদ দেওয়ান। এখানে বসে বসে প্রমান সংগ্রহের ভুল মোটেই করবেন না। তিতির কে হারাতে না চাইলে, আজকেই ফিরে যান। বেড়িয়ে যান এই বাড়ি থেকে। না হলে…’
—’ না হলে? ‘
মিতু হাত রাখলো নিজের সামান্য ফোলা পেটটার ওপর। ভেজা গলায় বললো,
—’ এই বাচ্চাকে হাতিয়ার বানিয়ে আপনাকে জেলের ভাত খেতে হবে। আমাকে এই বাড়িতে আটকে রেখে দিনের পর দিন ধ র্ষন করার অভিযোগ উঠবে আপনার নামে। এবং সেটার ডিএনএ টেস্ট ও পজিটিভ আসবে। এক মূহুর্তের জন্য এ সন্তানের বংশ মির্জা থেকে দেওয়ান এ চলে আসবে। আপনার বউ নিশ্চয় এতকিছুর পরও আপনার স্পর্শ পেতে চাইবে না? তখন সাক্ষাৎ দেবদূত হয়ে ইয়াজ মির্জা আপনার বউকে, ঈশান আরশাদের থেকে মুক্ত করতে হাজির হবে। পাশা ঘুরে যাবে ঈশান আরশাদ দেওয়ান। পুরোটা ঘুরে যাবে। চলে যান এখান থেকে। আমাকে বাঁচাতে নিজের ঘর ডোবাবেন না। একবার এই অতলে ডুবে গেলে, দ্বিতীয় বার নিজের অর্ধাঙ্গিনী কে ছুঁয়ে দেখা তো দূর, চোখের দেখাও দেখতে পাবেন না। কে জানে, সে-ই হয়তো আর দেখা দেবে না। ‘
ভর সন্ধ্যা বেলা । দিনের আলো নিভতেই, কৃত্রিম আলোতে আলোকিত হয়েছে চারিদিক। দেওয়ান বাড়ির বড় গেটে জ্বলজ্বল করছে বিশাল একটা লাইট। গোটা বাড়ির ভিতর বা বাহিরে, কোনো বাল্ব সম্ভবত আজ বন্ধ নেই। তার কারণও অবশ্য আছে। চন্দ্রা দেওয়ান ফিরেছে সবেই। রাহিয়ান দেওয়ান আনতে গিয়েছিলেন মা’কে। কয়েকদিন পরই ঈদ উল আযহা। বাড়িতে তো ফিরতেই হতো। তাছাড়া আশ্রমের কাজও প্রায় শেষের দিকেই। বৃদ্ধার ঘরেই এতক্ষণ ভির লাগিয়ে দাঁড়িয়ে, বসে ছিলো বাড়ির সবাই। এতদিন পর বাড়ি ফেরায় তার দিকেই নজর সবার। ঈশানের খোঁজ জিজ্ঞেস করতেই, রাইসুল দেওয়ান একচোট বকাবকি করে গেলেন ছেলেকে। এতসবের মধ্যেও নিরবে চোখাচোখি হলো রাহেলা আর চন্দ্রা দেওয়ানের। বউ -শাশুড়ী চোখে চোখে বলে ফেললেন অনেক কথা।
—’ আব্বা, বাইরে পুলিশ আইছে । আপনেরে খুঁজতেছে।’
বাড়ির মালি ছেলেটা ছুটে এসে পুলিশ আসার খবর দিতেই নড়েচড়ে বসলেন রাইসুল দেওয়ান। বাকিরা আহামরি গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করলো না। এলাকার মাথা হওয়ার নিমিত্তে, মা র্ডার কেসগুলো নিয়ে আজকাল, অহরহ পুলিশ আসে বাড়িতে। আলাপ আলোচনা করতে। তবে আজকে ভিন্ন চিত্র দেখা গেলো। চিৎকার চেঁচামেচির শব্দে বৃদ্ধার ঘর থেকে একএক করে সবাই এসে জমায়েত হলো বসার ঘরে। বলাবাহুল্য চেঁচামেচির মাত্রা এতটাই যে, চন্দ্রা দেওয়ানও হুইল চেয়ার ঠেলে এসে হাজির হয়েছে এখানটায়। সবাই বেশ অবাকই হলো বলা যায়। আজকে একজন পুলিশ নয়। বরং গোটা একটা ফোর্ড এসে হাজির হয়েছে। এবং এরা কেউ-ই এখানকার কেউ নয়। রাইসুল দেওয়ানের মুখটা রক্তলাল হয়ে গিয়েছে, রাসেদ দেওয়ানেরও একই অবস্থা। বৃদ্ধার মেজো ছেলের বউকে ইশারা করলো সেদিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। গম্ভীর গলায় শুধালো,
—’ কি ব্যাপার? এতো চেঁচামিচি কিসের? ‘
পুলিশ অফিসার ততক্ষণে খানিকটা নরম হয়ে এসেছে। তবে মুখের কাঠিন্য এখনো শুরুর মতোই। গম্ভীর কন্ঠে বললো,
—’ ঈশান আরশাদ দেওয়ানের নামে গ্রেফতারই পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। এবং আমরা তাকে গ্রেফতারও করেছি।’
বজ্রপাত হলো যেনো গোটা বাড়িতে। জ্বর শরীর নিয়ে নয়নও নেমে এসেছো সিঁড়ি ভেঙে। রাহেলা বিষ্ফরিত নজরে তাকিয়ে রইলো, বৃদ্ধা মোটেই ঘাবরালো না। শান্ত গলায় বললো,
—’ কারণ? কিসের ভিত্তিতে?’
পুলিশ অফিসার একপলক সবাইকে পরখ করলো। অতঃপর শান্ত সুরেই বললো,
—’ ধ র্ষন আর খু নের মামলা। পাঁচ পাঁচটা মা র্ডার করেছে সে। এ সময়ের বহুল আলোচিত যে ধ র্ষন মামলা নিয়ে এতো চর্চা। সেগুলোর মূল আ সামি, ঈশান আরশাদ দেওয়ান। আমরা পূর্ণ প্রমানের ভিত্তিতে তাকে গ্রেফতার করেছি। ‘
তিতির আশ্চর্য নয়নে দাঁড়িয়ে ছিলো বৃদ্ধার পাশেই। পা ভেঙে এলো তার। অবশ অনূভব করলো গোটা শরীর। দু কদম তাল সামলাতে না পেরে পিছিয়েও গেলো। মেয়েটাকে দু’হাতে আগলে নিলো নিশি। জড়িয়ে ধরে ব্যাস্ত গলায় শুধালো,
—’ অ্যাই, তিতির? কি হলো? খারাপ লাগছে? ‘
তিতির ততক্ষণে সামলে নিয়েছে নিজের ভারসাম্য। সবাই ছলছল চোখে তাকালো মেয়েটার দিকে। তিতিরের মুখ ভাবলেশহীন দেখাচ্ছে। বৃদ্ধা গম্ভীর গলায় শুধালো,
—’ কি প্রমান!’
অন্য কেউ হলে পুলিশ সম্ভবত কৈফিয়ত দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করতো না। তবে দেওয়ানদের ক্ষমতা বা জৌলুশ সম্পর্কে বেশ অবগত সে। চন্দ্রা দেওয়ান এর দিকে এগিয়ে গিয়ে, একে একে সবকটা প্রমানই উল্টেপাল্টে দেখালো। বর্ণনা দিলেন বহু কিছুর।
অদূরে শেয়ালের ডাক শুনতে পাওয়া যাচ্ছে তীক্ষ্ণ শব্দে। গা ছমছম করা অবস্থা। বাড়ির ভিতরে কিয়ৎক্ষনের জন্যে সেরকম গা ছমছম করা নিরবতা বিরাজ করে গেলো। রিশা, রোশনি, রাফিকে ওপরে নিয়ে গেলেন বাড়ির কাজের মহিলা। বাকিরা স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে। রাইসুল দেওয়ান রাগে গজগজ করছেন। রাগটা পুলিশের প্রতি, নাকি ছেলের প্রতি বোঝা গেলো না। নূরি নিজেও হতবাক। কোথাও একটা গন্ডগোল পাকিয়ে গিয়েছে। এখান থেকে সরে যাওয়ার উপায়ও পাচ্ছে না। তবে এই মূহুর্তে যাদের সবথেকে বেশি রিঅ্যাক্ট অথবা কান্নাকাটি করার কথা, অর্থাৎ রাহেলা, চন্দ্রা দেওয়ান এবং তিতির। আশ্চর্য জনক ভাবে তিনজনের মুখই একদম শান্ত। কারোর মুখে বিন্দুমাত্র চিন্তার রেশমাত্র দেখা গেলো না। রাহেলা একমুহূর্ত শাশুড়ির দিকে তাকালো। তারপর দু’জনের দৃষ্টি পরলো তিতিরের দিকে। পুলিশ অফিসার সম্ভবত এখন একটু ইতস্ততই বোধ করছে। বাড়ির ছেলে ধ র্ষন মামলায় ফেঁসে গিয়েছে। গ্রেফতার হয়েছে, আর বাড়ির সবাই এতোটা নির্বিকার কি করে! পুলিশ অফিসার খুকখুক করে কাশলেন। রাইসুল দেওয়ান কে উদ্দেশ্য করে বললো,
—’ আপনাদের বাড়িটার তল্লাশি করা হবে, স্যার। ‘
—’ তো করবেন । ‘
—’ ধন্যবাদ। ‘
—’ আমার ছেলেকে কোথায় রাখা হয়েছে?’
—’ সাহবাগ থানায়। ‘
—’ কবে গ্রে ফতার করেছেন? ‘
—’ তিনদিন আগে।’
জলন্ত দৃষ্টি তাক করলো রাইসুল দেওয়ান। তার ছেলে তিনদিন যাবৎ জেলে, আর আজকে তারা জানতে পারছে। গমগম করে উঠলো তার কন্ঠস্বর।
—’ কাকে কি কেসে জেলে তুলেছেন, ভাবতে পারছেন? আর আমাদের ইনফর্ম করা হচ্ছে আজকে? একপ্রকার গুম করে নিয়ে গিয়েছেন আমার ছেলেটাকে। আপনাদের সাহস দেখে আমি হতবাক। ‘
—’ আমাদের কেসের কিছু প্রসেস চলছিলো। বুঝতেই পারছেন, উনি এ সময়ের মোস্ট ওয়ান্টেড ক্রি মিনাল। মিডিয়া, প্রেস, সব থেকে কয়েকটা দিন আড়ালে রাখতে হতো। তাই…’
—’ শাট আপ। জাস্ট শাট আপ। দেওয়ান বাড়ির সম্মানে হাত লাগাবেন না। আমার ছেলে ধ র্ষন মামলায়! ছিহ্ ছিহ্। আমার ছেলের গায়ে একটা আঁচড় বা বদনাম লাগলে কাউকে ছাড়বো না আমি। দেওয়ান দের ক্ষমতা দেখিয়ে দিবো। ‘
পুলিশ অফিসারের মুখ দেখে বোঝা গেলো না তিনি কথাগুলো গায়ে মাখলেন কি-না। তবে বিনয়ের সাথে বললেন,
—’ ওনার স্ত্রীর সাথে আমি একটাবার কথা বলতে চাই।’
ঘরভর্তি সকলের দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো ওদিকে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তিতিরের দিকে। নিশি কাঁদছে বোনকে জড়িয়ে। সবার দৃষ্টি অনুসরন করতেই পুলিশ অফিসারের বুঝতে বাকি রইলো না, ঈশান আরশাদের স্ত্রী কে! রাহেলা তৎক্ষনাৎ এগিয়ে এলেন ছেলের বউয়ের দিকে। মেয়েটার বাহু আঁকড়ে ব্যাকুল গলায় বললো,
—’ সবসময় প্রমান সত্যি হয় না, মা। যেটা দেখা যায় সেটা তো…’
—’ আমি বুঝে নেবো, মামনী। কথা বলতে দাও।’
রাহেলা এতক্ষণে সম্ভবত হতাশ হলেন। তিতির শেষমেশ তার ছেলেটাকে ভুল বুঝবে! অবশ্য মেয়েটারই বা কি দোষ! সব প্রমান গুলো স্পষ্ট ইঙ্গিত করছে ঈশানের দিকে। সবাইকে ঠেলে সামনে গিয়ে দাঁড়ালো মেয়েটা। কন্ঠস্বর বেশ মোটা করে শুধালো,
—’ আমি। আমি রেহনুমা আরশাদ তিতির। ঈশান আরশাদ দেওয়ানের স্ত্রী। বলুন।’
অফিসার শান্ত নজরে দেখে তার সামনের এই অতি দৃঢ় এক রমনী কে। বয়স ঠাহর করে উঠতে পারে না। কত আর হবে! আঠারো, উনিশ! তবে রুপ দেখে থমকালোই খানিকটা। এতো এতো মানুষের ভিরে এতক্ষণ খেয়াল করেনি। লোলুপ দৃষ্টি সরালো না সে। নরম গলায় বললো,
—’ আপনার স্বামী নিজের অপরাধ স্বীকার করেছেন। এটা জানেন?’
একেরপর এক বজ্র হুংকার পরছে যেনো। বাড়িজুড়ে সবার মাথা ভনভন করে উঠলো। রাইসুল দেওয়ানের অগ্নিদৃষ্টি খেয়ালই করলো না অফিসার। সে তো ঈশান আরশাদের নরম কোমল বউকে নিজের দৃষ্টিতে তলিয়ে দেখতে ব্যাস্ত। তিতির এখনও শান্ত স্বামীর হাত আঁকড়ে ধরে আছেন রাহেলা। নিশি ঝটপট এগিয়ে এলো বোনের দিকে। মেয়েটার বয়স কম, আবেগি হয়ে অসুস্থ না হয়ে পরলে হয়!
তিতির ঠান্ডা গলায় বললো,
—’ তাই নাকি? আর কি স্বীকার করেছে? ‘
—’ উনি এসব বিগত তিনবছর যাবৎ করে আসছেন। মেডিকেলের ভাষায় উনি একপ্রকার হোমিসাইকেল ম্যানিয়াক। ‘
—’ এখন? আর কিছু বলেনি?’
—’ বলেছেন।’
—’ ঝটপট বলে ফেলুন। ‘
—’ আপনি বোধহয় এখনো বিশ্বাস করে উঠতে পারেননি ম্যাডাম। প্রমানগুলো খেয়াল করে দেখেননি। না করতে পারাই স্বাভাবিক। অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর। আপনারও সে অবস্থা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে…’
আচমকা হেসে ফেললো তিতির। মেয়েটার দিকে হত-বিহবল হয়ে তাকিয়ে আছে বাড়ির সবাই। সয়ং রাইসুল দেওয়ান ও। মেয়েটাকে বড্ড বড় মানুষের মতো মনে হচ্ছে। কন্ঠস্বরেও কেমন একটা দৃঢ়তা। মোটেই বাচ্চা বাচ্চা ভাব নেই। তিতির মাথার ওড়নাটা আলতো হাতে টেনে দিতে দিতে বললো,
—’ উনি কি বাড়ির মানুষের সাথে দেখা করার অনুমতি পাবেন?’
—’ আপনারা সলিসিটরের সাজেশন নিন। কেসটা কোর্টে উঠবে শীগ্রই। ‘
—’ দেখি কি করা যায়। কি যেনো বললেন, আমার উদ্দেশ্যে কি বার্তা আপনার?’
অফিসার বাঁকা নজরে তাকিয়েই আছে তখনো। বাঁকা গলাতেই বললো,
—’ জীবনটা অনেক বড়, ম্যাডাম। আপনার নতুন বিয়ে। স্বামী দিনের পর দিন ঠকিয়েছে। এটা মানা অবশ্যই যন্ত্রণার। তবুও, সে নিজ মুখে স্বীকার করেছেন সবটা। আমরা তাকে রিমান্ডে অবধি নেই নি। আর না তো একটা আঁচড় এঁকেছি তার গায়ে। বললাম না? উনি হোমিসাইকাল ম্যানিয়াক। সুপরিকল্পিত ছিলো সবটা। শুধু মাত্র নিজের নোং রা খায়েশ মেটাতে…’
—’ এনাফ, অফিসার। ‘
একপ্রকার হুংকার দিয়ে উঠলো তিতির। অগ্নিদৃষ্টি তাক করে বললো,
—’ এসেছিলেন খবরটা জানাতে। হয়ে গিয়েছে। আসতে পারেন। আমরা আমাদের সলিসিটারের সাথে কথা বলে, যা স্টেপ নেওয়ার নেবো। আপনার থেকে সাজেশন বা বিশেষন কোনোটাই শুনতে চাচ্ছি না আমরা।’
—’ আপনি তার মানে এখনো বিশ্বাস করছেন আপনার স্বামীকে? উনি নিজ মুখে বলেছেন, আপনাকেও বিয়ে করেছেন উনি শুধুমাত্র… ‘
—’ আপনাকে থামতে বলেছি অফিসার। উনি আমাকে কেনো বিয়ে করেছেন, বিয়ের পর আমার সাথে কি কি নোং রামি করেছেন, তা আমি ভেবে নেবো, বুঝে নেবো। আর শুনুন, আমি এখনো আমার স্বামী কে বিশ্বাস করি বা করছি কি-না, সেটা আপনার না ভাবলেও চলবে। আমার ভালোবাসা এতো ঠুনকো নয়, অফিসার। এক সমুদ্র বিশ্বাসে এ সম্পর্ক টিকে আছে। ‘
গোটা বাড়ির সকলে হতবাক হয়ে তাকিয়ে মেয়েটার দিকে। এতক্ষণ শক্ত হয়ে থাকা রাহেলা, এ যাত্রায় কেঁদে ফেললো। শাড়ির আঁচলে মুখ চাপা দিলো। বাদবাকি সবারই একই অবস্থা। চন্দ্রা দেওয়ান বিজয়ীর হাসি হাসলেন। তিতির গম্ভীর গলায় বললো,
—’ যে কেউ এসে যা খুশি বলে যাবে, আর আমি হাহাকার করে তার সাথ ছেড়ে দেবো, এমনটা ভাবলেন কি করে?’
পুলিশ অফিসারটি শব্দ করেই হাসলো এবারে। বাঁকা সুরে বললো,
—’ যে কেউ নয়, ম্যাডাম। আ সামী নিজ মুখে স্বীকার করেছে।’
তিতিরও তালে তাল মিলিয়ে হাসলো। ব্যাঙ্গাত্ম হাসি ছুড়লো তার দিকে।
—’ ওনার তিন কবুলে বাঁধা সঙ্গী আমি। খোদা ওনার জন্য আমাকে, আমার জন্য ওনাকে তৈরি করেছে। ঈশান আরশাদ দেওয়ান এর অর্ধাঙ্গিনী আমি, তার রুহ সঙ্গী। রুহ সঙ্গী মানে বোঝেন তো? সে আমার সামনে দাঁড়িয়ে এ কথা স্বীকার করলেও, আমি তার দু চোখের দৃষ্টি পড়ে ফেলতে পারবো। সত্য-মিথ্যার হদিশ খুঁজে বের করতে পারবো। সুতরাং, আপনাদের মতো ঘুষখোর পুলিশ অফিসারের কথা মেনে, আমি আমার স্বামীকে এরকম একটা নোং রা বিষয়ে জড়িয়ে ফেলবো! হাসালেন।’
সাঁঝের মায়া পর্ব ৬৩
—’ আপনি…’
—’ বড্ড অস্থির আপনি, অফিসার। সবই তো বললেন, এখন আমাদের কথা শুনুন। ঈশান আরশাদ কে গিয়ে বলবেন, এতো সহজে আমার বিশ্বাস বা ভালোবাসায় চিড় ধরবে না। ভুলেও, আমার ভালোর জন্য আমাকে ছাড়ার পায়তারা করে কোনো ধরনের মিথ্যা এজহার দিলে, আমি কিন্তু তাকে খু ন করে তারপর নিজেকে ফাঁসাবো। আমার ভালো করতে, আমার সাথে আজীবন থাকলেই চলবে। মিথ্যা গায়ে মাখতে হবে না। আমি আছি তার সাথে। আমি তার সব কৈফিয়ত শুনবো। তার সসম্মানে ফিরে আসা অবধি তার স্ত্রী তার অপেক্ষা করবে।’
